এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  • এপস্টাইন এর ফাইল - একটি কেলেঙ্কারি, নাকি একটি ব্যবস্থা: বৈশ্বিক পুঁজির Eros

    Tuhinangshu Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৬১ বার পঠিত
  • সাম্প্রতিক আদালত–নির্দেশিত নথি প্রকাশের পর “এপস্টাইন–ফাইলস” যে মাত্রার উন্মাদনা ও কৌতুহল সংবাদ মাধ্যমে তথা জনপরিসরে সৃষ্টি করেছে, তা কেবল একটি অপরাধ–কাণ্ডের পুনরুজ্জীবন নয়; বরং সমকালীন বৈশ্বিক গণমাধ্যমের কার্যপ্রণালী বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফেডারেল কোর্টে জমা থাকা নথির কিছু অংশ প্রকাশের পরপরই সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন স্টুডিও, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একযোগে যে আলোড়ন দেখা গেছে, তা শুধু অপরাধের ভয়াবহতার জন্য নয়; বরং সংবাদ-ফ্রেমিংয়ের কৌশলগত নির্বাচনের কারণেও আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে। শিরোনামগুলি প্রায় সর্বত্র মূলতঃ কিছু বাঁধা লব্জ ভিত্তিক —“Epstein Files”, “Pedophilia Network”, “Elite Abuse Ring”—যেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে একক ব্যক্তিত্ব হিসেবে এপস্টাইন-কে স্থাপন করা হচ্ছে। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকীকরণ এমনভাবে নির্মিত যে, বৃহত্তর ক্ষমতাবলয়, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, আন্তর্জাতিক চলাচলের অবকাঠামো, এবং রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক সম্পর্কের জটিল নেটওয়ার্কটি আড়ালে পড়ে যায়। সংবাদ-ফুটেজে পুনঃপুনঃ প্রদর্শিত হয় তাঁর ম্যানহাটনের বাসভবনের বাহ্যিক দৃশ্য, প্রাইভেট জেটের ছবি, দ্বীপ-সম্পত্তির আকাশদৃশ্য; কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে সেই সম্পর্ক-নেটওয়ার্কের কাঠামোগত ব্যাখ্যা—কীভাবে অর্থ, দান-অনুদান, পরামর্শক-চুক্তি, ফাউন্ডেশন ও লবিয়িংয়ের ছত্রছায়ায় একটি জটিল পরিসর গড়ে ওঠে।
    এই নথিপত্রে যে নামগুলিকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে এসেছে—যেমন Ghislaine Maxwell, Prince Andrew, Bill Clinton, Donald Trump, Bill Gates কিংবা  Noam Chomsky- তাদের উপস্থিতি মিডিয়া-আলোচনায় প্রায়শই কেবল ‘নাম-উচ্চারণ’-এ সীমাবদ্ধ থাকে। এই উচ্চারণ একদিকে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখে, অন্যদিকে নেটওয়ার্ক-তত্ত্বের মৌল প্রশ্ন—কে কাকে কীভাবে যুক্ত করেছে, কোন আর্থিক প্রবাহ কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বৈধতা পেয়েছে, কোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুঁজি (cultural capital) এই সম্পর্ককে টেকসই করেছে—এসব প্রশ্নকে প্রান্তে সরিয়ে দেয়। মিডিয়া-ফ্রেমিংয়ের এই প্রবণতা রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংবাদ-উৎপাদন নিজেই এক পণ্যায়িত প্রক্রিয়া; দর্শক-সংখ্যা, ক্লিক-রেট, বিজ্ঞাপন-আয়—সব মিলিয়ে যে অর্থনৈতিক চাপ কাজ করে, তা জটিল নেটওয়ার্ক-বিশ্লেষণের বদলে নাটকীয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নৈতিক-আক্রোশভিত্তিক কাহিনিকে প্রাধান্য দেয়। ফলে এপস্টাইন হয়ে ওঠেন ‘অশুভের প্রতীক’, আর তাঁর চারপাশের ক্ষমতার বলয় এক ধোঁয়াটে প্রেক্ষাপটে মিলিয়ে যায়। তাত্ত্বিকভাবে এই পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য ক্ষমতা-সংকেন্দ্রণ, নেটওয়ার্ক-সমাজ ও মিডিয়া-রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক বিবেচ্য। ফুকো ক্ষমতাকে যে সর্বব্যাপী সম্পর্ক-জালে ছড়িয়ে থাকা একটি বিষয় হিসাবে দেখেছিলেন, সমসাময়িক মিডিয়া-পরিসরে সেই ক্ষমতা জালকে প্রায়ই একক মুখে সঙ্কুচিত করা হয়, যেন জটিল কাঠামোকে নৈতিক নাটকে রূপান্তর করা যায়। একইভাবে, Pierre Bourdieu যে ‘social capital’ ও ‘symbolic capital’-এর কথা বলেছেন, তা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক: উচ্চবিত্ত সামাজিক মেলামেশা, দাতব্য অনুদান, বুদ্ধিবৃত্তিক পৃষ্ঠপোষকতা—এসবের মাধ্যমে সম্পর্কগুলি শুধু আর্থিক নয়, সাংস্কৃতিক বৈধতাও অর্জন করে। অথচ সংবাদ-আলোচনায় এই কাঠামোগত স্তর প্রায় অনুপস্থিত। বরং পেডোফিলিয়া-র নৈতিক ভয়াবহতা—যা অবশ্যই গুরুতর—তাকে এমনভাবে সামনে আনা হয় যে, বৃহত্তর এলিট-নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক অর্থনীতি আড়ালে থাকে। এই আড়াল কেবল কাকতালীয় নয়; এটি সংবাদ-প্রস্তুতির পদ্ধতি, মালিকানার গঠন, এবং রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্বমাধ্যমের পাশাপাশি ভারতীয় সংবাদ-পরিসরেও এই বিষয়টি দ্রুত আলোচিত হয়েছে। টেলিভিশন ডিবেট, ইউটিউব চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল—সবখানেই “Epstein Files” একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু প্রায় সর্বত্রই অপরাধের নৈতিকতা, ব্যক্তিগত চরিত্র, এবং চাঞ্চল্যকর বিবরণ; খুব কম ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক, দাতব্য ফাউন্ডেশন, বা নীতি-নির্ধারণের পরোক্ষ প্রভাব। এই প্রবণতা বৈশ্বিক মিডিয়া-রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ: জটিল কাঠামোগত সমালোচনার বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নাটকীয়তা। ফলে এপস্টাইন-কে ‘মুখ’ বানিয়ে যে কাঠামোটি তাঁকে সম্ভব করেছে—ব্যাংকিং, লবিয়িং, প্রাইভেট ফাউন্ডেশন, রাজনৈতিক দান—তা রয়ে যায় আড়ালে।
    এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি কেবল অপরাধ-তদন্তের নয়; বরং জ্ঞান-উৎপাদনের রাজনীতির। কোন নাম উচ্চারিত হবে, কোন সম্পর্ক বিশ্লেষিত হবে, কোন নথি শিরোনাম পাবে—এসবই এক ধরনের বাছাই প্রক্রিয়া। নতুন ফাইল প্রকাশের পর যে মিডিয়া-ঝড় উঠেছে, তা একদিকে ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো করে; অন্যদিকে ক্ষমতার জটিল নেটওয়ার্ককে সরলীকৃত নৈতিক কাহিনিতে রূপ দেয়। ফলে Epstein হয়ে ওঠেন একক অপরাধ-প্রতীক, আর এলিট-নেটওয়ার্কের কাঠামোগত বিশ্লেষণ রয়ে যায় প্রান্তিক। পেডোফিলিয়া–সংক্রান্ত সাক্ষ্য, ভ্রমণতালিকা, ব্যক্তিগত দ্বীপের বর্ণনা, বিলাসী জীবনযাত্রা—এই উপাদানগুলি চিত্রনাট্যের মতো সাজানো হয়। ফলে পাঠক বা দর্শক এক তীব্র নৈতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করেন। এটি স্বাভাবিক ও মানবিক। কিন্তু একই সঙ্গে এই আবেগঘন উপস্থাপন একটি কাঠামোগত প্রশ্নকে পেছনে সরিয়ে দেয়—এমন এক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ছিল, যেখানে একজন ব্যক্তি এত বিস্তৃত এলিট–সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, অভিযোগ সত্ত্বেও?
    মিডিয়া–সমাজতত্ত্বের আলোকে একে ‘স্ক্যান্ডালের পার্সোনালাইজেশন’ বলা যেতে পারে। যখন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা ব্যক্তির চরিত্রে সংকুচিত হয়, তখন সিস্টেমিক সমালোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে। এপস্টাইন তখন হয়ে ওঠেন একক ‘দোষী সত্তা’; তাঁর চারপাশের কর্পোরেট–রাজনৈতিক–একাডেমিক নেটওয়ার্ক পটভূমিতে মিলিয়ে যায়। অথচ নেটওয়ার্ক তত্ত্বের দৃষ্টিতে কোনও ক্ষমতাবলয় একক কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুসংযোগী, বহুস্তরীয়। একটি নেটওয়ার্কে বিভিন্ন ‘নোড’ ও ‘লিংক’ থাকে—যেখানে সামাজিক পুঁজি, আর্থিক পুঁজি ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা পরস্পর বিনিময় হয়। এপস্টাইনের আর্থিক অনুদান, উচ্চপর্যায়ের আমন্ত্রণ, ব্যক্তিগত পরিবেশ—এসব ছিল সেই সামাজিক পুঁজি সঞ্চয়ের মাধ্যম। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে—কেন সংবাদ–আলোচনায় নেটওয়ার্কের অর্থনৈতিক মাত্রা কম গুরুত্ব পায়? উত্তর খুঁজতে গেলে আধুনিক মিডিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হয়। সংবাদমাধ্যম আজ বহুলাংশে কর্পোরেট মালিকানাধীন; বিজ্ঞাপন ও বাজার–প্রতিযোগিতা তার বেঁচে থাকার শর্ত নির্ধারণ করে। চাঞ্চল্যকর ব্যক্তিগত অপরাধ দ্রুত পাঠক আকর্ষণ করে; দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত অনুসন্ধান তুলনামূলকভাবে কম ‘বিক্রয়যোগ্য’। ফলে, পেডোফিলিয়া–কেন্দ্রিক নৈতিক আতঙ্ক সংবাদ–চক্রে প্রধান স্থান পায়, কিন্তু এলিট–নেটওয়ার্কের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পারস্পরিকতা বিশ্লেষণ অপেক্ষাকৃত সীমিত থাকে। এখানে রাজনৈতিক মাত্রাটিও অনস্বীকার্য। যখন  ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিল ক্লিন্টন এর নাম একই সংবাদপ্রবাহে উচ্চারিত হয়, তখন তা প্রায়শই দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে রূপান্তরিত হয়। ফলে আলোচনার কেন্দ্র সরে যায় “কোন দল বেশি দোষী”—এই প্রশ্নে। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব আড়াল করে দেয় যে উভয় পক্ষই বৃহত্তর এলিট–পরিসরের অংশ। আন্তর্জাতিক তুলনায়, ভারতের ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদী বা হরদীপ সিং পুরীর মতো নেতাদের নাম যখন বৈশ্বিক এলিট–মেলামেশার প্রসঙ্গে উচ্চারিত হয়, তখন তা বিশ্বায়িত ক্ষমতার নেটওয়ার্কের ধারণাকে উস্কে দেয়—যদিও প্রত্যক্ষ অপরাধসংক্রান্ত সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত নয়। এই তুলনা দেখায় যে আধুনিক ক্ষমতার বলয় জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করে; অর্থ ও প্রভাবের ভাষা সর্বত্র অভিন্ন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও বিষয়টিকে দেশীয় রাজনীতির চেনা ছকে ফেলে দেবার একটা প্রবণতা পাওয়া যায়, তাতে দিব্যি হাওয়া দিয়ে যায় গ্লোবাল মিডিয়া। পরিতাপের কথা, যে চমস্কি এই আলোচ্য বিষয়টিতে আমাদের আলোকপাতে প্রায় এক মুখ্য ভূমিকা পালন করে এলেন তিনিই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
    এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক স্তরও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যাকে ফ্রয়েডীয় ভাষায় “slip” বা অসচেতন আত্ম-উন্মোচন বলা যেতে পারে। ফ্রয়েড তাঁর The Psychopathology of Everyday Life-এ দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতাবান বা শিক্ষিত ব্যক্তি যতই আত্ম-নিয়ন্ত্রণের বাহ্যিক কাঠামো নির্মাণ করুন না কেন, অবচেতন বাসনা প্রায়শই আচরণ, ভাষা কিংবা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফাঁস হয়ে যায়। এপস্টাইন-সংক্রান্ত নথিপত্রে এবং এর পূর্ববর্তী বহু কেলেঙ্কারিতে—যৌন শোষণ, মানব পাচার, কর্পোরেট দুর্নীতি কিংবা আর্থিক প্রতারণা—এক ধরনের পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন দেখা যায়: উচ্চস্তরের সামাজিক মর্যাদা ও নৈতিকতার ঘোষিত ভাষ্য একদিকে, এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, দেহতৃষ্ণা ও ক্ষমতার উন্মত্ত ভোগ অন্যদিকে। এই দ্বৈততার মধ্যেই ফ্রয়েডীয় “slip” কাজ করে—যেখানে প্রকাশ্যে সংযমের দাবি, কিন্তু গোপনে সীমা লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা। এটি কেবল ব্যক্তির নৈতিক বিচ্যুতি নয়; বরং এলিট-পরিসরের এক কাঠামোগত মনস্তত্ত্ব, যেখানে অর্থ ও ক্ষমতা অবচেতন ইচ্ছাকে কার্যকর করার অবকাঠামো জোগায়। এপস্টাইন-কে ঘিরে যে সংযুক্ত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে—সামাজিক আমন্ত্রণ, ব্যক্তিগত উড়ান, দাতব্য ফাউন্ডেশনের যোগাযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়-সংযোগ, রাজনৈতিক পরিচিতি—তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ইঙ্গিত দেয় এক প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত আকাঙ্ক্ষা-ব্যবস্থার দিকে। এখানে “Eros” কেবল যৌন বাসনা নয়, বরং অধিকার করার, নিয়ন্ত্রণ করার, এবং ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা—যা বৈশ্বিক পুঁজিবাদের বিস্তারতত্ত্বের সঙ্গেও সাযুজ্যপূর্ণ। মার্কুস তাঁর Eros and Civilization-এ দেখিয়েছিলেন, আধুনিক সভ্যতা উৎপাদনশীলতার নামে Eros-কে নিয়ন্ত্রণে রাখে, কিন্তু একই সঙ্গে পণ্যায়নের মাধ্যমে তাকে বাজারে পুনঃপ্রবর্তন করে। এই দ্বৈত গতি—দমন ও পুনরুৎপাদন—এলিট নেটওয়ার্কে বিশেষভাবে দৃশ্যমান। একদিকে কর্পোরেট নৈতিকতার ভাষ্য, সি এস আর রিপোর্ট, ফাউন্ডেশন-চালিত মানবহিতৈষী প্রকল্প; অন্যদিকে ব্যক্তিগত দ্বীপ, প্রাইভেট জেট, এবং গোপন আমোদ-আহ্লাদ। ফলে Eros এখানে পুঁজির অন্তঃস্রোত—যা লেনদেন, প্রভাব, এবং সামাজিক মূলধনের মাধ্যমে চলাচল করে। এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা লক্ষ্য করি, বহু আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারিতে—ব্যাংকিং জালিয়াতি থেকে শুরু করে যৌন অপরাধ পর্যন্ত—একই সামাজিক বলয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই পুনরাবৃত্তি নিছক কাকতালীয় নয়; বরং নেটওয়ার্ক-সমাজের এক স্বাভাবিক ফল, যেখানে সীমিত সংখ্যক ব্যক্তি বিপুল সম্পদ ও প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ, পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এক ধরনের ‘বন্ধ সার্কিট’ তৈরি করে। এই সার্কিটের মধ্যে অবচেতন আকাঙ্ক্ষা—ক্ষমতা ও দেহের প্রতি আকর্ষণ—নিয়মিতভাবে সুরক্ষা পায়। ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণে এটি এক প্রকার পুনরাবৃত্তি-বাধ্যতা (repetition compulsion): একই কাঠামোতে একই ধরনের আচরণের প্রত্যাবর্তন, যতক্ষণ না তা প্রকাশ্যে ভেঙে পড়ে। এপস্টাইন-ঘটনায় আমরা সেই ভাঙনের আংশিক চিত্র দেখি; কিন্তু নেটওয়ার্কটি নিজে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না। অতএব, এই প্রসঙ্গে Eros ও পুঁজির সম্পর্ককে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। বৈশ্বিক পুঁজিবাদ যে ‘উদ্যোক্তা-স্বাধীনতা’ ও ‘ব্যক্তিগত সাফল্য’-এর বয়ান তৈরি করে, তার অন্তর্গত এক অবদমিত স্তর আছে—যেখানে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ক্ষমতার সহায়তায় সামাজিক নিয়ম ভেঙে দেয়। এপস্টাইন-ফাইলের নতুন প্রকাশ সেই অবদমিত স্তরের সাময়িক উন্মোচন মাত্র। এখানে পেডোফিলিয়ার-র ভয়াবহতা নিঃসন্দেহে কেন্দ্রীয় অপরাধ; কিন্তু তার চারপাশে যে সংযুক্ত সামাজিক বলয়, সেটি ইঙ্গিত দেয়—Eros কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক।
    এপস্টাইন-প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা-সংযোগের যে প্রমান এসেছে তা আমাদের প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় তর্ককে আরও ঘনীভূত করে, বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, তিনি প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সঙ্গে অনুদান, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং বৌদ্ধিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। বিশেষত হার্ভার্ড এ তাঁর আর্থিক সংযোগ এবং কিছু উচ্চপদস্থ একাডেমিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রশ্ন প্রকাশ্যে এলে তা গভীর নৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। একইভাবে Massachusetts Institute of Technology-এ অনুদান গ্রহণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন দানের কাহিনি নয়; বরং পুঁজি ও জ্ঞানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সহাবস্থানের এক সমসাময়িক উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত আইভি লীগ বা বৈশ্বিক শীর্ষস্থানীয় গবেষণা-প্রতিষ্ঠানসমূহ, কেবল জ্ঞান নির্মাণের ক্ষেত্র নয়; তারা সামাজিক ও প্রতীকী পুঁজির উৎস। কোনও বিতর্কিত অর্থদাতা যখন এই পরিসরে প্রবেশাধিকার অর্জন করেন, তখন তিনি কেবল গবেষণার পৃষ্ঠপোষক হন না; বরং নিজেকে একটি নৈতিক ও বৌদ্ধিক বলয়ের অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করেন।  যে ‘symbolic capital’-এর কথা বলেছিলাম, তার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ এখানে দেখা যায়: অর্থনৈতিক পুঁজি রূপান্তরিত হচ্ছে বৌদ্ধিক স্বীকৃতিতে, এবং সেই স্বীকৃতি পুনরায় সামাজিক প্রভাবকে দৃঢ় করছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মারভিন মিনস্কি-এর নামও বিভিন্ন সাক্ষ্যে আলোচিত হয়েছে—যা দেখায়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও একাডেমিক মর্যাদা কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে ওঠে, যদিও অভিযোগের বিচার ও দায় নির্ধারণ পৃথক আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়-সংযোগকে কেবল নৈতিক বিচ্যুতি বা প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বরং এটিকে বোঝা দরকার পুঁজির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে—যেখানে জ্ঞান-প্রতিষ্ঠান এক ধরনের ‘ক্লিনিং মেকানিজম’ বা বৈধতার রূপান্তর-কেন্দ্র। গবেষণা-অনুদান, সেমিনার, ফেলোশিপ, ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ—এসবের মাধ্যমে একটি অন্তঃবৃত্ত (inner circle) তৈরি হয়, যা সামাজিক আস্থার আবরণে আবদ্ধ। ফলে pedophilia-সংক্রান্ত ভয়াবহ অপরাধের নৈতিক আলোচনার বাইরে, আরও একটি স্তর উন্মোচিত হয়: জ্ঞান-রাজনীতি। কে গবেষণার অর্থ জোগায়, সেই অর্থের উৎস কী, এবং সেই উৎসের সামাজিক চরিত্র কেমন—এই প্রশ্নগুলি একেবারেই মিডিয়া-ফ্রেমিংয়ে আড়াল হয়ে যায়। অথচ আমাদের আলোচ্য এলিট-নেটওয়ার্ক আলোচনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত, কারণ এখানেই পুঁজি, ক্ষমতা ও বৈধতা পরস্পরের সঙ্গে বিনিমেয় হয়ে ওঠে। 
    কাজেই যতই গভীরে যাই  দেখা যায়, ‘ম্যানেজমেন্ট’ আর ‘কোটারী’ উভয়ই এখানে একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হিসাবে উঠে আসে। কেলেঙ্কারি প্রকাশের পর আইনি প্রতিরক্ষা, জনসংযোগ কৌশল, প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব বজায় রাখা—সব মিলিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগত দায় স্বীকার বা অস্বীকারের বাইরে, নেটওয়ার্কের স্থায়িত্ব রক্ষা পায়। অর্থাৎ, স্ক্যান্ডাল ব্যক্তিকে গ্রাস করে; কাঠামো টিকে থাকে। এপস্টাইন তখন নৈতিক ক্ষোভের কেন্দ্রে; কিন্তু যে সামাজিক পদ্ধতি তাঁকে দীর্ঘদিন বৈধতা দিয়েছিল, সেটি প্রশ্নাতীত থেকে যায় কিংবা প্রশ্ন উঠলেও সেটিকে একটি ফুটনোটে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। এই ঘটনাকে তাই একটি বৃহত্তর নৈতিক অর্থনীতির সংকট হিসেবে পাঠ করা প্রয়োজন। সমকালীন  ব্যবস্থায় অর্থই সামাজিক মর্যাদার প্রধান উৎস, দীর্ঘদিনের ফসল এই উপপাদ্য; ফলে আর্থিক ক্ষমতা প্রায়শই নৈতিক জবাবদিহিতাকে ছাপিয়ে যায় বা যাবে এটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া যায়। সংবাদমাধ্যম, রাজনীতি ও কর্পোরেট পরিসর—সবই এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তাই এপস্টাইন–ফাইলসের সাম্প্রতিক উত্তাপ আমাদের সামনে এক দ্বৈত বাস্তবতা উন্মোচন করে: একদিকে ব্যক্তিগত বিকৃতি ও অপরাধের ন্যায়সঙ্গত নিন্দা; অন্যদিকে অদৃশ্য এলিট–নেটওয়ার্কের স্থায়িত্ব। প্রশ্নটি তাই কেবল আইনি নয়, সামাজিক ও তাত্ত্বিকও—আমরা কি অপরাধকে ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নৈতিক স্বস্তি লাভ করব, নাকি সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিশ্লেষণ করব, যা অর্থ, প্রভাব ও পারস্পরিক নীরবতার মাধ্যমে এমন এক বলয় তৈরি করে যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন দীর্ঘদিন অক্ষত থাকে? সাম্প্রতিক নথি–প্রকাশ এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। উত্তর খোঁজা এখন জনপরিসরের দায়।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৬১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ৬  - albert banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন