

যারা প্রথম যৌবনে কোলকাতা ছাড়ে, তারা সারাজীবন বুকের মধ্যে এক কোলকাতাকে বয়ে বেড়ায়। অবশ্য এই কথাটি মুম্বাই বা দিল্লির সন্তানদের জন্যেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। এসব কেন মনে এল? আলোচ্য বইটি পড়লে আপনারও তাই মনে হবে, গ্যারান্টি দিচ্ছি।
আমার অগ্রজপ্রতিম লেখক শ্রীঅমলেন্দু বিশ্বাসের প্রকাশিতব্য স্মৃতিকথা “সেই দিন সেই মন” এর দ্বিতীয় ভূমিকা লেখার অনুরোধ পেয়ে আমি একাধারে ভীত এবং আপ্লুত। ভয় পাওয়ার কারণ দুটো।
এক, তেত্রিশ পর্বে বিধৃত বিশাল এই আত্মজৈবনিক রচনার প্রতি সুবিচার করতে পারব কি? ভূমিকার কাজ, আমার মতে, আগ্রহী পাঠককে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করিয়ে দেয়া। অথচ, সতর্ক থাকা-- হাঁড়ি থেকে রস না উপচে পড়ে! ঘোমটা পুরো খুলে না যায়। পাঠক যেন ভাবেন—“বঁধুরে আমার দেখিনি এখনও, শুনেছি তার অপরূপ রূপ, চোখের চাহনি চমৎকার”। অবশ্য প্রখ্যাত অধ্যাপক ও গবেষক সুদীপ্ত কবিরাজ মহাশয় প্রথম সুদীর্ঘ ভূমিকায় কাজটা সেরে ফেলেছেন। এইখানেই ভয়ের দ্বিতীয় কারণ।
দুই, আমি কি পুনঃপৌনিকতা এড়িয়ে এমন কিছু বলতে পারব যা কবিরাজ মশায়ের অমন ভূমিকার পর বেমানান হবে না? সুর কেটে যাবে না? সুদীপ্ত ধরতাই দিয়েছেন—লেখাটি একই সঙ্গে দুটো স্তরে কথা বলছে। ব্যক্তি মানুষের পরবাসে গিয়ে পায়ের নীচে জমি খোঁজার কঠিন লড়াই এবং একই সঙ্গে বাঁচার দুর্নিবার তাগিদে নতুন দেশের সংস্কৃতিকে আত্তীকরণের প্রচেষ্টা। মজার ব্যাপার, সেই দেশটি লেখকের প্রবাসের মাত্র কয়েক দশক আগেও আমাদের কলোনিয়াল মাস্টার ছিল।
এর সুবিধে যেমন, অসুবিধেও তেমনই। এলিট সমাজের অদৃশ্য বর্ম এবং প্রাচীর ভেদ করা সবার কর্ম নয়। কী আশ্চর্য— অমলেন্দু সেই কঠিন সাধনায় সিদ্ধ হয়েছেন। কীভাবে? বলব না; বইটি পড়লেই জানতে পারবেন।
দ্বিতীয় লড়াই—নিজের সংস্কৃতির মাটি থেকে শেকড় উপড়ে ফেলেও বুকের মধ্যে চারাগাছটির পরিচর্যা করা, তাকে বাঁচিয়ে রাখা। এর চাবিকাঠিটি— সুদীপ্ত সহজ করে বলেছেন— নিজের একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরে বাংলার সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখা। এই প্রচেষ্টা ব্যক্তি থেকে ছড়িয়ে পড়ে সমষ্টির মধ্যে। সমগোত্রের পরিযায়ী পাখির দল এসে জোটে। জন্ম নেয় টেগোর সোসাইটি। বাঙালি সংস্কৃতির ও মননের শ্রেষ্ঠ উন্মেষ যাঁর মধ্যে ঘটেছে সেই রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে লণ্ডন ও যুক্তরাজ্যের প্রবাসী বাঙালিদের মিলনকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং আজীবন তাঁর প্রাণপুরুষ হয়ে থাকা অমলেন্দু বিশ্বাস মশাইয়ের বড় কৃতিত্ব।
আর রবীন্দ্রনাথ বলেই এই চর্চায় বেজে ওঠে মুক্তির আনন্দ— সব দলাদলি বিদ্বেষ ছাড়িয়ে। রোজকার শুধু দিনযাপনের শুধু প্রাণধারণের গ্লানির মধ্যে এই সুকঠিন চর্চা! এ যেন ‘নয়নে আঁধার রবে, ধেয়ানে আলোকরেখা’। এখানেই এসে পড়ে তাঁর জীবনসঙ্গী অরুন্ধতীদির নিয়মিত সঙ্গীত চর্চার কথা। একজনের কাব্যচর্চা, অন্যজনের সঙ্গীত। মজার ব্যাপার—অমলেন্দু ঔপন্যাসিক না হয়ে কবি হলেন। হয়ত এটাই স্বাভাবিক। কবিতা ও সঙ্গীতের জন্ম যে মানব সভ্যতার উষাকালে হাত ধরাধরি করে, অনেকটা যমজ ভাইবোনের মত।
আমরা সাহস পেলাম। আমার মত কর্মজীবনে ছত্তিশগড়ের গ্রাম্যসংস্কৃতিতে হাবুডুবু খাওয়া বঙ্গ সন্তানেরও বিশ্বাস হল– বিলেত দেশটা মাটির, সেটা হীরে রূপোর নয়।
বেশ কিছু জায়গা জুড়ে রয়েছে কম্পিউটারের আদি যুগে (অন্তত ভারতীয় ও বাঙালিদের সমাজে) তাঁর দূরদৃষ্টি, নতুন টেকনোলজিকে আপন করে নেয়া এবং বাঙালির স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ –অর্থাৎ ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষীঃ’ এই মহাবাক্য শিরোধার্য করে চাকরি ছেড়ে স্টার্ট আপের দুনিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়া। ভুল বললাম, চাঁদ সদাগরও তো বাঙালি ছিলেন। সমুদ্রে সপ্তডিঙা মধুকর ভাসিয়ে দেয়ার ঐতিহ্য আমাদের আছে, তবে প্রায় বিস্মৃত। অমলেন্দু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তির সাগরে নৌকো ভাসালেন। সাফল্য ও বিফলতা দুইই এল। অমলেন্দু তার বিপুল অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ডোমেইনে বাঙালিদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আলোক বর্তিকা হলেন।
অমলেন্দুর স্বপ্ন দেখা এবং অ্যাডভেঞ্চারের নেশা আমাদের অবাক করে। যুক্তরাজ্যের কমফোর্ট জোন ছেড়ে উনি গেলেন ইরানে— রাষ্ট্রবিপ্লবের উথাল পাথাল দিনে। সকুশল ফিরে এসেছেন বটে কিন্তু তার বিশদ বিবরণ দিতে ওনাকে আর একটি বই লিখতে হবে।
কিন্তু সল্ট লেকের বাড়ি নিয়ে বিপর্যয় যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাত। ফলং? ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর। পরের লাইনটাও ওঁর জীবনে খেটে গেছে— পর কৈনু আপন, আপন কৈনু পর!
ধীরে ধীরে উনি সেই উপলব্ধিতে পৌঁছে যান যা আমার মত আরও অনেক কোলকাতা ছেড়ে আসা প্রবাসীর উপলব্ধি—ফিরতে চাই পাবো কি সেই পথ? মেনে নিতে হয়—এক নদীতে দু’বার স্নান করা যায় না। সময় যে থেমে নেই। সমস্ত তরুণীরা আজ প্রৌঢ়া। বানার্ড শ’ থেকে ধার করে বললে– সব গোলাপ একদিন বাঁধাকপি হয়ে যায়। তেমনি শহর কোলকাতাও আজ কল্লোলিনী তিলোত্তমা নয়, বেশ গিন্নি-বান্নি হয়ে উঠেছে।
উড়াল পথ ও মলে ছাওয়া আজকের কোলকাতা যে আমাদের অচেনা।
আমাদের কোলকাতা বেঁচে আছে সামুহিক স্মৃতিতে এবং ব্যক্তির বুকের ভেতর। এই আমাদের ভবিতব্য। অমলেন্দুর লেখায় তার কুণ্ঠিত স্বীকৃতি। উনি যে কোলকাতায় ফিরতে চাইতেন। কিন্তু হ্যারো শহরে বাকি জীবন কাটাতে হবে এটা উনি মেনে নিয়েছেন।
শেষ পর্বে জানতে পারি বিরাট আর্থিক বিপর্যয়ের কথা— যার স্কেল আমার মত ছাপোষা বাঙালির কল্পনার বাইরে- এবং পরিবারের নিবিড় বন্ধনের শক্তিতে সেটা কাটিয়ে ওঠা। তারপর আসতে শুরু করে আঘাত একের পর এক। সবচেয়ে বড় আঘাত ২০২৫ এর গোড়াতেই।
কিন্তু আশি পেরিয়ে যাওয়া অমলেন্দুদার কাহিনীতে ধ্রুবপদ বেজে ওঠে— তবু শান্তি তবু আনন্দ সুন্দর তায় জাগে।
বই: সেই দিন সেই মন
লেখক: অমলেন্দু বিশ্বাস
প্রকাশক: গুরুচণ্ডা৯
প্রকাশ: ২০২৬
প্রচ্ছদ: রমিত চট্টোপাধ্যায়