এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ছেঁড়াকাঁথা

  •  ছেঁয়াবাজীর ছলনা  - ২৭ 

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ছেঁড়াকাঁথা | ০১ মার্চ ২০২৬ | ১২৯ বার পঠিত
  • গরমের দুপুরে একটা ম্যাজিক আছে।  শীতের দুপুরের মত চকচকে ঝলমলে খোলামেলা নয় আবার বর্ষার দুপুরের মত ঝাপসা কাঁদুনেমতও নয়, দুপুর হল  বেশ গম্ভীরমত,  ধোঁয়াধোঁয়া রহস্য ভেসে থাকে এখানে ওখানে।  গরমের দুপুরে বাইরের বারান্দার লাল টুকটুকে চকচকে মেঝেটা হুউশ করে ম্যাজিক কার্পেট হয়ে যায়।  তখন ওর কোণাটায় যেখানে দাদুর ঘরের জানলা আর দিদার ঘরের জানলা নব্বই ডিগ্রী কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেইদিকটার ছায়ায় চুপটি করে  বসে থাকলে ম্যাজিক কার্পেটে চড়ে ঘুরে বেড়ানো যায় একেকদিন একেক জায়গায়।  সেই আগে যখন বুড়ীরমা মাসি সমস্ত বাসন মেজে কাপড় কেচে গোয়ালঘর পরিস্কার করে গরুর জাবনা দিয়ে বাড়ী চলে যেত চান করে আসবে বলে তখন থেকেই দুপুরটা গুটি গুটি পায়ে এগোতে থাকত আমাদের বাড়ীর দিকে।  ততক্ষণে কাকগুলো শ্রীদুর্গামিলের পুকুরে ডানা ভিজিয়ে এসে  কাজলকাকুদের ঝাঁকড়া আমগাছে পাতার ছায়ায় লুকিয়ে বসে আছে।  আর ওদের আশেপাশেই কচি কচি আমের্ পাশে ঘাপটি মেরে বসে থাকে গম্ভীর দুপুর।  বুড়ীরমা-মাসি এসে দিদা বড়মাইমাদের সাথে বসে খাবে, মা'ও খাবে তখন।  তারপর বাসন মেজে রেখে পান মুখে দিয়ে মাসি বাড়ী চলে যাবে।  দিদা আবার ভাল করে চান করে এসে পান মুখে দিয়ে শোবে।

    সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই দিদার ঘরের দক্ষিনের দুটো জানলাই বন্ধ হয়ে যায় রোদ্দুরের তাত ঠ্যাকাতে।  বারান্দার দিকেরটা আধখানা খোলা থাকে, সেটাও বারোটার পরে একদম বন্ধ। তাই দিদার ঘর খুব ঠান্ডা হয়ে থাকে, ঘুমঘুম ঠান্ডা।  মা'ও চলে আসবে ঘরে।  খাওয়া শেষ করে বড়মাইমা এত্তবড় পিতলের ডাবর নিয়ে বসবে পান সাজতে, দিদার ঘর আর ভাঁড়ার ঘরের দরজাটায়।  ডাবরের মাথায় ঢাকনিটায় বসানো আছে ছোট্ট ছোট্ট পিতলের কৌটোয় সুপুরির কুচি, খয়ের, জর্দা, কিমাম, এলাচির দানা, কাশীর মশলা, চুন লাগানোর পিতলের ছোট্ট দন্ড মাথাটা চ্যাপ্টা, একটা কুচকুচে কালো বড়সড় জাঁতি।  সাথে থাকবে মাটির ভাঁড়ে ভেজানো চুন আর ছোট্ট একটা পিতলের হামানদিস্তা।  বুড়ীরমা-মাসির পান সাজা হবে দুটো পান দিয়ে, বড়মাইমার পান দেড়খানা পাতা দিয়ে আর দিদার একখানা পাতা।  দিদারটা সেজে নিয়ে যেমন তেমন একটা খিলি করে হামানদিস্তায় ঢুকিয়ে দেওয়া থাকবে।  দিদা যেই বাথরুম থেকে বেরিয়ে কাপড় মেলতে যাবে অমনি হয় বড়মাইমা নয়ত মাসি প্রথমে থুপথুপ আর  একটু চেপ্টে গেলেই ঢুপঢুপ করে দিদার পানটা একদম থেঁতো করে ফেলবে।  অমন কচিসবুজ রঙের পানটা তখন একদম কালচেলাল রঙের একটা দলা হয়ে যায়, আর কি সুন্দর গন্ধ তাতে।  ঐটে হল দুপুরের গন্ধ, গরমের দুপুরের।

    শীতের দুপুরে অমন গন্ধ থাকে না তো।  শীতের দুপুরের গায়ে কমলালেবু আর  বড়ির ডালবাটার গন্ধ লেগে থাকে।  মাসি বাড়ী চলে গেলে দিদা চৌকিতে উঠে শুয়ে পড়ে।  বড়মাইমা কোনো কোনোদিন ওপরে নিজের ঘরে যায়, আবার বেশী গরম থাকলে দিদার ঘরের মেঝেতেই শুয়ে পড়ে।  মেঝেটা খুব ঠান্ডা আর একটুও ধুলো নেই।  শুতে ভারী আরাম।  চৌকির চারটে পায়ার নীচে দুটো করে ইঁট দিয়ে উঁচু করা।  মাটিতে শুলে দেখা যায় নীচে রাখা ঝুড়িভর্তি সুপুরি, যেগুলোর খোলা ছাড়ানো হয়ে গেছে, আর সাদা চাদরে বাঁধা বাসনপত্র।  ওগুলো সব পিতল আর তামার পুজোর বাসন।  খুব গরমে একেকদিন আমি আর ছোটদিও মাটিতে শুয়ে পড়তাম। দেওয়াল থেকে ছয় ইঞ্চি ছেড়ে লাল মেঝের ওপরে এক ইঞ্চি চওড়া কালো বর্ডার।  ঐটে হল ধর্মডাঙার মাঠের সীমানা।  ধর্মডাঙার মাঠ যেখানে অবাধ্য ছেলেদের নিয়ে গিয়ে পুলিশে গুলি করে মেরে ফেলে।  আর ইঁট দিয়ে উঁচু করা চৌকির পায়াগুলো তো আসলে জমিদারবাড়ীর খিলান।  না না জমিদারবাড়ী নয়ত ঐটে মোক্তারদাদুর বাড়ীর খিলান, সুরথের মোক্তারদাদু।

    দুপুরবেলা সব ঘরের জানলা বন্ধ করে দেওয়া হলেও দাদুর ঘরের জানলা দাদু কিছুতেই বন্ধ করতে চায় না।  যতদিন নিজে সুস্থ ছিল ততদিন তো বাইরের্ দরজাটাও খুলে রাখত।  এখন অবশ্য বড়মাইমা  দাদুর খাওয়া হলেই দরজা বন্ধ করে দক্ষিণের দুটো জানলার নীচের দিকগুলো বন্ধ করে দেয়।  খুব রোদ্দুর থাকলে দাদুর মাথার দিকের জানলাটার ওপরের দিকও বন্ধ করে দেয়।  তারপর সবাই যখন যে যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে তখন চুপি চুপি গিয়ে দাদুর ঘরে দরজা খুলে আস্তে করে বারান্দায় বেরিয়ে বাইরে থেকে ভেজিয়ে দিতে হয়।  আর নাহলে বাথরুমের দিক দিয়ে বেরিয়ে পুরো বাগান ঘুরে এসে ঐ দক্ষিণ পশ্চিম কোণাটায় চুপ করে বসে পড়তে হয়। তারপর , তারপর হঠাৎ হুউউশ --- লালবারান্দা আমাকে নিয়ে যায় গড়ের মাঠে, সেই যে সবুজ ঘাসের মধ্যে পা  ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে দুটো মেয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে … 'পাপাসা মামাসা আইসক্রিম'।  আমার খুব লোভ হচ্ছে, কিন্তু জিজি তো কিনে দেবে না, মা জানতে পারলে ভীষণ বকবে যে জিজিকে।  জিজি একটা কোয়ালিটি আইসক্রিমের কাপ কিনে দেয়।  কুটুবাবু বলে দৌড়ো দেখি কত জোরে দৌড়োতে পারিস?

    কিন্তু আমার চোখ ঐ দুটো মেয়ের দিক থেকে নড়ে না … ঐটাই কি পাপাসা মামাসা? গোখেল ইস্কুলে শর্মিষ্ঠা খেয়ে এসে বলেছিল প্রথমে, তারপরে তো মৌসুমি, সুলগ্না, দেবলীনা, দেবযানী সংঘমিত্রা সব্বাই খেয়ে ফেলল।  ঐ আইসক্রিমের সাথে নাকি পেন্সিলবাক্স দেয়।  শর্মিষ্ঠা একটা নিয়েও এসেছিল সাদা রঙের বাক্স, বটলগ্রিন ঢাকনা, ভেতরে কি সুন্দর আইসক্রিম আইসক্রিম গন্ধ।  জিজি বলে  ওসব বাজে খাবার, সবচেয়ে ভাল হল কাসাট্টা আইসক্রিম, কুমড়োর ফালির মত প্লেটে করে আসে।  বলতে বলতেই দ্যাখো লালবারান্দা কেমন কোয়ালিটি রেস্টুর‍্যান্টে নিয়ে চলে এল।  সেখানে কিন্তু আমি কাসাট্টা খাই নি, সেখানে তো খেতে হয় টুটি ফ্রুটি।  এই এত্তবড় গ্লাস, আধখানা ফলের টুকরোয় ঠাসা আর বাকীটা আইসক্রিম।  সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পরে বাবা বসে বসে অর্ডার দিচ্ছে আর আমরা কত্তজন, আমি, ভাই, মা, জিজি, দাদা, মীনামা, ছোড়দি সব্বাই সাদা চাদরপাতা টেবিলের চারিদিকে বসে আছি।  ঘরটার ভেতরে কি সুন্দর ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আর আইসক্রিমের গন্ধ।  গ্লাসটা একটা প্লেটে বসিয়ে দিয়ে যায়,  পাশে একটা ফুল আঁকা ছোট্ট কাগজের রুমাল, একটা পাতলা ফিনফিনে ছোট্ট ছোট্ট চৌকো চৌকো খুপরিকরা বিস্কুট আর লম্বা হাতলের স্টীলের চামচ।  

    দ্যাখো দ্যাখো অমনি আবার গড়ের মাঠে ফেরত … মা'র সাথে ট্রামে করে আমি আর ভাই বাড়ী যাব।  যাহ বাবাকে ভাল করে দেখতেই পেলাম না তো।  কেমন যেন দেখতে ছিল?  ঐ দেয়ালের ছবিটার মত কোট প্যান্ট টাই পরা?  হ্যাঁ অমনিই তো লাগত  অফিস যাবার সময়।  সেই যে আমি খাটে চড়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে দুইগালে চুমু খেয়ে বলতাম 'চুমু চুমু আদর আদর সাবধানে যাবে সাবধানে আসবে।'  আমার দেখাদেখি ভাইও করত, ভাইয়ের জন্য বাবাকে আবার অনেকটা নীচু হতে হত। ভাই তখন ‘র’ বলতে পারত না, বলত আদন আদন।   বাবা তো ভীষণ ঘামত, গাল দিয়ে একেবারে ঘামের ধারা গড়াতে থাকত,  সেটা আবার হাতে করে মুছিয়েও দিতাম।   কে যে শিখিয়েছিল আমাকে এটা!?  মা তো বলে মা শেখায় নি, তাহলে কি জিজি?  কিন্তু কেমন ভিজে ভিজে ছিল বাবার গাল … গায়ে সিগারেটের গন্ধ … চৌকোমত কালোফ্রেমের চশমা।  ধবধবে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পরে বনফুল থেকে আসছে …। ঘামে পাঞ্জাবী লেপটে গেছে বুকপিঠের সাথে।  যাঃ লালবারান্দা আবার দাদুর ঘরের সামনে চলে এসেছে, ঐ যে কে যেন উঠোনের কুয়োয় বালতি ফেলল ঝপাং করে ব্যাস! ম্যাজিক শেষ।

    দীর্ঘ তিন চারমাসের অবকাশ গল্পে গল্পে ম্যাজিকে স্বপ্নে মিলেমিশে দিব্বি কেটে যায়।  মনাইকে আমি কিকিরার গল্প বলি, কাপালিকদের কথা বলি, তারানাথ তান্ত্রিক আর সই মৌরীফুলের কথাও।  ভাগ্যিস মনাই তখন বইয়ের সাথে গপ্পগুলো মিলিয়ে দেখতে যায় নি, গল্পের সাথে মিশে যায় আমার ইচ্ছে, কল্পনা।  সারাবিকেল , সন্ধ্যে পার করে বসে বসে আমরা পরিকল্পনা করি বড় হয়ে কোথায় কোথায় বেড়াতে যাব, অরোরা বোরিয়ালিস দেখতে তো যেতেই হবে আর কিলিমাঞ্জোরোতেও। আর হ্যাঁ শার্লক হোমসের বাড়ীটাও একবার দেখে আসতেই হবে। এদিকে স্কুলের মণীষা দিদিমণির পরামর্শে যেন মা এগারো ক্লাসের একটা ইয়াম্মোটা অঙ্কের বই কিনে এনে আবার গোপালবাবুর কাছে ভর্তি করে দিয়ে এল।  সপ্তাহে দুদিন।  আমার তো একেবারেই ভাল লাগে না যেতে, এদিকে ওঁরও একটু অসুবিধেই হয় বুঝতে পারি।  এগারো ক্লাসের আর কেউই পড়ে না, ফলে ওঁকে আমার অঙ্কগুলোর জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নিতে হয়।  সেই সময়ও ওঁর খুব একটা থাকে না।  অতএব কিছুদিন পরে কোত্থ্যেকে যেন খবর নিয়ে মা আবার গিয়ে নবগ্রামের শেষপ্রান্তে জামতলায় স্ব-স্যারের কাছে ভর্তি করে দিয়ে এল।

    তাও ভাল, ইনি সেই সাত সক্কালে ভোর ছ'টা থেকে পড়ান।  ফলে বিকেলের গল্প মাটি হওয়ার,  দুপুরের গপ্পবই পড়া মাটি হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই।  আর ইনি বলেও দিলেন রেজাল্ট বেরোলে, তারপর পড়াতে শুরু করবেন।  ফলে ক্ষয়ে যাওয়া স্বাধীন দিনরাত্রি আবার ফেরত।  তা এমনই সব উড়োপাতার দিনে সবে যখন আকাশ কালো করে মেঘ জমতে শুরু হয়েছে, কাগজে বেরোল মাধ্যমিকের ফল বেরোনোর সম্ভাবনা।  তখন আবার গেজেট বেরোত, সে আসত স্টেশানে আর ভাগ্যলক্ষ্মী বস্ত্রালয়ের মোড়ে।  সারা কোন্নগর নবগ্রাম ভেঙে পড়ত সেখানে রেজাল্ট জানতে।  শুধু বিভাগ  আর সর্বমোট নম্বর দেওয়া থাকত রোল নাম্বারের পাশে।  বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ খবর এল স্টেশানে  গেজেট এসে গেছে।  মা তাড়াতাড়ি শাড়ি বদলিয়ে দৌড়াল জানতে। আমাকে আবার ঘিরে ধরল সেই ছাই ছাই ভয়টা, যদি না পারি এদের প্রত্যাশা পূরণ করতে? যদি এই অঙ্কবইটা আর কোনও কাজে না লাগে? স্ব-স্যারের কাছে আর না যেতে হয়! আমি জোর করে মনে জোর আনার চেষ্টা করি, না না অঙ্কবই কাজে লাগবে না কেন,  ঠিক লাগবে।  ততকিছু ভাল না হলেও খুব খারাপ নিশ্চয় হবে না।  

    ভাবতে থাকি বাড়ী থেকে চুপ করে পালিয়ে যেতে গেলে সঙ্গে ন্যুনতম কী কী নিতে হবে? কিন্তু …।কিন্তু  কোনদিকে পালাব? কোথাও না পালিয়ে আমি রঙ্গনগাছের দিকে তাকিয়ে পোস্তার ওপরে থাপু হয়ে বসে থাকি। পোস্তাটা রোদের তাতে একদম আগুনগরম হয়ে আছে।  কিন্তু তাও উঠে যেতে পারি না।  চুপ করে দেখতে থাকি থোকাভরা হলদে রঙ্গনের উজ্জ্বল বাসন্তী রঙের ছোট্ট ছোট্ট ফুলগুলো, একটা লম্বাটে নীলকালো মেশানো পোকা ফুলগুলোর মধ্যে দিয়ে দ্রুত যাতায়াত করে।  আমার কেমন ঘুম পেতে থাকে।  আর তক্ষুণি মা এসে গেট খুলতে খুলতে বলে 'তোর তো টেস্টের থেকেও নম্বর কমে গেছে রে।‘  আমার সব ভয় মিথ্যে করে দিয়ে সবাই দেখলাম বেশ খুশী হয়ে গেল।  কেউই এমনকি মা'ও বিশেষ বকাঝকা কিচ্ছু করল না।  সে কি বড়মামা বলল বলে যে 'ভালাই তো হইসে, বেশ ভালা' সেইজন্য?  নাকি আমার ওপরে এত আশা আসলে সত্যি সত্যিই কেউ করে নি, এমনিই চাপে রাখতে বলত?  নাকি আমাকেও ছোটদিরই মতন ভাবত? কে জানে! ঠিক করে বুঝতে পারি না, তবে স্বস্তি পাই, অন্তত আরও কিছুদিন বাড়ীতে থেকে যাওয়া যাবে, বাড়ী থেকেই পড়াশোনা চালানো যাবে।  এক্ষুণি বেরিয়ে গিয়ে রাস্তায় রাস্তায় থাকতে হবে না।

    সবচেয়ে খুশী হল জিজি, মস্তবড় একহাঁড়ি পান্তুয়া নিয়ে সেদিন সন্ধ্যেবেলাই এল।  মা'ও আবার বেরিয়ে গিয়ে রসগোল্লা আর ছানার জিলিপী নিয়ে এল।  আমার বেশ ভাল লাগে, হাল্কা একটু দুঃখ থেকে যায় অবশ্য যে আরো একটু ভাল হলে, এক আধটা লেটার টেটার পেলে, স্টারফার পেলে  এরা সবাই আরো খুশী হত নিশ্চয়।  স্কুলে মার্কশিট আনতে গিয়ে শেষবারের মত দেখা হয় সবার সাথে।  এরপরে বার দুই তিন রীমার সাথে আর একবার শীলাবলের সাথে দেখা হয়েছিল।  বাকী সবাই কোথায় যে টুপটাপ হারিয়ে গেল।  সমাপ্তি জানায় ও রবীন্দ্রভারতীতে ভরতি হবে, কারণ ওখানেই একমাত্র গান নিয়ে পড়াশোনা করা যায়।  গোধুলিও বলে ও-ও চেষ্টা করবে ভরতনাট্যম নাচ নিয়ে পড়ার।  ছায়াবীথিদি ভারী রাগ করেন আমি আর্টস নিয়ে পড়তে চাই না শুনে।  আমার নাকি বাংলা নিয়েই সর্বোচ্চ শিক্ষা নেওয়া উচিৎ।  মণীষাদি জিগ্যেস করেন কোথায় ভর্তি হতে চাও? জানাই শ্রীরামপুর আকনাগার্লসে।  এরপরে শুরু হয় সব জায়গা থেকে ফর্ম আনা, গাদা গাদা অ্যাদমিট কার্ড আর মার্কশিটের কপি কিনে এনে নিজের তথ্যাদি পূরণ করে গেজেটেড অফিসার বা স্কুলের বড়দিকে দিয়ে 'অ্যাটেস্ট'  করিয়ে আনা।

    গলিঘুঁজিতে কেন এমনকি কলকাতার বড় বড় রাস্তায়ও  জেরক্সের দোকান তখনও গজিয়ে ওঠে নি।  বাড়ীতে প্রচুর আলোচনা হয়, স্কুলে না কলেজে কোথায় ভর্তি করা হবে এই নিয়ে।  কলেজে গেলেই যে ফাঁকি দিতে শিখবো এবং পড়াশোনা বিশেষ হবে না, এই নিয়ে মোটামুটি একমত হয়ে সিদ্ধান্ত হয় স্কুলেই ভর্তি হতে হবে।  আকনাস্কুলের সায়েন্সগ্রুপে যে প্রথম লিস্ট বেরোয় তাতে আমার নাম থাকে না, আরো অনেক বেশী বেশী নম্বরেরা থাকে সেখানে।  অতএব ছুটোছুটি শুরু হয় উত্তরপাড়ার একটি স্কুলের জন্য।  এরমধ্যে মা'র কাছে মণীষাদি খোঁজ নেন।  সব শুনে বলেন আকনার প্রথমলিস্টের অনেকেই ভর্তি হয় না, কলকাতার বেথুন , ব্রেবোর্ন ইত্যাদিতে সুযোগ  পেয়ে চলে যায়।  কাজেই সেকেন্ড লিস্টে হয়ে যাওয়ার চান্সই বেশী।  উনি  মার্কশিটের একটা অ্যাটেস্টেড কপি চেয়েও নেন কল্পনাদি, আকনাগার্লসের বড়দির সাথে কথা বলবেন বলে।  আর সেকেন্ড লিস্টের একদম শেষের আগের নামটা আমারই আসে।  জানি না মণীষাদি বলেছিলেন বলেই নাকি এমনিই দ্বিতীয় তালিকার শেষের দিকে নম্বর অনুযায়ীই আমার নামটা এসে গেছিল।  তবে এইবার নিজের পছন্দের স্কুলে যেতে পারব ভেবে আমি ভারী খুশী হয়ে যাই।  আর অঙ্কে তেমন ভাল না হয়েও মণীষাদির,  সেই প্রচন্ড রাগী মণীষাদির  এই অযাচিত ভালবাসা আমাকে অবাক হতভম্ব করে দেয়|

    মাধ্যমিক পাশ করার জন্য মা আমাকে কিনে দেয় একটা ঘড়ি, মা আর বড়মামার সাথে গিয়ে লিন্ডসে স্ট্রীটের একটা দোকান থেকে কেনা হয় কালো ডায়ালের স্টীলের ব্যান্ডওয়ালা এইচ এম টি ঘড়ি।  আমার ইচ্ছে ছিল কালো চৌকো ডায়ালের, কিন্তু চৌকো ডায়াল কালো রঙে পাওয়া যায় না, একটা ছয়কোণা কালো ডায়ালের ঘড়ি কেনা হয়।  বড়মাইমা কিনে দেয় একটা ফোল্ডিং ছাতা, ছেয়েমত নীলরঙের মধ্যে সাদা রঙ দিয়ে ফুল পাতা আর ফড়িং আঁকা|। জিজি একটা শাড়ী কিনে দেয় আর কতগুলো যেন গল্পের বই।  স্কুলে নেবার নতুন ব্যাগ হয় আর মান্থলি টিকিট।  ট্রেনে করে শ্রীরামপুরে যেতে হবে, সেখানে স্টেশানে নেমে ৩ নম্বর বাসে চেপে যেতে হবে বটতলা, ভাড়া ২৫ পয়সা।  এতদিনে তাহলে ভাগাড়পাড়া স্কুল থেকে একেবারে ছুটি।  আর যেতে হবে না ঐ গন্ধের মধ্যে দিয়ে,  আর পশ্চিম থেকে হাওয়া বইলে দম আটকে বসে থাকতে হবে না,  আর দেখা হবে না ধোপার পুকুরভর্তি বেগুনী রঙের চুড়োমত কচুরিপানার ফুল, মিনুদির মস্ত মস্ত দাঁত আর মস্ত চওড়া সিঁথি, শোনা হবে না টীচার্সরুমের বড় বড় জানলার লোহার রডের ফাঁক দিয়ে কাক ঢুকে দিদিমণিদের কারোর রসগোল্লা বা শিঙাড়া নিয়ে গেলে সমবেত হইহই চীৎকার, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আগে ক্লাস নাইনের ঘরে শান্তিদির রিহার্সাল করানো, নাকে আসবে না ভাঁটফুল আর আশশেওড়া পাতার জংলা গন্ধ।  

    মনাই আর আমার স্কুল আলাদা হয়ে গেল, আর ক্লাসের ফাঁকে, টিফিনের সময়, রাস্তায় যেতে আসতে  গল্প হবে না।  অপেক্ষা করে থাকতে হবে সেই দুজনে বাড়ী ফেরার পর বিকেলের একটু টুকরো যদি পাওয়া যায় সেইটুকুর জন্য।   আকনাস্কুলের বাড়ীটা কেমন দুর্গের মত, লাল রঙের দুর্গ।  ভেতরে একটা ছোট্ট মাঠের মত আছে, তাতে ছোটক্লাসের মেয়েরা খেলে।  এগারো বারোর আমরা কি আর খেলার সময় পাব! কতসব অচেনা মেয়েরা আসবে আমার ক্লাসে, ওরা কি জানবে আমি ওদের থেকে অনেক কম নম্বর পেয়েছি? আরো একজন অবশ্য আমার থেকেও একটু কম পেয়েছে, তবুও।  একসময় যে স্কুল প্রাণপণে ছেড়ে যেতে চেয়েছিলাম, কবে যেন সে আস্তে করে সরু সরু কটা শিকড় চারিয়ে দিয়েছিল আমার ভেতরে।  হাল্কা টানে তাকে ছিঁড়তে উসুম কুসুম ব্যথা জাগে বুকে।  ইচ্ছে করে না নতুন স্কুলে যেতে, কিন্তু এখন তো জানিই যে যেতে আমাকে হবেই।  সামনে যা আসবে যেমন যেমন আসবে তেমনি তেমনি দেখে দেখে যেতে হবে।  এই ঘড়ি, এই ছাতা, এই নতুন কড়মড়ে লালপাড় সাদা শাড়ি, মা'র কিছুটা উদ্বেগ, ভরসা, আশা মেশানো ভুঁরুর তিনটে খাঁজ,  মণীষাদি, অঞ্জলীদি, ইরাদি, মীরাদি, শান্তিদি, শৈলদি, পদ্মাদির সস্নেহ হাসি, মনাইয়ের অগাধ ভরসা 'তুই ঠিক দারুণ কিছু একটা হবি',  এইসব দুইহাতে সাপটে ধরে আমাকে  এগিয়ে যেতে হবে।
     
    (চলবে)

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ০১ মার্চ ২০২৬ | ১২৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বাতী রায় | 2402:3a80:4304:fb1f:3873:fff:fe67:***:*** | ০১ মার্চ ২০২৬ ১৯:৩৩738907
  • তোমার লেখা নিজের কাঁথা চাপা দেওয়া স্মৃতি গুলোকে ফের সামনে নিয়ে আসে। আবার রোদ খাইয়ে ঝেড়ে ঝুড়ে উল্টে পাল্টে দেখতে ইচ্ছে করে সেগুলোকে, আবার ভয় ও করে কত অপ্রিয় জিনিসের মুখোমুখি হতে হবে ভেবে। 
  • kk | 2607:fb91:4c1f:10de:8549:4fd9:331c:***:*** | ০১ মার্চ ২০২৬ ২০:৪২738908
  • এই গন্ধ দিয়ে দুপুরগুলোকে বোঝানো, খুব ভালো লাগলো। এই পর্বটা আমার নিজের ছোটবেলার ছবি কিছু তুলে আনলো। আমারও একজন কাজলকাকু ছিলেন, ঠাকুমা ঐ রকম পানের ডাবর নিয়ে বসতো, কালো চৌকো ডায়ালের ঘড়ির শখ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন