এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অনন্ত জীবন

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ৯৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • ‘ এই... এই যে আসুন ... এই মাঠটা পেরোলেই ওদের বাড়ি '। অগ্নিভ স্টেশন থেকে যে রিক্শাটা ধরেছিল তার চালকই মাঠের ধারে রিক্শাটা দাঁড় করিয়ে তাকে ছোট মাঠটা পেরিয়ে সত্যপ্রসাদ ভট্টাচার্যের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল।
    ছোট একতলা বাড়ি। ভেতর থেকে প্রায় চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছরের একজন মানুষ খালি গায়ে বেরিয়ে এলেন। রিক্শাওয়ালা বিদায় নিল।
    অগ্নিভ হাতজোড় করে বলল, ‘নমস্কার, আমি প্রতিলিপি থেকে আসছি। বিপ্লবী সত্যপ্রসাদ ভট্টাচার্যের জন্মের একশো পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমরা একটা বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চলেছি। তাই কিছু জানার ছিল।’
    — ‘ ও আচ্ছা। প্রতিলিপি মানে প্রতিলিপি দৈনিক পত্রিকা ? ‘
    — ‘ হ্যাঁ ‘
    — ‘ আসুন ভেতরে আসুন।’

    ভদ্রলোক গায়ে একটা পাঞ্জাবি গলিয়ে নিলেন। বললেন, ‘ আমি হলাম বিপ্লবী সত্যপ্রসাদ ভট্টাচার্যের নাতির ছেলে। আমরা তিন ভাই ছিলাম।আমি সবচেয়ে ছোট। আমরা স্বল্পায়ুর বংশ। আমার দুই দাদা মারা গেছেন।’
    — ‘ ও আচ্ছা আচ্ছা। এই বাড়িতেই কি উনি থাকতেন ?’ অগ্নিভ তার কাজে মন দেয়।
    — ‘ কে, শহীদ সত্যপ্রসাদ ? না না, তখন এ বাড়ি ছিলই না। এ বাড়িটা করেছিল তার নাতি, বিশ্বজয় ভট্টাচার্য, আমার বাবা। বেঁচে নেই....’
    — ‘ ও আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে সত্যপ্রসাদের মূল বসতভিটেটা কোথায় ? ’
    — ‘ ওই ... মাঠের ওধারে। ওই জমিটায় প্লাস্টার না করা ওই যে ঘরটা দেখছেন, ওখানে ওনার বাড়ি ছিল। বাড়ি মানে, কুঁড়েঘর আর কি.... এখন আর নেই।সে অনেক কাল আগের ব্যাপার তো..... তখন এখানে অজ পাড়াগাঁ ছিল, সব কুঁড়ে ঘর।’
    — ‘ওই যে ঘরের জানলার কাছে দুটো ফ্ল্যাগ লাগানো রয়েছে, ওইটা ?’
    — ‘ হ্যাঁ ... ওই পার্টির ফ্ল্যাগ আর কি ? ’
    অগ্নিভ বুদ্ধিমান ছেলে। ব্যাপারটা সহজেই আন্দাজ করতে পারল। বিপ্লবী সত্যপ্রসাদ ভট্টাচার্যের আদি বসতভিটেতে এখন পার্টি অফিস উঠেছে।
    অগ্নিভ বলল, ‘ আপনার নামটা যদি বলেন .... ’
    — ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য ’
    — ‘ সত্যপ্রসাদের সম্বন্ধে যা জানেন যদি বলেন..... আর যদি কিছু ছবি দিতে পারেন.... ’
    — ‘ হ্যাঁ অনেক পুরোনো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট কিছু ছবি আছে। ছবিগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেছে। যদি এতে আপনার কাজ হয়। আর ডকুমেন্ট বলতে বহু পুরনো একটা ডায়েরি আছে। এটা আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলাম আমি। দাঁড়ান নিয়ে আসছি।’ বলে পাশের ঘরে চলে গেলেন ভদ্রলোক।
