

আমরা সকলে মিলে টোটোতে চড়ে রওনা দিয়েছি বনভৈরবীর থানের উদ্দেশে। গাইড ভদ্রলোকও সঙ্গে আছেন। পাশাপাশি বাইক নিয়ে চলেছে সেই নতুন পাওয়া বন্ধুরা। পাহাড়ের কোল ঘেঁসে পথ। জঙ্গলের একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ণ কিন্তু অনুচ্চ গন্ধ আছে। বনপথে সেই সুবাস বাতাসে ভাসে। মাটির গন্ধ, বুনো লতার গন্ধ, গাছের বাকল, পাতা, ফুল, ফল সব মিলিয়ে কেমন একটা যে গন্ধ, কোন সুগন্ধীর বোতলে তা ধরা যায়না। বলা যেতে পারে একধরণের অ্যান্টি অ্যাংজাইটি অ্যারোমা - যা স্নায়ুর চাপ প্রশমিত করে। মন শান্ত করে দেয়। জোর করে দুই ভ্রুয়ের মধ্যিখানে দৃষ্টি নিয়ে এসে মেডিটেশনের দরকার হয়না, এমনি এমনি মন শিথিল কিন্তু একাগ্র হয়ে যায়। মাঝে মধ্যেই বাঁদিকে পড়ছে সংকীর্ণ শুঁড়িপথ - পর্বত কন্দরে ঢোকার জন্য হাতছানি দিচ্ছে। যদি এখানে বেশ দিন পনেরো থাকতে পারতাম, রোজ একটা করে পথে অভিযান চালাতাম নিশ্চিত। ডানদিকে পাহাড়ের ঢাল। নিচুতে দেখা যাচ্ছে চাষের ক্ষেত। রুখু শুখু ঝাড়বাগদা জঙ্গলে ঢেকে গিয়ে আজ মাটিতে খুঁজে পেয়েছে জলের ঈশারা। চাষ চলছে পুরোদমে, খাদ্যশস্য থেকে শাকসব্জি, ফলের বাগান থেকে তৈলবীজ - কী নেই?
তবে হ্যাঁ, অন্য প্রাকৃতিক বনভূমি থেকে এই বনের কিছুটা তফাৎ তো আছেই। যেমন ধরা যাক সুন্দরবনের কোর এলাকায় একরকম অনুভূতি হয়, আবার বাফার এলাকায় ঘুরলে ব্যাপারটা আলাদা। বাফারে হৈ চৈ থাকে, কোরে গা ছম ছম। উত্তরে তরাইয়ের বনের প্রকৃতি আবার অন্য রকম। সেখানে বাফারে মনের ভেতরে ভয় ভয় থাকে। এই বুঝি চিতাবাঘ লাফালো, এই বুঝি হাতির দলের মুখে পড়লাম, এই বুঝি বাইসন তেড়ে এল। কিন্তু কোরে ঢুকে পড়লে বনের প্রশান্তি সমস্ত সত্ত্বাটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। হয়তো সে বন ভয়ঙ্কর। কিন্তু তা অনুভবের উপরিতলে থাকেনা। যেন ঘুম নেমে আসে চোখে। জোর করে দু চোখের পাতা খুলে রাখার চেষ্টা করলেও নিবিড় আবেশে চোখ বুজে যেতে চায়। আমার বয়স হয়েছে ক্লান্তির জন্য ঘুম পেয়ে গেছে - ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। চলমান অবস্থায় আমি কখনও ঘুমোইনা। খোলা জিপের ঝাঁকুনিতে তো আরওই সম্ভব না। ছাত্র ছাত্রী মিলিয়ে দলের প্রত্যেকেরই একই অনুভূতি হয়েছিল।
সেই কবে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যারেরা শিখিয়েছিলেন - তুমি এই প্রকৃতিরই অংশ, মনঃসংযোগ কর, মনের চোখ কান খুলে দেখো - ও কী বলছে শুনতে পাবে, কী দেখাতে চাইছে, দেখতে পাবে। অদ্ভুতভাবে ইস্কুলে পড়া উপনিষদের সেই চতুর্মহাবাক্যের ‘তত্ত্বমসি - তুমিই সেই’ - এই ভাবনার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সেদিনের প্রকৃতি পাঠ। যেদিন থেকে কেউ দেখিয়ে না দিলেও নিজে নিজে প্রকৃতির কথা শুনতে শিখলাম, সেদিন নিজের মত করে ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’ - বুঝেছিলাম। তবে একেবারে কোন আদিম নিসর্গে গিয়ে পড়লে বোঝা যায় কেন ঋষিরা বলেছিলেন - ‘অহং ব্রহ্মস্মি’। মানেটা একটু নিজের মত করে নিলে - একটা কোর ফরেস্টের ভেতরে - এই আমিই ব্রহ্ম বা বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম - দেহপটে সেই উপলব্ধি হাতে কলমে হয়ে যায়। বেরিয়ে এসেও তার রেশ কাটেনা। স্বীকার করতে বাধা নেই, ঝাড়বাগদার এই বন বিস্ময় জাগায় তো বটেই, তবে চেতনার ঐ স্তরে যায় না।
এ বন একেবারেই জনপদ লাগোয়া বনভূমি, বন ঘন নিশ্চয়ই তবে গহন নয়। আর বাকি সব ঠিকই আছে। আমরা চলেছি খুশি মনে চারপাশ দেখতে দেখতে, তবে মাঝে মাঝে আঙুল চলছে চলভাষের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে - সকলেই জানতে আগ্রহী ওই চারজন কী জেনে এল? নতুন করে জানার আছেটাই বা কী? মানব সভ্যতার হাজার হাজার বছরের ক্ষমতার সমীকরণ কি বদলে গেছে? পঞ্চায়েত থেকে প্রশাসনের নানা স্তরে মাহান্তিরা অপ্রতিরোধ্য, তাই সুযোগ সুবিধের দাঁড়িপাল্লা তাদের ভাগে ঢলে আছে। পাশে আদিবাসী পাড়া হল নেই - রাজ্য। এই বন যে তৈরি হল সেখানে মাহান্তিরা নির্দেশক, টেগোর সোসাইটি, জাপানি ফান্ড এসবের সঙ্গে যোগাযোগের কর্মকর্তা। আদিবাসী পড়শি সেখানে শ্রম দেয়। আমরা জানতে এসেছিলাম মানুষ প্রকৃতির ভালোবাসার সম্পর্কের আদ্যোপান্ত - জানতে পারলাম যে, সম্পর্কে খাদ নেই, তবে প্রকৃতির সনে বন্ধন গড়ে তুলেছে গোষ্ঠীর মাঝে বিষম সংশ্রবের আলাপ। পুঁথির পাতা আর মাটির ছোঁয়া - দুটোর মধ্যে ফারাক এখানেই - পায়ে কাদা মাটি না লাগলে, খোলা বাতাসে শ্বাস নিয়ে কিছুটা না হাঁটলে কিছু জানাটা আসলে অজানাই থাকে। আমার মনের মধ্যে অনেক ভাবনা খেলা করে যায়। এত অল্প সময়ে এখানে কোন গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব আছে কিনা তা বোঝা সম্ভব নয়। তবে গুরুতর কিছু না থাকারই কথা। এখানে আসার আগে আরাবাড়ি সবুজায়ন মডেলের থেকে ঝাড়বাগদা মডেল কোথায় আলাদা - এই প্রশ্নটা আমাদের বারবার ভাবিয়েছিল। আমি মনে মনে একটা তুলনা করার চেষ্টা করছিলাম।
আরাবাড়ি ছিল মূলত একটা সরকারি পরীক্ষামূলক প্রকল্প - ১৯৭২-এ শুরু হওয়া একটি সফল যৌথ বন ব্যবস্থাপনা (Joint Forest Management - JFM), যেটা একজন উদ্যোগী সরকারি অফিসারের প্রশাসনিক দক্ষতায় সাময়িকভাবে সাফল্যের মুখ দেখেছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি ব্লকের আরাবাড়ি অরণ্য রেঞ্জের ডি. এফ. ও. অজিত কুমার ব্যানার্জির নেতৃত্বে স্থানীয় গ্রামবাসীরা প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া জঙ্গল এলাকা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। সরকারি নিয়ম মেনে সেখানে গ্রামের লোক কাঠ কাটার বদলে বনের রক্ষণাবেক্ষণ করে কিছুটা রোজগার করতে পারতেন। তাতে বন ও জীবিকা দুইই রক্ষা পেত। গ্রামবাসীরা জঙ্গল রক্ষায় অংশ নেওয়ায়, উৎপাদিত কাঠের বা বনজ সম্পদের ২৫% লভ্যাংশ পেতেন এবং কাঠ, পাতা, ঘাস ইত্যাদি সংগ্রহের অধিকার পেতেন। সেই সময়ে আরাবাড়িতে এইভাবে প্রায় ১,২৭২ হেক্টর বনভূমি পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং এটি ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বন সংরক্ষণের একটি পথপ্রদর্শক মডেল হিসেবে গৃহীত হয়। আর সরকার যখন কোনো কাজ করে, তার নথিপত্র, ডাটাবেস এবং অ্যাকাডেমিক প্রচার খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ঝাড়বাগদা তো কোনো সরকারি ফাইলের সৃষ্টি নয়। এটা হল একজন জাপানি অধ্যাপক সাইজি মাকিনোর ভালোবাসা, জ্ঞান আর ভূমিপুত্র জমিদার রঘুনাথ মাহান্তির দূরদৃষ্টির ফসল - দুজনের আইডিয়া সফল করে তুলেছে টেগোর সোসাইটির সহায়তা আর স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ - শুধু আবেগ বললেও ভুল, একটু ভালোভাবে বাঁচার তাগিদও বটে। — এই চারটি উপাদান মিশে তৈরি হয়েছে সবুজায়নের আন্দোলন। তাই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়া প্রাক্তনী না হয়ে ঝাড়বাগদা এখন এক সজীব আর প্রাণবন্ত স্থানীয় সামাজিক কীর্তি। এর গুরুত্ব আমার মতে আরাবাড়ির থেকে বেশি।
আরাবাড়ি আর ঝাড়বাগদার উদ্দেশ্যের মধ্যেও আছে এক বিশাল তফাত। আরাবাড়ির মূল লক্ষ্য ছিল গাছ চুরি ঠেকানো এবং বন রক্ষার বিনিময়ে গ্রামবাসীদের হাতে কিছু অর্থ তুলে দেওয়া। তাই সেখানে গাছ কাটার পর লাভের ২৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব দেওয়া হয় মানুষকে। অর্থাৎ, বন সেখানে ‘অর্থকরী’ সম্পদ। কিন্তু ঝাড়বাগদার দর্শনটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বল্পমেয়াদী আর্থিক লাভের চেয়ে পরিবেশ রক্ষা করে ভৌম জল বাঁচানো, কৃষি সুরক্ষা, জীববৈচিত্র রক্ষা, নান্দনিকতা - এইসব বৃহত্তর ভাবনা এখানে আছে। এমনকি বনের ক্ষতি হবে এই ভয়ে সাম্প্রতিক প্রবণতার উলটো পথে হেঁটে লাভজনক পর্যটন ব্যবসাকে সীমিত রাখা হয়েছে। সরাসরি কাঁচা টাকাকে ঢুকতে না দিয়ে বন বাঁচিয়ে এখানকার অধিবাসীরা অন্যধরণের সুবিধে পেয়েছেন। মাটি ছায়া পেয়েছে, বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পেরেছে, বৃষ্টির জল বয়ে যাবার মুখে নিচু পাথুরে জায়গায় বাঁধ দিয়ে জলাশয় তৈরি হয়েছে। আগের ঐতিহাসিক জলাশয়গুলো আবার জলে পূর্ণ হয়েছে। জলসেচের প্রয়োজন কমেছে। ভালো চাষ হচ্ছে। গরমের আর শুষ্কতার আতিশয্য কমেছে। ফল, ফুল, পাখির গান সব মিলিয়ে মনের শান্তি ফিরেছে। টাকার মূল্যে এই ইকোসিস্টেম সার্ভিসের দাম গাছ কেটে বেচার চাইতে অনেক বেশি। আর এই অনুভবের জায়গাতে আদিবাসী এবং সম্ভ্রান্ত মাহান্তিরা এক হয়েছে। এইখানে ঝাড়বাগদার জিৎ।
আরও একটা বড় পার্থক্য লুকিয়ে আছে বনের প্রকৃতির মধ্যে। অর্থকরী ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়ে পুনরুজ্জীবন হয়েছিল বলে, আরাবাড়িতে গেলে চোখে পড়বে মূলত সারি সারি শাল গাছ—একধরণের একচেটিয়া (Monoculture) বন। কিন্তু ঝাড়বাগদার মাকিনো-রঘুনাথ পাহাড় একটা বেশ পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। সেখানে কেবল শাল নেই, আছে মহুয়া, পলাশ, পিয়াল থেকে শুরু করে প্রায় ৭২টি ভিন্ন প্রজাতির গাছ আছে। ফলের গাছ আর ঔষধি গুল্মে পাহাড়টি আজ জীববৈচিত্র্যের এক খনি। আরাবাড়ি যেখানে টাকার মূল্যে বনকে রক্ষা করতে শিখিয়েছে, ঝাড়বাগদা সেখানে আস্ত একটি মরা পাহাড়কে জ্যান্ত করে তুলেছে।
আরাবাড়ি মডেল তার সাফল্য ধরে রাখতে পারলোনা কেন? প্রথম কারণ হল - 'রোটেশনাল লগিং' বা চক্রাকার পদ্ধতিতে গাছ কাটা। নির্দিষ্ট সময় পর পর শাল গাছ কাটা হতো এবং তার লাভের ২৫% গ্রামবাসীদের দেওয়া হতো। বারবার গাছ কাটার ফলে সেখানে কোনোদিন 'প্রাকৃতিক বন' (Natural Forest) গড়ে ওঠেনি ফলে জীববৈচিত্র্যও সেভাবে দানা বাঁধেনি। আবার একক প্রজাতির আধিপত্য মানেই কখনও কোন অসুখ বিসুখ বা পোকার আক্রমণ হলে পুরো আবাদীটাই নষ্ট হবে। এর বিপরীতে নানা প্রজাতির গাছ থাকায় ঝাড়বাগদার জঙ্গল অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। আরাবাড়িতে শুরুতে গ্রামবাসীরা উৎসাহ পেলেও, পরবর্তীকালে লভ্যাংশ বণ্টন নিয়ে অনেক জায়গায় সরকারি আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামবাসীরা তাদের প্রাপ্য টাকা সময়মতো পাননি, ফলে বন রক্ষার প্রতি তাদের সেই শুরুর দিকের আবেগটা হারিয়ে গেছে। আসলে আরাবাড়ি ছিল যাকে বলে 'টপ-ডাউন' (Top-down) মডেল, অর্থাৎ সরকার বাহাদুর ওপর থেকে নিয়ম চাপিয়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ঝাড়বাগদা বা মাকিনো-রঘুনাথ মডেল হলো 'বটম-আপ' (Bottom-up), যেখানে মানুষ নিজের প্রয়োজনে জঙ্গল তৈরি করেছে। ঝাড়বাগদায় আবার এক ধরণের উপাদান রয়েছে যা হয়তো আরাবাড়িতে ছিলনা - উপভোক্তাদের মধ্যে একপক্ষ প্রবল আর অন্যপক্ষ অপেক্ষাকৃত কমজোরি। আরাবাড়ির মত - ওবাড়িরলোক গাছ বেচার টাকা পেল, আমি পেলামনা কেন? - এমন সমান সমান স্বার্থ সেখানে নেই। বন তৈরিতে একদল তত্ত্বাবধান করে, অন্য দল গায়ে খাটে। আপাতত একে অপরের পরিপূরক হিসেবেই চলছে। এর পরে কী হবে তা জানে ভবিষ্যৎ। আপাতত টোটো দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমরা পৌঁছে গেছি গন্তব্যে। বাঁপাশে যে পাহাড়ের গায়ে গায়ে চলছি এতক্ষণ, এবারে তার গা বেয়ে কিছুটা ট্রেকিং। কিন্তু একী কান্ড! একটা সাইন বোর্ড রয়েছে ঘাসের মধ্যে - তাতে লেখা বন ভৈরব। আমরা তো দেবীর থানের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। দেবতার কথা তো শুনিনি।
পাহাড়ের গা বেয়ে চড়াই পথে হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। কিছুটা গিয়ে দেখি একটা এলাকা বেশ সমতল। একরকম পাথুরে টেরাস বলে যায়। বহু বছরের আবহবিকারে হালকা মাটির স্তর তৈরি হয়েছে, তাই কিছু জায়গায় ঘাস, ঝোপ। একটা দুটো খেজুর আর অন্য গাছও আছে। ঐ জায়গাটা পেরোলে আবার ঢালু অংশ শুরু। কিন্তু দেবতা দেখতে পাইনি এখনও। দুই বধূ বনপথে মাথায় কাঠকুটোর বোঝা নিয়ে চলেছেন। তাঁদের জিজ্ঞেস করাতে দেখিয়ে দিলেন। জুতো খুলে খালি পায়ে এগিয়ে গেলাম ঐ সমান জায়গাটার এক কোণে। ঝোপঝাড়ে ঢাকা বলে আগে খেয়ালই হয়নি। ঠান্ডা ঠান্ডা এক ছায়াপথ পেরিয়ে গেলাম ভৈরব দেবের সামনে। বড় গাছের তলায় সিঁদুর লেপা, লাল সুতো বাঁধা, মূর্তি সেভাবে কিছু নেই। চারপাশে ছড়িয়ে নানা মাপের ছলনের ঘোড়া আর হাতি। দেখেই বুঝলাম এ হল গ্রাম দেবতার স্থান মানে আদিবাসী সংস্কৃতির গরাম থান। দেবীও আছেন, পাশেই সামান্য দূরে সেখানে ঢোকার পথ। শক্ত একধরণের ঝোপে এমনভাবে ঢাকা, ভিতরে দেখতে হলে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে নিলে, তবেই ভেতরে কী আছে দেখা সম্ভব। কিন্তু একটু দূরে বলে স্পষ্টভাবে ঠিক দেখা যাচ্ছে না। আমি সাহস করে হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা ভেতরে ঢুকলাম। এবারে দেখা যাচ্ছে। শক্ত এক ধরণের লতার ঘেরাটোপে যেন প্রাকৃতিক এক গুহা। দেবী বলতে সিঁদুর লেপা এক পট, দেখে মনে হল হয়তো পোড়া মাটির ব্লক, এককালে কিছু খোদাই করা ছিল। দেবীর একেবারে কাছে চলে গেলে মনে হচ্ছে মাথা তুলে বসা যাবে। কিন্তু অতটা যাবার সাহস করলাম না। আমি বহিরাগত। দেবীর কত কাছে যাওয়া যায় নিয়মকানুন জানিনা। কী থেকে কী হবে, আবার সেইরকম চার হাত পায়ে বেরিয়ে এলাম। ছেলেমেয়েদের দূর থেকেই বসে মাথা ঝুঁকিয়ে দেখতে বললাম। ভেতরে ঢুকতে দিইনি। কারণ ওদের থামানো যাবেনা। গিয়ে হয়তো দেবীকে জড়িয়ে সেলফি তুলে বসবে।
আমি এমন গরাম থান বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া অঞ্চলে অজস্র দেখেছি। শান্তিনিকেতনের কাছে ফসিল পার্ক যেখানে, সেই গ্রামে একবার সার্ভে হয়েছিল আমাদের, সেখানে বেশ খোলামেলা বড়সড় গরাম থান আছে। আবার বিষ্ণুপুরের কাছে তো আছেই। এসব জায়গায় সাধারণ মানুষ নিজের একান্ত মনোবাসনা জানিয়ে ঠাকুরের কাছে মানত করেন, আর এমন হাতি ঘোড়া উৎসর্গ করেন। ঘোড়া হল ধর্ম ঠাকুরের বাহন, আবার যুগ যুগ ধরে রাজপুরুষ থুড়ি ক্ষমতারও প্রতীক। আর যেকোন জঙ্গল পাহাড়ে হাতিঠাকুর নিঃশর্ত পুজো পান। গ্রামে হাতির চলাচল যতটা ভয়ের, ততটাই যেন মঙ্গলজনক। এঁদের তুষ্ট রাখতে পারলে সব বিপদ আপদ থেকে গরাম দেবতা রক্ষা করবেন, এই হল লোকবিশ্বাস। এই ঝাড়বাগদার বিষয়টা সামান্য হলেও আলাদা লাগছে আমার। আমি এর আগে কোনদিন এরকম পাশাপাশি জোড়া থান দেখিনি। আর একটা বিষয় হল গতকাল সেই কৃষ্ণমন্দিরে বসে মাহান্তিরা বলেছিলেন, আদিতে তাঁরা হলেন শৈব। সেক্ষেত্রে মাহান্তি ও আদিবাসী বিশ্বাস মিশে গরাম দেবতা শিবের রুদ্র রূপ ভৈরবে পরিণত হয়ে থাকতেই পারেন। আর ভৈরব থাকলে তাঁর ভৈরবী থাকবেননা, তা কি হয়? দুনম্বর ব্যাপার হচ্ছে এই একই ধরণের শিব পুজো, হাতি পুজো তরাইয়ের বনেও হয়, সেখানে নাম হল মহাকালের আরাধনা। ভৈরবের পুরো নাম তো কাল ভৈরব। মূলে পুজোর ভাবনা একই - সেটা হল জঙ্গলের ভয়কে