এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  নাটক  শনিবারবেলা

  • ওয়ালেস! ওয়ালেস!

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    নাটক | ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • ৪র্থ অঙ্ক
    লণ্ডন হাইকোর্টের কুইনস বেঞ্চের একটি অংশ। উইগ পরা তিন জন বিচারক, একটি সাক্ষীর কাঠগড়া, বিচারকদের টেবিলের
    সামনে বিচারকদের আসনের তুলনায় খানিকটা কম উচ্চতায় আদালতের কর্মচারী এবং আইনজীবিদের বসার আসন। দর্শক-
    আসনের প্রথম সারিটি দৃশ্য। মঞ্চটি এমন ভাবে সাজানো যে, দর্শক-আসনের পরের সারিগুলিও খালি নেই এরকম মনে হয়,
    যদিও উইংসের অন্তরালে থাকায় দেখা যায় না। আদালতের কাজ শুরু হলেই বোঝা যাবে যে হ্যাম্পডেনের বহু সমর্থক দর্শক-
    আসনে বসে আছে। আইনজীবিদের আসনে দুজন উকিল, হ্যাম্পডেনের পক্ষে উকিল-১ এবং ওয়ালেসের পক্ষে উকিল-২। এ
    ছাড়া বিচারক-১, বিচারক-২ এবং বিচারক-৩। দর্শক আসনে দর্শকে পরিপূর্ণ যে প্রথম সারিটি দেখা যায়, সেখানে স্যামূয়েল
    স্টীভেন্সকেও বসে থাকতে দেখা যায়। দৃশ্যের শুরুতে সাক্ষী উইলিয়ম কারপেন্টার, হ্যাম্পডেনের রেফারী এবং উকিল-১।


    উকিল-১। আপনি কি মনে করেন ফ্ল্যাট-আর্থ ওয়েজার নামে পরিচিত যে বাজিটির বিষয়ে আজকের এই মামলা, সেটির ফলাফল সন্দেহাতীত ভাবে নির্ণয় করা হয়েছিল?

    কারপেন্টার। আমার সন্দেহ নেই।

    উকিল-১। কে জিতেছিলেন?

    কারপেন্টার। নিশ্চিতভাবে জন হ্যাম্পডেন।

    উকিল-১। আচ্ছা, এই ফলাফল নির্ণয়ের জন্যে যে পরীক্ষাটা করা হয়েছিলো, সেটা কী?

    কারপেন্টার। পরীক্ষাটা খুবই সহজ। একটা ক্যানালে দূরে দূরে তিনটে সমান সমান খুঁটি পুঁতে সেগুলোকে দূর থেকে একটা টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা হলো। ওয়ালেস বলেছিলো মাঝখানেরটা বেশি উঁচু বলে মনে হবে। কিন্তু মনে হয়নি।

    উকিল-১। এই বাজিতে আপনার কী ভূমিকা ছিলো?

    কারপেন্টার। আমি হ্যাম্পডেনের রেফারী ছিলাম।

    উকিল-১। এবং আপনি নিজেই হ্যাম্পডেনের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, ঠিক তো?

    কারপেন্টার। হ্যাঁ, আমিই দিয়েছিলাম।

    উকিল-১। তাহলে তো আর এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশই রইলো না, তাই তো?

    কারপেন্টার। ঠিক তাই।

    উকিল-১। ধন্যবাদ। (বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) আমার হয়ে গেছে, মিলর্ড।

    বিচারক-১। ঠিক আছে, আপনি বসুন। (উকিল-২ এর দিকে তাকিয়ে) আপনি কি কিছু প্রশ্ন করবেন?

    উকিল-২। (উঠতে উঠতে) করবো, মিলর্ড। (কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে) মিঃ কারপেন্টার, ঠিক কবে আপনি রায় দিয়েছিলেন?

    কারপেন্টার। সে কি আমার এতদিন পর মনে আছে?

    উকিল-২। মনে নেই? মিঃ কারপেন্টার, আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন জানেন? এখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ মূল্যবান।

    উকিল-১। (বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) অবজেকশন মিলর্ড, মিঃ কারপেন্টারকে অনর্থক ঘাবড়িয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে।

    বিচারক-২। অবজেকশন সাস্টেন্‌ড্‌।

    উকিল-২। (চোখ-মুখে একটু অসহায় কিন্তু মেনে নেবার অভিব্যক্তি) ওয়েল, পরীক্ষাটা কে করেছিলো তা কি মশায়ের মনে আছে?

    কারপেন্টার। বিলক্ষণ। ওয়ালেস নিজেই।

    উকিল-২। ওয়ালেস নিজে কেন? আপনারা ন'ন কেন?

    কারপেন্টার। এসব টেক্‌নিক্যাল ব্যাপারের আমরা কী বুঝি?

    উকিল-২।। হুঁঃ! অর্থাৎ দায়িত্বটা ওয়ালেসকে দেওয়া হয়েছিলো। মানে, আপনারাই দিয়েছিলেন, তাই তো?

    কারপেন্টার। না, ঠিক তা নয়।

    উকিল-২। তাহলে ঠিকটা কী?

    কারপেন্টার। সবাই মিলেই দেওয়া হয়েছিলো।

    উকিল-২। সবাই মিলে মানে? কে কে?

    কারপেন্টার। মানে আমরা সবাই।

    উকিল-২। আপনারা সবাই সেটা বোঝা গেলো। সেই সবাইয়ের নামগুলো কী কী?

    উকিল-১। অবজেক্‌শন, মিলর্ড।

    বিচারক-২। অবজেক্‌শন ওভাররুল্‌ড্‌।

    উকিল-২। থ্যাঙ্ক য়্যু, মিলর্ড। (সাক্ষীকে) হ্যাঁ, নামগুলো বলুন।

    কারপেন্টার। আমি, আমার নাম উইলিয়ম কারপেন্টার, আমার বন্ধু জন হ্যাম্পডেন, এই মামলার বাদী এবং বাজিটা যে ঘোষণা করেছিলো। এ ছাড়া চ্যালেঞ্জার অ্যালফ্রেড ওয়ালেস, আর, আর... —পুরো নামটা ভুলে গেছি—কুলচার।

    উকিল-২। প্রথম তিন জনকে আমরা চিনি। কুলচার কে?

    কারপেন্টার। কুলচার ওয়ালেসের রেফারী।

    উকিল-২। ওয়ালেসের রেফারী। আচ্ছা, (হাতে ধরা ফাইলে চোখ রেখে) এই নামটা, জে-জে ওয়ল্‌শ্‌, ইনি কে?

    কারপেন্টার। ওয়ল্‌শ্‌? ও জোচ্চোরটাও তো ওয়ালেসেরই রেফারী।

    ঊকিল-২। উঁহু উঁহু উঁহু, এটা আদালত। নো আনপার্লামেন্টারী ওয়র্ডস প্লীজ।

    বিচারক-১। মিঃ কারপেন্টার, আপনাকে সতর্ক করে দেওয়া হলো।

    কারপেন্টার। সরি স্যর, সরি সরি মিলর্ড, আর কোনদিন বলবো না। (উকিল-২কে) ওয়ল্‌শ ওয়ালেসের অরিজিনাল রেফারী।

    উকিল-২। এই অরিজিনাল রেফারীর ব্যাপারটা আদালতকে ভালো করে বুঝিয়ে দেবেন কি?

    কারপেন্টার। হ্যাঁ, ওয়ল্‌শই অরিজিনাল রেফারী। কিন্তু ৫ই মার্চ, যেদিন আমরা ওল্ড বেডফোর্ড ক্যানালে যাওয়ার জন্যে বেরোলাম, ওয়ল্‌শ্‌ হঠাৎ খবর পাঠালো ও যেতে পারছে না, ও কুলচারকে পাঠাচ্ছে, কুলচারই রেফারী হবে।

    উকিল-২। (বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) লক্ষ্য করবেন মিলর্ড, লণ্ডন থেকে বেরোনো হলো ৫ই মার্চ, সেটা মিঃ কারপেন্টারের দিব্যি মনে আছে, কিন্তু তার পরের দিন যে পরীক্ষাটা হলো এবং উনি তার রায়টা দিলেন, সে তারিখটা ওঁর মনে নেই।

    কারপেন্টার। থাকবে তার কী মানে আছে, পরের দিন তো আমি রায় না দিয়ে সময় নিয়ে থাকতে পারি।

    উকিল-২। পারেন না। ওটা আফটারথট, পরে ভেবে-চিন্তে, যেটা প্রথমে বলেছিলেন, সেটাকে এখন বদলাচ্ছেন!

    উকিল-১। (উঠে দাঁড়িয়ে) অবজেকশন মীলর্ড, সাক্ষীর মুখে মন-গড়া কথা বসিয়ে দেবার অপচেষ্টা চলছে।

    বিচারক-১। অবজেকশন সাস্টেণ্ড।

    উকিল-২। (অসহায় ভঙ্গীতে কাঁধ ঝাঁকায়) যাই হোক্‌, ওয়ল্‌শের বদলে কুলচার রেফারী, এটা হ্যাম্পডেন মেনে নিলেন?

    কারপেন্টার। হ্যাঁ, মেনে নিতেই হল।

    উকিল-২। নিতেই হল মানে কী? ওয়ালেস জোর করেছিল?

    কারপেন্টার। না, ঠিক জোর করেনি। আচ্ছা ঠিক আছে, হ্যাম্পডেন মেনে নিল।

    বিচারক-২। ভেবে-চিন্তে বলুন মিঃ কারপেন্টার, মেনে নিল না মেনে নিতে বাধ্য হল।

    কারপেন্টার। বাধ্য? হ্যাম্পডেনকে বাধ্য করবে কে? অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট। নিজের বুদ্ধিতে চলে। মেনেই নিল।

    উকিল-১। (নিজের জায়গাতেই উঠে দাঁড়িয়ে) আমার লার্ণেড বন্ধু কি কোন ডক্যুমেন্ট দিয়েছেন?

    উকিল-২। ডক্যুমেন্ট দুয়ের ক। (সাক্ষীকে) আচ্ছা, বাজি হারলে শেষ পর্যন্ত যে টাকা দেওয়া হবে তার গ্যারান্টি কী ছিল?

    কারপেন্টার। হ্যাম্পডেন আর ওয়ালেস, দুজনই ওয়ল্‌শের অ্যাকাউন্টে পাঁচশো পাউণ্ড করে জমা রেখেছিল। দুজনেই মেনে নিয়েছিল যে জিতবে ওয়ল্‌শ্‌ তাকে পুরো হাজার পাউণ্ডই দিয়ে দেবে।

    উকিল-২। কিন্তু এই যে ওয়ল্‌শ্‌ আসতে পারল না, তার বদলে এল কুলচার, তাতে অ্যারেঞ্জমেন্টটা বদলিয়ে গেল না?

    কারপেন্টার। এটাই তো ব্লাণ্ডার, হ্যাম্পডেনকে বুঝিয়ে দিল, কুলচারের সিদ্ধান্তই ফাইনাল ধরা হবে।

    উকিল-২। মানে একা কুলচারের সিদ্ধান্ত?

    কারপেন্টার। তা কি কখনো হয়? কুলচার সিদ্ধান্ত নেবে ওয়ালেসের হয়ে, আর আমি নেব হ্যাম্পডেনের রেফারী হিসেবে।

    উকিল-২। এই পুরো অ্যারেঞ্জমেন্টটা ওরা হ্যাম্পডেনকে বুঝিয়ে দিল? হ্যাম্পডেনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে?

    কারপেন্টার। ইচ্ছের বিরুদ্ধে? হ্যাম্পডেনকে? অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েটকে?

    উকিল-২। ও, ইচ্ছের বিরুদ্ধে নয়। হ্যাম্পডেন বেশ খুশি মনেই মেনে নিল, তাই তো?

    কারপেন্টার। নিশ্চয়ই, ও তো জানতই ও জিতবে।

    উকিল-১। এই এগ্রীমেন্টের কোন ডক্যুমেন্ট আছে কি?

    উকিল-২। ডক্যুমেন্ট দুয়ের খ। মিঃ কারপেন্টার, ভেবেচিন্তে বলুন তো, পরীক্ষার পর ওয়ালেসের কী প্রতিক্রিয়া হল।

    কারপেন্টার। কী প্রতিক্রিয়া আবার! ও তো আনন্দে ধেই ধেই করে নাচছিল।

    উকিল-২। ধেই ধেই করে নাচছিল? কেন?

    কারপেন্টার। কেন আবার? জিতল বলে।

    উকিল-২। জিতল বলে? অর্থাৎ আপনি মেনে নিচ্ছেন ওয়ালেস সত্যিই জিতেছিল!

    কারপেন্টার। প্রথম বার তো জিতেই ছিল, তা-ই তো আমরা অবজেকশন দিলাম, মানে ডিসপিয়ুট করলাম।

    উকিল-২। জিতেছিল বলে ডিসপিয়ুট করলেন?

    উকিল-১। অবজেকশন মিলর্ড, সাক্ষীর মুখে কথা বসানোর অপচেষ্টা চলছে।

    বিচারক-৩। অবজেকশন ওভাররুল্‌ড্‌।

    উকিল-২। (বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) থ্যাঙ্ক য়্যু মিলর্ড, (সাক্ষীকে) কী বললেন, জিতেছিল বলে ডিসপিয়ুট করলেন?

    কারপেন্টার। না না, ঠিক জিতেছিল বলে নয়, টেলিস্কোপটায় গণ্ডগোল ছিল বলে।

    উকিল-২। টেলিস্কোপটায় গণ্ডগোল ছিল কখন বোঝা গেল?

    কারপেন্টার। প্রথমবার যখন ওয়ালেস জিতেছে বলে মনে হল তখনই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল ব্যাপারটা।

    উকিল-২। জিতেছে বলে মনে হল, না জিতল?

    কারপেন্টার। জেতেনি। জিতেছে বলেছে। আমরা তখনই বললাম টেলিস্কোপটা আমরা পরীক্ষা করে দেখতে চাই।

    উকিল-২। কিন্তু এই যে বললেন টেকনিক্যাল ব্যাপারের কিছুই আপনারা বোঝেন না, তাহলে কীভাবে পরীক্ষা করলেন?

    কারপেন্টার। না না বোঝে এমন এক জনকে আমরা ডেকে নিয়ে এলাম।

    উকিল-২। তো সে ব্যাপারে ওয়ালেস কী বলল? আপত্তি করল না?

    কারপেন্টার। ওয়ালেস কে? কুলচার রাজি হল, একজনকে আমরা ডেকে আনলাম। সে যা বলল আমি লিখে এনেছি।

    বিচারক-১। (উকিল-২কে) লেখা দেখে পড়লে আপনার আপত্তি আছে?

    উকিল-২। কিছুমাত্র নয়, উনি দেখেই বলুন না।

    কারপেন্টার। (পকেট থেকে কাগজ বের করে, দেখে) ক্রস-হেয়ার ডিফেক্ট ছিল।

    উকিল-২। সেটা কী ডিফেক্ট?

    কারপেন্টার। আমি তার কী জানি, ডিফেক্ট তো।

    উকিল-২। আপনি জানেন না কী ডিফেক্ট, কিন্তু এটা নিশ্চিত ভাবে জানেন যে ডিফেক্ট ছিল? ওয়ালেস কী বলল?

    কারপেন্টার। ওয়ালেসের সঙ্গে আমরা কথা বলব কেন?

    উকিল-২। ওয়ালেস প্রতিপক্ষ, কিন্তু তার সঙ্গে আপনারা কথা বলতে রাজি ন'ন!

    বিচারক-১। (উকিল-২কে) আপনি একটু অপেক্ষা করুন লার্ণেড কাউনসেল, আমি মিঃ কারপেন্টারকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। মিঃ কারপেন্টার, এই ডিসপিয়ুটের ব্যাপারে যা জানেন, সংক্ষেপে বলুন। অযথা আদালতের সময় নষ্ট করবেন না।

    কারপেন্টার। ইয়েস স্যর, ইয়েস মিলর্ড, ইয়েস মিলর্ড।

    বিচারক-১। হ্যাঁ বলুন।

    কারপেন্টার। পৃথিবী গোল বলে এতদিন ধরে অধার্মিক বিজ্ঞানীরা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে যেভাবে ভুল বোঝাতে চাইছিল, সেটা বন্ধ করার জন্যে আমার বন্ধু অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট জন হ্যাম্পডেন...

    বিচারক-১। মিঃ কারপেন্টার, আমি আপনাকে আগেই বলেছি আদালতের সময় নষ্ট করবেন না, আপনি কিন্তু...

    কারপেন্টার। জল খাব....,স্যর,....মিলর্ড...

    বিচারক-১। জল খান। (বিচারকের ইঙ্গিতে জল আনা হয়, এক নিশ্বাসে জলটা শেষ করে কারপেন্টার) হ্যাঁ বলুন।

    কারপেন্টার। আমার বন্ধু হ্যাম্পডেন চ্যালেঞ্জ করে যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে যে পৃথিবী গোল, তাহলে ও পাঁচশো পাউণ্ড হারবে, কিন্তু চ্যালেঞ্জ যে অ্যাক্‌সেপ্ট করবে সে যদি না দেখাতে পারে তাহলে হ্যাম্পডেনকে সে-ই পাঁচশো পাউণ্ড দেবে। ওয়ালেস দেখাতে পারলো না, কিন্তু ও আর ওয়ল্‌শ্‌ ফন্দি করে ব্যাঙ্ক থেকে হ্যাম্পডেনের জমা টাকা তুলে নিয়েছে।

    বিচারক-১। মানে, ওয়ালেস এবং ওয়ল্‌শ্‌, দুজনে মিলে ফন্দী করেছিল?

    কারপেন্টার। নাঃ, ওয়ল্‌শের ব্যাপারে নয়, আপাতত আমরা শুধুমাত্র ওয়ালেসের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করছি।

    বিচারক-২। আপনারা মানে? আপনি কী? বাদী না সাক্ষী?

    কারপেন্টার। দুটোই, দুটোই স্যর, মিলর্ড।

    বিচারক-২। আপনি কি সুস্থ আছেন?

    কারপেন্টার। না, মানে হ্যাঁ, মিলর্ড। জল খাব।

    বিচারক-২। এই তো আপনি জল খেলেন। এখনই খাবেন?

    কারপেন্টার। হ্যাঁ, না, পরে খাব।

    বিচারক-২। (ধমক দিয়ে) চুপ করুন, জোকার! (বিচারকের নির্দেশে আবার জল আসে, কারপেন্টার এক চুমুকে খেয়ে নেয়)

    কারপেন্টার। বাথরূম পেয়েছে, বাথরূমে যাব, মিলর্ড।

    বিচারক-২। যান। (চলে যায়, উকিল-১ কে) লার্ণেড কাউনসেল, কাদের ধরে আনেন আদালতে, কাস্টডিতে পাঠাব নাকি?

    উকিল-১। সরি মিলর্ড, আমি দেখছি। (বাথরূমের দিকে অতি দ্রুত দৌড়িয়ে যায়)


    বিচারকরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে, কারপেন্টার ফিরে এসে কাঠগড়ায় দাঁড়ায়, এবার বিচারক-৩ কথা বলে



    বিচারক-৩। মিঃ কারপেন্টার, প্রথমবারের পরীক্ষায় আপনারা অবজেকশন দেবার পর কী হল, আবার পরীক্ষা হল কি?

    কারপেন্টার। হ্যাঁ মিলর্ড।

    বিচারক-৩। সেবারের পরীক্ষায় কী হল?

    কারপেন্টার। ওয়ালেস বললো ও জিতেছে, কিন্তু হ্যাম্পডেন টেলিস্কোপে চোখ রাখতেই রাজি হল না।

    বিচারক-৩। আপনি?

    কারপেন্টার। ও রাজি হল না, আমি আর কী বলব।

    বিচারক-৩। আপনি টেলিস্কোপে চোখ দিয়ে দেখেছিলেন কিনা?

    কারপেন্টার। হ্যাঁ, দেখেছিলাম।

    বিচারক-৩। কী দেখলেন?

    কারপেন্টার। আসলে স্যর, মিলর্ড, আমি তো টেকনিক্যাল লোক নই, আমি কী বুঝি?

    বিচারক-৩। আপনি রেফারী, কিছু বোঝেন না, আপনার বন্ধু দেখতেই রাজি নয়। ঠিক আছে, আপনি আসুন এখন। (কারপেন্টার কাঠগড়া থেকে নেমে আসে )

    বিচারক-১। (আদালত-কর্মচারীকে) পরের সাক্ষী কে?

    কর্মচারি। (ফাইল খুলে) হেনরী বার্ণার্ড।

    বিচারক-১। ঠিক আছে, ডাকুন।


    কর্মচারীটি উইংসের ভেতরে চলে যায়, বার্ণার্ড প্রবেশ করে, পেছন পেছন কর্মচারীটিও আসে, বার্ণার্ড কাঠগড়ায় ওঠে, কর্মচারীটি
    তার হাতে একটা বই দেয়, মনে হয় বাইবেল; সে নিজে কাঠগড়ার পাশে দাঁড়িয়ে বার্ণার্ডের দিকে মুখ করে একটা কাগজ থেকে
    মৃদু স্বরে কিছু পড়ে, বার্ণার্ড সেই কথাগুলো আবার উচ্চারণ করে, সমস্ত ঘটনাটা মৃদু স্বরে হয়, কিছুই শোনা যায় না, শপথ নেওয়া
    মাইম-এ দেখানো হয়। উকিল-২, বিচারক-২ এর ইঙ্গিত পেয়ে কাঠগড়ার সামনে পৌঁছে প্রশ্ন করার জন্যে তৈরি হয়।


    উকিল-২। মিঃ বার্ণার্ড, সংক্ষেপে আপনার পরিচয় আদালতকে জানাবেন কি?

    বার্ণার্ড। আমি হেনরী বার্ণার্ড, বাবার নাম পিটার বার্ণার্ড...

    উকিল-২। না না, অত কিছু নয়, আপনার অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন, সোশ্যাল স্ট্যাণ্ডিং, কী করেন এইসব...

    বার্ণার্ড। ফেলো অব দ্য রয়াল কলেজ অব সার্জেনস, ফেলো অব দ্য রয়াল সোসাইটি, আপাতত প্রোফেসর অব কম্পেয়ারেটিভ অ্যানাটমি অ্যাণ্ড ফিজিওলজি অ্যাট দ্য রয়াল কলেজ অব সার্জেনস।

    উকিল-২। মিঃ বার্ণার্ড, আপনি কি ফ্ল্যাট-আর্থ ওয়েজার সম্বন্ধে কিছু জানেন?

    বার্ণার্ড। হ্যাঁ, খবরের কাগজে যতটা পড়েছি।

    উকিল-২। আপনার কি মনে হয় যে পরীক্ষার জোরে মিঃ ওয়ালেস এই ওয়েজার জিতলেন, তাতে কোন অসাধুতা ছিল?

    বার্ণার্ড। অসাধুতা? এই অতি-সাধারণ পরীক্ষায় অসাধুতা করবে কে? যতবার আপনি পরীক্ষা করবেন একই ফল পাবেন তো।

    উকিল-২। আচ্ছা মিঃ বার্ণার্ড, আপনি কি মিঃ ওয়ালেসকে চেনেন?

    বার্ণার্ড। হ্যাঁ চিনি তো নিশ্চয়ই।

    উকিল-২। ওঁর চরিত্র সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা?

    বার্ণার্ড। চরিত্র? কোন ধারণা নেই। চিনি বিজ্ঞানী হিসেবে, ওঁর লেখা পড়েছি, বক্তৃতা শুনেছি, দুয়েকবার কথাবার্তাও হয়েছে, তবে সে সব একেবারেই বিজ্ঞান সংক্রান্ত, ওঁর চরিত্র সম্বন্ধে মন্তব্য করব, এতটা ব্যক্তিগত স্তরে ওঁর সঙ্গে মিশিনি আমি।

    উকিল-২। আচ্ছা বিজ্ঞানী হিসেবে মিঃ ওয়ালেসের সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা?

    বার্ণার্ড। ন্যাচারাল হিস্ট্রীতে মোটামুটি ডারউইনের পরেই যাঁরা সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট, উনি নিশ্চয়ই তাঁদের মধ্যে একজন।

    উকিল-২। মিঃ বার্ণার্ড, থ্যাঙ্ক য়্যু। (বিচারকদের উদ্দেশে) আমার আর কোন প্রশ্ন নেই। ( উকিল-২ নিজের জায়গায় বসে পড়েন)

    বিচারক-৩। (উকিল-১ কে) লার্ণেড কাউনসেল, আপনি কি প্রশ্ন করতে চান?

    উকিল-১। (কাঠগড়ার দিকে এগোতে এগোতে) হ্যাঁ, মিলর্ড (বার্ণার্ডকে), মিঃ বার্ণার্ড, আপনি তো ওয়ালেসের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

    বার্ণার্ড। না তো।

    উকিল-১। ও হোঃ, মিঃ বার্ণার্ড, আপনার কথায় বোঝা গেল আপনি নিজেও ডারউইনবাদী এবং তথাকথিত বিজ্ঞানী। অতএব একই সম্প্রদায়ভুক্ত ডারউইনবাদী ওয়ালেসকে আপনি একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী হিসেবে দেখাতে চাইছেন।

    বার্ণার্ড। সম্প্রদায়-টম্প্রদায় কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।

    উকিল-১। একটু মাথা ঘামালেই বুঝতে পারবেন! খুব উঁচু সামাজিক অবস্থান আপনার! এফ-আর-সি-এস! কিন্তু আপনারা যাকে ডারউইনবাদ বলেন তাতে বিশ্বাস করেন কজন? আপনাদের মতো ডারউইন সম্প্রদায়ভুক্ত বিজ্ঞানী তো মুষ্টিমেয়। এত ছোট সম্প্রদায়, স্বাভাবিক ভাবেই আপনারা একজন অন্যকে সাহায্য করেন, যে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়েও এটাই হয়।

    বার্ণার্ড। মানে? ডারউইনবাদ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন আমি জানিনা। অরিজিন অব স্পীশিস, ডেভ্‌লপমেন্ট, ভ্যারিয়েশন, এ সব ব্যাপারে ডারউইনের কিছু নতুন আইডিয়া এবং যুক্তি আছে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে একমত, অনেকে ন'ন, কিন্তু ডারউইন নিজে কোথাও কোন 'ডারউইনবাদ'-এর কথা বলেননি। সম্প্রদায়, ধর্ম এ সব আসছে কোথা থেকে?

    উকিল-১। আপনার কী ধর্ম?

    বার্ণার্ড। কী ধর্ম মানে? মানুষ যখন, তখন মানুষেরই ধর্ম।

    উকিল-১। রিলিজিয়নের কথা বলছিলাম। সরাসরি সেটার উত্তর যখন দিলেন না, আপনাকে অন্য একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আপনারা কি সত্যি সত্যিই মানুষ? আপনারা তো মানেন না। আপনাদের মতে আপনারা তো বাঁদরের বংশধর। (দর্শক-আসন থেকে হাসির শব্দ আসে। বিচারকরা কয়েকবার 'অর্ডার, অর্ডার' বলার পর থামে)

    বার্ণার্ড। আপনি আমাদের বলতে কাদের কথা বলছেন জানিনা। কোথা থেকে এই সব মত সংগ্রহ করেছেন জানিনা তা-ও। তবে ব্যাপারটা হচ্ছে এসব ব্যাপারে কথা বলতে গেলে একটু-আধটু পড়াশোনা করতে হয়, জানতে হয়।

    বিচারক-২। (উকিল-১ কে) লার্ণেড কাউনসেল, মিঃ বার্ণার্ডকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।

    উকিল-১। নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই মিলর্ড।

    বিচারক-২। মিঃ বার্ণার্ড, আপনি বলছিলেন মিঃ ওয়ালেসের পরীক্ষাটা খুবই সাধারণ একটা পরীক্ষা। আচ্ছা, ধরুন আপনি নিজে যদি এর মধ্যে থাকতেন, এই ফ্ল্যাট আর্থ ওয়েজারে, তাহলে আপনি কি অন্য কোন পরীক্ষার কথা ভাবতেন?

    বার্ণার্ড। ভাবতাম এমন কোন মানে নেই, তবে ভাবতেও পারতাম।

    বিচারক-৩। মানে পরীক্ষাটার মধ্যে কোন ফাঁক আছে কি নেই? কী মনে হয় আপনার?

    বার্ণার্ড। আমি তো আগেও বলেছি, আমি স্পটে ছিলাম না, কাজেই এই বিশেষ পরীক্ষাটায় ওই দিন কী হয়েছিলো আমি জানি না। কেউ যদি ম্যানিপুলেট করে, অন্য কথা। কিন্তু করবেই বা কেন? যতবারই পরীক্ষা হোক্‌, একই ফল হবে তো।

    বিচারক-১। ঠিক আছে মিঃ বার্ণার্ড, একটা অন্য কথা বলি। আপনি কি মনে করেন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মিঃ ওয়ালেসের যে বিশেষ পারদর্শিতা, এই ধরণের একটা তর্কের বৈজ্ঞানিক সমাধান পরীক্ষার সাহায্যে দেখাবার পক্ষে সেটা যথেষ্ট?

    বার্ণার্ড। যথেষ্ট, যথেষ্ট। এটা কি কিছু পরীক্ষা নাকি? এটার জন্যে কোন পারদর্শিতাই লাগেনা। যে কোন হাই স্কুলের ছেলে যদি একটা টেলিস্কোপ নাড়াচাড়া করে কয়েকদিন, সে-ও অবলীলায় এই পরীক্ষা করে দেখাতে পারে।

    বিচারক-২। তাহলে এই ওয়েজারের বিজ্ঞাপন দেখে আর কেউ কেন এগিয়ে এলেন না? শয়ে শয়ে তো আসার কথা।

    বার্ণার্ড। এটাই আসল পয়েন্ট। দেখুন, আজ যদি কেউ ত্রিভুজের তিন কোণের যোগফল দু সমকোণের সমান, এই প্রোপোজিশন পরীক্ষা করে দেখাতে পারলে হাজার পাউণ্ড পুরষ্কার দিতে চায়, তাহলে কোন বুদ্ধিমান লোক তার মধ্যে যাবে কি? এই ঘোষণা যে করবে সে লোকটা কী? পাগল, অথবা ম্যাজিশিয়ান, কিংবা ঠক। আত্মসম্মানবোধ যাঁর আছে, তিনি এর মধ্যে যাবেন? একজন বিজ্ঞানীর অনেক কাজ আছে, এ সব বাজে ব্যাপারে জড়াবেন কেন? আমি জানিনা মিঃ ওয়ালেসের কোন লাভ হয়েছে কিনা, আমি তো দেখতে পারছি শুধু শুধু এই সব আইন-আদালতের মধ্যে জড়িয়ে তাঁর বদনামই হচ্ছে। যে ধরণের লোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়ারই কথা নয়, মাচ বিলো হিম, তারাও তাঁকে নিয়ে ব্যান্টার করছে, কাগজে বাজারে হৈ হৈ—এসব কি ভালো? সত্যি কথা বলতে গেলে উনি অনেক নীচে নেমে এসেছেন, মাচ বিনীথ ডিগনিটি, অ্যাণ্ড হি হ্যাজ বীন কনসিডারেবলি লূজিং হিস কাস্ট, একজন বিজ্ঞানীর একটা জায়গা তো আছে সমাজে! এ তো প্রায় জাত খোয়ানো!

    বিচারক-২। ঠিক আছে মিঃ বার্ণার্ড, থ্যাঙ্ক য়্যু। (উকিল-১কে) লার্ণেড কাউনসেল, আপনার কি আর কোন প্রশ্ন আছে?

    উকিল-১। না মিলর্ড, আপাতত নয়, পরে প্রশ্ন করার একটা অপশন রাখতে চাইছি।

    বিচারক-২। থাকল। (উকিল-১ নিজের আসনে চলে যান, বার্ণার্ড উইংসের ভেতর ফিরে যায়)

    বিচারক-১। (আদালত-কর্মচারীকে) এর পর কে?

    কর্মচারি। জ্যাক হর্সমঙ্গার।

    বিচারক-২। ডাকুন।


    বিচারকদের ইঙ্গিতে কর্মচারীটি ভেতরে চলে যায়, একটু পরে জ্যাক হর্সমঙ্গার এবং কর্মচারীটি আসে, কাঠগড়ায় ওঠা এবং শপথ
    নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়। উকিল-১, বিচারক-২এর ইঙ্গিত পেয়ে কাঠগড়ার সামনে পৌঁছে হর্সমঙ্গারকে প্রশ্ন করার জন্যে তৈরি হয়।


    উকিল-১। মিঃ হর্সমঙ্গার, আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় যদি এই আদালতকে দেন...

    হর্সমঙ্গার। জ্যাক হর্সমঙ্গার, হার ম্যাজেস্টিস গাভ্‌মেন্টের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, আগে কার্টনের গাভ্‌নার ছিলাম। তার আগে আর্মিতে ডিস্টিঙ্গুইশ্‌ড্‌ সার্ভিস অ্যাওয়ার্ডী, কার্টনের আগে হেডকোয়ার্টারে, মানে ইয়ার্ডে ছিলাম, আর কিছু জানতে চান?

    উকিল-১। যথেষ্ট, আর দরকার নেই, আপনার সামাজিক অবস্থানটা আমার মনে হয় আদালত বুঝতে পারছেন।

    হর্সমঙ্গার। হুঁ।

    উকিল-১। এই মামলার বাদী জন হ্যাম্পডেনকে আপনি চেনেন?

    হর্সমঙ্গার। ভালোভাবেই।

    উকিল-১। কিভাবে চিনলেন?

    হর্সমঙ্গার। বেচারা আমার জেলে ছিল এক সপ্তা', একটা নোংরা ষড়যন্ত্রের ফলে।

    উকিল-১। নোংরা ষড়যন্ত্র? কিরকম?

    হর্সমঙ্গার। আরে মশাই হ্যাম্পডেন স্পষ্টবক্তা লোক—হবেই বা না কেন, হাইলি এডুকেটেড, অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট, যা শিখেছে সব তো সলিড—সোজা-সাপটা বলে, ওকে ফাঁসিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিলো ঐ বাঁদরের বংশধর বৈজ্ঞানিকটা।

    উকিল-২। (উঠে দাঁড়ায়, বিচারকদের উদ্দেশে) অবজেকশন মিলর্ড।

    বিচারক-১। অবজেকশন ওভাররুল্‌ড্‌।

    উকিল-১। মিঃ হর্সমঙ্গার, দেখছেন তো আপনি কারো কারো সূক্ষ্ম সংবেদ আহত করছেন। বাঁদরের বংশ-টংশ এসব কথা কি না বললেই নয়? (দর্শক-আসন থেকে হাসি এবং গুঞ্জন)

    বিচারক-২। অর্ডার অর্ডার।

    হর্সমঙ্গার। আমি কেন করব? এ সব তো ঐ ওয়ালেস, আর ওর গুরু ডারউইনের কথাবার্তা। ডারউইন ছাড়ুন, কিন্তু ওয়ালেস, ও তো আবার বক্তাও! বানরত্বের প্রচারক! কে জানে, হয়তো ওর বাপ-দাদা বাঁদরই ছিলো, দেখে মনেও হয় সেরকম খানিকটা...

    বিচারক-৩। (দর্শক-আসন থেকে প্রবল হাসির শব্দে) অর্ডার অর্ডার।

    হর্সমঙ্গার। আমার স্পষ্ট কথা, আমিও বাঁদরের বংশ নই, আর আমার এই মহান দেশের মানুষরাও নয়।

    উকিল-১। আপনার মতে হ্যাম্পডেনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?

    হর্সমঙ্গার। পার্সোনালি কথা বলেছি। জেলে সবাইকে চিনতাম। রিফর্ম করার চেষ্টা করতাম। (হঠাৎ বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) মিলর্ড, কার্টেনের রেকর্ড আমার অ্যাচিভমেন্ট, মিলর্ড। আপনারা যদি রেকমেণ্ড করেন তাহলে এ বছরের বার্থডেতে......

    বিচারক-১। ঠিক আছে ঠিক আছে...

    হর্সমঙ্গার। হ্যাম্পডেন জেলে এলে ওর সঙ্গে আলাপ করলাম। আমি পুলিস লাইনে অভিজ্ঞ, ইয়ার্ডেও সীনিয়র ছিলাম, ওর সঙ্গে মিশে মনে হলো যার গাভ্‌নার হওয়ার কথা, তাকে ভুল করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রিজন ইনমেট করে।

    উকিল-১। তার মানে কি আপনি হ্যাম্পডেনকে অত্যন্ত সচ্চরিত্র এবং নিয়মানুবর্তী ভদ্রলোক বলতে চাইছেন?

    হর্সমঙ্গার। নিঃসন্দেহে।

    উকিল-১। আর বেশি সময় নেব না। একটিই প্রশ্ন। আপনি যে ষড়যন্ত্রের কথা বলছিলেন সেটা যদি একটু স্পষ্ট করেন।

    হর্সমঙ্গার। যত বাঁদরের বাঁদরামি বুদ্ধি! ছোটবেলায় স্কুলে তৈলাক্ত খুঁটির অঙ্ক করেছেন? ঐ খুঁটি দিয়ে ওঠানামা করে কারা? সব বাঁদর, তাই না? খুঁটি বাঁদরের বড় প্রিয়। কাজেই ওয়ালেস বাঁদরের আর কী হবে! প্রথমেই খুঁটি মনে পড়বে! ঐ খুঁটি দিয়েই ঘাবড়িয়ে দিল হ্যাম্পডেনকে। ও জানত বাঁদরে অ্যালার্জি হয়ে গেছে হ্যাম্পডেনের ডারউইনের আজগুবি গপ্প শুনতে শুনতে, কোন রকমে বাঁদরের কথা মনে করিয়ে দিতে পারলেই ঘাবড়িয়ে যাবে ও, বুদ্ধিটুদ্ধি গুলিয়ে যাবে সব, তাই ইচ্ছে করেই খুঁটির এক্সপেরিমেন্ট, খুঁটি মানেই বাঁদর, সমস্ত এক্সপেরিমেন্টটাই তো একটা ধাপ্পাবাজি, ষড়যন্ত্র...


    (হর্সমঙ্গারের কথা চলাকালীন প্রায় অনবরতই দর্শক-আসন থেকে হাসির আর হাততালির আওয়াজ ওঠে এবং
    বিচারকদের অর্ডার, অর্ডার শুনতে পাওয়া যায়)


    উকিল-১। ঠিক আছে, মিঃ হর্সমঙ্গার, ধন্যবাদ। (নিজের জায়গায় ফিরে যায়)

    বিচারক-৩। (উকিল-২কে) আপনি কি কথা বলবেন মিঃ হর্সমঙ্গারের সঙ্গে?

    উকিল-২। বলব মিলর্ড। (এগিয়ে যায়) মিঃ হর্সমঙ্গার, বোঝা যাচ্ছে ঐ ওয়েজারের ব্যাপারে খুঁটি দিয়ে পরীক্ষায় আপনার আপত্তি আছে। কিন্তু আপনি কি জানেন সমস্ত পরীক্ষাটার বিশদ প্ল্যান, এবং সেই অনুযায়ী একটা স্কেচ, মিঃ হ্যাম্পডেনকে আগেই দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর রেফারীও তাতে সই করেন? (বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) ডক্যুমেন্ট একের গ, মিলর্ড।

    হর্সমঙ্গার। আমি আর এ ব্যাপারে কোন আলোচনা করতে চাইনা, আমার যা বলার বলা হয়ে গেছে।

    উকিল-২। চাইনা বললে তো চলবে না মিঃ হর্সমঙ্গার, এটা আদালত, প্রশ্ন যা করা হচ্ছে তার জবাব তো দেওয়া চাই।

    উকিল-১। অবজেকশন মিলর্ড, সাক্ষীকে তো কার্যত আদালতের নামে ভয় দেখানো হচ্ছে।

    বিচারক-৩। অবজেকশন সাস্টেণ্ড।

    উকিল-১। ঠিক আছে মিঃ হর্সমঙ্গার, অন্য প্রশ্ন। মিঃ হ্যাম্পডেনকে কার্টনের আগে কখনো দেখেছিলেন আপনি?

    হর্সমঙ্গার। না, আগে কখনো ওঁর সঙ্গে দেখা হয়নি।

    উকিল-২। কার্টনে তো উনি মাত্র এক সপ্তাহ ছিলেন, তাই না?

    হর্সমঙ্গার। হ্যাঁ, আপনার ক্লায়েন্ট অনেক চেষ্টা করেও ওটা বাড়াতে পারেনি, এক সপ্তাহই ছিল।

    উকিল-২। এক সপ্তাহেই আপনি ওঁকে এত ভালো চিনে গেলেন যে এত ভালো ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন?

    হর্সমঙ্গার। দেখুন, আমি লোকটা কে, আপনাকে বুঝতে হবে। সীনিয়র পুলিস সার্ভিসে ছিলাম। হেডকোয়ার্টারে, ইয়ার্ডেও। একটা মানুষের সঙ্গে এক ঘন্টা কথা বললেই তার সম্বন্ধে সব কিছু বুঝতে পারি; এটাই আমাদের ট্রেনিং, বুঝলেন তো?

    উকিল-২। তা ঠিক, কিন্তু আপনি কি মিসেস ওয়ালেসকে লেখা হ্যাম্পডেনের হুমকি দেওয়া চিঠিটার ব্যাপারে কিছু জানেন?

    হর্সমঙ্গার। হুমকি? হোয়াট ডু য়্যু মীন, হুমকি? সব কথার অক্ষরে অক্ষরে অর্থ হয়? প্রসঙ্গটা বুঝতে হবে—কন্টেক্স্‌ট্‌, বুঝলেন? হুমকি বললেই হুমকি? ডোন্ট ট্রাই টু টীচ আ ফর্মার পুলিসম্যান! এই যে আপনি এখানে দাঁড়িয়ে, আমি বললুম বসে পড়ুন, তাহলে আপনি কী অর্থ করবেন? বসুন, এবং পড়ে যান? মানে আমি আপনার বসার জায়গাটায় প্রচুর পরিমাণে গ্রীজ মাখিয়ে রেখেছি, যেই আপনি বসতে যাবেন, হড়হড়ে গ্রীজে পিছলে পড়ে যাবেন, সেই হুমকি? যত্ত সব!


    দর্শক-আসন থেকে হাততালি, হাসির শব্দ এবং গুঞ্জন, বিচারকরা “অর্ডার, অর্ডার” ঘোষণা করতে থাকেন


    উকিল-২। (বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) এখন এই পর্যন্ত, মিলর্ড। (বসে পড়েন, হর্সমঙ্গার উইংসের ভেতর ফিরে যায়)

    বিচারক-১। (কর্মচারীকে) এরপর কে?

    কর্মচারি। (ফাইল দেখে) অভিযুক্ত অ্যালফ্রেড ওয়ালেস।

    বিচারক-১। ডাকুন।


    কর্মচারীটি উইংসের ভেতরে চলে যায়, একটু পরে ওয়ালেস এবং সে ফিরে আসে,
    কাঠগড়ায় ওঠা এবং শপথ নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়। উকিল-১, বিচারক-১ এর
    ইঙ্গিত পেয়ে কাঠগড়ার সামনে পৌঁছে ওয়ালেসকে প্রশ্ন করার জন্যে তৈরি হয়।


    উকিল-১। মিঃ ওয়ালেস। আপনি এই মাত্র বাইবেল হাতে নিয়ে শপথ নিলেন, এই আদালত আশা করবে আপনি শপথের মর্যাদা রক্ষা করবেন। আচ্ছা ওয়ালেস, আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?

    ওয়ালেস। করি।

    উকিল-১। শুনেছি আপনি নিউটনিয়ন মেকানিক্‌সের তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। খবরটা কি ঠিক?

    ওয়ালেস। খবরটা ঠিক, কিন্তু এত লোক থাকতে এত শতক বাদে আবার নিউটনকে নিয়ে পড়লেন কেন?

    উকিল-১। সে কথা থাক। তাহলে দাঁড়ালো, আপনি নিউটনিয়ন মেকানিক্‌সে বিশ্বাসী। এবং ঈশ্বরে। ঠিক তো?

    ওয়ালেস। একেবারে ঠিক।

    উকিল-১। (অত্যুচ্চ কণ্ঠে, নাটকীয় ভঙ্গীতে) মিঃ ওয়ালেস, আপনার শপথের কথা আপনাকে মনে করিয়ে দিই। নিউটনিয়ন মেকানিক্‌সে বিশ্বাসের অর্থই তো ঈশ্বরে অবিশ্বাস, দুটোর মধ্যে একটাকে আপনি বেছে নিতে পারেন। যে মুহূর্তে আপনি নিজেকে ঈশ্বরবিশ্বাসী বলে ঘোষণা করলেন, নিউটনিয়ন মেকানিক্‌সে অবিশ্বাস সে মুহূর্তেই ঘোষিত হয়ে গেলো। আমি আপনাকে হার ম্যাজেস্টিজ হাই কোর্টের কুইন্‌স্‌ বেঞ্চের কাছে শপথভঙ্গ এবং মিথ্যাভাষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করছি।

    ওয়ালেস। তা করুন, কিন্তু (বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) আমি কি এই ভদ্রলোককে একটা প্রশ্ন করতে পারি?

    বিচারক-২। করুন, কিন্তু সংক্ষেপে।

    ওয়ালেস। (উকিল-১কে) আপনি কি মনে করেন স্যর আইজ্যাক নিউটন নিউটনিয়ন মেকানিক্‌সে বিশ্বাস করতেন?

    উকিল-১। ছেলেমানুষী প্রশ্ন করে আদালতের মহামূল্য সময় নষ্ট করছেন কেন?

    ওয়ালেস। বিশ্বাস করতেন কি?

    উকিল-১। নিশ্চয়ই করতেন।

    ওয়ালেস। কিন্তু মুশকিলটা হল এই যে তিনিও ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। (দর্শক-আসন থেকে চাপা হাসি এবং গুঞ্জন শোনা যায়)

    বিচারক-১। অর্ডার, অর্ডার।

    উকিল-১। আচ্ছা মিঃ ওয়ালেস, আপনার সর্বক্ষণের কোন পেশা আছে? সেটা কি? না থাকলে তা-ও বলতে পারেন।

    ওয়ালেস। আছে। বিজ্ঞান চর্চা করা।

    উকিল-১। বিজ্ঞান চর্চা? আপনি বিজ্ঞান শিখলেন কোথায়? কেম্ব্রিজে?

    ওয়ালেস। না, জঙ্গলে। মূলত অ্যামাজনের জঙ্গলে দক্ষিণ আমেরিকায়, তারপর বোর্ণিওয়।

    উকিল-১। জঙ্গলে, ভালো কথা। তার মানে, স্কুল-কলেজে নয়। জঙ্গলের শিক্ষা, সেল্‌ফ্‌-টট। অর্থাৎ আপনাকে
    কোয়্যাক-সায়েন্টিস্ট বলা যায়। কোয়্যাক-সায়েন্টিস্ট অ্যাণ্ড নিউটনিয়ন, বেড়ে! দি কম্বিনেশন! (হাসির শব্দ এবং 'অর্ডার' ধ্বনি)...তা না হয় হল, কিন্তু এই যে বাজি, যেখানে আপনি প্রমাণ করছিলেন যে পৃথিবী সমতল নয়, নিউটোনিয়ন মেকানিক্‌সে বিশ্বাসী হিসেবে আপনার কি মনে হয় না যে নৈতিক ভাবে এ রকম একটা বাজিতে আপনি অংশগ্রহণই করতে পারেন না?

    ওয়ালেস। আবার নিউটন! কেন?

    উকিল-১। মিঃ ওয়ালেস, এই আদালতে প্রশ্ন করার অধিকার আমার, আপনার কাজ জবাব দেওয়া।

    ওয়ালেস। তা-ই যদি হয়, তাহলে আমার জবাব হলো, শুধুমাত্র অংশগ্রহণ করার নৈতিক অধিকার নয়, এই বাজিতে জেতা আমার একটা নৈতিক কর্তব্য বলেই আমি মনে করি।

    উকিল-১। আর সেই নৈতিক কর্তব্যের তাগিদেই কি অসাধু উপায়ে বাজিটা জেতার প্রয়োজন আপনি অনুভব করলেন?

    ওয়ালেস। আপনি আমাকে অসাধু উপায়ে বাজি জেতার অভিযোগ করলেন। আপনার অভিযোগ আমি অস্বীকার করছি।

    উকিল-১। আপনার টেলিস্কোপটা কি আগের থেকেই কায়দা করে রেখে দেওয়া ছিলো না, যাতে আপনি যেটা চাইছেন সেই রেজাল্টটাই দেখা যায়? নিউটোনিয়ান সায়েন্টিস্ট হিসেবে আপনার তো টেলিস্কোপের নাড়ী-নক্ষত্র জানা আছে!

    ওয়ালেস। টেলিস্কোপের ব্যাপারে একটু-আধটু জ্ঞান নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সেটার জন্যে নিউটোনিয়ান সায়েন্টিস্ট হবার কী দরকার? আর শুনুন, পরীক্ষাটার সময়ে একটা নয়, দুটো টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয়েছিলো, কোনটাই আমার নয়। প্রথমটা স্থানীয় একটা ফোটোগ্রাফিক দোকান থেকে ভাড়া নেওয়া, কিন্তু সেটার ব্যাপারে মিঃ হ্যাম্পডেন পরীক্ষার পর আপত্তি করায় ওঁরাই একটা টেলিস্কোপ ভাড়া করে নিয়ে আসেন। কোথা থেকে এনেছেন আমি জানার চেষ্টাও করিনি, আপত্তিও করিনি।

    বিচারক-২। মিঃ ওয়ালেস, অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষাটা, পরীক্ষাটা শোনা যাচ্ছে। লার্ণেড কাউনসেলররা নিশ্চয়ই এই পরীক্ষার ব্যাপারে সম্যক অবহিত। আদালতের অবগতির জন্যে আপনি কি পরীক্ষাটা কী ছিল, একটু বুঝিয়ে দেবেন?

    ওয়ালেস। মিঃ হ্যাম্পডেন চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন পরীক্ষার সাহায্যে পৃথিবীপৃষ্ঠের বক্রতা প্রমাণ করতে হবে। আমরা ওল্ড বেডফোর্ড ক্যানালে ছ' মাইল দূরত্বে তিনটে সমান উচ্চতার খুঁটি পুঁতি।

    বিচারক-১। ছ' মাইল দূরত্বে তিনটে খুঁটি মানে?

    ওয়ালেস। প্রথম পয়েন্টে একটা খুঁটি পোঁতা হলো, তারপর তিন মাইল দূরে আর একটা খুঁটি পোঁতা হলো। পোঁতার পর উচ্চতা মেপে দেখা নেওয়া হলো দুটো খুঁটির উচ্চতা সমান। এবার ঐ দুটো খুঁটির সঙ্গে একই সরলরেখায় আবার তিন মাইল দূরত্বে আর একটা খুঁটি পুঁতে দেখে নেওয়া হল সেটার উচ্চতাও বাকি খুঁটি দুটোর সঙ্গে সমান। আমার হিসেব মতো এবার যদি একটা টেলিস্কোপ দিয়ে তিনটে খুঁটিকে একসঙ্গে দেখা হয়, মাঝের খুঁটিটাকে বাকি দুটো খুঁটির তুলনায় অন্তত পাঁচ ফুট উঁচু বলে মনে হবে, এবং তাতেই পৃথিবীপৃষ্ঠের বক্রতার নিঃসন্দেহ প্রমাণ হবে।

    বিচারক-১। ধন্যবাদ মিঃ ওয়ালেস, আমরা বুঝলাম। (উকিল-১কে) লার্ণেড কাউনসেল, আপনি রিজিউম করতে পারেন।

    উকিল-১। ধন্যবাদ, মিলর্ড। (ওয়ালেসকে) মিঃ ওয়ালেস, আমি বলছি আপনার পরীক্ষার পরিকল্পনার মধ্যেই অসাধুতা ছিল।

    ওয়ালেস। একটু অনুগ্রহ করে বুঝিয়ে বলবেন কি?

    উকিল-১। ওল্ড বেডফোর্ড ক্যানালে যে জায়গাটায় মাঝের খুঁটিটা পোঁতা হয়েছিল, সেখানে ক্যানালের নীচে ছ-সাত ফুট আপনি আগের থেকেই উঁচু করে রেখে এসেছিলেন। আমি সরাসরি অভিযোগ করছি। আপনি কি জবাব দিতে চান?

    ওয়ালেস। নাঃ, জবাব নয়। শুধুমাত্র আপনার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতে চাই। (আদালতে চাপা হাসি এবং গুঞ্জন)

    বিচারক-৩। অর্ডার, অর্ডার। (ওয়ালেসকে) মিঃ ওয়ালেস, আপনার ইচ্ছে হলে লার্ণেড কাউনসেলের প্রশ্নের জবাব না দিতে পারেন, সে আপনার স্বাধীনতা; কিন্তু ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা, বিশেষত একজন অভিযুক্তের পক্ষে, আদালতের রীতিবিরুদ্ধ।

    উকিল-২। (উঠে দাঁড়িয়ে, বিচারকদের উদ্দেশ্য করে) মিলর্ড, আমি কি আমার মক্কেলকে একটা পরামর্শ দিতে পারি?

    বিচারক-৩। গোপন পরামর্শ যদি না হয়, যদি সর্বসমক্ষে বলা যায়, দিতে পারেন।

    উকিল-২। ধন্যবাদ, মিলর্ড। (ওয়ালেসকে) মিঃ ওয়ালেস, আপনি আমার বিদগ্ধ বন্ধুর অভিযোগের উত্তরটা সরাসরিই দিন।

    ওয়ালেস। (উকিল-১কে) আপনার অভিযোগের প্রথম উত্তর হল, একটা বহমান ক্যানালে এভাবে একটা জায়গাকে উঁচু করে রাখা যায় না, যদি না সাময়িক ভাবে জল সরিয়ে দিয়ে ভিত-টিত খুঁড়ে, একটা রীতিমতন স্ট্রাকচার তৈরি করা হয়। সেটা করা সম্ভব ছিল না, কারণ লণ্ডন থেকে মিঃ হ্যাম্পডেন, মিঃ কারপেন্টার এবং আমি একই সঙ্গে নরফোকে ওল্ড বেডফোর্ড ক্যানালে পরীক্ষার আগের দিন পৌঁছোই। দু নম্বর, পরীক্ষার ভেন্যু, মানে ওল্ড বেডফোর্ড ক্যানাল, মিস্টার হ্যাম্পডেনেরই সিদ্ধান্ত। তিন নম্বর, খুঁটিগুলো আগের থেকে পোঁতা ছিল না, আমরা ক্যানালে পৌঁছোবার পর, সবাই মিলে সবায়ের সামনেই পোঁতা হয়েছে। চার নম্বর, ঠিক কোন্‌ জায়গায় মাঝখানের খুঁটিটা পোঁতা হবে, সেটা আমরা সবাই পৌঁছোবার পরই ঠিক করা হয়। পাঁচ নম্বর, আমরা কেউই নিজের হাতে খুঁটিগুলো পুঁতিনি, স্থানীয় একজন লোককে দিয়ে কাজটা করানো হয়েছিলো। ছ' নম্বর, খুঁটিটা যে পুঁতেছিল সে জলের নীচে কোন স্ট্রাকচার বুঝতে পেরেছে এমন কথা বলেনি। এবং, সাত নম্বর, আগেই আপনাকে বলেছি, প্রতিটি খুঁটি পোঁতা হয়ে যাবার পর তাদের উচ্চতা মেপে দেখা হয়েছিল।

    উকিল-১। ভেন্যু যে হ্যাম্পডেনই ঠিক করেছিলো, এটা আপনি প্রমাণ করতে পারবেন?

    ওয়ালেস। আমার মনে হয় হ্যাম্পডেন আমাদের লিখেই জানিয়েছিল এটা।

    উকিল-১। লিখেই জানিয়েছিল? প্রমাণ আছে?

    উকিল-২। (উঠে দাঁড়িয়ে, বিচারকদের উদ্দেশে) ডক্যুমেন্ট তিন এর ক, মিলর্ড।

    বিচারক-১। (কর্মচারিকে) ঠিক আছে, নোট করুন।

    উকিল-১। এতই যদি হয়, তখন বাজি জিতেছেন প্রমাণ করবার জন্যে আপনাকে আদালতে যেতে হয়েছিল কেন?

    ওয়ালেস। বাজি জিতেছি প্রমাণ করার জন্যে আদালতে যাইনি তো।

    উকিল-১। তবে কিসের জন্যে গিয়েছিলেন শুনি।

    ওয়ালেস। কোন্‌ বার? একাধিক বার তো যেতে হয়েছিল।

    উকিল-১। প্রথম বার যখন গেলেন, কেন গেলেন?

    ওয়ালেস। বাজিতে জিতে ব্যাঙ্কে গচ্ছিত টাকা আমি রেফারীর কাছ থেকে পেয়ে যাবার পর থেকেই হ্যাম্পডেন
    অকথ্য-কুকথ্য নানা কথা বলতে শুরু করে। প্রথমে আমি গুরুত্ব দিইনি। এরপর ও চিঠি লিখে লিখে আমি যে সব প্রতিষ্ঠানে যুক্ত, সে সব জায়গায় কুৎসা করতে শুরু করে। তখন বাধ্য হয়েই আমি ওর বিরুদ্ধে আদালতে মানহানির নালিশ জানাই...

    উকিল-১। আপনি তো যা জানা গেলো একজন কোয়্যাক সায়েন্টিস্ট, আপনি কি জানেন হ্যাম্পডেনের পড়াশোনা কতদূর?

    ওয়ালেস। আছে নাকি?

    উকিল-১। অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট। একজন অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট কি কোনও কোয়্যাক সায়েন্টিস্টের মানহানি করতে পারেন?

    ওয়ালেস। আদালতকে জিজ্ঞেস করুন। মহামান্য আদালত ওকে বিজ্ঞাপন দিয়ে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন।

    উকিল-১। তা-ই যদি হয়, তাহলে আপনি আবার ওর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করলেন কেন?

    ওয়ালেস। আমি তো কোনও ফৌজদারী মামলা করিনি।

    ঊকিল-১। করেননি? আপনি সজ্ঞানে এ কথা বলছেন?

    ওয়ালেস। সজ্ঞানেই।

    উকিল-১। (বিচারকদের উদ্দেশে) মিলর্ড, মহামান্য এই আদালতের অবগতি সত্ত্বেও, আদালতেরই সামনে, অভিযুক্ত অ্যালফ্রেড রাসেল ওয়ালেস সজ্ঞানে সম্পূর্ণ মিথ্যা বিবৃতি দিচ্ছে। আমি আদালতের কাছে একে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানাচ্ছি।

    বিচারক-৩। মিঃ ওয়ালেস, মিঃ হ্যাম্পডেনের বিরুদ্ধে কোন ফৌজদারী মোকদ্দমার কথা আপনার জানা আছে?

    ওয়ালেস। আছে, মিলর্ড।

    বিচারক-৩। সে মামলাটির বাদী কে ছিল?

    ওয়ালেস। হার ম্যাজেস্টিজ গাভ্‌মেন্ট, মিলর্ড।

    বিচারক-৩। আর আপনি?

    ওয়ালেস। আমি একজন সাক্ষী ছিলাম।

    বিচারক-৩। আপনাকে কেন সাক্ষী করা হয়েছিল?

    ওয়ালেস। আমি পুলিশের কাছে ওয়ালেসের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ করেছিলাম, পুলিশ মামলাটি করে।

    বিচারক-৩। (হেসে, উকিল-১কে) আপনি পুনরারম্ভ করতে পারেন, বিদগ্ধ কাউনসেল।

    উকিল-১। ঠিক আছে, কিন্তু কেন আপনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেন?

    ওয়ালেস। হ্যাম্পডেন আমার স্ত্রীকে একটি চিঠি দেয়, এই চিঠিতে সে আমার প্রাণনাশের হুমকি দেয়।

    উকিল-১। আপনি তো সাঙ্ঘাতিক অভিযোগ করছেন, আপনি প্রমাণ করতে পারবেন?

    ওয়ালেস। চিঠিটির একটি কপি আমার কাছে আছে, আদালত অনুমতি দিলে পড়ে শোনাতে পারি।

    বিচারক-২। কপি তো জমা পড়েছে নিশ্চয়ই। (বিচারক-৩ এর সঙ্গে ফিস ফিস করে আলোচনা করে) আচ্ছা, ঠিক আছে, পড়ুন।

    ওয়ালেস। (পকেট থেকে বার করে পড়তে শুরু করে) প্রিয় মহাশয়া, শয়তানের মৃতদেহ বহন করার জন্যে যে ঠেলাগাড়ির ব্যবস্থা বাইবেল করেছে, নরকের কীট আপনার স্বামী যদি কোনদিন শরীরের প্রতিটি হাড় চূর-চূর হয়ে যাওয়া, মাথার ঘিলু চটকানো অবস্থায়, সেই গাড়িতে বাড়ি ফেরে, সেদিন আমার হয়ে তাকে বলে দেবেন, মিথ্যেবাদী, ঠক, জোচ্চোর, চোরের অধম, ওয়ালেস নামের কোন ব্যক্তি বিছানায় শুয়ে শুয়ে মারা যাবে না। এরকম একটা দাগী আসামির সঙ্গে আপনাকে ঘর করতে হচ্ছে ভেবে আপনার জন্যে আমার সত্যি সত্যিই দুঃখ হয়। ওকে বলে দেবেন আমার হাত থেকে ওর নিস্তার নেই।

    বিচারক-৩। ঠিক আছে, ঠিক আছে। (উকিল-১কে) লার্ণেড কাউন্সেল, আমি মিঃ ওয়ালেসকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।

    উকিল-১। (খানিকটা আশ্বস্ত মনে হয়) ধন্যবাদ, মিলর্ড। (বসে পড়ে)

    বিচারক-৩। (ওয়ালেসকে) মিঃ ওয়ালেস, এই মামলায় এতক্ষণ পর্যন্ত অনেক অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার আলোচনা করে আদালতের সময় অযথা নষ্ট করা হয়েছে। আমি বেশি সময় নেব না। আপনি আমাকে বলুন, একজন বিজ্ঞানী হিসেবে আপনি কি বিশ্বাস করতেন না যে, পৃথিবীপৃষ্ঠের বক্রতা প্রমাণ করাটা কোন কঠিন কাজ নয়?

    ওয়ালেস। বিশ্বাস করতাম।

    বিচারক-৩। এবং এটাও কি বিশ্বাস করতেন না যে আপনার পক্ষে, বিশেষ করে আপনার পক্ষে, কাজটা খুবই সহজ?

    ওয়ালেস। বিশেষ করে আমার পক্ষে কিনা বলতে পারবো না, তবে কাজটা খুবই সহজ, এটা ঠিক।

    বিচারক-৩। আচ্ছা, এবার বলুন বাজি কাকে বলে।

    ওয়ালেস। এর উত্তর তো ভেবে-চিন্তে দেওয়া উচিত। তবুও, প্রথম চিন্তাতেই যেটা মাথায় আসে, সেটা বলব কি?

    বিচারক-৩। আপনাকে বলতে হবেনা, আমিই বলছি। আপনি হয়তো বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অনর্থক নতুন একটা তর্ক ডেকে আনবেন। বৈজ্ঞানিকদের তো কাজই এই, যেটা স্বতঃসিদ্ধ, যেটা সবাই জানে, যুগ যুগ ধরে যেটা হয়ে আসছে, সেটা নিয়েও অযথা একটা তর্ক তোলা। বাজি হচ্ছে এমন একটা তর্ক, যার ফলাফল অনিশ্চিত, এটাও হতে পারে, ওটাও হতে পারে। যারা লড়বে, শেষ পর্যন্ত কী হবে না জেনেই তারা লড়বে; যেমন ধরুন ঘোড়দৌড়ের বাজি, লটারির বাজি, বুঝলেন তো? ফলে, আমরা বলতেই পারি, নিশ্চিত জিতবেন জেনেও হ্যাম্পডেনের সঙ্গে আপনার বাজিটা লড়া অনৈতিক।

    ওয়ালেস। কিন্তু একটা আইনমাফিক চুক্তিপত্র তো তৈরি হয়েছিল, বাজিটা লড়াও হয়েছিল সেই চুক্তিপত্রের ভিত্তিতেই।

    বিচারক-১। ওঃ হো, আইন ছাড়ুন, আইন ছাড়ুন, আইনও খানিকটা বিজ্ঞানের মতই, অনর্থক তর্ক তৈরি করে। সেই জন্যেই, যেখানে নৈতিকতার সঙ্গে তর্কের সঙ্ঘাত, নিষ্পত্তি করার জন্যে সেখানে ডাক পড়ে বিচক্ষণ বিচারকের (অন্য বিচারকদের দিকে হেসে তাকায়, তারা হেসে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে) ! আচ্ছা, জন স্টূয়ার্ট মিলের সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা, মিঃ ওয়ালেস?

    ওয়ালেস। জন স্টূয়ার্ট মিল? তিনি তো এ ব্যাপারে বিন্দু-বিসর্গও জানেন না।

    বিচারক-২। (স্বগতোক্তি, কিন্তু শোনা যায়) শুধু এ ব্যাপারে কেন, কোন ব্যাপারেই বিন্দু-বিসর্গ জানেন না। (ওয়ালেসকে) না না, মিল সাহেবের জ্ঞানের পরিমাপ করতে বসিনি আমরা, আমরা জিজ্ঞাসা করছি ভদ্রলোকের সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা?

    ওয়ালেস। ওঁকে খুবই শ্রদ্ধা করি।

    বিচারক-২। হ্যাঁ, সেটাই ভেবেছিলাম। আচ্ছা, ওঁর কাগজে লেখেন-টেখেন নাকি?

    ওয়ালেস। কখনো কখনো।

    বিচারক-২। কখনো কখনো; আচ্ছা, আপনি কী ল্যাণ্ড রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশনের ব্যাপারে কিছু জানেন? নাম শুনেছেন?

    ওয়ালেস। নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছি, আমি ওদের মেম্বারও।

    বিচারক-১। কমিটি মেম্বার, তাই না?

    ওয়ালেস। আজ্ঞে হ্যাঁ।

    বিচারক-১। এটাই স্বাভাবিক। তার মানে আপনি কি ল্যাণ্ড টেনিয়োর রিফর্ম মুভমেন্টের একজন সক্রিয় সমর্থক?

    ওয়ালেস। সক্রিয় বলতে কী বোঝায়, আমি তো ঠিক ঠিক জানিনা, তবে সমর্থক নিশ্চয়ই।

    বিচারক-১। সক্রিয় বলতে কী বোঝায় আপনি ঠিক ঠিক জানেন না, কিন্তু এটা তো জানেন, ল্যাণ্ড টেনিয়োর রিফর্ম করার অর্থ হল আমাদের এই মহান দেশ জুড়ে যত চাষের জমি আছে, সেই জমিগুলো পুরুষানুক্রমে গরীব চাষীদের মঙ্গলের জন্যে নিজেরা সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে তাদের দিয়ে চাষবাস করিয়ে যাঁরা তাদের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে সেই জমি কেড়ে নিয়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাটা যারা ভেঙে ফেলতে চায়, তাদের মদত দেওয়া? সে চেঁচামেচি-গণ্ডগোল করেই হোক্‌ আর কাগজপত্রে লেখালিখি করেই হোক্‌।

    ওয়ালেস। না না, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়।

    বিচারক-২। চুপ করুন, মিঃ ওয়ালেস, চুপ করুন। আপনার সম্বন্ধে এটাই আমরা ভেবেছিলাম। আসলে আপনার নৈতিক চরিত্রের সঙ্গে ল্যাণ্ড টেনিয়োর রিফর্ম মুভমেন্ট বেশ সঙ্গতিপূর্ণ। বেশ বোঝা যায় পরের ধনের প্রতি আপনার একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে, সেটা হ্যাম্পডেনের পাঁচশো পাউণ্ডই হোক্‌, আর যুগ যুগ ধরে যারা এই মহান গ্রেট বৃটেনের কৃষিজমির দায়িত্ব নিয়ে, গরীব-গুর্বোদের চাষ বাস করে ভদ্রভাবে জীবন যাপনের একটা ব্যবস্থা করেছে, তাদের কাছ থেকে রিফর্মের নামে জমিগুলো ছিনিয়ে নেবার আন্দোলনই হোক্‌...

    ওয়ালেস। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।

    বিচারক-৩। পারবেন, পারবেন। কালই পারবেন। (অন্য বিচারকদের দিকে তাকিয়ে) আমার মনে হয় আদালতের আজকের কাজের আমরা এখানেই ইতি টানবো (অন্য বিচারকদের সম্মতির ঘাড় নাড়া)। আগামী কাল সকাল দশটায় এই আদালত আবার বসবে, লার্ণেড কাউনসেলদের আমরা ঘন্টাখানেক সময় দেব যদি তাঁদের কোন বক্তব্য থাকে, আশা করি প্রথমার্ধেই আমরা আমাদের রায় জানিয়ে দিতে পারব।


    কিছুক্ষণের জন্যে মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যায়; যখন আলো জ্বলে, দেখা যায় আদালত
    ফাঁকা, শুধু দর্শক-আসনের প্রথম সারিতে স্যামূয়েল স্টীভেন্স এবং ওয়ালেস বসে।


    স্টীভেন্স। কী বুঝছেন?

    ওয়ালেস। এ আর বোঝার কী আছে? এ তো কুইনস বেঞ্চের বিচারকরা আগের থেকেই ঠিক করে বসে আছে তারা কী করবে! বিচারের নামে এ কী প্রহসন! এখন তো শুধু রায়টা উচ্চারণ করার অপেক্ষা!

    স্টীভেন্স। হ্যাঁ, সেটা জানতাম। আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন আপনাকে বারণ করতাম ওয়ালেস। আপনি এসব বাজে ব্যাপারে গেলেন কেন?

    ওয়ালেস । সত্যি কথা বলব, আসলে পাঁচশো পাউণ্ড, পাঁচশো পাউণ্ডের হাতছানি ছিল। টাকার আমার বড় দরকার
    মিঃ স্টীভেন্স।

    স্টীভেন্স। কিন্তু মামলা-মোকদ্দমা করে আপনারই তো ক্ষতি হলো।

    ওয়ালেস। শুধু তা-ই নয়, বদনাম হয়ে গেল। বৃটিশ অ্যাসোসিয়েশনের লোকরা আমারই দোষ দেয়, যেন আমিই ঠকিয়েছি লোকটাকে!

    স্টীভেন্স। বৃটিশ অ্যাসোসিয়েশনের লোকরা? হুঁ! সে তো হবেই! আপনাকে একটা কথা বলব ওয়ালেস? আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি কার দলে। আপনার বিবর্তনের তত্ত্ব চার্চকে চটিয়েছে, ডারউইনরা বন্ধু হয়েছেন। আপনি স্পিরিচুয়ালিস্ট হলেন; ডারউইন চটল আপনার উপর, আর যত না ডারউইন চটল, তার দলবল চটল আরো বেশি। জন স্টুয়ার্ট মিলের সঙ্গে ঘোরাফেরা করেছেন, তাঁর কাগজে লিখেছেন, ল্যাণ্ড টেনিয়োর রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশন করেছেন, কতজনকে চটিয়েছেন জানেন? চার্চ চটেছে, কনজার্ভেটিভ পলিটিশিয়ানরা চটেছে, বৃটিশ সায়েন্টিস্টরা তো সব ল্যাণ্ডেড জেন্ট্রী, জুডিশিয়ারীর লোকরাও তাই, সবাই চটেছে আপনার উপর। যা সত্যি মনে করি, তা-ই বলে যাব অকপটে, এ কথা বললে তো চলবে না; জীবনে সফল হতে গেলে একটা দলে থাকতে হবে ওয়ালেস, দলের সত্যিটাই আপনার সত্যি!

    ওয়ালেস। জানি না মিঃ স্টীভেন্স, আমার কেমন যেন সব গুলিয়ে যায়!

    স্টীভেন্স। আচ্ছা শুনুন, আপনার জন্যে একটা জিনিষ এনেছি, কদিন ধরেই আপনার কেসটা ফলো করছি আমি, কাগজে যখন দেখলাম আজ হিয়ারিং, তখন মনে হলো কোর্টেই যাই, দর্শক-আসনে থাকলে হয়তো আপনাকে একটু মর‍্যাল সাপোর্ট দেওয়াও হবে, আর আপনার জিনিষটা আপনাকে দিয়ে দেওয়াও যাবে। (পকেট থেকে একটা খাম বার করে) এটা ধরুন।

    ওয়ালেস। কী ব্যাপার? কী এটা?

    স্টীভেন্স। ক্যাশ। আপনি যে স্পেসিমেনগুলো এনেছিলেন, সেগুলো সব তো কবেই বিক্রী হয়ে গেছে। আপনি যখন ফীল্ডে থাকতেন, আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আমি সরাসরি জমা দিয়ে দিতাম, আমার তো পাওয়ার অব অ্যাটর্ণীও ছিলো। আপনি ফেরার পর থেকে আর আপনার অ্যাকাউন্টে যাইনি, ক্যাশটা রেখে দিয়েছিলাম।

    ওয়ালেস। (খামটা নিয়ে পকেটে রাখে) থ্যাঙ্ক য়্যু মিঃ স্টীভেন্স। (হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দু হাত দিয়ে স্টীভেন্সের হাত চেপে ধরে) মিঃ স্টীভেন্স, আপনি আমার জন্যে এত ভাবেন, চিরকাল গাইড করে এসেছেন আমাকে, আমার আর একটা উপকার আপনি করবেন?

    স্টীভেন্স। কী ব্যাপার?

    ওয়ালেস। আমার কতকগুলো শেয়ার বেচে দেবার ব্যবস্থা করে দেবেন? আসলে এ সব তো আমি কিছুই বুঝিনা।

    স্টীভেন্স। কী শেয়ার?

    ওয়ালেস। লণ্ডন মিডল্যাণ্ড অ্যাণ্ড স্কটিশ রেলওয়ের কতকগুলো আছে, লিভারপুল অ্যাণ্ড ম্যাঞ্চেস্টার রেলওয়ের কিছু আছে, আর কিছু আছে একটা কোল-মাইনিং কম্পানীর।

    স্টীভেন্স। ও গড, এ সব কিনেছেন কবে? এর তো প্রায় কোন ভ্যালুই নেই এখন!

    ওয়ালেস। ভ্যালু নে-ই! ভ্যালু নে-ই! সিঙ্গাপুরে কিনেছিলাম, বোর্ণিও থেকে ফেরার সময়, একজন ব্রোকারের পরামর্শে।

    স্টীভেন্স। সে কী! সে তো সেই আর্লি সিক্সটিজ-এ! তখনই তো এগুলো ওয়র্থলেস পেপার! আমাকে বলেননি কেন? আমিই তো আপনাকে বরাবর ইনিভেস্টমেন্টে গাইড করে এসেছি।

    ওয়ালেস। মিঃ স্টীভেন্স, আপনাকে বলিনি কেন! সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যাকে ধ্বংস করবেন বলে ঠিক করেন, প্রথমেই তাকে বুদ্ধিভ্রংশ করেন; আমি বোধ হয় বুদ্ধিভ্রংশই হয়েছিলাম তখন। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় ঈশ্বর তাঁর নিজের পরিকল্পনায় আমার জন্যে একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে রেখেছিলেন। আমি সেটা ছাড়িয়ে জাতে উঠতে চেয়েছিলাম, জাতে উঠতে চেয়েছিলাম! ঈশ্বরের সেটা পছন্দ হবে কেন! বুদ্ধিভ্রংশ ওয়ালেসের ধ্বংস এখন অনিবার্য মিঃ স্টীভেন্স! (দৃশ্যান্তর)



    চলবে…
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • নাটক | ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ঘ - শর্মিষ্ঠা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন