এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইদবোশেখি  ইদবোশেখি

  • চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ

    সোমনাথ রায়
    ইদবোশেখি | ২৮ মার্চ ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)


  • অলংকরণ: রমিত




    শ্রীচৈতন্যদেব ১৫৩৪ সালে অন্তর্হিত হন। এর আগে তিনি ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা থেকে উড়িষ্যায় চলে গিয়েছিলেন। এই সময় থেকে বাংলায় চৈতন্যধারার বিকাশ তাঁর পরিকরদের মাধ্যমেই হতে থাকে। অদ্বৈত আচার্য, নিত্যানন্দ, শ্রীবাস পণ্ডিত, নরহরি সরকার প্রমুখ বৈষ্ণব মহাজনদের নিজস্ব গণ বিকাশ লাভ করতে থাকে। এর মধ্যে সাংগঠনিকতায় নিত্যানন্দ মহাপ্রভু আলোকসামান্য অবদান রেখেছিলেন। দক্ষিণ বাংলার বিভিন্ন গ্রামে বৈষ্ণব ধর্ম প্রসার ও প্রচারের জন্য তিনি বারোজন ‘গোপাল’কে নিযুক্ত করেন। লক্ষ্যণীয়, এই দ্বাদশ গোপাল বিভিন্ন জাতি থেকে এসেছিলেন। তাঁরা এবং তাঁদের অনুসরণকারীরা অনেকগুলি শ্রীপাট প্রতিষ্ঠা করেন, যেগুলি ছিল ধর্মসংগঠনের স্থানীয় কেন্দ্র। এর পরবর্তীকালে নিত্যানন্দের স্ত্রী জাহ্নবা দেবী, পুত্র নিত্যানন্দ এবং অদ্বৈত আচার্যের সন্তান অচ্যুতানন্দ বৈষ্ণব ধর্মের পরবর্তী প্রচারক প্রজন্ম হিসেবে উঠে আসেন। বাংলার বাইরে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের মূল তাত্ত্বিক-সাংগঠনিক কেন্দ্র ছিল বৃন্দাবনে। শ্রীচৈতন্য বৃন্দাবনে কিছু লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার করে সেখানে রূপ-সনাতনকে থিতু হতে বলেন। চৈতন্যচরিতামৃতের সাক্ষ্য যে তিনি নিজেও শেষজীবনে বৃন্দাবনে থাকবেন, এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বৃন্দাবনে ষড়গোস্বামী হিন্দু স্মৃতিশাস্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। ব্যাপক মানুষের কাছে চৈতন্যদেবের শিক্ষা পোঁছে দিতে মহাজনেরা নিজেরা, তাঁদের সম্প্রদায়ের প্রধান শিষ্যেরা এবং একই ভাবে চৈতন্যসাহিত্যের বিভিন্ন গ্রন্থগুলি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। কিন্তু, খেয়াল রাখতে হবে যে এই সমস্ত উপাদানের চেহারা ছিল যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়। চৈতন্যজীবনীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাব্যটির রচয়িতা বৃন্দাবন দাস ছিলেন শ্রীবাস পণ্ডিতের সম্পর্কে দৌহিত্র এবং নিত্যানন্দের সরাসরি শিষ্য। অন্যদিকে চৈতন্যসাহিত্যের সর্বজনমান্য সর্বাধিক জনপ্রিয় গ্রন্থ চৈতন্যচরিতামৃতের লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজ ছিলেন বৃন্দাবনবাসী, রূপ গোস্বামীর শিষ্য। তিনি এই মহাগ্রন্থ জীব গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে রচনা করেন। চৈতন্য ভাগবত (বৃন্দাবন দাস) এবং চৈতন্যচরিতামৃতের রচনাকালের মধ্যে প্রায় পৌনে শতাব্দী ফারাক। এর মধ্যে আরও বিভিন্ন গ্রন্থ রচিত হয়েছে, যার পাঠ বাংলার বিভিন্ন কোনায় পৌঁছে গেছে। এদের রচয়িতাদের মধ্যে তাত্ত্বিক এবং সম্প্রদায়গত ফারাকও থেকেছে। বাংলার বৈষ্ণবদের সঙ্গে বৃন্দাবনের গোস্বামীদেরও তাত্ত্বিক এবং চর্যাগত ব্যবধান তৈরি হয়েছে। খেতুরি মহোৎসবে (আনুমানিক ১৫৮০) এর একটা সাযুজ্য আনা হয়, যা নিয়ে আমরা পরে আবার আলোচনা করব। বাংলার বৈষ্ণবদের পাশাপাশি বৃন্দাবনে গোস্বামীদের কাছে দীক্ষিত নরোত্তম দাস বা শ্যামানন্দ বাংলায় ধর্মপ্রচারে বিশাল ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফলে, আমরা যদি চৈতন্য চরিতামৃতের সময় হিসেব করি (আনুমানিক ১৬১০), তার মধ্যে চৈতন্য ভাবধারা আরও বহু প্রতিভাবান জ্ঞানী-ভক্তের অবদানে পুষ্ট হয়েছে, বহু সংগঠকের পরিশ্রমের ছাপ পড়েছে তার প্রসারে। আমার এই প্রসঙ্গে আন্দোলন শব্দটা ব্যুৎপত্তির দিক থেকে আরও বেশি যথার্থ লাগে- পুনঃ পুনঃ দোলা। প্রকৃত অর্থেই বারবার লেগেছে এই ভাবধারায়। আমরা আগের অধ্যায়ে যে অর্থনীতির লাফের কথা বললাম, যার সময়কাল ১৬২৫ সাল বা তার আশেপাশে, ততদিনে চৈতন্য আন্দোলন প্রায় একশ বছরের সম্পদ জোগাড় করেছে। এই একশ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে এই আন্দোলনের এক মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে উঠেছে যেখানে উভয়ই উভয়কে পুষ্ট করেছে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা মাথায় রেখে আমরা চৈতন্যচরিতামৃত-কে মূল সূত্র ধরে এই আন্দোলন থেকে উঠে আসা কয়েকটি সামাজিক দিক-নির্দেশ আলোচনা করব। ক্ষেত্রভেদে অন্য কিছু সূত্র, যা চরিতামৃতে নেই, সেগুলিকে পর্যালোচনা করা হবে। এই আলোচনায় এইটাও আলাদা করে মাথায় রাখবার যে শ্রীচৈতন্য বা তাঁর অনুসারী সহযোগীরা মূলতঃ আধ্যাত্মিক আন্দোলন করতেই এসেছিলেন। আজকের দিনে যাকে সমাজবিপ্লব বলে, সেরকম লালকিলা মে লাল নিশান ওড়ানোর কোনও দায় ছিল না। যদিও তাঁদের অসামান্য প্রতিভার ফলে সেই আধ্যাত্মিক অনুশীলন সমাজের সদস্যদের একযোগে প্রাণিত করেছিল উৎপাদন ব্যবস্থার এক নবযুগে পা ফেলতে, যা আমরা আলোচনা করতে চাইছি।

    এই আলোচনা শুরুর আগে আমরা ধর্মতত্ত্বের একটা অনুশীলনের জায়গা একটু দেখে নিই। মানুষের ধর্মগুলি হয়তো বা জাদুবিশ্বাসের জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল। কার্যকারণ সম্বন্ধে ধারণা করা যায় না এরকম অনেক ক্ষেত্রে মানুষ কিছু কিছু সমাপতনে বিশ্বাস রাখতে শুরু করেন, এমনটা করলে অমুক ফল ফলবে- এইরকম সমাপতন। প্রকৃতির রীতিনীতি ও মানবজীবনের বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে তাল রেখে ফার্টিলিটি কাল্ট জাতীয় অনুষ্ঠান আসে, যেখানে ধর্মাচরণের সঙ্গে উৎপাদনের সম্পর্ক ধরে নেওয়া হয়। স্মর্তব্য, এই বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সাযুজ্য অন্বেষণ ধর্মের পাশাপাশি মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যারও জন্ম দিয়েছিল। ভারতে এবং বাকি পৃথিবীর ধর্মেও পরলোকের ধারণা আসে। বর্তমান জীবনের দুর্গতির বাইরে পরলোকে এক শাশ্বত আনন্দের ছবি তুলে ধরা হয়, এবং যেকোনও ধর্মেরই প্রায় মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে আনন্দময় পারলৌকিক জীবন পাওয়া। আমাদের শত শত স্মৃতি ও শ্রুতি নিজের ও নিজের পূর্বপুরুষের পারলৌকিক কল্যাণে উদ্দিষ্ট। এই জায়গাটায় আমরা দেখি, সাংখ্যদর্শনের হাত ধরে একটা ভিন্ন চিন্তা গড়ে উঠতে। তা হল মানুষের জীবনে দুঃখভোগ বাস্তব এবং অলঙ্ঘ্যণীয়। সুখের ধারণার সঙ্গে সুখ না থাকা বা দুঃখের ধারণা যুক্ত। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে যদি সুখ দুঃখ উভয়েরই বাইরে যাওয়া যায়, তাহলেই একমাত্র সুরাহা হয়। এই ধারণা ভারতীয় আস্তিক দর্শনে মোক্ষ রূপে পরিচিত হয়, গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরিয়াসও অনুরূপ ধারণাকে অ্যাটারাক্সিয়া বলে অভিহিত করেন। এই চ্যুতিবিন্দু মানুষের ধর্মে এক নতুন দিগন্তের উন্মেষ করে। পৃথিবীর বহু ধর্মমতে সাধনা মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মোক্ষ, নির্বাণ, স্যালভেশন বা ফানা-র মতন অবস্থায় উন্নীত হওয়া যা মানুষকে সুখ-দুঃখের অতীত এক চিরন্তন স্থিতি দেবে। এই অবস্থায় আসার যে সাধনা, তার মধ্যে প্রায় সমস্ত ধর্মই ভালো ও সৎ হওয়া এবং ভালো কাজ করাকে গুরুত্ব দিয়েছে। একে সৎকর্মবাদও বলা হয়, সৎকর্ম মানুষকে মোক্ষের দিকে এগোতে সাহায্য করে। সৎকর্মবাদের মধ্যে ভগবান বুদ্ধ এক বৈপ্লবিক ধারণা প্রবিষ্ট করান। তা হল করুণা। করুণার বশবর্তী হয়ে মানুষ শুধু নিজের নয়, অন্যের ভালো থাকা এবং আখেরে তার নির্বাণের জন্য প্রয়াসী হবেন। দুখী-আর্ত-অসমর্থের জন্য বা সামগ্রিকভাবে সমষ্টির জন্য ভালো করার ইচ্ছেকে করুণা বলা হয়। বুদ্ধের করুণার তত্ত্ব পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধর্মে ঢুকছে, এবং আমরা সচরাচর ধার্মিক মানুষ ও ধর্মসংস্থাগুলিকে মানবিক কাজ করতে দেখি, তা এই করুণার তত্ত্ব মেনেই। করুণার পাশাপাশি এসে পড়ে ভক্তির ধারণাও। ভগবান বুদ্ধ করুণার আধার। তিনি করুণাবশতঃ আমাদের নির্বাণের পথ দেখাচ্ছেন, যা পরলোকে তো বটেই, ইহলোকেও আমাদের দুঃখভোগ কমাবে। এই যে মহান দান আমরা তাঁর থেকে পাচ্ছি, গ্রহীতার জায়গা থেকে আমরা তাঁর উপর ভক্তি প্রদর্শন করছি। আমরা তাঁকে অন্তর থেকে ডাকছি যাতে তাঁর করুণা আমাদের উপর বর্ষিত হয়। অর্থাৎ, এই দেওয়া নেওয়ার জায়গায় ভক্তি ও করুণা বিলাস করছে। যেকোনও ইষ্টকে আমরা ভক্তি করছি কারণ তিনি করুণা করছেন। এর পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে ভক্তির অভ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে ভক্তি কিন্তু অহৈতুকী নয় এখানে, তা করুণা অর্জনের উপায়। ইসলামে বা খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বেও এই ভক্তি-করুণা-মোক্ষের ধারণা আছে এবং সৎকর্মবাদের ধারণাও আছে। এইখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভিন্নপথের কথা বলেন মার্টিন লুথার, যখন তিনি খ্রিস্টিয় ধর্মের একটি নবতর রূপ, প্রোটেস্টান্টিজম-এর প্রবর্তন করেন। তিনি বলেন যে সৎকর্ম মোক্ষের পূর্বশর্ত না। মোক্ষ আসতে পারে কেবলমাত্র ঈশ্বরের করুণা পেলেই। করুণাধন্য হলে কেউ সৎকর্মে প্রবৃত্ত হবেন এমনটা স্বাভাবিক, কিন্তু সৎকর্ম করলেই করুণা আসবে এরকম না, এ একান্তই ঈশ্বরেচ্ছাধীন। মানুষ একমাত্র ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস জানিয়েই তাঁর করুণা পেতে পারে যা তাকে স্যালভেশন এনে দেবে। এর ফলে প্রোটেস্টান্ট ধর্মজীবনে সৎকর্মের ভূমিকা কমে গেল। কমে গেল সমষ্টির উন্নয়নের অনুপ্রাণনাও এবং অপরের ক্ষতি করছি এই পাপবোধে অসৎ কাজ থেকে নিরত হওয়ার তাগিদও। অর্থাৎ, ইহলোকের কর্মের ফলে পরলোকে লাভ-অলাভের হিসেব কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এল। এই জায়গায় মানুষ তার নিজের পৃথিবীকে পরলোক থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ধরে নিয়ে কাজ করতে পারে। অনেকেই মনে করেছেন আধুনিক ধনতন্ত্রের শোষণমূলক, অবিবেকী রূপটির পিছনে প্রোটেস্টান্টিজমের ভূমিকা আছে।

    আরেকটা জিনিস খেয়াল করার পরলোকে সব কিছু সুন্দর হবে, এই মানসিকতা কিন্তু ইহলোকের অনেক খামতি অসুবিধে অন্যায়কে সহ্য করে যেতে বলে। আবার, ইহলোকে জাগতিক উন্নতি, দুটো ভালো খেতে পরতে পাওয়ার ইচ্ছেকেও দমিয়ে রাখতে পারে পরলোকে সব পাব ভেবে নেওয়া। আমাদের দেশে জাতিভেদের নামে অনেক অবিচার-অসম্মান পরলোকের দোহাই দিয়ে , মোক্ষপ্রাপ্তির দোহাই দিয়ে চলেছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা যখন খ্রিস্টান মিশনারিদের সঙ্গে জোট বেঁধে আন্দোলন করেছেন, তাঁরা অনেকসময়ই এই কথা বলেছেন যে খ্রিস্টানরা যে স্বর্গরাজ্য দেখতে চান তা পারলৌকিক, কিন্তু কমিউনিস্টরা তা এই পৃথিবীতেই দেখতে চান (আদি শংকরাচার্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ)।