জয় করা, আসলে অকাল মৃত্যুর ভয়। বন্য প্রাণীর জন্য ফসল নষ্ট হতে পারে, বাড়ি ঘর ভাঙতে পারে সেই ভয়। এইরকম সার্ভে করতে গিয়েই একবার একটা কথা শুনেছিলাম - বেশ মজা লেগেছিল আমার। কথাটা হচ্ছে, হিমালয় সংলগ্ন বিপদ আপদ গুলো হর পার্বতী নিজেরাই দেখাশোনা করেন। আর মালভূমির পাহাড় জঙ্গল দেখাশোনার ভার হল ভৈরব আর ভৈরবীদের। হর পার্বতীর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরাই এসব অঞ্চল রক্ষা করেন। এই প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারটা কিন্তু খুবই জাস্টিফায়েড। দুজনের পক্ষে এত পাহাড় জঙ্গলে এত রকম অপশক্তির মোকাবিলা করা কি সম্ভব, কিছু না কিছু নজর এড়িয়ে যেতেই পারে। তার চেয়ে এমন বিশ্বস্ত নিজেদের অংশভাগী শক্তিশালী অনুচরদের ভার দেওয়াই বিধেয়।
আমি ছলনের হাতি ঘোড়াগুলো ভালো করে নজর করছিলাম। হাতের চাপে গড়া টেপা পুতুল। গাঁয়ের লোকের ছোট খাটো আশা নিরাশার মতই সরল তাদের গড়ন। এইরকম হাতে গড়া পোড়া মাটির মূর্তিগুলো ফসিল পার্কের গ্রামে দেখেছিলাম বেশ বড়, জটিল এবং অলঙ্কৃত, হয়তো ওগুলোতে ছাঁচের ব্যবহার হয়েছিল। আসলে লোকসংস্কৃতি যত নগর সভ্যতার কাছাকাছি যায়,ততই তাতে নাগরিক জটিলতার, আধুনিকতার, যন্ত্রসভ্যতার ছোঁয়া লাগে। আর যত সেই স্পর্শ লাগে ততই প্রাচীন রীতি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আমাদের ঝাড়বাগদার টেপা পুতুলগুলো এখনও সেই ছোঁয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
বন রক্ষাকারী দুই দেবদেবীকে প্রণাম জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। চারপাশে দেখে শুনে একটা উপযুক্ত ঢাল বেছে নিয়ে সেখানে ক্লাইনোমিটার সার্ভেটাও করে নেওয়া গেল। এরপর ওখান থেকে ফেরার পালা। যখন এসেছিলাম, তখনও পথে ঝোপের মধ্যে একধরণের ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে এসেছিল। তখন যাবার তাড়ায় খেয়াল করিনি। ফেরার পথে কিন্তু সকলে সেই গন্ধের উৎস খুঁজতে শুরু করলাম। পেয়েও গেলাম - ঝাঁঝালো কিন্তু এমন গন্ধ, যেন খুব চেনা - আর খুব আকর্ষণীয়। ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে মিশে আছে একধরণের তুলসী বন - কিন্তু সাধারণ তুলসীর মত নয়, মানে তুলসী পাতার গন্ধ আছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে অন্য গন্ধ - কখনও মনে হচ্ছে পুদিনা পাতার গন্ধ, আবার কখনও যেন ঠিক ভিক্সের মেন্থলের মত। শুঁকলে কী আরাম! সেই মিন্টি তুলসী কিছু খাওয়া হল, কিছু গাছপাগল চারা সংগ্রহ করে নিল। কেউ গন্ধের জন্য পকেটে পুরল। ফিল্ড করতে আমরা এইজন্যই ভীষণ ভালোবাসি। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, ডেমোগ্রাফি, লোক সংস্কৃতি, অ্যাডভেঞ্চার, গল্প পুরাণ - সব মিলিয়ে একেবারে ফুল প্যাকেজ। আমরা পাহাড় থেকে নেমে এসেছি। তখনও তো জানিনা সামনে আরও কী কী অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।