

অলংকরণ: রমিত
ধরুন, আপনি স্কেচ করেন। ছোট্ট কাগজে কয়েকটা আঁচড় কেটে বোঝালেন – মেঘ, কুঁড়েঘর, গাছপালা, ঝোপ। মেরেকেটে ২ মিনিট লাগলো। এবারে, সেই ঝোপের সামনে বসে তার একখানা ফুল গুছিয়ে আঁকতে গিয়ে, শুধু আলো-ছায়ার খেলা ফোটাতেই তার দশগুণ সময় লাগলো। অথচ, দুটো দেখেই দর্শক ঠিক চিনতে পারে – কী এঁকেছেন। ওই যে ছোট্ট ছবির কয়েকটা আঁচড়, ও-ই হল তার মূল অবয়ব। আরো কাছে এসে দেখলে, তার জটিল খুঁটিনাটি ধরা পড়ে। তারা হয়তো আকারে ছোট, কিন্তু কালি-কাগজে ফুটিয়ে তুলতে হিমশিম খেতে হয়। শুধু যে সময় বেশি লাগে তা-ই নয়, যে কায়দা অবলম্বন করতে হয়, যেভাবে আঁকতে হয় – তা আগের ছবির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
রাজনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাসের তত্ত্ব – এসব বুঝতে গেলেই এই মাইক্রো (ছোট) বনাম ম্যাক্রো (বড়) বিস্তারের সমস্যাটা হয়। একটু ইতিহাসের চর্চা করলেই বোঝা যায়, বিষয়টি ফ্র্যাক্টাল ধরনের। আকবর বাদশা নিয়ে দশ লাইনের টীকা-ও লেখা যায়, ওদিকে হয়তো তেনার প্রবর্তিত কোনো এক আইনের শুরু, শেষ, ফলাফল, অভিঘাত – এসব নিয়ে দেখলেন কোনো একজন বছরদশেক কাটিয়ে দিয়েছে। এতশত করার পরে, কেউ যদি তাকে এসে একদিন প্রশ্ন করে: “আকবর ভালো ছিলেন, না মন্দ?”, আর দুটি বিকল্পের একটিতে টিক দিতে বাধ্য করে, তবে তার এতদিনের চর্চা সে রাখে কোথায়?
মাসের পর মাস রাজনৈতিক তত্ত্বালোচনার পর নির্বাচনের দিন বোতাম টেপা হল সেইরকম এক গন্ডগোলের কাজ। রাখবেন কাকে? ছাড়বেনই বা কোনটি? খুঁটিয়ে দেখলে সব দলের ছবিই ছেঁড়া, ভুল তুলির আঁচড়ে ভরা, পেনসিলের শেড বর্ডার পেরিয়েছে। কারুর অর্থনীতি গোলমেলে, তো কারুর সমাজচেতনা। কেউ শিক্ষায় দুর্নীতি করে, তো কেউ যুদ্ধবাজ। বাস্তবে তাই আপোশ করতে হয় সকলকেই।
সকলেই যদি আপোশমুখো, সবাই যদি অসুখী, তাহলে কেন এত উত্তেজনা? কীসের এত রণরঙ্গ? তার চেয়েও বড় কথা – এমন কোনো ছবিই কি নেই, যা মোটে ছবিই হয়নি? এমন কোনো রাজনীতি, যা এক্কেবারে ভুল? এর উত্তর কোনো বিজ্ঞানের পড়ুয়ার পক্ষে দেওয়া অসম্ভব, কারণ, ‘ভুল‘ ঘোষণার জন্যে যে পদ্ধতির প্রয়োগ সে করতে শিখেছে, তা এখানে চলে না। তেমন কোনো নীতিমালা নেই। সমাজনীতি, পার্টি লাইন, গোষ্ঠীস্বার্থ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মিডিয়া-হুজুগ – সবকিছুর মিশেলে এক প্রবল ঘোল তৈরি হয়, যা জনতা জনার্দন গিলতে বাধ্য হয়। তাই লিগের নক-আউট খেলার উত্তেজনার সঙ্গে তাল দেয় কিছু উচ্চারিত, কিন্তু অনুচ্চকিত প্রশ্ন – এই সংসদীয় গণতন্ত্র কি আদৌ ঠিক রাস্তা?
এ প্রশ্নের গভীরে না গিয়ে, যদি ধরে নিই এটিই আমাদের পথ, তবে প্রথম প্রশ্ন দাঁড়ায়: আপোশ পরে হবে, আগে ঠিক করি – কোন কোন মূল নীতির সঙ্গে আপোশ অসম্ভব। এইখানে এসেই দেখবেন, অনেক মানুষ আর আপনার সঙ্গে নেই। তাঁরা কোনো নীতি নয়, ব্যক্তি/গোষ্ঠীগত স্বার্থ বুঝে নির্বাচনে অংশ নেন। এই লেখায় ধরে নেবো, আপনি তাদের থেকে হয় বেশি শিক্ষিত, নয় বেশি প্রিভিলেজড।
এমন কোনো নীতিমালা কি সম্ভব, যা পালন করে কিছু দলকে প্রথমেই বিকল্প হিসেবে খারিজ করে দেওয়া যায়? সাইনাই পর্বত থেকে মোজ়েস যা লিখে এনেছিলেন, তেমন নৈতিক সহজপাঠের কথা বলছি না। তা ব্যক্তির জন্যে প্রযোজ্য ছিল। ‘খুন কোরো না’-ও যদি কম্যান্ডমেন্ট পড়ে শিখতে হয়, তবে আর কথা বাড়িয়ে কী লাভ? আমি বলছি সেই সাধারণ জমিটুকুর কথা, যার ওপর দাঁড়িয়ে সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্ক সম্ভব। সেইটুকু, যা নিয়ে বিবদমান পক্ষগুলির কারুর মনে কোনো সন্দেহ থাকবে না। কেউ বলতে পারবে না, “ওসব কথা শুনতে ভালো, কিন্তু বাস্তবে আসলে এইরকম হয়...”। এক কথায়, রাজনীতির 'সূত্র' নেই কোনো?
অনেক ভেবে, তিনটে সূত্র পেয়েছি – যার ওপর ভর করে বেশ কিছু ধরনের রাজনীতি ছুঁড়ে ফেলা সম্ভব। বেশ কিছু ধরনের বক্তব্য শুরু হওয়ামাত্র থামিয়ে দেওয়া যায়। কোনোটিই আমার নয়, আর সবকটিই আপনি জানেন – আগে এভাবে পড়ুন বা না পড়ুন (ভালো সূত্র যেমন হয় আর কি...)।
১) পেরিয়ার-এর সূত্র:
‘কোনোমতেই শোষণ সমর্থন করবো না।’
পেরিয়ারের আসল উদ্ধৃতিটি হল – “বড় দেশ ছোট দেশকে নিপীড়ন করলে, আমি ছোট দেশের পাশে দাঁড়াব। সেই ছোট দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুদের ওপর ধর্মের নামে অত্যাচার করলে, আমি সংখ্যালঘুদের পক্ষ নেব। সংখ্যালঘু ধর্মে যদি এক জাত অন্য জাতকে শোষণ করে, তবে আমি শোষিত জাতের পাশে থাকব। সেই শোষিত জাতের মধ্যে কোনো মালিক তার কর্মচারীকে অত্যাচার করলে, আমি কর্মচারীর পক্ষে দাঁড়াব। সেই কর্মচারী বাড়ি ফিরে স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালালে, আমি ওই নারীর পাশে দাঁড়াব। এককথায়, নিপীড়নই আমার শত্রু।”
এ সূত্র আপনাকে পক্ষ নিতে সাহায্য করবে (জ্ঞানীরা যতই অ্যানার্কিজ়ম বনাম মার্ক্সিজ়মের লড়াই ইত্যাদি বলে বিভ্রান্ত করুক, কোনো মতবাদ নিয়ে বাদানুবাদের আগেই এই নীতিটি আসে)।
একজনের হয়ে গলা ফাটালেন; তারপর সে খুব খারাপ কিছু করলো, বা নিজের স্বার্থে অন্য কারুর শোষণ সমর্থন করলো; আপনি বিরোধিতা করলেন – ব্যস, অন্য দলের কেউ এসে বলতে শুরু করলো – ‘কেন রে? খুব তো নাকি পছন্দ?’ হতেই পারে, আপনি নিজেও গিয়ে কাউকে এমনধারা কথা বলে এসেছেন। যা দিনকাল, কে যে বাস্তব বুঝে সমর্থন বদলেছে, আর কে যে শুভেন্দু অধিকারী – এ বোঝা কঠিন। কিন্তু সৌজন্য নির্দেশ করে – প্রমাণ না থাকলে, যে মত বদলায়, তার পিছনের সৎ কারণটি দেখুন, কন্সপিরেসি থিয়োরি না। নীতি ঠিক রেখে, সমর্থন বদলাতে ভয় পাবেন না। ব্যক্তি নয়, নীতি।
এ পথেও কিছু খানাখন্দ আছে। নীতি বদলাবেন কখন? যদি সে নীতি বাঁধানো বড়রাস্তাও হয়, আপনার অভীষ্ট গন্তব্যের দিকে যায় তো ঠিক? তখন নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়, এ পথ কেন নিয়েছিলাম? খুব প্রভাবশালী কেউ বলেছিল বলে? নাকি এর থেকে শ্রেয় কোনো বিকল্প ছিল না বলে? প্রথম সম্ভাবনাটি ঠিক হলে, আরো অগণন মানুষের মতো আপনাকেও দিকনির্দেশ করবেন গৌতম,
“যেখানেই পড়ে থাকো, বা যে-ই বলে থাকুক—এমনকি যদি আমিও বলে থাকি—নিজের যুক্তিবুদ্ধি আর সাধারণ জ্ঞান দিয়ে না আঁচিয়ে কোনোকিছুই বিশ্বাস করবে না।”
যদি দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি সত্য হয়, তবে আরেকটি দীর্ঘ উদ্ধৃতির সাহায্য নেওয়া যাক:
"অভিযোগ – আমার নাকি নিজের দার্শনিক মতামত বদলানোর অভ্যেস আছে... আমি নিজে, আমার মত বদলের জন্য মোটেই লজ্জিত নই। এমন কোনো একজন পদার্থবিদকেও কি দেখাতে পারবেন, যিনি ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সক্রিয় ছিলেন এবং গর্ব করে বলতে পারেন – তাঁর মতামত গত অর্ধ-শতকে বদলায়নি? নতুন তথ্য বা জ্ঞান সামনে এসে পড়লে বিজ্ঞানী তাঁর মতামত পরিবর্তন করেন; অথচ, অনেকেরই ধারণা— দর্শন আসলে বিজ্ঞান নয়, শাস্ত্র।
যখন কেউই, কিচ্ছুই জানে না—তখন তো মত পরিবর্তনের কোনো মানেই নেই! কিন্তু আমি যে দর্শনকে গুরুত্ব দিই,অনুসরণ করার চেষ্টা করি – তা এক অর্থে বিজ্ঞান; এই অর্থে, যে, তাতে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ‘জানা’ সম্ভব এবং নতুন তথ্য আবিষ্কার হওয়ামাত্র, যেকোনো অকপট, সহজ মানুষের পক্ষে তার পুরোনো ভুল স্বীকার করাই স্বাভাবিক। বহুকাল আগে হোক বা সম্প্রতি, আমি যা-ই বলে থাকি না কেন – ধর্মতত্ত্ববিদরা যে ভঙ্গিতে তাঁদের মতামতকে সত্য বলে দাবি করেন, আমি তা করি না।
খুব বেশি হলে আমার দাবি এইটুকুই – যখন মতটি প্রকাশ করা হয়েছিল, সেই সময়ে সেই মতামত পোষণ করাই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ছিল।
ভবিষ্যত গবেষণায় যদি এই মতের সংশোধনের বিশেষ প্রয়োজন না দেখা যায়—তা হলেই বরং আমার খুব অবাক হওয়ার কথা। অতএব, আমার আশা, যিনিই [এই বইটি] পড়বেন, তিনি এর উক্তিগুলোকে দেবতা/ধর্মগুরুর বাণীর মত মেনে না নিয়ে, ধরে নেবেন এগুলি, স্পষ্ট এবং নির্ভুল চিন্তার প্রসারের উদ্দেশ্যে আমার পক্ষে সেই মুহূর্তে যতটা সম্ভব ছিল, ঠিক ততটাই সত্য।..."
Dictionary of Mind, Matter and Morals (1952) বইটির ভূমিকায় এ কথা লিখেছেন বার্ট্রান্ড রাসেল।
বেশ, রাসেলদাদু যখন এসেই পড়লেন, তখন দ্বিতীয় সূত্রে যাওয়া যাক।
২) রাসেলের সূত্র:
‘ভালোবাসার পথই বিচক্ষণের পথ, ঘৃণার রাস্তা নির্বোধের।’
১৯৫৯ সালে বিবিসি-র Face to Face অনুষ্ঠানে রাসেলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আজ থেকে হাজার বছর পরে জন্মানো কাউকে তিনি কী উপদেশ দেবেন। রাসেল দুটি কথা বলেছিলেন, প্রথমটি বৌদ্ধিক শিক্ষা, আর দ্বিতীয়টি নৈতিক। এই সূত্রটি ওই নৈতিক শিক্ষাটুকু।
এর ব্যাখ্যা একদিকে খুব সহজ, অন্যভাবে দেখলে বেজায় কঠিন। একদিকে প্রেমের বুলি দিচ্ছেন, ওদিকে সীমান্তে ক-জন সাধারণ মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন। ত্যাঁদড় বন্ধু এসে বললো, ‘কলসির কানা নয় রে, কালাশনিকভের গুলি – এখনো প্রেম বিলোবি?’ কী বলবেন? উত্তর আছে। নিজের পরিবার, প্রিয়জন, পাড়া, সমাজ, রাজ্য, রাষ্ট্র, প্রতিবেশী, প্রজাতি, পরিবেশ – রক্ষার্থে যদি লড়াই হয়, তবে তা ওইগুলির প্রতি ভালোবাসা থেকেই। এ কথা শিশুরাও বোঝে। কিন্তু গোলমাল বাধে, যখন যুক্তিকে পেঁচিয়ে, ‘জাতি’ বা ‘গোষ্ঠী’-স্বার্থের অজুহাতে যুদ্ধকে জায়েজ় প্রমাণ করার চেষ্টা হয়। offence যখন প্রাণহানি, অন্যের জমি/সংস্কৃতি/জীবিকা দখল, তখন তা best defence নয়। তৃতীয় রাইখ যখন বলেছিল, জার্মান জনগণের সুবিধার্থে আশপাশের দেশগুলি দখল করতে হবে (লেবেনশ্রাউম), তখন তারা এ নীতি লঙ্ঘন করেছিল। এই একই কারণে, গাজ়া দখলে ইজ্রায়েলকে সমর্থন করা যায় না। ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, মায় নাগরিকত্ব – কোনো কিছুর অজুহাতেই একদল মানুষকে একঘরে করা যায় না, সে তার যে নামই দাও – কন্সেনট্রেশন ক্যাম্প, ডিটেনশন ক্যাম্প, NRC বা 'অবৈধ' বস্তি। আসাম যখন ভূমিপুত্রের ডাক দেয়, ভারত যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে তার নাগরিকদের উদ্ধার করে, আদিবাসী যখন তার জঙ্গল বাঁচানোর জন্যে কোম্পানি বা সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয়, তা ঘৃণা থেকে শুরু হয় না, কিন্তু মানবচরিত্র মেনে ঘৃণায় শেষ হতেই পারে। লড়াইকে সমর্থন করার সময় তার উদ্দিষ্ট কী, সে কথা মনে রাখতে হবে। আগের সূত্রটির কথা মাথায় রেখে, বাংলাপক্ষ যখন বাঙালির সংস্কৃতির টিকিয়ে রাখার কথা বলে, কেউ বাঙালির দোকানে হামলা করলে দাঁত খিঁচিয়ে আটকাতে ছুটে যায়, তখন তাকে সমর্থন করতে হবে, কিন্তু সেই উত্তেজনাই যখন তাল হারিয়ে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানকে চিঠি লিখে হুমকি দেয়, তখন মনে রাখতে হবে, শিবসেনা হওয়ার পথের থেকে তার দূরত্ব খুব কম। উলটোদিকে, ‘জয় সিয়ারাম’ আর ‘জয় শ্রী রাম’ – একরকম শোনালেও, তারা উলটো মেরুর স্লোগান। প্রথমটি সহনশীলতার বাণী, দ্বিতীয়টি ঘৃণার।
কাকে ফ্যাসিবাদ বলে, আর কাকে একনায়কতন্ত্র – এসব না জেনেও, একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যায়, কোন লড়াই অধিকারের, আর কোনটা ঘৃণা/অবজ্ঞাজনিত। হিংসা বা অহিংসা – কোনো পক্ষই না নিলেও, আম্বেদকর না গান্ধী – এ তর্কে না ঢুকেও, গণতন্ত্র না সশস্ত্র বিপ্লব – পক্ষ না নিলেও, এটুকু বোঝাই যায় – লড়াইটা ঘৃণার পক্ষে নয়, বিপক্ষে। আর এই লাইনেই...
৩) পপার-এর সূত্র:
‘সহনশীলতা অসীম নয়। অসহিষ্ণুতার প্রতি কখনোই সহনশীল হওয়া যাবে না।‘
কার্ল পপার তাঁর The Open Society and Its Enemies (1945) বইয়ে Paradox of Tolerance বা সহনশীলতার কূট নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর উদ্ধৃতিটি:
“...তবে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও এদের [অসহিষ্ণু মতাদর্শগুলোকে] দমন করার অধিকার আমাদের দাবি করা উচিত। কারণ তারা হয় আমাদের সঙ্গে যুক্তির মাটিতে আলোচনা করতে তৈরি থাকবে না, বা শুরুতেই সমস্ত যুক্তি খারিজ করবে, অথবা তাদের অনুগামীদের যুক্তিসংগত কথা শুনতেই বারণ করবে। যুক্তিগুলিই আসলে ধোঁকা – এমনও বোঝাতে পারে। আর তাদের শেখাবে – যুক্তির জবাব হল ঘুঁষি বা বন্দুক।”
এইটুকুই লড়াই। যুদ্ধ শুধুই ঘৃণা/অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে। নইলে একবার সুযোগ পেলেই, আজ যে অসহিষ্ণু দল ‘উনি এমন কথা কী করে বললেন?‘ বলে কুমিরের কান্না শুরু করছে, কাল ক্ষমতা পেলে তারা সেটুকু করার অধিকারও আর প্রতিপক্ষকে দেবে না। ওবামার সরকারে পান থেকে চুন খসলে যে দক্ষিণপন্থী মিডিয়া ‘গেল গেল‘ রব তুলতো, ট্রাম্পের সময়ে তার হাজার গুণ অন্যায়েও তারা রা কাড়ে না। যে মুসলিম প্রতিক্রিয়াশীলরা বাংলাদেশে ধর্মের স্বাধীনতার পক্ষ নিত, তারাই ক্ষমতা পেলে কী করতে পারে, জনগণ টের পেয়েছে। যে বিরোধী নেতা, ডক্টর মনমোহন সিং-এর সময়ে তাঁর মৌনতা, মূল্যবৃদ্ধি আর দুর্নীতি নিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করতো, নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে সে আর সাংবাদিক সম্মেলনই করে না; রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে হয় পার্টির পকেটে পোরে, নইলে বেচে দেয়; মূল্যবৃদ্ধি আকাশ ছুঁলেও, ডলারের তুলনায় টাকা পাতালে প্রবেশ করলেও, ‘আচ্ছে দিন‘ ঘোষণা করে।
এই একই কারণে তারা মাত্র একবার, একবারই মাত্র গোটা দেশ বিরোধীশূন্য করতে চায়। কারণ ওই একটিবারই যথেষ্ট, গণতন্ত্রের মূল উপড়ে ফেলার জন্যে। ওই কারণেই এদের মুখও খুলতে দেওয়া যাবে না।
কী করে বুঝবেন – এদের প্রতি অসহিষ্ণু হতে গিয়ে আপনি নিজে সহনশীলতার পথে আছেন কিনা? নিজের অবস্থান আগের দুটি সূত্র দিয়ে ঝালিয়ে নিয়ে।
রাজনীতি এক বিরাট প্রাঙ্গন। সেখানে খেলা অনেকরকম, তাদের নিয়মও রকমারি। এখানে শুধুই আলোচনা হল, সে মাঠে কাদের খেলতে দেবেন না, বা কোনো দলটিকে কখনোই সমর্থন করবেন না – তা নিয়ে। এর পরের স্তরে আসে ‘কাকে সমর্থন করবো?‘ সেই প্রশ্ন। তার সঙ্গেই আসে – দেওয়ালে যাদের পিঠ ঠেকেছে, তারা কী গণের অংশ নয়? অহিংসা যদি আসলে ক্ষমতাকে চাপ দেওয়ার জন্যে এক প্রদর্শন হয়, আর শোষণের বিরুদ্ধে অহিংস অবস্থানের কোনো ক্ষমতাবান দর্শক না থাকে, তবে অস্ত্র হাতে নেওয়া ছাড়া গতি কী? তখন তারা অপরাধী? দর্শক থাকলেই বা। তারা যদি সব দেখেও না দেখার ভান করে, যেমনটি করেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ইজ্রায়েল-বান্ধবরা? প্রতি-হিংসার পথে সমালোচনা আসে, অহিংসায় শুকনো সহমর্মিতা। মানুষ গণহত্যা, জাতিগত নিপীড়ন ঠেকাবে কী উপায়ে? গণতন্ত্রের পক্ষ নিয়ে রাসেলের সওয়াল আগেই অনুবাদ করেছি, কিন্তু ইন্টারনেটোত্তর যুগে তা নিয়ে আরও অনেক আলোচনা-সমালোচনা দরকার।
এ সব পরে হোক। আপাতত একটা সাফাই:
‘রাজনীতি নিয়ে মুখ খোলা আমাদের মতো বোকাদের মানায় না’ – এ আমার বহুদিনের পুরোনো বিশ্বাস—বিশ্বাস ঠিক নয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব। মানায় না, কারণ আজন্ম শিখে এসেছি – যা জানো না, তা নিয়ে ত্যানা পেঁচিও না। গবেষণার কাজেও তাই – না জানলে/বুঝলে, সে কথা লিখে দিতে হয়। অনেক বসন্ত পেরিয়ে, আধা-সরকারি শিক্ষকের চাকরি পেয়ে কাল হল। ও বাবা! “জানি না” বললে সততা/বিনয় বলে কেউ ভালো চোখে তো দেখেই না, অন্য কোনো আরো কম জানা লোক সেই সুযোগে গলা ফাটায়। এখন চুলে পাক অনেক বেশি। তাই, কিস্যু তেমন জানি/বুঝি না – বুঝলেও, লিখেই ফেলবো রাজনীতি নিয়ে। কী আর হবে? কেউ হয়তো ভুল ধরাবে। শিখবো। নইলে, আমারই মতো কেউ হয়তো পড়ে ভাববে, বাঃ, এই তো, মানে বোঝা যাচ্ছে। তবে, খুব সম্ভব, কেউ পড়বে না। তাতেও তেমন ক্ষতিবৃদ্ধি নেই।
ভালো থাকবেন।
dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ১০ মে ২০২৬ ১০:৩৪740592
Swapan Sengupta | ১০ মে ২০২৬ ১০:৩৮740593