    এইখানে আমরা অবাক হয়ে যাই গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা এই পারলৌকিক মুক্তি বা মোক্ষ নিয়ে কী বলছেন দেখলে। চৈতন্যচরিতামৃতকার শ্রীচৈতন্য-নিত্যানন্দের অবদান নিয়ে বলতে গিয়ে লিখছেন-
    এইমত দুই ভাই জীবের অজ্ঞান।
    তমো নাশ করি করে বস্তুতত্ত্ব জ্ঞান।।
    অজ্ঞান তমের নাম কহিয়ে কৈতব।
    ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ-বাঞ্ছা-আদি সব।।
    তার মধ্য মোক্ষবাঞ্ছা কৈতব প্রধান।
    যাহা হৈতে কৃষ্ণভক্তি হয় অন্তর্দ্ধান।।

    কৈতব শব্দের আভিধানিক অর্থ ছল বা কপট। মোক্ষের ধারণাকে বৈষ্ণবরা ছলনা বলছেন। সনাতনকে শিক্ষাদানের সময় শ্রীচৈতন্য বলছেন ‘দারিদ্র্যনাশ ভবক্ষয় প্রেমের ফল নয়/ ভোগ প্রেমসুখ মুখ্য প্রয়োজন হয়।‘ অর্থাৎ, পার্থিব চেতনা থেকে মুক্ত হয় সুখ-দুঃখের অতীত নির্বিকল্প নির্বাণ বা মোক্ষ নয়, প্রেমের সুখ ভোগ করাই মুখ্য উদ্দেশ্য, যে প্রেম অবশ্যই কৃষ্ণের প্রতি। মায়াবাদী ব্রহ্মবাদীরা পারমার্থিক উদ্দেশ্য বলতে ব্রহ্মে লীন হওয়ার কথা বলছেন, এই উদ্দেশ্যকে চৈতন্য ছলনা বলছেন। তাঁর শিক্ষায় এই সাধনা রসের সাধনা, আনন্দের সাধনা এবং অহিংসা জাতীয় সৎকর্মের সাধনাও বটে। ‘জ্ঞান বৈরাগ্য ভক্তির কভু নহে অঙ্গ/ অহিংসা নিয়মাদি বুলে কৃষ্ণভক্ত-সঙ্গ’। ধর্মচেতনায় যেখানে প্রায় সর্বত্র অপার্থিব পারলৌকিক জীবনের কথা বলা হয়েছে, সেখানে সুখভোগ বা সুখ-দুঃখ বিরহিত জীবনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, চৈতন্যদেব একদম মরপৃথিবী ও মানুষের জীবনে বাঁচার কথা বলেছেন। বৃন্দাবনের গোস্বামীরাও তাঁদের রচনায় মুক্তি-র ধারণাকে পিশাচী বলেছেন, যার সংস্রব এড়িয়ে চলতে হবে। পরবর্তীকালে নরোত্তম দাসের পদে আমরা দেখতে পাই, গোলোক বা স্বর্গবাস নয়, মাটির পৃথিবীতে ফিরে এক যাপনের কথা বলা হচ্ছে- ‘তাদের চরণ সেবি ভক্তসনে বাস/জনমে জনমে হয় এই অভিলাষ’। পার্থিব জীবন যাপনের ওপর এতটা গুরুত্ব দেওয়া, মোক্ষভাবনার বদলে মানুষের জীবন যাপন করতে চাওয়ার এই অভিলাষ পৃথিবীর অন্য ধর্মে বিরল। এই কৃষ্ণপ্রেমও কিন্তু সাধকের দেহগত। ‘দেহত্যাগে কৃষ্ণ না পাই পাইয়ে ভজনে’।

    তাহলে আমরা দেখতে পারি কল্পিত স্বর্গরাজ্য বা কল্পিত ঈশ্বরে বিলীন হওয়ার বদলে বেঁচে থাকা এবং পৃথিবীতে বসে কৃষ্ণসেবা করা ভক্তের মূল ইচ্ছে হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এইখানে একটা জিনিস বলার দরকার, এই কৃষ্ণসেবা ব্যাপারটা কিন্তু স্বেচ্ছাচার নয়। দান-ধ্যান, অহিংসা, সাধুসঙ্গ, ব্রতপালন, বৃন্দাবন ভ্রমণ এই পাঁচটি অঙ্গকে সাধনা-শ্রেষ্ঠ বলা হচ্ছে এবং এই সাধনার যে ফল তা সাধক নিজের মরজীবনেই ভোগ করবেন, সেই ফলই হল কৃষ্ণপ্রেম। তার ফলে সাধকের আধ্যাত্মিক যে উন্নতি হবে, তার স্বরূপ কী? ‘বিধি ধর্ম্ম ছাড়ি ভজে কৃষ্ণের চরণ/ নিষিদ্ধ পাপাচারে তার কভু নহে মন’’। লুথার সৎকর্মকে ঈশ্বরানুগ্রাহে স্যালভেশনের ফল বলেছিলেন। শ্রীচৈতন্য মোক্ষ-বিহীন দর্শনের চর্যাতে সৎকর্মকে স্থান দিয়েছেন, তেমনি বলেছেন এই চর্যার ফলশ্রুতিতেও পাপমুক্ত হবে মানুষ।

    নরোত্তম দাসের আরেকটি পদ, ‘হাটপত্তন’, এখানে স্মর্তব্য। পদটি আরম্ভ হচ্ছে এই দুটি চরণ দিয়ে ‘ প্রণমহ কলিযুগে সর্ব্বযুগসার/ হরিনাম-সঙ্কীর্ত্তন যাহাতে প্রচার’ – যে কলিযুগকে হিন্দুধর্মের বিভিন্ন শাস্ত্রে পাপের যুগ, অসত্যে যুগ বলা হয়েছে সেই যুগকেই সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ঘোষণা করে এই পদ শুরু হচ্ছে। এরপর দেখানো হচ্ছে কলিযুগে কীভাবে চৈতন্যদেব প্রেমের হাট পত্তন করছেন তাঁর পরিকরদের সঙ্গে। মানুষের এক স্বাভাবিক ধাঁচ হল পুরোনো আমলের সমৃদ্ধির কথা ভেবে বর্তমান সময়ের দুরবস্থার সুরাহা খোঁজা। এই চেতনায় ধর্মগুলি বিভিন্ন সময়ে সামিল হয়েছে, আমরা আমাদের দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় আন্দোলনের সময়ও দেখেছি পুরোনো কালের, বৈদিক যুগের কল্পিত সমাজচেতনা কীভাবে পরাধীন ভারতীয়ের তৎকালীন রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু, চৈতন্য আন্দোলনের আরেকটা বিশিষ্টতা হল এখানে সমসাময়িকতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষ্ণলীলা স্মরণের জন্য দ্বাপরে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়নি, সেই লীলার নিত্যতা স্বীকার করে বলা হয়েছে তার শ্রেষ্ঠ উপভোগ এই সময়েই সম্ভব। এবং কলি, যাকে ওয়ার্স্ট অফ টাইম হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তাকেই শ্রেষ্ঠ সময় করে তুলেছে এই আন্দোলন।

    আমরা হাটপত্তন কাব্যের দিকে আরেকবার মন দিই, পদকর্তা নরোত্তম দাসের প্রসঙ্গে পরে আবারও আসব। তিনি ছিলেন বৈষ্ণব আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ সংগঠকদের একজন। তিনি এই পদে লিখছেন -
    চৈতন্যের ঘাটে নৌকা চাপিল যখন।
    হাটের পত্তন নিতাই রচিল তখন॥
    ঘাটের উপরে হাট থানা বসাইল।
    পাষণ্ডদলন নাম নিশান গাড়িল॥
    চারিদিকে চারি রস কুঠরি পুরিয়া।
    হরিনাম দিল তার চৌদিকে বেড়িয়া॥
    চৌকিদার হরিদাস ফুকারে ঘনেঘন।
    হাট করি বেচ কিন যার যেই মন॥
    হাটে বসি রাজা হৈল প্রভু নিত্যানন্দ।
    মুচ্ছদ্দি হইল তাহে মুরারি মুকুন্দ॥
    ভাণ্ডারী চৈতন্য ভেল আর গদাধর।
    অদ্বৈত মুনসী ভেল পরখাই দামোদর॥
    প্রেমের রমণী ভেল দাস নরহরি।
    চৈতন্যের হাটে ফিরে লইয়া গাগরী॥

    আমরা যদি উপমানগুলি বিচার করি, দেখব প্রাত্যহিক কাজের ভাষায় ধর্মসংগঠনকে ব্যাখ্যা করছেন তিনি। এই ধরণের উপমান বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলী প্রথম যুগের থেকেই নৌকাকাণ্ড, দানকাণ্ড, জটিলা-কুটিলা লীলার মধ্য দিয়ে মানুষের প্রাত্যহিকী জীবনের উপমা অনবরত ব্যবহার হয়েছে। চৈতন্যোত্তর বাংলা কাব্যের বিকাশ সেই ধারাকে পুষ্ট করেছে। জ্ঞানদাস একটি পদে লিখছেন – ‘'বিগলিত অরুণ বসন দোহ গায়। / শ্রমজল বিন্দু বিন্দু শোভে তায়।।’ শৃঙ্গাররসে স্বেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু বৈষ্ণব কবিরা স্বেদকে দেখছেন শ্রমজ উৎপত্তির জায়গা থেকে। নরোত্তম দাসও রাধার রূপ বর্ণনায় শ্রমজল ব্যবহার করেছেন। এখানে আমরা লক্ষ্য করছি যে ঈশ্বর-উপাসনাকে তাঁরা প্রাত্যহিক জীবনের বাইরের কোনও চর্যা হিসেবে দেখছেন না, তা ব্যক্তিজীবন ও সমষ্টিজীবনের সঙ্গেই জড়িয়ে।

    রূপ গোস্বামীকে শিক্ষাদানের সময় চৈতন্যদেব বলছেন ‘স্বর্গ মোক্ষ কৃষ্ণভক্ত নরক করি মানে’। মোক্ষের মধ্যে শান্ত-দাস্য-বাৎসল্য-সখ্য-মধুর রসে কৃষ্ণসেবার আনন্দ নেই। ‘সে অমৃতানন্দে ভক্ত সহ ডুবেন আপনে/ কৃষ্ণভক্ত-রসগুণ নহে ঐশ্বর্য্যজ্ঞানিগণে।‘ এখানে ঐশ্বর্য্যজ্ঞানী অর্থে ব্রহ্মজ্ঞানী বা উত্তর-মীমাংসকদের কথা বলছে, যাঁরা বলতেন জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরসম অবস্থায় পৌঁছতে পারে। এই ব্রহ্মজ্ঞানকে নাকচ করে বলছেন ‘ব্রহ্মানন্দ হৈতে পূর্ণানন্দ কৃষ্ণগুণ’। একইভাবে পূর্ব-মীমাংসক বা কর্মকাণ্ডবাদীদেরও তিনি বিরোধিতা করছেন। পূর্ব মীমাংসা একটি নিরীশ্বরবাদী দর্শন, যেখানে বলা হয়েছিল বৈদিক মন্ত্রের যথার্থ উচ্চারণ এবং যজ্ঞ ইত্যাদি কর্মগুলির প্রকৃত অভ্যাস করলে ইহজীবনে সুখ-সমৃদ্ধির ফললাভ হয়, ইহজীবনেই সুখ ভোগ করা যায়। রূপ গোস্বামী তাঁর ভক্তিরসামৃতসিন্ধু বইয়ে এই ভুক্তি-মুক্তি উভয়কেই পিশাচী বলেছেন। এই ইহজীবনকে বস্তুগত সুখের সময় না ভেবে চৈতন্যদেব কৃষ্ণপ্রেমের আনন্দের সময় হিসেবে ভাবতে চেয়েছেন। শিক্ষাষ্টকের একটি শ্লোকে চৈতন্যদেব বলছেন- ধন জন কাব্যকৃতি বা সুন্দরী রমণীর বদলে জন্ম জন্ম কৃষ্ণের প্রতি অহৈতুকী ভক্তিই কাম্য। আমরা খেয়াল করতে পারি কলার খোলা বিক্রি করে জীবন চালানো দরিদ্র নিম্নবর্ণের শ্রীধরকে নবদ্বীপে যখন চৈতন্যদেব বর দিতে চেয়েছিলেন- শ্রীধর বলেছিলেন তিনি আর কিছু চান না, শুধু চৈতন্যে ভক্তিমান থাকতে চান- যে ব্রাহ্মণ কাড়ি নিল মোর খোল পাত/ সে ব্রাহ্মণ হউক মোর জন্ম জন্ম নাথ’।

    তাহলে আমরা বিভিন্ন ধর্মের সঙ্গে তুলনা করে চৈতন্য-আন্দোলনের একটা অভিনব অভিমুখ পেলাম। এখানে পারলৌকিক মুক্তি, সমাজ সংসারের ঊর্ধ্বে, আত্মদেহবোধ লোপ করে মুক্তি বা নির্বাণের ধারণাকে ছলনা বলা হচ্ছে। বৈষ্ণব সংসার থেকে মুক্তি চান না, বৈষ্ণব কৃষ্ণের সংগে একত্বও চান না। তিনি চান মানুষের শরীরে মানুষের সংসারে থেকে এক জীবন যাপন করতে, যে যাপনে তিনি কৃষ্ণের প্রেমে তদগত থাকতে পারবেন। পার্থিব জীবনের প্রতি এতখানি গুরুত্ব আর কোনও আধ্যাত্মিক দর্শনে দেখানো হয়েছে কিনা সন্দেহ। এবং, এর পাশাপাশি একটা সামাজিক অবস্থান আছে, ভক্ত একা কৃষ্ণপ্রেম চান না, তিনি চান বাকিদের মধ্যেও সেই প্রেম জাগুক এবং সেই কৃষ্ণভক্ত সাধুজনের সঙ্গে তিনি থাকতে চান। তিনি সৎকর্মেও স্থিত হতে চান, কারণ কৃষ্ণপ্রেমের প্রকাশ সদাচরণের মধ্যে দিয়েও। হরির কীর্তন করতে গেলে তরুর মতন সহনশীল, তৃণের মত নম্র হতে হবে, এবং মানহীনকে সম্মান এনে দিতে হবে। চৈতন্য পরবর্তীযুগেও বাংলা তথা ভারতে বিভিন্ন বৈষ্ণব শাখা সমাজে যথেষ্ট সম্মান পেয়েছেন তাঁদের এই জীবনচর্যার জন্যেই।

    আমরা ইতিপূর্বে নরোত্তম দাসের কথা উল্লেখ করলাম। দত্তকুলোদ্ভব সাধক নরোত্তম, যিনি বৈষ্ণবজনোচিত দাস পদবী ব্যবহার করতেন, চৈতনোত্তর বৈষ্ণব সমাজের এক শ্রেষ্ঠ সংগঠক ও পদকর্তা ছিলেন। চৈতন্যদেবের নীলাচল বাসের সময় থেকে যেকোনও বহমান ভাবধারার মতনই বৈষ্ণবদের মতধারায় বিভিন্ন স্রোতের প্রচলন ঘটে। চৈতন্যদেব রূপ সনাতন এবং আর কয়েকজন শিষ্যকে বৃন্দাবনে বাস করে হিন্দু স্মৃতিশাস্ত্রগুলি আলোচনা করে তাঁর মতবাদের শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ করবার কাজ দেন। আবার নিত্যানন্দ বাংলায় সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করেন। এর পাশাপাশি আরও বহু মহাজন আলাদা আলাদা ভাবে ধর্ম ও সংঘ প্রসারের কাজে ব্রতী হন। তাঁদের মতবাদের ফারাকগুলি ক্রমশঃ বেড়ে উঠতে থাকে স্বাভাবিকভাবেই। বাংলায় চৈতন্যদেবকে কৃষ্ণের শেষতম অবতার ধরে নিয়ে তাঁর পূজা চালু হয়, যে ধারাকে বলা হয় গৌরপারম্যবাদ। নরহরি সরকার ও আরও কিছু মহাজন দেহসাধনার পন্থায় শ্রীচৈতন্যকে পরমপুরুষ ধরে গৌরনাগরবাদী ধারা চালু রাখেন। বৃন্দাবনের গোস্বামীরা ভাগবত ও অন্যান্য স্মৃতি মন্থন করে বৈষ্ণব স্মৃতিশাস্ত্র তৈরি করেন, সেখানে কৃষ্ণকেই পরম উপাস্য নিরূপণ করা হয়। বাংলার সঙ্গে বৃন্দাবনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং বাংলার বৈষ্ণবদের একাংশ গোস্বামীমতের প্রাধান্য স্বীকার করেন। গোস্বামীমত সংস্কৃত স্মৃতিসাহিত্য চর্চা করলেও বাংলার বিভিন্ন উপাসনাধারা, যেমন মঞ্জরীতত্ত্ব (শ্রীরাধিকার সখী বা মঞ্জরীদের মতন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার সাক্ষী থাকা, নিজেরা সেই লীলায় শারিরীকভাবে অংশ না নিয়েও- দ্রষ্টব্য চণ্ডীদাসের পদ – মনে অনুগত মঞ্জরীসহিত ভাবিয়া দেখহ মনে) বৃন্দাবনের গোস্বামীদের তত্ত্বে স্থান পায়। তেমনি গোস্বামীরা যে পরকীয়াতত্ত্ব নিরূপণ করেন, বাংলার বৈষ্ণবদের কাছে তা অতি জনপ্রিয় হয়। যাই হোক, বাংলার বৈষ্ণবমতগুলি এবং গোস্বামী মতের চ্যুতিরেখা যখন স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে, তখন বৃন্দাবন থেকে দীক্ষিত নরোত্তম দাস খেতুরিতে বৈষ্ণবদের এক সম্মেলন আয়োজন করেন। সেই সম্মেলনে বাংলার বৈষ্ণবদের মধ্যে প্রধানস্থানীয়া জাহ্নবাদেবী (নিত্যানন্দের স্ত্রী) উপস্থিত ছিলেন, বাংলা ও বৃন্দাবনের অন্যান্য বৈষ্ণবদের সঙ্গে। এইখানে নরোত্তম দাস এই বিবিধ ধারাগুলির তত্ত্বগত সমন্বয় করেন। সেইজন্য তিনি এক অভূতপূর্ব পন্থা নেন। নরোত্তম দাস নামসংকীর্তনের একটি কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে কৃষ্ণপারম্যবাদ এবং গৌরপারম্যবাদ উভয় মতই গুরুত্ব সহকারে স্থান পায়। কীর্তনের আঙ্গিকে এবং নৃত্যে ঢুকে যায় গৌরনাগরীদের জপ-সাধনার ধারাও। খেয়াল করবেন, গৌরচন্দ্রিকা দিয়ে শুরু হয়ে কৃষ্ণলীলা, নবদ্বীপলীলা আবার রাধিকা বিরহ এবং গৌর-নিতাই, গৌর-বিষ্ণুপ্রিয়ার পূজা সবই কীর্তনের অঙ্গ। এই অদ্ভূত সমন্বয়ী প্রচেষ্টা, যা নিজে একটি স্বতন্ত্র আর্ট ফর্ম, বৈষ্ণব আন্দোলনের উজ্জ্বলতম অর্জনগুলির একটা। বাংলার সমাজ যে বিভিন্ন ধারাকে অনায়াসে আত্তীকৃত করতে পারে, তার এক দৃষ্টান্ত নরোত্তম দাসের খেতুরিতে কীর্তন প্রবর্তন। আমরা আরও পরে দেখব রামপ্রসাদ কমলাকান্ত পদাবলী সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে বৈষ্ণবের ভক্তিরস শাক্ত উপাসনায় প্রবেশ করাচ্ছেন। বিভিন্ন উপাসনামত, বিভিন্ন ভাবধারা তাদের বৈপরীত্যের জায়গাটা বজায় রেখেও সংশ্লিষ্ট হয়েছে লালনের গানে কিম্বা কাজি নজরুলের কবিতাতে। সমন্বয়কে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করবার শক্তি অর্জন করেছিল বাংলার সমাজ।

    এইবার আমরা বৈষ্ণব মতাদর্শের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে ঢুকব, তা হল জাতিভেদ। আমরা জানি ‘আচণ্ডালে প্রেম দেব’ -এই অঙ্গীকার করে মহাপ্রভু জাতিভেদ ও বর্ণাশ্রমের বেড়াগুলিকে অস্বীকার করেছিলেন এবং এই কারণে চৈতন্য আন্দোলনকে সমাজবিপ্লবও বলা হয়। তবুও এই অবস্থানটিকে একটু খতিয়ে দেখার দরকার। আমরা যদি উৎপাদনের বহুল বিকাশের সময় হিসেবে চৈতন্যোত্তর যুগকে দেখি, তাহলে খেয়াল করবার যে উৎপাদনের এই বিকাশের একটা আবশ্যিক শর্ত হল উৎপাদন-সম্পর্কের সঙ্গে সমাজব্যবস্থার সাযুজ্য এবং অতি উৎপাদনের প্রয়োজনে নতুনভাবে সমাজে শ্রমবিভাজন ঘটানো। এইখানে জাতিভেদপ্রথার আলোচনা অনিবার্যভাবে এসে পড়ে। বাংলায় জাতিব্যবস্থা কঠোরভাবে স্মৃতিশাস্ত্র বা মনু-নির্ধারিত মতে চলেনি। তদুক্ত বর্ণাশ্রমের বদলে এখানে যে জাতিব্যবস্থা চলেছে, তার মধ্যে কৌলিক বৃত্তির অনস্বীকার্য ছায়া পড়েছে। জাতিগুলি সচরাচর পেশাগত নামে চিহ্নিত হয়। সংকর জাতির নামের মধ্যেও পেশাগত পরিচিতি ফুটে ওঠে।

    ঐতিহাসিকভাবে মানুষ পরম্পরাগত শিক্ষার মাধ্যমে পেশাদার হয়ে উঠেছে। পেশাগত শিক্ষা সে পেয়েছে তার গোষ্ঠী থেকে। আজকের দিনেও যদি আমরা কাজের জগৎ দেখি, হয়ত গরিষ্ঠ অংশের মানুষ অ্যাকাডেমির বদলে সমাজ বা গোষ্ঠী থেকে কাজের ট্রেনিং পান। পরিবার এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমদক্ষতা বা কর্মকুশলতা আধার হয়ে থেকেছে পরিবারগুলি, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে উৎপাদনশীল কাজ করবার পদ্ধতিগত শিক্ষা প্রবাহিত হয়েছে পরিবারের মধ্য দিয়েই। এবং বিবাহও সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। স্থাবর সম্পদ ঐতিহাসিক ভাবে কজন মানুষেরই বা ছিল আর কীই বা ছিল, কিন্তু পরিবার যেহেতু শ্রমের আধার, তার উৎপাদন যাতে ব্যহত না হয় আর উত্তরাধিকার সূত্রে কর্মকুশলতা যাতে প্রবাহিত হয়, সেইটা নিশ্চিত হয়েছে বিবাহের মাধ্যমেও। কৃষি ও কারিগরি উৎপাদনশীল সমাজে এই সাধারণ সূত্রটা প্রায় সর্বত্র বজায় থেকেছে। ফলে জাতিনির্ধারণে পেশার পরিচয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। আমরা এখানে আনন্দভট্ট রচিত বল্লাল চরিত (১৫১০ খ্রিস্টাব্দে রচিত, মূল উপাদান দ্বাদশ শতাব্দীতে গোপাল ভট্টকৃত গ্রন্থ থেকে নেওয়া) থেকে বাংলার সংকরজাতিগুলির কিছু বর্ণনা উদ্ধৃত করব (অনুবাদক দীননাথ ধর)- ‘রত্নকার, স্বর্ণকার, রৌপ্যকার, লিপিকর, তাম্রকার, লৌহকার, শঙ্খকার, তন্তবায়, তণ্ডুলী ও ব্যঞ্জনী, ইহারা সৎশূদ্র ; বৈশ্যের ঔরসে ব্রাহ্মণীর গর্ভে রামক জাতির, ও বৈশ্যের ঔরসে ক্ষত্রিয়ার গর্ভে বৈদেহ জাতির উৎপত্তি। রামকের ঔরসে ক্ষত্রিয়কন্যার গর্ভে উগ্রজাতির, উগ্রকন্যার গর্ভে ব্রাহ্মণের ঔরসে আবৃত জাতির, ব্রাত্য ক্ষত্রিয় ও ব্রাত্য বৈশ্যের ঔরসে ও শূদ্র কন্যার গর্ভে আভীর জাতির, বৈশ্যের ঔরসে বৈদেহকন্যার গর্ভে কংসকার জাতির, বৈশ্যের ঔরসে অম্বষ্ঠ কন্যার গর্ভে গোপ ও গোপাল জাতির, রামকের ঔরসে বৈদেহকন্যার গর্ভে লেষকার জাতির, বৈশ্যের গর্ভে শূদ্রের ঔরসে তৈলকার জাতির, অম্বষ্ঠার গর্ভে স্বর্ণকারের ঔরসে চিকজাতির, বৈশ্যের ঔরসে কুবিন্দ কন্যার গর্ভে কৃষিক জাতির, কৃষিকের ঔরসে গোপ কন্যার গর্ভে তাম্বোলি জাতির, বৈশ্যের ঔরসে শূদ্রকন্যার গর্ভে কন্দুক জাতির, কন্দুকের ঔরসে ব্রাহ্মণীর গর্ভে কল্লপাল জাতির, শূদ্রের ঔরসে ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা ও ব্রাহ্মণীর গর্ভে যথাক্রমে আয়গব, বৈধ ও নরাধম চণ্ডাল জাতির উৎপত্তি হইয়াছে।‘

    আমরা দেখছি, প্রায় সমস্ত সংকরবর্ণই কোনো পেশার সঙ্গে জড়িয়ে। যেখানে পেশামূলক অর্থ নেই, সেখানেও বহুক্ষেত্রে পণ্যবাচক অর্থ পাচ্ছি। যখন দুটি পেশার (পেশার সঙ্গে যুক্ত দক্ষতার) মিলন হচ্ছে, একটি নতুন বৃত্তিমূলক জাতির উৎপত্তি হচ্ছে। আরেকটা জিনিস খুব দৃষ্টিকটু ভাবে আমাদের নজর টানে, তা হল চণ্ডাল শব্দের আগে ‘নরাধম’ শব্দের ব্যবহার। যাই হোক, অতি উৎপাদনের প্রেক্ষিতে এই জাতিভেদ কয়েকটা সমস্যার হেতু হয়। প্রথমতঃ যখন নতুন পেশা হচ্ছে বা এক পেশায় অনেক নতুন লোকের শ্রম দরকার হচ্ছে, তখন জাতিগত বৃত্তি ছেড়ে মানুষকে সেই নতুন বৃত্তিতে ঢুকতে হচ্ছে। এর জন্যে শিক্ষাদান, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা এবং আদানপ্রদান ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে গেলে জাতির ভেদ গুলিকে কিছু শিথিল করতে হবেই। কিন্তু, গোষ্ঠীমূলক বৃত্তি পুরোটা ছেড়ে দিচ্ছে সকলে এরকম না। আমরা আগে আলোচনা করেছি, যিনি কারিগর তিনি আংশিক সময়ের কারিগর, বাকি সময় নিজের সমাজ, নিজের গোষ্ঠীর পেশা বা যৌথ মালিকানার জমি চাষ ইত্যাদি করছেন। যে সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন, তাঁর মধ্যে তাঁর গোষ্ঠীস্বত্তা, নিজের কৌলিক সম্প্রদায়ের সংযোগগুলি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জাতিব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লেও চলবে না। আবার জাতিগত উচ্চ-নীচতা প্রবল থাকলে আন্তঃসম্প্রদায় বিনিময় ব্যাহত হবে। এই সামগ্রিক জটিলতাকে সম্ভবতঃ চৈতন্য আন্দোলন ধারণ করতে পেরেছিল।
    চৈতন্য ও তাঁর পরিকরেরা কিন্তু সকলে জাতিচিহ্ন লোপ করেছেন এরকম নয়। চৈতন্যদেব অনেক জায়গাতেই জাতি হিসেবে ব্রাহ্মণকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্যের জামাই, শাঠীর স্বামী অমোঘ যখন চৈতন্যের নিন্দা করছেন, চৈতন্যদেব পরিতাপ করছেন এই বলে- ‘সহজে নির্ম্মল এই ব্রাহ্মণ হৃদয়/ কৃষ্ণের বসিতে এই যোগ্যস্থল হয়/ মাৎসর্যচণ্ডাল কেন ইহা বসাইলে’ – একদমই জাতিভেদের পরিধির মধ্যে এই উচ্চারণ। কিম্বা, আমরা দেখছি দাক্ষিণাত্যভ্রমণের কালেও তাঁর সঙ্গী, রাঁধাবাড়ার কাজ করবার জন্য নির্বাচিত হচ্ছেন এক ব্রাহ্মণই। আমরা এও খেয়াল রাখতে পারি, নীচজাতি হেতু যবন হরিদাস ঠাকুর কখনওই পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করছেন না। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধায় তাঁর লোকায়ত দর্শন গ্রন্থে জাতিভেদের প্রাথমিক ভিত্তি নির্ধারণ করেছেন অন্তর্বিবাহের মধ্যে দিয়ে। তাঁর মতে একটি জাতির মূল চিহ্ন পেশাগত নয় বরং অন্তর্বিবাহগত। একই পেশাধারী দুই জাতির পরিবারের মধ্যে বিয়ে হয় না, কিন্তু উল্টোটা বহুলপ্রচলিত। বৈষ্ণবরা কিন্তু আন্তর্বিবাহের প্রচলন করেননি (জাতবৈষ্ণব ব্যতীত, সেখানে যদিও নতুন জাতি হিসেবে বৈষ্ণবদের ঐ গোষ্ঠীকে ধরা হচ্ছে)। নিত্যানন্দ বহুবার জাতিভেদের ওপরে উঠেছেন। তিনি অন্ত্যজদের ঘরে অবারিত গিয়েছেন, তাঁদের কাছে খেয়েছেন, তিনি ঘোষণা করেছেন- ‘মোর জাতি মোর ভক্তের জাতি নাই’। স্বয়ং চৈতন্যদেবকে অবধি নিত্যানন্দের নামে জাতিভেদ না মানার নালিশ শুনতে হয়েছে। তিনি কিন্তু বিয়ের সময় ব্রাহ্মণকণ্যার পাণিগ্রহণই করেছেন, তাঁর বংশধরেরাও অন্যথা করেননি। অথবা অদ্বৈত আচার্য, যিনি যবন হরিদাসকে ঘরে তুলে নিচ্ছেন, কিম্বা চৈতন্যদেবকে আদেশ দিচ্ছেন নীচুজাতের মধ্যে ধর্মপ্রচার করতে, তাঁর পুত্র-পৌত্রও বিয়ের সময় স্বজাতির মধ্য থেকেই বিয়ে করছেন। অর্থাৎ, জাতিভেদের প্রথা আমূল ভেঙে ফেলবার অবস্থান বৈষ্ণবরা নিচ্ছেন না। বিভিন্ন নিত্যকর্মে জাতিভেদকে মান্যতা দিচ্ছেন। তাঁরা অথচ অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা জাতিগত পরিচিতির উচ্চ-নীচতা ভাঙছেন। হরিদাসকে মাতৃশ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ করে অদ্বৈত আচার্য বলছেন তোমাকে খাওয়ালে শতজন ব্রাহ্মণকে খাওয়ানোর থেকে বেশি পুণ্য হয়। চৈতন্যদেব কাজিদলন পর্বের পর প্রথমেই কলার খোল থোড় মোচা বিক্রি করা দরিদ্র শ্রীধরের ঘরে গিয়ে তাঁর জলপাত্রে জল খাচ্ছেন। চৈতন্যদেব শ্রীধরের জাতি নির্ধারণ না করে বলছেন- বৈষ্ণবের জলপানে বিষ্ণুভক্তি হয় (চৈতন্যভাগবত)। বৈষ্ণব-পরিচিতিকে জাতি পরিচিতির ঊর্ধ্বে স্থান দিতে তাঁদের বহুবার দেখা গেছে। হরিদাস ঠাকুরের সঙ্গে আত্মিক ঘনিষ্ঠতার পরে এসেছে রায় রামানন্দের সঙ্গে চৈতন্যদেবের রস-আস্বাদন। রামানন্দের সঙ্গে আলোচনাতেই আমরা সাধ্যসাধনতত্ত্বের মূল সূত্রগুলি পাই। রামানন্দ শূদ্র, কিন্তু চৈতন্যদেব তাঁকে বারবার আলিঙ্গন করেছেন, তাঁর রচিত কৃষ্ণভক্তি পদ শুনে নিজের হাতে তাঁর মুখ আচ্ছাদন করেছেন। কাশীতে চন্দ্রশেখর, উত্তরভারতে সানোরিয়া ব্রাহ্মণ (অস্পৃশ্য), এবং এরকম আরও অনেকের ঘরে তিনি উঠছেন, তাঁদের কাছে খাচ্ছেন, যাঁরা অব্রাহ্মণ, শূদ্র। সুতরাং, জাতিপ্রথার বিকল্প হিসেবে তাঁরা এক নতুন পরিচিতি তৈরি করছেন, তা হল বৈষ্ণবের পরিচিতি। ‘ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ নহে যদি কৃষ্ণ ত্যাজে/ চণ্ডাল ব্রাহ্মণ সম যদি কৃষ্ণ ভজে।‘ আমরা বলতে পারি, তাঁরা এক দ্বান্দ্বিক অবস্থান নিচ্ছেন যেখানে জন্মগত জাতি-পরিচিতি ততক্ষণই মান্যতা পাচ্ছে যতক্ষণ না বৈষ্ণব হিসেবে পরিচিতির প্রশ্ন উঠছে। এই প্রশ্ন এলে বৈষ্ণব পরিচিতি প্রাধান্য পাচ্ছে। যে পরিচিতি আচরণ ও সাধনার মাধ্যমে ব্যক্তি অর্জন করছেন। শ্রীচৈতন্যদেব-এর উদ্ধৃতি পাচ্ছি- ‘এবে বৈষ্ণব হৈল তার গেল অপরাধ’। বৈষ্ণব হয়ে ওঠা আর সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে। যবন হরিদাসকে চৈতন্যদেব বলছেন- ‘প্রভু কহে তোমা স্পর্শি পবিত্র হইতে’, ‘দ্বিজ ন্যাসী হৈতে তুমি পরম পাবন’ ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সাধ্যসাধনতত্ত্ব, যা নিয়ে আমরা পরের অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা করব, সেই তত্ত্ব কিন্তু চৈতন্যদেব মূলতঃ তিনজনের সঙ্গে বিশদে আলোচনা করছেন বলে আমরা চৈতন্যাচরিতামৃতে দেখতে পাই। এই তিনজন হলেন রায় রামানন্দ, রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী। এঁদের জাতিগত অবস্থান লক্ষ্যণীয়। রায় রামানন্দ যে শূদ্র ছিলেন, তা আগেই বলা হয়েছে। রূপ ও সনাতন খুবই উল্লেখযোগ্য চরিত্র এই সন্দর্ভের। চরিতামৃতে সর্বত্রই তাঁরা নিজেদের নীচজাতি বলে পরিচয় দিয়েছেন- ‘নীচজাতি নীচসঙ্গী করি নীচ কাজ/তোমার অগ্রেতে প্রভু কহিতে বাসি লাজ।‘ এরপরেও অনেকবার তাঁরা নিজেদের নীচজাতি বলে পরিচয় দিয়েছেন। এই ‘নীচজাতি পরিচয়’টা সম্ভবত বিনয়বশতঃ নয়, এর আরও নিদর্শন চরিতামৃতে আছে। রূপ সনাতন কেউই পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করেননি। তাঁরা পুরীতে এলে অন্য ভক্তদের সঙ্গে না থেকে যবন হরিদাসের সঙ্গে থাকতেন। চরিতামৃতে পাচ্ছি-
    ‘সনাতন কহে নীচবংশে মোর জন্ম।
    অধর্ম্ম অন্যায় যত মোর কুলধর্ম্ম।।
    হেন বংশে ঘৃণা ছাড়ি কৈলে অঙ্গীকার।
    তোমার কৃপাতে বংশের মঙ্গল আমার।।‘
    এর উত্তরে চৈতন্যদেব বলছেন-
    ‘নীচজাতি হৈলে নহে ভজনের অযোগ্য।
    সৎকুল বিপ্র নহে ভজনের যোগ্য।।
    যেই ভজে সেই বড় অভক্ত হীন ছার।
    কৃষ্ণভজনে নাহি জাতকুলাদি বিচার।।’

    রূপ সনাতন দবীর খাস নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁদের আসল নাম অন্য, কারণ রূপ ও সনাতন নাম শ্রীচৈতন্যের দেওয়া। চৈতন্যচরিতামৃতের বর্ণনা অনুযায়ী এই সম্ভাবনাও পরিত্যাগ করা যায় না যে তাঁরা মুসলমান ছিলেন। হুসেন শাহের মন্ত্রিত্ব ত্যাগের পরে সনাতনকে দেখে মুসলমান ফকিরের মতন লাগত। হুসেন শাহ যখন বন্দি করে রেখেছিলেন, সনাতন প্রহরীকে ফাঁকি দেন তিনি মক্কায় যেতে চান বলে, এবং প্রহরী তাঁকে কোরানে পণ্ডিত বলে স্বীকার করেন। যাই হোক, রূপ সনাতন ‘নীচজাতি’ হওয়া সত্ত্বেও বৈষ্ণবধর্মের শ্রেষ্ঠ উপাসক এবং তত্ত্ববেত্তা হয়ে উঠেছিলেন। চৈতন্যদেব সম্ভবতঃ কেবলমাত্র এঁদেরই নিজে দীক্ষিত করেছিলেন। তিনি নীচুজাতের হিন্দু ছাড়াও বিজুলি খান, রামদাস পাঠান প্রভৃতি মুসলিমকে বৈষ্ণব করে তুলেছিলেন। এপ্রসঙ্গে একটা উল্লেখ্য বিষয় হল, রামদাস পাঠান, যিনি আগে যোদ্ধা ছিলেন এবং যাঁকে সঙ্গীরা পীর মনে করত, তাঁর সঙ্গে চৈতন্যদেবের কথোপকথন। চৈতন্যচরিতামৃত থেকে উদ্ধৃত করা যাক-
    সেই ম্লেচ্ছমধ্যে এক পরম গম্ভীর।
    কাল বস্ত্র পরে তাকে লোকে বলে পীর।।
    চিত্ত আর্দ্র হৈল তার প্রভুকে দেখিয়া।
    নির্বিশেষ ব্রহ্ম স্থাপে স্বশাস্ত্র উঠাইয়া।
    অদ্বয়ব্রহ্মবাদ সেই করিলা স্থাপন।
    তার শাস্ত্রযুক্তি প্রভু করিলা খণ্ডন।।

    চৈতন্যদেব এইখানে যে যুক্তি দেন, তা লক্ষ্যণীয়। তিনি বলেন কোরাণেও আসলে সগুণ ঈশ্বরের কথাই বলা হয়েছে। শাস্ত্রবেত্তারা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ায় ঐ পির নির্গুণ অদ্বয় ব্রহ্ম বলে তাঁকে ঠাউরাচ্ছেন। পূর্ব পর বিধিমতে দেখতে হবে শাস্ত্রগ্রন্থ শেষে কী বলছে-
    প্রভু কহে তোমার শাস্ত্রে স্থাপি নির্ব্বিশেষ।
    তাহা খণ্ডি সবিশেষ স্থাপিয়াছে শেষ।।
    তোমার শাস্ত্রে কহে শেষ একই ঈশ্বর।
    সর্ব্বৈশ্বর্যপূর্ণ তেহোঁ শ্যামকলেবর।

    কর্ম্মযোগজ্ঞান আগে করিয়া স্থাপন।
    সব খণ্ডি স্থাপে ঈশ্বর তাঁহার সেবন।।
    তোমার পণ্ডিত সবের নাহি শাস্ত্র জ্ঞান।
    পূর্ব্ব পর বিধিমতে পর বলবান।।‘

    এই যুক্তিক্রম কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন। কৃষ্ণদাস নিজে বৃন্দাবনের গোস্বামী পরম্পরার লোক। এই যুক্তি মেনে আমরা যদি বৃন্দাবনের গোস্বামী শাস্ত্রকে দেখি, যেগুলির নামে ব্রাহ্মণ্যবাদের অভিযোগ তোলা হয়, সেখানেও কিন্তু পূর্ব পর বিধিমতে বর্ণাশ্রমের ঊর্ধ্বে বৈষ্ণব পরিচিতি ও হরিভক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গোস্বামী শাস্ত্র রচনার একটা উদ্দেশ্য ছিল বাকি হিন্দু শাস্ত্রের সঙ্গে বিচার করে চৈতন্যমতের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করা। গোস্বামীশাস্ত্রের স্মৃতিগ্রন্থ হরিভক্তিবিলাস অনুরূপ দ্বান্দ্বিক অবস্থান নিয়েছে। কৃত্যকর্মের বর্ণনায় শুরুতে সে বর্ণাশ্রম ও দ্বিজ ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বললেও, শেষে গিয়ে বৈষ্ণব পরিচিতিকে শ্রেষ্ঠত্বের আসন দিয়েছে। রূপ ও সনাতন গোস্বামী তাঁদের সকল রচনায় বর্ণাশ্রমকে বাতিল করেছে বিষ্ণুভক্তির কাছে। তাঁরা বিভিন্ন স্মৃতিগ্রন্থ থেকে সেই মতের সমর্থনও দেখিয়েছেন।

    এই প্রসঙ্গে এও বলবার যে বৈষ্ণবসত্তা যা কৃষ্ণের উপর প্রেম থেকে অর্জিত, সেই সত্তাকে জাতিভেদের উপর তুলে ধরা এবং তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা এই মহাপ্রাণদের বহু প্রয়াসের মধ্য দিয়ে হয়েছিল। কখনও তা এঁদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমে আবার কখনও চিঁড়া মহোৎসবের মতন বিশাল গণ-আন্দোলন করে, যেখানে সব জাতের মানুষ একত্রে খাবার খাচ্ছেন এরকম ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। বৈষ্ণব ধর্ম জাতি বিষয়ে এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান যে নিয়েছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বাংলার সামাজিক গতিময়তায়। লোকেশ্বর বসুর ‘আমাদের পদবীর ইতিহাস’ কিংবা হিতেশরঞ্জন সান্যালের ‘বাংলার সামাজিক গতিময়তা’ গ্রন্থগুলিতে এই নিয়ে বিশদ আলোচনা পাওয়া যাবে।

    গবেষক রমাকান্ত চক্রবর্তী ‘মধ্যযুগে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে ১৮৭০-এর জনগণনায় জানা যায় যে বাংলার প্রাথমিক উৎপাদকদের অধিকাংশ শূদ্র জাতিভুক্ত এবং তাঁরা বৈষ্ণব ভাবাপন্ন (প্রবন্ধ- মধ্যযুগে বাংলায় বৈষ্ণবধর্ম ও তার প্রভাব)। তিনি মন্তব্য করেন যে বৈষ্ণবধর্মের ফসল যে ধর্মীয় ও সামাজিক উদারতা, তা এই উৎপাদকদের পূর্বপ্রজন্মকে বাংলাদেশের উৎপাদনের স্বর্ণযুগে সাহায্য করেছিল। আমরা এই প্রবন্ধে সেই সূত্রগুলি বিশদে অধ্যয়ন করবার চেষ্টা করলাম। আমরা দেখলাম পার্থিব জীবন এবং যাপনের উপর যথোচিত গুরুত্বদান বৈষ্ণবধর্মকে অন্য ধর্মের থেকে আলাদা করেছিল। এই গুরুত্ব নিশ্চিতভাবে এই ধর্মের অনুসারী কারিগরদের পৃথিবী সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে ধর্মচিন্তার বদলে মাটির পৃথিবীতে জীবনযাপনে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছিল। তেমনি জাতিভেদের নিগড় এই আন্দোলনের ফলে শিথিল হওয়ায় পেশাগত অবস্থানের তারল্য বাড়ল এবং সামাজিক সচলতাও বাড়ল। যে সামাজিক সচলতা মধ্যযুগের বাংলার কারিগরি উৎপাদনের অতিবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিল।

    জ্ঞানগঞ্জ থেকে প্রকাশিত পুঁথি - ‘উপনিবেশপূর্ব কারিগরি সমাজে চৈতন্যদেবের ভূমিকা’ থেকে গৃহীত


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইদবোশেখি | ২৮ মার্চ ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    সাডেন ওয়াক - c
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ২৮ মার্চ ২০২৬ ১০:০৫739499
  • পড়ে খুবভালো লাগলো। 
    আমার কয়েক টা প্রশ্ন আছে 
    ১। এই ভক্তি প্লাবনের বিস্তার এর মূল কান্ডারি কে নিতাই না গৌর? 
    ২। এমন কোনো লেখা যেখানে গোরা চাঁদের দুই শশুর বাড়ির অৰ্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের উল্লেখ আছে? 
    With Respect
  • albert banerjee | ২৮ মার্চ ২০২৬ ১০:০৮739500
  • এই ভক্তি প্লাবনের বিস্তার কি নিমাই এর মৃত্যুর পর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়? 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন