এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  নাটক  শনিবারবেলা

  • ওয়ালেস! ওয়ালেস!

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    নাটক | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৩৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • অঙ্ক ১

    এই মৌলিক নাটকটি ইতিহাস-আশ্রিত। উনিশ শতকে আবিষ্কৃত ডারউইনের বিবর্তনবাদ সভ্যতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলির অন্যতম। এই তত্ত্বে ভ্রাম্যমান সংগ্রহকারী অ্যালফ্রেড ওয়ালেসের অবদান ডারউইনসহ তখনকার বিজ্ঞানী সমাজ মেনে নিতে এক রকমের বাধ্য হয়েছিল। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ওয়ালেসের মৃত্যুর পর থেকে পশ্চিমী দুনিয়ার প্রভাবশালী বিজ্ঞানীরা অজ্ঞাত (যদিও অনুমেয়) কোন কারণে ওয়ালেসের বিষয়ে আলোচনা অনেকটাই কমিয়ে আনেন। উনিশ শতকীয় সামাজিক পরিবেশে ওয়ালেসের অবস্থান এই নাটকের বিষয়। যদিও নাটকটির কাহিনী-বিন্যাসের প্রয়োজনে দু-একটি পরিস্থিতিতে কল্পনার সাহায্য নেওয়া হয়েছে, তবুও, ঐতিহাসিক সত্যটি নিখাদ। প্রতিটি চরিত্রই ঐতিহাসিক, একটি নাম ছাড়া। বোর্ণিওর সারাওয়কে ধলারাজা জেম্‌স্‌ ব্রূক ওয়ালেসের ব্যক্তিগত কাজের জন্যে ঠাকুর-চাকর জাতীয় (মধ্যবিত্তের 'কম্বাইণ্ড হ্যাণ্ড') একজন লোকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু এই ব্যক্তিটির নামটা খুঁজে পাইনি। মোরিয়া—এই নামটা কাল্পনিক।

    ১ম অঙ্ক
    দু-ভাগে বিভক্ত মঞ্চ। আলোকিত অংশে চৌকিতে কম্বল গায়ে অসুস্থ ওয়ালেস শুয়ে আছে। সাদামাটা ঘরে
    একটা ছোট বইয়ের শেল্‌ফে গোটাকয়েক বই। খোলা অবস্থায় একটা ফোল্ডিং টেবিল, দু-একটা ওষুধের শিশি-বোতল,
    একটা বাটিতে কিছু শাকপাতা। এ ছাড়া লেখার সরঞ্জাম, খোলা একটা খাতা, তাতে কিছু লেখা। চেয়ার নেই, টেবিলের
    সামনে একটা বসবার টুল। ঘরে আরেকজন, ওয়ালেসের সঙ্গী বলে মনে হয়, কিন্তু বোধ হয় চাকর বা রাঁধুনী জাতীয়।
    লোকটির নাম মোরিয়া।



    মোরিয়া। এই পাতাগুলো চিবিয়ে না খেলে আর আমি লিখছি না।

    ওয়ালেস। বড় তেতো রে, তার চেয়ে ঐ বোতলের ওষুধ আমাকে একটু দে, ওতেই কমে যাবে।

    মোরিয়া। সাহেব, ধলারাজাকে চেনো তো, তোমারই দেশের লোক, কিন্তু সে রাজা, অনেক বড়লোক। জ্বর-জারি হলে
    সে-ও ঐ পাতাই চিবিয়ে চিবিয়ে খায়, আমি নিজে দেখেছি। বুঝলে? যা বলছি শোন, বাইরে রোদ উঠেছে, আর তুমি এখানে শুয়ে আছো। এর পর যখন সেরে উঠবে, আবার বৃষ্টি এলে করবেটা কী? তোমার কলেকশনের কী হবে? পেট চলবে?

    ওয়ালেস। হুঁ, সেরে তো উঠতেই হবে। আচ্ছা দে, আর ওই জারে মধু আছে, একটা বাটিতে রেডি করে রাখ খানিকটা।

    মোরিয়া। ঠিক আছে, ঠিক আছে। এই তো লক্ষ্মী ছেলের মতো (এগিয়ে দেয়) । খেয়ে নাও। (ওয়ালেস খেয়ে নেয়। মুখ একটু বিকৃত হয়। তারপর মধুর বাটি নিয়ে চেটে চেটে মধু খায়)

    ওয়ালেস। এবার লেখ্‌।

    মোরিয়া। লিখবো তো সাহেব, কিন্তু লাভটা কী হবে? এই যে লেখাটা পাঠালে ঐ সাহেবকে, কী যেন নাম, ডারউইন, হ্যাঁ, কী লাভ হলো? তুমি তো বল তোমরা সবাই সাদা লোক, তোমাদের একই জাত। ধলারাজা কিন্তু সে রকমটা ভাবে না, সে তোমার চেয়ে অনেক বেশি জানে, আর জানে বলেই বলেছিল একা নিজের নামে না পাঠিয়ে ওর নামটাও জুড়ে দিতে।

    ওয়ালেস। (উত্তেজিত হয়ে উঠে বসে) তাতে লাভটা কী হত?

    মোরিয়া। লাভটা! তোমার নামের সঙ্গে ধলারাজা জেম্‌স্‌ ব্রূকের নামটাও থাকলে ওটা ছাপা হত। জাতের জোরেই উৎরে যেত লেখাটা।

    ওয়ালেস। এই, চুপ কর তো, জাত জাত করবি না। তোদের এই জংলী এশিয়ানদের মতো জাতপাতের ধার ধারিনা আমরা। বুঝলি, আমাদের ডেমোক্রেসী আছে। জানিস, আমাদের পার্লামেন্টে ভোটে জিতে ইলেক্টেড হতে পারে যে কেউ?

    মোরিয়া। পারে নাকি? মেয়েরাও?

    ওয়ালেস। মেয়েদের কথা বাদ দে। আমরা পুরুষদের কথা বলছি।

    মোরিয়া। ও, পুরুষদের। আর রাজবাড়ীর মেয়ে হলে? তখন তোমাদের নিয়ম-টিয়ম বদলে যায়। রাজার জাত কিনা!

    ওয়ালেস। এই, আবার খামোকা জাত জাত করবি না।

    মোরিয়া। খামোকা কি আর করি সাহেব, অনেক দুঃখে করি। ঐ যে তোমার মহাজন, কী যেন খটমট নামটা...

    ওয়ালেস। স্যামুয়েল স্টীভেন্সের কথা বলছিস? মহাজন-টহাজন আবার কী?

    মোরিয়া। তা তোমাকে আগাম টাকাপয়সা দেয়, তুমি যা পাঠাও, সেসব বেচে দেবার ব্যবস্থা করে, মহাজনই তো। তবে হ্যাঁ, মানুষটা বোধ হয় ভালোই। তোমার আগের লেখাটা ছাপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লাভ কী হলো তাতে বল? কেউ পড়ল?

    ওয়ালেস। কেন, পড়েছিল তো। স্যর চার্লস লায়েল পড়েছিল, ডারউইন সাহেব পড়েছিল।

    মোরিয়া। পড়েছিল। পড়ে চেপেও গিয়েছিল, সেটা বল। ওদের সব সভা-সমিতি আছে, আলোচনা করেছিল কোথাও?

    ওয়ালেস। হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে, ঠিক আছে। এ বারে দেখিস, আলোচনা করবেই, সত্যি কথাকে কি আর চেপে রাখা যায়?

    মোরিয়া। চেপে যদি না রাখতে পারে নেহাৎ, তা হলে দেখো, ঠিক একটা উল্টো কথা খুঁজে বের করবে, করবেই!

    ওয়ালেস। হোঃ, উল্টো কথা! উপায় আছে, বিজ্ঞানে উল্টো কথা বলার উপায় আছে! তুই-ই বল্‌ না, এই যে জঙ্গলে জঙ্গলে
    ঘুরে বেড়াস, কত হরিণ দেখেছিস বলতে পারিস?

    মোরিয়া। সে কথা কি আর বলা যায় সাহেব? শ'য়ে শ'য়ে, হাজারে হাজারে দেখেছি তো।

    ওয়ালেস। এ সব হরিণ তো মাদি-মদ্দা মিলিয়েই হবে নিশ্চয়ই, তাই না? ধর্‌, আদ্দেক মাদি, আদ্দেক মদ্দা?

    মোরিয়া। হুঁ, সেরকমই তো হওয়ার কথা।

    ওয়ালেস। তো, তাদের যদি বছরে একটা করেও বাচ্চা হয়, পাঁচ বছরে জঙ্গলে কত হরিণ হবে বল্‌তো।

    মোরিয়া। ও বাবা, সে তো অনেক হওয়ার কথা।

    ওয়ালেস। অনেক, কতো অনেক?

    মোরিয়া। সে কি আর সোজা হিসেব সাহেব? তুমিই বল না কত।

    ওয়ালেস। সোজা তো নয়ই, ধর দু বছর বয়েস থেকে একটা মাদি হরিণ বাচ্চা দিতে শুরু করে। তার মানে, গত বছর যেগুলো জন্মাল, তাদের মাদিগুলো আঠেরো-কুড়ি বছর ধরে, বছর বছর বাচ্চা দিয়ে যাবে, আর দু বছর অন্তর অন্তর সেই বাচ্চাগুলোর আদ্দেকও আবার একই ভাবেই বাচ্চা দেবে, আর এভাবেই চলবে। (উত্তেজনায় হঠাৎ কাশতে শুরু করে ওয়ালেস)

    মোরিয়া। উঃ সাহেব, একটু আস্তে আস্তে কথা বল। দাঁড়াও, আমি জল গরম করে রেখেছি, তার সঙ্গে একটু মধু গুলে দিই, আস্তে আস্তে খাও, কমে যাবে। (মধু গোলা গরম জল তৈরি করে দেয়)

    ওয়ালেস। (ধীরে ধীরে খেতে খেতে) তাহলে পাঁচ-দশ বছরে জঙ্গলে কত হরিণ হবে ভাবতে পারিস?

    মোরিয়া। সাহেব, তোমার হিসেবে গণ্ডগোল হয়ে গেলো। এর মধ্যে মরবে যেগুলো, সেই গুলোকে হিসেবে নিয়েছো কি?

    ওয়ালেস। বাঃ বাঃ মোরিয়া, এই জন্যেই তোকে এত ভালবাসি। যেগুলো মরবে, গূড। কারা মরবে?

    মোরিয়া। কারা আবার, বুড়োগুলো, বুড়োগুলো মরবে।

    ওয়ালেস। শুধু বুড়োগুলো?

    মোরিয়া। দুবলাগুলো, আর বাঘে-কুমিরে খাবে যেগুলোকে, সেই গুলো।

    ওয়ালেস। এক্সেলেন্ট মোরিয়া, এক্সেলেন্ট। বাঘে-কুমিরে খায় কাদের? সেগুলোও তো দুবলাই; ধর্‌, জোরে দৌড়োতে পারে না, ভালো সাঁতার কাটতে পারে না; সেই গুলোই, তাই না?

    মোরিয়া। হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছো, সেই গুলোই।

    ওয়ালেস। তার মানে বেঁচে যেগুলো থাকে, সেই গুলোই মোটামুটি হরিণদের মধ্যে সেরা: স্বাস্থ্য ভালো, কায়দাকানুন জানে, আর মদ্দাগুলোর মধ্যে যাদের একটু দেখতে শুনতে ভালো।

    মোরিয়া। কী যে বলো সাহেব, দেখতে তো সবই এক।

    ওয়ালেস। হ্যাঁ, তুই তো তা বলবিই, তুই তো আর মাদি হরিণ নোস। মাদি হরিণ আসবে কেন মদ্দার কাছে যদি পছন্দ না হয়? আচ্ছা, এখানকার হরিণগুলোকে লক্ষ্য করেছিস ভালো করে? কেমন মোটা মোটা, বড়-সড় দেখেছিস?

    মোরিয়া। হ্যাঁ, আর কী বড় বড় শিঙ, কিন্তু কী লিকলিকে আর লম্বা লম্বা ঠ্যাং!

    ওয়ালেস। ঐ ঠ্যাঙের জোরেই তো মোটা শরীর নিয়েও বাঘের পেটে যায় না। কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছরের পুরোনো মরা হরিণের ছাপ থেকে দেখা গেছে, অতদিন আগে ওদের পা গুলো ও রকম ছিলো না। তা হলে এখন কীভাবে হল?

    মোরিয়া। কীভাবে, সাহেব?

    ওয়ালেস। আচ্ছা, তোকে আর আমাকে কি পুরোপুরি এক রকমের দেখতে?

    মোরিয়া। তা কেন হবে? গায়ের রং-ই তো আলাদা।

    ওয়ালেস। আচ্ছা, আমাকে আর ধলারাজাকে? গায়ের রং তো একই, তবুও?

    মোরিয়া। নাঃ, ধলারাজা তো কত মোটা, আর তোমার চেয়ে লম্বাও কতটা।

    ওয়ালেস। তা হলে আমি যদি বলি, সব মানুষের চেহারাতেই একটু একটু তফাৎ আছে, মানবি সে কথা?

    মোরিয়া। হ্যাঁ, সে তো বটেই।

    ওয়ালেস। আর হরিণের?

    মোরিয়া। মানতে হবে।

    ওয়ালেস। আচ্ছা, লক্ষ লক্ষ বছর আগেও তো হরিণ মারা পড়ত বাঘ-টাঘদের হাতে?

    মোরিয়া। হ্যাঁ, তা পড়ত নিশ্চয়ই।

    ওয়ালেস। যারা পালাতে পারত, তারা মরত না, তাই না? তার মানে বেঁচে যারা থাকল, তারা সে দফায় বাঘ-টাঘদের হারিয়ে দিল, তাই তো? কীভাবে? জোরে দৌড়োয়, হয়তো বুদ্ধি-শুদ্ধিও একটু বেশি, তারই জোরে, তাই না? আর, বেশি দৌড়োবার ক্ষমতা যাদের ছিল, তাদের পাগুলোও হয়তো, অন্যদের তুলনায় একটু লিকলিকে ছিল। কী রে, ঠিক?

    মোরিয়া। ঠিকই তো শুনতে লাগছে সাহেব।

    ওয়ালেস। তাহলে ভেবে দেখ্‌ মোরিয়া, ঐ জিতে-যাওয়া হরিণগুলোর যারা বাচ্চা, তাদের মধ্যে আবার যারা হারিয়ে দিলো তাদের সময়কার বাঘদের, তাদেরও হয়তো ক্ষমতা আর একটু বেশি; পা গুলোও হয়তো, সামান্য হলেও আরও একটু লম্বা; মানে, লম্বা পায়ের হরিণের বাচ্চা তো। এইভাবে জন্মের পর জন্ম বাঁচার লড়াইয়ে জিততে জিততে, এখনকার যে হরিণদের তুই-আমি দেখছি, মোটাসোটা হলেও, তাদের পা গুলো লম্বা আর লিকলিকে হয়ে আজও তাদের জিতিয়ে দিচ্ছে।

    মোরিয়া। আর এবারে যদি তারা হেরে যায়?

    ওয়ালেস। কেউ কেউ তো যাবেই রে, বাঘগুলোকেও তো বাঁচতে হবে। শ্যাওলা থেকে মানুষ, আজ পর্যন্ত যারাই বেঁচে আছে, বাঁচার লড়াইয়ে জিতে জিতেই তো বেঁচে আছে তারা। অস্বীকার করতে পারিস? কেউ পারে? এটাই তো আমি লিখেছি। যোগ্যতমের উদ্বর্তন, সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট! হুঁঃ, উল্টে দেবে! উল্টে দেওয়া যায়!

    মোরিয়া। এ সব তো তোমার কথা সাহেব, কিন্তু ওরা তো তোমাকে চিন্তা করতেই বারণ করে। তোমার হেঁইও হেঁইও সব বিজ্ঞানীরা আগের বারের লেখাটা পড়ে কী বলেছিল স্যামূয়েল সাহেবকে? ওয়ালেসকে বলে দিও চিন্তা করে সময় নষ্ট না করে যেন কালেকশনে মন দেয়, মনে আছে তোমার? একটা কথা বলব সাহেব? তোমার লেখা-টেখাগুলো না পড়েই যারা তোমাকে চিন্তা করতে বারণ করে, বোধ হয় বিজ্ঞানের লড়াইয়ে তোমার কাছে হেরে যাওয়ার ভয়েই তারা করে এমনটা।

    ওয়ালেস। মানে?

    মোরিয়া। লেখাটা কবে পাঠিয়েছিলে ডারউইন সাহেবকে, মনে আছে তোমার?

    ওয়ালেস। ফেব্রুয়ারীতে, ফেব্রুয়ারী মাসে পাঠিয়েছিলাম।

    মোরিয়া। আর, এটা কী মাস?

    ওয়ালেস। জুন।

    মোরিয়া। কত তারিখ ?


    দেয়ালে একটা ক্যালেণ্ডার টাঙানো, জুন, ১৮৫৮-র পাতা খোলা। ১ তারিখ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত প্রত্যেকটা
    তারিখে মোটা দাগে লাল কালিতে ঢ্যারা চিহ্ণ দেওয়া, এবং প্রতিটি তারিখের নীচে একটা করে সংখ্যা লেখা; ১৮
    তারিখের নীচে লেখা ১২০, ১৭-র নীচে ১১৯, ১৬-র নীচে ১১৮... এই রকম। ক্যালেণ্ডারের দিকে তাকায় ওয়ালেস।


    ওয়ালেস। ১৯শে জুন, কেন কী হলো?

    মোরিয়া। (ক্যালেণ্ডারের দিকে তাকায় মোরিয়া। হাসে।) কী হলো আমি আর কী বলবো সাহেব! বেচারা! সব জানো, তবু আমার সাথে তক্ক! পাঠানোর পর থেকে দিন গুনছ! রোজ ঢ্যারা মেরে মেরে ক্যালেণ্ডারে লিখে রাখছ কতদিন হল। কী লেখা আছে ওখানে? ১২০ দিন। ১২০ দিন হয়ে গেল সাহেব, তোমার ডারউইন একটা জবাবও দিল না। কী বলবে তুমি!


    মঞ্চ কয়েক মুহূর্তের জন্যে অন্ধকার। আলো জ্বললে পাশের অংশে লীনিয়ন সোসাইটির গভর্ণিং কমিটির সভাকক্ষ।
    সভাকক্ষের মাঝামাঝি বোর্ডে Linnean Society of London/ Estd 1788/ Burlington House, London
    লেখা। লম্বা টেবিলের চারদিক ঘিরে সদস্যদের চেয়ার। এক কোণে একটা ছোট শেল্‌ফ্‌ গোছের, দু-চারটে ফাইল,
    কিছু লেখার সরঞ্জাম। দুজন সদস্য, স্যর চার্লস লায়েল এবং টমাস হাক্সলী আলোচনারত। বাকিরা এখনো আসেননি।



    হাক্সলী । আজকের মীটিঙের অ্যাজেণ্ডা কী?

    চার্লস । বেল যতক্ষণ না আসছে বোঝা যাচ্ছে না, মনে হয় সামনের মাসের মাসিক সভার অ্যাজেণ্ডা আর তারিখটা...।
    আমার ইন ফ্যাক্ট একটা সাজেশন আছে সামনের মাসের মীটিঙের ব্যাপারে। আসা গ্রেকে চেনেন?

    হাক্সলী । আসা... বোস্টনের?

    চার্লস । হ্যাঁ, বোটানীর প্রফেসর। (জোসেফ হূকারের প্রবেশ, ঘড়ি দেখতে দেখতে)

    হূকার । সরি সরি, দেরি হয়ে গেল, গূড মর্নিং,...হ্যাঁ কী যেন শুনছিলাম, বোটানী? বোস্টন? গ্রের কথা হচ্ছিলো বুঝি?

    চার্লস । হুঁ, গ্রের একটা চিঠি পেলাম, সামনের মাসে আসছে। ডারউইনের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছে রিসেন্টলি, সেই কথা লিখেছে। অনেক দিন পর আসছে তো য়্যোরোপে, আচ্ছা লীনিয়নে ওকে একটা সম্বর্ধনা দেওয়া যায় না?

    হূকার । দেওয়া তো উচিত। কী চিঠি পেয়েছে ডারউইনের কাছ থেকে যে স্পেশালী সেই কথা লিখল?

    চার্লস । ন্যাচারাল সিলেকশনের মূল আইডিয়ার ব্যাখ্যা। গ্রেরও ঐ একই কথা, ডারউইন কেন কিছুই পাবলিশ করছে না!

    হূকার । ডারউইনের সেন্টিমেন্টটা কিন্তু আপনাদের বুঝতে হবে। তড়িঘড়ি কিছু করার লোক ও নয়। যতদিন না ওর মনে হয় কোথাও ওর যুক্তিতে কোন ফাঁক নেই, ততদিন পাবলিশ করবে মনে হয় না। আজ থেকে লিখছে?

    চার্লস । হূকার, আপনি ওয়ালেসের রিসেন্ট কোন আর্টিক্‌ল্‌ পড়েছেন?

    হূকার । ওয়ালেস মানে? ওই সেই বোর্ণিওর কলেক্টর? ও-ও লেখে-টেখে নাকি? না না আমার চোখে পড়েনি।

    চার্লস । হাক্সলী?

    হাক্সলী । হ্যাঁ, পড়লাম। অ্যানাল্‌সে তো? উলটে পালটে দেখলাম। আয়্যাম নট ইমপ্রেসড। কিন্তু কেন বলুন তো?

    চার্লস । ভালো করে পড়ুন। আমার মনে হয় ডারউইনের সঙ্গে ওর চিন্তার যথেষ্ট মিল আছে।

    হাক্সলী । ডারউইনের সঙ্গে চিন্তার মিল? হাঃ হাঃ হাঃ! ডারউইন কিছু বুঝেছে নাকি ও? সেই বিদ্যে আছে ওর?

    হূকার । একটা কথা বলব স্যর চার্লস? মানে, বাইরের লোকরা কেউ নেই, আমাদের মধ্যেই আলোচনা হচ্ছে তাই বলছি। ইদানিং মনে হচ্ছে না বৈজ্ঞানিক চিন্তাটা প্রায় জলভাত? সবাই বিজ্ঞানী! দেখুন না, এই যে ওয়ালেসের কথা বলছি আমরা, খোঁজ করলে দেখবেন হয়তো স্কুলের পড়াটাও...! বাউণ্ডুলে মার্কা লোক, আজ অ্যামাজন তো কাল কিনাবাতাঙ্গান করে বেড়ায়, একটা-আধটা রেয়ার পাখি বা পশু ধরে পাচার করতে পারলে দুটো পয়সাও আসে, অতএব সে কমার্শিয়াল কলেক্টর! আর আমরা তো ওদের কাছ থেকেই এটা কিনি ওটা কিনি, সেই সূত্রে আলাপ দুচারজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে! ব্যস, তার পরেই সে-ও বিজ্ঞানী! তত্ত্বের আবিষ্কারক! কিন্তু সত্যিই কি এতই সোজা! ট্রেনিং, এডুকেশন, ব্যাকগ্রাউণ্ড এ সব ছাড়াই হয় নাকি সবকিছু! (Society-র প্রেসিডেন্ট ডঃ টমাস বেল ব্যস্ত হয়ে ঢোকেন)

    বেল । গূড মর্ণিং এভরিবডি, সরি ফর বিয়িং লেট, একটা ক্লাশ নিতে নিতে দেরি হয়ে গেলো; ওয়েল, এভরিবডি হিয়ার?

    চার্লস । এভরিবডি বাট ডারউইন। তবে ডারউইনের তো দেরি হয়, সেই ডাউন থেকে আসবে।

    বেল । আমরা কি অপেক্ষা করব, নাকি শুরু করে দেব? বেনেটের আজ দেরি হবে জানিয়েই দিয়েছে।

    হূকার । আমরা শুরুই করে দিই না, ডারউইন আর বেনেট এলে জয়েন করবে। স্যর চার্লসের একটা প্রোপোজাল আছে।

    বেল । স্যর চার্লসের প্রোপোজাল? বেশ তো বলুন না। দাঁড়ান, তার আগে মিনিট্‌স্‌ বুকটা বের করা যাক। (শেল্‌ফ্‌ থেকে একটা মোটা বাঁধানো খাতা নিয়ে এসে বসেন, সেটাকে খুলে) হুঁ, আজকের তারিখটা... (শেল্‌ফের পাশে দেওয়ালে একটা ক্যালেণ্ডার ঝোলানো, সেটার দিকে তাকিয়ে) ২২শে জুন, ১৮৫৮। (তারিখটা মিনিট্‌স্‌ বুকে লিখতে লিখতে) হ্যাঁ, বলুন স্যর চার্লস।

    চার্লস । প্রফেসর গ্রে আমেরিকা থেকে আসছেন সামনের মাসে, ওঁর কাছ থেকে..... (ডারউইনের প্রবেশ। বিভ্রান্ত অসুস্থ চেহারা। মুখে এবং টাক মাথায় ঘাম)

    ডারউইন । ফরগিভ মী ফর বীয়িং লেট, গূড মর্ণিং টু অল। (সবাই এক সঙ্গে ভয়ার্ত চিন্তিত মুখে উঠে দাঁড়ায়)

    বেল । কী হলো ডারউইন, য়্যু লূক আনওয়েল।

    চার্লস । (চেয়ার থেকে উঠে, ডারউইনের গায়ে হাত রেখে) আপনি একটু বসুন আগে, স্থির হোন, জল খান একটু।


    ততক্ষণে হাক্সলী ভেতরে চলে গেছে, সে এক গ্লাস জল নিয়ে এসে ডারউইনকে দেয়, ডারউইন বসে, জলটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে গ্লাসটা টেবিলে রাখে, পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথা এবং মুখ মুছতে শুরু করে।



    ডারউইন । থ্যাঙ্ক য়্যু হাক্সলী।

    ডারউইন । কিছু হয়নি, কিছু হয়নি আমার। আপনারা মীটিং করছিলেন, চলুক না সেটা।

    বেল । দ্য মীটিং ক্যান ওয়েট ডারউইন। কিন্তু আপনি ভালো নেই, কিছু একটা হয়েছে। খুব কনফিডেনশিয়াল যদি হয়...

    ডারউইন । আপনাদের কাছে আর কনফিডেনশিয়াল! (ব্রীফ কেস খুলে একটা খাম বের করে) স্যর চার্লস, এটা আপনার জন্যে।

    চার্লস । (খামটা ডারউইনের কাছ থেকে নিতে নিতে) কী এটা?

    ডারউইন । কাল বিকেলের ডাকে পেয়েছি। সী মেল, বোর্ণিও থেকে এসেছে।

    হূকার ও হাক্সলী । বোর্ণিও থেকে?

    চার্লস । কে পাঠিয়েছে? ওয়ালেস নাকি? কী ব্যাপার?

    ডারউইন । পড়লেই বুঝবেন। বারবার বলা সত্ত্বেও আপনার কথায় কর্ণপাত করিনি স্যর চার্লস, ফল হাতে হাতে।

    চার্লস । মানে?

    ডারউইন । আপনি কতবার বলেছেন আমার চিন্তাটা সংক্ষেপে আমি যেন পাবলিশ করে রাখি; তখন যদি শুনতাম...!

    হূকার । কেন, কী হল? কী আছে এই খামে?

    ডারউইন । ওয়ালেসের প্রবন্ধ। অনুরোধ, পাবলিশ করার যোগ্য হলে যেন আমি এটা স্যর চার্লস লায়েলকে দিয়ে দিই।

    চার্লস । মানে? আমাকে মুরুব্বি ঠাউরেছে! আমি কী করব এটা নিয়ে?

    ডারউইন । কী করবেন? ছাপিয়ে দেবেন!

    হূকার । ছাপিয়ে দেবেন মানে কী ডারউইন, তোমার কি মনে হচ্ছে এটা ছাপাবার যোগ্য?

    ডারউইন । যোগ্য? অসাধারণ, অসাধারণ লেখা।

    হূকার । অসাধারণ! বল কী!

    ডারউইন । (গলায় বিষাদের ছায়া) সত্যি কথা তো বলতে হবেই। এত দিন, এত বছর ধরে পাতার পর পাতা নানা যুক্তি আর উদাহরণ দিয়ে যা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, ওয়ালেস অতি সংক্ষেপে লিখেছে প্রায় তাই-ই। বড় আঁটোসাটো ওর লেখা! আর আশ্চর্য, যে সব শব্দবন্ধ আমি ব্যবহার করেছি, ঠিক সেগুলোই ও লিখল কী ভাবে! অক্ষরে অক্ষরে মিল হূকার, অক্ষরে অক্ষরে মিল! বাঁচার লড়াই ̶ স্ট্রাগ্‌ল্‌ ফর এগ্‌জিস্টেন্স, যোগ্যতমের উদ্বর্তন ̶ সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট, ভাবা যায়!

    হূকার । কী ভয়ঙ্কর! কী করবে এখন?

    ডারউইন । কিছু না কিছু না! ও তো আমাকে মুক্তি দিয়েছে, মুক্তি! বলেছে, বিজ্ঞানী মহলে জানাবার যোগ্য হলে স্যর চার্লসকে যেন দিয়ে দিই। তাই করব, আর বিজ্ঞানের থেকে রিটায়ার করে যাব। তারপর স্যর চার্লস যা ভালো বোঝেন!

    বেল । একটু মাথা ঠাণ্ডা করুন ডারউইন, তাড়াহুড়ো নয়। আমি তো যতদূর জানি আপনি বহুদিন ধরে আপনার বিবর্তনের ভাবনাটা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। সে তো আপনার দক্ষিণ আমেরিকা অভিযানের সময় থেকেই। কখনো কিছু লেখেননি?

    হাক্সলী । লেখেন-নি? কয়েক ভল্যূম বইয়ের মেটিরিয়াল তো হয়েই গেছে। তারই খানিকটা ছাপার কথা স্যর চার্লস আগেই বলেছেন, উনি গা করেননি। আসলে, ওঁর তত্ত্বের সঙ্গে এত দিনের ধর্মবিশ্বাসের এমন সংঘাত হতে পারে যা সামলাতে না পারলে এই নাইনটিন্‌থ্‌ সেঞ্চুরীতেও ব্রূনো-গ্যালিলিওর হাল হতে পারে। তাই এতদিন সব ফাঁক ভরাট করছিলেন উনি!

    বেল । না না না না, ব্রূনো-গ্যালিলিওর কথা ছেড়ে দিন, সে দিন আর নেই।

    চার্লস । আচ্ছা ডারউইন, এখনই যদি আমরা আপনি যতটা অলরেডি লিখেছেন তার থেকে খানিকটা ছেপে দিই।

    ডারউইন । ও নো, দ্যাটস্‌ আউট অব কোয়শ্চেন। আমাকে সৎ আর ভদ্র মনে না করলে...! এ তো বিশ্বাসঘাতকতা!

    চার্লস । ডারউইন সাহেব, আপনি কি মনে করেন আমি ডিসঅনারেব্‌ল্‌ কিছু করার জন্যে আপনাকে পরামর্শ দেব?

    ডারউইন । ওঃ সরি, আমি সরি স্যর চার্লস, আসলে আমার মাথারই ঠিক নেই। আপনি যখন বলেছিলেন তখনই তো সমস্ত আইডিয়াটা কনসাইজ করে ডজন খানেক পাতার মধ্যেই একটা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট গোছের লিখে ফেলা যেত!

    চার্লস । এখনো কি করা যায় না? ছোট একটা ভল্যুম, হলই বা একটু অপরিচ্ছন্ন... আনএডিটেড... কী বলেন আপনি?

    ডারউইন । না নাঃ, সব চেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্টটাই তো এখনও লিখিনি আমি। বাঁচার লড়াই, মানে স্ট্রাগ্‌ল্‌ ফর এগজিস্টেন্স আর সারভাইভ্যাল অব দ্য ফিটেস্ট, এই দুটোই লিখেছি। কিন্তু ন্যাচারাল সিলেকশন? হয়নি তো লেখা এখনো! অথচ মাত্র কুড়ি পাতার মধ্যে ওয়ালেস তারও একটা আভাস দিয়েছে। এখন আর ছোট ভল্যুম পাবলিশ করে লাভ কী!

    হূকার। (চিন্তিত) হুঁ, কিন্তু আমরা তো জানি এ তোমার কতদিনের আইডিয়া, কতদিনের সাধনা! একজন কমার্শিয়াল কলেক্টরের মাথায় কিছু এসে যাওয়া তো আর নয়! কাজেই ক্রেডিটটা অন্য একজন নিয়ে যাবে এ অ্যালাউ করা যায় না।

    ডারউইন । হুঁঃ, ক্রেডিট! পাণ্ডুলিপিটা এখন আপনার কাছে স্যর চার্লস, যা ভাল বোঝেন, করুন। ভালোই হয়েছে। এই একই বিষয়ে আমি অনেকদিন ধরে কাজ করছি এ তো বিজ্ঞানী মহলে অনেকেই জানেন। কাজেই পাণ্ডুলিপিটা আমার কাছে থাকলে, আমার স্বার্থের সঙ্ঘাত—মানে, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট যাকে বলে—সেটা খুব স্পষ্ট হত। সে ক্ষেত্রে, ছাপার চেষ্টা আমাকে করতেই হত। অথচ প্রবলেমটা এই যে, এটা এখনই ছেপে বেরোলে বিজ্ঞানের একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে।

    বেল । ছাপা হলে বিজ্ঞানের ক্ষতি হয়ে যাবে? বিজ্ঞানের ক্ষতি? কীরকম?

    ডারউইন । দেখুন ডঃ বেল, এরকম র‍্যাডিকাল তত্ত্ব পেশ করার একটা স্বীকৃত পদ্ধতি তো আছে। তা না করে, কুড়ি পাতার একটা ওপর-ওপর স্কেচ... কেউ কি সীরিয়সলি নেবে? ভালো করে পড়ে দেখবে কেউ? আপনার কী মনে হয়?

    স্যর চার্লস। না দেখবে না। আপনার মতো বিজ্ঞানী চেষ্টা করলে ছাপা হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু ওয়ালেসের নামে ছাপা, পাতা কুড়ির স্কেচ চোখেই পড়বে না কারো। পড়বে কে? আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক কিছুই হবে না। সবটাই ধামা চাপা পড়ে যাবে।

    হূকার । আচ্ছা উল্টো দিক থেকে ভাবুন। দু-চারজন পড়ল, একমত হল না। ওয়ালেস নিজের থীসিস ডিফেণ্ড করতে পারবে? ওর আছে সেই ব্যাকগ্রাউণ্ড, সেই রিসোর্সেস? এরকম একটা পৃথিবী-কাঁপানো থিয়োরী হাওয়ায় উড়ে যাবে, বোর্ণিওর জঙ্গলে একজন কমার্শিয়াল কলেক্টরের তাতে কী? না না, বিজ্ঞানের এত বড় একটা ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না।

    ডারউইন । (ম্লান হেসে) দেওয়া যাবে না বলে কী লাভ হূকার, নৈতিকতার স্বার্থে আমার এখন উইথড্র করতেই হবে!

    হাক্সলী । উইথড্র করতে হবে? মানে? বিজ্ঞানের ক্ষতিটাও কি একটা নৈতিকতার প্রশ্ন নয়?

    বেল। আচ্ছা ডারউইন সাহেব, আপনি তো সেই এইটীন থার্টিনাইন-টাইন থেকেই এসব ভাবছেন, কখনো কিছু লেখেননি?

    ডারউইন। লিখেছি তো বটেই, কিন্তু ছাপাই-টাপাইনি তো কিছুই, ডক্যুমেন্টেশন তো নেই।

    স্যর চার্লস। না না, সে কথা নয়। এই যে এত বিজ্ঞানী জানে আপনার কাজটার ব্যাপারে, এত জন—ধরুন কলকাতার ব্লাইদ, বোর্ণিওয় ওয়ালেস, কখনো কাউকে চিঠিপত্রেও আপনার আইডিয়াটা লেখেননি? কোথাও রিট্‌ন্‌ কিছু নেই?

    ডারউইন। ওঃ সেই কথা? না না এই তো, এই লাস্ট অক্টোবরেই তো গ্রেকে লিখলাম।

    চার্লস । গ্রেকে লিখেছেন জানি। গ্রে-ই আমাকে জানিয়েছে। ঐ চিঠিটার একটা কপিও পাঠিয়েছে। দাঁড়ান তো। (ব্রীফ-কেসটা খোলেন স্যর চার্লস, কাগজ-পত্রের মধ্যে চিঠিটা খোঁজেন, পান না) কোথায় গেলো! কোথায় রাখলাম! হ্যান্‌সমে ফেলে এলাম নাকি? ডঃ বেল, আমি একটু আসছি। (তড়িঘড়ি বেরিয়ে যান চার্লস)

    বেল । (খানিকটা স্বগত, যদিও শুনতে পায় সবাই) এইজন্যেই সবাইকে আমি বলি একজন সেক্রেটারী রাখুন। কিন্তু করবেনই বা কী! যে দৈন্যের দশা ইংল্যাণ্ডের বিজ্ঞানীদের!


    একটু পরে ফিতে বাঁধা একটা ফাইল নিয়ে আবার ঢোকেন স্যর চার্লস



    চার্লস। তাড়াতাড়িতে নিতে ভুলেছিলাম, পেয়েছি। (বের করে) হ্যাঁ, এই গ্রেকে লেখা আপনার চিঠি। (পাশে রেখে দিয়ে) আপনার প্রায়োরিটির একটা ডক্যুমেন্ট। আচ্ছা, এই একটা চিঠি ছাড়া আর কখনো কিছু লেখেননি?

    ডারউইন। নাঃ, মনে তো পড়ছে না তেমন কিছু।

    হূকার। লিখেছ ডারউইন, লিখেছ। আমার মনে পড়ছে। ওঃ এক্সাইটিং! গায়ে কাঁটা দেয়! (উত্তেজিত) এইটীন ফর্টি থ্রী। মান্থ অব সেপ্টেম্বর। অ্যান্টার্কটিকা এক্সপিডিশন সেরে সদ্য ফিরেই শুনলাম দক্ষিণ আমেরিকা থেকে হিউজ কলেকশন করে ফিরেছে ডারউইন। তখনও চিনি না তোমাকে, কিন্তু খুঁজে খুঁজে বের করলাম। ব্যাচিলর আমি, জিয়োলজিকাল সার্ভে ঘুরে, গাওয়ার স্ট্রীট ঘুরে, মাঝরাতে তোমার বাড়ীতে পৌঁছোলাম। শীতকাল, জানুয়ারী মাস, হাড়-কাঁপানো ঠাণ্ডা। মনে পড়ে?

    ডারউইন। ফায়ার-প্লেসে নিজেকে সেঁকে-টেকে একটু সুস্থ হয়ে দু-তিনদিন তো তুমি থেকেও গেছিলে আমাদের সঙ্গে।

    হূকার। হ্যাঁ, ডাউন গ্রামে। জেগেই কাটালাম দু রাত। আর তখনই তুমি আমাকে বলেছিলে ন্যাচারাল সিলেকশনের আইডিয়াটা। থার্টি নাইনে তো একটা প্রবন্ধ গোছেরও লিখেছিলে তুমি, সেটা পড়তেও দিয়েছিলে আমাকে, মনে আছে?

    ডারউইন। মনে পড়ছে। কিন্তু সেটা কি খুঁজে পাব এখন, এতদিন পর! সেই থার্টি নাইন আর আজ ফিফটি এইট!

    স্যর চার্লস। পেতে আপনাকে হবেই মিঃ ডারউইন। এটা বিজ্ঞানের স্বার্থ। খুব চাপ হচ্ছে জানি, কিন্তু পেতেই হবে।

    হূকার । এক মিনিট, স্যর চার্লস। থার্টি নাইন নয়। আমার যতদূর মনে পড়ছে ফর্টি থ্রী-ফোর নাগাদ ওটাকে ডারউইন রিভাইজও করেছিলো। (স্যর চার্লসকে) আপনিও পড়েছিলেন, আপনাকে দিয়েছিলাম আমি। ওটা আপনার কাছেই আছে।

    চার্লস । আমার কাছে? সর্বনাশ, আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না।

    ডঃ বেল । আর্টিক্‌ল্‌টা কী ব্যাপারে ছিল বলুন তো? টপিকটা কী?

    চার্লস । টপিক তো নিশ্চয়ই ন্যাচারাল সিলেকশন, আমি পড়েওছি হয়তো, কিন্তু এতদিন পর কোথায় সেটা রেখেছি...

    ডঃ বেল । (উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন, একটু পায়চারি করেন, আবার বসে পড়েন, দাঁড়ান) দাঁড়ান দাঁড়ান দাঁড়ান। আচ্ছা, টপিকটা কি ভেরিয়েশন অব অর্গানিক বীইংস...

    হূকার ও ডঃ বেল । ...আণ্ডার ডোমেস্টিকেশন...

    ডারউইন, চার্লস এবং হূকার ও ডঃ বেল । ...অ্যাণ্ড ইন দেয়ার ন্যাচারাল স্টেট!

    হাক্সলী । (উঠে দাঁড়িয়ে, বিস্মিত) ব্যাপারটা কী? আপনারা সবাই একই সঙ্গে মনে করলেন কী করে?

    ডঃ বেল । উত্তরটা দিচ্ছি। হাক্সলী, আপনিই বয়ঃকনিষ্ঠ, লাইব্রেরীয়ান মিঃ স্টোনকে ডেকে আনবেন একবার? (হাক্সলী লাইব্রেরীর উদ্দেশে ভেতরে চলে যায়)

    ডারউইন । লেখক আমিই, কাজেই আমার মনে পড়তেই পারে, হূকার এবং স্যর চার্লস, এঁদেরও পড়া, কিন্তু ডঃ বেল, আপনি কীভাবে জানলেন? (হাক্সলী এবং লাইব্রেরীয়ান মিঃ স্টোনের প্রবেশ)

    ডঃ বেল । এবার উত্তরটা পাবেন। মিঃ স্টোন, লাইব্রেরীতে ডারউইন ম্যানেস্ক্রিপ্ট নামে একটা ফাইল আছে। আনবেন?

    স্টোন । সার্টেনলি ডঃ বেল। (চলে যায়)

    ডারউইন । এটা কী ব্যাপার? ডারউইন ম্যানেস্ক্রিপ্ট?

    চার্লস । এবার আমার মনে পড়েছে। ডারউইন, আপনার বিবর্তনের তত্ত্বের সঙ্গে আমি তো কোনদিনই একমত নই। কিন্তু পড়ে বুঝলাম আপনার ভাবনাটা আউটস্ট্যাণ্ডিং। আধুনিক বিজ্ঞানে একটা নাড়া দেওয়া চিন্তা, এই স্ক্রিপ্ট নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ লেখা পড়তে দিতেই হবে। তখনই আমি স্ক্রিপটা লীনিয়নের লাইব্রেরীতে ডোনেট করি। (স্যর চার্লসের কথার মধ্যেই মিঃ স্টোন ফাইলটা নিয়ে এসে দাঁড়ান, ডঃ বেল তার কাছ থেকে সেটা নিয়ে নেন)

    ডঃ বেল । এবার বাকিটা বলি। আমি প্রেসিডেন্ট হবার পর লাইব্রেরীতে ফাইলটা দেখতে পাই। ডারউইন, আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই, বীগল অভিযানের পর আপনার আনা রেপটাইল্‌স্‌গুলো আইডেন্টিফাই করার জন্যে আপনি আমার সাহায্য চেয়েছিলেন। তখন থেকেই আপনার সম্বন্ধে আমার খুব উঁচু ধারণা। ফাইলটা দেখেই সেটা আমি পড়ে ফেলি। ক্লিয়ার?

    চার্লস । (নিজের পাশ থেকে আসা গ্রের চিঠিটা তুলে নিয়ে বেলকে দেন) ডঃ বেল, এখন এটাও ঐ ফাইলে রেখে দিন। আর গোটা ফাইলটাই ফোটোস্ট্যাট করে রাখতে পারলে সুবিধে হবে। এই ফাইলটাই ডারউইনের প্রায়োরিটির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ বলে আমার মনে হয়। আপনি কী বলেন?

    ডঃ বেল । ওয়েল, আমি আপনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। এগুলোর একটাও পাবলিশড নয়।

    হূকার । ঠিক, কিন্তু ওয়ালেসেরটাও নয়। কাজেই, লীনিয়নের জুলাইয়ের মাসিক সভায় আমরা দুটোই তো পড়তে পারি।

    হাক্সলী । দুটো নয়, তিনটে।

    ডঃ বেল । তিনটে? তিনটে কীরকম?

    হাক্সলী । ডারউইন সাহেবের প্রথম লেখাটা, এটা এক নম্বর। যেটা ১৮৩৯ এ লেখা হয়েছিল, পরে ১৮৪৪-এ নতুন করে লেখা হয়। দু নম্বর হলো প্রফেসর আসা গ্রেকে লেখা ডারউইন সাহেবের চিঠিটা।

    স্যর চার্লস । হ্যাঁ, এটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। চিঠিটা লেখা হয়েছে ১৮৫৭-র সেপ্টেম্বরে, তার মানে এটা প্রমাণ হলো যে ১৮৩৯ থেকে ১৮৫৭-র মধ্যে ডারউইন সাহেবের মতামতের কোন পরিবর্তন হয়নি।

    হুকার। আর তিন নম্বর হচ্ছে ওয়ালেসের প্রবন্ধটা, তাই তো? যেটা ওয়ালেস লিখেছে কবে যেন...১৮৫৮-র ফেব্রুয়ারী, তাই তো? তাহলে কে লিখলো আগে?

    ডঃ বেল। রাইট। সে ক্ষেত্রে অ্যাজ আ প্রিন্সিপ্‌ল্‌ আমার আপত্তি নেই, আচ্ছা, কী অর্ডারে পড়া হবে?

    হূকার। আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, এ ব্যাপারে আমার মতামত একেবারে স্পষ্ট।

    ডঃ বেল। সেটা কী?

    হূকার। দেখুন, আমরা একটা সায়েন্টিফিক কম্যুনিটি, আমরা যা-ই করি উই মাস্ট অ্যাপিয়ার টু বী ফেয়ার অ্যাণ্ড নিউট্রাল।

    ডঃ বেল। নিশ্চয়। তার মানে সর্বমান্য, সকলের গ্রহণযোগ্য, একটা নীতির ভিত্তিতে আমরা ক্রম নির্দেশ করবো, কী বলেন?

    স্যর চার্লস। অবশ্যই। আমার মনে হয় সেটা বর্ণানুক্রমিক হওয়াই ভালো।

    ডঃ বেল। বর্ণানুক্রমিক। তার মানে অ্যালফ্রেড ওয়ালেস; অ্যালফ্রেড, এ। প্রথমে এটা। তারপর সি, চার্লস ডারউইন।

    স্যর চার্লস। ওটা ব্রিটিশ ট্র্যাডিশন নয় ডঃ বেল, আমরা সব সময়েই পদবিকে অগ্রাধিকার দিই, তাই না? ডারউইন ডী, তারপর ওয়ালেস, ডাবল্যু, তাই তো?

    ডঃ বেল । ওয়েল ইয়েস, ব্রিটিশ ট্র্যাডিশন। ডী-এর প্রায়োরিটি, ডারউইন ফার্স্ট।

    চার্লস । হ্যাঁ, সেটাই তাহলে কথা রইল। আর একটা কথা, সেদিনের মীটিঙে ডারউইনের না আসাই ভালো, ঐ কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের পয়েন্টটা ইম্পর্ট্যান্ট। আমাদের কাছে শুধু বিজ্ঞানই ইম্পর্ট্যান্ট। আমরা যা করছি, সে শুধু বিজ্ঞানের স্বার্থে।

    হূকার ও ডঃ বেল । শুধুই বিজ্ঞানের স্বার্থে।

    ডারউইন। (উঠতে উঠতে) হ্যাঁ নিশ্চয়ই, ব্যক্তি-ট্যক্তি কোন ব্যাপার নয়, ক্রেডিট কে পেলো সেটা সেকেণ্ডারী, কিন্তু বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের স্বার্থ সবার উপরে।


    II দৃশ্যান্তরII

    লিনীয়ন সোসাইটির মীটিঙের মঞ্চ। চেয়ারে চারজন উপবিষ্ট। মাঝখানের দুটি চেয়ারে জে-জে বেনেট ও টমাস বেল,
    বেলের ডানদিকে স্যর চার্লস লায়েল এবং বেনেটের বাঁদিকে জোসেফ হূকার। নাটকের দর্শকরাই মীটিঙের শ্রোতা।



    বেল। শুভ সন্ধ্যা। লিনীয়ন সোসাইটির মাননীয় সকল বিদগ্ধ সভ্যকে জুলাই এর মাসিক সভায় স্বাগত। ইতোমধ্যে সভার যে কার্যসূচী আপনারা পেয়েছেন, সভাটি মূলত সেই সূচী অনুযায়ীই পরিচালনা করা হবে, যদিও একটি পরিবর্তনের জন্য আপনাদের অগ্রিম অনুমতি প্রার্থনা করছি। বিজ্ঞানের স্বার্থরক্ষার্থেই এই পরিবর্তন; সময়াভাবে আপনাদের আগাম সূচনা দিতে না পারায় প্রথমেই আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমাদের পরিচালন সমিতির মাননীয় সভ্য চার্লস ডারউইন, এফ-আর-এস মহাশয় এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানী অ্যালফ্রেড ওয়ালেসের যুগ্ম রচনার কিয়দংশ আপনাদের সামনে পাঠ করার আশু প্রয়োজনই আজকের পরিবর্তিত কার্যসূচীর কারণ। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী এবং আমাদের পরিচালন সমিতির সভ্য স্যর চার্লস লায়েল এবং ডক্টর জোসেফ হূকার আজ মঞ্চে উপবিষ্ট। আর আমার পাশেই যিনি বসে আছেন, আমাদের সমিতির সাধারণ সম্পাদক, প্রথিতযশা বিজ্ঞানী জে-জে বেনেট মহাশয়, তাঁর তো আলাদা করে পরিচয় দেবার কিছু নেই। আমি তাঁকেই পূর্বোল্লিখিত রচনাগুলি পাঠ করার জন্য অনুরোধ করবো। পাঠান্তে, স্যর চার্লস এবং ডঃ হূকার রচনাগুলির বিষয়ে আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন, এবং বিজ্ঞানের যে স্বার্থের প্রয়োজনে আজকের কর্মসূচীর সামান্য পরিবর্তন হলো, তা-ও তখন সম্যক বোধগম্য হবে। তবুও একটি কথা এই সোসাইটির সভ্য হিসেবে জানিয়ে রাখা আমার কর্তব্য। জীবজগতের ক্রমবিবর্তনের বিষয়ে বিজ্ঞানী অ্যালফ্রেড ওয়ালেস এবং চার্লস ডারউইন পৃথিবীর দুটি পৃথক প্রান্তে সম্পূর্ণ পৃথক গবেষণায় প্রায় একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। যে রচনাগুলি আজ পড়া হবে সেগুলি ভবিষ্যতে আমরা প্রকাশ করবো, এবং ডারউইন-ওয়ালেস পেপার নামে এই রচনা ভবিষ্যতে পরিচিত হবে। মিঃ বেনেট...

    দৃশ্যান্তর। মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যায়। আমরা বোর্ণিওতে ওয়ালেসের বাসস্থানে ফিরে আসি। চৌকিতে ওয়ালেস বসে, অনেক কাগজপত্র, হাতে একটি খোলা চিঠি, শারীরী ভাষায় খুব অমনোযোগ, মুখ-চোখের অভিব্যক্তিতে খানিকটা হতাশা, খানিকটা পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার অমোঘ পরিণতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা, নিজেকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে একটু খুশি খুশি ভাব দেখানোর চেষ্টাও বুঝি-বা! ফলত নিজের অজান্তেই চোখে জল। কিছুক্ষণ পর মথ-প্রজাপতি-ফড়িং ধরবার একটি 'নেট' ঘাড়ে ওয়ালেসের সহকারী মোরিয়ার প্রবেশ।

    মোরিয়া। কী সাহেব, রেডি তো, চল চল, ঝকঝকে রোদ্দুর বাইরে, আজ হাজার খানেক প্রজাপতি ধরব। (হঠাৎ ওয়ালেসের দিকে ভাল করে তাকিয়ে) আরে, কী হল, চোখে জল কেন? হাতে ওটা কী? ও, ডাক দিয়ে গেল বুঝি? চিঠি পেয়েছ?

    ওয়ালেস। (ধরা পড়ে যাওয়ার ভঙ্গীতে চোখ মুছে) ওঃ তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না, চোখে জল কেন হবে!

    মোরিয়া। আরে, কেন হবে সেটা আমি কী করে জানব! সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি। কার চিঠি? বাড়ী থেকে? মায়ের?

    ওয়ালেস। (হেসে) দূর পাগলা, মায়ের চিঠি হবে কোথা থেকে, মা কি আমার ঠিকানা জানে? মা-কে তো বলাই আছে, আমিই শুধু চিঠি লিখব; মা পাবে, কিন্তু লিখতে পারবে না। চিঠিটা কার জানিস?

    মোরিয়া। কার?

    ওয়ালেস। ডক্টর জোসেফ হূকার। নাম শুনেছিস?

    মোরিয়া। না সাহেব, আমি নাম শুনব কোথা থেকে?

    ওয়ালেস। খুব বড় বিজ্ঞানী, বিরাট বংশের ছেলে, বাবাও খুব নাম করা বিজ্ঞানী ছিল, উইলিয়াম হূকার।

    মোরিয়া। সে তো তোমার কাছে ছোট বংশের লোকের কথা শুনিই না। আমার মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো সাহেব, একবার দেখে আসি তোমার দেশে গিয়ে, ততটা বড় বংশ নয় এমন লোক তুমি ছাড়া আর ক'জন আছে তোমার দেশে।

    ওয়ালেস। সে তুই বলতে পারিস। আসলে আমার কাছে যাদের কথা শুনিস তারা তো সব বিজ্ঞানী-টিজ্ঞানী, এসব কাজ বড় বংশের ছেলে ছাড়া করবে কারা বল্‌। পেটের জন্যেই যাদের কাজ করতে হয় তারা বিজ্ঞান নিয়ে ভাববে কখন!

    মোরিয়া। কেন, তুমি তো ভাবো সাহেব। তবে হ্যাঁ, তোমার ভাবনা শুনতে চায় না তোমার বড় বড় বংশের ছেলেরা, না পড়েই তো বলে সাপ্লাই-টাপ্লাই করতে মন দিয়ে, অত ভাবনা-চিন্তা করার দরকার নেই, ওসব তোমার কাজ নয়।

    ওয়ালেস। হুঁ, বোল্‌তো, তবে আর বলবে না রে মোরিয়া, বলবে না আর। সেই চিঠিই লিখেছে হূকার।

    মোরিয়া। কী লিখেছে?

    ওয়ালেস। তোর মনে আছে ডারউইনের কথা?

    মোরিয়া। ডারউইন? ডারউইনকে ভুলতে পারি? তোমার লেখাটা ছাপা হয়েছে? পড়েছে ওরা?

    ওয়ালেস। সেটার কথাই তো বলছি রে। পড়েছে, পড়েছে। আর শুধু পড়েছে? পড়েছে কোথায় জানিস? লিনীয়ন সোসাইটিতে। লণ্ডনের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানীদের সামনে।

    মোরিয়া। শুধু পড়ল, না ছাপা-টাপাও হল?

    ওয়ালেস। ছেপেছে রে, ছেপেছে। সেটাই তো পাঠিয়েছে হূকার ঐ চিঠিটার সঙ্গে, খামটার মধ্যে আছে, খুলে দেখ্‌। (খামটা খুলে লিনীয়ন সোসাইটির ১লা জুলাই, ১৮৫৮-র সভার মুদ্রিত কার্য-বিবরণী দেখে। শিরোনামটি দেখার পর—)

    মোরিয়া। এটা কী? ডারউইন-ওয়ালেস পেপার! মানে? এর মধ্যে ডারউইন এল কোথা থেকে? তুমি তো একাই লিখেছিলে সাহেব, আমিই তো ডিক্টেশন নিলাম, তুমি তো শুধু বানান-টানান ঠিক করে সেটাই নকল করে পাঠিয়ে দিলে!

    ওয়ালেস। ও হো, তুই মাথা গরম করছিস কেন মোরিয়া, ভাল করে দেখ্‌। প্রথমে ডারউইনের লেখার একটা অংশ, তারপর ডারউইনের লেখা একটা চিঠি, আর তারপর আমার লেখাটা, পুরোপুরি। এডিট-ফেডিট করা নয়। (যতক্ষণ ওয়ালেস কথা বলে মোরিয়া পাতাগুলো ওলটাতে থাকে, তারপর পাতা ওলটাতে ওলটাতেই)

    মোরিয়া। সে ঠিক আছে, কিন্তু আমি কিছুতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। আইডিয়াটা তোমার। জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে, দেখতে দেখতে, ভাবতে ভাবতে, তোমার মাথায় আইডিয়াটা এলো, হরিণ বাঘ এইসব; অনেক দিন ধরে আস্তে আস্তে কেমন বদলে যায়, মনে পড়ে তোমার? তুমি ডিক্টেশন দিলে, আমি লিখলাম; সেটার থেকে বানান-টানান ঠিক করে তুমি পাঠিয়ে দিলে ডারউইনের কাছে, তারপরেই সেটা ডারউইন-ওয়ালেস পেপার হয়ে গেল! আর ডারউইনই প্রথমে, তুমি শেষে!

    ওয়ালেস। মোরিয়া, তুই বুঝছিস না। আমারটা কেন ডারউইন-ওয়ালেস হবে? আমারটা আমারই আছে, দেখ্‌ না, কেমন ছাপা হয়েছে। (নিজেকে এবং মোরিয়াকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টাটা গলায় ধরা পড়ে, উদ্গত আবেগ এবং কান্না গোপন করার প্রয়াসে গলাটা ভেঙে যায় একটু) , ডারউইন তো আমার আগেই এরকম ভেবেছিলেন—এরপর আমার লেখাটা পেয়ে—আমিই তো বলেছিলাম আমার লেখাটা স্যর চার্লস লায়েলকে দেখাতে—উনি স্যর চার্লসকে দেখালেন। তো স্যর চার্লস, জোসেফ হূকার, এঁরা বলছেন এঁরা সবাই জানতেন, সেই উনচল্লিশ সাল থেকেই ডারউইন নাকি এই আইডিয়াটাই মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। অত বড় বিজ্ঞানী, আইডিয়া এলেই তো আর পাবলিশ করবেন না, নানারকমের এক্সপেরিমেন্ট করছেন, ডেটা সাজাচ্ছেন, ভাবছেন তাড়া কী? তারপর আমার লেখাটা যখন হাতে এলো, ডারউইন স্যর চার্লসকে বললেন, ওয়ালেস যখন কাগজে-কলমে লিখেই ফেলেছে আইডিয়াটা,ওঁর আগেই তো পুরোপুরি সব আইডিয়াটাই লিখেছি যতই সংক্ষেপে হোক্‌—ওঁর আগেই, তাই না?— আমার লেখাটাই যেন ওঁরা ছেপে দেন; ডারউইন আর এর মধ্যে থাকবেন না, উনি উইদ্‌ড্র করছেন।

    মোরিয়া। (রাগত) তো করলেন না কেন?

    ওয়ালেস। সেটাই তো কথা। হূকার তো তা-ই লিখেছেন চিঠিতে। ওঁরা অনেক করে বোঝালেন ডারউইনকে। ডারউইন উইদ্‌ড্র করলে ওঁর সব কাজ হারিয়ে যাবে বিজ্ঞানের থেকে। তার বদলে লিনীয়ন সোসাইটিতে যদি ওঁর পুরোনো দিনের খসড়াটার থেকে খানিকটা পড়া হয়, তাহলে ওঁরটাও রইলো, আর আমারটাও ছাপা হচ্ছে, আমারও স্বীকৃতি মৌলিক চিন্তার জন্যে। আর তা-ই কি শুধু? পেপারের নাম ডারউইন-ওয়ালেস পেপার। ভাবতে পারিস? আমার নাম ডারউইনের সঙ্গে, একসাথে! মানে, সত্যি কথা বলতে গেলে, স্বীকৃতি উইদ্‌ বোনাস! আর তা ছাড়া, বিজ্ঞানেরও ক্ষতি হল না, সব দিকই বাঁচলো।

    মোরিয়া। এসব কী তোমরা বলছ, আমি কিছু বুঝলাম না সাহেব। ঠিক আছে, তুমি যদি ভাল বোঝ, আমার কী!

    ওয়ালেস। আর তা ছাড়া দেখ্‌ না, এর আগে আমার যে পেপারটা ছাপিয়ে দিয়েছিল স্টীভেন্স—মনে পড়ে তোর?—কেউ তো ভাল করে পড়েও দেখল না সেটা। এটাও যদি সে ভাবেই ছাপা হত, কী লাভ হত বল্‌? ডারউইনের সঙ্গে একসাথে বেরিয়েছে, এবার দেখিস সবাই পড়বে, আমাকেও চিনবে সবাই। সবাইকে এবার ডারউইনের সঙ্গে একসাথে বলতে হবে আমার নামও, ডারউইন-ওয়ালেস, ডারউইন-ওয়ালেস, ওয়ালেস-ডারউইন, ডারউইন-ওয়ালেস, ওয়ালেস, ওয়ালেস, ওয়ালেস! আমারই তো লাভ মোরিয়া (গলায় উদ্গত কান্না আটকিয়ে থাকে) , ওঃ মোরিয়া!

    মোরিয়া। বুঝলাম সাহেব, বুঝলাম। তোমার লেখাটা যদি শুধু তোমার নামেই ছাপা হত, পড়ত না কেউ! বংশটা তো বড় হওয়া চাই! তাই, ডারউইনের সঙ্গে তুমি! দেখেছ, তোমাকে কেমন ওরা জাতে তুলে নিল সাহেব, জাতে উঠে গেলে তুমি! হ্যাঁ, একটু হাঁচোড়-পাঁচোড় করতে করতে উঠলে বটে, তবে জাতে তো উঠলেই!




    চলবে…
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    অঙ্ক ১
  • নাটক | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৩৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন