

একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতিদের সামনে বলছেন, ‘আমার বিনম্র নিবেদন মহাশয়, আমি একটি সাধারণ পরিবার থেকে আসছি এবং আমি শুধু আমার দলের জন্য কথা বলছি না, আমি পুরো বাংলার জন্য কথা বলছি, সাধারণ মানুষের অসুবিধার কথা তুলে ধরতে আমি আজ এখানে এসেছি’ তখন অর্ধেক লড়াই জেতা হয়ে যায়। সারা দেশের প্রতিটি বাঙালি আজ দেখেছে, যে তাঁর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী’র নামে মানুষের যে হয়রানি হচ্ছে, তার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বলছেন, যে তিনি বাংলার জন্য লড়ছেন, বাংলার মানুষের জন্য লড়ছেন, তখন তাঁর মন্ত্রীসভার শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি থেকে শুরু করে, ওবিসির ক্ষেত্রে তাঁর প্রশাসনের গাফিলতি কিংবা অন্য যে কোনও ইস্যু গৌণ হয়ে গেল।
মমতা ব্যানার্জি সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করলেন, লাইভ যারা শোনেননি, তাঁদের কাছেও এই কথা আজ না হয় কাল পৌঁছে যাবে। SIR আবহে এই প্রথম এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে দেখলাম SIR যে ভাবে হচ্ছে তার বিরোধিতা করে, মাইক্রো অবসার্ভারদেরদের ভূমিকার বিরোধিতা করে, লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি নামক অযৌক্তিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে কোর্টে দাঁড়িয়ে জোরদার সওয়াল করলেন। সেই সওয়ালে কতটা ভাষার শুদ্ধতা ছিল, কতটা পাকা উকিলি মারপ্যাঁচ ছিল সেটা বিষয় নয়। উনি পুরো রাজ্যের কোটি মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বললেন যা হচ্ছে সেটা বাঙালিদের নিশানা করে হেনস্থা, সেটা বন্ধ করতে হবে। এই স্পষ্ট পজিশন অন্য দলের দেখা যাচ্ছে না। উলটে তাঁরা ‘পিসি কবে জেলে যাবে, ভাইপোর কান ধরে কবে টানা হবে’ তা নিয়ে মিম বানিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, তাঁকে নিয়ে নারীবিদ্বেষী মন্তব্যও করে চললেন এবং সেটাকেই রাজনৈতিক কর্তব্য বলে মনে করলেন এবং তার ফলে আরও জনসংযোগ হারালেন।
আজকের সময়টা রাজনীতিতে দৃশ্যকল্প তৈরী করার খেলা আর এই খেলাতে সবচেয়ে পারদর্শী যিনি, তিনি জানেন কী করে এই দৃশ্যকল্প তৈরী করতে হয়। বাংলার মূলধারার সংবাদমাধ্যম যতই দেখানোর চেষ্টা করুক, নির্বাচন কমিশন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করেছে এবং সেটা যুক্তি সহকারে, বাংলার অলিতে গলিতে মানুষের মোবাইল ফোনে যখন ঐ ভিডিও ক্লিপটি ভেসে আসবে, যেখানে মমতা ব্যানার্জী বলছেন, তিনি নিজের পার্টির জন্য নয়, বাংলার জন্য বাঙালির জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সওয়াল করছেন, তখন প্রধান বিরোধী দল বুঝতে পারবে যে ঐ SIR তাঁদের কতটা ক্ষতি করেছে। যখন একদিকে মানুষ শুনবে রাজ্যের বিরোধী দলনেতার বক্তব্য যে ১ কোটি কিংবা দেড় কোটি মানুষের নাম এই SIR করলে উড়ে যাবে ভোটার তালিকা থেকে আর যখন শুনানির সময়ে নিজের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠাকে মেলাবেন, তখন তিনি ভোট দেওয়ার সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা এখনই বলে দেওয়া যায়।
যে বামপন্থীদের কাজ হওয়ার কথা ছিল, মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করার লড়াইতে থাকা, বিহারের উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সেটা করেননি। ক্ষীণ শক্তি হয়েও সিপিআইএমএল লিবারেশনের মতো দল, যোগেন্দ্র যাদবের মতো সমাজকর্মীরা বাংলায় এসে বারংবার বলে গেছেন যে এই SIR মানুষের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া, এটি তালিকা শুদ্ধিকরণের কোনও প্রক্রিয়া নয়, তা সত্ত্বেও বামেদের বৃহদাংশ মনেই করেনি এই নিয়ে লড়াই করা উচিত। মনেই করেনি, এই SIR এ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বা লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সির মতো বিষয় নিয়ে গলা চড়ানো উচিত, উল্টোদিকে মানুষ কী দেখেছে তৃণমূলের নীচের তলার কর্মীরা ক্যাম্প খুলে মানুষকে সহায়তা করছেন। শুধু তাই নয় বিরোধী বিজেপি-র পক্ষ থেকে যখন তাড়া তাড়া ফর্ম ৭ (নাম মুছে দেওয়ার আবেদনপত্র) জমা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে তখন তা আটকানোর চেষ্টাও ঐ নীচের তলার তৃণমূল কর্মীরা সাধ্যমতো করেছেন।
এই রায় পক্ষে বা বিপক্ষে আসুক আজ সেটা নিয়ে কেউ সুপ্রিম কোর্টের দিকে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ তাকিয়ে নেই। আসলে বেশ কিছু কথা আজ সর্বসমক্ষে আলোচিত হয়েছে এবং জাতীয় স্তরের প্রতিটি গোদী মিডিয়াও তা দেখাতে বাধ্য হবে। প্রথমত এই SIR নিয়ে কমিশন তাড়াহুড়ো করেছে সেটা বলা হয়েছে এবং সেই কারণেই বহু ভুল আজ জনগণের সামনে প্রকাশিত হয়েছে এবং অজস্র মৃত ভোটার বেঁচে আছে। বহু বৈধ ভোটারদের লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সির নামে হয়রানি হচ্ছে। মানুষজন তো বলাই শুরু করেছে এটা শুনানি না হয়রানি? নির্বাচন কমিশন সময়ে কাজ শেষ করার জন্য সব থেকে নিচের স্তরে কর্মচারী অর্থাৎ বিএলও-দের উপর দিনের পর দিন অমানুষিক মানসিক চাপ তৈরী করেছে যার ফলে বহু বিএলও আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে কমিশন তাঁদের নিজেদের নিয়ম নিজেরাই বদল করে তা হোয়াটসঅ্যাপ মারফত দেওয়া হয়েছে আজ যাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কমিশন এটা ভেবেছিল রাজ্য সরকারি কর্মচারী তাদের অধিন, তা যে না এবার বুঝতে পারছেন। রাজ্য সরকার বেতন দেয় তাই কর্মচারী আগে রাজ্যের তারপর ওভারে টাইম হিসাবে কমিশনের কাজ করে। এই বিষয়টিও কমিশনের আগে ভাবা উচিত ছিল। তাই তাদের প্রতি ভদ্র ব্যবহার ও বিশ্বাস কমিশন কে রাখতেই হবে না হলে ২ মাসের জায়গায় ৬ মাস লাগবে SIR শেষ হবে। এখন ও রাজ্য সরকার কর্মচারীকে কমিশন বিশ্বাস ও মর্যাদা না দিলে এখন মাইক্রোঅবজার পরে ম্যাক্রোঅবজাভার ও আরো বিগ অফিসারদের নিয়োগ করতে হবে। রাজ্যের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইমেজ আরো বড় করার সুযোগ কমিশন তথা বিরোধীরা নিজেরাই দিয়েছে। এই বিধান সভা ভোট তো এই রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের দিয়েই করতে হবে যাদের উপর কমিশন ভরসা না করে মাইক্রো অবজারভার দিয়ে কাজ করছে। ভোটের সময় কি ভোটিং অফিসার ও বাইরের রাজ্য থেকে আসবে তা যদি না হয়, এই ক্ষোভ ও পুষিয়ে নেবে আর সব ক্ষেত্রেই সবথেকে লাভবান হচ্ছে তৃণমূল সরকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিরোধীরা, কারণ বিরোধী রাজনীতির পরিসরটাও তিনিই দখল করে নিয়েছেন।
যে ভূমিকায় যিনি স্বচ্ছন্দ। মমতা ব্যানার্জী বিরোধীর ভূমিকায় সবচেয়ে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, আর বিরোধীরা সেই ভুলটাই করলেন, বিরোধী হিসেবে মমতা ব্যানার্জীকে সেই জায়গা ছেড়ে দিয়ে। ১৯৯৮ কিংবা তারও আগে থেকে বাংলার মানুষ মমতা ব্যানার্জীকে এই ভূমিকাতেই দেখেছেন, আর আজকে যখন বাংলা বিরোধী, বাঙালি বিরোধী বিজেপি-র বিরুদ্ধে তাঁকে আগের ঐ ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে তখন ২০২৬ সালের নির্বাচনে কী ফলাফল হতে চলেছে তা এখনই বলে দেওয়া যায়। রাজনীতি আজকের সময়ে দৃশ্য তৈরীর খেলা, বামপন্থীদের বৃহদাংশ কবে যে বুঝবেন বিষয়টা?