

দরকারি কাজ সেরে হোটেলে যখন ফিরলাম তখন সন্ধ্যা নেমেছে। হোটেলের উল্টোদিকে একটা হনুমান মন্দির আছে। সেখান থেকে ঘন্টা ধ্বনি শুনে লোহার গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। একজন মাত্র পূজারী আরতি করছেন, আর জনমনিষ্যি বলতে আমরা এই কজন। গর্ভগৃহে টিমটিমে হলুদ বাল্ব জ্বলছে। কামিনী ফুলের মিষ্টি গন্ধ আসছে নাকে। পাঁচিলের মধ্যে ধারে ধারে ফুলগাছ, পাতাবাহার। মাথার ওপরে শুক্লা পঞ্চমীর আধখানা চাঁদ। আকাশে মেঘ নেই, চারিপাশে বিজলি আলো যথেষ্ট নেই। প্রায়ান্ধকার নিরিবিলি এই মন্দিরটিতে মনটা ভারি শান্ত লাগছিল। মনের মেঘ আর নেই। আরতি শেষ হল। আমাদের ঘরেও যে সরস্বতী মা বসে আছেন, তাঁকেও আরতি করতে হবে।
মুস্কিল আসান অগ্নিশা তো আছেই। আমাদের আরতিও সুসম্পন্ন হল। উমম্ জলখাবারে আজ চাউমিন হয়েছে। ছেলেমেয়েদের পছন্দ, আর দুজনেরও খুব - কাদের আবার সৌরভ আর অগ্নিশা। খেতে খেতে গল্প হল। সারাদিনের ক্লান্তি আর নেই। এই জিনিসটা আমি ফিল্ডে এলেই খেয়াল করি। আমরা সমতলের লোকেরা দূষিত বাতাসে কাজ চালাই তো, প্রকৃতির কাছে এলে বাড়তি অক্সিজেনে নিশ্বাস নিয়ে চট করে ক্লান্ত হইনা। আজ বিভিন্ন দলে কী কী কাজ হয়েছে তার খতিয়ান নিয়ে বসা হল। মূল মৌজা ম্যাপটা যোগাড় হয়ে গেছে । ঐ ম্যাপে বসানোর মতো যথেষ্ট প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি ডাটাও যোগাড় হয়েছে। কিন্তু মুস্কিল হল এখনও দু দুটো মোক্ষম কাজ বাকি। ক্লাইনোমিটার সার্ভে আর প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটি ম্যাপিং। টাইমে কুলোবে কিকরে? কাল যে সাইট সীয়িং এ বেরোনোর কথা। এলাকার উল্লেখযোগ্য ভূদৃশ্য গুলিও ছেলেমেয়েদের দেখাতে হবে। এই পৃথিবীই যে ভূগোলের ল্যাবরেটরি। অবশ্য এজন্য অন্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা একটু দুঃখ করেন। আমাদের মতো তাঁরা ঘুরে বেড়াতে পারেননা। তাই সবসময়ে রাগানোর জন্য বলেন, এবার তোমরা কোথায় ‘বেড়াতে’ যাচ্ছ গো? কারণ আমাদের কাজটাকে বেড়ানো বললে আমরা খুব রেগে যাই। কেউ আবার এমনও বলেছেন যে পরের জন্মে মায়ের পেট থেকে বেরিয়েই ভূগোল বই নিয়ে বসে যাব, আর ভুল হবেনা। যাক ওসব কথা। টাইম ম্যাপিং এর জন্য ডিনারের সময়ে বিদ্যুৎ বাবুর শরণাপন্ন হলাম। সমাধান সূত্রও মিলে গেল সহজে। সবই নির্ভর করছে আমরা কত ভোরে উঠে কাজ শেষ করতে পারব তার ওপরে। ঘুমোতে গেলে জায়গা দেখা যাবেনা। এটা শহর নয়। এখানে সূর্য ঘড়ি অনুসরণ করে চলতে হবে। তিনি অন্তর্হিত হলে বাইরের কাজও সাঙ্গ হয়। ঘরে ঘরে ডিনার টাইম মিটিং এর ডাক গেল। ছেলেমেয়েদের অনেক এনার্জি, কিন্তু সব নিজের নিজের বাড়ির রাজপুত্র রাজকন্যে। এত পরিশ্রম করার অভ্যেস তো নেই। থাকলেও এধরনের কাজ ওদের কাছে একেবারেই নতুন। এখনই বেশ রাত। সারাদিন রোদে পুড়ে কাজ করেছে। কাল আবার খুব ভোরে ওঠা। একটা অন্য সমস্যাও হয়েছে। দুদিন কাটল। খাবার জল খারাপ। পৈটিক গোলযোগ সংক্রান্ত ওষুধের খোঁজ পড়েছে ঘরে ঘরে। যদিও এখনও পর্যন্ত সমস্যা জটিল দিকে এগোয়নি, তবু ওরা পারবে তো? ছেলেমেয়েদের বলাতে তারা এককথায় রাজি। যেকোনো কষ্ট করতে প্রস্তুত। ভোরে লাইট টিফিন করেই সার্ভে। ফিরে এসে আর্লি লাঞ্চ করে সারাদিনের জন্য বেরিয়ে পড়া।
রাতে আবার তিনজন যুক্তি করতে বসলাম। আসল চ্যালেঞ্জ আমাদের। ছেলেমেয়েরা কাজগুলো তো জানেনা। দুঘন্টার মধ্যে লোকেশন খুঁজে, ওদের শিখিয়ে দু দুটো সার্ভে কমপ্লিট করা কি সম্ভব? এদিকে যত দেরি হবে, ওদিকে একটা করে সাইট বাদ যাবে, সেটা কি মানা যায়? কখনোই নয়। আমাদের ভিতরের ছেলেমানুষগুলো মরে গেছে বুঝি!! আচ্ছা আমরা পুরো টীম সকলে কাল যে অত কষ্ট করব, একটা কোন প্রাইজ নেবনা? কাল আবার এক ফাঁকে সরস্বতী ঠাকুরও তো তুলতে হবে। ফিরে এসে দধিকর্মা পেলে কেমন হয়। প্রতিবারই বিদ্যুৎ বাবু আমাদের নানা আবদারে পাগল হন, কিন্তু এটা যে সম্পূর্ণ অন্য। আচ্ছা উনি কি শুয়ে পড়েছেন? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনজনই লাফিয়ে উঠেছি। রাত একটা ছুঁই ছুঁই। অন্তত চারঘন্টার বিশ্রাম চাই এক্ষুনি শুয়ে না পড়লে, নিজেরাই উল্টে যাব।
ভোরেই রান্নাঘরে দধিকর্মার আর্জি পেশ করলাম। মঞ্জুরও হল সঙ্গে সঙ্গে। এবারে সবাই মিলে ঘড়ির সঙ্গে যুদ্ধে নামলাম। কাজ শেষ করেই ছোড়েঙ্গে। আবার দারিংবাড়ি সবটা দেখার পণটাও নেহি তোড়েঙ্গে।
হোটেলের সামনে থেকে ঢালু পায়ে চলা পথ গড়িয়ে গিয়েছে বাস রাস্তার দিকে। বেশি খোঁজাখুঁজি করে মাথাগরম করার দরকার কী?। এপথে যথেষ্ট ঢাল আছে। ক্লাইনোমিটার সার্ভে ভালোই হবে। হৈ হৈ করে সকলে কাজে নেমে পড়লাম। এর পর একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে হবে, যেখানে প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটি ম্যাপিং করা যায়। বাস রাস্তায় পৌঁছে কয়েকজন বলল, ওপারে একটা জায়গা আছে যেখানে ঐ কাজ করা যেতে পারে। গতকাল হাউসহোল্ড সার্ভে করতে করতে ওরা ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল। আচ্ছা গিয়ে দেখাই যাক তাহলে।
রাস্তা পেরিয়ে বিরাট মাঠ, আর বিশাল দুটো অশ্বত্থ গাছ। আরও এগোই। ওপাশে তো একটা মন্দির মনে হচ্ছে। গত দুদিন আমরা বাজার পেরিয়ে চারমাথার মোড়ের দিকে কাজ করছিলাম। ওদিকে সব চার্চ দেখলাম। এদিকটায় তার মানে মন্দিরগুলো আছে। ভাবনা মুক্ত হয়েই এগোচ্ছিলাম, কল্পনা করিনি দুমিনিট পরে কোন বিস্ময়ের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। জানিনা পাঠক বিস্মিত হবেন কিনা। জিওমরফোলজির বইএর পাতা জ্যান্ত হতে দেখলে ভৌগোলিকের হৃদস্পন্দন নিজের বশে থাকেনা। একটু গুছিয়ে নিই। ধীরে ধীরে বলছি।
দারিংবাড়ির আবিষ্কার
আমি যা প্রথম দেখি, তা আমারই আবিষ্কার - একদা এমন কথা বলেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এখানেও ব্যপারটা কতকটা অমনি হল। আমি খুঁজছিলাম এমন একটা জায়গা যেখানে স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা ছোট বড় গাছপালা মিলে মিশে রয়েছে, মানুষের লাগানো গাছ নয়। আবার খুব বেশি ঝোপ জঙ্গল থাকলে ছেলেমেয়েদের কাজের অসুবিধে হবে। অশ্বথ গাছ পেরিয়ে মন্দিরে ঢোকার পায়ে চলা পথ। পথের ওপারে এবড়ো খেবড়ো একটা উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেল, যেখানে প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটির কাজ করা সম্ভব। আরও একটু দূরে গেলে গাছ আরও ঘন। কিন্তু শুনলাম ওদিকে অনেক সাপের গর্ত। স্থানীয় মানুষ বারণ করছেন। হোক শীতকাল। এতগুলো ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়ে বিবেচনা জলাঞ্জলি দেওয়া যায়না। আমরা সামনের দিকেই রইলাম। যে স্পটে কাজ করতে চাইছি, তার ডান সীমানা দিয়ে সোজা চলে গেছে উঁচু মাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি বাঁধ। সে বাঁধ দিয়ে যাতায়াত করা যায়। মানে আমরা মেয়েরা যেতে পারব। কিন্তু ছেলেদের নিচে দিয়ে যেতে হবে। এমন অদ্ভুত নিয়ম কেন? আগে খেয়াল করিনি। বাঁধটা বেশ কিছুটা নাক বরাবর গিয়ে ডানদিকে বেঁকেছে, আসলে গোল হয়ে বিশাল একটা নিচু জায়গাকে ঘিরে রেখেছে। আমাদের সামনে বাঁধের গা ঘেঁষে সিমেন্টের দেওয়াল তোলা আছে। ডানদিকে সিঁড়ি নেমে গেছে। মন্দিরের মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম সিঁড়ি দিয়ে নেমে মহিলাদের স্নানের জায়গা। পুকুর তো নেই এখানে। আমার সন্দেহ গাঢ় হচ্ছে। কথা বলে তা নিরসন হল। মাটির তলা থেকে সারাবছর জল ওঠে। একজন ছাত্রকে বলি জিজ্ঞেস করোতো, ওটা কোন ঠাকুরের মন্দির। যা ভেবেছি তাই। দেবাদিদেব শিবশম্ভুর ভজনা করা হয় এখানে। একজনকে বলি চট করে দেখে এসো তো মূর্তি পুজো হচ্ছে, নাকি শিবলিঙ্গ। সে এসে বলে মূর্তি নয় ম্যাডাম। আমি হাসি। এ জিনিস প্রথম দেখেছিলাম প্রায় কুড়ি বছর আগে মধ্য ভারতে। মহাকাল পর্বতের অমরকন্টকে। আসলে একটি প্রাকৃতিক কুন্ড, বা ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। ভূগর্ভস্থ জলস্তর আগ্নেয় আর রূপান্তরিত শিলার ফাটল দিয়ে চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখে এলাম জলের লেভেল। এখন শীতকাল। জলস্তর নেমে যাওয়ার কথা। এখনো এতটা জল মানে জলস্তর ভূপৃষ্ঠের খুবই কাছে। হুমম, বুঝলাম। জলস্তর ভূপৃষ্ঠের কাছে বলে মাটির স্তরের মধ্যে দিয়ে বেশি ফিল্টার হবার সুযোগ পায়না। সেজন্যই সবার পেটের গোলমাল হয়েছে। এবারে শিবঠাকুরকে দেখে আসি। শিব ও বুদ্ধের শান্ত, ধ্যানী কল্পনাটি আমার খুব ভালোলাগে। আমার মনে হয় ঐ মূর্তি মানুষের মনঃসংযোগ আর অনুভবের ক্ষমতার মূর্ত রূপ। সাদামাটা মন্দিরটির পিছনে একটি বেশ বড় চাতাল। দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলে সিমেন্ট বাঁধানো বড় ঘর। একসাথে অনেকের বসা সম্ভব। তার একপাশে মেঝেতেই জটাজূট শিবঠাকুর বসে আছেন নন্দীকে পাশে নিয়ে। তবে সেখানে পুজো হয়না। বাঁদিকে ধাপে ধাপে নেমে গেছে পথ। পূজারী উঠে এসে জিজ্ঞেস করলেন স্নান করে এসেছি কিনা। অবশ্যই স্নান করে এসেছি। 'তাহ্যানে আপণ আসুন' পূজারী ডাকছেন। আমি আর অগ্নিশা পা বাড়ালাম। কিন্তু সৌরভ যাচ্ছেনা কেন? হায় ভগবান, ও চান করে আসেনি। ব্যস। তিনজনের যাওয়াই আটকে গেল। কারণ পূজারী রাজি হলেন না। হয়তো ভেবেছেন এক পরিবারে এক যাত্রায় পৃথক ফল হয়না। মনে মনে হাসি, পূজারী ঠিকই বুঝেছেন, আমরা এক পরিবারের তো বটেই। মাঠে প্রান্তরে, মানুষের অন্তরে বাহিরে খুঁজে বেড়াচ্ছি ভূগোলের জ্ঞান ক্ষ্যাপার মতো, ভৌগোলিক পরিবারের প্রতিনিধি হয়ে। পূজারী একটা জিনিস বোঝেননি। আমরা ফুল বেলপাতায় পুজো দিতে আসিনি। শিবলিঙ্গ স্পর্শ করে দেখতে চেয়েছিলাম ঊদবেধী শিলা কিনা। জ্ঞানের অন্বেষণই আমাদের প্রণাম। পূর্বঘাট পাহাড়ের শ্রেণী আসলে তো পাহাড় নয়। সৃষ্টির প্রথম আগ্নেয় শিলায় পৃথিবীর বুকে তৈরি হয়েছিল মালভূমি। সেই আদি মালভূমি টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে আফ্রিকায়, দক্ষিণ আমেরিকায়, অস্ট্রেলিয়ায়, ভারতে, আন্টার্কটিকায়। ভারতের দুই উপকূলে পূর্বঘাট আর পশ্চিম ঘাট হল সেই আদিম মালভূমির দুই ধার। আজ দুধারের মাঝখানের অংশটা ক্ষয় হয়ে নিচু হয়ে গেছে। সৃষ্টির সেই অশান্ত দিনে পাথর ফেটে গিয়েছিল কোথাও কোথাও। সেই ফাটল দিয়ে উঠে আসছিল পৃথিবীর বুকের ভিতরে লুকোনো গরম তরল ম্যাগমা। পশ্চিমে আরব সাগরের দিকে কাছাকাছি অনেক ফাটল দিয়ে পাতলা লাভা বেরিয়ে পড়ল বাইরে। তৈরি করলো মালভূমির আর একটা পরত - কালো ব্যাসল্ট পাথরের - যাকে এখন আমরা চিনি ডেকান ট্র্যাপ নামে। ডেকান ট্র্যাপের পাথুরে গায়ের ওপর ঐ পাথরেরই চূর্ণ পরত দিয়ে তৈরি আজকের কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা রেগুর সয়েল, ভারতের কার্পাস তুলোর চাষের আদর্শ অঞ্চল। জায়গাটা মূলত মহারাষ্ট্র। মুম্বাইয়ের জুহু বিচের কালো বালি আরব সাগরের জলে ভিজে যেন কাজলপারা। প্রথম দর্শনে তুলে চোখে পরে নিতে ইচ্ছে হয়েছিল আমার। ভারতের বাকি মালভূমির ফাটলের ম্যাগমা কিন্তু ছিল ভারি ও সান্দ্র, পশ্চিমা লাভার মতোন পাতলা ছিলনা। তাই তারা ভূপৃষ্ঠের ওপরে উঠে আসতে পারেনি। খানিক দূর উঠে মাটির গভীরেই জমে গেছে। তাদেরই আজ বলে ঊদবেধী শিলা। উল্লম্ব আক্ৃতির আগ্নেয় উদবেধী শিলাকে বলে ডাইক। কোটি কোটি বছরের ক্ষয়ের ফলে অনেক ডাইক আজ বেরিয়ে এসেছে। অমরকন্টকে শুনেছিলাম ওস্থানটি শিবক্ষেত্র। কারণ ওখানকার মন্দিরের কোনো শিবই মানুষ প্রতিষ্ঠা করেনি, সবই পাতাল থেকে উঠেছে। শহুরে মন নিয়ে আমরা বিশ্বাস করিনি। আর যত নদীর উৎস সব মন্দিরে। এটাও বিশ্বাস করিনি। পরে দেখলাম সব মন্দিরেই শিবলিঙ্গ ভেজা, ওপর থেকে নয়, নিচের দিক থেকে। স্থানীয় মানুষ বলেন বর্ষা কালে মা গঙ্গা দেখা করতে আসেন। ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসে জল। ঐ ডাইকগুলিই যে শিবজ্ঞানে পূজিত হচ্ছে সহস্র বছর ধরে। মানুষের সাধ্য কি পাতাল থেকে ঐ দেবতাকে উপড়ে এনে অন্য কোথাও প্রতিষ্ঠা করার। বর্ষাকালে ভূগর্ভস্থ জল ঐ ফাটল দিয়ে ওভার ফ্লো হয়। যে জলের উৎস জানা নেই, ধর্মভীরু মানুষের কাছে তা গঙ্গা জল ছাড়া কী? লোকবিশ্বাসকেও মর্যাদা দিতে হয়। তার মধ্যে থাকতে পারে সত্য অনুষঙ্গ। এই কথাটা অমরকন্টকে জীবন একটা চড় মেরে শিখিয়েছিল। তবে এখানে এমন কোন ধর্মীয় গল্প নেই। হয়তো আদিবাসী লোক-ধর্ম এবং খৃষ্টধর্মের মিশ্রণে হিন্দু সংস্কৃতি মাথা চাড়া দিতে পারেনি। আফটার অল পূর্ব ভারত তো - এখানে সহাবস্থানই স্বাভাবিক নিয়ম। কোনরকম কট্টরবাদের সামনে পূবদিক কোনোদিন মাথা নোয়ায়নি। এ হল সূর্যোদয়ের দিক। যুক্তি ও জ্ঞানই যে মানুষের হৃদ-সূর্য। ভূতাত্ত্বিক তো নই আমি, ম্যাজিসিয়ানও না, যে দূর থেকে দেখেই নিশ্চিত বলতে পারব, দারিংবাড়ির এই শিবঠাকুর হল ডাইক। কিন্তু আমরা যে ভৌগোলিক। এখানকার সারফেস এক্সপ্রেশনগুলি সেদিকেই নির্দেশ করছে। প্রথম ক্লু হল ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসা জল, আর দ্বিতীয় হল, মানুষই যদি শিবলিঙ্গ বসিয়েছে, তবে অতগুলো ধাপ নিচে কেন? ভিতরে জল কেন? ছেলেমেয়েরা বলছে, গতকাল যখন ওরা গ্রামে ঢুকেছিল, তখন ওখানেও অমন কুন্ড আর ঝোরা দেখেছে। আশ্চর্য কিছু নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক। আদিম কম্পনে প্রাচীন শিলায় ফাটল তো আর একটা হবেনা। এখানে চারপাশেই এমন থাকবে। হয়তো এই ঝোরাগুলোই এখানকার জলের যোগানদার। বর্ষায় ওভার ফ্লো এখানেও হয় সেটা নিশ্চিত। ঐজল ধরে রাখার জন্যই এতটা জায়গা বাঁধ দিয়ে ঘেরা। এঅঞ্চল তো মহানদীর ক্যাচমেন্ট এলাকা আর বঙ্গোপসাগরের মাঝে জলবিভাজিকা। যেদিক দিয়েই হোক, এখানকার জল মিলে যায় বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে। প্রাকৃতিক কুন্ড আর শিবলিঙ্গের সহাবস্থান আমি অনেক জায়গায় দেখেছি। আমাদের বাংলায় বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণের পড়শিও তো বক্রেশ্বর শিব। দারিংবাড়িতে এই সম্পদ আছে আগে শুনিনি। বইতে এসব লেখা থাকেনা। শুধু বই পড়া ভৌগোলিক হল আর্ম চেয়ার জিওগ্রাফার। সায়েন্স কলেজে আমাদের স্যার সুভাষ রঞ্জন বসু বলতেন, কখনো যেন আরাম কেদারায় বসে থেকোনা। ফিল্ডে এলে বারবার স্যারেদের কথা মনে আসে। ফিসফিস করে বলি আমি বসে থাকিনি স্যার। অমরকন্টকে এই প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে পৌরাণিক গল্পের মোড়কে, সঙ্গে দোকান বাজার বাহারি চটকের সাথে পরিবেশিত হয়। আর দারিংবাড়িতে অজান্তে অগোছালো হয়ে পড়ে আছে এখানে ওখানে।
আমাদের প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটির কাজ শেষ। না দুঘন্টার মধ্যে পারলাম না। প্রায় পৌনে তিনঘন্টা কাবার। সব সাইট গুলো ছুঁতে পারবো তো? দেখা যাক কী হয়।
বাস চলল জনবসতির সীমানা ছাড়িয়ে, আর দারিংবাড়ির রূপ রস আমাদের চোখে স্পষ্ট হতে শুরু করল। ঢেউ খেলানো কালো পিচের রাস্তা, দুপাশে পাইনের বন। মাঝে মাঝে চা বাগান। ফাঁকে ফাঁকে লালচে আগ্নেয় পাথরের টিলা। নিজের কলেজ জীবনের ফিল্ডের কথা মনে পড়ে। যেন দারিংবাড়ি নয়, পাঁচমারী; যেন পূর্বঘাট নয়, সাতপুরা; যেন আমি শিক্ষিকা নই, ছাত্রী। মনটা পালকের মতো হাল্কা লাগে। পাইনের পাতায় রোদের ঝিলমিল, আর পিছনের সিটগুলোতে চাপা খিলখিল, আড়াই দিনের কাজের চাপ সরে গিয়ে রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলেছে। পাইনের বন শেষ, এবারে পর্ণমোচী গাছের সারি, তার মানে আমরা আসলে ঢালের নিচের দিকে নামছি। কখনো ঘন, কোথাও বা একটু ফাঁকা ফাঁকা। সঙ্গে চলেছে দূরে, কাছে পাহাড়ের শ্রেণী। আন্দাজ সতেরো আঠেরো কিলোমিটার যাওয়ার পরে বাসটা পাকা রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তায় উঠল, লালচে হলুদ ধুলো উড়িয়ে চলল নাচতে নাচতে। রাস্তা খুব খারাপ, সরুও। এত বড় বাস, কষ্ট করে চালাতে হচ্ছে। প্রায় এক কিলোমিটার এমন যাবার পর বাস থামল। কোমরটা যেন একটু আরাম পেল। কিন্তু মনে ছিলনা যে আরাম হারাম হ্যায়। বাস থেমেছে আরাম দিতে নয়। এখান থেকে হাঁটতে হবে। মূলত উৎরাই পথ, মাঝে মাঝে চড়াই, আর প্রায় দুশোর কাছাকাছি সিঁড়ি ভেঙে আমরা পৌঁছবো মিদুবান্দা জলপ্রপাতের সামনে। অমরকন্টকের দুধধারা বা পাঁচমারীর বী ফলসের মতো রাস্তা অতটা কঠিন নয়। তবে পাহাড়ি পথ, সমতল তো নয়। দম লাগে। যাওয়ার পথটুকু ছাড়া দুপাশে জঙ্গল। অর্ধেক পথ নামার পর একটু জিরিয়ে নেবার জন্য পাথরের ওপর বসেছি, সায়ন এসে গাছের ডাল ভাঙা লাঠি হাতে ধরিয়ে দিল আমার। তাতে বাকি পথটা পার হতে বেশ সুবিধে হয়ে গেল। লাঠি ঠুকে ঠুকে নিচের উপত্যকায় নামতে লাগলাম। এবারে পাশের নিচু খাদে জলের আওয়াজ শুনতে পেলাম, নদী এখনও দেখা দেয়নি। শেষ পর্যায়ে এসে নদীর জল দেখলাম, কিন্তু এ কি, নদীতে অনেক ভাত ভেসে যাচ্ছে। বড় বড় পাথরের বাঁক পেরিয়ে একটা গাছের গুঁড়ি লাল সিমেন্টে বাঁধানো, সিঁদুর মাখা। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা সব পৌঁছে গেছে, মোবাইলে ছবি তুলছে। অন্য পর্যটকেরাও আছে। ঘুরে পিছু ফিরতেই বাকরুদ্ধ হলাম। পাহাড়ের মাথা থেকে ঘন বনের মধ্য দিয়ে তিনটে ধাপে নেমে আসছে দুরন্ত নদী। জল পাথরে আছড়ে পড়ে কুয়াশা তৈরি করেছে। শীতকালে এত জল! বড় বড় পাথরের খাঁজে গভীর জলাশয়ের মতো তৈরি হয়েছে। শ্যাওলায় গাঢ় সবুজ। কিন্তু পিকনিক পার্টির চাপে চারিদিকে থার্মোকলের বাসন আর এঁটো শালপাতা ভাসছে। বুঝেছি, এইজন্য নদীতে অত ভাত ভেসে যাচ্ছিল। প্রকৃতির এই দান, যদি একটু পরিচ্ছন্ন রাখা যেত, ভালো হত। বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে ফিরতে শুরু করলাম। উঠতে সময় লাগবে আমার। জিরিয়ে নিতে হবে বারবার। সবগুলো স্পট ছুঁতে হবে, একথা ভুললে চলবেনা। সৌরভ আর অগ্নিশা তো আছে, ঠিক ছেলেমেয়েদের গুছিয়ে নিয়ে চলে আসবে। নামার সময়ে একটানে নেমে গেছি। অন্যদিকে তাকানোর মন ছিলনা। এখন চারদিক দেখতে দেখতে উঠছি। পর্যটক বেশিরভাগই স্থানীয়। তবে বাঙালিও আছে। আদিবাসী মহিলারা একটু দূরে কাঁচা হলুদ বিক্রি করছেন। এখানে হলুদের চাষ ভালো হয়। কেনার ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। কিন্তু এখন উপায় নেই। সুযোগ থাকলে অবশ্য আমরা এসব জিনিস চটপট কিনে নিই। রায়মাটাংয়ে গিয়ে যেমন দেখেছিলাম গ্রামের ঘরে ঘরে সুপুরি গাছে গোলমরিচের লতা জড়িয়ে আছে। কোন কোন ঘরে আবার কাঁচা গোলমরিচের গোছা দেখলাম গাছ থেকে পেড়ে চাটাই পেতে উঠোনে শুকোনো হচ্ছে। আমরা তো বটেই ছেলেমেয়েরাও সব যে যা পেরেছে কিনে নিয়েছে। বাড়িতে এনে রোদে রেখে শুকিয়ে নিলাম। দিন তিনেকের মধ্যে ফার্স্ট ক্লাস মরিচ রেডি। মজা হচ্ছে ওখানে বাজারের থেকে হাফেরও কম দাম। আবার চেরাপুঞ্জিতে নিয়েছিলাম কাঁচা দারচিনি। কৌটোয় পুরে দিয়েছিলাম, রোদে রাখার কথা তখন মাথায় আসেনি। ঠিক ঠাক শুকোতে - তা বছর খানেক লাগলো - তবে শুকোনোর পর স্বাদে গন্ধে অপূর্ব। তাই এখানেও মনটা হলুদ হলুদ করে লাফাচ্ছিল, হলনা - কী আর করা যাবে!