দেখা না দেখায় মেশাঃ পর্ব ১৫
স্বপন যদি ভাঙিলে রজনী প্রভাতে
“তুমি আমাকে কী করেছ মোহিনী? আমি যে এখনও ঠিক করে দেখতে পাচ্ছি নে। সব কেমন ছায়া ছায়া অস্পষ্ট”।
“অবিনাশ স্যার! চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকুন। আমি আপনার চোখে কোল্ড কম্প্রেস করে দিচ্ছি। জোর করে চোখ খুলে দেখার চেষ্টা করবেন না।
তাতে ক্ষতি হতে পারে”।
আমি চোখ বুজে ফেলি। কপালের উপর দুটো শিরা দপদপ করছে। মাথাটা ধরে আছে, আর কানের ভেতর একটা ভ্রমরগুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি।
যেন কোন যোগগুরু ভ্রামরী শেখাচ্ছেন।
ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে গেল।
একটা ছোকরা, সে নাকি থানার বর্তমান ওসি হালদারের ভাগ্নে, আমার গলায় ছুরি ধরেছিল আর মোহিনীকে বলছিল এক পা দু’ পা করে পিছিয়ে
কিচেনে ঢুকে নিজেকে বন্ধ করে রাখতে।
কিন্তু মোহিনী এগিয়ে এল আর মাটিতে হাঁটু গেড়ে বজ্রাসনে বসে জোড়া হাত বাড়িয়ে কিছু একটা করল, যেন মন্তর পড়ল বা অমনি কিছু।
তারপর ফস্ করে সাদা আলোর ঝলক! ব্যস্, আর কিছু মনে নেই।
কিন্তু আমার কী হয়েছিল?
মোহিনী বোধহয় ওর আত্মরক্ষার ম্যানুয়াল অনুযায়ী গুণ্ডামত ছেলে্টাকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়েছিল।
স্ট্যাটিক শক না কী যেন? ওরা বোধহয় পালিয়ে গেছে। বেশ হয়েছে। উচিত শিক্ষা পেয়েছে। সব রোয়াব বেরিয়ে গেছে।
যা, থানায় গিয়ে তোর মামার কাছে রিপোর্ট করগে’ ! আমার তাতে কচু হবে। সব রিপোর্ট আগেই ক্লিয়ার হয়ে গেছে।
তবে সুপ্রিয়র সংগে ছাড়াছাড়ি না হলেই ভাল হত।
আমার কী হয়েছে? আমি কেন দেখতে পাচ্ছি না? কেন শুয়ে শুয়ে কোল্ড কম্প্রেস নিতে হচ্ছে?
হ্যাঁ, খাটে শুয়ে আছি। মোহিনী পাশের চেয়ারে বসে আমার চোখে কোল্ড কম্প্রেস করে দিচ্ছে। অনেকটা রীমার মতন?
না, না; একেবারেই নয়। কোথায় রীমা—আমার বৌ, আর কোথায় মোহিনী—একটা যন্ত্রমানবী।
ওর নিজের কোন বুদ্ধি নেই, অনুভূতি নেই। ও আমার আদেশ মেনে চলে।
একথাটা কি রীমার সম্বন্ধে বলা যায়?
আদেশ! হুঁঃ। রীমা রেগে যেত না, হেসে উড়িয়ে দিত। তারপর বলত –সোয়ামীজি? মাস্টার? প্রভূজি?
আরে হেসে বল, ভাল করে বল। অনুরোধ কর। বল—রীমাজি, কৃপয়া এক পেয়ালা চায় পিলাইয়ে। ব্যস্ তুরন্ত কাম হো জায়েগা।
কিঁউ, শাদী কে পহলে জব হাথ মাঙ্গনে আয়ে থে তব নীল ডাউন হয়ে থে কি নহীঁ?
হ্যাঁ, সত্যি কথা।
হাঁটু গেড়ে বসে হাত বাড়িয়ে নাটুকে ঢঙে বলেছিলাম—মিস্ রীমা সাঙ্গোয়ান, উইল ইউ ম্যারি মী?
রীমা খিলখিলিয়ে হেসে হাত ধরে বলেছিল –ইয়েস! বাট অন ওয়ান কন্ডিশন।
আমি ভ্যাবাচাকা। বিয়ে করবে আবার শর্ত মেনে?
এটা কি প্রজাপতির নির্বন্ধ, নাকি বাড়িভাড়ার লীজ—এটা চলবে না, ওটা চলবে না, প্রতি মাসের অমুখ তারিখ নাগাদ-----।
আরে ভালোবাসা কি অমন দিনক্ষণ মেনে পাঁজিপুঁথি দেখে হয়?
রীমা আবার হাসে।
--কী হল বাবুমশায়? ঘাবড়ে গেলে? না, না। আমি কোন পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানো শর্তের কথা বলছি না।
এবার শুনে নাও। আমরা বন্ধু, সমান সমান। তাই কোনদিন জোরজবরদস্তি করবে না।
আর যদি কোনদিন গায়ে হাত তুলেছ--, সম্পর্ক সেদিনই শেষ।
আরে, আমরা বন্ধু তো, এক হী শর্ত দোনোঁ পর লাগু। ক্যা, রাজি? জোরসে বোলো!
আমি ওকে জড়িয়ে ধরি। ফিসফিসিয়ে বলি—রাজি! রাজি! আর আমার ভেতর থেকে একটা কান্না উথলে ওঠে।
আমি ওর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে থাকি, মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বেরোতে থাকে—রাজি! রাজি! রাজি!
ও আমার পিঠে হাত বোলায়।
একটু পরে বলে—হয়েছে! হয়েছে! এত কান্নার কী আছে? এইজন্যেই বাঙালী বিয়ে করতে চাইছিলাম না। বড্ড ছিঁচকাদুনে।
--না, তুমি বলেছিলে বাঙালী ছেলেরা দাঁত মাজার সময় জিভ ছোলে না। ওদের চুমু খাব কী করে! তখন থেকে আমি জিভ ছোলা শুরু করেছি।
এবার দুজনেই হেসে ফেলি।
রীমার সকালে ওঠার বাতিক ছিল। চাইত –আমিও উঠে হাঁটতে বেরোই, অন্ততঃ আধঘন্টা। তবে জোরাজুরি করত না।
তৈরি হয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে গুনগুন করত—জাগো মুসাফির, ভোর ভয়োঁ! অব রয়ন কহাঁ ---।
আহা, সকালবেলার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলে! একটু বেড টি পেলে--।
কিন্তু রীমার বাতিক—ব্রাশ করে আসতে হবে। আছোঁচা মুখে চা খাওয়া চলবে না।
এটা কি জবরদস্তি নয়? উঁহু, ডিসিপ্লিন আর জবরদস্তির মাঝে একটা লাইনটানা আছে।
আরে, মোহিনীও তো অমন জবরদস্তি করে।
অবিনাশ স্যার, এতটার সময় থাইরয়েড, অমুক সময়ে নাস্তা। তারপরে আধঘন্টা হেঁটে আসা।
তাহলে? যন্ত্রমানবী মোহিনী আর জীবনসঙ্গী রীমার মধ্যে তফাৎ কোথায়?
আছে। মন দিয়ে শোন। রীমার গায়ে হাত তুললে সম্পর্ক শেষ। কিন্তু মোহিনীর গায়ে হাত?
পাগল নাকি! তবে সম্পর্ক ভাঙবে না। ও যে আমার হুকুমে চলে, আমি ওর প্রভু।
আমি কি তাই চেয়েছিলাম? এক খুল-যা-সিম- সিম হুকুম তামিলের অপেক্ষারত যান্ত্রিক আলাদিন!
না না, আরেকটা বিরাট তফাত আছে। রীমার কাঁধে মাথা রেখে কেঁদেছি, একাধিকবার। রীমাও কেঁদেছে—একবার, ওর বাবা মারা গেলে।
কিন্তু মোহিনীর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা? অসম্ভব।
অথচ বিজ্ঞাপনে তাই লেখা ছিলঃ “কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা যায়”!
সেটা দেখেই তো “আশ্চর্য প্রদীপ” কোম্পানিতে ফোন করেছিলাম। সেসব কবে ‘রাত গয়ী, বাত গয়ী’ হয়ে গেছে।
যাক গে, আপাতত মোহিনীকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। এখন মাথাব্যথা করছে না।
কখন চোখ খুলতে পারব? পারব তো?
কপালে মোহিনীর কঠিন হাতের ছোঁয়া—“অবিনাশ স্যার, চোখ খুলুন। ধীরে ধীরে, সইয়ে সইয়ে।
দেখবেন, আপনি ঠিক হয়ে গেছেন”।
গলার সুর আমার কানে কেমন লাগল। ঠিক নৈর্ব্যক্তিক যান্ত্রিক আওয়াজ তো নয়। নাকি আমারই ভুল?
আর কী টাইমিং! ও যেন আমার মনের কথা শুনতে পেয়েছে।
দেখতে পাচ্ছি! দেখতে পাচ্ছি! কী আনন্দ!
অফ হোয়াইট দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো যামিনী রায়ের গর্বিতা রাজকুমারী—কেমন ভুরু তুলে মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে।
দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম দুলে চলেছে। টিভিতে কোন বিজ্ঞাপন, কিন্তু মিউট করে রাখা। আর?
আমার উপর ঝুঁকে রয়েছে মোহিনীর চিন্তিত মুখ। চিন্তিত?
বাঃ মালিকের অসুস্থতায় চিন্তা হবে না? ওর অভ্যেস হুকুম মেনে চলা।
কিন্তু হুকুম দেয়ার লোকই যদি না থাকে? ওর ম্যান্ডেটে আমার সুরক্ষার ব্যাপারটাও আছে যে!
মোহিনী এক কাপ হরলিক্স মেশানো গরম দুধ দেয়। ধীরে ধীরে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দেয়।
হ্যাঁ, ওই স্ট্যাটিক শক্ ! সাদা ম্যাগনেসিয়াম আলোয় ঝলসে ওঠা তির ছেলেটার সংগে সোজা আমার কপালেও লেগেছিল। উপায় ছিল না।
গুণ্ডা ছেলেটা যেভাবে আমাকে পেছন থেকে ধরে গলায় ছুরি ধরেছিল!
আমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। যখন ঘুম ভাঙলো তখন বাইরে অন্ধকার নেমেছে।
বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মোহিনী। কী হয়েছে?
--অবিনাশ স্যার, আপনি এখান থেকে চলে যান।
মানে? এটা আবার কীরকম কথা! আমাকে নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে? কোথায় যাব? কেন যাব?
--কথা শুনুন অবিনাশ স্যার। এ’বাড়ি ছেড়ে চলে যান। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এখান থেকে দূরে চলে যান। অনেক দূরে।
--কেন?
--আপনার উপর হামলা হবে, আর আমার উপরও। হয়ত আজ রাতেই।
--সেকী? কে হামলা করবে? আমরা কার কী ক্ষতি করেছি?
--করবে ওই ছেলেগুলো, ওসি হালদারের ভাগ্নে। আসল প্ল্যানিং পুলিস অফিসার হালদার বাবুর। রাগটা আমার উপর।
দুজনেই আমার কাছে নাজেহাল হয়েছে। এখন বদলা চাই।
--আর আমি? আমার অপরাধ?
--আপনি যে আমাকে এখানে এনেছেন। সেটাই যথেষ্ট।
- তু-তুমি এত সব জানলে কী করে? কে বলেছে?
--কেউ বলেনি। আমি বিপদের গন্ধ পাই। এটার শক্তি আমার মধ্যে দেয়া আছে।
ছেলেটার শরীর থেকে একটা কিলার টক্সিনের গন্ধ বেরোচ্ছিল।
এটা শরীরে বেশিমাত্রায় তৈরি হলে মানুষ খুন করে, তখন শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যায়। তারপর মানুষটা স্বাভাবিক হয়।
তাই বলছি হাতে সময় নেই, চটপট তৈরি হন।
ওয়ালেটে টাকা, আধার কার্ড, ব্যাংক কার্ড নিন। একটা কেবিন ব্যাগে অল্প জামাকাপড় গুছিয়ে নিন।
ওষুধের পাউচ ও প্রেসক্রিপশন আমি গুছিয়ে দিচ্ছি।
--কোথায় যাব?
--তা জানিনা। যতদূরে যেতে পারেন। যাতে হালদারের থানা কিছুদিন আপনার খোঁজ না পায়!
সামনের গেট দিয়ে বেরোবেন না। মনে হয় ওরা নজর রাখছে। অন্ধকারে পেছনের পাঁচিল টপকে ঘাসের উপর লাফিয়ে পড়ুন।
এটা ওরা ভাববে না। হাঁটতে থাকুন যতক্ষণ না বাসরাস্তায় পৌঁছে যান।
--আমি আ আ-মি ওসব পারব না। এই বয়সে পাঁচিলে চড়া কঠিন, টপকানো দূরের কথা।
--আরে ঘাবড়াচ্ছেন কেন? বাগানের পাঁচিল বেশি উঁচু নয়। আমি আপনাকে ধরে পাঁচিলের উপর তুলে দেব। আপনাকে খালি গড়িয়ে নেমে যেতে হবে।
বাসরাস্তায় পৌঁছে যে গাড়ি পান—অটো, মোটর, ট্যাক্সি বা বাস – তাতে উঠে পড়ুন। তারপর রেল স্টেশন। কাছেরটা নয়, দুটো স্টেশন ছাড়িয়ে।
সেখানে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠুন। অন্য রাজ্যে চলে যান। আপনার কাছে কার্ড আছে, ওয়ালেটে টাকা। ট্রেনের টিকিট কাটুন- জেনারেল কম্পার্টমেন্টের।
--এই বয়সে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে?
--তা জানি। কষ্ট হবে। কিন্তু এই এলাকা থেকে বেরোতে হলে তাই করতে হবে।
কোনরকমে দু’একটা স্টেশন পেরিয়ে প্রথম যে জংশন স্টেশন পাবেন, নেমে পড়বেন। সেখান থেকে অন্য ট্রেনে এসি কোচের টিকিট নেবেন।
আপনার কাছে টাকা আছে। ক্যাশ পেমেন্ট করবেন, ডিজিটাল নয়।
--আর তুমি?
--আমি?
মোহিনী হাসল। মানে ওর মুখোশের মত মুখে ঠোঁট কিঞ্চিৎ বেঁকে গেল, গালে ভাঁজ পড়ল। একে যদি হাসি বলা যায়।
তাতে কী? এতদিনে এই প্রথম। আমার কেমন যেন খটকা লাগল।
এ কোন মোহিনী? আমার অজ্ঞান অবস্থায় অন্য কেউ আসল মোহিনীর জায়গা নিয়েছে?
ধ্যাৎ, তা কী করে হয়? এটা কেবল মাত্র ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ কোম্পানি করতে পারে। সেটাও ছ’মাস পরে, এবং আমি রিকোয়েস্ট পাঠালে।
ছ’মাস কি হয়ে গেছে? মাথার ভেতরটা ভোঁ ভাঁ।
মোহিনী হাসছে, নিঃশব্দ হাসি।
বলল, “আমার এখান থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও যাবার ম্যান্ডেট নেই”।
আমি মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করি।
--“শোন মোহিনী, আমি যদি তোমাকে এখান থেকে চলে যেতে আদেশ করি? তোমার সুরক্ষার খাতিরে? তোমার বিপদের আশংকায়”?
--“অবিনাশ স্যার, সরি। এটা আপনার কাজ নয়। ম্যানুয়ালে নেই।
আমার একটাই কাজ –আপনার সুরক্ষা। নিজের জন্যে? ওই যতটুকু স্টেপ বলা আছে”।
--“যদি আমি না যাই? তোমাকে একলা ফেলে—“!
মুহুর্তের মধ্যে মোহিনী আগেকার সেই যান্ত্রিক রোবো নারী হয়ে যায়।
--“অবিনাশ স্যার। ছেলেমানুষি করবেন না। আমি মানুষ নই, রোবো। আপনি কথা না শুনলে আমি আপনাকে বাঁচাতে পারব না।
হাতে বেশি সময় নেই। রাত বারোটা বেজে গেছে। আর দু’ঘন্টা।
আমার চার্জ ফুরিয়ে গেলে আমি অচল হয়ে পড়ব। আপনাকে হেল্প করতে পারব না”।
কথাটা একেবারে বিশ হাজার ভোল্টের শকের মত লাগল। আমি কথা না বাড়িয়ে গোছগাছ করতে শুরু করলাম।
আধঘন্টার মধ্যে প্যাকিং শেষ, আমি তৈরি। এবার পেছনের দরজাটা খুলে বাগানে যেতে হবে।
কী মনে হল, ফিরে এসে রীমার একটা ছোট পাসপোর্ট সাইজের একটা ফটো ব্যাগের ভেতরের পকেটে ঢুকিয়ে নিলাম।
শেষবারের মত ঘরগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে মনে পড়ল—এই বাড়ি আর বাগান-- রীমা কত শখ করে বানিয়েছিল।
এবার আমি ওয়ার্ডরোব খুলে রীমার জামাকাপড় বের করে বিছানায় ছড়িয়ে ফেলে তার উপর মুখ গুঁজে শুয়ে রইলাম।
এখনও কাপড়ে ওর শরীরের মৃদু গন্ধ লেগে আছে।
আমার শরীর কাঁপছে; ভেতর থেকে একটা কান্না উঠে আসছে।
না, ঠিক কান্না নয়, একটা বমির ভাব ও পেটে মোচড়। কিন্তু আমাকে কাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে মোহিনী।
“উঠুন স্যার। চটপট আমার সংগে বাগানে চলুন। সময় নেই, ওরা আসছে। আমি মাটিতে ভাইব্রেশন টের পাচ্ছি”।
ও আমাকে প্রায় হিঁচড়ে নিয়ে যায় বাগানে, পাঁচিলের কাছে। হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয়।
বোঝায়—আগে আমাকে পাঁচিলে তুলে নীচে ঠেলে দেবে, তারপর আমার ব্যাগটা।
এইসময় আমার মনে হল কোথাও যদি ভগবান থাকেন তাহলে মোহিনীকে রক্ষা করুন।
ও আমাকে পাঁচিলের সমান উঁচুতে তুলে ধরে। তারপর থেমে যায়। পাঁচ সেকেন্ড।
আমাকে টানতে টানতে ফেরত নিয়ে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে দ্রুত হাতে সামনে পেছনের দুটো দরজাতেই পেল্লায় দুটো তালা লাগিয়ে দেয়।
--“দেরি হয়ে গেল, অবিনাশ স্যার। ওরা এসে গেছে”।
বলার দরকার ছিল না। পাঁচিল সমান উঁচুতে তুলে ধরায় আমিও দেখতে পেয়েছি।
আধমাইল দূর থেকে বেশ কিছু লোক মিছিল করে আসছে। তাদের হাতে জ্বলন্ত মশাল।
আমার হাত পা থরথর করে কাঁপে। এবার কী হবে? এ যেন সমুদ্র দেখতে গিয়ে সুনামির সংগে দেখা।
মোহিনীর চোখের পাতা ফরফর করে। ও আমাকে আমার বেড রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে, “অবিনাশ স্যার, খাটের নিচে ঢুকে পড়ুন। মোবাইল হাতে নিন।
আমার চিৎকার শোনা মাত্র কল করবেন ১১২ নম্বরে। বলবেন আর্জেন্ট। বলবেন ডেঞ্জার।
লোকেশন জানিয়ে দেবেন। বলবেন বড় দল আগুন লাগাতে আসছে”।
--“কিন্তু পুলিশ তো ১০০ নম্বর”!
--“অবিনাশ স্যার। মন দিয়ে শুনুন। ১০০ নম্বরে ফোন করলে যাবে স্থানীয় থানায়, হালদারদের কাছে। ওরা আসবে না।
১১২ নম্বরে কল করবেন। এটা কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে। ৯১১ মডেলে। সেন্ট্রাল ফোর্স। রেডি হয়ে যান -ওরা আসছে।
আপনার কামরার ভেতরে ছিটকিনি তুলে খাটের নীচে যান—শিগগির। বাকি আমি দেখছি”।
মশাল নিয়ে দশজনের দলটি বাড়ির পেছনে পাঁচিলের আড়ালে মাটিতে বসে আছে। কয়েকটা মশাল মাটিতে পোঁতা। কয়েকটা নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির সামনের দিকে। পেছনের দলটি পাঁচিল টপকে ভেতরে যাবে।
ওরা ভেতর থেকে বাইরের ঘরের দরজা খুলে দিলে তারপর ওই তিনজন ঢুকবে। তার আগে ঘাপটি মেরে থাকবে, অপেক্ষা করবে।
পেছনের দল পাঁচিলে চড়তে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু দলের নেতাটি নিরস্ত করে। ও হাতঘড়ি দেখছে। এখনও দুটো বাজতে মিনিট দশেক বাকি।
ও উত্তেজিত দলটিকে বলে, “মামু বলেছেন রাত দুটোর আগে না ঢুকতে। দুটোর সময় ওই ডাইনিটার ব্যাটারি ফুরিয়ে যায়, ও অচল হয়ে পড়ে।
তার আগে ঢুকলে—না, না”।
--গুরু, খামোখা ভয় খাচ্ছ। ওই খানকিটার যতই ক্ষ্যামতা হোক, আমরা সাতজন। একসঙ্গে চার্জ করলে ও পারবে না।
আমরা ওর হাত-পা বেঁধে বাগানে এনে একটা গাছ থেকে ঝুলিয়ে দেব। তারপর ওকে জ্বালিয়ে দেব। ও পুড়তে থাকবে, একটু একটু করে।
--তারপর দেখে নেব ঢ্যামনা বুড়োটাকে। বাঞ্চোতের সব রস বেরিয়ে যাবে।
ও তোমাকে বাড়ি বেচে দিয়ে বনবাসে যাক গে। আপদ চুকলে ওর বাড়িতে আমাদের ক্লাবঘর হবে।
-- ফ্যান্টাস্টিক! লোকে বিয়েবাড়ির জন্যে ভাড়া নেবে। আর পটলার কাজের মাসির মেয়েটা এটার কেয়ারটেকার হবে। তাই না রে?
--গুরু, আমাদের কেসটার একটা মারকাটারি নাম দাও। অপারেশন উইচ হান্ট বেশ খাপে খাপ!
--চোপ্! যত বাতেলাবাজ গান্ডু জুটেছে। এক মিনিট বাকি। আমরা এখনই স্টার্ট করছি। পাঁচিল টপকে বাগানে গিয়ে পেছনের দরজাটা ভেঙে ঢুকতে ঢুকতে আরও দশ মিনিট। ততক্ষণে ডাইনি মাগী চার্জ ফুরিয়ে কেলিয়ে পড়ে থাকবে।
কিন্তু সব কিছু সহজ হিসেব মেনে হয় না।
পেছনের দরজাটা বেশ শক্ত, আর ভেতরে দরজার গায়ে একটা টেবিল, গ্যাসের সিলিন্ডার, জলভরা বালতি ঠেকানো ছিল।
মিনিট কুড়ি লেগে গেল।
ওরা মশাল আর লোহার রড নিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখল—অন্ধকার ঘরে সুইচবোর্ড থেকে একটা নীল আলোর আভাস।
দেয়ালের কাছে সুইচবোর্ড ঘেঁষে একটা চেয়ারে বসে আছে একটি নারীর আকৃতি। কেমন যেন ছায়া ছায়া শরীর।
নড়ছে না, ওদের দিকে তাকানো তো দূর! ওরা এগোয় না। একজন আরেকজনের হাত খিমচে ধরে।
কিন্তু হালদার-ভাগ্নে পটলার হাতে একটা রড ধরিয়ে ঠেলে দেয় ছায়ামূর্তির দিকে। পটলা মূর্তির পিছন দিক থেকে এগোয়।
কাঁপা কাঁপা হাতে রড বাগিয়ে ধরে ওর মাথার উপর তুলে থেমে যায়। হাতের কাঁপুনি বেড়ে যাচ্ছে।
আরও কয়েকজন সাহস করে এগিয়ে এসেছে। বল্টু ফের একটা ঠ্যালা মারে। কিন্তু পটলার হাতের রড হাত থেকে ছিটকে পড়েছে।
আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়েছে ছায়ামূর্তি। ওর চোখ ধকধক করে জ্বলছে।
নমস্কারের ভঙ্গিমায় এগিয়ে আসা জোড়া হাত থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে নীলচে আলোর কণা। কঁকিয়ে ওঠে পটলা।
--ডাইনিটা আমায় মেরে ফেলল!
বল্টু ছায়ামূর্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। খেয়াল করেছে যে চার্জিং প্লাগ সকেট থেকে আলগা হয়ে গেছে।
আচমকা ওর হাতের রড মোহিনীর মাথায় জোরে আঘাত করে—ঠন্ করে শব্দ।
মোহিনী আবার ওর জোড়া হাত বল্টুর দিকে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু কোন আলোককণা কোন স্পার্ক বেরোয় না।
বল্টু চেঁচিয়ে ওঠে, “আরে ওর চার্জ ফুরিয়ে গেছে। এবার মার শালীকে”।
অনেকগুলো আঘাত। মোহিনী হাত তোলে আটকাবার জন্যে, তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তার আগে দু’বার বিড়বিড় করে—১১২! স্যার ১১২! ---!
একটা ঘর থেকে অন্ধকারে উচ্চগ্রামে ভেসে আসছে একটি যান্ত্রিক কন্ঠস্বর—১১২! ১১২! ডায়াল কর! ডায়াল কর!
ফের রীমা কথা বলে-- ফোন লাগাও ! ফোন লাগাও! সবকো জাগাও! সবকো জাগাও!
খাটের তলায় শুয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমি মোবাইলে টিপতে থাকি ১১২ ! কেউ বলে -হ্যালো!
আমি ফিসফিস করি-- বিপদ, বড় বিপদ!
ওদিকে দরজায় ধাক্কা পড়ছে। আমি কোনরকমে লোকেশন ম্যাপ পাঠিয়ে দিই।
তখনই দরজাটা ভেঙে পড়ে।
হাসপাতালে বেডে শুয়ে চোখ মেলি। বিছানার পাশে বসে আছে দু’জন। থানার ওসি মিঃ হালদার। আরেকজন সুপ্রিয়।
আমার গলায় একদলা পিত্ত উঠে আসে। সুপ্রিয় তাহলে হালদারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে! আমাকে শিক্ষা দেবে!
আমি বিরক্তিতে পাশ ফিরে চোখ বুঁজি।
হালদার নাছোড়বান্দা। ও বেডের এপাশে ঘুরে এসে বলে—“কেমন আছেন মিঃ সমাদ্দার? আপনার থেকে একটা স্টেটমেন্ট নেবার ছিল”।
আমার পেছন দিক থেকে সুপ্রিয়র গলার স্বর,” সরি মিঃ হালদার। এই অবস্থায় স্টেটমেন্ট নেয়া কি খুব জরুরি?
কেসটা কিসের? কেউ মার্ডার হয়েছে কি”?
“দেখুন, মাঝরাত্তিরে অবিনাশবাবু ২১১ নম্বরে আর্জেন্ট হেল্প চান। লোকেশন ম্যাপ পাঠিয়ে।
দশ মিনিটের মধ্যে ওই নম্বরের ডিস্ট্রেস কল রেস্পন্ডের ফোর্স এসে আপনার বন্ধুর বাড়ি পৌঁছে প্রায় দশজনকে গ্রেফতার করে।
ওদের বিরুদ্ধে মাঝরাতে একজন সিনিয়র সিটিজেনের উপর কোন অজ্ঞাত কারণে মারাত্মক হামলা করার অভিযোগ।
কেস এখন স্থানীয় পুলিশের হাতে। জানতে চাই – সে রাতে ওনার বাড়িতে কী ঘটেছিল”।
--এই স্টেটমেন্ট আপনি কয়েকদিন পরেও নিতে পারেন। অবিনাশ কোথাও চলে যাচ্ছে না।
আমি বন্ড সই করে দিচ্ছি। ও কিছুদিন আমার সল্ট লেকের বাড়িতে থাকবে।
আমি আবার চোখ বুঁজে ফেলি।
হালদার চলে গেছেন। সুপ্রিয় আমার কপালে হাত রাখে, বলে -না জ্বর নেই। সিস্টার, কাল ডিসচার্জ করে দেবেন?
আচ্ছা, ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনুন।
--তুই কী করে খবর পেলি?
--একটা ফোন এসেছিল। অজানা নম্বর, বলছিল – বন্ধুর বিপদ! বন্ধুর বিপদ! ১১২! ১১২!
--তোর বাড়িতে কেন? নিজের বাড়িতে যেতে চাই।
--তোর বাড়ি? দরজাগুলো ভাঙা, লণ্ডভণ্ড।
--মোহিনী?
-ওঃ, সেই রোবো পুতুল? ও এখন নেই হয়ে গেছে। মানে খন্ড খন্ড হয়ে এভিডেন্স হিসেবে থানার মালঘরে জমা আছে।
--তুই রীমার শেষকাজ নিয়ে পুলিশকে কিছু বলিস নি?
--পাগল! আমি তোকে ভালবাসি রে, বিশ্বাস করি। সেদিন ওসব বলেছিলেম হিংসেয়।
মোহিনী তোর আর আমার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছিল। আজ ও নেই, ব্যস্।
আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই।
আবার যাব “আশ্চর্য প্রদীপ" কোম্পানিতে। আরও দুটো ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙব।
আরও উচ্চমানের মডেল চাই। মানে যার কাঁধে মাথা রেখে সত্যি সত্যি কাঁদা যায়।
সে হবে রীমার মত দেখতে। অবিকল। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসব। বলব—‘ক্ষমা কর”।
কিন্তু নম্বরটা? ভুলে গেছি। জানি ফিবোনাচ্চি সিরিজের কোন একটা নম্বর হবে। এই সিরিজ অনন্ত, যার কোন শেষ নেই।
(সমাপ্ত)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।