

ছবি: রমিত
এবারের বাংলার নির্বাচন একেবারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় হবে। এমনটাই বলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের তরফে। বলা হচ্ছে নয়, দেখাও যাচ্ছে হাজার হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান আনা হয়েছে। গোদী মিডিয়ায় খবর পাওয়া গেছে যে ৩৬০ ডিগ্রি নজরদারি চলবে, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হবে নির্বাচন কেন্দ্র থেকে গণনা কেন্দ্র। কেউ এতটুকু বেগরবাই করলেই, সঙ্গে সঙ্গে রিপোল, অর্থাৎ পুনরায় ভোট নেওয়া হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে এত প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে সেই সমস্ত করার জন্য নিশ্চয় বেশ কিছু ক্যামেরা, বেশ কিছু কম্পিউটার এবং অন্যান্য জিনিষপত্রের প্রয়োজন হচ্ছে। কখনো কি কোনও একজন ভোটারের এই বিষয়ে প্রশ্ন জেগেছে এই এত এত সরঞ্জাম কোথা থেকে আসছে? কেউ কি এইগুলো কিনছেন? তাহলে সেই কেনার জন্য সঠিক পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে? ঠিকঠাক দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে তো? না এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে নেই। এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বসলে তো নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব দুর্নীতি বেরিয়ে আসতে পারে, কিন্তু বেশ কিছু মানুষের কাছে নির্বাচন কমিশন বা কেন্দ্রের সরকার তো দুর্নীতি করতেই পারে না। তাঁদের মতো সৎ স্বশাসিত সংস্থা তো ভূ ভারতে আর খুঁজেই পাওয়া যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু এক্ষেত্রে যে বড় সড় দুর্নীতি হয়েছে, তা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সম্প্রতি।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' এর একটি খবর থেকে জানা গেছে যে, কলকাতা হাইকোর্ট ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের জন্য নজরদারি সংক্রান্ত একটি দরপত্র (টেন্ডার) ভারতীয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে "স্বেচ্ছাচারী ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত" হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে ওই চুক্তিটি বাতিল করতে অস্বীকার করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রদত্ত এই রায়ে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বলেন যে, কমিশন দিল্লিতে এক প্রতিদ্বন্দ্বী দরদাতার অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করলেও, আবেদনকারীর (I-Net Secure Labs) পুদুচেরি ও দমন-এ অর্জিত প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করেছে। আদালতের এমন সমালোচনা সত্ত্বেও, এপ্রিল ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়—তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে লাইভ ওয়েব স্ট্রিমিং এবং সিসিটিভি পরিষেবা সংক্রান্ত চুক্তিটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
এবার এই পুরো প্রক্রিয়ার আইনি ও পদ্ধতিগত প্রেক্ষাপটটা বোঝা জরুরি। এই বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল যোগ্যতার সেই শর্তাবলি, যা অনুযায়ী দরদাতাদের "পূর্ণাঙ্গ রাজ্য"-ভিত্তিক নির্বাচনী ওয়েব স্ট্রিমিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক ছিল। I-Net Secure Labs যুক্তি দেয় যে, এই মানদণ্ডটি অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসিআই এই অবস্থান বজায় রাখে যে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর অভিজ্ঞতাকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যগুলোর অভিজ্ঞতার সমতুল্য গণ্য করা উচিত নয়; তবে কার্যক্রমের তুলনামূলকভাবে একই ব্যাপকতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালত শেষ পর্যন্ত ইসিআই-এর এই অবস্থানকে অসংগতিপূর্ণ ও অযৌক্তিক হিসেবে রায় প্রদান করেন।
I-Net Secure Labs পুদুচেরি ও দমন—এই দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (UT) অনুষ্ঠিত ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের কাজের অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিয়ে প্রমাণ করে যে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনের অভিজ্ঞতার সমতুল্য। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চেষ্টা করে যে, ওই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে তারা পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনের মতোই লাইভ ওয়েব স্ট্রিমিং ও নজরদারি পরিষেবা সফলভাবে সম্পাদন করেছে। তারা যুক্তি দেয় যে, যেহেতু নির্বাচন কমিশন দিল্লির মতো আরেকটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতাকে—যা তাদের এক প্রতিদ্বন্দ্বী দরদাতার ছিল বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাই পুদুচেরি ও দমনে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাকে প্রত্যাখ্যান করাটা ছিল বৈষম্যমূলক। কলকাতা হাইকোর্ট এই যুক্তির সাথে সহমত পোষণ করে এবং নির্বাচন কমিশনের মূল্যায়নে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উল্লেখ করে। কিন্তু এই সমস্ত খবর আপনি বা আমি কোথাও পাব না। কোনও গোদী মিডিয়াতে এই সংক্রান্ত কোনও খবর পাবেন না। ঐ দিল্লির সংস্থার সঙ্গে কোন রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ আছে এবং সেই রাজনৈতিক দল ঐ সংস্থার থেকে কী আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে, তা জানার জন্য যদি কোনও সাংবাদিক চেষ্টা করেন, তবেই বোঝা যাবে দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে আছে। কিন্তু আমাদের দেশের সাংবাদিকেরা সেইসব কাজ করার থেকে অনেক বেশী আগ্রহী সরকারী আনুকুল্য পাবার জন্য। সেখানেই সমস্যা।
অনেকেই বলে থাকেন, বিজেপি একটি সর্বাঙ্গসুন্দর দল, তাঁদের নেতা বিশ্বগুরু নরেন্দ্র মোদীর কোনও পরিবার নেই, তিনি ৩৬৫ দিন দেশের জন্য কাজ করেন, দিনরাত ২৪ ঘন্টা। তিনি নিজেই বলে থাকেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’। অর্থাৎ তিনি নিজেও দুর্নীতি করবেন না, অন্য দুর্নীতিগ্রস্তদের কাছেও ঘেঁষতে দেবেন না। কিন্তু ঘটনাচক্রে বিভিন্ন সময়ে যাঁরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, যেমন শুভেন্দু অধিকারী, হিমন্ত বিশ্বশর্মা বা অজিত পাওয়ারদের দেখতে পাওয়া গেছে। বিভিন্ন রাজ্যের অন্যান্য দলের নেতা, যাঁদের ওপর সিবিআই এবং ইডির নজর আছে, তাঁদেরকে বিজেপির সদস্য পদ নিতে দেখা গেছে। এগুলো তো ধরা যাক নিন্দুকদের অভিযোগ, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে বিজেপি কি সত্যিই কোনোরকম দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। কেন্দ্রীয় শাসিত সংস্থা বা স্বশাসিত সংস্থাগুলো কি একেবারেই দুর্নীতিমুক্ত? নাকি সেখানে অন্য ধরনের দুর্নীতি চলে, এবং সেই দুর্নীতিও হয় একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে?
ইতিমধ্যেই বাংলার প্রায় প্রতিটি মানুষ নিশ্চিত জেনে গেছেন, যে বাংলার ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি কতটা মরণ কামড় দিতে চাইছে। সারা বাংলা মুড়ে দিয়েছে ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’ শ্লোগানে। এই বড় শ্লোগানকে ঘিরে আরো ছোট ছোট সাব শ্লোগান দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে যেমন মহিলা নিরাপত্তার বিষয় আছে, তেমন আছে বিজেপি’র অনুপ্রবেশের জুজুও। আর যেটা আছে, সেটা হল, চোর তৃণমূলের সিন্ডিকেট রাজ খতম করতে হবে।
খুব ভালো কথা, আমরা সকলেই জানি যে তৃণমূল দলের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের একটা নিজস্ব সিন্ডিকেট রাজ আছে, এই অভিযোগ গোদী মিডিয়া থেকে সমস্ত বিরোধী দল প্রায়শই করে থাকে। এই সিন্ডিকেট রাজের অবসান অনেকেই চান। তার পরিবর্তে মানুষের মুখে মুখে এখন বিজেপির শ্লোগানের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ তৃণমূলকে পরাজিত করে বিজেপিকে আনতে পারলেই এই দুর্নীতির চক্র বন্ধ হবে। কিন্তু বিজেপির কি নিজস্ব কোনও দুর্নীতি নেই? তাঁদের কি কোনও সিন্ডিকেট চলেনা? অবশ্যই চলে এবং সেটা এমনভাবে চলে যে বাইরের কোনও মানুষ বুঝতেই পারবেন না, কীভাবে দুর্নীতি হচ্ছে এবং কীভাবে বাংলার এবং অন্যান্য যে কোনও রাজ্যের ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের শেষ করে দেওয়া হচ্ছে।
একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টার ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করা যাক। কোনও সরকারি প্রতিষ্ঠানে আগে যদি কোনও প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনতে হত, তাহলে কম টাকার হলে কন্টিনজেন্সি বা টাকা দিয়ে বাজার থেকে কেনা হত, একটু বেশী পয়সার হলে দরপত্র আহ্বান করা হত। এখন এই সমস্ত কেনা বা ছোটখাট দরপত্রের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হত না, তা কেউই বলতে পারবেন না, কিন্তু তাতে যে কোনও ছোটখাট ব্যবসায়ীরা কিছু কাজ করার সুযোগ পেতেন। যাঁরা সরকারি দপ্তরে আছেন তাঁরা বিষয়টা ভাল করে বুঝতে পারবেন। এখন যে প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এই কেনা বা প্রয়োজনীয় জিনিষ নেওয়া হয়, তা হল ‘জেম’ বা ‘গভর্মেন্ট ই মার্কেট প্লেস’। এই ওয়েবসাইটে বড় বড় করে লেখা আছে #VocalForLocal অর্থাৎ এই দেশের মানুষজনই এই কাজটা করতে পারবেন। এখন যদি কোনও একটি কম্পিউটারের ও প্রয়োজন হয়, বা কোনও একটি পরীক্ষাগারে কোনও রাসায়নিকের প্রয়োজন আছে বা কোনও আসবাবের প্রয়োজন আছে। এখন বলা হয়েছে সমস্ত চাহিদা ঐ জেম পোর্টালে আগে তুলে দিতে হবে। যাঁদের নাম ঐ জেম পোর্টালে নথিভুক্ত করা আছে, তাঁরা দেখে নিয়ে ঐ বস্তুটি সরবরাহ করবে। যদি টাকার অঙ্কে বেশী হয়, তাহলে সেখানে নিজস্ব দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং ঐ নথিভুক্ত সংস্থাদের মধ্যে থেকেই বেছে নেওয়া হবে কে দিতে পারবেন আর কে পারবেন না। কিন্তু আঞ্চলিক বিভিন্ন ছোট ছোট সংস্থার সঙ্গে তো বড় বহুজাতিকের সেই অর্থে যোগাযোগই নেই, সবাই তো আর ঐ ‘জেম’ পোর্টালে নথিভুক্ত নাও থাকতে পারেন, তাহলে তাঁরা এই ধরনের দরপত্রে তো অংশই নিতে পারবেন না। তাহলে তাঁরা টিকে থাকবেন কী করে? যাঁদের সঙ্গে বহুজাতিক সংস্থার যোগাযোগ আছে এবং ঐ বহুজাতিক সংস্থার তৈরী জিনিষই তাঁরা দিতে পারবেন, তাহলেই একমাত্র তাঁদের গণ্য করা হবে।
এটাই হচ্ছে সিন্ডিকেট রাজের অবসান করে অন্য বড় সিন্ডিকেট রাজের সূচনা, যা বাইরে থেকে দেখতে স্বচ্ছ মনে হলেও অন্দর থেকে দুর্নীতিতে ভরা। কিন্তু এই প্রশ্ন করার মত সাহস এবং যোগ্যতা তো এখানকার কোনও সাংবাদিকের নেই, তাহলে কোনোদিনই এই ‘সরকারি মদতে দুর্নীতি’ চোখেও পড়বে না। সুতরাং যাঁরা বলছেন এই তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তার পরিবর্তে বিজেপিকে আনলেই সমস্ত দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে, তাঁরা একবার মনে করে দেখবেন ‘নির্বাচনী বন্ডে’ সবচেয়ে বেশী টাকা কারা পেয়েছে, কেন কোভিডের সময়ে তৈরী হওয়া পিএম কেয়ারস এর তথ্য মানুষকে জানানো হবে না বলে সরকার বলে দিয়েছে? আসলে দুর্নীতি যদি বন্ধ করতেই হয়, পাল্টাতে যদি হয় তাহলে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেই পাল্টাতে হবে, সেটাই সময়ের দাবী। তাই শ্লোগান হবে, ‘পাল্টানো দরকার, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার’, যাঁরা অনুপ্রবেশ রোখার নামে এসআইআরের মত বড় দুর্নীতি করে জীবিত মানুষকে বাদ দিয়ে, ভুয়ো ভোটার ঢুকিয়ে বাংলা দখল করতে চাইছে।