

স্যামুয়েল স্টীভেন্সের দোকানঘর। দোকানের ভেতরের দেওয়ালে সাইনবোর্ডে Mr. Samuel Stevens, Natural History Agency, 24 Bloomsbury Street, London লেখা। দোকানে কেউ নেই, শুধু এক কোণে একটি চেয়ারে অপেক্ষারত ওয়ালেস। একটু পর স্টীভেন্স প্রবেশ করে ওয়ালেসকে দেখে অবাক হয়ে যায়।
স্টীভেন্স। আরে, ওয়ালেস না! গূড মর্ণিং, কী ব্যাপার, আপনি? বলা নেই, কওয়া নেই, বোর্ণিও থেকে কবে এলেন?
ওয়ালেস। এইমাত্র। মালপত্তর দিদির বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সোজা আপনার কাছে চলে এসেছি।
স্টীভেন্স। (বসতে বসতে) কী হলো হঠাৎ, কতদিনের জন্যে এলেন? ফিরবেন কবে?
ওয়ালেস। মিঃ স্টীভেনস, ভাবছি আর ফিরব না, লণ্ডন বা আশপাশের কোন ম্যুজিয়ম-ট্যুজিয়মে একটা চাকরি নেব।
স্টীভেন্স। চাকরি নেবেন? পাবেন কোথায়? দেবে কে?
ওয়ালেস। আপনাকে একটা কথা বলি মিঃ স্টীভেনস। ডারউইন-ওয়ালেস পেপার বেরোনোর পর মিঃ হূকার আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। তিনি লিখেছেন, এই পেপার আমাকে ইংল্যাণ্ডের প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের মধ্যে এনে দিয়েছে ডারউইন সাহেবের সঙ্গে। এর পরেও আপনি কি মনে করেন একটা ভদ্রগোছের চাকরি আমি জোটাতে পারব না?
স্টীভেন্স। ওঃ, ডাঃরউইন-ওয়ালেস পেপার! (গলায় হাসি কিন্তু উচ্চারণেই অবজ্ঞা স্পষ্ট, ডারউইনের ডা-এর ওপর জোর দেওয়ায় উচ্চারণটা খানিকটা ডাঃ-এর মতো শোনায়)।
ওয়ালেস। এভাবে বলছেন কেন মিঃ স্টীভেন্স? আপনি কি পেপারটাকে গুরুত্বই দিচ্ছেন না?
স্টীভেন্স। (উঠে দাঁড়িয়ে ওয়ালেসের হাত ধরে) আমার সঙ্গে আসুন ওয়ালেস। (ওয়ালেস উঠে দাঁড়িয়ে এগোতে থাকে, পেছনে রাখা শেল্ফের থেকে একটা পাল্লা খুলে দেয় স্টীভেন্স) দেখুন তো এখানে কী আছে। (ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটা ফাইল বের করে আনে ওয়ালেস) ফাইলটা খুলুন, পড়ুন। (ওয়ালেস ফাইল খোলে, ওয়ালেসের কাঁধের ওপর দিয়ে ফাইলে চোখ দেয় স্টীভেন্স) এটা লীনিয়ন সোসাইটির ১৮৫৮-৫৯ এর বাৎসরিক রিপোর্ট। লীনিয়ন সোসাইটির। এবং, মনে রাখবেন রিপোর্টটা ১৮৫৮-৫৯ এর। সোসাইটির সভাপতি টমাস বেল রিপোর্ট দিচ্ছেন। এটার একটা প্যারাগ্রাফের একটা মাত্র লাইন আমি দাগ দিয়ে রেখেছি, শুধু ঐ টুকু পড়ুন।
ওয়ালেস। (পড়ে) “বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখিতে গেলে আলোচ্য বৎসরটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিতে পারে নাই, বস্তুত বিজ্ঞানের পক্ষে সম্পূর্ণ নূতন, বৈপ্লবিক, কোন আবিষ্কার বা চিন্তা এ বৎসর আমরা দেখিতে পাই নাই”। (ওয়ালেসের কণ্ঠে এবং চেহারায় বিষ্ময়, হতাশা, আতঙ্ক, অবিশ্বাস) এ কী করে সম্ভব মিঃ স্টীভেনস, ডারউইন-ওয়ালেস পেপার, সে তো পয়লা জুলাই, আঠেরোশো আটান্নয় পড়া হয়েছে, ১৮৫৮-৫৯ ই তো হলো! নূতন, বৈপ্লবিক চিন্তা দেখিতে পাই নাই! মানে?
স্টীভেনস। মানে? মানে বুঝে নিন। এবং লক্ষ্য করুন, যে মীটিঙে পড়া হয়েছিলো, সে মীটিং প্রিসাইড করেছিলেন স্বয়ং টমাস বেল, যিনি এই রিপোর্ট দিচ্ছেন। কাজেই বুঝতেই পারছেন ও পেপারের গুরুত্ব কার কাছে কতটা! আসলে আপনি যে ধরণের চাকরি আশা করেন, সে চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা যাঁদের, তাঁরা কী ভাবছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, পেপার-টেপার নয়। যে চাকরি পাওয়ার জন্যে একাধিক ইম্পর্ট্যান্ট লোকের সুপারিশ দরকার হয়, সেটা পাওয়া খুব সহজ নয়।
ওয়ালেস। কিন্তু আমি তো এখন নিশ্চয়ই ডারউইন, হূকার, স্যর চার্লস লায়েল, এঁদের সুপারিশ...
সীভেন্স। আপনি তো সোজাই এসেছেন বললেন; দাঁড়ান, কিছু ব্রেকফাস্ট আনাই, তারপর বলছি (বেরিয়ে গিয়ে ফিরে আসেন)।
হ্যাঁ, কী বলছিলেন, সুপারিশ? ধরুন পেলেন। ধরুন, জুয়োলজিকাল গার্ডেনের ক্যূরেটরশিপের জন্যে অ্যাপ্লাই করেছেন আপনি। সুপারিশ ডারউইনের। কী মনে করেন? যথেষ্ট? আমার তো মনে হয় চাকরিটা নিশ্চিত পাওয়ার জন্যে আপনাকে এর পরেও দু-একজন পার্লামেন্ট সভ্যের সুপারিশ যোগাড় করতে হবে। তারপর কেম্ব্রিজ-টেম্ব্রিজের কোন প্রফেসরের, মানে যদি তাঁর ছাত্র হন। এ ছাড়াও আপনার বাবা কে ছিলেন, কী ফ্যামিলি ব্যাক্গ্রাউণ্ড, এ সবও তো দেখতে হবে নিশ্চয়ই!
ওয়ালেস। তার মানে কোনও আশা নেই?
স্টীভেন্স। তা বলছি না, তবে মুশকিল। এদিকে আপনি তো আবার পলিটিক্সেও জড়িয়েছেন! ল্যাণ্ড রিফর্ম মুভমেন্টের কাগজে গত মাসে আপনার একটা প্রতিবাদ ছাপা হয়েছে না? একটা কথা জিজ্ঞেস করি ওয়ালেস। এর আগে আপনার যে পেপার ছাপা হয়েছিলো সায়েন্টিফিক জার্ণালে, সেটাই সারাওয়াক ল পেপার, তাই না? ছাপাবার ব্যবস্থা কে করেছিল?
ওয়ালেস। ছাপাবার ব্যবস্থা কে করেছিল? কেন আপনি, আপনিই তো মিস্টার স্টীভেন্স! এ যাবৎ আমার যতটুকু প্রতিষ্ঠা সবটাই তো আপনার চেষ্টায়।
স্টীভেন্স। তাহলে এবারের পেপারটা আমার কাছে না পাঠিয়ে সরাসরি ডারউইনের কাছে পাঠালেন কেন?
ওয়ালেস। (মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে অস্বস্তিকর রকমের নীরবতায় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এবার নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করবার প্রচেষ্টা ওয়ালেসের) আসলে আমি......
স্টীভেন্স। চুপ করুন ওয়ালেস, চুপ করুন! আমি জানি। আমি জানি আপনি কী বলবেন, যতটা আহাম্মক আপনি আমাকে মনে করেন, ঠিক ততটা আমি নই। একটু দাঁড়ান (বলতে বলতে প্রায় দৌড়িয়ে একটা শেল্ফ্ খুলে একটা ফাইল নিয়ে সেটা খুলে এক তাড়া কাগজ একসঙ্গে চেপে ধরে উত্তেজিত ভাবে ফাইলটা ঝাঁকাতে থাকে)। এর মধ্যে ইংলণ্ডের ডজনখানেক বৈজ্ঞানিক সংস্থার তাড়া তাড়া চিঠি আছে; সব আমাকে লেখা, গত এক বছর ধরে চিঠিগুলো জমা হচ্ছে। সবাই জানে ওয়ালেস ইংলণ্ডে ফিরে এলে প্রথম যে ব্যক্তিটি জানবে, তার নাম স্যামূয়েল স্টীভেন্স। সব চিঠির একটাই কথা, ওয়ালেস এলেই যেন আমি তাদের জানিয়ে দিই। ইংলণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডারউইনপন্থী-বিজ্ঞানী অ্যালফ্রেড ওয়ালেসকে দিয়ে তারা বক্তৃতা করাতে চায়। হ্যাঁ হ্যাঁ, বক্তৃতাই করাতে চায়! শুধুই বক্তৃতা! হুঁঃ, টু হেল উইদ্ ডারউইন-ওয়ালেস পেপার! ইটস্ ডারউইন্স্ পেপার! ওয়ালেস শুধুমাত্র ডারউইনের লেজুড়! ডারউইনপন্থী বিজ্ঞানী! হোঃ!
ওয়ালেস। মিঃ স্টিভেন্স, আসল ব্যাপারটা..., মানে ঐ ল পেপারটার, তেমন ইমপ্যাক্ট তো হল না, পড়লই না তো বিশেষ কেউ।
স্টীভেন্স। পড়ল না, তাই সোজা ডারউইনের কাছে পরেরটা! আপনি জানতেন না ডারউইন একই কাজ করছিল?
ওয়ালেস। একটু একটু যে জানতাম না তা নয়। ডারউইন নিজেই তো খানিকটা আভাস দিয়েছিলেন।
স্টীভেনস। তবুও, তবুও আপনি ডারউইনের কাছেই পাঠালেন!
ওয়ালেস। উনি লিখেছিলেন উনিও আমার মতো করেই ভাবছেন অনেকটা, এমনকি স্যর চার্লসও প্রশংসা করেছেন ল পেপারটার। তাই বোধ হয় খানিকটা আবেগেই ওঁর কাছে পাঠালাম, অত বড় বড় মানুষ ভাবছেন আমার মতো!
স্টীভেনস। কী বলবো আপনাকে, আপনি আহাম্মক না ছেলেমানুষ।
ওয়ালেস। আপনার যা মনে হয় ভাবতে পারেন স্যর, নির্লজ্জ সত্যিটা হল, আমি বড্ড গরীবের ছেলে, একেবারেই চালচুলোহীন। চোদ্দ বছর বয়েসের পর বাবা আর ইশকুলে পড়াতে পারেনি, কী কষ্ট করে যে সংসার চালিয়েছে মা, সে তো চোখের সামনে দেখেছি। আপনার সাহায্যে অ্যামাজনে গিয়ে প্রথম একটু পয়সার মুখ দেখলাম। তারপর বোর্ণিওতে এসে ডারউইনের নিজের হাতে লেখা চিঠিটা পেলাম যখন, কতবার যে পড়েছি সে চিঠি! বুক পকেটে যত্ন করে রেখে দেওয়া সে চিঠি কতদিন আমার সঙ্গে ঘুরেছে, কতদিন! ডারউইন লিখেছেন, নিজের হাতে! বৃটিশ ম্যুজিয়মে একবার দেখেছিলাম তাঁকে, দূর থেকে। কাছে গিয়ে শেকহ্যাণ্ড করার সাহসটাও ছিল না সেদিন। সেই ডারউইন নিজে লিখেছেন আমাকে! বলেছেন তাঁর সঙ্গে আমার চিন্তার মিল! বলেছেন, স্যর চার্লস লায়েল পড়েছেন আমার পেপার। পড়ে, নতুন চিন্তা এসেছে তাঁর মাথায়! সত্যি কথা বলি মিঃ স্টীভেন্স, ডারউইনকে লেখাটা পাঠিয়েছিলাম লোভে পড়ে। জানতাম, আমার লেখাটা ভালো হয়েছে, ডারউইনেরও যদি ভালো লাগে! ওঁরা কি একটু সাহায্য করবেন না আমাকে! বোর্ণিওতে আমার কাছে একটা ছেলে কাজ করতো, মোরিয়া। সে বলত, তোমার দেশে কোন কোন লোক উঁচু জাতের, বাকিরা নীচু। নীচু জাতের লোকদের কিছুতেই বড় হতে দেবেনা ঐ উঁচু জাতের দল, চিন্তা-ভাবনা সব ওরা করবে, আর তোমরা খেটে মরবে। বড় লোভ ছিল মিঃ স্টীভেন্স, বড় লোভ ছিলো ঐ উঁচু জাতে ওঠার... (একটি ছেলে ট্রেতে এক প্লেট টোস্ট আর পটে চা রেখে দিয়ে যায়)
স্টীভেন্স। উঠতে পারলেন নাকি? উঠতে দিল ওরা আপনাকে? কী লাভ হল যখন লিনীয়নে পড়া হল পেপারটা? কী ইমপ্যাক্ট? ইমপ্যাক্ট হলো এক বছর পর। যখন ডারউইনের বই বেরোলো, অরিজিন অব স্পীশিস। কিন্তু সে বই তো আর ডারউইন-ওয়ালেস পেপার নয়, সে তো একা ডারউইনের। ডারউইনের একা! ডারউইন্স্ থট! ডারউইনিজ্ম্! আর আপনি? নীচু জাতেই রয়ে গেলেন ওয়ালেস! তত্ত্বের আবিষ্কারক নয়, ফলোয়ার! পেছন পেছন যায়! অথবা পাল্কিবাহক! কাঁধে করে বহে নিয়ে যায় চিন্তানায়ক ডারউইনকে! অথচ ভাবুন ওয়ালেস, উল্টোটাও তো হতে পারত! ধরুন, পেপারটা আপনি আমার কাছে পাঠাতেন, আগেরটার মতো। অ্যানাল্সে ছাপা হত। মেনে নিলাম, ইম্প্যাক্ট হত না, বিশেষ কেউ পড়তো না। না পড়ুক, কিন্তু পেপারটা আপনার, আপনার একার। এতদিন ধরে ডারউইন কাজ করেছে, তার বই তো বেরতোই। কিন্তু তত্ত্বটা আপনার! আগেই ছাপা! ভাবতে পারেন রোল রিভার্স্যাল! রিভার্স্যাল অব ফেম? আপনার তত্ত্ব, আপনার তত্ত্ব! থট অব ওয়ালেস! থট অব ওয়ালেস ইলাবোরেটেড বাই ডারউইন! ডারউইন! তখন সে হত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওয়ালেসপন্থী!
ওয়ালেস। আমার অদৃষ্ট মিঃ স্টীভেন্স।
স্টীভেন্স। থামুন, অদৃষ্ট! অদৃষ্টই বটে! এই ছোট জাতের লোকগুলো মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারেনা! কিছুক্ষণ ওপরের দিকে তাকালেই মাথা ঘুরে যায়, তাই না? অদৃষ্ট! (ট্রেতে খাবারটি অভুক্ত পড়েই থাকে)