এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  ঘুমক্কড়

  • একা বেড়ানোর আনন্দে-৩৭ - কুম্ভলগড় 

    সমরেশ মুখার্জী লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | ঘুমক্কড় | ০৭ জুন ২০২৬ | ৭৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ১-মুখবন্ধ | ২-বিদিশা | ৩-ধূবেলা | ৪-গোপেশ্বর | ৫-ধূবেলা পুনশ্চ | ৬-মারকুটে মাস্টারের সাথে | ৭-চান্দেরী | ৮-ফুহারীজী | ৯-করেরা | ১০-সুরয়ায়া গড়ি | ১১-ভাদিয়াকুন্ড-১ | ১২-ভাদিয়াকুন্ড-২ | ১৩-ভাদিয়াকুন্ড-৩ | ১৪-নরোয়র-১ | ১৬-পানহালা | ১৫-নরোয়র-২ | ১৭-কালিঞ্জর | ১৮-দেবপ্রয়াগ | ১৯-দেবগড় | ২০-শ্রেয়াংসগিরি-১ | ২১-শ্রেয়াংসগিরি-২ | ২২-শ্রেয়াংসগিরি-৩ | ২৩-মুক্ত বন্দীশালা-১ | ২৪-মুক্ত বন্দীশালা-২ | ২৫-মুক্ত বন্দীশালা-৩ | ২৬-অনসূয়া দেবী-১ | ২৭-অনসূয়া দেবী-২ | ২৮-অনসূয়া দেবী-৩ | ২৯-ভদ্রেশ্বরের আশেপাশে-১ | ৩০-ভদ্রেশ্বরের আশেপাশে-২ | ৩১-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-১ | ৩২-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-২ | ৩৩-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-৩ | ৩৪-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-৪ | ৩৫-পদব্রজে আউলি | ৩৬-চৌকরি | ৩৭-কুম্ভলগড়
    অনেকদিনের ইচ্ছে
     
    ২০১১ জানুয়ারি‌র মাঝামাঝি এক শুক্রবার। গতকাল বিকেলে উদয়পুর এসেছি অফিসে‌র কাজে। এরপর মঙ্গলবার সকালে কোটায় যেতে হবে। সেটাও অফিসে‌র কাজে‌ই। সোমবার বিকেল টিকিট আছে চেতক এক্সপ্রেসে। মানে শনি, রবি ও সোমবার‌ বিকেল চারটে অবধি ফ্রী। শীতের মরশুমে এমন সুযোগ হেলায় হারানো যায় না।
     
    কোম্পানির ট্র্যাভেল ডেস্ক ঘর দিয়েছে হাতি পোলের কাছে রাজদর্শন লেকভিউ হোটেলে। অবস্থান পিচোলা ও ফতেহ সাগর লেকের সংযোগকারী স্বরূপ সাগর লেকের দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে।‌ সুন্দর লোকেশনে চৌহদ্দি‌র মধ্যে‌ গাছপালা নিয়ে হোটেলটি ১৯৮৪ সালে তৈরী।
     
    আগে দুবার উদয়পুর এলেও অনেকদিনের একটি ইচ্ছা - মহারাণা প্রতাপের জন্মস্থান ঘুরে আসা‌ - হয়ে ওঠেনি। এবার হাতে সময় থাকায় রিসেপশনের ছেলেটিকে সকালে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কুম্ভলগড়ে যাওয়ার বাস কোথায় পাওয়া যাবে? সে বলে, কুম্ভলগড় ৮০ কিমি দূরে একটা একটেরে জায়গায়। ওখানে বাস যায় বলে জানা নেই। চাইলে হোটেল থেকে ইন্ডিকা পাবেন, আসা যাওয়া, ওয়েটিং নিয়ে আড়াই হাজার পড়বে।
     
    ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, আচ্ছা ভেবে দেখি। কিন্তু একাকী ভ্রমণে‌র ক্ষেত্রে রিজার্ভ গাড়ির বদলে নবনীতাদির ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহন’ মুডে জনবাহনে বা হিচহাইক করে বেড়নোই আমার পছন্দ। তা শুধু সস্তাই নয়, তেমন যাত্রায় হয় নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতা।
     
    চিরতাবাবু‌ও তাই বললেন
     
    চারটে নাগাদ কাজ মিটে যেতে গেলাম উদয়পোলের কাছে সেন্ট্রাল বাস ডিপো। কুম্ভলগড়ে যাওয়ার বাসের খোঁজ করতে পুছতাছ খিড়কির কর্মীটি বেজার মুখে জানালেন - কুম্ভলগড়ে কোনো বাস যায় না, গাড়ি‌ বুক করে যেতে হয়। কারণ যাই হোক, লর্ড কর্ন‌ওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো কিছু লোকের মুখ‌ও চিরস্থায়ী বিরক্তিতে কুঁচকে থাকে।
     
    কিন্তু মহারানা প্রতাপের জন্মস্থানে কোনো বাস যায় না? বেশ অবাক লাগে।‌ অথচ ভারতবর্ষকে জনপ্রিয় করতে Incredible India, অতিথি দেবো ভবঃ ক্যাম্পেন হচ্ছে। এসব ক্যাম্পেনের উদ্দেশ্য বিদেশী পর্যটক ও মূদ্রা আকর্ষণ বলেই হয়তো দেশি ব্যাকপ্যাকার শৈলীর পর্যটকদের নিয়ে ভাবার দায় কত্তাদের নেই।
     
    ধুমকেতু‌র দৌলতে বেঁচে গেল আড়াই হাজার
     
    এইসব ভেবে কিঞ্চিৎ বিমর্ষ হয়ে‌ই ফতেহ সাগর বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটছিলাম। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। লেকের জলে পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো। অমন সুন্দর পরিবেশে মনের ভার নেমে যায়। এক বয়স্ক কিন্তু চটপটে ভদ্রলোক হাফপ্যান্ট, টি শার্ট, স্নিকার্স পরে গটগট করে হেঁটে আমায় অতিক্রম করে পিছন ফিরে অমায়িক হেসে বলেন, আপনাকে তো এখানে আগে দেখিনি? নতুন এসেছেন?
     
    বলি, আমি এখানে থাকিনা। অফিসের কাজে এসে সময় পেয়ে এদিকে ঘুরতে এসেছি। উনি বলেন, তা বেশ, তো উঠেছেন কোথায়? বলি, হোটেল রাজ দর্শন, কোম্পানি থেকেই বুক করেছে।
     
    ভদ্রলোক আড্ডা‌বাজ টাইপের। বললেন, ও তাই নাকি! সত্যি কিনা জানিনা, তবে শুনেছি হোটেলটি উদয়পুরের রাজপরিবার, মুম্বাইয়ের ক্রিকেট জগত ও বলিউডে‌‌ও বিশেষ পরিচিত এক হাই প্রোফাইল ব্যক্তি‌ রাজ সিং দুঙ্গারপুর ও তাঁর বিশেষ পরিচিতা লতা মঙ্গেশকরের জয়েন্ট ভেঞ্চার।
     
    আমি আদার ব্যাপারী, ফল খেয়েই খুশি, গাছ না চিনলেও চলে। একথা সেকথার পর জানাই আমার মনোবাসনা এবং চিরতাবাবুর নিদান শুনে মনোবেদনার কথা। উনি বলেন, ঠিক‌ই তো, একা ঘুরতে অযথা আড়াই হাজার দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার মানে‌ হয়না। ডিপো ম্যানেজার আমার বন্ধু, দেখি, ও কী বলে। ডিপো ম্যানেজারকে ফোন লাগিয়ে বলেন, আমার ‘এক বিশেষ পরিচিত’ Mr. Mukherjee এখানে একা এসেছেন। বাসে কুম্ভলগড় যেতে চান।‌ এনকোয়ারি থেকে বলেছে ওখানে কোনো বাস যায় না! একটু গাইড করুন তো ওনাকে।
     
    এই বলে, সদ্য আলাপেই ‘বিশেষ পরিচিত’ হয়ে যাওয়া আমায় ফোন ধরিয়ে দিলেন। ডিপো ম্যানেজার অতি সজ্জন। বলেন, উদয়পুর - যোধপুর রুটে ভলভো থেকে সাধারণ, সব বাস‌ই যায় হাইওয়ে ধরে। কুম্ভলগড় ঐ রুটে পড়ে না। তবে একটাই জেনারেল বাস সকাল সাড়ে পাঁচটায় ভিতরে‌র রাস্তা দিয়ে কেলওয়াড়া হয়ে জয়পুর যায়। ঐ বাসে আপনি কেলওয়ারা যেতে পারেন। ঘন্টা দুয়েক লাগে। ওটাই জয়পুর থেকে ফিরে আসে উদয়পুর। কেল‌ওয়ারা থেকে পাবেন বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। তবে কেল‌ওয়াড়া গাঁও থেকে কুম্ভলগড় কেল্লা আট কিমি। তাই হয়তো এনকোয়ারি থেকে বলেছে কুম্ভলগড়ে কোনো বাস যায় না।
     
    বলি, কেলওয়াড়া থেকে কুম্ভলগড় কিভাবে যাবো? উনি বলেন, তা বলতে পারবো না। ওখানে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রাখি। ভাবি, কিছু না পেলে আসা যাওয়া ১৬ কিমি। বেশ বড় কেল্লাটি দেখতে হয়তো আরো দুই কিমি। তবে ১৮ কিমি ধীরেসুস্থে হাঁটলেও পাঁচ ঘন্টার মামলা। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা - দশ ঘন্টা। হন্টনের সময় বাদ দিলে হাতে থাকবে পাঁচ ঘন্টা। কেল্লা ঘুরে দেখার জন্য যথেষ্ট। আগে‌ও কয়েকবার শীতকালে হেঁটে ঘুরে বেশ আনন্দ পেয়েছি। আগামীকাল চরৈবেতি মন্ত্রে জনবাহনে কুম্ভলগড় যাওয়ার একটা হাল হয়ে যেতে সদ্য পরিচিত ভদ্রলোকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। উনি ধুমকেতুর মত উদয় হলে কুম্ভলগড় যেতে কপালে আড়াই হাজারি গচ্চা ছিল।
     
    নীমচমাতার থান
     
     
    ভদ্রলোকের সাথে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চাই, ডানদিকে ঐ পাহাড়ের মাথায় ওটা কীসের মন্দির? সন্ধ্যে হয়ে আসছে। আলো টালোও জ্বলতে দেখছিনা। এখন কি ওখানে একা যাওয়া ঠিক হবে? উনি বলেন, ওটা দেবী নীমচমাতার মন্দির। অতীতে উদয়পুরের রাজপরিবারের কুলদেবী। স্থানীয়‌দের কাছে খুব‌ই মান্য দেবী। অনেকে ভাবেন অম্বাজী। সুন্দর পথ। ল্যাম্পপোস্ট‌ও আছে। সন্ধ্যায় আলো জ্বলে। রাত ৯টা পর্যন্ত মন্দির ঘোলা। অবশ্যই যেতে পারেন। কোনো ভয় নেই। ওনাকে আর একপ্রস্থ ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত পা চালা‌ই।
     
    ফতেহ সাগর বাঁধের মাঝামাঝি থেকে প্রায় দেড় কিমি ধীর ছন্দে হেঁটে‌ও চড়াই বলে একটু হাঁফ ধরে। মন্দিরের নীচে বসার জায়গায় বসে বিশ্রাম নি‌ই। এখন রোপ‌ওয়ে‌ হ‌ওয়াতে যাদের হাঁটতে অসুবিধা তাদের সুবিধা‌ হবে।
     
     
    ওপরে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। উদয়পুর শহরকে ঘিরে আছে সাতটি প্রধান সরোবর - পিচোলা লেক, ফতেহ সাগর, স্বরূপ সাগর, উদয় সাগর, রঙ সাগর, দুধ তালাই এবং বড়ি তালাও বা জিয়ান সাগর যদিও শেষোক্তটি শহর থেকে একটু দূরে অবস্থিত। এতোগুলি লেক থাকায় উদয়পুর ভেনিস অফ দ্য ইস্ট নামে‌ও পরিচিত। মন্দির চত্বর থেকে দক্ষিণে দূরে পিচোলা লেকের মাঝে আলো ঝলমলে লেক প্যালেস। কাছে ফতেহ সাগরের কিনারা সদ্য জ্বলে ওঠা আলোয় নেকলেসের মতো লাগছে। পূবে উদয়সাগর। পশ্চিম সজ্জনগড় পাহাড়ে মনসুন প্যালেসে‌র দিকে সূর্যদেব অস্ত যাচ্ছে‌ন। মন্দিরে ভক্তদের ঘন্টাধ্বনি, ধূপ ধুনোর গন্ধ - সব মিশে মায়াবী পরিবেশ। জানুয়ারি‌র ঠান্ডা-মিঠে হাওয়ায় পাহাড় শীর্ষে সেই মনোরম মন্দির চত্বরে অনেকক্ষন বসে রইলাম। আকাশে সূর্যাস্ত থেকে গোধূলি - নানা রঙের খেলা দেখে অন্ধকার হয়ে যেতে সাড়ে সাতটা নাগাদ নামতে শুরু করলাম। তখন গোটা পথে আলো জ্বলছে। বেশ লাগলো মাতাজির মন্দির দর্শন। মন শান্তির পরশ বোলানো এমন অনুভূতির সাথে ঈশ্বরভক্তি সম্পর্করহিত।
     
    ZRTI প্রসঙ্গে
     
    মন্দিরের নীচে বেঞ্চে যেখানে জিরিয়েছিলাম, সেখানে‌ অন্য বেঞ্চে চারজন মধ্যবয়সী লোক বসে গল্প করছিলেন। তাদের কথাবার্তায় আগ্ৰহ হোলো। আলাপ করে জানলাম ওনারা‌ লোকো ড্রাইভার। উদয়পুরে রেলের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে - ZRTI (জোনাল রেলওয়ে ট্রেনিং ইনস্টিটিউট)। চারজনে ওখানে ক’দিনের ট্রেনিং নিতে এসেছেন। রেসিডেনসিয়াল ক্যাম্পাসটি আড়াই কিমি দূরে সুখাড়িয়া সার্কেলে। ক্লাসের শেষে বিকেলে এখানে ঘুরতে এসেছেন।
     
    জানলাম ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ZRTI এশিয়ার বৃহত্তম কিছু রেল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পাসগুলির একটি। এমু (EMU) লোকাল, মেট্রো ট্রেন, ডিজেল ও ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ চালকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপারেটিং স্টাফদেরও এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
     
    আগ্ৰহ প্রকাশ করে জানলাম, ভারতীয় রেলে প্রথমে সাইডিং লাইনে শান্টার হিসেবে কাজ করতে হয়। কারণ সেখানে যাত্রীদের প্রাণের দায়িত্ব নেই। তারপর সময়ের সাথে অভিজ্ঞতা বাড়লে ট্রেনিং নিয়ে ALP (Asst Loco Pilot) Goods বা মালগাড়ি‌র সহকারী ড্রাইভার হ‌ওয়া যায়। তার পরে LP-Goods, ALP/LP-Passenger, Express, Superfast, Rajdhani এভাবে পদোন্নতি হয়।
     
    প্রতিবার প্রোমোশনের আগে রিফ্রেশার ট্রেনিং, প্র্যাক্টিকাল ট্রেনিং, সিমুলেশনে টেস্ট, লিখিত পরীক্ষা, মেডিক্যাল টেস্ট ক্লীয়ার করতে পারলে তবেই প্রোমোশন হয়। ভারতীয় রেল ব্রিটিশ অপারেশনাল লিগেসি ফলো করে বলে এ ব্যাপারে খুব‌ই স্ট্রিক্ট। সারা ভারতে বিভিন্ন ডিভিশনে অর্ধশতাধিক ট্রেনিং সেন্টার আছে। সবগুলো ZRTI উদয়পুরের মতো বড়ো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়।
     
    ভালো লাগলো ওনাদের সাথে কথা বলে। এতোদিন ট্রেন লেট হলে রেল দপ্তরের মুণ্ডুপাত করেছি। কিন্তু ধরা যাক হাওড়া থেকে মুম্বাই একটা ট্রেন যাচ্ছে - সেক্ষেত্রে তার প্রেক্ষাপটে কতো রেলকর্মীর কতো রকমের ভূমিকা আছে, কখনো তলিয়ে ভাবিনি। ওনাদের ধন্যবাদ দিয়ে মন্দিরে‌র দিকে একটু যেতে‌ই একজন পিছন থেকে ডাকলেন - বেঞ্চে তো আপনার ক্যামেরা ফেলে যাচ্ছেন। লোকো পাইলটের নজর! পিছিয়ে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আর একপ্রস্থ ধন্যবাদ জানাই। উনি হেসে বলেন, মনের ভুলে হয় এরকম, খেয়াল রাখবেন।
     
    আগামীকালের প্রস্তুতি
     
    নীচে এসে হোটেল যাওয়ার পথে মটরশুটি, গাজর, পেয়ারা আর গুড ডে বিস্কুট কিনি। কালকে ডে ট্রিপের ড্রাই লাঞ্চ। কোথায় কী পাবো কে জানে। তৈরী থাকা ভালো। কুম্ভলগড়ে গিয়ে বুঝেছি সেই প্ল্যানিং কতো কাজের ছিল। নিলাম দশ টাকায় কুড়িটা পার্লে কিসমি মিল্ক টফি। টুকটাক মুখ চালাতে বেশ লাগে। পথে দেখা ছোটদের সাথে ভাব জমাতে‌ও কাজে আসে।
     
    হোটেলে ব্রেকফাষ্ট কমপ্লিমেন্টারি। রুমে এসে ইন্টারকমে জিজ্ঞাসা করি, ভোর সোয়া চারটেয় কি ব্রেকফাস্ট পাওয়া যাবে? সে বলে, সরি স্যার, সাতটার আগে রেগুলার ব্রেকফাস্ট রেডি হয়না, তবে 24Hrs কফিশপে বাটার টোষ্ট, বয়েলড এগ আর কফি বলে দিতে পারি। তাকে হ্যাঁ বলে দিই।
     
    বাইরে এসে একটা দোকানে জিজ্ঞাসা করি, এখান থেকে সকাল পৌনে পাঁচটা নাগাদ অটো পাওয়া যাবে? দোকানি বলে, কুছ অটো ইধর সে যাতি হ্যায় উস ওয়ক্ত টেশন কি তরফ, মিল যায়েগি।
     
    তার আশ্বাসে ভরসা হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে আমি সেফ প্লে করি। রিসেপশনের ছেলেটির কাছে জেনে নিয়েছি সেন্ট্রাল বাস ডিপো আন্দাজ আড়াই কিমি। বাড়িতে নিয়মিত 4% স্লোপে 45 মিনিট ট্রেডমিলে হেঁটে জানি পাঁচ কিমি গতিতে সমতল রাস্তায় আধঘণ্টা হাঁটা কোনো ব্যাপার‌ই নয়। একটু আগে বেরোবো, অটো না পেলে হেঁটেই চলে যাবো। বিশ্বস্ত পদযুগল অর্ধশতাব্দী‌ ধরে আমার ভার বয়ে চলেছে। তাদের ওপর ভরসা করা‌ যায়।
     
    অকপট অটো‌ওয়ালা
     
    পরদিন পৌনে পাঁচটায় বাইরে এসে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকারে, জানুয়ারি‌র ঠাণ্ডায় রাস্তা শুনশান। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে হাঁটা দিলাম। একটু যেতে দেখি একটা অটো আসছে।‌ হাত দেখাতে থামলো। বাসস্ট্যান্ড যাইয়েগা? সত্তর রুপিয়া। বলি, দিনমে তো পাঁচ রুপিয়ামে শেয়ার মে গিয়া থা ইঁহাসে? আভি সত্তর? সে শুধু মিতবাক‌ই নয়, সুরসিক‌ও বটে। তো সুরজ নিকালনেকা ইন্তেজার কিজিয়ে - বলে চলে যায়। হেঁটে যেতে হতে পারে তো ভেবে‌ইছিলাম। তাই হাঁটতে থাকি।
     
