

দড়ি দিয়ে টাইট করে বাঁধা প্লাস্টিকটা। নীল রঙের। দড়ির মাঝ দিয়ে প্লাস্টিকটা ফুলে ফুলে আছে নানা শেপে। ব্যাকা ত্যাড়া খাবলানো গোল কোনাচে। ওগুলো কুনুই বুক পেট হাঁটু পায়ের আঙুল থাই মাথা। ভেতরে একটা মেয়ের মরা শরীর। প্লাস্টিকটার উপর চৈত্রের রোদ এসে পড়েছে। চকচক করে উঠছে। শরীরখানা একটা শাদা রঙ করা বিল্ডিঙের সামনে শোয়ানো। মাথাটা বিল্ডিঙের দিকে। লাশটার পা এর দিকে নর্থ কোলকাতার রোড। আশপাশে যে যার মতো আসছে যাচ্ছে। একটু দূরে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। প্লাস্টিকের বাইরে থেকে ছোট গোল মতো মাথাটা বোঝা যাচ্ছে। বডিটার ঠিক পায়ের কাছ থেকে একটা মানুষ বারবার মাথার দিকটায় চলে আসছে। উঁকি মারছে প্লাস্টিকে বাঁধা মাথার দিকটাতে। প্লাস্টিকের ভাঁজগুলোতে সামান্য ফাঁক আছে কিনা খোঁজার চেষ্টা করছে চোখদুটো। না ভাঁজগুলো থেকে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। বারবার উঁকি ঝুকি মারছে। ফিরে আসছে আবার পায়ের দিকটাতে। ওখানে জনাপাঁচেক মানুষ। একজন সালোয়ার কামিজ পরা ভারিক্কি চেহারার ভদ্রমহিলার সঙ্গে বিড়বিড় করে তারা কথা বলে যাচ্ছে বাকি পুরুষমানুষেরা। ওই যে উঁকি মেরে আসছে তিনি শাড়ি পরা আরেক মহিলা। বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে অযত্নে অযত্নে আরো অনেকটা বেশি। কুচকানো চামড়ার কপালে লাল সিঁদুরের টিপ। চোয়াল উঁচু মাইস্থা পড়া গালদুটো। নীল হলুদ ছাপা শাড়িটায় মার দেওয়া নেই। গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে মার ছাড়া শাড়ি। ওটা দিয়ে মাথাটা ঘোমটা দিয়ে মুড়ে হাত দিয়ে আঁচল নাকে চেপে রেখেছে। দেখে মনে হচ্ছে গন্ধ চারপাশে। যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলে চলেছে তারা একটু কিছুক্ষণ আগেই দেখেছিল প্লাস্টিক ছাড়া লাশটাকে। লাশটা যখন মর্গের ঠান্ডা ঘর থেকে বার করে আনা হচ্ছিল। ওই রুমের বাইরে এখানে চড়া ঝাঁঝাঁপোড়া রোদ জ্বালিয়ে দিচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখ মুখ। ওই যে উঁকি মারছে, সে কেবল দেখেনি লাশটা প্লাস্টিকে বাঁধার আগে। যখন শরীরের সঙ্গে সাঁটিয়ে আঁট করে প্লাস্টিক বাঁধা চলছিল তখনও সে এসে পৌঁছায়নি।
প্লাস্টিকটা গরম হয়ে চলেছে ক্রমশ। প্লাস্টিকের ভেতরে একটু কম গরম হচ্ছে শক্ত ঠান্ডা মাথা নাক ঠোঁট হাত পা পেট থাই। বরফ ঠান্ডা থেকে একটু একটু করে গরম। বেঁচে থাকা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মতো গরম। প্লাস্টিকের ভেতরের ওই মাথাটায় একটাও চুল নেই এখন। সব চুল উঠতে উঠতে আস্তে আস্তে ন্যাড়া হয়ে গেছে। বাদামি রঙ করা চুলগুলো কেমন ফাটা ফাটা তামাটে তামাটে হতে হতে ক্রমশ ঝরে পড়ছিল মাথা থেকে। ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল খুলির গায়ে লেগে থাকা চামড়া। মাঝের সিঁথিটা ফাঁকা হতে হতে আশপাশ থেকেও অনেক অনেক সিঁথি বেরিয়ে আসছিল। শরীরের চামড়াগুলো ফাটছিল। অল্পবয়সী মেয়ের হৃষ্টপুষ্ট ফর্সা বুকদুটো শুকিয়ে শুকিয়ে কুচকে শুকনো কালো চামড়া হয়ে ঝুলছিল পেটের উপর। মেদহীন পেটের টানটান চামড়াগুলো শুকিয়ে ফেটে ফাটা ফাটা দাগে গিয়েছিল ভরে। কপালের হাড়গুলো চোয়ালদুটো উঁচু হয়ে উঠছিল। গালের মাংসগুলো শুকিয়ে কোথায় ঢুকে চলেছিল।
এখন শুকন গালদুটোর মাঝ থেকে নাকটা অনেকখানি খাঁড়া হয়ে প্লাস্টিকে টাইট হয়ে ঘষে যাচ্ছে। নাকের ফুটো দুটোতে তুলো গোঁজা।
যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যেকার ভদ্রমহিলার কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করছে এই বৃদ্ধ মতো দেখতে শাড়ি পরা মহিলাটি। তেমন কিছু উত্তর না পেয়ে আবার ঘুরে বডির মাথার দিকে ফিরে আসছে।
লাশটা এখনও শুয়ে আছে চৈত্রের চড়া রোদের মদ্দিখানে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো এবার ওর কাছাকাছি সরে আসছে। বডি তোলা হচ্ছে ছোট মতোন একখানা টেম্পোয়। সামনের কাচের উপর সাদা চুন দিয়ে হাতে ব্যাকা ত্যাড়া করে লেখা ‘ডেড বডি’। মানুষগুলো উঠছে গাড়িতে। নীচে দাঁড়িয়ে আছে শাড়ি পরা মহিলাটি। গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে একগাদা কালো ধোঁয়া ছেড়ে। কোলকাতার রাস্তার ধুলো ধোঁয়ার মধ্যে মিশে যাচ্ছে গাড়ির ধোঁয়াটা। আবছা হয়ে যাচ্ছে ডব্লিউ বি …।
সেবার গাড়ি ছেড়েছিল বারাসাত চাঁপাডালি মোড় থেকে। যাত্রীটি পায়ে হেঁটে এসেছিল কিছুটা দূরের কোনও এক পাড়া থেকে। তিন চাকার গাড়ি। প্যাডেল ভ্যান। খোলা চারপাশ। চড়া রোদ এসে লাগছিল ভ্যানে বসে থাকা মানুষগুলোর শরীরে। ভ্যানে বসে থাকা মানুষ চলেছিল বিয়ে করতে। শেয়ার ভাড়া। ভ্যানের পেছনে মাঝে আরো জনা তিনেক যাত্রী। অচেনা। তারা কোথাও চলেছে যে যার মতো। কনে বসেছে সামনের দিকে ডান পাশে। মাথাটা নীচু। হাত দিয়ে খামচে ধরে রেখেছে কোলের উপর রাখা ব্যাগখানা। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। রোগা চেহারার। কনের পোশাকটা ঠিক বিয়ের কনের পোশাকের মতো নয়। সাদা শার্ট। নীল বা সবুজ কমলা কোনো একটা রঙের স্কার্ট। ওটা তো স্কুল ইউনিফর্ম। গরীব কোনও মেয়ে সরকারি স্কুলের ছাত্রী হলে যে ছবিটা মনে পড়ে যায় ঠিক সেরকম। স্কার্টের রঙ ভাঁজের উপরে উপরে ফেড হয়ে গেছে। ভাঁজের ভেতরে আসল রঙটা রয়ে গেছে। কোলের উপর ওই যে ব্যাগটা ওটা রঙ চটা একটা স্কুল ব্যাগ। হয়ত চেন কাটা। সেফটিপিন দিয়ে কোনোভাবে একটা ম্যানেজ করা। পায়ে কেডস জুতো মোজার বদলে প্লাস্টিকের স্যান্ডাক বা হাওয়াই চটি। চুলগুলি যে ফিতে দিয়ে বাঁধা সেটা বহুল ব্যবহারে দড়ি পাকিয়ে গেছে। বিয়েটা হবে কবে যেন! ঠিক জানা নেই। কোথায় যেন বিয়েটা হবে। কারুর বাড়ি বা কোথাও একটা! রোগা প্রেমিক প্রাইভেট টিউশনি স্যারের বাড়ির পেছনে বাঁশ ঝাড়ের নীচে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছিল শক্ত করে। প্রেমিকের বিড়ি খাওয়া মুখের গরম নিশ্বাস শরীরের চাপ আর পাউডার মেশানো ঘামের গন্ধে শরীরটা কিরকম অবশ হয়ে আসছিল। বলেছিল ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ এনে বিয়ের কথা। পাকা হল পালানোর ডেট।
ভ্যানের বাঁ পাশে শার্ট প্যান্ট পরা সেই প্রেমিক। বাড়ির মানুষগুলোর জানা নেই ঘরের মেয়েটির এক কিলোমিটারের বদলে চলে যাচ্ছে ঠিক কত কিলোমিটার।
সকাল দশটা সোয়া দশটা। ব্যস্ত বারাসাতের রাস্তা। স্কুলের ছেলে মেয়েরা চলেছে ইস্কুলের পথে। মাছওয়ালারা মাছ বেচে খালি ড্রাম নিয়ে ফিরছে। দুধওয়ালার খালি ড্রামগুলো সাইকেলের উপর ধাক্কা লেগে শব্দ হয়ে চলেছে জোরসে। চাঁপাডালি মোড়ে বিড়া গুমা বনগাঁর বাসগুলোর কন্ডাক্টার চ্যাঁচাচ্ছে জায়গাগুলোর নাম বলে বলে। হর্ন দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে কোনওটা। পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে ট্রাক ম্যাটাডোর। বাইক। সাইকেল। কোনওটা দাঁড়িয়ে পড়ছে স্টার্ট থামিয়ে জ্যামে আটকে পড়ে। কোনওটা স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশের ভ্যান রিকশয় চার পাঁচ জন করে মানুষ চলেছে। প্যাঁক প্যাঁক হর্ন বাজিয়ে উঠছে বেশি বেশি করে। চিৎকার করে উঠছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটাকে লক্ষ্য করে। অথবা মানুষটাকে লক্ষ্য করে। বা সদলবলে চিৎকার করে চলেছে। কথার উত্তরে কথা বলে যাচ্ছে কেউ। ভ্যানের পেছনে ভ্যান। জ্যামে ভিড় হয়ে যাচ্ছে। ওই ভিড়ের ভেতর কোনও ভ্যানে চলেছে সকালবেলার ক্ষেত থেকে তুলে আনা আলু পটল মুলো গাজর কাঁচা লঙ্কার বস্তা বোঝাই করে। কোনওটাতে অন্য মাল। কোনওটাতে বিক্রি হওয়া ভাঙা শিশি বোতল। কোনটাতে বিক্রি হতে চলা মেয়ে। কোনো শব্দ কেবল কানে এসে পৌঁছাচ্ছে না ভ্যানের সামনে বসে থাকা ওই কনের কানে। কি ভাবছে ও তখন? নতুন শাড়ি ঠোঁটের লিপ্সটিক নেলপালিশ বরের আদর! প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক! হর্ন বেজে উঠছে বারবার কানের পাশে। হাতের আঙুলগুলো নড়ে চড়ে উঠছে ব্যাগটার উপর। পায়ের আঙুলগুলো কুচকে গিয়ে চটির মধ্যে দলা পাকিয়ে আছে। মাথাটা একভাবে রয়েছে। নড়ছেও না। ঘাড় নীচু। ঘাড়খানা তুলে মুখটা সোজা করে দাঁড় করালে দেখা যেত বিয়ের বাজারে প্রকৃত সুন্দরী বলতে যেরকম একটা ছবি ভেসে ওঠে অনেকটা সেরকম একখানা মুখ। নিষিদ্ধ পল্লীর বাজারে সেরকম ‘সুন্দরী’কে কি বলা হয় জানা নেই। যাই বলুক বিক্রির দর ওঠে অনেক বেশি। ক্রেতা বিক্রেতার চেনে সব সময়ে দর থাকে হাই। ডিমান্ড বেশি। বেশি বেশি কাস্টোমার। দিন রাত যখন তখন। কাস্টোমারের মিনিট থাকে বাঁধা। টাইম শেষ। আবার নতুন কাস্টোমার। ফাঁকা যায় না সুন্দরীরা।
ভ্যানটা চলেছে ডাকবাংলো মোড়ের দিকে। ভ্যানের সামনে বসে থাকা পাত্র পাত্রীর মুখে কথা নেই। চুপ একদম। সামনে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক। ওই রোড দিয়ে বাস আসবে একটু পরেই। যাবে কোলকাতা। বাসটা এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। লোক উঠছে অনেক। সিটগুলো ভরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে মানুষ। ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে পড়েছে সেই কনে। বর। বিয়ে হবে। শ্বশুর বাড়ি হবে কোথায় একটা যেন! ধর্মতলা বৌ বাজার শ্যামবাজার কালীঘাট বা মুম্বাই। অটো বাস ট্রেন। জার্নির পর জার্নি। মাঝে এক রাত দু রাতের হল্ট। আবার জার্নি। ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে বাড়ি যাওয়ার রাস্তার দিক নির্দেশ! বর ননদ শ্বশুর জা মাসি ভাগ্নে। নানারকম বাড়িতে নানা রকম সব আত্মীয়। নকল আত্মীয় বা এজেন্ট তারা। শেষ গন্তব্য মুম্বাইএর কামাতিপুরা। মুম্বাই শহরের সবচেয়ে বড় রেড লাইট এরিয়া। বিরাট বিরাট বিল্ডিং। তলের পর তল। ওয়েটিং হল বড়। তারপর ঘুপচি ঘুপচি ঘর। ঘর নয় খোপ খোপ চিলতে জায়গা। পরপর লাইন দেওয়া। কোথাও মাঝে ইটের দেওয়াল। কোথাও প্লাইউডের পার্টিশান। কোথাও কাপড় বা পিচবোর্ড মতো কিছু একটা টাঙিয়ে দিয়ে পার্টিশন। খোপের সামনে পর্দা টাঙানো। শাড়ি কেটে পর্দা বানানো। বা দরজা একখানা। দেওয়ালে সালমান খানের জামাখোলা পেশিওয়ালা ফটো। ঠাকুরের ছবি। হিরোইনের আধাখোলা শরীরের ছবি। সেলোটেপ দিয়ে সাঁটা। অনেক মানুষ। ওয়েটিং রুমে লোক। সিঁড়িতে লোক। অনেক ভিড়। ঘরের ভেতরে ভেতরে মেয়েদের শরীর। বাইরে থেকে আসা নানা পুরুষ শরীর। ময়লা শরীরে চড়া মেকাপ। কোথাও উঠে গেছে মেকাপখানা। মেকআপ উঠে গিয়ে শরীরের আসল রঙখানা বেরিয়ে এসেছে বাইরে। গলার ভাঁজে ভাঁজে ঘামে ঘামে উঠে গেছে ফেস পাউডার। কোথাও অন্য কিছু লেগে আছে। ভেজা ভেজা শরীর। সিগারেটের ধোঁয়া। ধূপকাঠির ধোঁয়া। অন্ধকার অন্ধকার ঘর। রাত জেগে ভোরবেলা ঘুম।
কনেকে স্নান করানো চলছে। মাথা ভর্তি সিদুর। গামলা ভর্তি ঠান্ডা জল। সাবান। খোসা। শ্যাওলা পড়া বাথরুম। শ্বশুর বর ননদ যা পিসি মাসি সব হাওয়া। সামনে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটা মহিলা। জামা কাপড় একে একে টেনে খুলছে তারা। হাত দিয়ে আটকাচ্ছে মেয়েটা। শরীরের হাত পা কুঁকড়ে আসছে। বসে পড়তে চাইছে নীচে। টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আবার। হাত দিয়ে নিজের শরীরটা জাপ্টে ধরছে। পারছে না কিছুতেই। আটকাতে পারছে না। টান মারছে হাতদুটো ধরে। টান মারছে অন্তর্বাসগুলো ধরে। টানাটানি চলছে খুব। চুলে আটকানো খামচি ক্লিপখানা টেনে খুলে দিয়েছে। মগে করে জল নিয়ে ঢেলে দিয়েছে মাথার উপর। ছটফটানিতে জল এলোমেলোভাবে ছিটকে যাচ্ছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকেরাও তারাও যাচ্ছে ভিজে। ভেজা পোশাকের যা কিছু এখনও লেগে আছে শরীরে টানাটানি করছে সেগুলো নিয়ে। লম্বা ভিজে চুলটা আলুথালু হয়ে পিঠে বুকে পেটে জড়িয়ে যাচ্ছে। হাত দিয়ে টেনে সরিয়ে দিচ্ছে ওরা। সব শক্তি শেষ হয়ে এবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখের জল নাকের জল মগের জল মিলে মিশে যাচ্ছে। অনেক জল পড়ছে ওর শরীর ন্যাংটো শরীর ভিজিয়ে দিয়ে। সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে ওরা। ওকে অভ্যাস করানো হচ্ছে অনেকের সামনে জামা কাপড় খুলে ফেলার। নতুন একটা নাম দিচ্ছে ওর। মিস সেফালি মিতালি বিউটি বা ওরকমই একটা কিছু। মেয়েটা রাজি হল। রাজি না হয়ে আর উপায় নেই।
আশপাশে ঘুরছে আধাখোলা আধাখোলা শরীর। সেই শরীরগুলোর মতো ওর ফর্সা স্লিম শরীরখানাকে সাজিয়ে দেওয়া হল। বসিয়ে দেওয়া হল ওয়েটিং হলে। বাইরের আলো ঢোকেনা এখানে। আশপাশটা ঠিক কেমন! আর জানার উপায় নেই। সেই ভোর অন্ধকার থাকতে এনে ঢুকিয়ে দিয়েছিল এই বাড়ির ভিতর বর। সেই শেষ বাইরেটা দেখা। এবার শুধু রঙচঙে দেওয়ালগুলোর ভেতর টিমটিমে আলোয় শরীরের ভিড়। চোখগুলোতে সন্দেহ। হিসেব চলছে এখানে সব সময়। কার কাস্টোমার কত হল। সেই সংখ্যাটা জমা হচ্ছে গুটির হিসেবে ব্রোথেল মালকিনের কাছে। তার থেকে একটা সামান্য একটা অংকের পয়সা পাচ্ছে মেয়েটা। দিনে রাতের ক্লান্তি এসে জমা হচ্ছে ওর নানান অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। ব্যথা হচ্ছে খুব। দেওয়া হচ্ছে হ্রর্মোনাল ওষুধ। ইঞ্জেক্শন ফুটিয়ে দেওয়া হচ্ছে শরীরে। অবশ মতো করে দেওয়া হচ্ছে শরীরের যতটুকু অবশ করে দেওয়া দরকার। ঝিমুনি ঝিমুনি ভাব। অবশ-অবশ শরীর নিয়ে আবার বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে ওয়েটিং হলে। আধাখেচড়া মুছে যাওয়া মেকাপের উপর আবার মেকাপের পরত লাগিয়ে দিচ্ছে। ঘষে ঘষে উঠে যাওয়া লিপ্সটিকের উপর আবার লিপ্সটিক। ফাটা ফাটা ঠোঁটের লিপ্সটিকের রঙের ভেতর এবড়খেবড় চামড়া উঁচিয়ে থাকছে। কাস্টোমারের নানা রকম শখ। কারুর খোলা শরীর সিগেরেটের ছ্যাঁকা লাগাতে শখ। কারুর খোলা শরীরের মধ ঢালতে শখ। কারুর রোগা খোলা শরীরে বেত পেটানোর শখ। বেত মারতে মারতে ব্যথায় গোঙানি শব্দ শোনার শখ। কারও খামচে দেওয়ার শখ। দাঁত দিয়ে কামড়ানোর শখ কারুর।
ওই উঁচু বিল্ডিংএর ভেতরে চব্বিশ ঘন্টায় টিমটিমে আলো জ্বলে। বাইরে অন্ধকার হয়। আলো হয়। রাতের পর দিন হয়। ঋতু বদলায়। বৃষ্টি নামে। ওই উঁচু বিল্ডিঙের ভেতর বাইরের আলো ঢোকে না। ঋতু বদলে ফারাক পড়ে না। কাস্টোমার বেশি কমে ফারাক ঘটে কেবল।
এরপরের ঘটনাটা একটু অন্য রকম। মেয়েটা বেরিয়ে এলো বাইরে। একা নয়। নিয়ে এলো কেউ বার করে। না সিনেমার নায়কের মতো কোনও প্রেমিকের আগমন ঘটেনি ওই রেড লাইট এরিয়ার মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিংটাতে। যারা এসে ঢুকেছিল কাস্টোমার হয়ে তারা কাস্টোমারের মতোই বেরিয়ে গেছে বাইরে। প্রেমের গল্প শুরু হয়নি একবারও। মেয়েটাকে বাইরে বার করে এনেছেন এক ভদ্র মহিলা। এ সব ঘটনা জানা আমার ওই লাশটার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা জটলার মাঝের সালোয়ার কামিজ পরা ভারিক্কি চেহারার সেই ভদ্রমহিলার কাছ থেকেই। তপতী ভৌমিক। যার জীবনের যৌবনের অধ্যায়টুকু শুরুই হয়েছিল বিক্রি হওয়া মেয়েদের ঘিরে। পড়াশোনা শেষ করে অফিসে চাকরি করতে আসা। অফিসটা ‘সংলাপ’। রাসবিহারি এভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে গড়িয়াহাট মোড়ের দিকে মুখ করে তাকালে হিন্দুস্তান পার্কে গিয়ে বাঁয়ে মুড়ে যেতে হবে। তারপর এই সামনেই। ডান হাতে। গতে ধরা ফাইল হাতে ঘোরাঘুরি- কম্পিউটারে ডাটা আপলোড- দশটা পাঁচটার ডিউটি আওয়ার্স নয়। রাতে যখন তখন কাজটা। কাজটা কেবল অফিসের বসে বসে নয়। বস আরেকজন ভদ্রমহিলা। অফিসটা ঠিক অফিসের মতো করে তৈরি হয়নি। এক গৃহবধুর অন্ধকার গলির মেয়েদের অন্ধকার থেকে বার করে আনার অদ্ভুত রকম আগ্রহ থেকে ধীরে ধীরে অফিসটা তৈরি। ইন্দ্রানী সিন্হা। এ নামটা অনেকেরই চেনা। আশির দশকে তৈরি সে অফিস। সেই অফিসে চাকরি পাওয়া মেয়েটিরও কাজটা তাই কখনও শহরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা নিষিদ্ধ পল্লীতে কখনও দেশের সীমান্তে কখনও দেশের সীমানা পার করে। তপতী ভৌমিকের জীবনের বহু বছর কেটে গেছে এভাবেই। প্রতিদিন প্রতিরাত কখনও একজন কোনো বিক্রি হওয়া মেয়ে কখনও দল বাঁধা লাটে লাটে মেয়ে। কখনও সোনাগাছি কখনও মুম্বাইএর কামাতিপুরা কখনও দিল্লির জি বি রোড। কখনও পশ্চিমবঙ্গের ধাবা হোটেল রিসোর্টের পিছন দিকের ঘুপছি ঘুপচি রুমগুলি থেকে কচি কচি মেয়েদের মেয়েদের বার করে এনেছেন। কারও শরীর খোলা কারও শরীরে অজস্র বেতের দাগ দাঁত নখের আঁচর সিগরেটের ছ্যাঁকা। আরো অনেক কিছুর দাগ। কেউ লজ্জায় সিটিয়ে আছে। কেউ আধামরা। কখনও বাঁকুড়া মুর্শিদাবাদ মেদিনীপুর কখনও সুন্দরবনের মেয়ে। কখনও সাতক্ষীরার। কুষ্টি্যার। কখনও কাশ্মীরের আপেল বাগানের পিছনের কোনো এক পাহাড়ি গ্রামের মেয়ে। তারা বিক্রি হয়েছে। দুবার তিনবার চারবার। জায়গা বদল হয়েছে। নিষিদ্ধ পল্লীর ঠিকানা বদল হয়েছে। নিষিদ্ধ পল্লী থেকে কখনও রিসোর্ট। কখনও হোটেলের ঘর। কখনও ভাড়া করা রুম। কখনও এক দেশ থেকে অন্য দেশ। কখনও মর্গের ঠান্ডা ঘরে জায়গা হয়েছে। রেস্কিউ হয়েছে। আবার ফিরে গেছে সেই পুরোনো পেশাতেই। বা কেউ ফিরে আসতেই চায়নি। বা মরেছে কেউ। তপতী ভৌমিকের জীবন চলেছে এদের নিয়ে। কখনও নিজেই রেড লাইট এরিয়ার রুমে ঢুকে পড়ে রেস্কিউ করেছেন। কখনও নিষিদ্ধ পল্লীর উঠোনে বসে পড়াশোনা করিয়েছেন ওই মেয়েদের বাচ্চাদের। কখনও হাসপাতালে ছুটেছেন। কখনও শ্মশানে। কখনও কবরখানায়।
এই মেয়েটিকে বার করে আনাটার গল্প অনেকটা থ্রিলারের গল্পের মতো। ভেতরে ষন্ডা মার্কা হোমরা চমরা চেহারার বাউন্সার ঘোরাঘুরি করছে। কাস্টোমারের ভিড়। সারি সারি মেয়ে কাস্টোমারের জন্য সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে বসে আছে। ব্রোথেলের মালকিন, এজেন্ট হিসেব কষে যাচ্ছে। সন্দেহ সন্দেহ চোখ নিয়ে চারদিকে লক্ষ্য রেখে যাচ্ছে চারপাশে। গান বাজছে । নতুন কোনও হিট বইএর গান। দর কষাকষি চলছে কোথাও। কোথাও ঝাল ঝাল মাংস খাওয়া চলছে। কোথাও মধ ঢালছে কেউ কোথাও একটা। তপতী ভৌমিক ঢুকছেন ভেতরে। সালোয়ার কামিজ গায়ে। গটগট করে হেঁটে ঢুকে যাচ্ছে একদম ভিতরে। ওয়েটিং হলে সারি সারি মেয়ের মদ্দিখানে বা খুপড়ি খুপড়ি আড়াল করা ঘরে ধা ধা করে ঢুকে পড়ছে। নানারকম অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আইডেন্টিফাই করছেন মেয়েদের। হুড়োহুড়ি পড়ে যাচ্ছে ভেতরে। টানাটানি। ধুপধাপ। অপারেশন সাকসেসফুল।
উনিশখানা মেয়েকে সেবার একসঙ্গে বার করে এনেছিলাম। বিরাট অপারেশন চলেছিল। তপতী ভৌমিক বলে চলেছেন শান্ত ভাবে। ওই একটা বিল্ডিঙের ভেতরেই উনিশখানা মেয়ে ছিল। সব মাইনর। রেড হয়েছিল সেবার রাতের বেলা।
জানলেন কিভাবে?
খবর ছিল আমাদের কাছে।
তারপর উনিশজনকে নিয়ে গন্তব্য কামাতিপুরার থানা। কোর্ট প্রসিডিওর। শেষে কোলকাতার ট্রেন। ফেরা হল নিজের রাজ্যে। কিন্তু সে মেয়েটির নিজের বাড়িটা আর ততদিনে ঠিক নিজের বাড়ির মতো ছিল না। বাড়ির জানালা দরজা আলমারি খাট বিছানা একই রকম ছিল কিন্তু বাদবাকিটা এক নয়। বাড়ির বাইরে একটা একটা গোটা বসন্ত শীত বর্ষা কেটে গেছে। গৃষ্মের দাবদাহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে চালের মাথার পেয়ারা গাছটার পাতাগুলো। বাড়ির ভেতর চালের হিসেবে সে বছর একটুখানি বদল হয়ে গেছে। বছরখানেকের জন্য হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে আর ফিরিয়ে নিতে চাইল না মেয়ের মা। হারিয়ে যাওয়ার জায়গাটা যে আসলে কোথায় ছিল সে ঠিকানাটা ততদিনে জেনে গেছে বাড়ির মানুষগুলো। কানাঘুষোতে জেনে গেছে পাড়ার মানুষগুলোও। বাড়িতে মেয়ে আছে আরো তিনটি। তাদের বিয়ে দেবে। বাড়িতে এরকম একখানা হারিয়ে যাওয়া মেয়ে ফিরে এলে আর বিয়ে হবে না তাদের। এ দুশ্চিন্তায় দুশ্চিন্তায় বাড়ির বড় মেয়ে আর জায়গা পেলনা বাড়ির ছাতের নীচে।
যে হোমে ওর অল্প ক’দিন থাকার কথা ছিল পুরোপুরি জায়গা হল সে হোমে। শুধু একলা ওই মেয়ে নয়। ওই উনিশ জনের অনেকজনই থেকে গেল হোমে। ওদের শরীরগুলোকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সে শরীরগুলো তখন রোগে ভরা। রেড লাইট এরিয়াতে বেশিদিন কাটিয়ে এলে যে রোগটার আশঙ্কা হয় সে রোগটা ততদিনে ওই মেয়েগুলোর অনেকের শরীরেই তখন থাবা বসিয়েছে। এইড্স।
লাশটা ওই যে শুয়ে ছিল সাদা বিল্ডিঙের দিকে মাথা করে শুয়ে, ওটা মেডিকেল কলেজের এজ্ররা বিল্ডিং।
আস্তে আস্তে চুল উঠে মাংস মেদ শুকিয়ে গিয়ে মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিল বেশ কিছুদিন। বাড়িতে খবর গেছে তখনও। আসেনি কেউ। ডেড বডি মর্গে। খবর গেল আরো একবার। ওই যে ছাপা শাড়ি পরা বৃদ্ধ দেখতে মহিলা মরা মেয়ের মা সে।
তপতী ভৌমিকের কাছে ওই যে ঘুরে ঘুরে এসে প্রশ্ন করছে।
-নাকছাবিটা? দিদি ওর নাকছাবিটা দেখেছেন নাকে? ছিল ওইটা? ওই একখানা সাদা পাথার বসিয়ে সোনার নাকছাবি গড়িয়ে দিয়েছিলাম ওরে। ওইটা পরেই ও বেরিয়ে গিয়েছিল। দেখতে পেলামনা। পেলাস্টিকে বাঁধা তো মুখখানা। কিচ্ছু দেখতে পেলাম না। ঠাহর করতে পারলামনা ওটা নাকে আছে না নাই। শেষে ছিল ওর নাকে? খুলে রেখে দিয়েছিলেন দিদি? ওটা কোথায় দিদি?
. | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:১৬738894