

পুজার আগে ১৯৮৪তে আমার বেশ কয়েকটি টিউশন থেকে ভালোই পয়সা জুটে গেল। সাড়ে পাঁচশো টাকা। আমি মায়ের জন্য একটা তসরের শাড়ি আর নিজের জন্য একটা তসরের শার্ট কিনে ফেললাম। তসর খাদি এসব ছিল আমার খুব পছন্দের। একটা পাঞ্জাবিও কিনি। পাঞ্জাবির দাম ২৯ টাকা। আর বোধহয় সাকুল্যে আড়াইশো টাকা লেগেছিল তসরের জামা শাড়ি পাঞ্জাবি মিলিয়ে। ৩০ শতাংশ ছাড়ের সুযোগ ছিল। পূজার আগে বাকি টাকা সব খরচ করে ফেললাম, বন্ধুদের ফুচকা, ঘুগনি, পরতা, মোগলাই খাইয়ে। তখন পঞ্চমীর দিন ছুটি পড়ত। গ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এরপর তো রোজ নেমন্তন্ন থাকবে--এর বাড়ি তার বাড়ি। ২৪ কামরার ছাত্রাবাস। থাকতাম ৬২ জন। পঞ্চমীর দিন দুপুরে আমি ছাড়া সবাই বাড়ি চলে গেল। হোস্টেলের মেস বন্ধ। আমি সন্ধ্যায় একটা মাড়োয়ারি বাড়িতে পড়াতে গেলাম। দুটো বাচ্চা। সপ্তাহে পাঁচদিন। পাঁচশো টাকা মাইনে। দারুণ খুশির ব্যাপার। এক বড়লোক বান্ধবী দেখে দিয়েছিল। প্রথম দিন তো বিরাট খাতির পাথরের গ্লাসে পেস্তা বাদামের শরবত। ওপরে গোলাপের পাপড়ি। অপূর্ব খেতে। পড়াতে বসলাম। প্রথমদিন ভালোই কাটল। পরেরদিন থেকে বুঝলাম, কী কঠিন পড়ানো। দু ভাই বোন পাঁচ আর সাত বয়স। শুধু মারামারি করে। ঠিক করলাম একজনকে পড়িয়ে আরেকজঙ্কে পড়াবো। তাও হয় না। ভাই ছোট। সে ঠিক চলে আসে। শর্ত দিই, চুপ করে বসে থাকবে। কিন্তু কে কথা শোনে! একটু চুপ করেই, কথা বার্তা নেই, চুল ধরে টান দিদির।
লেগে গেল ঝুটোপুটি।
মারতেও পারি না। মারার অভ্যাস আমার ছিল না। দুটোকে টেনে আলাদা করি। বিরাট কঠিন কাজ। কিন্তু পাঁচ ছটা টিউশন পড়িয়ে যা পাই, একজায়গায় তার সমান পাবো, থেকে গেলাম। টিফিন ভালো। নুডলস, চিঁড়ের পোলাও ইত্যাদি। তবে নিরামিষ। আমিষ নিরামিষ ব্যাপারটাই তখন ভাবা ছিল না। খাবার খাবার। তার আবার আমিষ নিরামিষ। মাছ ডিম দৈনিক খুব কম বাড়িতেই হতো। সরকারি ভালো চাকুরে আর ঠিকাদার ছাড়া হতো বলে মনেও হ্য না। যা পেত বা পেতাম হাসিমুখে সবাই খেতো। খালি হোস্টেলে গেরান্ড/গ্রান্ড ফিস্টের দিন--একটু মাংস নিয়ে আদিখ্যেতা ছিল। পিস ছোট কেন? আরেকটু ঝোল দাও। একটা আলু হবে? এইসব আবদার ছিল। ছিল রঙ্গরসিকতা। ব্যাটা তোর পিসটা একটু বড় মনে হলো।
তা পঞ্চমীর দিন গেলাম। গেলাম রিক্সা করে। বাবুয়ানা দেখাতে নয়, সাইকেলটা খারাপ হ্যেছে। সারাতে দিয়েছি। রাতে দেবে বলল। গেলাম। কিন্তু যাওয়াই সার। ছেলে মেয়ে নেই। পুজোর মার্কেটিংয়ে গেছে। টিফিনও জুটল না।
আর শুনলাম--কাল থেকে তো পুজো। পুজোর পর পড়াতে আসবেন।
এই রে। পয়সা তো সব শেষ করে ফেলেছি। কী করা আর করা!
হেঁটে ফিরলাম।
আমার ভাই বলতো, এখনও বলে, মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত, আমি কে আর সম্রাট শাজাহান কে?
তো আমার সেই দশা।
রাতে কলেজের পাশের হোটেলে খেতে গেলাম। খাওয়ার পর দাম দিয়ে শুনি, কাল থেকে হোটেল বন্ধ। কলেজ নেই। পাশেই ছিল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। হাসপাতালের বেশিরভাগ ডাক্তার ছুটিতে চলে যাচ্ছেন। আউটডোরে তেমন রোগী হবে না। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। পরের দিন দুপুরে একটা নেমন্তন্ন। কলেজের ঘরদোর পরিষ্কার এবং কলেজ খোলার কাজ করতেন সীতা মাসি। দুপুরে মাছ ভাত ডাল সব্জি খেলাম। বিধবা মানুষ। আমার জন্য মাছ রান্না করেছিলেন। সীতামাসির ঠেকুয়া যে না খেয়েছে, সে বুঝবে না কী স্বাদ। খাওয়ার পর মাসি কয়েকটা পরোটা আর আলুভাজা দিয়ে বললেন, ব্যাটা রাতে খাস। তারপর মাসি বললেন, শোন ব্যাটা, আমি কদিন দেশের বাড়ি বিহার যাচ্ছি। কলেজের চাবি রইল। কোনও সমস্যা হলে খুলে দিবি। যদিও কদিন কেউ আসবে না।
কলেজের চাবি মাসি মাঝে মাঝে আমার কাছে দিতেন শরীর খারাপ হলে। সকাল সাড়ে চটায় গিয়ে কলেজ গেট ঘর ইত্যাদি খুলে দিতাম।
পরদিন সকাল দুপুর রাত কাটল হরিমটর। খিদে কী জিনিস বুঝলাম। ওইদিন বুঝলাম, পকেটে পয়সা কী জিনিস।
পয়সা থাকলে যে কাউকে বলা যায়, ব্যাটা খাওয়াতো বা মাসিমা মুড়ি দিন বা খেতে দিন। না থাকলে নিজের ভিতর কেমন একটা প্রতিরোধ তৈরি হয়। কোথাও যাওয়া যায় না। আর ধার চাইতে আমি পারি না। এবং তখন চাওয়া যায়, যখন পকেটে পয়সা থাকে। আমি কোনোদিন বাবার কাছেও পয়সা চাইনি। বড়জোর মাকে বলেছি দুএকবার। নবম দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিউশন পড়াতাম পাপাকে। পাঁচ বছরের ছেল। জিকে পড়াতাম। আর ওর বাবার ১০ লিটার দুধ এবং ছানা সাড়ে ছয় কিলোমিটার বয়ে নিয়ে গিয়ে মাসে ত্রিশ টাকা পেতাম। বর্ধমান এসে টিউশন করছি। আর নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি করেননি বলে, আমার জেদ টাকা নেবো না।
অষ্টমীর দুপুর অসহ্য হয়ে ঊঠল। মনে পড়তে লাগল গ্রামে এদিন কত বাড়িতে নিমন্ত্রণ। জগন্নাথের মায়ের লুচি ছোলার ডাল, নিখিলের বাড়ি ঠাকুর কাকিমার জিরের হাল্কা প্রলেপের ডাল, গুরুমামার মায়ের দুধের ছাঁচির মিষ্টি মনে পড়াতে আরও অসহ্য হয়ে উঠল। অষ্টমী গেল না খেয়ে। নবমীও। বন্ধুরাও কেউ এল না। অন্য সময় এর ওর বাড়ি কতবার গেছি। গিয়ে বলেছি, মাসিমা মুড়ি দিন। এখন যেতে পারলাম না। খিদে পাচ্ছে জোর। জল খেয়ে কাটিয়ে দিচ্ছি। হোস্টেল থেকে বের হতে খুব লজ্জা করতে লাগল। বাড়ি চলে যাওয়া যেত। কিন্তু কলেজের চাবি আছে। যদি প্রিন্সিপ্যাল / অফিসার ইন চার্জ অলোক দত্ত স্যার আসেন। তাঁকে বলে গেছেন সীতা মাসি, ইমানুলের কাছে চাবি আছে। নবমীর দিন দুপুরে আর পারছি না। মনে পড়ল সীতা মাসির দেওয়া দুটো পরোটা আছে। খুঁজে দেখি টিফিন কেস ফাঁকা। কোথায় গেল। কেউ তো আসে নি। খোঁজ খোঁজ। পেলাম না। সন্ধেবেলায় মনে হল, আরেকটু খুঁজি। প্রায় তিনদিন জল আর একটা বিস্কুটের প্যাকেট দিয়ে চালিয়েছি। আমাদের একটা টিবেল গোছের ছিল। সব ওখানে জমা হতো। নীচে খুঁজতে গিয়ে দেখি, কয়েকটা আধ খাওয়া সাবান পাওয়া গেল। এর একটা আধ খাওয়া পরোটা। তাই খেলাম। খেয়ে তো পেট ব্যথা বেড়ে গেল। কী করা যায়! একটু পরে দেখি হোস্টেলের গেট খিলে কে একজন ঢুকল। আমার সহপাঠী অতনু সেনের ভাই। অমিত সেন। আমাদের স্কুলেই পড়ত। আমার সঙ্গে খুব দোস্তি। প্রচুর প্রশ্ন অমিতের। পার্টি নিয়ে জীবন নিয়ে। ও বল্ল, মা পাঠিয়েছে তোমাকে নিয়ে যেতে! অন্য সময় হলে, চলে যেতাম বললেই। আজ খুব লজ্জা হচ্ছিল। বললাম, আরেকদিন যাবো। অমিত নাছোড়বান্দা। কী বুঝেছিল কে জানে! কাউকে ও কদিন না খাওয়ার গল্প বলিনি। অমিতকেও না।
অমিতের সঙ্গে গেলাম। রাতে আলু পোস্ত দিয়ে ভাত খেলাম। আগে গরমকালে বাড়িতে রোজ আলু পোস্ত হতো। বিরক্ত হতাম অল্প। রোজ আলুপোস্ত!
আজ আলুপোস্ত মনে হল অমৃত। অমিতের মায়ের নাম লতিকা সেন। আমার বন্ধুদের মা ঠাকুমা দিদিমারা আমার জীবনের একটা বড় সম্পদ।
পকেটে পয়সা থাকা আর না থাকার পার্থক্য বুঝেছি জীবনে। তবে সব কী বুঝেছি!
কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজে পড়াই এর ১২ বছর পর। সেবার প্রচণ্ড শীত পড়েছে। সবাই সোয়েটার পরে এসেছে সাধ্যমতো। একজন ছেলে পরে আসেনি। বললাম, আলাদা ডেকে, সোয়েটার পরে আসোনি কেন? বলল, স্যার অসুবিধা নেই।
আমি বললাম সোয়েটার ভালো না লাগলে চাদর পরে এসো। আমরাও তো চদর পরি। আমি ইচ্ছে করে পরের দিন একটা উইন্ডচিটারের ওপর চাদর পরে গেলাম। উইন্ডচিটার স্টাফরুমে খুলে শুধু চাদর পরে ক্লাসে গেলাম। আমি বেশ শীতকাতুড়ে। কষ্ট হচ্ছিল। তারপরেও দেখি খালি জামা পরে আসছে। পরের দিন আমি হাফহাতা সোয়েটার আর উইন্ডচিটার পরে গেলাম। ক্লাসে দেখি আবার শুধু জামা। আমি ক্লাস শেষে আলাদা ডেকে আমার উইন্ডচিটার খুলে দিলাম। ও কিছুতেই নেবে না। ধমকে আমি নিজে পরিয়ে দিলাম। বললাম, শোনো জেদ করে কলকাতা আসার সময় আমার একটা হাফহাতা সোয়েটার আর উইন্ডচিটার ছিল সঙ্গী। তুমি পরলে আমার ভাল লাগবে। ছেলেটি আর কোনওদিন ক্লাসে আসেনি। এই বেদনা ভুলব না। শীত এলেই এই কথা মার মনে পড়ে। কাউকে কিছু দেওয়ার সময় তাই সতর্ক থাকি। আগের দিন রাধিকার কথা লিখেছিলাম--আজ 'কেষ্ট'র কথা থাকল।
'কেষ্ট' যদি এই লেখা পরে আশা করি ক্ষমা করবে আমায়।