    মিনিট পাঁচেক পরে একটা ধূসর হয়ে যাওয়া বাদামী রঙচটা ডায়েরি আর একটা কালো রঙের বড় ফোলিও ব্যাগ নিয়ে তিনি এ ঘরে এলেন।
    ব্যাগ থেকে পাঁচ ছটা সাদা কালো ঈষৎ অস্পষ্ট ফটো বার করে বললেন, ‘ এই যে, এগুলোই আছে আমার কাছে। আর এই ডায়েরিটা ..... এতে কিছু তথ্য পেতে পারেন.... যদি কাজ চলে...’
    অগ্নিভ বিপ্লবী সত্যপ্রসাদের ইতিহাসের গন্ধমাখানো ছবিগুলো দেখতে লাগল।দুটো একার ছবি আছে। বাকিগুলো গ্রুপফটো। সব ছবিতেই সত্যপ্রসাদের দৃঢ়প্রত্যয়ী মুখ এবং দেদীপ্যমান চোখ দুটি বহুযুগের ইতিহাসের স্মৃতিস্তর ভেদ করে প্রোজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে।
    — ‘ এতেই কাজ হবে। ছবিগুলো থেকে ফ্রেশ লে আউট হয়ে যাবে। আর ডায়েরিটা পেয়ে ভীষণ উপকার হল। আশা করছি এটা এক্সপ্লোর করলে স্পেশাল সাপ্লিমেন্ট পেজ কাভার্ড হয়ে যাবে ভালভাবেই। কিন্তু কথা হল, ডায়েরিটা তো আমাকে পুরোটা পড়তে হবে। তাই .....’
    সুকান্তবাবু অগ্নিভর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘ না না ... তাতে কোন অসুবিধে নেই। আপনি এগুলো নিয়ে যেতে পারেন। কাজ হয়ে গেলে একটু সময় করে ....’
    — ‘ আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন পরের মঙ্গলবার আমি নিজে এসে সব আপনার হাতে তুলে দিয়ে যাব’, অগ্নিভ জানায়।
    — ‘ ঠিক আছে, ঠিক আছে কোন ব্যাপার না। এইটুকু বিশ্বাস যদি না রাখতে পারি .... আমি চাই বিপ্লবী সত্যপ্রসাদের যথার্থ মূল্যায়ন যেন হয়। দেশের জন্য আত্মবলিদানের জন্য যে শ্রদ্ধা তার প্রাপ্য তা যেন তিনি পান। দেশের লোক তো তাকে ভুলেই গেছে। দেখুন, আপনারা যদি কিছু করতে পারেন .... ’
    এইসময় এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন ভেতর থেকে চায়ের কাপ আর রসগোল্লার প্লেট হাতে।তাতে বড় বড় চারটে রাজভোগ। আর একটা প্লেটে বর্ধমানের বিখ্যাত সীতাভোগ আর মিহিদানা। সুকান্তবাবুর স্ত্রী শর্মিষ্ঠাদেবী। মিষ্টি পরিবেশনের বহর দেখে অগ্নিভর চোখ কপালে উঠল। গ্রাম আর শহরের মানুষের আচরণ ও মানসিকতায় যে এখনও কত তফাৎ সে আর একবার বুঝতে পারল। অগ্নিভ এহেন আপ্যায়নে বেশ বিব্রত বোধ করতে লাগল — ‘আরে .... এসব কেন ? এগুলোর দরকার ছিল না.... ’
    শর্মিষ্ঠা দেবী গায়ে আঁচল জড়িয়ে খাটের পাশে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘ না, এ খুব সামান্য ব্যাপার। আপনি আমাদের অতিথি, কত দূর থেকে এসেছেন.... আরো বেশি করা উচিৎ।এটুকু খেয়ে নিন।‘ অকপট সরল ভঙ্গীতে বললেন, ‘ আমরা ওনার জন্মদিনে খুব শ্রদ্ধা জানাতে চাই।আপনারা আমাদের সাহায্য করেন। এখন তো সবাই ওনাকে ভুলেই গেছে।’
    — ‘ হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আমি আপনার সঙ্গে একমত।আমরা আমাদের প্রকাশনার তরফ থেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের পরিকল্পনাকে ভালভাবে রূপ দিতে আপনাদের একটু সাহায্য দরকার। ’
    — ‘ আমাদের যা ক্ষমতা আছে আমরা করব। দরকার হলে আবার আসবেন।’
    অগ্নিভ মাত্র একটা রসগোল্লা এবং একটুখানি সীতাভোগ খেল।

    রাত প্রায় বারোটার সময়ে অগ্নিভ তাদের লেকটাউনের ফ্ল্যাটে নিজের ঘরে বসে ইতিহাসের গন্ধমাখা ডায়েরিটা খুলল।

    “আমার সৌভাগ্য যে আমি বিপ্লবী ভবানীপ্রসাদ ভট্টাচার্যের সঙ্গে রাজশাহী জেলে একই সেলে ছিলাম। সে আমার থেকে চার পাঁচ বছরের ছোট। আমি সদ্য বিবাহিত এবং সে অবিবাহিত একুশ বছরের যুবক। এই ১৯৩৫ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি তার ফাঁসি হবে। আজ ৩১শে জানুয়ারি। আর তিনদিন বাকি। আজ ছোট ভাই দুর্গাপ্রসাদকে লেখা চিঠিটা ও আমাকে দেখিয়েছিল। চিঠিতে ছিল, ‘আমাবস্যার শ্মশানে ভীরু ভয় পায় — সাধক সেখানে সিদ্ধিলাভ করে। ..... আজ আমি বেশি কথা লিখব না, শুধু ভাবব।মৃত্যু কত সুন্দর ! অনন্ত জীবনের বার্তা তার কাছে।’
    গত শনিবারে আমার শুনানি শেষ হয়ে গেছে। রায় এখনও বেরোয়নি। দু একদিনের মধ্যেই এসে যাবে। ফাঁসির হুকুম যে হবে তা নিশ্চিত। মনে কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব কিছু নেই। অপার মুক্ত মন এখন। শুধু একটা কাঁটা খচখচ করে মনে সরমার কথা ভেবে। খবর পেয়েছি সে সন্তানসম্ভবা। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি আমার সন্তান যেন আপন স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনের ব্রতে নিজেকে সমর্পণ করে।

    এখানে বসে শুনতে পেলাম মাস্টারদা কলকাতায় এসেছেন। আমি ধরা পড়লাম কাটোয়ায়। বিচার হল কলকাতায়, নিয়ে আসা হল এই রাজশাহির জেলে।পুলিশ ইন্সপেক্টর পরমেশ্বর রায়কে গুলি করে মারার জন্য আমার মনে কোন আফশোষ নেই। কেউ এক গালে চড় দিলে তাকে দু গালে দুটো চড় মারার নীতিতে আমি বিশ্বাসী। শুধু ভারতবর্ষ নয়, সারা পৃথিবী থেকে রাষ্ট্রনায়কদের শোষণ, কপটতা এবং অত্যাচার সমূলে বিনাশ করতে হবে। অক্ষমের আষ্ফালন আর ক্ষমার ধর্ম আমার কাছে সমার্থক।
    ফরিদপুরের মনোরঞ্জন সেনগুপ্তের সঙ্গেও একবার দেখা হয়েছিল অনুশীলন সমিতিতে, যদিও সে ছিল মাদারিপুরের বিপ্লবী পূর্ণ দাসের কাছে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত।
    আমি তখনও ধরা পড়িনি। বুড়িবালাম নদীতীরে সেই লড়াইয়ে বাঘা যতীনের দলে ছিলেন মনোরঞ্জন। তিনি ছিলেন বাঘা যতীনের ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর। তার ফাঁসির হুকুম হওয়ার পর আমি মনোরঞ্জনের বাড়িতে গিয়ে তার দিদির সঙ্গে দেখা করলুম। গিয়ে বুঝতে পারলাম দিদি মানসিকভাবে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমি কোন সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করিনি। নীরবে বসে রইলাম। তার একমাত্র আপনজন এই দিদি নি:শব্দে অশ্রুপাত করতে লাগলেন। তাৎক্ষণিকভাবে আমার মনে উদয় হল আমাদের এই আত্মত্যাগের কি প্রকৃতই কোন তাৎপর্য আছে ? নাকি ক্ষণিক আবেগের অগ্নুৎপাত। দিদি ভেতরে চলে গিয়ে একটা চিঠি নিয়ে এসে আমাকে দিলেন।কান্নায় বুজে যাওয়া স্বরে কোনমতে বললেন, ‘ মনা এটা জেল থেকে লিখেছে আমাকে।ও এর আগে কখনও চিঠি লেখেনি আমাকে। পড়ে দেখ একটু। খুলে দেখলাম লেখা রয়েছে— ‘ এ মায়াময় নশ্বর পৃথিবীতে কেহই কাহারও নয়। সমস্তই অনিত্য।..... সকলেই চলে যাবে। আমরা এ সংসারে জল বুদ্বুদের মত এই আছি এই নাই।.... আগামী পরশু আমার জীবনের বিজয়া দশমী।..... মনে করিও না এই জীবনদান নিরর্থক। আমরা আমাদের লক্ষ্যে নিশ্চয়ই পৌঁছাব। .... তোমাকে আমি বহুদিন বলেছি, আজও শেষ দিনে বলে যাচ্ছি— কেউ এক গালে চড় দিলে তাকে দুই গালে দুইটা চড় দিবে।
    চিঠিটা পড়ে আমার রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠল। মনে হল চিঠিটা যেন আমার মনের গভীরে ওঠা সব সংশয়ের উত্তর দেবার জন্য আমাকে উদ্দেশ করেই লেখা।

    মনে আর ভয় সংশয় কিছুই নেই। জেলের অন্ধ কুঠুরিতে বসে ধ্যানমগ্ন নিবিড় সমর্পিত চিত্তে অপেক্ষা করে বসে আছি কবে আমার সুযোগ আসবে ফাঁসির মঞ্চে এই নগন্য প্রাণটুকু নিবেদন করার।
    ব্রজকিশোর চক্রবর্তীকে আমি ভালভাবে চিনতাম। রামকৃষ্ণ রায়ের সঙ্গে একসঙ্গে ফাঁসি হল তিনমাস আগে। এই দুজনের মতো বজ্রকঠিন চরিত্রের মানুষ আমি আর দেখি নাই। ফাঁসির রায় হবার পর দলের নির্দেশে আমি তার মা-র সঙ্গে দেখা করলাম। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে তাকে একটা চিঠি লিখেছিল রামকৃষ্ণ।পরম সৌভাগ্যবশত: চিঠিটা দেখার সুযোগ পেলাম— ‘ মা আমার হৃদয়ে কি সুখ যে অনুভব করছি তা নিজেই বুঝতে পারছি না।.... এই পৃথিবী যেন একটি বাজারের মতো, বাজার করুক বা না করুক তাদের ফিরে যেতে হবে।..... আমি তবে এবারের মত আসি মা ! আপনার কোল হতে চিরবিদায় নিয়ে চললাম। ‘গীতা’টি দিয়ে গেলাম।’
    একাকী সেলের মধ্যে বসিয়া ঘোর অন্ধকার নিশীথে ম্রিয়মান একটি দিপালোকের নীচে এই দিনলিপি লিখিতেছি। কত কি যে বলিবার আছে, কত কি যে লিখিবার আছে কিছুই লিখিয়া উঠিতে পারিতেছি না।
    খুব সম্ভবত: আগামী সোমবার, মানে আর ছ দিন পরে আমি ফাঁসির মঞ্চে উঠিব। যদিও এখনও আদেশনামা আসিয়া পৌঁছায় নাই।
    সরমা সন্তানসম্ভবা। তাহার কথা খুব মনে পড়িতেছে। দেশমাতৃকার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা যেন তাহার মনের সকল ক্লেশ এবং শোকাকুলতা মুছিয়া দেয়।
    এই দিনলিপিটি যাহাতে আমার পরিবারের হাতে পড়ে সে ব্যবস্থা করে যেতে চাই।

    *****************************

    ডায়েরির মজে যাওয়া প্রায় হলুদ রঙা খোলা পাতাগুলো রাত্রির শেষ প্রহরের হাওয়ায় ফরফর করে উড়ছে। অগ্নিভ টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখনও শেষ হয় নি সত্যপ্রসাদের ডায়েরি। মেটিরিয়াল যোগাড় হলেই হল না। প্রপার পেজ লে আউট নামাতে হবে আর্টিকেলটা তৈরি হবার পর। মাথায় অনেক চিন্তা অগ্নিভর। এই ‘শ্রদ্ধা জানাই’ ফিচারের পেজটার পুরো দায়িত্ব পড়েছে তার ওপর।অগ্নিভ ভাবছে, আর একবার যাওয়ার দরকার সত্যপ্রসাদ ভট্টাচার্যের গ্রামে। আরও এক্সক্লুসিভ মেটিরিয়াল যদি কিছু পাওয়া যায়।
    এদিক ওদিক নানা কাজ সেরে বেলা বারোটা নাগাদ অফিসে পৌঁছল অগ্নিভ। পৌঁছে অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ এডিটর অভীক রায়ের চেম্বারে ঢুকল।
    অভীক রায় মুখ তুলে বললেন, ‘ আরে অগ্নিভ কি খবর তোমার ? কাজ কিছু এগিয়েছে ? হাতে কিন্তু আর বেশি সময় নেই।’
    — ‘ হ্যাঁ দাদা, আমি বর্ধমানে গিয়েছিলাম। অনেকটা মেটিরিয়াল কালেক্ট করেছি। তবে মনে হচ্ছে আর একবার যেতে হবে।’ অগ্নিভ অভীকের উল্টোদিকের চেয়ারে বসে।
    — ‘ তা দরকার হলে যাও। কিন্তু মনে রেখ পরশুর মধ্যে পেজ লে আউট কমপ্লিট করতে হবে।’
    — ‘ হ্যাঁ মনে আছে। এই দেখুন এগুলো কালেক্ট করেছি ওনার নাতির ছেলের কাছ থেকে। আবার রিটার্ন করতে হবে।’
    অভীক জ্বলে প্রায় সাদাটে হয়ে যাওয়া ছবিগুলো নিয়ে তার অভিজ্ঞ চোখে জরিপ করতে লাগল — ‘ বা: ..... গুড কালেকশান। বেশ একটা অ্যান্টিক ইমপ্যাক্ট হবে।’ এরপর ডায়েরিটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। বা: এটাও একটা সলিড মেটিরিয়াল। সিনপসিস নামিয়েছ ?’ অভীক খোঁজ নেয়।
    — ‘ না হয়নি এখনও। আজ রাত্রে নামাব।’
    — ‘ ঠিক আছে। বিপ্লবী সত্যপ্রসাদের একজ্যাক্ট বার্থডেটটা কবে যেন বললে ?’
    — ‘ টোয়েন্টি ফিফথ। টোয়েন্টি ফিফথ নভেম্বর।’
    — ‘ অলরাইট। হাতে এখনও সাতদিন সময় আছে। তুমি কাজে লেগে পড়। অন্য কোন পাবলিকেশনের কাছে খুব সম্ভবত: কোন খবর নেই। এ কেসটা যেভাবেই হোক আমাদের হাইলাইট করতে হবে। এতে আমাদের ক্রেডিবিলিটি অনেকটাই বাড়বে আশা করছি।তাই তোমাকে বলছি খুব কনফিডেনশিয়ালি কাজটা কর। কাক পক্ষীতেও যেন না জানে। অন্য কোন পাবলিকেশান যেন এই কনটেন্টটা হাইজ্যাক করতে না পারে। প্রোডাক্টটা যেন দারুন ইমপ্রেসিভ হয়। মানে মার্কেটে পাব্লিক না খেলে সবটাই পন্ডশ্রমে পর্যবসিত হবে বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই। আফটার অল উই আর সাপোজড্ টু বি আনসারেবল্ টু দি অথরিটি।
    অগ্নিভ হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
    এ পাতাটাও তাহলে মার্কেটেবল প্রোডাক্ট ছাড়া আর কিছু না !

    একদিন বাদ দিয়ে তার পরের দিন অগ্নিভ আবার একবার বর্ধমানের মাটিঘরি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।গ্রামের ভেতরদিকের রাস্তা এখনও কাঁচা।
    রাস্তার ধারে একটা চালাঘরের ছোট মিস্টির দোকান। ভরদুপুরে রোদ্দুর খাঁ খাঁ করছে। খরিদ্দার শূন্য দোকানে খালি গায়ে একজন দোকানি বসে আছে। বাইরে পাতা বেঞ্চে একটা লোক শুয়ে ঘুমোচ্ছে। রিক্শাওয়ালা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। অগ্নিভর খুব জলতেষ্টা পেয়েছিল। জল খেয়ে আবার রিক্শায় উঠল। কি মনে করে আবার রিক্শা থেকে নেমে গেল।দোকান থেকে দুশো টাকার রসগোল্লা আর ল্যাংচা কিনল। বেঞ্চে শুয়ে থাকা লোকটা ঘুমিয়ে যেতে লাগল।

    সুকান্ত ভট্টাচার্যের বাড়ি যাচ্ছে আর একটা দুষ্প্রাপ্য ফটো পাবার আশায়। মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে সত্যপ্রসাদের একটা ছবি। ছবিটা সুকান্তবাবু সেদিন খুঁজে পাচ্ছিলেন না।এখন খুঁজে পেয়েছেন বলে ফোনে কালকে জানিয়েছেন অগ্নিভকে। এই ছবিটাকে সাত রাজার ধন এক মানিক বলে মনে হচ্ছে। পেজের ইমপ্যাক্ট বহুগুণ বেড়ে যাবে। অভীক রায়ের কথায় ‘রিয়েলি মার্কেটেবল্ এলিমেন্ট’। তা, অগ্নিভর অভিযান ব্যর্থ হয়নি।অমূল্য ফটোগ্রাফটি তার করায়ত্ব হয়েছিল। ফেরবার সময়ে রিক্শাওয়ালাকে সে একশ টাকা দিয়েছিল। অগ্নিভ সঠিক জানে না, তার এই বদান্যতার পেছনে কি আছে — পেশাদারি উচ্চাশা, না অগ্নিযুগের মহান শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা।

    আবার সেই গভীর রাতে দিনলিপির পবিত্র ইতিহাস উন্মোচন।

    “ব্রজকিশোর চক্রবর্তীর ডাক নাম ছিল বেজা।ফাঁসির আগে তাহার শেষ চিঠিটিও পড়িবার সুযোগ হইয়াছিল আমার। তাহাতে ছিল- ‘ আমার মা, মা আমার, প্রণাম নিন।.... ভোরের বেলা শূন্য কোলে, ডাকবি যখন ‘বেজা’ বলে, বলবো আমি — নাই গো ‘বেজা’ নাই, মাগো যাই।

    পবিত্র অনন্ত প্রবাহিনী দিনলিপি স্রোতধারায় আপ্লুত হতে হতে রাতের শেষ প্রহরে অবসন্ন অগ্নিভ এ দিনও টেবিলে মাথা রেখে নিদ্রায় আচ্ছন্ন হল।

    টিভি -তে খবর প্রচারের শব্দে মুখরিত চারপাশ। সাতসকালে হাওয়ায় হাওয়ায় খবরের ছোটাছুটি। মহাব্যস্ত প্রতিবেশী লোকজন। চলচ্চিত্রের মহাকাশে এক মহা তারকার জীবনদীপ নিভে গেছে। গভীর রাতের আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের প্রবল অভিঘাত তিনি সামলাতে পারেননি।
    ব্যস্, এখন মহাকরণ থেকে ফুটপাথ সব জায়গা তোলপাড়।পথে ঘাটে কোর্টে কাছারিতে আলোচনার বিষয়বস্তু একটাই।কাজকম্ম সারাদিন ধরে শিকেয় উঠল।

    অভীক রায়ের ঘরে এ সি চলছে ফিরফির করে। চেম্বারে আর কেউ নেই। শুধু অগ্নিভ বসে আছে মুখোমুখি। দুজনেরই মুখ শুকনো।
    অভীক নীচু ম্লান গলায় বলতে লাগলেন — ‘ আমার কিছু করার নেই অগ্নিভ। আমাদের ওই ‘শ্রদ্ধার্ঘ ‘ফিচারের পেজটা জাস্ট একদিন পেছিয়ে দিতে হচ্ছে।কি করব ? অথরিটি চাইছে তাই। এখন মহানায়কের মৃত্যুর ব্যাপারটা ওয়াইডলি কমার্শিয়ালাইজ করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে পুরো মিডিয়া ফ্রেটারনিটি।
    সেখানে একদিন হোল্ড ব্যাক করার মানে অনেকটা পিছিয়ে পড়া। পরে মেক আপ দেওয়া ডিফিকাল্ট হয়ে যাবে। মিডিয়া নর্ম হল— হিট দা আয়রণ হোয়েন ইট ইজ হট। অভীক মালিকের শেখানো বুলি আওড়ে যায়।
    হতভম্ব অগ্নিভ বলল, ‘ কিন্তু সত্যপ্রসাদের বার্থডেট তো আর বদলানো যাবে না..... ওটা তো পঁচিশে নভেম্বরই থাকবে।’
    — ‘ ওটা ছাব্বিশে নভেম্বর করে দিলেই হল। কে আর খবর রাখে সত্যপ্রসাদের জন্মদিনের তারিখ। কেই বা তাকে চেনে, কেই বা তাকে জানে !’ অভীক রায়ের বাস্তব কথার গায়ে জড়িয়ে রইল গোপন বিষাদের গন্ধ।

    সেদিনও নিশুত রাতের বেলায় পেজ লে আউটের ফরম্যাটে উঠে দাঁড়াল দীপ্ত মহিমায় — ‘আমাবস্যার শ্মশানে ভীরু ভয় পায়— সাধক সেখানে সিদ্ধিলাভ করে...... মৃত্যু কত সুন্দর ! অনন্ত জীবনের বার্তা তার কাছে।’

    অগ্নিভর লে আউট কমপ্লিট। তার মনে হল এ শ্রদ্ধার্ঘ তো এক অনন্ত জীবনের উদ্দেশ্যে। জন্মগ্রহণের এক বিশেষ দিন কখনও কখনও এক মহান তুচ্ছতা হয়ে যায়।

    ** তথ্যঋণ স্বীকার : শুভাশিস চক্রবর্তীর নিবন্ধ ‘এবার তবে আসি মা’

    ****************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anindya Rakshit | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২২738102
  • সুন্দর! তবে, "এ পাতাটাও তাহলে মার্কেটেবল প্রোডাক্ট ছাড়া আর কিছু না !" আর "অগ্নিভ সঠিক জানে না, তার এই বদান্যতার পেছনে কি আছে — পেশাদারি উচ্চাশা, না অগ্নিযুগের মহান শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা।" এই দুটো জায়গা অতিকথন বলে মনে হচ্ছে। এগুলো নিরুচ্চারিত হলে ভালো হতো বলে আমার মনে হচ্ছে। 
  • Anjan Banerjee | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:০৪738105
  • হমম্... 
  • :|: | 2607:fb90:bd01:835e:1df0:b411:f61a:***:*** | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:০০738111
  • ডায়রী লেখাৱ সময়ঃ সাধু চলিত মিশে গেছে -- যেটি আনকমন। 
  • aranya | 2601:84:4600:5410:1000:ab9a:6225:***:*** | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০২:২৫738112
  • বাঃ 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন