এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো  ইদবোশেখি

  • চেনা মন অচেনা অসুখ

    শ্রাবণী
    গপ্পো | ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি | বানপ্রস্থ | বার্বিডল | মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প | শিরোনামহীন কবিতা | ভোটের সার(SIR) কথা | ছাদ এবং বড়ো দিদিমার ক্লাসঘর | একজন ইহুদি শরণার্থী, সেই জার্মান বেষ্টসেলার ও তার রিভিউ | সুফিদের গল্প | চেনা মন অচেনা অসুখ

    অলংকরণ: রমিত



    রিপোর্ট গুলো হাতে নিয়ে একমনে পড়ে চলেছেন ভদ্রমহিলা। সে নি:শব্দে বসে, উৎকণ্ঠায় উদ্বেল, যেন আসামী জজের আদেশের প্রতীক্ষায়, না জানি কী সাজা ঘোষণা হবে। ডাক্তারটির সমস্ত কিছু যেন কীরকম অন্যদের থেকে আলাদা। এই কবছরে কম ডাক্তারের ঘর তো আর ঘোরা হলনা, অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে উপচে পড়ছে। সবাই মোটামুটি একইধরণের, গম্ভীর, পেশেন্টের সাথে বেশী কথা বলবেনা। যা বলবে তাও নানা রকম অচেনা শব্দাবলীর ব্যবহারে জটিল শোনাবে। তরতর করে রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নেওয়া,খসখস করে প্রেসক্রিপশন লেখা, আরো ওষুধ, আরো নানা পরীক্ষার নাম।

    এই ডাক্তারের নাম শুনেছিল পাশের বাড়ির সবিতার কাছে, সবিতার বাপের বাড়ির পাড়ায় থাকে। কাছেই গড়িয়ার ক্লিনিকে বসে। স্বামীও ডাক্তার ছিলেন, কিছুদিন হল মারা গেছেন। ভদ্রমহিলা আগে খুব একটা প্র্যাকটিস করত না, শুধু নিজের বাড়িতে দু চারটে পেশেন্ট দেখত। ইদানীং স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে এখানে ওখানে বসছে। সবিতা খুব প্রশংসা করছিল,
    "একবার দেখাও দিদি, আমার তো ওর ওষুধে কাজ হয়েছে। এক ধরণের রোগের স্পেশালিস্ট হলেও সব কিছু খুব যত্ন নিয়ে দেখে। আজকালকার একচোখো ডাক্তারদের মতো নয়।"

    অবশ্য এই দুবার দেখানোয় এখনো তত অন্যরকম কিছু মনে হচ্ছেনা। প্রথমদিন সমস্যাগুলো মন দিয়ে শুনেছে। পুরনো রিপোর্ট, হিস্ট্রী সব দেখে, দু চারটে টুকটাক প্রশ্ন করেছে, তেমন বেশী কিছু না। কতগুলো ওষুধ লিখে দিয়েছিল যা খেয়ে একমাস পরে আবার কয়েকটা টেস্ট করিয়ে আসতে বলেছিল। আজ সেইমত এসেছে, অনেক কিছু বলার আছে তার, পায়ের ব্যাথাটা যাচ্ছেনা, পেটের সমস্যাও একইরকম আছে। নতুন একটা ব্যথা শুরু হয়েছে বাঁদিকের কোমরে, লাল ট্যাবলেট টা খেলে সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব। এতদিন ধরে এত ডাক্তারের দুয়ারে ঘুরছে, নামকরা, অনামী, কেউই তাকে পুরোপুরি ভালো করতে পারল না!

    বাইরে যে মেয়েটি বসে থাকে, ওজন হাইট সব নেয়, সে ভেতরে ঢুকে এল কিছু বলতে। তার ডাকে ডাক্তার মুখ তুলল, হাতের কাগজগুলো রাখল টেবিলে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন, ঐ গম্ভীর মুখে এত খুঁটিয়ে রিপোর্ট পড়া দেখে ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে পড়ছিল। মেয়েটি বাইরে চলে যেতে ভদ্রমহিলা এবার সোজাসুজি তাকালো ওর দিকে।

    "আপনার শারীরিক সমস্যা তেমন কিছু আমি দেখছি না, রিপোর্ট ভালোই। যা টুকটাক সমস্যা আছে সেসব তো একটা বয়সের পরে সব মেয়েদেরই কমবেশী হয়ে থাকে।"

    কী বলে এই মহিলা ডাক্তার? এত যত্ন করে সব পড়েদেখে শেষে এই রায়! মনটা বেজায় বেজার হয়ে গেল। দুর, এও কিছু করতে পারল না! মুখে বোধহয় মনের ভাব ফুটে উঠেছিল। সেইদিকে তাকিয়ে একটু থেমে থেমে পরের বাক্যটা উচ্চারণ করল ডাক্তার,
    -"মিসেস গুহ, আমার ধারনা আপনার সমস্যার অনেকটাই আসলে মনে।"

    মানে? এ আবার কী কথা, এসব কী বলছে এই মহিলা! এই এত ব্যথা এত জায়গায়, সব মনের ভুল? নাকি রোগ ধরতে না পেরে শেষে সুস্থ মানুষকে পাগল বা বাতিকগ্রস্ত সাব্যস্ত করবে? একটু রেগেই কিছু বলতে যায়, তবে তার আগে ওকে থামিয়ে, ডাক্তার বলে ওঠে,
    -"আপনি হয়ত বুঝতে পারছেন না, অনেকেই পারেনা। এ সমস্যা আমার আপনার মত যেকোনো সাধারণ মানুষেরই হতে পারে। হলে তাকে পাগল বা বিকারগ্রস্ত বলা হয়না। ধরুন না কেন যে আপনার আসলে মন খারাপ। মন খারাপ কোনো না কোনো সময় আমাদের সবারই হয়, তবে এখন আপনার হয়ত একটু বেশী বেশী মন খারাপ। আর সম্ভবত তাই শরীরও এত খারাপ হচ্ছে। আপনাকে আমি ওষুধ দেব, মামুলী কিছু শারীরিক অসুবিধে যা আছে তার জন্য, সেগুলো ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার মনকে একেবারে ভালো করার, খুশী করার কোনো ওষুধ, আমার কাছে নেই। ডাক্তারীর সহজ ভাষায় একে আমি এক ধরণের ডিপ্রেশন বলব, খুঁজলে গালভারী নাম হয়ত কোনো পাওয়া যাবে মনোবিশারদদের বইয়ে। তবে সেসব জেনে দরকার নেই। দীর্ঘদিনের অবহেলায় অযত্নে মনের মধ্যে এক অবসাদ বাসা বেঁধেছে। এর থেকে আপনাকে বেরোতে হবে। এখনই কোনো বিশেষজ্ঞের কাছে আমি যেতে বলছিনা। আগে নিজে একটু চেষ্টা করে দেখুন না, আমার মনে হয় আপনি ঠিক পারবেন। ওষুধ যা দেওয়ার দিচ্ছি, কিন্তু মন না ভালো করলে শরীর পুরোপুরি সারবেনা।"

    বিরক্তি, খুব বিরক্তি অনুভব করে সে। উঠে চলে যেতে ইচ্ছে করে, পারেনা, কে যেন টেনে ধরে রাখে ওকে। কথায় ঝরে ঝরে পড়ে অসহিষ্ণুতা,
    -"তা কী করে হয়? আমার মন খারাপের কোনো কারণই নেই। সুখী সংসার, ছেলে কলেজে, মেয়ে সদ্য চাকরি পেয়েছে, প্রতিষ্ঠিত স্বামী, ঝঞ্ঝাট নেই সংসারে। একটাই সমস্যা আমার, এই অসুস্থতা, শরীরে যেন যুত নেই, সর্বাঙ্গে ব্যথা বেদনা। শরীরের জন্যই যত চিন্তা, যত ভাবনা, এছাড়া সব ঠিক আছে।"

    আমি সুখী, আমি সুখী, হ্যাপি ফ্যামিলী, মন খারাপ, সে কেমন কথা - মনের কোন অন্দর থেকে প্রতিধ্বনি উঠে কোণে কোণে ছড়িয়ে যায়। কী যেন সব বলে যায় ডাক্তারটি, টুকটাক নানান প্রশ্ন। প্রথমটায় অনিচ্ছায় বিরক্তিতে দায়সারা উত্তর দেয়, কথার পিঠে দু একটা আলগা কথায়। কিছু পরে উত্তরগুলো কি এমনিই মুখে এসে যায়? আস্তে আস্তে বিরক্তিটা কখন যে অদৃশ্য হয়ে যায়, সে টেরও পায়না।

    - "যা ভালো লাগে তাই করবেন, যা ভালো লাগেনা, চেষ্টা করবেন জোর করে সেরকম কিছু না করার"।
    - " তাইই তো করি। যা ভালো লাগে সবই করি, খাইদাই, গল্প করি, টিভি দেখি, শুধু শরীরটা গোলমাল করে, নাহলে তো এসব করতে খুব ভালো লাগে।"
    - "সেসব ঠিক আছে। এমন কিছু কী নেই যা আপনার খুব ভালো লাগে কিন্তু অনেকদিন সেভাবে তা করা হয়ে ওঠেনা? আগে ভালো লাগত?”
    - “গল্পের বই? বই পড়তে ভালোবাসতেন? বা, বেশ, তাহলে গল্পের বই পড়বেন। অভ্যেস চলে গেছে তো কী হয়েছে, আবার শুরু করুন। কোনো লাইব্রেরীর মেম্বার হয়ে যান, নিয়মিত বই আনা নেওয়া করুন।"




    - "তোমার বই পড়তে ভালো লাগে? কী ধরণের বই পড়ো তুমি"?

    লাইব্রেরীতে ঢোকার মুখে আচমকা বাধা পড়ল। অতি সাধারণ এক মুখাবয়বে চোখদুটো যেন একটু বেশী উজ্জ্বল, ঠোঁটে আলগা একচিলতে হাসির আভাস। না চেনার ভান করতে ইচ্ছে হলেও উপায় নেই। ধরে বেঁধে পরিচয় না করানো হলে পরিচিত নয়......তাদের এই মফস্বলে,বড় শহরের এসব আদবকায়দার কোনো স্থান নেই। পরিচিত তো বটেই আবার লতায় পাতায় একখানা সম্পর্কও আছে না ওদের বাড়ির সঙ্গে!

    এতদিন মামাবাড়িতে থাকত তাই পালে পার্বণে সেভাবে মাথা ঠোকাঠুকি হয়নি। নাহলে বহু আগেই আলাপের অনেক অবকাশ জুটে যেত। ইদানীং পড়াশোনা শেষ করে নিজের বাড়ী ফিরে নিরিবিলিতে চাকরীর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিশ্চিত, ও যেমন তার খবর জানে, তিনিও ওর সম্পর্কে সবই জানেন! বাড়িতে বই পড়ার খুব চল, নানা জনের হাতে নানা রকমের বই। ঠাকুমার রামায়ণ থেকে শুরু করে মায়ের দেশ, নবকল্লোল। অবরে সবরে সবার হাতে একখানা বই থাকবেই। রাতে বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ না পড়লে কারোর ঘুম আসে না। মা বৌদি এরা যারা বাড়িতে থাকে তারা দুপুরের অবসরেও হাতে গল্পের বই নিয়ে বসে। এমনকী খুদে ভাইপোটা তখনো পড়তে শেখেনি, তাতেই একটা কমিক্স বই হাতে করে ছবিতে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে নিজেই নিজেকে গল্প শোনাতে শোনাতে ঘুমিয়ে পড়ত। গ্রামের লাইব্রেরীতে বাড়ি থেকে তাই একাধিক মেম্বার। প্রায়ই কলেজ থেকে ফেরার পথে ওকে বই পাল্টাতে আসতে হয়। তার হাতে সেদিন “ঘরে বাইরে”, ওর হাতে কতগুলো হালের উপন্যাস। দুজনে প্রায় এক যোগে লাইব্রেরীয়ান কুমারকাকুর টেবিলের সামনে। হাতের বইগুলো জমা দিতে তাথেকে একটা তুলে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে মন্তব্য,
    "এগুলো পড়ো কেন, সময় নষ্ট"। মাতব্বরের মতো নিজের হাতের বইখানা এগিয়ে দেয় ওর দিকে।

    "এইটা পড়ো, পড়েছো আগে?" এবার আর উত্তর না দিয়ে পারা যায়না।

    কুমার কাকু তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে, দৃষ্টি অপ্রসন্ন, দুপুরের ঝিমুনির সময়ে যত উৎপাত। কিভাবে কী হল বুঝে ওঠার আগেই ওর নামে ইস্যু হয়ে যায়, ঘরে বাইরে। আরো দুটো বই নিজের পছন্দে ওকে প্রায় বাধ্য করে নিতে। সব মিটলে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আসে একসাথে দুজনে। এক পা এগিয়ে, আগলে চলায় কেমন বড় অভিভাবকের মত হাবভাব, গা জ্বালানে!
    পাড়ায় ঢোকার মুখ অবধি সাথে এসে তবে থামে, ভাগ্যিস। ঐটুকু পথ পাশাপাশি চলতেই ভয়ে কুঁকড়ে উঠছিল ও, কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে। তা সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ ছিল বলে মনে হয়নি। নিজের পাড়ার দিকে পা বাড়াবার আগে গুরুঠাকুরের মত ওর উদ্দেশ্যে বলে যায়,
    "আগে রবীন্দ্রনাথ ভালো করে পড়ো, তারপরে অন্য সব পড়বে। রবীন্দ্রনাথ না পড়া থাকলে, সাহিত্যে অন্য কোনো কিছুর পূর্ণ আস্বাদ নিতে পারবেনা কোনদিন।"

    বাড়ি ঢুকে নিজের ওপর প্রচন্ড রাগ হতে থাকে। ইস, কী যে হয়েছিল তার! মাথা খারাপ নাহলে একটু আগে লাইব্রেরীতে পুতুলের মতো আরেকজন স্বল্পচেনা মানুষকে নিজের পছন্দ অপছন্দর ওপর কথা বলতে দেয় কখনো। কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই, একবার মনে হয় হাতের বইগুলো আবার ফেরত দিয়ে আসে লাইব্রেরিতে, কিন্তু জানাজানি হলে লোকে কী মনে করবে, কুমারকাকু কী ভাববে, এইসব সাতপাঁচ ভেবে নিজেকে সম্বরণ করে। প্রথমে ভেবেছিল ছোঁবে না বইখানা, রাখতে পারল না প্রতিজ্ঞা। রাগের কাছে শেষমেশ বইয়ের নেশা জয়ী হয়। রাতে শোবার সময় বিছানায় উপুড় হয়ে কৌতুহলে “ঘরে বাইরের” পাতা খুলে দেখে প্রতি পাতায় ধারে ধারে পেন্সিলের দাগ, টুকরো নোট। হাতের লেখা চেনেনা তবু মনে হল টাটকা সীসের আঁচড়, এ তারই হাতের লেখা।

    বই শেষ হলে তারপর তার সে কী পাগলামি, বার বার লাইব্রেরীতে গিয়ে ফিরে ফিরে শুধু ঐ বইটার মেয়াদ বাড়ানো। কদিনে ছাপা অক্ষর সব আদ্যন্ত মুখস্ত হয়ে নোটগুলো মায় পেন্সিলের দাগ অবধি ছবির মত মাথায় আঁকা হয়ে গেল। সারাদিনে নানা কাজের ফাঁকে শুধু সেসবই মনে পড়ে। একটা ঘোরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়, ঠিক যেন ভুতে পাওয়া রোগী।

    আশ্চর্য, এর আগে এতদিনে কখনো তো মনে পড়েনি, কোনো অবকাশে অথবা কোনো বই হাতে নিয়ে। অথচ আজ বই পড়ার কথা উঠতে চোখের সামনে প্রথমেই সিনেমার পর্দার ছবির মত ভেসে উঠল পেন্সিলের দাগ আর নোটে ভরা ঘরে বাইরের পাতারা, আর সেই উস্কোখুস্কো চুলে ভরা মাথা, আর আর ঠোঁটের কোণে "সব জানি" হাসি। মাগো!

    বিয়ের পরে প্রথম প্রথম এবাড়িতে এসে কী অসুবিধেই না হত। আলমারি ভর্তি সাজানো বই, এখান ওখান থেকে উপহার পাওয়া, বিয়ে, জন্মদিনে, প্রাইজ পাওয়া, কিন্তু কেউ পড়েনা। গল্পের বই নিয়ে বসতে দেখলে সবার মুখ ভার, নানান না হওয়া কাজের ফিরিস্তি ভাসত বাতাসে। আলমারী থেকে বই বার করলে আলমারীর ঐ জায়গাটা দেখতে ফাঁকা ফাঁকা, বাজে লাগে, এমন মন্তব্যও শুনতে হত। তাই বোধহয় বই রেখে একটু এদিক ওদিক গেলেই কেউ বইটা তুলে আবার আলমারীতে রেখে দিত। বার বার উঁচু দেওয়াল আলমারী থেকে বই বার করার ঝামেলায় পড়ার ইচ্ছেটাই গেল চলে। রাতে ঘুম আসত না প্রথম প্রথম, একটু কিছু না পড়লে, কিন্তু আলো জ্বাললে পাশের লোকের নাকি বড় অসুবিধে। ভেবেছিল ছেলেমেয়ে বড় হলে, সংসারে হালকা হলে তখন অনেক সময় পাবে বই পড়ার। আর হয় নি, এখন অনেক দায়িত্ব, সংসারের কর্ত্রী, সবদিকে খেয়াল করতে হয়। বন্ধুর মত শাশুড়ী, দুপুরে বউকে পাশে নিয়ে একসঙ্গে বসে সাস বহু সিরিয়াল না দেখলে ওনার মন ভরেনা। সকাল সন্ধ্যেয় বাকীদের অফিস কলেজ যাওয়া ও ফেরা সম্পর্কিত নানা নিত্যকর্ম। যে বাড়িতে অন্য কোনো সদস্যের এমন গল্পের বই পড়ার বদ অভ্যেস নেই সে বাড়িতে থাকতে থাকতে, সবার রঙে রঙ মিলে গেছে।
    “এককালে খুব পড়তেন, এখন পড়েন না? তা আবার শুরু করে দেখুন না, ভালো লাগলে, মন ভালো হবে।"

    আর কী হয়! অভ্যেস চলে গেছে, এখন পড়া বলতে শুধু ঐ ম্যাগাজিন টিন, টুকিটাকি কেনাবেচা, সাজগোজ, ফিল্মী খবর এইসব। একটা আস্ত গল্প উপন্যাস পড়ার মত ধৈর্য্য আর নেই মনে হয়। ঘরে বাইরের সেই ছেলেটার কী যেন নাম ছিল?




    “বেড়াতে যান নিয়মিত? ভালো লাগে বেড়াতে যেতে?"
    "বাঃ, যান, ভালো লাগে যেতে, এতো খুব ভালো কথা। তাহলে আরো একটু বেশী বেশী বেড়াতে যেতে পারেন। ছেলেমেয়ে তো বড় হয়ে গেছে বললেন, স্বামী স্ত্রী দুজনে মাঝে মাঝে ঘুরতে গেলেন, ছোট খাটো ট্রিপ। সবসময় তো দুরে যাওয়া সম্ভব হয়না, সে বছরে দুরে একবার যেমন যান, যান না। তাছাড়াও দু তিনমাস অন্তর দীঘা পুরী মুকুটমণিপুর এই ধরণের কাছাকাছি কোথাও ঘুরে এলেন উইকেন্ডে বা এক আধটা ছুটির দিনে।"

    "আমার জানো সমুদ্র দারুন লাগে, সমুদ্রের ধারে বসে ঢেউ দেখতে দেখতে আমি বোধহয় দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারি। আমার স্বপ্ন ছিল সমুদ্রের ধারে একটা ঘর, মা বলতো নুলিয়ার সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে, এত সমুদ্র সমুদ্র করি।" আসন্ন হানিমুনের কথা চিন্তা করে ঠারেঠোরে নিজের পছন্দ টা জানিয়ে রেখেছিল বিয়ের পরে পরে। হানিমুনে যাওয়া হল দার্জিলিং।
    মামাতো বোন বনি বলেছিল,
    "বাঁচালি বাবা, ঐ বিশ্বসুদ্ধু লোকের মতো বিয়ের পরে পুরী যাওয়া দেখলে বিরক্তি ধরে যায়। সবার বিয়ের অ্যালবামে একটা পুরীর সমুদ্রস্নানের ছবি থাকবে জোড়ে, সালোয়ারের ওপর ওড়না বা গামছা জড়িয়ে, বিচ্ছিরি। বিজনদাকে এরজন্য প্রথম বছরেই ফুল মার্কস দেওয়া যায়"।

    স্বামীগরবে গরবিনীর হাসির আড়ালে ভালবাসার সমুদ্র দুরে সরে গেছিল। যদিও চলতি ট্রেনে জানালার বাইরে তাকিয়ে যখন মনে হচ্ছিল যে পথের শেষে সমুদ্রগর্জনের আওয়াজ নেই, জলের সোঁদা গন্ধ নেই, নোনা হাওয়া নেই, তখন মন একেবারে যে উদাস হয়নি তা নয়। পুরী ছাড়া আর কী সমুদ্র ছিলনা, গোপালপুর, ভাইজ্যাগ! প্রথম প্রথম সন্দেহ হত, একজনের সমুদ্রপ্রীতিই কী অন্যজনকে সমুদ্রবিমুখ করে তুলেছিল! ছিঃ, কীসব উল্টোপাল্টা ভাবত তখন, কম বয়সে। সবার পছন্দ এক হয় নাকি? বার্ষিক বেড়ানোর তালিকায় সেই থেকে উঠে গেল শুধু পাহাড় আর পাহাড়। উত্তর পূর্ব দক্ষিণ মধ্য যে অঞ্চলেই যাক, সেখানে পাহাড় থাকা আবশ্যিক, বাড়িতে সবার পছন্দ পাহাড়। পাহাড়ে যেতে এখনো একটু অস্বস্তি হয়, বিশেষ করে এখন যখন বয়স হচ্ছে। চড়াই উঠতে ভয় করে, দম পায়না। তবু পাহাড়ের দৃশ্যাবলী কত সুন্দর হয়, ঠান্ডা আবহাওয়া, ক্লান্তিটান্তি কম। তাই এখন ওরও পছন্দ পাহাড়, সবার সাথে পছন্দটা মিলিয়ে নিলে সংসারে কত সুবিধে। জোর দিয়ে নিজের পর্বতপ্রেম জাহির করল। কাছাকাছির মধ্যে কম খরচে দীঘা পুরী আছে ঠিকই, কিন্তু সমুদ্র ভালো লাগেনা, পাহাড়ে যেতে ভালোলাগে। ভদ্রমহিলা যেন কেমন, এককথার উত্তরে শান্তি পায় না, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কত কিছু জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে। কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল বিয়ের আগে বাড়ি থেকে বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নয় নয় অন্তত বার আষ্টেক দীঘা ঘোরার কথা, এছাড়া বছরে একবার পুরী, মায়ের গুরুদেবের আশ্রমে। অনেকদিন যাওয়া হয়না, মা নেই, গুরুদেবও চলে গেছেন।

    তাছাড়া দুজনে মিলে বেড়াতে যাব বললেই কী যাওয়া যায় নাকি। সারা সপ্তাহ অফিসে কত দায়িত্বের কাজ, দিনরাতই বাইরে ট্যুরে যেতে হয়।ছুটিতে মানুষটা বাড়িতে একটু বিশ্রাম নেবে, ছেলেমেয়ের সাথে, পরিবার, বন্ধু সবার সাথে সময় কাটাবে। লোক লৌকিকতা, সামাজিক মেলামেশা না করে বউকে নিয়ে একা একা ঘুরতে চলে যাবে, এও কি সম্ভব নাকি? তাও এই বয়সে?

    "তাহলে আপনি একা বেরিয়ে পড়তে পারেন। আজকাল অনেক মহিলা একা একা বেড়াতে যান, সোলো। কাছাকাছির মধ্যে গিয়ে দেখুন, আর সাহস না হলে চেনা পছন্দের জায়গায়, গ্রামের বাড়ি, ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়ি, ঘুরতে চলে যান।এক জায়গায় বসে থেকে থেকে একরকমের জড়তা এসে যায়, বিশেষ করে মনে, সেটা কাটিয়ে উঠতে হবে। কথাটা বোঝার চেষ্টা করুন মিসেস গুহ। আপনার মধ্যে এক সীমাহীন ক্লান্তির আভাস দেখা যাচ্ছে, যা আপনার শারীরিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রন করছে। কিছুদিন, অন্তত কিছুদিন, আপনি সবকিছু নিজের পছন্দে, শুধু আপনার ইচ্ছেতে করে দেখুন। যা ভালো লাগে খান, যেখানে যেতে ইচ্ছে করে যান, যার সঙ্গে গল্প করতে মন চায় করুন।"




    শোনো কথা, এই ডাক্তারেরই মাথায় গন্ডগোল মনে হয়, সবাইকে তাই নিজের মত ভাবছে। সংসারে থেকে শুধু নিজের মত করে যা ইচ্ছে তাই করা যায় নাকি, কেউ পারে করতে? সংসারের একটা নিয়মকানুন নেই? গল্প তো করছে দিবারাত্রি, অষ্টপ্রহর। ঘরে শাশুড়ীর সঙ্গে, বারান্দা ছাদ থেকে আশেপাশে পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে। আগে সন্ধ্যেবেলায় বাকী সদস্যরা বাড়ি ফিরলে, তাদের সাথেও আড্ডা হত, ইদানীং সেটা কমে গেছে। সবাই দেরী করে ফেরে, পদমর্যাদা, পড়ার চাপ, নতুন চাকরি, ইত্যাদির ঝক্কি ঝামেলা কম নয়। আজকের যুগের তালে সবাই ইঁদুর দৌড় দৌড়তে ব্যস্ত। কখনো সখনো তা নিয়ে হালকা অভিমান হলেও মনকে মানিয়ে নেয়। ঘরে বসে বসেও আঁচ পাওয়া যায় বাইরের ব্যস্ত পৃথিবীর কর্মকাণ্ডের, টিভি আর তাহলে কী জন্যে দেখা, এটুকু না বুঝলে। আর সব জেনেবুঝে একেবারে অবুঝের মত রাগ করা কি সাজে নাকি তার বয়সী মহিলাদের?

    বাড়ি ফিরে কোনোরকমে রাতের খাওয়া সেরে সবাই ল্যাপটপে মুখ গুঁজে থাকে, এমনকি ছেলেমেয়ের বাবা পর্যন্ত। ছুটির দিনে বাড়ি থাকলেও সব হয় ঐ ল্যাপটপ নয়ত মোবাইলে ব্যস্ত। সেসময় কথা বলতে গেলে বিরক্ত হয় তারা। তাদের দোষও খুব একটা দেওয়া যায় না। কতদিন চেষ্টা করেছে মাকে কম্পিউটার আর মোবাইলটা শেখাতে, আর কিছু নয় অন্তত পক্ষে মেল টেল বা টেক্সট যাতে ঠিকঠাক করতে পারে।

    "আমরা যদি বাইরে চলে যাই, তখন তো সব যোগাযোগ এই অনলাইনে। এখন আর তোমাদের আমলের মত চিঠি লেখালেখি নেই। কাজে ব্যস্ত থাকলে ফোন করা যায়না, ফোন তোলাও যায়না। একমাত্র মেল বা টেক্সট যে কোনোসময় চেক করা যায়, পড়া যায়।"

    শেখাতে অনেকই চেষ্টা করেছে, বিশেষ করে মেয়েটা। কিন্তু এ তরফে তেমন আগ্রহ দেখেনা, কেমন যেন নিস্পৃহ ভাব। জোর করলে সব গুলিয়ে ফেলেছে, উল্টোপাল্টা করেছে। রাগ হবেনা? অনেক চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে শেখানেওয়ালারা। আজো একটা সম্ভ্রমমিশ্রিত ভয় নিয়ে দুর থেকেই দেখে যায় কম্পিউটারকে, কাছে গিয়ে আপন করে নিতে পারেনা। অথচ কাছাকাছি বয়সের মামাতো পিসতুতো বোনেদের দু একজন যারা বাইরে প্রবাসে বা বিদেশে থাকে, তাদের কারো কারো সঙ্গে মেয়ের দিব্যি চ্যাট চলে। ফেসবুকে মেয়ে তাদের ছবি দেখায়। মাঝে মাঝে মেয়ের মেলে তারা ওকে চিঠি লেখে, ইংরেজী হরফে বাংলা লিখে। মেয়ে সেসব খুলে পড়ায়, উত্তরও লেখা হয় সেভাবেই। বোনেরা লেখে আবার খুব রাগ করে, ও নিজে মেল করতে পারেনা, চ্যাট করতে বা ফেসবুক করতে পারেনা বলে। অন্যের মাধ্যমে লিখে বলে কি আর প্রাণের কথা হয়!

    কম্পিউটারের ব্যাপারস্যাপার দেখে ওতে ঢোকার ইচ্ছে তার তেমন হয় না। কথা না বলে শুধু লিখে লিখে যোগাযোগ, তার পোষাবে না বলে মনে হয়। কিন্তু মোবাইলের কথা আলাদা। হাতের চেটোয় একেবারে নিজস্ব একটা ফোন, যেন একটা খোলা আকাশ।

    এবাড়ির সচল সদস্যদের নিজের নিজের দামী মোবাইল ফোন থাকলেও, ঘরে থাকা দুই সদস্যের জন্যে একটাই মোবাইল। নামে সেটা বাড়ির ফোন হলেও বেশীরভাগই তা শাশুড়ির হাতে ঘোরে।সারা দিনে ক্রমাগত তাঁর আত্মীয়স্বজনদের ফোন আসতেই থাকে, গল্পগুজব, নানা খবরের আদানপ্রদান চলতে থাকে, টিভি দেখার ফাঁকে ফাঁকে।

    অথচ এখন সব বাড়িতে, এমনকী ওদের গ্রামেও সবার হাতে নিজের নিজের মোবাইল ফোন আছে। চাইলেই যে কেউ যার সঙ্গে মন চায়, যখন খুশী, ডেকে কথা বলতে পারে। এককালে বয়সে কিছুটা বড় বৌদি ছিল প্রাণের বন্ধু, যত কথা, আবদার সব তার কাছে। বিয়ের পরে তেমন করে আর যোগাযোগ রইল কই?

    সুন্দরী দেখে গ্রামের মেয়ে ঘরে আনলেও, এদের ছেলের নাকি গ্রামদেশ পছন্দ নয়, শ্বশুরবাড়ী গেছে হাতে গোণা কয়েকবার, কর্তব্যকর্মে। আগে ছেলেমেয়ে যখন ছোট ছিল, তাদের নিয়ে একাই বছরে একবার গিয়ে কদিন থেকে আসত। ছোটবেলায় ওরা খুব ভালোবাসত গ্রামে যেতে, দাদু দিদার কাছে যাবার জন্যে বায়না করত। কিন্তু বড় হয়ে সব কেমন বদলে গেল, আর যেতে চায়না, পাড়াগাঁ বলে নাক সিঁটকায়। তাও আগে যেত মাবাবার কাছে, একা একাই, বছরে এক বা দুবার, ঐ এক দুদিনের জন্যে। সংসারের এত দায়িত্ব কর্তব্য ছেড়ে বেশীদিন কোথাও গিয়ে থাকা চলে না। বাবা মা চলে যাওয়ার পর বছরে সেই দুবার দুদিন, কেমন করে যেন দুবছরে চারবছরে একদিন হতে হতে, শূন্যদিন হয়ে গেছে।

    মাঝে মাঝে বৌদিটার ফোন আসে,। তখন খুব ইচ্ছে হয়, একটু বেশী সময় নিয়ে কথা বলতে, গোটা গ্রাম এক পরিবারের মত, তাদের সবার খবর নিতে। কত কথা জানতে মন চায়, আশকথা পাশকথা যত জমে যায় দিন মাসে, কিন্তু হয়ে ওঠেনা। কেমন করে যেন ঠিক সেসময়ই বাড়ীতে ও মহা দরকারী হয়ে পড়ে। এ ডাকছে, সে খুঁজছে, আর সাড়া না পেলে সবার চোখে মুখে বিরক্তি। শাশুড়িমায়েরও ঠিক সেই সময়ই কাউকে ফোন করার দরকার হয় বা কারুর দরকারী ফোন আসার কথা থাকে। কোনোরকমে কথা শেষ হলে, মুখে মুখে হয় ঠাট্টা নয় বিরক্তির বয়ান ঘুরতে থাকে।

    "বাববা, ফোনে কথা বলতে শুরু করলে মা আর ছাড়তেই চায়না, জগত সংসার যেন ভুলে যাও, গসিপ করতে গিয়ে"।
    "হুঁ, কথা বলার পয়সা নিজের পকেট থেকে তো আর তোর মাকে দিতে হয় না। এই জন্যেই ফোন এত ঘন ঘন রিচার্জ করতে লাগে"।

    কোথাও আবার এক ফোন কলের জন্যে সারাদিন ধরে চাপা বিরক্তি সহ গজগজ চলে,
    "ইস আজ ঠাকুর পুজোটাই ভালো করে হলনা। মানুর মা এসে এমন ডাকাডাকি শুরু করল দরজায়, পুজোর আসন থেকে উঠে দরজা খুলতে হল। বৌমানুষ, গল্পে এত মজে যাবে যে একেবারে হুঁশ থাকবেনা?"

    নিজের একটা মোবাইল থাকলে সবার আড়ালে, নিজের সময় দেখে বৌদিটাকে ফোন করত। শাশুড়ি বিরক্ত হবে বলে এই মোবাইল নাম্বার নিজের বাড়ির লোক অথবা নিতান্ত দরকারী কাজের জন্যে ছাড়া কোথাও কারুকে দেয় না। আত্মীয় স্বজন বিশেষ করে তুতো ভাই বোনেরা বা ক্বচিৎ কখনো পুরনো কোনো বন্ধু বা চেনা জানা কারো সঙ্গে দেখা হলে, তারা ফোন নাম্বার চাইলে, ও এড়িয়ে যায়। বুঝতে পারে, অনেকে অবাক হয়, কেউ আহতও বা, বেশীরভাগই অবশ্য ও যোগাযোগ রাখতে চাইছে না মনে করে গুটিয়ে যায়।সেসময় গুলোতে খারাপ লাগলেও সবাইকে ফোন নাম্বার দিলে যদি ঘন ঘন ফোন আসে, সেতো অন্য অশান্তি! মা বলত না, “সুখের থেকে স্বস্তি ভালো”, সেই কথা ভেবেই সংসারে সবার পছন্দ অপছন্দের এটুকু খেয়াল তো গৃহিণী হিসেবে তাকে রাখতেই হয়। তবু মাঝে মাঝে এই একটা সুবিধের জন্যে মন উথালপাতাল হয়। খুব ইচ্ছে করে কথা বলতে, শুনতে, পুরনো বন্ধুদের সাথে, মামাবাড়ির সাথে, শান্তিতে, নিরিবিলিতে, নিজের সময়ে, কারুর বিরক্তির কারণ না হয়ে।

    কয়েকবার নরম সময়ে তুলেছে কথাটা, স্বামীর কাছে, মেয়ের কাছে।সব বাড়িতেই তো আজকাল প্রত্যেক সদস্যের নিজস্ব ফোন থাকে।স্বামী বড় অফিসার, যুক্তিতর্কে অকাট্য।বুঝিয়েছে, আসলে তো বাড়ির ফোনটা তারই, বুড়োমানুষ মা আর কতটুকু ব্যবহার করে বা কতদিন করবে। শুধুশুধু এতগুলো ফোন কানেকশনের পিছনে পয়সা খরচ করে কী লাভ! মেয়ে আজকালকার, সোজা কথা সোজাসুজি বলে,
    "তুমি তো সারাদিন ঘরে থাকো মা। পড়াশোনা, কাজ, কিছুই নেই, তাছাড়া তুমি তো আজ অবধি স্মার্ট ফোনের ব্যবহারও ঠিকমত শিখতে পারলে না। বাবা তো ঠিকই বলেছে, শুধু কথা বলার জন্যে তোমাদের দুজনের ওই একটা ফোনই যথেষ্ট "।

    দেখতে গেলে ওরা অযৌক্তিক কিছু তো বলেনি। সত্যি কি আর কেউ মাথা কেটে ফেলবে, সপ্তাহে দু একবার ফোন করলে, বা তার কয়েকটা ফোন এলে। আসলে ওরই সেরকম ইচ্ছে হয়না, কী আর কথা বলবে তাদের সাথে, যাদের সঙ্গে এতবছর দেখাসাক্ষাতই নেই সেভাবে!




    -"আপনার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে? তারা আছে এশহরে বা কাছাকাছি? ছেলেমেয়েরা তো বড় হয়ে গেছে, স্বাবলম্বী বলছেন। তা মাঝে মাঝে বন্ধুরা সব এক হয়ে আড্ডা মারতে পারেন তো। দুপুরে বেরিয়ে একসাথে সিনেমা দেখলেন বা কোথাও বাইরে খেলেন। এই বয়সে মেয়েরা অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়, শরীরের ভেতরে অনেক ভাঙাগড়া চলে। সমবয়সী, সমমনস্ক সঙ্গীরা এসময় ভালো সাপোর্ট দিতে পারে, অসুবিধেগুলো অনেক সহজ মনে হয়।"

    সত্যি, এই আজকালকার ডাক্তারদের সব কেমন শুধু গুরুগম্ভীর বাণী দেওয়ার অভ্যেস, ইনি তো আবার যেন তাদের মধ্যেও আরো সৃষ্টিছাড়া। পুরনো দিনের ডাক্তাররা এর চেয়ে অনেক ভালো ছিল। তাদের গ্রামে বিধু ডাক্তার ছিল, একজন ডাক্তারের মত ডাক্তার। জ্বর জালি, পেটখারাপ যাই হোক, এসে প্রথমে নাড়ি ধরত, গম্ভীর মুখে, চেয়ারে বা মোড়ায় বসে শরীরটাকে একটু বাঁকিয়ে, ঘসা চশমার মধ্যে দিয়ে, হাতঘড়ির দিকে চোখ রেখে। সেই মুহুর্তে চারপাশে যারা থাকত তারা, এমনকি রোগী নিজেও বোধহয় দম বন্ধ করে বসে থাকত, ভয়ে। তারপরে গলার স্টেথোটা নিয়ে দু কানে লাগিয়ে বুকে পিঠে সেটা চেপে চেপে বলত,
    "জোরে শ্বাস নে, আরো জোরে"।

    ব্যস, হয়ে গেল রোগী দেখা, সে যেমন রোগই হোক না কেন। তারপরে সেই বোতলে কাগজের দাগ দেওয়া ওষুধ, কয়েক দাগ খেলে যে কোনো মানুষ একেবারে চাঙ্গা। কাগজে পুরিয়াও দিত কখনোসখনো। বেশী বাড়াবাড়ি কিছু হলে ইঞ্জেকশন, তখন বুঝতে হবে একটু বেকায়দার অসুখ। ইঞ্জেকশনের ছুঁচ লাগিয়ে ওষুধ ভরে ফোঁড়বার আগে, একহাতে সিরিঞ্জ ওপরে ধরে, অন্য হাতের হাল্কা ঠেলায় দু চার ফোঁটা ওষুধের ভুড়ভুড়ি কেটে বেরিয়ে আসা। তখনো আবার সবার দমবন্ধ, ঠিকঠাক ছুঁচ ঢুকবে না ভেঙে যাবে!

    বিধু ডাক্তার পাড়ায় বা বাড়িতে ঢুকলে চারধার গমগম করত, অথচ ছোটখাটো মানুষটি বেশী কথা বলত না, এত প্রশ্ন করতনা। কোথায় যে গেল সেসব ধন্বন্তরীরা! মনে মনে সেসব দিনের জন্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু যেন আলগোছ ভাবেই ডাক্তারের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়।

    মালা ছিল খুব কাছের বন্ধু, সই পাতানো ছিল দুজনের। তবে প্রথমদিকে কিছুদিন সই বলে ডাকলেও পরে দুজনেই আবার নাম ধরে ডাকতে শুরু করে দেয়। অনেক দুরে থাকে এখন, দুর্গাপুরে। কবে যে শেষ দেখা হয়েছিল মনেও পড়েনা। কোন একটা বিয়েবাড়িতে নাকি ছোট ভাইপোটার অন্নপ্রাশনে? মালার বড় ছেলে তখন বছর পাঁচেকের হবে, এর মেয়ে তিন বছরের। ভাগ্যিস মালাটার বিয়ে আগে হয়েছিল, কত মজা করেছিল বিয়েবাড়িতে। প্রাণের বন্ধুর বিয়ে, তোড়জোড়ের শুরু থেকে সবকিছুতে সাথে সাথে। বাজারে দোকানে, সমস্ত কেনাকাটাতে কনের সঙ্গী, এমনকি বাড়ি বাড়ি আইবুড়োভাত খেতেও। নিতকনে মালার মাসির মেয়ে, বিয়ের মাত্র দুদিন আগে পৌঁছতে পেরেছিল মাসীরা। তদ্দিন পাড়ার ঘরে ঘরে আইবুড়োভাতে মালার সঙ্গে সবাই ওকে নেমন্তন্ন করেছে, নিতকনের বদলি। খুব মজা হত, নেমন্তন্ন হলেই দুজনে বাজী ধরত, সেদিন মেনুতে মাছ পাওয়া যাবে না মাংস, তাই নিয়ে।

    বিয়েবাড়িতে সাজ দেখে হঠাৎ একফাঁকে বলে কিনা,
    -"বাঃ, তুমি তো বেশ সুন্দর সাজতে পার। এই গুণটা তো জানা ছিলনা, ভালো লাগছে। তবে হাসিটা একটু কম করলে হয় না? বরযাত্রীদের নজর পড়েছে, বলাবলি করছে শুনে এলাম।"

    ভালো বলবে তার মাঝেও কেমন গুরুগিরি, রাগ রাগ ভাব। নজরে পড়বে বলে বিয়েবাড়িতে হাসবে না, সাজবেনা, আশ্চর্য! আসলে নিজে তো গেরাম্ভীর কনেকর্তার ভাব করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ধুতির ওপর একখানা সাধারণ আদ্যির কোঁচকানো পাঞ্জাবী পরে, চুলে সেই বরাবরের মত চিরুনী পড়েনি। বেচারা, যা চেহারা করে ঘুরছে, কোনো মেয়েই তাকাচ্ছেনা বোধহয়। সেই রাগে অন্যের ওপর ঝাল ঝেড়ে গেল!

    রাতে মজা করে বাসর জাগা, কত গান, হাসি। পাড়ার সব ছেলেরা মালার বরের শালা আর মেয়েরা শালী হয়ে গেছিল সেদিন। শেষ রাতে সবার ঘুম কাটাতে জামাইবাবু কে রেফারী করে ছেলে বনাম মেয়েদের অন্তাক্ষরী শুরু হল। উস্কোখুস্কো চুল, হ্যাঁ, মনে মনে তাকে ঐ নামেই ডাকত। সামনাসামনি অবশ্য কোনোদিন ডাকেনি, ভাববাচ্যে কাজ সেরেছে। তার যে অমন গানের গলা, অত ভালো গাইতে পারে,কে জানত। সবাই মুগ্ধ। ছেলেদের মধ্যে যারা বন্ধু বা নিকট প্রতিবেশী তাদের বোধহয় একেবারে অজানা ছিলনা। তবে ইনি অনেকদিন এ গ্রামে ছিলেননা বলে ভুলে গেছিল তারাও।

    "আপনি গান ভালোবাসেন না? রোজ নিয়মিত কিছুটা সময় পছন্দের গান শুনে দেখতে পারেন তো, ভালো লাগবে মনে হয়।"

    "আগে শুনতেন? রবীন্দ্রসঙ্গীত? ছোটোবেলায় শিখেছিলেন? বাঃ, তাহলে তো খুব ভালো। সেইসব পুরনো গান আবার শুনতে শুরু করুন না, টিভিতে দেখা নয়, শুধু শোনা। একা ঘরে চোখ বুজে গান চালিয়ে কিছুক্ষণ শুধু গানের সঙ্গে সময় কাটান। আগে গাইতেন যখন, আবার গানের চর্চা শুরু করলেও তো মন্দ হয়না। বাড়িতে তেমন কাজ থাকেনা, হাতে সময় থাকে অনেক, বলছিলেন না?"

    মেয়ে তখন ছোট, তাকে দুটো তিনটে গান শিখিয়েছিল। বেশ লাগত, ছোট্ট মেয়েটা তোতা পাখির মত আধো আধো বুলিতে গান গেয়ে বাড়িময় ঘুরত। ইচ্ছে ছিল একটু বড় হলে সামনের গানের স্কুলে ভর্তি করে দেবে। মেয়ের শেখার সাথে সাথে নিজের পুরনো অভ্যেসটাও ঝালিয়ে নেওয়া হবে। কথাটা যখন উঠল, তখন আলোচনায় সাব্যস্ত হল, গান না নাচ। নাচ শিখলে এক্সারসাইজ হবে, পড়াশোনা স্কুল ইত্যাদির ফাঁকে খেলাধূলার সময় হয়না, তাই নাচ। গ্রামে তাদের সময়ে এমনিতেই সাঁতার, দৌড়ঝাঁপ করে খেলাধূলা কতকিছু ছিল। স্বাস্থ্যের জন্যে আলাদা করে শরীরচর্চার কথা ভাবতে হত না বাবা মাকে। সেসব সুযোগ এই শহরের বাচ্চাদের জন্যে নেই,একথাটা আগে মাথায় আসেনি, সবাই বলে দিল ভাগ্যিস!

    এদিকে পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথ, ওদিকে গানের বেলায় বলে,
    "শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনো কেন, অন্য গানও শুনবে। আধুনিক গান, সিনেমার গান বলে কি খারাপ নাকি?"

    এছাড়া আরো কত গানের কথা, কত অচেনা শিল্পীদের নাম। তিনি যে শহরে মামাবাড়িতে থেকে হিন্দী গান শোনার অভ্যেসও বাধিয়ে এসেছেন। কথা না বুঝে গান শুনতে ওর ভালো লাগতনা, তবু শুনত হিন্দি মাঝেসাঝে। বাড়ির রেডিও, নাটক আর খবরের সময় ছাড়া ওর দখলে থাকত। ইচ্ছেমত যা খুশী শুনতে পারত, কোনো বারণ ছিলনা। তখন কলেজের পরীক্ষা শেষ, বাড়িতে বসে শুধু রেজাল্টের অপেক্ষা। মালা শ্বশুরবাড়িতে, একেবারে সমবয়সী সঙ্গী পাড়ায় আর কেউ নেই। কাজের মধ্যে সারাদিন রেডিও শোনা আর নিত্য লাইব্রেরীতে বই পাল্টানো। তারইমাঝে একবার মামাবাড়িতে এসে পাত্রপক্ষের সামনে আর এক পরীক্ষায় বসা। কোনো কিছু মনে হয়নি, খারাপ লাগেনি। তাদের মত বাড়িতে চিরকাল জেনে এসেছে, মেয়েদের এটাই ভবিতব্য, এই নিয়ম।

    "কিরে, তলে তলে এত কান্ড বাধিয়ে আছিস, আর আমাকে একবারও বলিসনি"? সেদিন তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, প্রথম বর্ষা। দক্ষিনের বারান্দায় নিরিবিলিতে বসে মাঠ পুকুরের অপরূপ শোভা দেখছিল, কোলের ওপর খোলা পড়ে ছিল গল্পের বই। কখন বৌদি ওপরে উঠে এসেছে খেয়াল করেনি, এতটাই বুঁদ ছিল প্রকৃতিতে। তার উদ্দেশ্যে করা প্রশ্নও প্রথমে ঠিকমত শোনেনি। দ্বিতীয়বার বলতে হুঁশ ফিরে অবাক হয়ে তাকায়, কিসের কান্ড?

    সেই সরল নিস্পাপ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বৌদি প্রথমটায় ধন্দে, তারপরে শক্ত হয়ে বলে,
    -"মানে? তুমি কিছু জাননা বলতে চাও?"

    -"কী জানিনা, হয়েছেটা কী?"

    -"ওপাড়ার কাকা আজ বাবাকে রাস্তায় ধরেছিল, ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ে দিতে চায়। তোর বিয়ের কথা চলছে শুনে এসেছে। ওদের ছেলে নাকি তোকে ছাড়া অন্য মেয়েকে বিয়ে করবেনা। এরপরও তুই বলবি, জানিস না? বাবা তোকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, কতদিন এসব চলছে। খুব রেগে আছে, এক তো আত্মীয়ের মধ্যে, তায় বেকার ছেলে, একদম মত নেই বাবার। তবু বলছে মেয়ের মনের যদি তাই ইচ্ছে হয়, মেনে নিতে হবে। ভাগ্যিস তোর দাদা এখন ইস্কুলে, ফিরে এসে সব শুনলে কী হবে কে জানে! খুব ক্ষেপে যাবে মনে হয়। আমার আর মায়ের ঘাড়েই সব দোষ চাপবে, তোকে চোখে চোখে রাখা হয়নি বলে। এত কথা বলিস আমায়, আর এব্যাপারে কোনোদিন টুঁ শব্দটি করিসনি। চাপা মেয়ে জানি, তবে এত চাপা, পেটে পেটে এত বুদ্ধি তোর! "




    "মিসেস গুহ"। খুব নরম মায়াবী স্বরে ডেকে ওঠেন ডাক্তার। টেবিলের এদিকে কেমন একরকম বিহ্বল ভাব, হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি। ভেতরে সব যেন ওলোটপালোট, ঝড়ে দিশেহারা চরাচর।

    -"কোনো তাড়া নেই, সময় নিন। তবে অনেকদিন হয়ে গেল, না? এবার নিজেকে সময় দিন, নিজের দিকে ফিরে তাকান একটু। হয়ত নিজেকে এতদিন অযত্ন করেছেন, তাই আজ এত সমস্যা। আপনি মন ঠিক করুন, আমি আপনার শারীরিক সমস্যাগুলো মিটিয়ে দেব, কথা দিলাম।"

    নিজেকে তো কতবার দেখেছে। কতবার চেয়েছে না দেখতে, তবু দেখতে হয়েছে। সেই দুপুরেও তো পুকুরের জলে নিজের ছায়া দেখে মনে হয়েছিল, এ মুখ আর দেখাব কেমন করে? নিজেকে? আইবুড়োভাত খেতে গিয়েছিল সইমার বাড়িতে, যেতে হয়েছিল। যেতে চায়নি কিছুতে, তবু কেউ শোনেনি তার কথা। মায়ের অনেকদিনের বন্ধু সইমা, তাকে মেয়ের মত দ্যাখে, না গেলে কষ্ট পাবে। পায়ে আলতা ছুঁইয়ে, পরা কাপড় ছেড়ে সইমার দেওয়া নতুন কাপড় পরে ঘাটে এসেছিল হাত পা ধুতে। সঙ্গে রানু ছিল, সইমার মেয়ে। খিড়কী দিকে বাঁধানো নির্জন ঘাট, রানুটা বারবার পাশের বাড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। তখন বোঝেনি, কী ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ওর বিরূদ্ধে। ঘাটের সিঁড়ির শেষ ধাপে, অল্প জলে পায়ের পাতা ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে, চুপ করে। ওপাড়ে ঘন গাছের সারির বনে, পাতার আড়াল থেকে একটা “বউ কথা কও” একসুরে ডেকে চলেছে। ধেবড়ে গেছে তার পায়ের কাঁচা আলতা, সেই রঙে আর শেওলায় জলে লালচে সবুজ আভাস। নীচু হয়ে এক আঁজলা ভরে জল তুলে মুখে ঝাপটা মারে, চোখ তার আধবোজা। আলগা আঁচলে মুখ মুছে, ফিরে উঠতে গিয়ে তাকিয়ে দেখে রানু নেই। তার বদলে ওপরের ধাপে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির ছেলে।

    -"আমি কাল চলে যাচ্ছি। যাবার আগে তোমাকে একবার দেখতে চেয়েছিলাম। একটু আগে রানু গিয়ে বলল, তুমি আলতা পরছ, এখুনি ঘাটে আসবে।"

    কী লজ্জা, কী লজ্জা, শেষে রানুও! তার মানে সবাই জানে, সবাই মনে করে সে এরকম একটা কাজ করেছে? সবাই এই ছেলেটার মিথ্যেকে সত্যি মনে করে? ডুবে মরতে ইচ্ছে হয়েছিল, লজ্জা রাগ সব এসে মনের মধ্যে তোলপাড় তুলেছিল। অবশ্য সব ভাবনা শুধু মনে, ক্ষনিকের জন্য। এমনিতে যেখানে দাঁড়িয়েছিল, যেমনভাবে, সেখান থেকে একচুল নড়তে পারেনি। কেমন যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল সারা শরীর। চোখের পাতা প্রথম দেখার পরে সেই যে নামিয়েছিল তাও আর তুলতে পারেনি।

    -"তোমার দাদা সেদিন অনেক কিছু বলে গেল, সেগুলো নাকি তোমারও কথা। আমি কিছু বলিনি, কোনোদিন এমন কথাও কাউকে বলিনি যে যা আমার মনে আছে, তা তোমারও মনে। যা আমার ভাবনা তা একান্তই আমার। আমার ভালোবাসায় তোমার কোনো দায় নেই, কোনোদিন ছিলনা। আর তাই তোমার ভাবনার, সিদ্ধান্তের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে, তবে তার সাথে আছে নিজের প্রতি মমতা,তাই দুরে চলে যাচ্ছি। ভালো থেকো।"

    এতদিনে আর সব কথা ঠিক করে মনেও পড়েনা। ঠিক এই কথাগুলোই সে বলেছিল না আরো অন্যকিছু? অথবা কিছুই বলেনি শুধু চেয়ে দেখেছিল। হয়ত শব্দগুলো পরে ও নিজে গেঁথে নিয়েছে দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। কিন্তু আজ এই ডাক্তারের চেম্বারে বসে বারেবারে আবার সেই কথা কেন মনে আসছে? মনের তো পদ্মপাতা হওয়ার কথা ছিল, অন্তত সে তো এতদিন ধরে তাই জেনে এসেছে, বিশ্বাস করে এসেছে। এভাবে পাতা উলটে দেখার তো কথা ছিলনা!




    সাধারনত একজন পেশেন্টকে যা সময় দেয় তার থেকে একটু বেশীই দিয়ে ফেলেছে এই মহিলাকে। সে অবশ্য গোনাগুনতি রোগী দেখে, তাই ভিড় নেই চেম্বারে, তবু সময় তো বাঁধা। হিসেবমতো এখনো বাইরে অপেক্ষমান জনা চারেকের থাকার কথা। প্রথমদিনেই মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন একটা মনে হয়েছিল। অস্বস্তি, নাকি মায়া? বয়স তার থেকে বেশী হবে, তবে খুব বেশী নয়। রোগীদের হতাশাগ্রস্ত মুখ তার কাছে নতুন নয় কিন্তু এ মুখে শুধু হতাশা, রোগজনিত উদ্বেগ থাকলে কথা ছিলনা। আরো অনেক কিছু যেন ছিল বা ছিলনা। সে কী একটু বেশী বেশী রিয়্যাক্ট করছে?

    দেখতে মহিলাকে বেশ সুন্দর এই বয়সেও, দেখলে সেভাবে রোগভোগা মনে হয় না, সাজপোশাকও মানানসই। শরীরের এত সমস্যার কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু চেহারা দেখলে প্রাণবন্ত লাগে। তবু, তবু কেন ওনাকে দেখে এক নিষ্প্রাণ রোবট বা দম দেওয়া পুতুলের কথা মনে হল ওর!

    কালো চোখে হাল্কা কাজল টেনেছে, চাহনি স্বাভাবিক, তবু কেন মনে হয় ফ্যাকাশে দৃষ্টি, অদ্ভুত এক শূন্যতা ও চোখে? ডাক্তার হয়ে এত বিশদ তার ভাবার কথা নয় বা এভাবে রোগীকে দেখারও কথা নয়। রিপোর্ট দেখে নেড়েচেড়ে ওষুধ দিয়ে দেওয়া, কিছু মামুলী সতর্কবাণী, আগামী দেখানোর তারিখ জানিয়ে দেওয়া। কখনো বা আরো টেস্ট করতে বলা অথবা কোনো রোগ সম্বন্ধিত উপদেশ। এর বেশী হয়ত রোগীরা আশাও করেনা।

    কিন্তু তাও মাঝে মাঝে গোলমাল হয়ে যায়। যেন সামনে গভীর জল, কেউ ডুবছে বা আর একটু এগোলেই ডুবে যাবে। যেন তাকে চেষ্টা করতে হবে ওই ডুবন্ত অথবা ডুবতে উদ্যত মানুষটাকে ডাঙায় ফেরাতে।

    ইতিমধ্যে দুবার পর্দাটা অল্প তুলে সহকারিনী সংকেত দিয়ে গেছে, এর মানে বাইরে অধৈর্য্য পেশেন্ট। তবু কথা বলে যায়, নিজেও জানেনা কী বলছে, কেউ যেন তাকে দিয়ে পরপর কোনো স্ক্রিপ্টের লিখিত ডায়ালগ বলিয়ে নেয়।

    তবে কথোপকথনের মাঝেই একসময় হঠাতই যেন শুরু হয় রঙ বদলানো, ম্যাজিকের মত। যন্ত্রের মধ্যে প্রাণ জাগছে, খুব মৃদু হলেও স্নায়ুতন্তুতে কে যেন সুর তুলতে চেষ্টা করছে। এপার থেকে সেই প্রাণের স্পন্দন সে অনুভব করে, তার নিজের ভেতরেও কি কিছু হচ্ছে?

    আসলে ডাক্তার নিজে তখন একটা আয়না দেখতে পায়। আরশিতে চেনা প্রতিবিম্ব, কন্ঠস্বরে একই আওয়াজ, যেন উত্তর প্রত্যুত্তর নয়, আসলে দুজনেই পাহাড়চূড়ায়, গহীন খাদের একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে, শুনছে যা তা শুধু প্রতিধ্বনি। কথা যেই বলুক, প্রশ্নকর্তা আর উত্তরদাতার মধ্যের ফারাক কখন কিভাবে যেন মিলিয়ে যায়!




    অনেক দেরী হয়ে গেছে, অনেকটা পথ যেতে হবে, বাড়িতে কাজ অনেক। ও তাকায় ডাক্তারের দিকে, আর কত বলতে হবে, শুনতে হবে, এই কথার পিঠে কথার শেষ কোথায়! তখনই তার খেয়াল হয়, এখন সেই শুধু বলে যাচ্ছে। আসলে ডাক্তার অনেকক্ষণ কথা শেষ করে এখন শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছে, চশমার ফাঁক দিয়ে চোখের দৃষ্টিটা ঠিক যেন তাদের সেই কালো দীঘির জলের মতন। এমন মায়াবী চাহনি শেষ কবে সে দেখেছে, কার চোখে!

    ভালো লাগে সমুদ্র, হ্যাঁ সমুদ্র। পাহাড় নয়, পাহাড় বিচ্ছিরি লাগে। আর কোনোদিনো পাহাড়ে যাবেনা, কোনোদিনও নয়।

    মোড়ের মাথার লাইব্রেরী, এই তো সামনে। তবু অনেকটা রাস্তা, নাহলে এত বছর লেগে গেল সেখানে পৌঁছতে? বইয়ের গন্ধ মেখে কাটবে প্রত্যেকটা দুপুর এবার। বিছানার পাশে বই, ঘরের তাকে বই। হারিয়ে যাক না সব দেওয়াল জোড়া বন্ধ আলমারির চাবি!

    সমস্ত পুরনো মোড়ক খুলে, পুরনো খাতা বার হোক। পুরনো যত নাম নম্বর আবার নতুন করে লিখতে হবে। তারপর শুরু হোক কথা বলা, এই এত বছরে, হারিয়ে যাওয়া কালে, কত নাবলা কথা আছে কতলোকের সঙ্গে। প্রিয়জন যারা, সঙ্গিনীরা, পথ খুঁজে তাদের কাছে পৌঁছতেই হবে তাকে।

    ঐ যে কানে হেডফোন গুঁজে, মোবাইলে একান্তে গান শোনে না সবাই, ওটাই ভালো। মোবাইল সে শিখে নেবে, এত কিই বা কঠিন, পড়াশোনায় কম ভালো ছিল নাকি সে, ঠাকুমা তো বলত এ মেয়ে হয় ডাক্তার হবে নাহলে জজ!ডাক্তার হলেই ভালো হত, তাহলে সে অন্যরকম হত, অন্যরকম এই মেয়েটার মতন।

    গান শুনতে হবে, অনেক গান। হ্যাঁ ভালো লাগে তো, সেই যে গজল গান, বড় সুন্দর মায়াময় সব কথা সুর। "কাগজ কী কস্তি, উহ বারিস কা পানী"। ওটা শুনেই না বর্ষার দিনে উঠোনের নর্দমার ফুটো বন্ধ করে, জলে মায়ের বানানো কাগজের নৌকো ভাসানোর কথা মনে পড়েছিল। কান্নায় বুক ভরে উথালপাথাল হয়েছিল!

    ফিরতে হবে, প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া দিনে, পুজোতে, পয়লা বৈশাখে, পৌষালী সন্ধ্যেয়, ফাগুন ভোরে, ফিরতে হবে শৈশবের খেলার মাঠে, যৌবনের দীঘল দীঘির সূর্যাস্তে। বেলায় ঘুম থেকে উঠে, আটপৌরে সে, চায়ের কাপ হাতে ঘাটের ধারে বসে গল্প করবে, বৌদির সাথে, মালার সাথে। সন্ধ্যের মুখে চুল বেঁধে, খোঁপায় গন্ধরাজ ফুল গুঁজে মন্দিরতলার দিকে হাঁটতে যাবে। বর্ষায় যাবে, মাঠের সবুজে চোখ ডুবিয়ে, ভরা পুকুরে ডুব সাঁতার কাটতে। শীতের সকালে ঘাসের শিশিরে পা মাড়িয়ে, দুরে কুয়াশা জড়ানো দিগন্ত পেরিয়ে, ধানের সোনালী ছুঁয়ে আসবে।

    ভাবতে গিয়ে গা শিরশির করে উঠছে, এসবই করতে পারবে, করবে সে, ফিরতে পারবে?

    নাঃ, কিছু জায়গা থাকবে যেখানে আর কখনো ফেরা যাবেনা, ফিরতে পারেনা কেউ। নাহয় নাই বা ফিরল, তবু সেই স্মৃতি থেকে আর মুখ ফিরিয়ে থাকবে না। আলতা পরে, পাটভাঙা শাড়ি পরে কখনো নিরালায় সেই ঘাটের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এক আঁজলা জল তুলে নেবে। নীচের ধাপে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকাবে, সোজা চোখে,হাসিমুখে। সেই ফাঁকা ঘাটের ধাপে অপেক্ষায় থাকে যেন সময় ওর জন্য। জলে যেন মেশানো থাকে নিস্পাপ ভালোবাসার বিজন স্মৃতি!!

    ডাক্তার তাকিয়ে থাকে সামনে বসা মানুষটির দিকে, ভুলে যায় বাইরে তার অপেক্ষায় আরো কেউ কেউ। সারাদিনে কত জন আসে যায় তার চেম্বারে, বারকয়েক না দেখলে কারো মুখও মনে থাকে না। কিন্তু এত আসা যাওয়ার মাঝে সে এমন আয়না যে দেখেনি কখনো। আজ অনেকদিন পরে যে আবার আয়নায় দেখা হয়ে গেল সেই চেনা মেয়েটার সাথে, যার রক্ত দেখলে মাথা কেমন করে উঠত!




    সবিতার বাপের বাড়ির পাড়ার ডাক্তার আজ বিশেষ সময় নিল না, চটপট হয়ে গেল দেখা। রিপোর্ট গুলো হাতে নিয়ে পাতা উল্টে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল। হয়ে গেলে কাগজের থেকে মুখ তুলে এবার সামনে বসে থাকা রক্তমাংসের মানুষটিকে আর একবার খুঁটিয়ে দেখে নেয়। নাঃ, আর সেই প্রাণহীন ভয়ে ভীত ছবিটা দেখা যায়না। তার জায়গায় একটা পরিস্কার উজ্জ্বল সাহসী মুখ।হয়ত এটাই কতকাল আগের সেই মুখ, রক্ত দেখে ভয় পাওয়াকে জয় করেছিল যে মেয়ে একদিন, তারই প্রতিচ্ছবি।

    আয়নাটা এবার ভেঙে যায়, ভেঙে দেয় সে, আয়নার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তাদের দুজনেরই। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাল্কা হাসিটা মুছে ফেলে, দৃঢ়স্বরে, একাধারে ভরসার ও ব্যস্ত পেশাদারীত্বের ভাব গলায় এনে, ডাক্তার বলে ওঠে,
    - “ভালোই তো আছেন, খুব ভালো আছেন। রিপোর্ট সব ঠিকঠাক। ওষুধ কমিয়ে দেব আজ, ভিটামিন ডিটা আর এত ঘন ঘন খাবার দরকার নেই। আরো ভালো হয়ে যাবেন, খুব তাড়াতাড়ি। “


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি | বানপ্রস্থ | বার্বিডল | মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প | শিরোনামহীন কবিতা | ভোটের সার(SIR) কথা | ছাদ এবং বড়ো দিদিমার ক্লাসঘর | একজন ইহুদি শরণার্থী, সেই জার্মান বেষ্টসেলার ও তার রিভিউ | সুফিদের গল্প | চেনা মন অচেনা অসুখ
  • গপ্পো | ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন