বৃষ্টি ভেজা দিনগুলো.........
“মা বাইরে তাকিয়ে দ্যাখো না, বৃষ্টি হচ্ছে?”
“হচ্ছে, কিন্ত জোরে নয়, উঠে পড়।“
“আর পনের মিনিট, মা। তুমি দশ মিনিট পরে আবার জানালায় যেও। যদি দেখ প্রাইমারির ছেলেমেয়েরা ফিরছে, তাহলে ডেকো না, তাহলে রেনি ডে। যদি না ফেরে তাহলে ডেকো।
“রেনি ডে হলেই বা কী? সকাল সকাল উঠে পড়, বাড়িতেই পড়বি। আর এক মাস পরে তোর ফার্স্ট টার্ম না?
এ কথার জবাব দিতে গেলে সকালের মিষ্টি আলতুসি ঘুমটা মাটি হয়। ঝিমলি মুখের ওপর চাদরটা টেনে দিয়ে পাশ ফিরে শুল।
মা গজগজ করতে করতে মশারি খুলতে থাকে। ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভের পড়া, এত কম পড়ে কী করে হয় কে জানে। স্কুলটুকু বাদ দিলে সারাদিনই তো হয় ঘুরে বেড়াচ্ছে নয় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, অথবা গল্পের বইয়ে মুখ দিয়ে বসে আছে। এত বন্ধু যে কোত্থেকে আসে? আবার কারুর না কারুর জন্মদিনের পার্টি লেগেই আছে। আজকাল নাকি এরপরে সব আলাদা হয়ে যাবে বলে, জন্মদিন পালনের বেশী ঘটা। রাত্রি দশটা এগারোটায় সবাই ঘুমোতে গেলে, তিনি আলো জ্বালিয়ে বই খাতা নিয়ে নাকি পড়তে বসেন । অত রাতে কী ছাই পড়া হয় অমন করে কে জানে!
এদিকে টিভিতে কাগজে সব ভালো রেজাল্ট করিয়েদের কথা লেখে, সেসব ছেলেমেয়েরা কত কত ঘন্টা পড়ে দিনে, কতজনের আবার একবছরেই সব স্কুলের সিলেবাস শেষ হয়ে এখন শুধু এন্ট্রান্সের প্রস্তুতি চলছে, শুনলেও কান জুড়িয়ে যায়। আর এবাড়ির ইনি তো পারলে বোধহয় বারো ক্লাসটাও ফেল মারেন!
“মা, ছটা বেজে গেছে, তুমি ডাকনি কেন? দেরী হয়ে গেল।“
মা হাসে।
“উঠে কী করবি, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। স্কুলে ফোন করেছিলাম, রেনি ডে দিয়ে দিয়েছে। তুই তখন বললি তো, রেনি ডে হলে ডেকো না। “
“এমা, বলেছিলাম নাকি? ওমা, আমার মনে নেই, কী মিষ্টি একটা স্বপ্ন দেখলাম মা, ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়, হ্যাঁ মা?”
“ওঠ,বিছানাটা ঝাড়ি। আমি জানিনা, আমার কোনো স্বপ্ন মনে থাকেনা, তাই সত্যি হয়েছে কিনা জানিনা। তা, কী এমন স্বপ্ন দেখলি তুই, যার জন্যে এত আহ্লাদ? স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেছে? তোকে আর পড়তে হচ্ছেনা?”
ঝিমলি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পেছন থেকে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে,
“কী যে বল মা, সবসময় শুধু স্কুল আর পড়া। আমি কি এত ফাঁকিবাজ নাকি? অনুর থেকে কম।“
“শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল আর তোমার অনু। ছাড়, আমার গলায় লাগছে।“
“মাম্মা, শোনো না, দেখলাম, খুব বৃষ্টি হচ্ছে, একদম ঝম ঝমিয়ে। আর আমি আবার ছোট্ট হয়ে গেছি, এ্যালবামের ছবির মত। একটা চারিদিক খোলা, গোল বারান্দায় আকাশী রঙের ফ্রক পরে, তুমি একটা সুন্দর নতুন শাড়ি পরে, আমার মাথায় ফিতে দিয়ে ফুল বাঁধছ। ফিতে টাকে থুতনি থেকে দুই গালেতে জড়িয়ে, মাথায় তুলে ফুল বানাচ্ছ, আমি হাসছি আর বলছি, মা আজকে গোলাপ, আজকে গোলাপ। তোমার শাড়ীর কী সুন্দর গন্ধ। এমন সময় দাদা একটা সাদা তুলতুলে কুকুর নিয়ে এল, আর বাবু কোথা থেকে এসে বলল,
“আজ বৃষ্টির ছুটি, আমরা আজ খিচুড়ি খাব।“
বৃষ্টির ঝাট এসে আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে, অথচ আমাদের জামা ভিজছে না, কোথা থেকে দিদি মিনুদি সবাই এসে আমরা হাত ধরে গোল হয়ে ঘুরছি, আর বৃষ্টিও আমাদের সাথে গোল হয়ে ঝরছে। কী মিষ্টি না মা?”
মার মুখটা কেমন নরম হয়ে এসেছিল শুনতে শুনতে। প্রশ্ন শুনে সম্বিত ফিরে পেয়ে, জোরে জোরে বিছানার বেডকভারটা ঝেড়ে পাতে।
“এর আর সত্যি হবার কী আছে মা। তুমি কি আবার ছোট হতে চাও? এমনিতেই তোমার ঠিকঠাক বড় হবার লক্ষণ খুব একটা দেখতে পাই না আমরা।
বড় হলে কি আর সকালবেলা এইভাবে ঘুমিয়ে আর গুলতানি করে নষ্ট করতে, এগারো বারো ক্লাসের মেয়ে যে কী করে এমন ঘুমাস! আর ওইরকম ফিতে ঘুরিয়ে ফুল আমি তোর মাথায় বানাতাম, যখন তুই ভেজা বারান্দায় পা পিছলে পড়ে থুতনি ভেঙেছিলি, চার বছর বয়সে, এমনি বর্ষা দিনে। সে গল্প তোমার অনেকবার শোনা। বাইরে ফেরিওয়ালার ডাক শুনে দৌড়েছিলি।
ছোট থেকেই মা তোমার ওরকম, হাতে পায়ে লক্ষ্মী, দিনরাত কিছু না কিছু বাধাতে তো।“
“এই বাদলায় আবার বেরচ্ছিস কেন। এমন দিনে কুকুর বেড়ালও রাস্তায় বেরয় নি।“
“বা রে আজ বেস্পতিবার না, আমি অনুর বাড়ি পড়তে যাই না আজ? রোহিত কালকে ওর স্যারের কাছে যে অঙ্কগুলো করেছে সেগুলো আমাদের করায় তো আজ। “
“কাল করে নিস।“
“কাল আমি ফিজিক্স পড়তে যাব গুপ্তা স্যরের কাছে। বৃষ্টি হচ্ছে না এখন,চলে যাই। ফেরার সময় হলে সাইকেল অনুদের ওখানে রেখে রিক্সায় চলে আসব। তুমি বরং রিকশা ভাড়া দাও আর ভেলের জন্য দুটাকা। সিনেমা হলের সামনে থেকে ভেল কিনে নিয়ে যাব, দুজনে খাব।“
মা একটু দ্বিধায়। পড়ার থেকে বন্ধুর সাথে আড্ডার টান বেশী, সে তো বোঝাই যায়। তবে স্কুলের পরে প্রতি বেস্পতিবার ওখানে যায় এটাও ঠিক। অঙ্কে খুব একটা খারাপ নয়, বরং ওটাই একটু ভালোবেসে করে। আড্ডার সাথে একটু পড়া যদি হয়, তাই সই। ঘরে থাকলে বরং কিছু করবে না।
“এই ভাত খেয়েছিস, এখনই ভেল খেতে হবেনা। আমার অত পয়সার গাছ নেই। দুটাকা দিচ্ছি, একটাকা কুড়ি রিকশা ভাড়া।“
ঝিমলি মুখটা নীচু করে মায়ের মুখের কাছে নিয়ে আসে, চোখের পাতায় মেঘ নেমে এসেছে, গলার স্বর ভারী,
“আমাদের পয়সা নেই মা? আমরা গরীব?”
মা একটু সরে গিয়ে হাত তুলে হেসে একটা আলগা থাপ্পড় দিতে, মুখ কুঁচকে হি হি করতে করতে দুড়দাড় সাইকেল নামায় লনের কাদায়।
গেটে তখন প্রিয় বান্ধবী দাঁড়িয়ে, তার উদাস বাউল চোখ, দৃষ্টি দূরে বাস্প ধোঁয়ায় আবছা হয়ে আসা খালের ব্রিজের পানে। সামনে জমিনে জমা জলের আয়নায় কালচে ধূসর আসমানের প্রতিচ্ছবি। বুক ধুকপুক, সাইকেল থেকে একলাফে নামে। হাতের ঠেলায় প্রাণ ফিরে পায় মূর্তি, মুখের ভেতর এতক্ষণের থেমে থাকা বাবল গামের বাবল ফাটিয়ে নিজেকে মানবী প্রমাণ করে। হাসিতে, একটু বা অভিমানে,
“এত দেরী করলি, আমি তো ভাবছিলাম আসবি না।“
ঝিমলির মুখ ছোট হয়ে আসে উদ্বেগে আর শঙ্কায়,
“কেন? ফোন এসে গেছে?“
অনু কিছু বলার আগেই বসার ঘর থেকে দূরভাষের রিং বেজে ওঠে , রিন রিন রিন। দুজনে দৌড়য় পড়িমরি করে, জীবন মরন শমন। কেউ এসে পড়ার আগে তুলতে হবে রিসিভার। সাইকেলটা ঠিকমত স্ট্যান্ডে লাগানো হয়না, ধড়মড়িয়ে পড়ে যায়.........ফিরেও দেখেনা।
“ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়?”
“জানো, আজ এখানে জোর বৃষ্টি হয়েছে, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি।“
----------------------------
“সকাল বেলা রেনি ডে। মা ডাকেনি, আমিও ঘুমিয়েছিলাম আর স্বপ্ন দেখলাম, মিষ্টি মোমের মত স্বপ্ন।“
-----------------------------
“একটা রাস্তা, অনেকদুর চলে গেছে। আচ্ছা তোমার কী মনে হয়? রাস্তারা কি চলে যায়, না একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমার তো মনে হয় ওরা চলে, চলতেই থাকে, আঁকাবাঁকা সোজা সে যেমনই হোক, পথ তাই সবসময় সুন্দর হয়।, পথে নামলে খুশীতে প্রাণ ভরে যায় ।“
----------------------------------
“জানো, দুধারে সারি সারি গাছ। আমাদের ক্যাম্পাসের মত, কিন্তু ঠিক এক নয়, আলাদা। প্রথমে দেখলাম বৃষ্টি, ঘন, নিঃশব্দ। আমি একা ভিজে চলেছি। তুমি পাশে এলে, কোথা থেকে কে জানে। গায়ে তোমার সেই ব্লু উইন্ডচিটার টা। মাথায় হুড তোলা, চশমার কাঁচে জলের ঘাম। আমি ভিজছি, তুমি শুকনো, আমার হাতে বৃষ্টি, আমার মনে ভয় মেশানো অভিমান, তুমি হাল্কা পায়ে এই বোধহয় পেরিয়ে গেলে আমায়!”
-------------------------------------
“হঠাত বৃষ্টি বরফ হয়ে গেল। সাদা সাদা গুঁড়ি গুঁড়ি বরফ, তোমার গায়ে একটা ব্রাউন ওভারকোট, সেই যেমন তোমার বাবা পরেন। তুমি এবার কোট খুলে আমাকে দিলে, আমরা দুজনে একটা কোটে, হেঁটে চলেছি বরফ কেটে......রাস্তাটা কী দারুন শান্ত, শান্তি বুলিয়ে দেয় গায়ে মাথায়.........”
--------------------------------------
“ধ্যাত, রোমান্টিক আবার কী! রোমান্টিক কেন হতে যাবে। মিষ্টি স্বপ্ন। তুমি আজকাল কেমন বড়দের মত কথা বল, ভাল্লাগে না। “
------------------------------------
“হ্যাঁ, অনুকে বললে এখনি বলবে এটা “লেপার্ড ইন দ্য স্নো” র দৃশ্য। আমি ওকে মোটেই বলব না স্বপ্নের কথা।“
-----------------------------------
“কিন্তু তুমি বুঝছ না, এটা একটা ক্যাম্পাসের স্বপ্ন। আমি তো এমনিতে কিছুতেই তোমার ক্যাম্পাসে চান্স পাব না। ভোরের স্বপ্ন সত্যি হলে যদি কিছু হয়।“
-----------------------------------
“হুঁ, করব। এবার থেকে আগরওয়াল গুলো ভালো করে করব। আমার যে ওই রাস্তা, ওই গাছগুলো ওই বৃষ্টি ভীষণ পছন্দ হয়েছে।“
---------------------------------
“নাঃ । ছোটবেলার সেই পুরনো উইন্ডচিটার আর বাবার কোট, ছিঃ। ওই রাস্তায় আমি একাই চলব কাউকে লাগবেনা, এক যদি “লেপার্ড ইন দ স্নো” র হিরো টা এসে যায়, তো ভাবা যাবে। “