এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  লঘুগুরু

  • গণতন্ত্র কি খায়, না চিবোয়? – পর্ব ২

    প্যালারাম
    ধারাবাহিক | লঘুগুরু | ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ৫০ বার পঠিত
  • প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব
    ১৯৫৩ সাল, একদিকে, মার্চ মাসে স্তালিনের মৃত্যু হয়েছে, অন্যদিকে আমেরিকায় ম্যাকার্থি জমানা তার কম্যুনিস্ট ধরপাকড়ের শীর্ষে। এরই মধ্যে, সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাচওয়র্থ প্রেস থেকে বেরোয় Bertrand Russell-এর লেখা ‘What is Democracy?’ বইটি। লেখাটির কয়েক খণ্ডে অনুবাদ…

    অলংকরণ: রমিত



    আমাদের সময়ে, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা অন্যায্যভাবে কমে যাওয়ার পিছনে দায়ী দুটি বিপরীত শক্তি। তথাকথিত বামে আছেন রাশিয়ার গুণমুগ্ধরা, যাঁরা ভাবেন – রাশিয়ার কম্যুনিস্টরা যখন স্বৈরতন্ত্র অবলম্বন করেছে, তবে নিশ্চয়ই গণতন্ত্র কোনো না কোনোভাবে প্রতিক্রিয়াশীল। ডানদিকে আছেন, যাঁরা সমাজতন্ত্রের (socialism) নামেই ভয় খান, আর প্রাচীন সুযোগসুবিধেগুলো ছাড়তে চান না।

    এই দুই মতামতের বাইরেও কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা অনুভব করতে পারেন – সবকিছু মোটেই ঠিক নেই, আর অন্য কোনো, আরও ভালো কাঠামোর কল্পনা করেন অস্থির হয়ে। আমার মতে, গণতন্ত্রের চেয়েও ভালো প্রক্রিয়ার কল্পনা করা—অন্তত পশ্চিমা সভ্য জনগোষ্ঠীগুলির জন্যে—ভীষণ বিপজ্জনক। এমন নয়, যে, গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবেই শুভ, কিন্তু অন্যান্য তন্ত্রগুলির মধ্যে কিছু অশুভ হামেহাল থাকে – গণতন্ত্রে যাদের অস্তিত্বের সম্ভাবনাটুকুও নির্মূল করা সম্ভব। মানুষ যখন কোনো বিকল্প অগণতান্ত্রিক পদ্ধতির কল্পনা করে সংশোধনী হিসেবে, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই রাজত্বে নিজেদের ক্ষমতার কেন্দ্র বলে মনে করে, সঙ্গে নিজেদের সর্বজ্ঞানী এবং সম্পূর্ণ সাধুপুরুষ বলেও ভাবে।

    বাস্তবে এমনটা হয় না।


    ক্ষমতার বালাই


    সর্বকালে, সর্বত্র – ক্ষমতা যাদের হাতে, তারা ক্ষমতাহীনদের ভালোমন্দের ব্যাপারে উদাসীন; তাদের একমাত্র লাগাম টেনে রাখে ‘ভয়’। কথাটা খুব কর্কশ শোনাতে পারে। ভালো মানুষেরা অন্যদের ওপরে এক বিশেষ সীমা লঙ্ঘন করে অত্যাচার করবে না – এমনটা বলা যেতেই পারে। বলা হয়তো যায়, কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। নিজেদের সুখে রাখতে ঠিক কতটা নির্যাতন চালানো হচ্ছে – সে কথা ভালো মানুষেরা দিব্যি না জেনে, বা না জানার ভান করে থাকতে পারে।



    উইলিয়ম ল্যাম, মেলবোর্নের ২য় ভাইকাউন্ট, সূত্র: উইকিমিডিয়া


    রানী ভিক্টোরিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, লর্ড মেলবোর্ন ছিলেন এইরকমই একজন ভালো মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে মনোহর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। রুচিসম্পন্ন, লেখাপড়া জানা, মানবিক এবং উদারপন্থী। ও হ্যাঁ, বেশ ধনীও ছিলেন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে কয়লাখনির অন্ধকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেটে তাঁর সম্পত্তির জোগান দিত। ওইসব শিশুদের যন্ত্রণাই ছিল তাঁর শহুরে জীবনের জিয়নকাঠি। তিনি যে ব্যতিক্রম ছিলেন, এমন নয় কিন্তু! কম্যুনিজ়মের উৎসসন্ধানে গেলেও এর তুল্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। এঙ্গেলস-এর খয়রাতের ওপরে নির্ভর করতেন মার্ক্স, আর এঙ্গেলস জীবনধারণ করতেন ক্ষুধার্ত চল্লিশের দশকের ম্যানচেস্টারের সর্বহারাদের শোষণের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। ইংরেজ ক্লাসিসিস্টরা ব্রিটিশ উচ্চবর্ণের যুবকদের আদর্শ হিসেবে যাদের খাড়া করেছেন, প্লেটো-র ‘কথোপকথন’-এর সেই ঝকঝকে যুবকরা বেঁচে থাকতো দাসশ্রম আর ক্ষণস্থায়ী এথেনীয় সাম্রাজ্যের শোষণের ওপর নির্ভর করে। যে অবিচার আমাদের পক্ষে লাভজনক, তাকে সর্বদাই কোনো না কোনো কথার মারপ্যাঁচে (sophistry) জায়েজ় বলে দেখানো সম্ভব।



    কাঁটাতারে ঘেরা কেনিয়াবাসী, মাউ-মাউদের তত্ত্বতালাশের জন্যে আটক, সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা


    মাউ-মাউ হিংসার নারকীয়তায় [৭] মানুষ ন্যায্যতই আতঙ্কিত, কিন্তু হাতে গোনা মানুষও কি ভেবে দেখেছেন – শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্রীতদাসপ্রথা ও দাসব্যাবসার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গরা কালো মানুষদের ওপর যে হিংসার বোঝা চাপিয়েছে, এই গোটা আন্দোলনকে হিসেবে ধরলেও তার এক সহস্রাংশও হবে না? ব্রিস্টল শহরে বাস করেন উচ্চতম নৈতিক আদর্শের অধিকারী বহু বিত্তশালী ব্যক্তি, কিন্তু সেই সম্পদের অধিকাংশ আদতে দাসব্যাবসার ফলাফল। স্তালিন যখন ‘যৌথীকরণ’ (collectivization) প্রবর্তন করছিলেন [৮], তাঁকে চাষীদের কড়া বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এই বিরোধিতার মোকাবিলায় তিনি এত নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিলেন, যা গণতান্ত্রিক সরকারে অসম্ভব। তাঁর কারণে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ চাষী অনাহারে মৃত্যুবরণ করে, আর আরও বহু লক্ষ মানুষকে তিনি উত্তরের শ্রমশিবিরে সরিয়ে দেন। এ সমস্তই করা হয়েছিল ‘বিজ্ঞানসম্মত কৃষিকাজ’ (scientific agriculture)-এর নাম করে।



    ১৮২৯ সালে জর্জ ক্রুকশ্যাঙ্কের খোদাই, ‘London going out of Town, or The March of Bricks & Mortar’, ইট-কাঠ-পাথরের দল গ্রামাঞ্চল অধিকার করে লন্ডনের সম্প্রসারণ অভিযান চালাচ্ছে। সূত্র: উইকিমিডিয়া


    কিছু সংক্ষিপ্ত পরিসরে, প্রায় এই জিনিসই করা হয়েছিল অষ্টাদশ শতকের শেষ আর ঊনবিংশ শতকের শুরুর ইংল্যান্ডে। পার্লামেন্টের দুটি হাউস-ই তখন জমিদার অভিজাতদের প্রতিনিধিত্ব করতো; তারা ‘জমি ঘেরাও আইন’ (Enclosure Act) প্রবর্তন করার মাধ্যমে সাধারণ জমি চাষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্ররা যে অধিকার উপভোগ করতো – তা কেড়ে নেয়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলের জনসংখ্যা কীভাবে কমে গিয়েছিল, তার জ্বলন্ত ছবি ধরা আছে গোল্ডস্মিথের ‘The Deserted Village’ কবিতায়। গ্রামীণ জনতা শহরে পরিযায়ী হতে বাধ্য হয়, যেখানে উদয়াস্ত খেটে আর আধপেটা মজুরি নিয়ে তারা শিল্পবিপ্লবের প্রসার সুনিশ্চিত করে। কেবল প্রাপ্তবয়স্করা নয়, শিশুদেরও এই দীর্ঘসময়ের শ্রম দিতে হত। কারখানাগুলোয় ছোট ছেলেমেয়েদের দিনে বারো ঘণ্টা বা তারও বেশি পরিশ্রম করতে হত, যেখানে ঘনঘন, কাজের মাঝেই তাদের ক্লান্ত ঘুমন্ত দেহ যন্ত্রের ভিতরে গড়িয়ে গিয়ে থেঁতলে, পিষে যেত।



    ১৯৩১-এর প্রোপাগান্ডা পোস্টার: “কলখোজ়নিক, বইটা পড়ো! এই বইয়ে তোমায় দ্বিতীয় বলশেভিক বসন্তের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করবে।” সূত্র: উইকিমিডিয়া


    স্তালিনের নৃশংসতায় আমাদের আতঙ্ক বোধ করারই কথা, কিন্তু সুযোগ পেলে আমরা এর থেকে ভালো কিছু করতাম – এমন ভাবা সম্পূর্ণ ভুল হবে। গণতন্ত্রই আমাদের ‘ভালো’ করে তোলে। ইংরেজ উচ্চশ্রেণীর হাতে যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার মৌরসীপাট্টা ছিল, তারাও স্তালিনের মতোই খারাপ ছিল। গণতন্ত্রের প্রধান মূল্য – এই ধরনের বিরাট মাপের অনাচার সে রোধ করে; এইটেই তার প্রথম এবং সর্বোত্তম গুণ।


    গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা


    তবে তা ছাড়াও, আরও কিছু সামান্য কম গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী আছে গণতন্ত্রের। গণতন্ত্র আমাদের বৌদ্ধিক স্বাধীনতাকে এতদূর নিয়ে যেতে দেয়, যা কোনো স্বৈরাচারী শাসনে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রভুদের জ্ঞান ও চরিত্রের মহিমা নিয়ে সামান্যও সন্দেহ তৈরি করতে পারে – এমন কোনো সাহিত্য প্রকাশের অনুমতি আজকের রাশিয়ায় নেই (১৯৫৩-য় লেখা)। তাঁদের ক্ষমতা মাত্রা ছাড়িয়েছে – এমন সমস্ত ইঙ্গিতকে স্বৈরাচারী নৃপতিরা চিরকাল যত-দূর-সম্ভব দমন করে এসেছেন। এই প্রেক্ষিতে চার্চও কম যায় না।

    ধর্মতত্ত্ব নিয়ে কোনো তর্কে ঢোকার আমার ইচ্ছে নেই, তবে ষোড়শ শতকে প্রোটেস্টান্টদের চাপানো ধর্মতত্ত্বের নতুন উদ্ভাবনগুলি নিয়ে কেউ যদি একবারও মাথা ঘামাতে চায়, তবে সে দেখতে পাবে – এদের প্রতিটির উদ্দেশ্য ছিল পাদ্রিদের আয় কমানো। ক্যাথলিক চার্চ যে স্তরে বিধর্মী-বিরোধিতা করে এসেছে, তার সঙ্গে এই নতুন নিয়মাবলীর কোনো সম্পর্ক নেই – এমন যদি ভাবো, তবে আমার মতে, মানবচরিত্র সম্পর্কে আমরা যা জানি, তুমি তার উলটোসুরে গাইছো।

    এই খ্রিস্টীয় ধর্মগুরুরা বহু হাজার মানুষকে খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মেরেছে – কোনো সন্দেহ নেই, তখন তাদের নিজেদের মনে তারা খুব প্রশংসনীয় কাজই করছিল। এই মর্মে, তাদের, স্তালিন আর ‘ঘেরাও আইন’ পাশ করা ব্রিটিশ জমিদারদের মধ্যে তেমন তফাৎ নেই, কিন্তু বাকি সব এক থাকলেও, যে উন্মত্ত ক্রোধ নিয়ে এই কাজ তারা চালিয়েছিল, তার মধ্যে—অবচেতনে সুপ্ত হলেও—এক অহংবোধ জড়িয়েছিল। গণতন্ত্রে কি আর নির্যাতন হয় না? হয়, তবে তা শুধুই কোনো ক্ষুদ্র প্রান্তিক শ্রেণীর ওপর। নিউ ইংল্যান্ডে (আমেরিকা) কোয়েকাররা নিপীড়নের শিকার হয়েছিল [৯], তবে অল্প সময়ের জন্যে। বহুগামিতা দেখে বিশালসংখ্যক সংখ্যাগুরু জনতা চমকে উঠেছিল বলে ঊনবিংশ শতকে মর্মনদের ওপরও অত্যাচার হয় [১০]। কিন্তু এক্ষেত্রেও সে নির্যাতন অল্প সময়-ব্যাপী। অগণতান্ত্রিক শাসনে কিন্তু এই ধরনের অনাচার শতকের পর শতক চলতে পারে। জ়ারের সময়ের রাশিয়ায় ‘ওল্ড বিলিভার’-দের (যারা রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের অনুগামী) ওপর কখনো বেশি, কখনো কম অত্যাচার চলেছে বিপ্লব হওয়া অবধি। বিপ্লবের সময় থেকে শুরু করে স্তালিনের মৃত্যু পর্যন্ত, সনাতনী কম্যুনিস্ট ভাবধারা থেকে প্রতিটি বিচ্যুতির—তা সে যত সামান্যই হোক না কেন—সম্ভাব্য শাস্তি ছিল – হয় মৃত্যু, নয় আজীবন অত্যাচার।


    গণতন্ত্র ও যুদ্ধ


    গণতন্ত্রের আরেকটা সুবিধে – একনায়কতন্ত্রের তুলনায় এই শাসন অপেক্ষাকৃত কম যুদ্ধবাজ। যুদ্ধ থেকে যতটুকু লাভ হয়, তা শুধুই বিজয়ীদের হর্তাকর্তাদের কপালে জোটে। ক্ষতি যা হয় – সাধারণ মানুষের। আমার কোনো সন্দেহ নেই – এই মুহূর্তে যদি রাশিয়ার জনসাধারণের ইচ্ছে বাস্তবায়িত হয়, তবে পূর্ব ও পশ্চিম পৃথিবীর মধ্যে আসন্ন যুদ্ধের সম্ভাবনাটির পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটবে।

    একবার ভেবে দেখুন তো – রাশিয়া সরকারের ঠিক কোন উদ্দেশ্যগুলি তাকে পশ্চিমের কাছে এত আতঙ্কের ব্যাপার করে তুলেছে? উলটোটাও ভেবে দেখুন। দেখবেন, এই কারণগুলি রকমারি। প্রথমত, উভয়পক্ষেই একটি করে অন্ধবিশ্বাস আছে, যা তারা ছড়িয়ে দিতে চায়। দ্বিতীয়ত, আছে বিজয়গৌরবের সম্ভাবনা। আর, এই দুইয়ের থেকেই বেশি জোরালো যা আছে – তীব্র ক্ষমতালিপ্সা। এসব উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের মনে যতটা না থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশিমাত্রায় বাসা বাঁধে প্রথিতযশা প্রশাসকদের চিন্তায়। তাই, যেখানে সাধারণ নরনারীর হাতে ক্ষমতা থাকে, সেখানে যুদ্ধপন্থী নীতি অবলম্বনের সম্ভাবনা যেকোনো স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে কম।

    গণতন্ত্রমাত্রই যুদ্ধবিরোধী – একথা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, আমার মনে হয়, একনায়কতন্ত্রের তুলনায় গণতন্ত্রগুলির লড়াই-ক্ষ্যাপা হওয়ার প্রবণতা কম।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দায় কীভাবে ভাগ করা যায় – এই প্রশ্নটি এখনো কমবেশি বিতর্কের সৃষ্টি করে, তবে মনে হয় সকলেই একটি ব্যাপারে একমত, যে, দায়ের সিংহভাগের মালিক সমানভাবে তিনটি সাম্রাজ্য – জার্মানি, অস্ট্রিয়া আর রাশিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবে গোটা দোষটাই এসে পড়ে হিটলারের ঘাড়ে, যার শাসনকে গণতন্ত্রের ঠিক উলটো বলা যেতে পারে। যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধে—খোদার কসম, না হয় যেন—সে যে স্ফুলিঙ্গ থেকেই সেই বিস্ফোরণ হোক না কেন, ১৯৪৫ থেকে রাশিয়া যে প্রতিকূল আর উদ্ধত নীতির চর্চা করছে, সেটাই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হবে – এটুকু পরিষ্কার। অতএব, এই দাবিটুকু নির্ঘাত করাই যায়, যে, অন্য সব সরকারের তুলনায় গণতন্ত্রে লাভ এই, যে সেখানে শান্তিপ্রেমের পরিমাণ বেশি।

    গণতন্ত্রের আরেকটা বড় গুণ হল – যুদ্ধের সময় সে অনেক বেশি শক্তির জোগান দেয়, যদিও ঘনঘনই এর উলটো কথাটিই প্রচার করা হয়। যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে হয়তো কথাটা সত্য নয়, বিশেষ করে যদি সেই সময়কালে স্বৈরতন্ত্র কিছু প্রাথমিক জয়লাভ করে ফেলে। কিন্তু লম্বা রেসের ক্ষেত্রে কথাটা ঠিক। গত ২৫০ বছরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের খতিয়ান নেওয়ার কষ্টটা যদি কেউ একবার করে, সে দেখবে – যুযুধান পক্ষগুলির মধ্যে যারা গণতন্ত্রের সবচেয়ে কাছাকাছি গেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে তারাই বিজয়ী।

    এর প্রধান কারণ আমি মনে করি দুটি: প্রথমত, যুদ্ধরত গণতন্ত্র মনে করে – তার নিজের আত্মসম্মান আর অহমিকা এই যুদ্ধে জড়িত, উলটোদিকে কোনো স্বৈরাচারী বা একচ্ছত্রাধিপতির কোঁৎকা খেয়ে যুদ্ধে যেতে হলে সে পক্ষের আর ততটা দায় থাকে না, তাই উদ্যমও থাকে কম। অন্য কারণটা হল, গণতান্ত্রিক সরকারকে সমালোচনার জবাব দিতে হয়, আর তাই বেমালুম অপদার্থতা সমর্থন করা যতটা কঠিন, বিচক্ষণ উদ্যমের বিরোধিতাও ঠিক ততটাই।

    যে অগণতান্ত্রিক ঠগ বাছার কাজে কিছু মার্কিন নাগরিক এখন উঠেপড়ে লেগেছেন, তার সবচেয়ে বড় গাফিলতি হল – এর মাধ্যমে, একদিকে বিজ্ঞানের জগতের নামকরা চরিত্র, অন্যদিকে চিনা-লবির গাত্রদাহ করতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষজন – এই দুইপক্ষই জনগণের ভালোর জন্যে কাজ করার ক্ষমতা হারাচ্ছে [১১]। তবে, যেভাবেই হোক, এই ঠগ বাছার তুঙ্গে থাকার সময়েও মার্কিন বিশেষজ্ঞদের ভাবপ্রকাশ আর কাজের যতটা স্বাধীনতা আছে, রাশিয়ায় সেটুকুও নেই। আমরা আশা করতেই পারি – সমরাস্ত্রের প্রযুক্তিগত শীর্ষে অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক পক্ষটিই আরোহণ করুক, কিন্তু স্বীকার করি, তেমনটি হওয়ার সপক্ষে বিশেষ সাবুদ পাওয়া যাচ্ছে না।



    [চলবে…]


    [৭] ইংরেজ ঔপনিবেশিক নীতি, তার চালু ফর্মুলা মেনে, কেনিয়ায় এক শতকেরও বেশি সময় ধরে আদি অধিবাসীদের জমিহারা করে সে জমি ইংরেজ নাগরিকদের হাতে তুলে দেয়।

    “এই দেশের সম্পদের অধিকাংশ এখন আমাদের করায়ত্ত ... এই যে নতুন জমি পেয়েছি আমরা, এ জমিতে আমাদেরই অধিকার – দখল করেই পেয়েছি এ অধিকার।”
    — ৩০ নভেম্বর ১৯৪৬, ইংরেজ সহকারী ঔপনিবেশিক রাজ্যপালের বক্তৃতা।

    কেনিয়ার জনতা, বিশেষ করে কিকুয়্যু জনজাতির লোকজন বাস্তুহারা তো হয়ই, কঠিন শ্রম ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। আবেদন-নিবেদনের রাজনীতিতে কোনো ফল না হওয়ায় ১৯৪০ নাগাদ ‘মাউ-মাউ’ সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়। কোনো কেন্দ্রীয় পরিচালন ছিল না, গেরিলা যুদ্ধ চলে। ১৯৫২-য় ব্রিটিশ সরকার হাজারে হাজারে সৈন্য নামায় কেনিয়ায়। অত্যাচার, ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে নারকীয় অবস্থা তৈরি করা – ফর্মুলা তখনও নিখুঁত। সারা পৃথিবী থেকেই মানবাধিকার কর্মী ও ঔপনিবেশিকতার বিরোধীদের প্রতিবাদ আসে, কিন্তু ব্রিটিশ মিডিয়ায় সে কথা কম, বরং কেনিয়ার কালো মানুষেরা কেমন করে সহ-ব্রিটিশ নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে – তার খবরই একটু বেশি হত। এ সত্ত্বেও সুবুদ্ধিসম্পন্ন লোকজন সরকারে নীতির বিরোধিতা করে। এ লেখা তারই এক উদাহরণ। হাওয়া ঘোরে। সময় লেগেছিল, কিন্তু ষাটের দশকে কেনিয়ার স্বাধীনতালাভ সম্পূর্ণ হয়।

    [৮] না, কো-অপারেটিভ নয়। চাষীদের থেকে জমি নিয়ে তাদের জুড়ে দিয়ে ‘কলখোজ়ি’ বানিয়ে সরাসরি সরকার তার পরিচালনা করবে (যেসব ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত ছিল, সে ছিল নামেমাত্র)। পদ্ধতিটি কতটা ভালো বা মন্দ তা বিচার্য নয়, পদ্ধতির প্রয়োগটি সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ছিল আর অধিকতর ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের মতের বিরুদ্ধে ছিল -- সেটাই লেখার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

    [৯] সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের সময়ে বহু মানুষই চার্চের ভণ্ডামিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিজস্ব আধ্যাত্মিক উত্তরণের রাস্তা খুঁজছিল। সেসময় যত গোষ্ঠী তৈরি হয়, তাদের একটি – ‘বন্ধুসমাজ’ (Society of Friends)। ধর্মদ্রোহের অভিযোগে প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ফক্স-কে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিয়ে আসলে তিনি নাকি বিচরককে বলেছিলেন, “[You’ll] quake before the authority of God.” এরপর থেকে তাঁদের কোয়েকার বলে ডাকা শুরু হয়। এর পর উত্তর আমেরিকার বস্টনে প্রচার শুরু করলে, কোয়েকার প্রচারকদের ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়, চারজনকে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়। এর পরেই অধিকাংশ কোয়েকার বর্তমান নিউ জার্সি অঞ্চলে নিজেদের কার্যকলাপ সীমাবদ্ধ করেন, সমাজে গৃহীত হন, ক্ষমতাও লাভ করেন।

    [১০] মর্মন-দের নিয়ে হাজার পাতা লেখা যায়, এতই উদ্ভট খ্রিস্টধর্মের এই অবাধ্য শাখাটি। এখানে তার একটিই ব্যাপার প্রাসঙ্গিক – বহুগামিতার সঙ্গে মর্মনদের সম্পর্ক। মর্মনদের অনেক ভাগ। তার মধ্যে সর্বৃহৎটির নাম ‘Church of Jesus Christ and the Latter-Day Saints’ (CJCLDS বা সংক্ষেপে LDS)। আমেরিকার নানা জায়গায় বিরোধিতার পরে এঁরা ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি বর্তমান ইউটা (Utah) অঞ্চলে থানা গাড়েন। এঁদের বক্তব্য বহুবিবাহ (নিন্দুকদের মতে বহুগামিতা) ধর্মগ্রন্থ-স্বীকৃত। ভ্যাপার এতদূর গড়ায়, যে, কংগ্রেস ঘোষণা করে – এই প্রথা অবলুপ্ত না করলে LDS ধর্মীয় সংস্থা এবং ইউটা-কে অঙ্গরাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হবে না। ১৮৯০ সালে LDS আনুষ্ঠানিকভাবে বহুগামিতা পরিত্যাগ করলে, দুইই হয়, কিন্তু বেশ কিছু গোঁড়া মর্মন টুকরো মূলধারা থেকে আলাদা হয়ে যায়।

    [১১] China Lobby বলতে বোঝানো হয়েছে সেই গোষ্ঠীর কথা, যারা চিনের কম্যুনিস্ট শাসনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ভয়ানক বিরোধী, বদলে চাং-কাই-শেক-এর জাতীয়তাবাদী দলটির সমর্থন করতো। হাজার হাজার মার্কিন নাগরিককে কম্যুনিস্ট বা কম্যুনিস্ট-প্রেমী দাগিয়ে, তাদের ব্ল্যাক-লিস্ট করে জীবন-জীবিকা নষ্ট করাকে সংক্ষেপে ম্যাকার্থিইজ়ম (সেনেটর জোসেফ ম্যাকার্থি-র নামে) বলে ডাকা হত, তবে এখন তাকে জে এডগার হুভার-এর নামে হুভারিজ়ম বলে ডাকাই দস্তুর।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব
  • ধারাবাহিক | ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ৫০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন