এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • তালিকা সংশোধন নাকি কাঠামো সংশোধন – প্রয়োজন কিসের?  ভোটার হাজির - কন্ঠ কৈ?

    Tuhinangshu Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৮২ বার পঠিত
  • বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এস আই আর প্রক্রিয়া ঘিরে সাম্প্রতিক যে বিতর্ক, তা আপাতদৃষ্টিতে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নাগরিকত্বের নথি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে। দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায় এই বিতর্ক প্রতিদিন নতুন ভাষা পাচ্ছে—কখনও আশঙ্কা, কখনও আশ্বাস, কখনও আইনি যুক্তি, কখনও রাজনৈতিক পাল্টা অভিযোগ। কিন্তু এই কোলাহলের মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায় অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থাকে আমরা কি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছি, নাকি তাকে একটি গভীর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মতো বোঝার চেষ্টা করছি? সংবাদমাধ্যম, সংসদীয় বিতর্ক এবং সামাজিক পরিসরে এস এই আর প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রবল উদ্বেগ ও উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই আলোচনার সীমা লক্ষণীয়ভাবে সংকীর্ণ: এখানে মূলত একটি নথিভিত্তিক ভোটার তালিকা কতটা নির্ভুল, কে তালিকায় থাকবে বা থাকবে না—সেই প্রশ্নই প্রাধান্য পাচ্ছে। অথচ নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কেবল ভোটারের তালিকায় সীমাবদ্ধ করে দেখা মানে গণতন্ত্রের বৃহত্তর কাঠামোকে আড়াল করে ফেলা। ভোটার তালিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র; প্রতিনিধিত্বের ধরন, ভোটের পদ্ধতি, ক্ষমতার পুনর্বণ্টন, এবং বঞ্চিত গোষ্ঠীর রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর—এই মৌলিক প্রশ্নগুলি সার্বিকভাবেইই অনালোচিত। এসআইআরকে ঘিরে চলমান এই উত্তাপ তাই আমাদের সামনে এক বড় শূন্যতা উন্মোচন করে: আমরা কি কেবল তালিকা শুদ্ধ করছি, না কি গণতন্ত্রের গভীর কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন তুলতে প্রস্তুত?
    বিশ্বের দিকে তাকালে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন’ বলতে কোনো একক বা সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি নেই। ব্রিটেন, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যে ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতি চালু আছে, সেখানে একটি নির্বাচনী এলাকায় সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী জয়ী হন—তিনি মোট ভোটের অর্ধেকও না পেলেও। এই পদ্ধতির মূল যুক্তি প্রশাসনিক সরলতা ও শাসনযোগ্যতা। দ্রুত ফল পাওয়া যায়, সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা কমে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ব্যবস্থায় বিপুল সংখ্যক ভোট কার্যত প্রতিনিধিত্বহীন থেকে যায়। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, মোট ভোটের ৩০ বা ৩৫ শতাংশ পেয়ে একটি দল বা প্রার্থী সম্পূর্ণ এলাকার প্রতিনিধিত্ব দাবি করছে, আর বাকি ভোটগুলি সংসদীয় রাজনীতিতে কোনো প্রতিফলনই পাচ্ছে না। এই ‘ওয়েস্টেড ভোট’-এর ধারণা গণতন্ত্রের গাণিতিক যুক্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ইউরোপের বহু দেশে ভিন্ন ধরনের সমাধান দেখা যায়। জার্মানি বা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে অনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে ভোট ও আসনের মধ্যে একটি তুলনামূলক ন্যায্য সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক দল যত শতাংশ ভোট পায়, সংসদে প্রায় সেই অনুপাতে আসন পায়। এর ফলে ছোট দল, আঞ্চলিক স্বার্থ বা সংখ্যালঘু মতাদর্শ সংসদে জায়গা পায়। তবে এই ব্যবস্থারও নিজস্ব জটিলতা আছে। জোট সরকার প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, এবং অনেক সময় নীতিগত আপসকে স্বাভাবিক করে তোলে। স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলিতে এই মডেলের সঙ্গে শক্তিশালী কল্যাণরাষ্ট্র যুক্ত হয়ে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে। আবার ফ্রান্সের মতো দেশে দুই দফার নির্বাচন চালু, যেখানে প্রথম রাউন্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে দ্বিতীয় রাউন্ডে শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে চূড়ান্ত লড়াই হয়। এই পদ্ধতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার নৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করতে চায়, যদিও এতে নির্বাচনী ব্যয় ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে। অন্যদিকে জার্মানি মিশ্র সদস্য অনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে একদিকে স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব, আর একদিকে দলভিত্তিক সামাজিক বৈচিত্র্যকে সংসদে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছে; এতে প্রতিনিধিত্ব বিস্তৃত হলেও জোট সরকার, দীর্ঘ দরকষাকষি ও নীতিনির্ধারণে ধীরগতির অভিযোগ থেকে মুক্তি মেলেনি।  অস্ট্রেলিয়া বাধ্যতামূলক ভোটদান ও প্রাধান্যভিত্তিক ভোট পদ্ধতির মাধ্যমে ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়েছে এবং ভোট নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র কি নাগরিককে ভোট দিতে বাধ্য করতে পারে—এই নৈতিক প্রশ্নও সেখানে সমানভাবে আলোচিত। আরও কিছু দেশে একক আসন ও দলভিত্তিক তালিকার মিশ্রণ দেখা যায়—যেখানে একদিকে স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বজায় থাকে, অন্যদিকে সামগ্রিক ভোটের অনুপাতও আংশিকভাবে প্রতিফলিত হয়। এই বৈচিত্র্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নির্বাচন ব্যবস্থা কোনো নিরপেক্ষ প্রযুক্তি নয়; এটি একটি রাজনৈতিক পছন্দ, যার মাধ্যমে সমাজ নিজের ক্ষমতার কাঠামোকে রূপ দিতে সক্ষম।
    এই জায়গা থেকেই ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপট টিকে অনুধাবন করার প্রশ্ন ওঠে। কারণ ভারতীয় সমাজ ঐতিহাসিকভাবে এমন এক সমাজ, যেখানে নাগরিক পরিচয় কখনোই কেবল ব্যক্তি-নিরপেক্ষ নয়। জাত, শ্রেণি, ধর্ম, অঞ্চল ও লিঙ্গ—এই সব পরিচয় ভোটারকে ঘিরে ধরে। এই বাস্তবতা সবচেয়ে গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন বি আর আম্বেদকর। ১৯২৮ সালের সাইমন কমিশনের সময় থেকেই তাঁর আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যদি ভবিষ্যৎ ভারত কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার গাণিতিক যুক্তিতে শাসিত হয়, তবে সামাজিকভাবে দুর্বল গোষ্ঠীগুলি রাজনৈতিকভাবে চিরকাল পরনির্ভরশীল থেকে যাবে। লখনৌ চুক্তির পর থেকে মুসলিম সমাজ এর জন্য পৃথক নির্বাচন এর প্রস্তাব উঠে আসলেও, দলিত শ্রেণীর অংশীদারিত্বের কোন স্বাভাবিক দাবি এমনকি মতিলাল নেহরুর রিপোর্টে ও পাওয়া যায়না। গোলটেবিল বৈঠকগুলিতে (১৯৩০-৩১) তিনি বারবার এই যুক্তিই তুলে ধরেন যে ভারতীয় সমাজ ব্যক্তিসমূহের সমষ্টি নয়; এটি স্তরীকৃত, শ্রেণিবদ্ধ গোষ্ঠীর সমাহার। এই সমাজে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ বাস্তবে পরিণত হয় ‘এক সামাজিক গোষ্ঠী বহু ভোট’-এ।এই উপলব্ধি থেকেই তিনি পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি তোলেন। তাঁর যুক্তিতে এটি বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং প্রতিনিধিত্বের ন্যূনতম শর্ত। এই অবস্থানকে বোঝার জন্য রাজা শেখর ভুন্দ্রুর Ambedkar, Gandhi and Patel গ্রন্থের বিশ্লেষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে দেখানো হয়েছে, আম্বেদকরের লড়াই কেবল ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, সমানভাবে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের ভেতরকার আধিপত্যশীল ধারণার সঙ্গেও। এই প্রশ্নেই তাঁর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর-র সংঘাত। গান্ধীর আপত্তি ছিল নৈতিক ও রাজনৈতিক—তিনি মনে করতেন পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী হিন্দু সমাজকে বিভক্ত করবে। কিন্তু আম্বেদকরের পাল্টা যুক্তি ছিল নির্মম বাস্তববাদী—যে সমাজ ইতিমধ্যেই বিভক্ত, সেখানে ঐক্যের ভাষা ক্ষমতার অসমতাকে ঢেকে রাখে। রাজা শেখর ভুন্দ্রুর Ambedkar, Gandhi and Patel গ্রন্থে এই সংঘাতের বিশদ বিশ্লেষণ পাওয়া যায়—যেখানে দেখা যায়, আম্বেদকরের লড়াই কেবল ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভেতরের আধিপত্যশীল সামাজিক ধারণার বিরুদ্ধেও।
    ঔপনিবেশিক ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে ‘দ্বি-সদস্য আসন’ বা ডাবল মেম্বার কনস্টিটুয়েন্সি ছিল এক ধরনের আপসনির্ভর কিন্তু গভীরভাবে সমস্যাযুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার উৎপত্তি ১৯৩২ সালের কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড এবং তার পরবর্তী সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসের ভেতর দিয়ে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‌্যামসে ম্যাকডোনাল্ড এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের রাজনৈতিক আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে তথাকথিত ‘ডিপ্রেসড ক্লাস’ বা দলিত জনগোষ্ঠীকে সীমিত প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থায় একটি আসন সাধারণ প্রার্থীর জন্য এবং অন্যটি সংরক্ষিত প্রার্থীর জন্য নির্ধারিত থাকলেও, বাস্তবে তা সামাজিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারেনি। কারণ নির্বাচনী প্রচারের অর্থ, সংগঠন, গ্রাম-সমাজে প্রভাব এবং স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো সবই ছিল উচ্চবর্ণ ও প্রভাবশালী শ্রেণির দখলে। ফলে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত দলিত প্রার্থীরা প্রায়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের অনুগ্রহ ও সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তেন। আম্বেদকর এই ব্যবস্থাকেই তীব্র ভাষায় ‘ছায়া প্রতিনিধিত্ব’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন—যেখানে নির্বাচিত হওয়া সম্ভব হলেও স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া কার্যত অসম্ভব। পুনা চুক্তির পর পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি প্রত্যাহার করতে গিয়ে যে আপস তৈরি হয়, দ্বি-সদস্য আসন তারই একটি বিকৃত রূপ হয়ে ওঠে—আলাদা রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত অন্তর্ভুক্তি। এই পর্বে মহাত্মা গান্ধী সামাজিক ঐক্যের যুক্তিতে পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর বিরোধিতা করলেও, আম্বেদকরের আশঙ্কা ছিল—এই ধরনের ব্যবস্থা দলিতদের নিজস্ব রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করবে। পুনা চুক্তির পর যে নির্বাচনী অভিজ্ঞতা সামনে আসে, তাতে কাগজে-কলমে আপসের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে আম্বেদকর-এর আশঙ্কাকেই একের পর এক সত্য প্রমাণ করে। পুনা চুক্তি অনুযায়ী দলিত প্রতিনিধিত্বের জন্য যে দ্বি-পর্বের নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রস্তাবিত হয়েছিল, তার ধারণা ছিল আপাতদৃষ্টিতে অভিনব—প্রথম পর্বে কেবল দলিত ভোটারদের দ্বারা একটি সীমিত সংখ্যক প্রার্থী নির্বাচন, এবং দ্বিতীয় পর্বে সেই নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্য থেকে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রতিনিধি নির্ধারণ। তাত্ত্বিকভাবে এতে দলিত সমাজের ভেতর থেকে নেতৃত্ব উঠে আসার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, এই প্রথম পর্ব কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। বহু ক্ষেত্রে নির্ধারিত চারজনের বেশি যোগ্য দলিত প্রার্থীই পাওয়া যায়নি, কোথাও আবার প্রক্রিয়াটিই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। ফলে দ্বিতীয় পর্বে সাধারণ নির্বাচনের সময় কংগ্রেস ও অন্যান্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি সহজেই দলিত প্রতিনিধিত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচিত দলিত প্রতিনিধিরা সামাজিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেস-সমর্থিত শক্তির প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন—যা আম্বেদকরের ভাষায় এক রকম ‘নির্ভরশীল প্রতিনিধিত্ব’-রই আরেক রূপ। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর সেই মৌলিক যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে যে, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ছাড়া দলিতদের প্রকৃত রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে এই পর্বে ব্রিটিশ প্রশাসনের ভূমিকা ছিল স্বাভাবিকভাবেই নিষ্ক্রিয়, তারা জানত যে পুনা চুক্তির কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ছে বা পড়বে, তবু নির্বাচনী নকশা সংশোধনে কোনও আন্তরিক উদ্যোগ তারা নিতে চায়নি। তৎকালীন সংখ্যালঘু উপকমিটিগুলিতেও এই বাস্তব সমস্যাগুলি আলোচিত হলেও, তা নীতিগত পরিবর্তনে রূপ নেয়নি। ফলে পুনা চুক্তি-উত্তর নির্বাচনগুলি এক ধরনের নীরব শিক্ষা দিয়ে যায়—প্রতিনিধিত্বের কাঠামো যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের সদিচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা শেষ পর্যন্ত সেই সমাজের রাজনৈতিক স্বার্থকেই শক্তিশালী করে, আর বঞ্চিত গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর যথারীতি প্রান্তে ঠেলে দেয়। 
     স্বাধীনতার পরে এই দ্বি-সদস্য আসন কিছু সময় বহাল থাকে; ১৯৫১–৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনেও এর উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু দ্রুতই স্পষ্ট হয় যে এটি সামাজিক ন্যায়ের বদলে পুরনো ক্ষমতাকাঠামোকেই পুনরুৎপাদন করছে। এই সময় সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্রগঠনের বিতর্কে জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং কে এম মুনশি-র মতো নেতারা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নকে প্রাধান্য দিলেও, প্রতিনিধিত্বের এই কাঠামোগত সমস্যাগুলি পুরোপুরি সমাধান করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯৬১ সালের ডিলিমিটেশন ও সংশোধনের মাধ্যমে দ্বি-সদস্য আসন সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয় এবং একক-সদস্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবু এই ইতিহাস আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিনিধিত্ব কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অসম কাঠামো অক্ষত থাকলে, যে কোনো নির্বাচনী উদ্ভাবন শেষ পর্যন্ত সেই অসমতাকেই নতুন আকারে বৈধতা দেয়। এই পর্বে জওহরলাল নেহরু-র অবস্থান ছিল একদিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আধুনিক জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে দৃঢ়, অন্যদিকে দলিত প্রশ্নে এক ধরনের দ্বিধাগ্রস্ত রাষ্ট্রনৈতিক বাস্তববোধে বাঁধা। ১৯৩২ সালের পুনা চুক্তির সময় নেহরু কার্যত রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত ছিলেন—তিনি তখন দেরাদুন জেলে বন্দি। ফলে গান্ধী–আম্বেদকর বিতর্কের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে কংগ্রেসের সমাজতান্ত্রিক ও আধুনিকতাবাদী কণ্ঠস্বর কার্যকরভাবে উপস্থিত ছিল না। দেশভাগের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং রাষ্ট্রের ভাঙনের স্মৃতি নেহরুর মনে এমন গভীর ছাপ ফেলেছিল যে স্বাধীনতার পরে তিনি প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে যে কোনো ‘পৃথকীকরণমূলক’ ব্যবস্থার প্রতি সতর্ক এবং সন্দিগ্ধ ছিলেন। তাঁর কাছে জাতীয় ঐক্য ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগঠন ছিল তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার, যার ফলে দলিত প্রশ্ন অনেক সময়ই একটি প্রশাসনিক সংরক্ষণ-নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে পৌঁছয় না। অন্যদিকে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল-এর ভূমিকা ছিল আরও বাস্তববাদী ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় গড়া। তিনি মহাত্মা গান্ধী-র সঙ্গে ইয়েরওয়ারা জেলে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে পুনা চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্যকে প্রত্যক্ষভাবে দেখেছিলেন। প্যাটেলের আশঙ্কা ছিল, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী সমাজকে স্থায়ীভাবে খণ্ডিত করবে এবং নবগঠিত রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতাকে দুর্বল করবে। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে কংগ্রেস নেতৃত্বকে স্বাধীনতা পরবর্তী নির্বাচন ব্যবস্থায় দ্বি-সদস্য আসনের মতো আপসকামী কাঠামোর দিকে ঠেলে দেয়—যেখানে অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি থাকলেও ক্ষমতার মূল কেন্দ্র অক্ষত থাকে। কিন্তু আম্বেদকর এই আপসকে কখনওই ন্যায়সঙ্গত সমাধান হিসেবে মেনে নেননি। তাঁর কাছে দ্বি-সদস্য আসন ছিল পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর বিকল্প নয়, বরং তার দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত সংস্করণ—যেখানে দলিত প্রতিনিধিত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নের সময়ও আম্বেদকর প্রায় একাই এই প্রশ্নে লড়াই চালিয়ে যান; যদিও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি, তবু তাঁর বৌদ্ধিক সংগ্রাম থেমে যায়নি। পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি এই রাজনৈতিক পটভূমি থেকে বেশ কিছুটা পথ সরে আসেন। এই দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পুনা চুক্তি, দ্বি-সদস্য আসন বা সংরক্ষণ—কোনোটিই নিছক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না; এগুলি ছিল রাষ্ট্র, সমাজ ও ক্ষমতার গভীর দ্বন্দ্বের প্রতিফলন, যার ছায়া আজও ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপর রয়ে গেছে।
    স্বাধীন ভারতের নির্বাচনী বাস্তবতায় প্রবেশ করলে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা কোনও সরল ‘গণতান্ত্রিক সাফল্যের গল্প’ নয়, বরং এক দীর্ঘ, স্তরবিন্যস্ত ও অন্তর্দ্বন্দ্বে পূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের ইতিহাস। দ্বি-সদস্য আসন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হওয়ার পরে ভারত কার্যত একটি প্রায় ন্যূনতম হস্তক্ষেপমূলক নির্বাচনী কাঠামো গ্রহণ করে—একক আসন, প্রথম-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতি, সীমিত সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সমাজের ভেতরকার শক্তি-সম্পর্কের ওপর ছেড়ে দেওয়া। এই কাঠামোর মধ্যেই ধীরে ধীরে আবির্ভাব ঘটে দলিতভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলির, আঞ্চলিক পরিচয়নির্ভর শক্তির, ভাষা-জাতি-ধর্মভিত্তিক নানা সংখ্যালঘু রাজনৈতিক সংগঠনের। এই দলগুলি কিছু কিছু রাজ্যে ক্ষমতায় পৌঁছয়, কিছু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ‘কিংমেকার’-এর ভূমিকা নেয়, সংসদে দলিত ও অনগ্রসর প্রতিনিধির সংখ্যা পরিসংখ্যানগতভাবে বৃদ্ধি পায়—যা নিঃসন্দেহে ঔপনিবেশিক যুগের তুলনায় এক বড় পরিবর্তন। জনপ্রিয় রাজনীতি সক্রিয় হয়, ভোটব্যাঙ্কের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজের বহু স্তরের মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেকে রাজনৈতিক খেলায় দৃশ্যমান বলে অনুভব করে। কিন্তু এই দৃশ্যমানতার আড়ালেই গড়ে ওঠে আরেক বাস্তবতা—পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ক্রমে কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি, ভর্তুকি, নগদ সহায়তা ও তাৎক্ষণিক সুবিধার ভাষায় বন্দি হয়ে পড়ে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত বৈষম্য, ভূমি, শিক্ষা, উৎপাদন ও ক্ষমতার প্রশ্নগুলি প্রায়শই পেছনে চলে যায়। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সংসদের ভেতরেই নাটকীয় প্রতিবাদের দৃশ্য দেখা যায়—যেমন উত্তরপ্রদেশ এর এক দলিত সাংসদ তফসিলি উপজাতি বা অন্যান্য সংরক্ষিত গোষ্ঠীর দাবিকে ঘিরে উত্থাপিত প্রস্তাবের বিরোধিতায় কাগজ ছিঁড়ে ফেলছেন, উচ্চস্বরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন—যা কেবল ব্যক্তিগত রাগ নয়, বরং অনগ্রসর সমাজগুলির ভেতরকার তীব্র প্রতিযোগিতা, ভাঙন ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রকাশ করে ফেলে নগ্ন ভাবে। এতে স্পষ্ট হয় যে ‘বঞ্চিত’ সত্ত্বা একটি সমজাতীয় রাজনৈতিক সত্ত্বা নয়; রাষ্ট্রীয় নীতির সীমিত সম্পদ ও সুযোগকে ঘিরে তাদের মধ্যেই নতুন ক্ষমতাকাঠামো তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বহু দশকের সংরক্ষণ ও প্রতিনিধিত্ব সত্ত্বেও দলিত, সংখ্যালঘু কিংবা নারীদের কণ্ঠস্বর এখনও প্রকৃত অর্থে স্বায়ত্তশাসিত হয়ে উঠতে পারেনি—তারা প্রায়শই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, পারিবারিক রাজনীতি, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা বা সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের প্রত্যাশার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে সংসদে উপস্থিতি থাকলেও ‘ভেতর থেকে কথা বলার’ রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিতই থেকে যায়। এই অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—এই পদ্ধতি কি সত্যিই সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করতে সক্ষম, না কি এটি কেবল বিদ্যমান অসমতাকে বা সমঝোতাকে নতুন ভাষায় পুনরুৎপাদন করছে? এখান থেকেই আবার নতুন করে পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, বহু-সদস্য আসন, বিকল্প প্রতিনিধিত্ব কাঠামো কিংবা আরও মৌলিক নির্বাচনী সংস্কারের আলোচনা মাথাচাড়া দেয়। স্বাধীন ভারতের দীর্ঘ নির্বাচনী অভিজ্ঞতা তাই আমাদের দেখায়—প্রতিনিধিত্বের পরিমাণ বেড়েছে, রাজনীতি গণমুখী হয়েছে, কিন্তু প্রতিনিধিত্বের গুণগত প্রশ্ন, সামাজিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টন এবং নীরব কণ্ঠগুলির সত্যিকারের রাজনৈতিক উপস্থিতি আজও এক গভীর, অমীমাংসিত সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে।
    নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও সংসদীয় বাস্তবতা একই রকম দ্বন্দ্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে নারী সংরক্ষণ বিল সংসদে বারবার উত্থাপিত হয়েছে, রাজ্যসভায় পাসও হয়েছে, কিন্তু লোকসভায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা ঝুলে রয়েছে দীর্ঘদিন। এই সময়কালে নারী সাংসদরা একাধিকবার সংসদে প্রকাশ্যে বলেছেন যে তাঁরা কেবল সংখ্যা হিসেবে উপস্থিত, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে তাঁদের প্রবেশ এখনো সীমিত। সংসদের বিতর্কে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বা মাতৃত্বকালীন অধিকার নিয়ে আলোচনা প্রায়শই সময়ের অভাবে সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে, অথচ বাজেট, প্রতিরক্ষা বা বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক তত্ত্বে যাকে ‘ডিসক্রিপটিভ রিপ্রেজেন্টেশন’ বলা হয়—অর্থাৎ উপস্থিতি—তা থাকলেও ‘সাবস্ট্যান্টিভ রিপ্রেজেন্টেশন’, অর্থাৎ বাস্তব নীতিগত প্রভাব, বহু ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থেকেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেও নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বের এই সংকট স্পষ্ট। সংসদে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব স্বাধীনতার প্রথম কয়েক দশকের তুলনায় ক্রমশ কমেছে—যা কোনো আইনি নিষেধের ফল নয়, বরং ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কের ফল। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতির ক্ষেত্রে—যেমন ব্যক্তিগত আইন সংস্কার, নিরাপত্তা আইন বা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্ন—সংখ্যালঘু সাংসদদের বক্তব্য সংসদে নথিভুক্ত হলেও, ভোটাভুটিতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে নির্বাচনী গণতন্ত্র এখানে সংখ্যার মাধ্যমে বৈধতা পেলেও, সংলাপের মাধ্যমে ঐকমত্য তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। যার স্বাভাবিক পরিণতি  উঠে এসেছে গণসম্মুখে বিবিধ প্রতিবাদ, অশান্তি ভাঙচুর এসবের মাধ্যমে, বর্তমান সামাজিক মাধ্যমের অপপ্রযোগে, গোষ্ঠীভিত্তিক হিংসার উদাহরণে। সত্যি বলতে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দাবি প্রায়শই জনপরিসরে হাজির হয়েছে এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা ও মেরুকরণের ভাষায়—যেন তাদের উপস্থিতিই সমস্যা, আর তাদের ক্ষোভই গণতন্ত্রের বিঘ্ন। নির্দিষ্ট দাবিগুলি রাজনৈতিক বিতর্কে প্রবেশ করলেও সেগুলি খুব কম ক্ষেত্রেই মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হয়েছে; অধিকাংশ সময় তা প্রতীকী স্বীকৃতি, সাময়িক সুবিধা বা প্রশাসনিক সমন্বয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই যে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের বড় অংশ ক্রমশ নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত করা, দলীয় অবস্থান দৃঢ় করা এবং নির্বাচনী যন্ত্রের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছেন, ফলে যাদের প্রতিনিধিত্বের নামে তাঁরা সংসদে পৌঁছচ্ছেন— সেই নিজস্ব জাতি, সম্প্রদায় বা উপজাতির মানুষের সঙ্গে তাঁদের জৈব, দৈনন্দিন ও সংগ্রামী সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রান্তিক মানুষ ভোট দিচ্ছেন, কিন্তু প্রায়শই ব্যক্তি বা নীতিকে নয়—ভোট দিচ্ছেন প্রতীককে, নামকে, দলের চিহ্নকে; কারণ রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁদের শেখায় যে ‘যাকে ভোট দিতে হবে’ সেটি আগে থেকেই নির্ধারিত। সংসদীয় স্তরে গিয়ে সেই প্রতিনিধি আর তাঁদের কণ্ঠস্বর হয়ে থাকছেন না; বরং তিনি হয়ে উঠছেন বৃহত্তর দলীয় রাজনীতির এক অনুগত অংশ। এই বিচ্ছিন্নতাই প্রতিনিধিত্বকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করে ফেলছে, সামাজিক রূপান্তরের হাতিয়ার নয়। এর উপর ‘এক দেশ এক ভোট’ এর মতো প্রস্তাব আরও একটি বৃহৎ স্তরের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে—যেখানে স্থানীয় বাস্তবতা, আঞ্চলিক বৈষম্য ও প্রান্তিক জীবনের সূক্ষ্ম প্রশ্নগুলি জাতীয় সময়সূচি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত ছকের নিচে চাপা পড়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। 
    এই সব দৃষ্টান্ত ও উদাহরণের মধ্যে একটি সাধারণ কাঠামোগত সূত্র আছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, ভারতীয় সংসদ বহু ক্ষেত্রে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক বৈধতা’র উপর দাঁড়িয়ে, যেখানে সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে শোনা হয় কিন্তু মান্য করা হয় না।আম্বেদকর যে আশঙ্কা করেছিলেন—রাজনৈতিক গণতন্ত্র সামাজিক গণতন্ত্র ছাড়া দমনমূলক হয়ে উঠতে পারে—এই সংসদীয় ঘটনাগুলি সেই আশঙ্কারই বাস্তব রূপ। নির্বাচন নিয়মিত হয়েছে, সরকার বদল হয়েছে কিংবা হয়নি, কিন্তু দলিতদের ক্ষেত্রে সামাজিক সহিংসতা, নারীদের ক্ষেত্রে কাঠামোগত বৈষম্য, এবং সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা—এই মৌলিক প্রশ্নগুলি বহু সময়েই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি।বরং সংরক্ষণের কিংবা তোষণের একটি প্রলেপ পড়েছে যা ক্রমাগত একটি বাইনারি তৈরি করতে রসদ জুগিয়েছে। এই সমস্যা কোনো নির্দিষ্ট দলের বা নির্দিষ্ট সাংসদের বলে মনে করার কোন কারণ নেই। সমস্যা কাঠামোগত—একটি এমন নির্বাচনী ও সংসদীয় ব্যবস্থার, যা উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ক্ষমতার বণ্টনকে প্রশ্ন করতে অনিচ্ছুক। আর এই কারণেই ভারতের নির্বাচন ইতিহাসকে কেবল গণতন্ত্রের সাফল্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায় না; বরং তা এক দ্বন্দ্বপূর্ণ বাস্তবতা, যেখানে ভোটের অধিকার থাকলেও প্রতিনিধিত্বের ন্যায়বিচার এখনও অসম্পূর্ণ। নির্বাচনী সংস্কারের অছিলায় কমিশন নামক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি ভোটার তালিকায় ভুল ভ্রান্তি সংশোধনে নাগরিক কে বিশেষত প্রান্তিক নাগরিককে যেরকম ঝঞ্ঝাটে ফেলেছেন, তার যৌক্তিক দিকটি আদৌ ফলপ্রসূ নাকি ভেবে দেখবার মতন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • প্রবন্ধ | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৮২ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ৪ - albert banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন