১৩
দাঁতনে মাছটা খুব শক্ত, আঁশ ছাড়াতে, কাটতে কষ্ট আছে। কর্তার সাহায্য নিতে হল। হলুদ, নুন, লঙ্কা গুঁড়ো আর একটু সর্ষের তেল মাখিয়ে বেশ কড়া করে মাছের টুকরোগুলো ভেজে নিলাম। মাছের ঝালের রেসিপি সামুদ্রিক মাছে যেমন হয় তেমনই - তেল, ঝাল, পেঁয়াজ রসুন, আদা দিয়ে মশলাদার রান্না। তবে একটা জিনিস একটু আলাদা। আমরা যেমন রান্নার শুরুতে কিছু না কিছু ফোড়ন দিই, এখানে তেমন হবেনা। পেঁয়াজ রসুন, আদার টুকরো, শুকনো লঙ্কা, কাঁচা লঙ্কা - সব কিছু একসঙ্গে অল্প তেলে নেড়ে নিয়ে ভাজা মিশ্রণ বেটে নিতে হবে। এবারে কড়ায় গরম জল যখন টগবগ করে ফুটবে, তখন ঐ ফুটন্ত জলে বাটা মশলা, নুন, হলুদ দিয়ে ফোটাতে হবে। বেশ ঘন হয়ে এলে তাতে মাছ দিয়ে আবার একটু ফুটবে। স্বাদ বুঝে নামিয়ে নিতে হবে।
আর কাবাব করার পদ্ধতি আর একটু আলাদা। শুকনো খোলায় গোটা জিরে, ধনে, শুকনো লঙ্কা আর গোলমরিচ নেড়ে নিয়ে খুব ভাল ভাবে পিষে গুঁড়ো করে ফেলতে হবে। এখানে পেঁয়াজ লাগবেনা। আদা রসুন বাটায় বেশি জল থাকলে চলবেনা। খানিকটা বেসন নিয়ে শুকনো খোলায় ভেজে রাখতে হবে, বেশ সুন্দর একটা গন্ধ উঠবে, কিন্তু পুড়ে গেলে চলবেনা। এবারে ডিম ফেটিয়ে তার সঙ্গে সব মশলা মিশিয়ে মাছের গায়ে বেশ করে মাখিয়ে আধঘণ্টা চাপা দিয়ে রাখতে হবে। এরপরের ধাপ হল মাছটা ভেজে হালুম হুলুম করে খাওয়া। পমফ্রেট, হালুয়া বা ঐ জাতীয় মাছও এইভাবে ভেজে খেলে বেশ লাগে - নতুন ধরণের স্বাদ।
— মা! মেজ পিসির কাছে রেসিপি নিয়েছ বললে, কিন্তু রুনা জেঠুর কাছে একবার জেনে নিলে পারতে।
— কেন? খেতে কী খারাপ হয়েছে?
— খারাপের কথা বলছিনা, রুনা জেঠু বলে দিলে ব্যাপারটা পাকাপোক্ত হয়, তাই না!
— দাঁড়া আমি মেজপিসিকে তোর পাকামোর কথা বলে দিচ্ছি। আরে বোকা, রেসিপি রুনাদাই বলুক বা মেজদি, তাদের শিখিয়েছে কে?
— কে?
— দুজনের শিক্ষাগুরু তো একজন - তোর ঠাকুমা।
— ওহ। তার মানে দুজনের জানাটা সেম?
— হুম, সেম।
— আচ্ছা মা, রুনা জেঠুর বাপ ঠাকুরদাও কি এমন সুন্দর রান্না করতো?
— না।
— তাহলে রুনা জেঠু এমন রান্না শিখলো কোথায়? সব ঠাকুমার কাছে? মানে আমি বলতে চাইছি যে…
— রুনাদা রান্নাকে পেশা হিসেবে নিল কেন, তাইতো?
— হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটাই।
— রুনাদা কোন বাড়ির ছেলে কোনো ধারণা আছে তোর বাবু, রুনাদার ঠাকুরদার বাবা হটীচরণ দাস, ইংরেজ আমলে নিজে পাঠশালা তৈরি করে, সেখানে পড়াতেন। এলাকায় তখন আর কোন ইশকুল ছিলনা।
— তাই নাকি? তাহলে রুনা জেঠু ওরকম হলনা কেন?
— গ্রহের ফেরে ওদের পরিবার গরীব হয়ে গিয়েছিল বাবু। বিয়াল্লিশের উত্তাল আন্দোলনের বছরে উপকূল এলাকায় এক ভয়াবহ সাইক্লোন হয়েছিল।
— আমাদের আয়লা, আম্ফানের মত?
— হ্যাঁ, বহু বাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, ক্ষেত খামার উজাড় হয়ে গেল। লোকে না খেয়ে, অসুখে বিসুখে পথে পড়ে মরতে লাগলো। যেহেতু মেদিনীপুরে ব্রিটিশ বিরোধিতা খুব বেশি ছিল, ইংরেজ সরকারও বসে বসে মজা দেখতে লাগল। দেশের অন্য লোক যাতে জানতে না পারে, খবরগুলো চেপে দিল, সংবাদপত্রে বেরোলোনা। শচীন দাদুর বইটা পড়বি - সেখানে লেখা আছে সেদিনের বর্ণনা, পড়লে বুকটা ফেটে যায়।
—উফফ, তারপর?
— ঐ ঝড়ে হটীচরণ দাসের পাঠশালা মাটিতে মিশে যায়, ছাত্রদের দুরবস্থার জন্য লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ওঁদের পরিবারও কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ে। অনেকবছর পরে তোর ঠাকুমা একদিন দেখলেন, ফুটফুটে ছেলে কপালে রসকলি এঁকে কৃষ্ণ সেজে বাড়ি বাড়ি চাল ভিক্ষে করছে। ঠাকুমা তো ছাড়ার পাত্রী নন। খোঁজখবর করে জানতে পারলেন, যে এ ছেলে হটীচরণ দাসের ছেলে ঈশ্বর দাসের নাতি। ব্যাস তোর ঠাকুমা তাকে কোলে তুলে নিলেন। সেই থেকে বক্সি বাড়ির আশ্রয়েই রুনাদা আছে। রুনাদা কি শুধু রান্না করে নাকি! ওবাড়িতে রুনাদাই আমাদের অভিভাবক। শুধু রান্নার লোক হলে তোর বাবা, কাকাকে তুই তোকারি করে কথা বলতে পারতো, দাবড়াতে পারতো? গ্রামের বাড়ির কোন বিষয়ে তোর বাপ কাকার ক্ষমতা আছে রুনাদার ওপরে কথা বলার? রুনাদা রান্না করে, কারণ বোষ্টম পরিবারে সকলে ভোগের রান্নার গুপ্ত পদ্ধতি জানে, আর রুনাদা রান্না ভালোবাসে, তোর ঠাকুমার একনিষ্ঠ জীবিত শিষ্য। ওরা অনেকগুলো ভাই বোন। রুনাদা নিজের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ির বহু দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের জন্য খাটতে খাটতে বেচারার টি.বি. ধরে গিয়েছিল, বহু চিকিৎসা করে সারানো হয়েছে। তার মধ্যে বড় মেয়েটা পুকুরে ডুবে মারা গেল। অনেক দুঃখ সয়েছে।
— এত সব কথা তো জানতামই না। রুনাজেঠু তো সব সময়েই হাসি মজা হুড়োহুড়ি করে।
— নিজের দুঃখ ভুলে, যে অন্যকে ভাল রাখতে পারে, সেই তো মানুষ বাবা।
— তবে হ্যাঁ রান্নাঘরে তোমার সঙ্গে গুজগুজ ফুসফুস করে।
— হা হা হা হা, দেখা হলে দুজনে ঘর সংসারের হাঁড়ির খবর দেওয়া নেওয়া করি। তুলু জেঠুর ঠাকুরদা, মানে শচীন দাদুর বাবা ব্রজমোহন বড়পণ্ডা আর তোর বাবার ঠাকুরদা তারিণীপ্রসাদ দাস মহাপাত্র যখন নতুন করে প্রাথমিক স্কুল তৈরি করেন, তখন হটীচরণের ঐ প্রয়াসকে সম্মান জানিয়ে ইস্কুলের নাম দেন, কলাপুঞ্জা হটীচরণ প্রাথমিক বিদ্যালয়।
— আচ্ছা! নিজেদের নাম দিলেননা। পরের লোক জানবে কীকরে? কারা ইস্কুল করেছিল।
— ব্রজমোহন, তারিণীপ্রসাদ, ব্রজমোহনের বাবা উমেশ্চন্দ্র, এঁদের নাম এলাকার মানুষের হৃদয়ে লেখা আছে বাবু। এঁরা নির্লোভ ছিলেন, তাই আজও এঁদের নাম নিলে এলাকার মানুষ হাত তুলে নমস্কার করে।
— আর বড় ইস্কুল দুটো?
— সেটা হল স্বাধীনতা আসার পরে। কারণ তার আগে শিক্ষা সংকোচের জন্য ইংরেজরা চট করে নতুন ইস্কুলের দরখাস্ত মঞ্জুর করতনা। ইংরেজ ভারত ছাড়ার পর দেশ গড়ার ঢেউ উঠল। যে ইউনিয়ন বোর্ড বর্জনের জন্য তারিণী আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, স্বাধীন ভারতে তাঁর ছেলে কিন্তু চটা পদ্মপুর ইউনিয়ন বোর্ডে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে ভোটে জিতলেন।
— ঠাকুরদা ভোটেও লড়েছেন?
— হ্যাঁ, ঠিক স্বাধীনতার আগে আগে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ষড়যন্ত্র করেছিল যে মেদিনীপুর জেলাকে তৎকালীন প্রস্তাবিত পূর্ব পাকিস্তান এর অন্তর্ভুক্ত করবে।
— কিন্তু বাংলাদেশ তো মেদিনীপুরের লাগোয়া নয়।
— তাতে কী? নানা জায়গায় ছিটমহল বানিয়ে সাড়ে সর্বনাশ করবে প্ল্যান করেছিল।
— তারপর?
— এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মৈতনার পানিগ্রাহী হাটে এক বিশাল জনসভা হয়। এই জনসভার অন্যতম আয়োজক এবং বক্তা ছিলেন তারিণী। বাবার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে অমরেন্দ্রনাথ সব জায়গাতেই সহযোগী ছিল।
— তার মানে ঠাকুরদাও পুরোদস্তুর স্থানীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন। ঐ জন্যেই ভোটে জিতেছেন। এবার ইস্কুলটা বল।
— প্রাথমিক পাশ করার পর ছেলেরা আর ইস্কুল পাচ্ছিলনা বলে লেখাপড়ার ইতি হয়ে যাচ্ছিল। এদিকে অনেক ছেলের পড়ার খুব ইচ্ছে। তখন ঐ ব্রজমোহন, তারিণীপ্রসাদ - এই দুজনের সঙ্গে যোগ দিলেন শশিভূষণ মাইতি। তিনজনে মিলে চালাঘর তৈরি করে মাধ্যমিক বিভাগ চালু করলেন। তোর ঠাকুরদা অমরেন্দ্রনাথ গল্প করতেন, হঠাৎ জানা গেল অমুক গ্রামের তমুক গ্র্যাজুয়েট হয়েছে। সকাল অবধি দেরী করলে দূরের অন্য ইস্কুল যদি টীচার হিসেবে নিয়োগ করে দেয়, তাই বিকেলেই বেরিয়ে পড়লেন ইস্কুলের জন্য শিক্ষক ধরতে। উড়িষ্যা কোস্ট ক্যানাল পেরোনোর সময়ে দেখলেন নৌকো নেই, ব্যাগ থেকে গামছা বার করে পরে, ধুতি মাথায় বেঁধে ব্যাগ একহাতে মাথার ওপর তুলে সাঁতরে রাত্তিরে সেই লোকের বাড়ি পৌঁছে তাকে শিক্ষক হবার জন্য রাজি করানো হল। রাতে তার বাড়িতে থেকে ভাত ডাল খেয়ে আবার তাকে নিয়ে ফেরা।
— এ যে অবিশ্বাস্য। বাবা ইস্কুল করেছে বলে ছেলে জান লড়িয়ে দিয়েছে।
— সে দেখ, সাপোর্ট না পেলে কি আর বড় কাজ সফল হয়? তারপর আবার একইভাবে অভিভাবকদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছাত্র সংখ্যা বাড়ানো - সে কাজটাও সেযুগে খুব সহজ কাজ ছিলনা। নইলে সরকারী বৈধতা পাওয়া যাবেনা। সেই ইস্কুল আজ সরকারী সহায়তায় কত বিশাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার পরের বছরে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় বটতলা আনন্দময়ী হাই স্কুল। প্রথমে হাইস্কুল ছিলনা, এম. ই. স্কুল নাম ছিল। পরে হাইস্কুল হল।
— এইরকম নাম দেওয়া হল কেন?
— স্থানীয় ডাকঘরের নাম বটতলা। আর ব্রজমোহন, তারিণীপ্রসাদ আরও কয়েকজন মিলে আনন্দময়ী কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই কালীমায়ের নামে ইস্কুল হল। সঙ্গে তোর পুতুল দিদার ঠাকুর্দা জিতেন মহাপাত্রও ছিলেন।
— হঠাৎ কালীমন্দির কেন?
— শচীন দাদু লিখে গেছেন, এক দুর্গা পুজোর ভাসানে দাঁড়িয়ে সকলে ঠিক করেছিলেন গ্রামে কালী মন্দির হবে। এখন তার পিছনে বিপ্লবী আবহ থাকতে পারে, রামকৃষ্ণ - বিবেকানন্দ - ভবতারিণীর অনুপ্রেরণা থাকতে পারে, কারোর স্বপ্নাদেশ হতে পারে - সঠিক কারণ জানার আর উপায় নেই।
— মেয়েদের পড়ার কোন উপায় হলনা?
— তারিণী তো মেয়েদের আলাদা ইস্কুল করলেন, বলেছিলাম না মৈতনা গার্লস ইস্কুল তৈরি হয়েছিল তোর ঠাকুমার তত্ত্বাবধানে।
— হুঁ বলেছিলে, তবে পুরোটা খুলে বলোনি।
— প্রথম থেকেই চেষ্টা হয়েছিল মেয়েদের পড়ানোর। বটতলা আনন্দময়ী ইস্কুল প্রথম থেকেই কোএডুকেশন। কিন্তু তখন কোন ছাত্রী ভর্তি হতনা।
— কেন?
— মেয়েদের অভিভাবকেরা ছেলে মেয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করবে সেটা মানতে পারেননি। তাই শুরুর দিকটায় শুধু ছেলেরাই পড়ত।
— ছেলেরা মেয়েরা একসঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিল, মৃত্যু বরণ করল, আর একসঙ্গে পড়াশোনায় আপত্তি? এ তো খুব অন্যায়!
— সব মানুষের ধ্যান ধারণা তো সমান হয়না বাবু। এদিকে একটা ইস্কুলের খরচ যোগাতেই নাভিশ্বাস উঠছে, দুটো ইস্কুল চালানোর টাকা কোথায়? তবু নানাভাবে চেষ্টা করতে করতে কেটে গেল আরও দশটা বছর। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালে মৈতনা গার্লস স্কুলের যাত্রা শুরু হল পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে, তোদের বাড়ির দাওয়ায়।
— আমাদের বাড়িতে কেন হল?
— প্রথমতঃ জায়গা। তখন বড় মাটির বাড়ি ছিল। তোর বাবা বলে দশবিঘে জমির খড় যেত তোদের বাড়ি ছাওয়ার জন্য। নাটমন্দির, ঠাকুরের রান্নাঘরের চাতাল, তারিণীর বৈঠকখানা, দুর্গামন্ডপ, উঠোন - এমন নানা জায়গায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মেয়েদের ক্লাস হত।
দ্বিতীয়তঃ তোর ঠাকুমাকে ব্যক্তিত্বের জন্য গ্রামের লোক খুব মান্যি করত, একেবারে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেই সম্মান তিনি পেয়েছেন। আর মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা ছিল বলেই না অভিভাবকেরা মেয়েদের ইস্কুলে পড়তে পাঠাতেন না। ঠাকুমার উপস্থিতি গার্জেনদের সেই ভয় কাটিয়ে দিয়েছিল।
— ঠাকুমার তখন কত বয়স?
— তোর ঠাকুমার বিয়ে হয়েছিল চোদ্দ বছর বয়সে, সন ১৯৪৭। তার মানে ১৯৫৮ তে আরও এগারো বছর যোগ করলে হয় পঁচিশ।
— ঠাকুমা নিজে তোমায় বলেছে ইস্কুলের কথা?
— অবশ্যই। মা এই ইস্কুলকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল। ইস্কুলের কথা হলেই আনন্দে উত্তেজিত হয়ে যেত।
— কী বলেছিল ঠাকুমা?
— ঠাকুমা বলেছিলেন যে, প্রতি সন্ধেবেলাতেই বাড়ির দুর্গামন্ডপে বয়স্ক জ্ঞানীগুণী লোকেরা আসতেন। চা, তামাক, জলখাবার চলত। তারিণী বসে গড়গড়া টানতেন। আর সকলে মিলে নানা বিষয় আলোচনা হত। একদিন সেই সভায় তারিণী বৌমাকে রান্নাঘর থেকে ডেকে পাঠালেন, সবার সঙ্গে বসতে বললেন। বৌমা এত গুরুজনদের সঙ্গে বসবে কী, লজ্জায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে রইল। তারিণী বললেন, 'এই লজ্জা সংকোচ ভাঙতে হবে বৌমা, তোমাকে মেয়েদের ইস্কুলের ভার নিতে হবে। নতুন ইস্কুলের দরখাস্ত করা হচ্ছে।'
— তখন ঠাকুমা কী করল?
— ওরে ঠাকুমা পণ্ডিত বাড়ির মেয়ে, বাড়িতে টোল, চতুষ্পাঠী - এসব জন্ম থেকে দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু নিজে কীকরে করবে, এই ভেবে পা কাঁপছিল, বুকের ভেতর ভয় করছিল।
— তারপর?
— তারপর অন্যান্য বড় যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও বোঝালেন, যে এছাড়া এলাকার মেয়েদের ইস্কুলে টেনে আনার দ্বিতীয় কোন রাস্তা নেই। তুমি বুকে সাহস আন বৌমা, অমত কোরোনা।
— সেই পাঁচজন প্রথম ছাত্রী কারা ছিল জানতে পেরেছ?
— চারজনের পরিচয় পাইনি, একজনের নাম জেনেছি। তিনি তোর বাপ্পা কাকার মা, চঞ্চলা দাসমহাপাত্র বিয়ের পরে মাইতি।
— তারপর?
— তারপর ধীরে ধীরে ছাত্রী সংখ্যা বাড়তে লাগল। তোর ঠাকুরদা, ঠাকুমা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ করতেন। ঐ ইস্কুলটাই রামনগর থানার প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। এখন তো বিরাট বিল্ডিং হয়ে কত বড় হয়ে গেছে।
— তুমি যে বলেছিলে, ঠাকুমাকে নিজে হাতে আমিষ নিরামিষ সব রান্না করতে হত, উনুন আলাদা। উনুন বদল করতে গেলে বারবার চান করতে হত।
— হুম, তার সঙ্গে আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, গরু গোয়াল, দাসদাসী, মন্দির, নটি গর্ভ, তিনটি সন্তানের অপমৃত্যু, ছটি সন্তানের দেখভাল।
— তার সঙ্গে ইস্কুল চালানো? মানুষের পক্ষে সম্ভব?
— ঠাকুমা মনের জোরে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন বাবু। বাকিরাও সঙ্গে ছিলেন, সাহস যুগিয়েছেন। ঠাকুমার বড়দা বিভূতিভূষণ দাসও স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন এবং ব্রিটিশ বিরোধিতা করতে গিয়ে দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন।
— তাই নাকি?
— বড় মামা ১৯৩৬ সালে বি ই কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফাইনাল পরীক্ষা দেন। কিন্তু আইন অমান্য আন্দোলনের সময়ে ছমাস জেলবন্দী হওয়ার ইতিহাস থাকায় ব্রিটিশরা তাঁর ডিগ্রি আটকে দিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ডক্টর ত্রিগুণা সেনের সাহায্যে আবার যাদবপুর থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পেলেন। তারপর সরকারী চাকরি করেছেন। পি ডব্লিউ ডির সুপারিন্টেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন। উনি মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের কাছের মানুষ ছিলেন। আর ছোটমামা কালীকিঙ্কর দাস ছিলেন ইউনাইটেড এলিভেটরের এম ডি। বড়মাইমা সেই যুগে নিজে গাড়ি চালিয়ে ঘুরতেন। ঠাকুমা মনের দিক থেকে খুবই প্রগতিশীল ছিলেন বাবু। কিন্তু যে যেরকম, তার সঙ্গে ঠিক তার মত হয়ে মিশতে পারতেন। তাই সবাই তাঁকে কাছের মানুষ মনে করত। শুধু তো চেনা মানুষ জন নয়, বাইরে থেকে যাঁরা আসতেন, তাঁদেরও তিনি ভরসা হয়ে উঠতেন।
— বাইরে থেকে কারা আসতেন?
— দুটো ইস্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা যাঁরা বাইরে থেকে আসতেন, তাঁদের মধ্যে শিক্ষিকারা থাকতেন বীরেন্দ্র নাথ মিশ্রের বাড়িতে আর শিক্ষকরা থাকতেন আমাদের বক্সি বাড়িতে। অথবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যে ডাক্তার বাবুরা আসতেন, এঁদের — সকলের কথাই বলছি।
— স্বাস্থ্য কেন্দ্র মানে?
— ১৯৬০ সালে তারিণীপ্রসাদ, সিতাংশু শেখর নন্দ ও সোনাকোনিয়ার হরনারায়ণ প্রধানের উদ্যোগে এবং বিধায়ক ত্রৈলোক্য প্রধান এর সাহায্যে আজকের নিজ মৈতনা উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি হয়। বাইরে থেকে সেখানে যে ডাক্তার বাবু বা নার্স দিদিমণি আসতেন, তাঁদের ভালোমন্দ, থাকা খাওয়া এসবও তোর ঠাকুমা দেখাশোনা করতেন।
— এক জীবনে এত কিছু? বিরাট সংগ্রাম করেছে ঠাকুমা।
— দেখ বাবু, সংগ্রাম আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার অংশ।
— কীকরে?
— তুই ভেবে দেখনা, পাহাড় থেকে সমুদ্র অবধি জায়গা আমাদের, হাজার হাজার নদী। নদীর ঢেউ, সাগরে তুফান, জঙ্গলে বাঘ, সাপ, জলে কুমীর, সঙ্গে কলেরা, প্লেগ, ফ্লু জ্বর, ম্যালেরিয়া কতকিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করে যুগ যুগ ধরে আমরা বেঁচে আছি।
— তারপর ইংরেজের সঙ্গে লড়াই।
— শুধু ইংরেজ কেন, যে কোন দূরের শাসকের নাকে দড়ি দিয়ে বাঙালি ঘুরিয়েছে।
— হি হি।
— তারপর নৃত্য গীত বাদ্য আদি চারুকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, নাটক, সিনেমা, খেলাধুলো কোথায় বাঙালি আইকন নেই?
— সবেতে আছে।
— তার সঙ্গে ধারালো যুক্তি, জ্ঞানের আলোয় ঝিকিয়ে ওঠার লড়াই বাবু, যত মত তত পথ - টিকিয়ে রাখার লড়াই।
— গায়ে কাঁটা দেয় মা, এসব ভাবলে।
— এই কথাগুলো সবসময়ে মনে রাখবে বাবু। জীবনে কখনও এমন কিছু কোরোনা, যাতে তোমার পূর্বপুরুষের ত্যাগ, শ্রম, সংগ্রামের অবমাননা হয়।
"পরিচয়ে আমি বাঙালি,
আমার আছে ইতিহাস গর্বের—
কখনোই ভয় করিনাকো
আমি উদ্যত কোনো খড়গের।
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি,
স্বপ্নের সাথে বাস;
অস্ত্রেও শান দিয়েছি
যেমন শস্য করেছি চাষ;
একই হাসিমুখে বাজায়েছি
বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস;
আপোষ করিনি কখনোই
আমি— এই হ’লো ইতিহাস।"