    একটু গিয়ে‌ই, অটো থামিয়ে সে মুখ বাড়িয়ে বলে - পচাশ দিজিয়েগা? হয়তো পরদেশীকে সুযোগ পেয়ে লোটার ফন্দিতে কিঞ্চিৎ বিবেকদংশন হয়েছে। বসে পড়ি। এবার সে নরম গলায় বলে, বাবুজি, হমলোগ ভি ওয়ক্ত দেখকে মৌকা ঢুন্ডতে হ্যায়। কিঁউকি সাত বজে কা বাদ চালু রুট মে কো‌ই রিজাভ করকে নেহি যাতা। তব লোগ শেয়ার মে যাতে হ্যায়। অভি ম্যয় যা রাহা হুঁ টেশন সে কিসিকো লেনে কে লিয়ে। আপ মিল গয়ে, হমে ভি পচাশ উপর সে কামানে কা ম‌ওকা মিল গয়্যা। বুরা মত মানিয়ে, বাবুজি।
     
    তার অকপট ভাষণে অভিভূত হ‌ই। সত্যি‌ই তো, ও যা বললো - চারো তরফ বেসুমার ম‌ওকাপরোস্ত ঔর এহসানফরামোশ ইনসান। তাই ওর ক্ষেত্রে‌ গোবরে পদ্মফুল আশা করা বৃথা।
     
    তবে আছে ব্যতিক্রম‌‌
     
    ৫/১৬ কর্মজীবনে ইতি টেনে ১/১৭ গেছিলাম ১৫ দিনের প্রথম মাইক টেস্টিং একাকী ভ্রমণে। জানুয়ারি‌র ঠাণ্ডায় ঝাঁসির নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি ভোর পাঁচটায়। একটা খালি অটো আসছিলো। হাত দেখিয়ে বলেছিলাম - স্টেশন যাবো। সে বলে, রিজার্ভে যাবেন? বলি একা মানুষ, এই তো দুটো স্যাক, শেয়ারেই চলো, যদি রাস্তায় কাউকে পাও, নিয়ে নিও।
     
    সেদিন সেও ম‌ওকা বুঝে বলতে পারতো, এতো ভোরে শেয়ার চলে না। কিন্তু বললো, ঠিক আছে, বসুন, কুড়ি টাকা দেবেন। সাড়ে তিন কিমি পথ, দুদিন আগে সকালে শেয়ারে এসেছি দশ টাকায়। সে মাত্র ডবল চাইলো। পথে আর কাউকে পেলো না। স্টেশনে পৌঁছে চল্লিশ টাকা দিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে টাকাটা কপালে ঠেকিয়েছিল। মনে হয় শুধু‌ই বৌনির স‌ওয়ারী বলে নয়। ২০১৯এ মধ্যপ্রদেশে দেখা পেয়েছিলাম রামুর (এই সিরিজের ১৯তম পর্ব পশ্য)। এরা অন্য গোত্রের মানুষ।
     
    সরকারি বাসের মহিমা
     
    অনুসন্ধানে এখন যিনি আছেন তিনি বেশ অমায়িক। হয়তো পরদেশী বুঝেই, আমায় নরম করে বলেন, ঐ প্ল্যাটফর্মে বাস আসবে। সাড়ে পাঁচটায় ছাড়বে। তাঁকে ধন্যবাদ সেখানে গিয়ে দাঁড়াই। ৫-২৫এও বাসের দেখা না পেয়ে কুণ্ঠিত হয়ে আর একবার শুধোই - আসবে তো ঠিক? উনি বলেন, অবশ‌্যই, ঐ দেখুন কেল‌ওয়াড়ার মেলব্যাগ পড়ে আছে, ওটা ডাক বাস, বাতিল হয়না। এতোক্ষণ ঐ প্ল্যাটফর্মে‌র আশপাশে বিশেষ যাত্রী না দেখে ভাবছিলাম, সরকারি ব্যাপার, নাও আসতে পারে বাস। এবার মেলব্যাগ দেখে ভরসা হয়।
     
    ৫-৩২এ এলো ৩x২ কনফিগারেশনে ৪৮ সীটার বাস।‌ সাকুল্যে জনা পনেরো স্থানীয় গ্ৰাম্য যাত্রী উঠলো। ৫-৩৭এ বাস ছেড়ে দিলো। এমন পাঙ্কচুয়ালিটি তো বহু ট্রেনের ক্ষেত্রে‌ও দেখা যায় না! মাত্র চল্লিশ টাকা ভাড়া। উদয়পুর থেকে কেল‌ওয়াড়ার দূরত্ব ৭৬ কিমি। মাঝারি গতিতে (৪০-৫০ হবে) বাস চলতে র‌ইলো।
     
     
    রাজপুত বংশের প্রেক্ষাপট
     
     
    যতক্ষণ বাস যাচ্ছে দেখে নেওয়া যাক অতীতে উত্তর-পশ্চিম ভারতে রাজপুত বংশের প্রেক্ষাপট। রাজপুত কিংবদন্তি অনুযায়ী, অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী বিপর্যস্ত হলে ঋষি বশিষ্ঠ আবু পর্বতে যজ্ঞ করেন। সেই যজ্ঞাগ্নি থেকে চারটি ক্ষত্রিয় বংশের উৎপত্তি হয় - পরমার, প্রতিহার, চৌহান ও শোলাঙ্কি (চালুক্য)। তাদের ওপর ধর্ম ও রাজ্য রক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। এই চারটি বংশের মধ্যযুগীয় উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাদের প্রধান কেন্দ্রগুলি ছিল নিম্নরূপ:
     
    চৌহান - আজমের, দিল্লি
     
    পরমার - মালব বা মাল‌ওয়া অঞ্চল (উজ্জয়িনী, ইন্দোর, ধার, মাণ্ডু ইত্যাদি)।
     
    প্রতিহার - (বা গুর্জর-প্রতিহার এবং পরে সরলীকৃত হয়ে পরিহার) প্রথমে উত্তর ভারতের কানৌজ এলাকায় পরে মারোয়ার অঞ্চল।
     
    শোলাঙ্কি/চালুক্য - গুজরাটের আনহিলওয়াড়া (পাটন)
     
    উপরে উল্লেখিত কিংবদন্তিতে চারটি অগ্নিকুলজাত রাজপুত বংশের মধ্যে মেবারের গুহিল/সিসোদিয়া বংশ নেই। তারা নিজেদের সূর্যবংশীয় রাজপুত অর্থাৎ পৌরাণিক রাজা রাম-এর ইক্ষ্বাকু বংশের উত্তরাধিকারী বলে দাবি করতো।
     
    তেমনি চন্দ্রবংশীয় রাজপুতরা নিজেদের উৎস পৌরাণিক “চন্দ্রবংশ” বা চাঁদের বংশ থেকে হয়েছে বলে দাবি করত। পুরাণে চন্দ্রদেব, বুধ, পুরুরবা, যযাতি, যদু/পুরু প্রভৃতি রাজবংশের ধারাই চন্দ্রবংশ। রাজপুত ঐতিহ্যে চান্দেলা (খাজুরাহো মন্দির সমূহের স্রষ্টা), যাদব, তোমর রাজপুত বংশ চন্দ্রবংশীয় হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
     
    ঐতিহাসিক মতে এই সব কিংবদন্তি ক্ষত্রিয়‌দের রাজনৈতিক মর্যাদা ও বৈধতা প্রতিষ্ঠার পরম্পরা। কুম্ভলগড় যেহেতু রাজস্থানে তাই মধ্যযুগীয় উত্তর-পশ্চিম ভারতের তিনটি মুখ্য রাজপুত বংশে‌ই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাক। এগুলি হচ্ছে - মেবার (মেওয়ার), মার‌ওয়ার এবং হাডা (চৌহান) রাজবংশ।
     
    মেওয়ার রাজপুত বংশ
     
    অষ্টম শতকে বাপ্পা রাওয়াল তাঁর শাসনকালে (৭২৮-৭৫৩) গুহিলা বা গেহলোট (রাজস্থানে‌র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলোট স্মর্তব্য) সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করেন মে‌ওয়ার রাজবংশের। সেখান থেকেই উদ্ভব হয় সিসোদিয়া বংশ - অতঃপর মেওয়ারের ধারাবাহিক রাজপুত শাসক।
     
    বাপ্পা রাওয়ালের সময় থেকেই মে‌ওয়ারের রাজধানী ছিল চিত্তোরগড়। তাঁর আগে ঐ এলাকা ছিল রাজস্থানে‌র মোরি রাজপুত বংশের চিত্রাঙ্গদ মোরির অধীনে। চিত্তোরগড় উঁচু পাহাড়ের উপর অনেকটা সমতল জায়গা। সেখানে বহু শতাব্দী ধরে মানুষের বসতি ছিল। সেই বসতিকে কেল্লার রূপ দেওয়ার আদি কারিগর চিত্রাঙ্গদ মোরি। তাই শুরুতে তার নাম ছিল চিত্রকোট (কোট অর্থ দুর্গ)। তাঁকে পরাজিত করে বাপ্পা রাওয়াল দখল নেন দুর্গের। ক্রমে উচ্চারণের পরিবর্তনে চিত্রকোট - চিত্তৌড় - হয়ে চিত্তোরগড় হয়েছে যার বর্তমান রূপ বহু শতাব্দী‌ ধরে নানা মেওয়ার রাণাদের সংযোজনের ফল।
     
    রাজস্থানের প্রচলিত প্রবাদ
     
    “गढ़ तो चित्तौड़गढ़, बाकी सब गढ़ैया;
    ताल तो भोजताल, बाकी सब तलैया।”
     
    ছড়াকারে এর ভাবার্থ হতে পারে:
     
    বিশাল দুর্গ বলতে গেলে
    সে তো শুধু চিত্তোরগড়,
    অন্য যা সব যায় গো দ্যাখা
    তা তো সব‌‌ই চুনকিগড়।
     
    বিশাল হ্রদ বলতে গেলে
    সে তো শুধু ভোজ সরোবর
    অন্য যা সব যায় গো দ্যাখা
    তা তো সব‌‌ই পুঁচকে পোখর।
     
    ভোজতাল বলতে একাদশ শতকে পরমার বংশীয় রাজা ভোজ কর্তৃক ভোপালে কোলান নদীর ওপর নির্মিত মাটির বাঁধের ফলে সৃষ্ট ৩৬ বর্গকিমি ব্যাপী আপার লেক বা বড়া তালাও বোঝায়।
     
    চারদিকে সমতলের মাঝে উন্মুক্ত পাহাড়ি কেল্লা চিত্তোরগড় সরাসরি আক্রমণে পরাজিত করা কঠিন ছিল। তবে নীচে দীর্ঘ অবরোধের মাধ্যমে কেল্লায় খাদ্যের যোগান বন্ধ করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করাও একটি সামরিক কৌশল (siege tactics). চিত্তোরগড় তেমন তিনটি দীর্ঘ অবরোধে হার মেনেছে। রাণী পদ্মিনী‌র রূপের খ্যাতি শুনে আলাউদ্দীন খিলজীর চিত্তোর আক্রমণ (১৩০৩)। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ (১৫৩৫) ও আকবরের (১৫৬৭-৬৮) চিত্তোর অবরোধ।‌ রাণী পদ্মিনী বাস্তব চরিত্র না কিংম্বদন্তী তা নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ আছে। তবে ১৫৩৫এ চিত্তোরের পতনে রাণা সাঙ্গার (সংগ্ৰাম সিং) বিধবা পত্নী রাণী কর্ণাবতী‌র সম্মিলিত মহাজৌহর ঐতিহাসিক সত্য।
     
    প্রবাদে চিত্তোরগড়ের গড়িমা তাই কেবল তার বিশালতা বা সরাসরি আক্রমণের দুর্ভেদ্যতা‌ সূচক নয়, বরং পরাজয় নিশ্চিত বুঝলে রাজপুত যোদ্ধাদের ‘সাকা’ করে অন্তিম লড়াইতে যাওয়া ও দুর্গবাসিনী রাজপুত রমণীদের সম্মিলিত জৌহর - বা জহরব্রত পালন - এহেন সব রাজপুত বীরত্ব ও গৌরবসূচক। চরম সময়ে জৌহর প্রথা মে‌ওয়ার, মার‌ওয়ার বা হাডা চৌহান - তিন রাজপুত বংশে‌ই দেখা গেলেও চিত্তোরগড়ের ঐ তিনটি মহাজৌহর তাকে অনন্য মর্যাদা দেয়।
     
    দুর্গের পতন অনিবার্য বুঝলে দুর্গে শঙ্খধ্বনি শুরু হোতো।‌ তখন শত্রুর হাতে বন্দিত্ব বা অপমান এড়াতে দুর্গের নারীরা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে শিশুদের নিক্ষেপ করে নিজেরাও ঝাঁপিয়ে আত্মাহুতি দিতেন। তারপর পুরুষ যোদ্ধারা পাগড়িতে কেশরিয়া বা গেরুয়া কাপড় বেঁধে, দুর্গের ফটক খুলে মরণপণ শেষ লড়াই‌তে বেরিয়ে যেতেন। এটাই “সাকা”। তাই সাকা ছিল কার্যত একমুখী যাত্রা, ফিরে এসে কাউকে আর রক্ষা করার প্রত্যাশা থাকত না। তাই ঐ প্রবাদে চিত্তোরগড় শুধু একটি দুর্গ নয়, রাজপুত বীরত্ব, আত্মসম্মান ও স্বাধীনচেতা মানসিকতা‌র প্রতীক।
     
    জৌহর প্রথা কেবল রাজস্থানেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। ২০১৯এর একাকী ভ্রমণে মধ্যপ্রদেশে‌র চান্দেরী কেল্লাতেও জৌহর কুণ্ড দেখে মন ভারাক্রান্ত হয়েছিল। ১৫২৮ সালে বাবর চান্দেরী আক্রমণ করলে পরাজয় আসন্ন বুঝে নারীরা জৌহর করেন ও রাজপুত শাসক মেদিনী রায়ের নেতৃত্বে কেল্লার যোদ্ধা‌রা সাকা প্রথায় মূল প্রবেশ তোরণে মরণপণ লড়াইয়ে মৃত্যু‌বরণ করেন। সেখানে রক্তবন্যা বয়েছিল বলে পরে লোকমুখে সেই তোরণের নাম হয় খুনী দর‌ওয়াজা।
     
    গোয়ালিয়র কেল্লাতেও ১২৩২ সালে দিল্লির সুলতান শামস-উদ-দীন ইলতুতমিশ দুর্গ দখল করলে কেল্লার নারীরা জৌহর করেন। কেল্লার উত্তরে জৌহরস্থানের পাশে জলাশয়টি তাই জৌহর-তাল নামে পরিচিত। ২০১৯এর সেই একাকী ভ্রমণেই গোয়ালিয়র কেল্লা‌য় সেই তাল দেখে, তার প্রেক্ষাপট জেনে খারাপ লেগেছিল।
     
    মার‌ওয়ার রাজপুত বংশ
     
    মারওয়ারের রাঠোর রাজবংশের কেন্দ্র ছিল জোধপুর অঞ্চল। মেবারের মতো রাঠোররা‌ও নিজেদের সূর্যবংশীয় ভাবতেন এবং উত্তর ভারতের প্রাচীন কনৌজ রাজের বংশধর বলে পরিচয় দিতেন। ১১৯৪ সালে চান্দাওয়ারের যুদ্ধে মুহম্মদ ঘোরীর হাতে কনৌজের রাজা জয়চন্দ্র নিহত হলে তাঁর বংশধর সিহাজি রাঠোর পশ্চিমে রাজস্থানের দিকে চলে আসেন। তিনিই মারওয়ারে রাঠোর শক্তির প্রতিষ্ঠাতা। “মারু” অর্থ মরুভূমি‌ এবং “ওয়ার” অর্থ অঞ্চল। অর্থাৎ মারওয়ার অর্থ মরুপ্রদেশ। বর্তমান পশ্চিম রাজস্থানের বিশাল শুষ্ক অঞ্চলই ছিল ঐতিহাসিক মারওয়ার। এর মধ্যে আজকের জোধপুর, পালি, নাগৌর, বারমের, জালোর ইত্যাদি অঞ্চল পড়ত।
     
    শুরুতে রাঠোররা পালি অঞ্চলে শক্তিবৃদ্ধি করে স্থানীয় প্রতিহার, পরমার, চৌহান প্রভৃতি শক্তিকে সরিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। প্রকৃত উত্থান ঘটে রাও জোধা রাঠোরের সময়। আগে মার‌ওয়ারের রাজধানী ছিল মাণ্ডোর, যা সমতলে বলে নিরাপদ ছিল না। তাই রাও জোধা রাঠোর ১৪৫৯ সালে জোধপুর শহরের প্রতিষ্ঠা করে পাহাড়ের উপর মেহরনগড় দুর্গ নির্মাণ করেন। মজবুত উঁচু প্রাচীর এবং বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফলে এটি ছিল একটি দুর্ভেদ্য কেল্লা।
     
    মেবারের সিসোদিয়া ও মারওয়ারের রাঠোর, এই দুই সূর্যবংশীয় রাজপুত ধারা রাজস্থানে মর্যাদার শীর্ষে ছিল। তাদের মধ্যে কখনও মিত্রতা, কখনও প্রতিদ্বন্দ্বীতা আবার কখনো বিবাহ সম্পর্কও ছিল। রাঠোর বংশে রাও মালদেও রাঠোর ষোড়শ শতকে মারওয়ারকে প্রবল সামরিক শক্তিতে পরিণত করেন। শের শাহ সূরি‌ও তাঁকে সমঝে চলতেন।
     
    মুঘল সম্রাট বিচক্ষণ আকবর রাজপুতদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তাই মারওয়ারের বহু রাঠোর অভিজাত মুঘল দরবারে উচ্চপদে যান। তার মধ্যে রাজা উদয় সিংয়ের কন্যা জগত গোসাঁই ছিলেন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী অর্থাৎ শাহজাহানের জননী।
     
    মহারাজা জসওয়ন্ত সিং মুঘল সাম্রাজ্যের বড় সেনাপতি ছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সময় তখন‌ও উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর পুত্রের জন্ম না হ‌ওয়ায় চতুর ঔরঙ্গজেব মারওয়ারকে সরাসরি মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চান। এর ফলে শুরু হয় দীর্ঘ রাজপুত বিদ্রোহ। মারওয়ারের মহাবীর দুর্গাদাস রাঠোর শিশুরাজা অজিত সিংকে রক্ষা করে ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বহু বছর গেরিলা যুদ্ধ চালান। রাজপুত ইতিহাসে তাঁর মর্যাদা ও বীরত্ব মেবারের মহারাণা প্রতাপের সমতুল্য। শেষ পর্যন্ত মারওয়ার পুনরায় তার স্বাধীন মর্যাদা ফিরে পায়।
     
    ব্রিটিশ আমলে জোধপুর স্টেট ছিল রাজপুতানার অন্যতম বৃহৎ ও ধনী দেশীয় রাজ্য। জোধপুর ল্যান্সারস নামে বিখ্যাত অশ্বারোহী বাহিনীও ছিল। স্বাধীনতার পর বহু স্বাধীন দেশীয় রাজ্যের মতো জোধপুর স্টেট বা মার‌ওয়ার‌ও ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মেবারের ঐতিহ্যে স্বাধীনচেতা মনোভাবের গৌরব প্রাধান্য পেয়েছে কিন্তু মারওয়ারের ইতিহাসে সামরিক শক্তির বিকাশের সাথে বাস্তববাদী কূটনৈতিক কৌশলের গুরুত্ব‌ও দেখা গেছে।
     
    হাডা চৌহান রাজপুত বংশ
     
    হাডারা মূলত চৌহান রাজপুত বংশেরই একটি শাখা। যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ড হতে উদ্ভুত বলে চৌহানরা‌ নিজেদের “অগ্নিবংশীয়” রাজপুত ভাবতেন।‌ চৌহানরা উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক শক্তিশালী ক্ষত্রিয় রাজবংশ, যাদের উত্থান হয়েছিল আজমের - শাকম্ভরী অঞ্চলে।
     
    অতীতে রাজপুত রাজারা সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মেবারের রাণা সাঙ্গার শরীরে বহু যুদ্ধে‌র ক্ষতচিহ্ন ছিল, একটি চোখ ও একটি হাত‌ও অকেজো হয়ে গেছিল তাও তিনি অসীম মনোবলে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মেবারের রাণা প্রতাপ দীর্ঘ মুঘল বিরোধী যুদ্ধে কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত। তেমনি‌ই ছিলেন দুর্গাদাস রাঠোর (মার‌ওয়ার), পৃথ্বীরাজ চৌহান‌ (চৌহান), রাও সুরজন হাডা, রাও রতন সিং হাডা (বুন্দির হাডা বংশ) ইত্যাদি।
     
    মাত্র ২৬ বছরের জীবনকালে (১১৬৬-৯২) এবং ১৫ বছরের রাজত্বকালে (১১৭৭-৯২) পৃথ্বীরাজ চৌহান দু’বার উত্তর ভারতে মুসলিম আক্রমণ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা করেন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মুহম্মদ ঘোরীকে পরাজিত করলেও তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ও মৃত্যু ভারতীয় ইতিহাসের একটি মর্মান্তিক অধ্যায়। কারণ তার পরে উত্তর ভারতে তুর্কি-মুসলিম শাসনের পথ অনেকটাই খুলে যায়।
     
    চৌহানদের বহু শাখার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা “হাডা” নামটি এসেছে এক পূর্বপুরুষ “হাড়া” বা “হররাজ” নাম থেকে। তাঁর বংশধররাই পরে হাডা নামে পরিচিত হন। প্রথমদিকে এরা মেওয়ালের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে শক্তি বাড়াতে থাকে। ১৩শ–১৪শ শতকে বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব রাজস্থানের পাহাড়ি বনাঞ্চল মীণা উপজাতীয় প্রধানদের প্রভাব ছিল। হাডা চৌহান নেতা রাও দেবা হাডা ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন বলে তাঁকেই বুন্দি রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয়। তিনি মীণা প্রধানদের পরাজিত করে বুন্দিকে রাজধানী করেন। হাডা চৌহানদের শাসনের জন্যই ওই অঞ্চল “হাডৌতি" নামে পরিচিত। বর্তমান বুন্দি, কোটা, ঝালাওয়াড় প্রভৃতি অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত। প্রথমে কোটা ছিল বুন্দিরই অংশ। পরে হাডা বংশের আরেক শাখা কোটার শাসক হন। এর ফলে দুটি পৃথক হাডা রাজ্য গড়ে ওঠে, বুন্দি ও কোটা। দুটিই রাজপুতানার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
     
    (প্রসঙ্গত বলি - ২০২৩এর জানুয়ারি‌তে দু'মাসের একাকী ভ্রমণে বুন্দি, কোটা, ঝালাওয়াড় ও সংলগ্ন ঝালরাপাটান - কেবল এই তিনটি জায়গা‌তেই ১৩ দিন ধরে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে ঘুরেছি। দলে গেলে জনতা বোর হয়ে যেতো। অপূর্ব সেসব অভিজ্ঞতা)
     
    দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী হাডা রাজপুতরা যুদ্ধকুশলতা ও বীরত্বের জন্য বিখ্যাত ছিল।‌ অন্যান্য রাজপুত বংশের মতো তারাও পরে আকবরের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে।‌ বিশেষ করে কোটার হাডা রাজারা মুঘল সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ভূমিকা পালন করেন। হাডা শাসকদের সঙ্গে জড়িত বিখ্যাত স্থাপত্যের মধ্যে বুন্দির তারাগড় দুর্গ ও প্যালেস এবং কোটার গড়প্যালেস উল্লেখযোগ্য। বুন্দির প্রাসাদ ও দেওয়ালচিত্র (Boondi School of Arts) রাজস্থানি শিল্পকলায় খুব‌ই বিখ্যাত।
     
    পৌঁছে গেলাম কেল‌ওয়াড়া
     
    দু ঘন্টা ঘুমপাড়ানি ছন্দে, নন-স্টপ চললো বাস। মাঝে কেউ উঠলো‌ও না, নামলো‌ও না। পৌনে আটটা পৌঁছলাম কেল‌ওয়াড়া। ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর নেমে গেলো চা, নাস্তা করতে। আমি‌ও নামলাম। ভোরে টোষ্ট, ডিম সেদ্ধ খেয়েছি, তাই ক্ষিদে তেমন পায়নি। তবে কোথাও বসে খোঁজ‌খবর নিতে হবে। গতকাল বিকেলে বাসডিপোর নিমানন বাবুর স্মৃতি তখন‌ও তাজা। তাই এক অমায়িক দর্শন দোকানীর নাস্তার দোকানে পোহা, চা নিয়ে বসে জানতে চাই কেল্লা কতদূর?
     
    তিনি বলেন, সাত আট কিমি হবে। বলি, তাহলে কিভাবে যাবো? উনি যা বললেন, তার মর্মার্থ হচ্ছে - সাড়ে নটা নাগাদ একটা বাস আসবে যেটা রণকপুর যাবে। তাতে গিয়ে পাঁচ কিমি দূরে T জংশনে নেমে পড়তে হবে। সেখানে রাণা প্রতাপের একটি পুতলা (স্ট্যাচু) আছে। সেখান থেকে বাস চলে যাবে বাঁয়ে রণকপুর। ডাইনে গেলে কেল্লা।
     
    মাত্র পাঁচ কিমির জন্য দেড় ঘন্টা অপেক্ষা‌র মানে হয়না। বলি, হেঁটে‌ যেতে পারি না। তিনি বলেন, অবশ্যই পারেন। বেড়াতেই তো এসেছে‌ন, সঙ্গে মাল‌ও নেই, হাঁটায় অসুবিধা না থাকলে যেতেই পারেন। একটাই পথ, ভুলের কোনো সম্ভাবনা নেই।
     
     
    উপরে উপগ্ৰহ চিত্রের 1 নম্বর পয়েন্ট থেকে হাঁটতে শুরু করেছি। আর 2 নম্বর পয়েন্ট T-জংশন। মামূলী চড়াই পথ। এখন ম্যাপে দেখলাম কেল‌ওয়াড়া থেকে গড়ের গেট অবধি ৭ কিমি পথ। চড়াই প্রায় সাতশো ফুট, উৎরাই দুশো।‌ এমন কিছু নয়। গেট থেকে কেল্লার উচ্চতম পয়েন্ট বাদলমহল আরো দুশো ফুট। তবে তা একটানা চলার পথে নয়। কেল্লা‌য় ঢুকে ধীরে সুস্থে আশপাশে ঘুরে দেখে পরে উঠেছিলাম।
     
     
    একটু গিয়ে 1A পয়েন্টে রাস্তা‌র বাঁদিকে দেখলাম লাখেলা লেক। নেট থেকে নেওয়া ২০২৫এর ছবিতে দেখি বেশ বড় রিসোর্ট হয়েছে।‌ বেশ সুন্দর লোকেশন। তবে ২০১১ তে ওখানে কিছু‌ই ছিল না। শীতের সকালে মোলায়েম রোদে হাঁটতে বেশ লাগছে। নদীখাত, পাহাড়, জঙ্গল নিয়ে রাস্তার দুপাশের দৃশ্য চমৎকার। সুন্দর প্রকৃতির মাঝে এমন নির্জন পথে হাঁটলে মনের আরাম হয়।
     
     
    সাড়ে নটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ম্যাপে 2 নম্বর পয়েন্টে T জাংশনে। পাশেই ঝকঝকে একটা ফাঁকা চায়ের দোকানে বসে চা বলি। সৌম্যদর্শন মৃদুভাষী দোকানীকে বেশ লাগে। তার ছোট মেয়েটি দোকানে বাবার কাছে বসেছি‌ল।‌ স্যাক থেকে দুটো টফি বার করে দিই। গোলগাল, আদুরে মুখ। দোকানীকে বলি, ওর একটা ছবি নেবো। হেসে সায় দেয়। চলার পথে এসব ছোট্ট বোনাস।
     
    দোকানীর সাথে গল্পে জানলাম কুম্ভলগড় থেকে রনকপুর ৩০ কিমি‌র জাঙ্গল ট্রেক রুট আছে। মাঝে এক রাত থাকতে হয়। তবে ঐ পথ কুম্ভলগড় ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুযারির মধ্যে দিয়ে, গাইড ছাড়া যাওয়া উচিত নয়।
    চল্লুম কেল্লার পানে
     
     
    চা খেয়ে ডানদিকে হাঁটি কেল্লার দিকে। প্রথম উপগ্ৰহ ম্যাপে দেখানো 2 এবং 3 পয়েন্টে‌র মধ্যে রাস্তায় প্রথমে এলো আরেত পোল। এতোটা এসে‌ও কেল্লা বা তার দেওয়া‌ল চোখে পড়েনি। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় - আসবো পরে।
     
     
    আর একটু যেতে এলো হাল্লা পোল। এইখান থেকে কেল্লার প্রাচীর দেখা গেল যার মাঝে মাঝে নিয়মিত দূরত্বে বিরাট মোটা গোলাকার বুরুজ।
     
     
    হাল্লা পোল থেকে কিছু‌টা যেতে ম্যাপে 3 নম্বর পয়েন্টে হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়ে অভিভূত করেছিল বাদল মহল (5)।
     
     
    এই ম্যাপ আর একটু এনলার্জড্। এতে 4 নম্বর পয়েন্ট কেল্লার প্রাচীরের বাইরে দ্বিতল বড় প্রবেশদ্বার - হনুমান পোল। 4A- প্রাচীরের মধ্যে কেল্লার মুখ্য গেট - রাম পোল। এখানে‌ই ASI টিকেটঘর। 5 নম্বর - বাদল মহল। 6 নম্বর - বাহান্ন দেউড়ি জৈন মন্দির - সেখানে বসে লাঞ্চ করেছি‌লাম।
     
     
    ড্রোন ভিউতে কেল্লার পশ্চিমে মুখ্য অংশ‌ - একদম ওপরে বাদল মহল (5)
     
    কেল্লা‌র পোল বা দ্বারের বৃত্তান্ত
     
     
    কুম্ভলগড় কেল্লার ১০টি পোল বা দ্বার স্যাটেলাইট বা ড্রোন ভিউতে ঠিক বোঝা যায়না। তাই এই স্কিমেটিক স্কেচটা রাখলাম। নয়টি পোল কেল্লার পশ্চিম দিকে। কেল্লার বাইরে এ্যাপ্রোচ রোডে ১.আরেত পোল ২. হাল্লা পোল। কেল্লার প্রাচীরের কাছে ৩. হনুমান পোল ও ৪. রাম পোল। বাকি গেটগুলি কেল্লার মধ্যে বাদল মহলের দিকে যেতে ৫. ভৈরব পোল ৬. নিম্বু পোল ৭. চৌগান পোল ৮. পাগড়া পোল ও অন্তিমে বাদল মহলে ঢোকার আগে ৯. গণেশ পোল।‌ কেল্লার পূব দিকের প্রাচীরে ১০. বিজয় পোল।
     
    এই ১০টি ডকুমেন্টেড পোল ছাড়াও প্রাচীরে বিভিন্ন জায়গায় আরো ৭ থেকে ১২ টি গেট ছিল। তার কিছু কেল্লা‌য় মালপত্র আনার জন্য (supply gates), কিছু প্রয়োজনে পলায়নের জন্য গুপ্ত দ্বার (Escape gates). বলে নাকি কুম্ভলগড়ের ৩৬ কিমি দুর্গপ্রাকার বিশ্বে চায়না ওয়ালের পরে দ্বিতীয় দীর্ঘ‌তম। সেই দীর্ঘ প্রাচীরের অনেক জায়গা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বলে বাকি গেটগুলি শনাক্ত করা যায় না।
     
     
     
    যেমন উপরের ছবি দুটিতে লাল তীর গুলি দূরবর্তী দুর্গপ্রাকারের অবস্থান। চীনের প্রাচীরের মতোই পাহাড়ের শিখর, গিরি শিরা ধরে চলে গেছে কত দূর অবধি!
     
    কেল্লার ভিতরে - পূবে
     
    ১৪৪৩ থেকে ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিশাল কুম্ভলগড় দুর্গ নির্মাণ করেন মেবারের বিখ্যাত শাসক রানা কুম্ভ।‌ আরাবল্লী পাহাড়ের উঁচুনীচু গিরাশিরা ধরে ৩৬ কিমি প্রাচীরে ঘেরা ২০ থেকে ২৫ বর্গকিমি এলাকায় বিস্তৃত এই সুবিশাল দুর্গ মাত্র ১৫ বছরে তৈরী হয়েছে ভাবলে অকল্পনীয় মনে হয়। ঐতিহাসিকদের‌ও অনুমান আগে পাহাড়ের উপর কিছু পুরনো প্রতিরক্ষা কাঠামো থাকতে পারে, তবে বর্তমানে দৃশ্যমান দুর্গ মূলত রানা কুম্ভর‌ই সৃষ্টি।
     
     
    রামপোলের দরজা দিয়ে ঢুকে ডাইনে পূবদিকে কেল্লার প্রাচীরের ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ১৫ থেকে ২৫ ফুট চওড়া প্রাচীর, কিছুটা অন্তর অর্ধবৃত্তাকার বড় বুরুজ (bastions). কুম্ভলগড় দুর্গে ৩৬০টি মন্দির ছিল, ৩০০টি জৈন মন্দির, ৬০টি হিন্দু মন্দির। রাজপুত হিন্দু শাসকদের দুর্গে এতো জৈন মন্দিরের উপস্থিতিতে বোঝা যায় যে জৈন সম্প্রদায়ের প্রতি মেবারের শাসকদের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এখন অধিকাংশ মন্দির ভগ্নপ্রায়। কিছু টিকে আছে। তার কিছু বেশ কারুকার্যমন্ডিত।
     
     
    টিকে থাকা জৈন মন্দিরে‌র মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বাওয়ান দেবড়ি দিগম্বর জৈন মন্দির। এটি কেল্লা নির্মাণ সম্পন্ন (১৪৫৮) হ‌ওয়ার অনতিপরে আনুমানিক ১৪৬৪ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্ন হয়। বাওয়ান শব্দের অর্থ ৫২ এবং দেবড়ি অর্থ উপমন্দির। কেন্দ্রের মূল মন্দিরটি ভগবান পার্শ্বনাথের। তাকে ঘিরে ৫২টি উপমন্দির নির্মিত হয়েছে বলে এই নাম। মন্দিরে খোদাইয়ের কাজ সূক্ষ্ম। সে‌ই নির্জন মন্দিরের চাতালে বসে‌ সেদিন দুপুরে মটর, গাজর, পেয়ারা সহযোগে মধ্যাহ্ন ভোজ করেছিলাম।‌
     
    কেল্লার ভিতরে - পশ্চিমে
     
    একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরে গেলাম রাম পোলের কাছে। জয়সলমীর (সোনার) কেল্লায় দেখেছি ভিতরে আজ‌ও বহু লোকজন বসবাস করে, তাই ওটাকে লিভিং ফোর্ট‌ বলা হয়।‌ এখানে‌ও রাম পোলের উত্তরে কিছু টিনের চালের ঘর দেখলাম। শুনলাম ওরাও বহু পুরোনো আমলের স্থানীয় লোক, তাই ASI উচ্ছেদ করেনি। তাদের কেউ কেল্লার কর্মচারী।
     
     
    ওদিকে একটু দেখতে গিয়ে আবার‌ও কিসমি টফি কাজে এলো। Lost in thought ভঙ্গিতে একটি শিশু গাছের তলায় দাঁড়িয়ে। মুখ থমথমে। চোখ ছলছলে। দূর থেকে চকিতে সেই হন্টিং মুখটি জুম ইন করে ধরি। সে খেয়াল করেনি। কাছে গিয়ে তালুতে চারটে কিসমি টফি নিয়ে বাড়িয়ে ধরি। সে মুখ তুলে তাকায়। চোখ ইশারায় বলি, নাও। টফিগুলো নিয়ে নীরবে চলে যায়। সুক্রিয়া গোছের পোশাকি ভদ্রতা জানানোর বয়স ওটা নয়। হয়তো ও নিজের ঘোরে মগ্ন। শিশু‌দের ভাবনার নাগাল পাওয়া‌ বড়দের কম্মো নয়।
     
    দুর্ভেদ্য কুম্ভলগড়
     
    বাদল মহলের দিকে যেতে ভৈরব পোলের কাছে একটি মন্দিরের মত জায়গায় একটা অদ্ভুত দর্শন পাথরের মুখের মতো দেখেছিলাম। তাতে চপচপে করে সিঁদুর মাখানো। তখন তার তাৎপর্য বুঝিনি। ওপরে বাদল মহলে গিয়ে ASI গার্ডের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য জনশ্রুতি শুনলাম। রানা কুম্ভ দুর্গট নির্মাণ করতে গেলে নানা জায়গায় রহস্যজনকভাবে ভেঙে পড়তো বা নানা বাধা পড়তো। তখন এক সাধু রাণাকে বলেন‌ যে, কেল্লার স্থান নির্বাচনে‌ই ভুল হয়েছে এবং এই কেল্লা নির্মাণ সম্পন্ন করতে কারুর আত্মবলিদান প্রয়োজন।‌ তিনি নিজেকে এর জন্য উৎসর্গ করতে চান। তিনি রানাকে নির্দেশ দেন তাকে অনুসরণ করতে এবং তার নির্বাচিত স্থানে তার শিরশ্ছেদ করতে। যেখানে ছিন্ন মস্তকটি পড়বে, সেখানে তার স্মৃতি‌তে একটি স্মারক করতে হবে।‌ শিরচ্ছেদের পরেও দেহটি কিছুটা গিয়ে যেখানে মাটিতে পড়বে, সেখানে কেল্লার মূল প্রতিরক্ষা দ্বার বানাতে হবে। জানলাম সেই সিঁদুর মাখা পাথরের কাছে‌ই রাণা কুম্ভ সাধুর নির্দেশে তাঁর শিরচ্ছেদ করতে মস্তকবিহীন দেহটি শ খানেক মিটার গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। সেখানে‌ই বর্তমানে দ্বিতল, বৃহৎ হনুমান পোল।
     
    প্রথমে রাণা কুম্ভ নির্বাচিত স্থানটি ছিল উন্মুক্ত স্থানে। সাধু নির্দেশিত বর্তমান স্থানটি আরাবল্লী পর্বতমালার ভাঁজের মধ্যে লুকানো। এটি চিত্তোরগড়, মেহরনগড়, গোয়ালিয়র কেল্লার মতো দূরে নীচের সমতল থেকে তো নয়‌ই, অনেকটা ওপরে এলেও দৃশ্যমান নয়। আমি‌ও সেদিন কেল‌ওয়াড়া থেকে ৬ কিমি আসার পর স্যাটেলাইট ইমেজে দেখানো ২ থেকে ৩ এর মধ্যে সেই প্রথম কেল্লার দেওয়াল দেখতে পেয়েছিলাম। লোককথার এই অংশে বাস্তব সত্যের একটি গ্ৰহণযোগ্য উপাদান রয়েছে।
    প্রাকৃতিকভাবে এমন লুক্কায়িত অবস্থানের জন্য শত্রুপক্ষ দূর থেকে দুর্গের বিন্যাস সহজে বুঝতে পারত না, গোলন্দাজ মোতায়েন করা কঠিন ছিল। কাছে এসে‌ও আঁকাবাঁকা চড়াই পথে অতোগুলি প্রতিরক্ষা তোরণ থাকায় যুদ্ধহস্তী দিয়ে গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকা সহজ ছিলনা। ভিতরে চ‌ওড়া প্রাচীর দিয়ে অনেক সৈন্য এসে ওপর থেকে, পাথর, তীর, গোলা বর্ষণ করতো। গরম জল ঢেলে দিতো। এসবের ফলে সরাসরি আক্রমণ করে কুম্ভলগড় কেল্লা জেতা কঠিন ছিল।
     
     
    চিত্তোরগড় উঁচু পাহাড়ের মাথায় প্রাচীর ঘেরা ৭০০ একর বা ৩ বর্গকিমি সমতল এলাকা। কুম্ভলগড়ের মূল এলাকা চিত্তোরগড়ের থেকে সামান্য কম কিন্তু ৩৬ কিমি সুরক্ষা প্রাচীরের মধ্যে এলাকা প্রায় ২২ বর্গকিমি‌। উপরের ছবিতে উত্তরে লাল তীর থেকে বোঝা যাবে কী বিশাল পাহাড়ি এলাকা ঐ প্রাচীরের মধ্যে ছিল। প্রভূত বর্ষা‌র জল ধরে রাখা যেতো। চাষাবাদ, ফলমূলের বাগান, পশুচারণও করা যেতো। ফলে শত্রুপক্ষ বাইরে অবরোধ করে কেল্লা‌য় খাদ্যাভাব তৈরী করতে চাইলে জমানো শষ্য ছাড়া‌ও উৎপাদন করেও আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দীর্ঘদিন খুঁটি গেঁড়ে বসে থাকা যেতো।
     
    মুঘলদের বিরুদ্ধে আভ্যন্তরীণ ঐক্যবদ্ধ‌তা না থাকায় বিভিন্ন সময়ে মুঘলদের সাথে আম্বর-এর (আমের, পরে জয়পুর) কচ্ছওয়াহা রাজপুত, বিকানির বংশ, জয়সলমীরের ভাটি রাজপুত, মার‌ওয়ারের রাঠোর বংশ‌‌ও যোগ দিয়েছিল। মুঘলদের বিরুদ্ধে রাণা প্রতাপের ইতিহাস বিখ্যাত হলদিঘাটির যুদ্ধে (১৫৭৬) মুঘল বাহিনীর প্রধান সেনানায়ক‌ ছিলেন আমেরের রাজা মান সিং (১ম)।‌ হলদিঘাটির যুদ্ধের পর রানা প্রতাপ কুম্ভলগড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই সময় রাজপুত জোটের সাহায্যে মুঘল সম্রাট আকবরের নেতৃত্বে শাহবাজ খান কাম্বোহ সহ অন্যান্য সেনাপতিদের সম্মিলিত বড় বাহিনী দুর্গটি অবরোধ করে। অনেকদিন দুর্গটি সেই অবরোধ প্রতিরোধ করেছিল। আকস্মিক বিস্ফোরণে রসদ, কামানের গোলাবারুদের ভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হতে কেল্লার প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মুঘলরা সাময়িকভাবে দুর্গটি দখল করলেও বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি।
     
    মুঘলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন সংগ্ৰাম করে রাণা প্রতাপ চিত্তোরগড় ছাড়া মেবারের অনেক অংশ পুনরুদ্ধার করেন। যদি পশ্চিম ভারতের সব রাজপুত গোষ্ঠী একজোট হয়ে থাকতে পারতো তাহলে হয়তো তারা সম্মিলিতভাবে মুঘলদের প্রতিরোধ করতে পারতো। কিন্তু রাজপুত রাজনীতি ছিল অত্যন্ত বিভক্ত। প্রত্যেক রাজ্য টিকে থাকার প্রয়োজনে সময়ের সঙ্গে জোট ও সম্পর্ক বদলাত। তাই আম্বর মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছিল, কিন্তু মহারাণা প্রতাপের নেতৃত্বে মেবার মুঘলদের দীর্ঘ প্রতিরোধের পথ গ্রহণ করেছিল। এই পার্থক্যই রাজপুত ইতিহাস, লোকগাথা ও স্মৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
     
    ধাত্রী পান্নার ত্যাগ - উদয়পুরের উত্থান
     
    ১৫২৭ সালে দ্বিতীয়‌বার বাবরের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর খানওয়ার যুদ্ধে রাণা সাঙ্গা বিশাল রাজপুত জোটের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে রানা সাংগা গুরুতর আহত হয়ে ১৫২৮ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে মেবারে উত্তরাধিকার নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। বয়োজ্যেষ্ঠ বলে প্রথমে রাণার অন্য পত্নী‌র সন্তান রতন সিংহ সিংহাসনে বসেন। ১৫৩১ সালে তিনি শিকারে গিয়ে মারা যেতে রাণা সাঙ্গা‌র পাটরাণী রাণী কর্ণাবতীর বড় ছেলে ১৪ বছরের বিক্রমাদিত্য সিংহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু অযোগ্য, দুর্বিনীত কিশোর বিক্রমাদিত্য অচিরেই সকলের বিরাগভাজন হয়ে পড়ে। রাজপুত সামন্তদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে। কিন্তু বুন্দির হাডা চৌহান বংশের কন্যা রাণী কর্ণাবতী তাঁর স্বামী রাণা সাঙ্গা‌র মতোই তেজস্বিনী, সাহসী নারী।‌ তাই তিনি বিক্রমাদিত্যর বকলমে রিজেন্ট কু‌ইন বা অভিভাবক রাণী হিসেবে মেবারের নেতৃত্বভার নিলে তা মেনে নেওয়া রাজপুত প্রধানদের মর্যাদায় বাঁধে নি, তারা বীরপূজক - সে রাজা হোক বা রাণী।
     
     
    তেমন এক রাণী ছিলেন মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের পুত্র রাজারাম (প্রথম)-এর স্ত্রী তারাবাঈ ভোঁশলে (১৬৭৫–১৭৬১)। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে মারাঠাদের দীর্ঘ সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা অসাধারণ। ১৭০০ সালে রাজারাম মারা গেলে তাঁর পুত্র ছিল অল্পবয়সী। তখন তারাবাঈ মারাঠা সাম্রাজ্যের রিজেন্ট বা অভিভাবক-শাসক হন। তিনি সেনাবাহিনী পরিচালনা, দুর্গ রক্ষা ও গেরিলা যুদ্ধ কৌশল সংগঠিত করতেন। তারাবাঈ সেই সময় নেতৃত্ব না দিলে তবে মুঘলদের দাপটে মারাঠা শক্তি ভেঙে পড়তে পারত।
     
    (২০২০ সালের শীতে ৬৩ দিনের একাকী ভ্রমণে বেরিয়ে কোলহাপুর গিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে দেখেছিলাম ছত্রপতি সাহুজী মহারাজ (নিউ প্যালেস) মিউজিয়াম। দরবার হলে শাড়ি পরে কোমরে তলোয়ার নিয়ে ঘোড়ায় চড়া আভিজাত্য‌ময় ব্যক্তি‌ত্বময়ী এই নারীর বিরাট তৈলচিত্রটি দেখে বেশ সম্ভ্রম হয়েছিল। ওখানে ছবি তোলা নিষেধ। এখানে যে ছবিটি রেখেছি সেটা উইকি থেকে নেওয়া ঐ ছবিটার‌ই ডিজিটাল সংস্করণ)
     
    ফিরে আসি চিত্তোরে। কঠিন প্রতিরোধ স্বত্ত্বেও ১৫৩৫ সালে গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহের আক্রমণে চিত্তোরগড়ের পতন অনিবার্য বুঝে রাণী কর্ণাবতীর সম্মিলিত মহাজৌহরের কথা আগেই লিখেছি। তখন বিক্রমাদিত্য ও উদয় ছিল নিরাপদে বুন্দিতে মামার বাড়ি‌তে। বাহাদুর শা চিত্তোরগড় জয় করেও অত বড় কেল্লা কব্জায় রাখতে চাপে ছিলেন। ওদিকে খবর এলো হুমায়ূন চলেছে‌ন গুজরাতের দিকে। তাই চিত্তোর ছেড়ে তিনি দ্রুত গেলেন গুজরাতে। চিত্তোরগড় আবার মেবারের সিসোদিয়া রাজপুত‌দের অধীনে এলো। বিক্রমাদিত্য ও উদয়কে বুন্দি থেকে আনা হোলো চিত্তোরে।
     
    চিত্তোরের ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে রাণা সাঙ্গা‌র ভাইপো বনবীর ১৯ বছরের বিক্রমাদিত্যকে হত্যা করে ছোট রাজপুত্র উদয়কেও হত্যা করতে চায়, যাতে মেবারের সিংহাসনের আর কোনো বৈধ দাবিদার না থাকে। তখন পান্না দাই ছিলেন উদয়ের তত্ত্বাবধানে। বনবীরের ষড়যন্ত্রে‌র আভাস পেয়ে পান্না উদয়কে বিশ্বস্ত ভৃত্যদের সাহায্যে দুর্গের বাইরে পাচার করে নিজের পুত্র চন্দনকে রাজপুত্রের পোশাক পরিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন। বনবীর তরবারি হাতে ঘরে ঢুকে বিছানায় শোয়া চন্দনকেই উদয় ভেবে পান্নার সামনেই হত্যা করেন।‌ পান্না নিজের সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে মেবারের উত্তরাধিকারীকে রক্ষা করেন। এতোদিন জানতাম ধাত্রী পান্না বছর পাঁচেকের শিশু উদয়কে নিয়ে পালিয়ে গেছিলেন চিত্তোর থেকে। এই লেখার জন্য সংগৃহীত তথ্যের কালানুক্রম অনুধাবন করে বুঝলাম, তখন উদয় ১৪ বছরের কিশোর।
     
    চিত্তোরগড় থেকে পান্না দাই উদয়কে নিয়ে প্রচলিত রাস্তায় দিনের বেলায় গেলে বনবীরের লোক ধরে ফেলবে। তাই আরাবল্লীর দুর্গম শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যপথে, রাতের অন্ধকারে প্রায় ১২০ কিমি ঘুরপথে বেশ কিছুদিন পরে পৌঁছান কুম্ভলগড়ে। পথে মেবারের অনুগামী বিশ্বস্ত, রাজপুত ও সাহসী ভীল উপজাতির সর্দার‌রা পান্না‌কে আশ্রয় দিয়েছে‌ন, নিরাপদে কুম্ভলগড়ে পৌঁছে দিয়েছেন। ভীল উপজাতি পরে রাণা প্রতাপের দীর্ঘ মুঘল বিরোধী যুদ্ধে‌ও সাথে ছিলেন। যখন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে উদয় সিংহ জীবিত আছেন, তখন মেবারের রাজপুত প্রধানরা তাঁকে‌ই বৈধ মহারানা হিসেবে স্বীকার করে বনবীরকে পরাজিত করে চিত্তোর পুনর্দখল করেন।
     
    ধাত্রী পান্নার অকল্পনীয় ত্যাগে উদয় সিং (২) বেঁচে যেতে পরে তাঁর সন্তান রাণা প্রতাপের জন্ম‌ হয় কুম্ভলগড়ে। ১৫৪০ সালে মেম্বারের শাসক হয়ে উদয় সিংহ চিত্তোরের অবস্থা‌নগত দুর্বলতা‌ উপলব্ধি করে ১৫৫৯ সালে উদয়পুর শহরের নির্মাণ করে মেবারের রাজধানী‌ সেখানে সরিয়ে আনেন। অবশ্য মেবার বংশের প্রতিষ্ঠাতা বাপ্পা রাওয়ালের মতোই উদয় সিংহ‌ও উদয়পুরের পত্তন শুন্য থেকে করেন নি। বাপ্পা রাওয়াল তাঁর আমলেই (৭২৮-৭৫৩) উদয়পুরের ২০কিমি উত্তরে কৈলাশপুরীতে একলিঙ্গজী (শিব) মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। মেবারের মহারাণারা নিজেদের শিবের “দেওয়ান” বা প্রতিনিধি মনে করতেন। ফলে প্রাচীন কাল থেকেই ঐ এলাকায় জনবসতি ছিল। উদয় সিংহ তাই সেখানে‌ই পরিকল্পিত রাজধানী নগরী উদয়পুরের নির্মাণ করেন যেমন রাও জোধা মান্ডোর থেকে জোধপুর নগরের পত্তন করে মার‌ওয়ারের রাজধানী সরিয়ে আনেন।
     
    বাদল মহল
     
    বাদল মহলের এক জায়গায় লেখা “Rana Pratap was born here"। এটা দেখতেই তো এখানে আসা। ঐ রাজপুত বীরের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে। মহিয়সী নারী ধাত্রী পান্নার ঘরও দেখতে পেলাম। এক ASI গার্ড উৎসাহ নিয়ে আমাকে সেসব ঘুরিয়ে দেখালেন। বললেন, কুম্ভলগড়ে মে হ্যায় এক "ছত্তিশ কা আঁকড়া” - ইয়ানি ৩৬ কিমি পরকোটা (দুর্গপ্রাচীর) গুণা ১০ = ৩৬০ মন্দির গুণা ১০ = ৩৬০০ ফুট উঁচা বাদলমহল কি শিখর।
     
    পরে জাল ঘেঁটে দেখেছি এই “ছত্তিশ গুণা দশ"-এর নামতাটি প্রায় ঠিক তবে সম্পর্কটা কাকতালীয়, কোনো উর্বর মস্তিষ্কের আবিষ্কার। কেননা যখন এই কেল্লা তৈরী হয় তখন গড় সমূদ্রতলের সাপেক্ষে কোনো স্থানে‌র উচ্চতা‌ নিরুপনের ধারণা ভবিষ্যতে‌র গর্ভে। হোয়াতে দেখেছি এমন‌ই এক চমকপ্রদ মেসেজ - "শিবশক্তি অক্ষরেখা"। তাতে বলা হয়েছে প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান এত‌টাই উন্নত ছিল যে উত্তরে কেদারনাথ থেকে দক্ষিণে রামেশ্বরমে রামনাথস্বামী মন্দিরে‌র মধ্যে আরো গোটা ছয়েক শিবমন্দির প্রায় একই দ্রাঘিমারেখায় (79°E) নির্মিত হয়েছে। এই দাবিও প্রায় সঠিক, তবে কোথাও এক ডিগ্ৰির বেশি বা একশো কিমির তফাৎ‌ও আছে। তবে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদবাবু‌‌ও বলে গেছেন, সব‌ই ব্যাদে আছে, সুতরাং…।
     
    গার্ডমশাইকে ওনার তথ্যসম্বলিত ভাষ্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে, কিছু বকশিশ দিলাম। কিন্তু উনি শেষে যা বললেন, মনে হোলো নিয়তি‌র নিষ্ঠুর পরিহাস।
     
    নিয়তির পরিহাস
     
    মেবারের ইতিহাসে রাণা কুম্ভের শাসনকাল (১৪৩৩~১৪৬৮) এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সুবিশাল, দুর্ভেদ্য কুম্ভলগড় কেল্লার নির্মাণ করে তিনি মেবারকে শক্তিশালী করে তোলেন। চিত্তোরগড় তো বহু শতাব্দী প্রাচীন। সেখানে‌ও তিনি কুম্ভ মহল (যেখান‌ থেকে পান্না দাই উদয়কে নিয়ে পালিয়ে আসেন)‌ নির্মাণ করেছিলেন। কুম্ভ শ্যাম মন্দিরে‌র সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেছিলেন যার সাথে পরে মীরা বাইয়ের নাম জুড়ে যায়। মালওয়ার সুলতান মাহমুদ খিলজি-র ওপর জয়ের স্মৃতিতে তাঁর নির্মিত ৯ তলা উঁচু রাজপুত সামরিক গৌরবের প্রতীক “বিজয় স্তম্ভ” চিত্তোরগড়ের সর্বাধিক পরিচিত স্মারক। তিনি চিত্তোরে শুধু নতুন স্থাপত্যই নির্মাণ করেননি, দুর্গের বহু অংশ মজবুত ও সংস্কারও করেছিলেন। স্থাপত্য ছাড়াও রানা কুম্ভ সঙ্গীত ও শাস্ত্র অধ্যয়নেও আগ্রহী ছিলেন। তাই শুধু যোদ্ধা নয়, ইতিহাসে তিনি “Scholar-King” হিসেবে‌ও পরিচিত। তাই তিনি ইতিহাসে সিসোদিয়া রাজবংশের শ্রেষ্ঠ নির্মাতা-শাসক হিসেবে মান্য।
     
    ইতিহাসে বিভিন্ন রাজবংশে সিংহাসনের লোভে ভ্রাতৃহত্যার উদাহরণ আছে। মেবারে‌ই বনবীর বিক্রমাদিত্য ও উদয় ভেবে চন্দনকে হত্যা করে। ১৫৯৫ সালে পিতার মৃত্যুর পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের ত্রয়োদশ সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেই তৃতীয় মুহাম্মদ তার ১৯ জন ভাইকে একসাথে মৃত্যুদণ্ড দেন। আওরঙ্গজেব তাঁর ভাই দারা শিকোহ ও মুরাদ বখ্‌শ-কে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে হৃদয় পরিবর্তিত মহামতি অশোক‌ নাকি যৌবনে সিংহাসনে বসার জন্য ভাইদের হত্যা করেন। সিংহাসনের জন্য পিতাকে বন্দি করে রাখার ঘটনাও আছে। গুণধর আওরঙ্গজেব‌ই শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন।
     
    তবে ক্ষমতা দখলের জন্য পিতৃহত্যা‌র ঘটনা বিরল হলেও আছে। মগধের সিংহাসনের আকাঙ্ক্ষা‌য় অজাতশত্রু পিতা বিম্বিসারকে বন্দি করেন ও তাঁর মৃত্যুর কারণ হন। এক মাঘে শীত যায় না। তাই অজাতশত্রুকে হত্যা করে তাঁর পুত্র উদয়ীন মগধের সিংহাসনে বসেন।
     
    ফেরা যাক রাণা কুম্ভ‌র প্রসঙ্গে। তখন তিনি ছিলেন কুম্ভলগড়ে। তিনি সন্ধ্যায় নিয়মিত পূজা ও সঙ্গীতচর্চা করতেন। ১৪৬৮ সালের এক সন্ধ্যায় রাণা মন্দিরে পূজায় নিমগ্ন, উদয় সিং (প্রথম) তাঁকে পিছন থেকে হত্যা করেন। ক্ষমতার লোভ ভয়ংকর।
     
    রাণা কুম্ভ কুম্ভলগড় কেল্লা নির্মান করেছিলেন বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধে এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি‌তে চিত্তোরগড় বা অন্য কোনো স্থান থেকে কৌশলগত পশ্চাদপসরণের ক্ষেত্রে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে (Fallback fort during strategic retreat). পরবর্তী‌তে মেবারের শাসকদের তা কাজে‌ও এসেছি‌ল। রাণা প্রতাপ‌ও মুঘলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন যুদ্ধে‌র সময় এখানে এসে মাঝে মাঝে আশ্রয় নিয়েছে‌ন।
     
    কিন্তু রাণা কুম্ভ তাঁর নিজের তৈরি কেল্লার অভ্যন্তরে‌‌ই তাঁর‌ সন্তানের হাতে‌ নিহত হলেন। তাই রাণা কুম্ভ‌র মৃত্যু রাজপুত ইতিহাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি এবং পিতৃহন্তারক প্রথম উদয় সিংহ এক কলঙ্কিত খলনায়ক।
     
    কিসমি যখন সেতু
     
    ফেরার পথে উৎরাই বলে কেল‌ওয়াড়া চলে এলাম গড়গড়িয়ে। একটা ৩০ সীটার ছোট প্রাইভেট বাস দাঁড়িয়ে আছে। যাবে চেতক সার্কেল। ভাড়া এ‌ক‌ই - চল্লিশ। সরকারি বাস তখনো আসেনি। হাতের একটা পাখি ছাড়তে নেই। উঠে দেখি কেবল পিছনে কয়েকটি সীট রয়েছে। কন্ডাক্টরকে বলি, ভাই মেরা ব্যাক পেন হ্যায়, বীচমে কো‌ই সীট নেহি মিলেগি?
     
    প্রাইভেট বাসের কন্ডাক্টরের রানিং মেমোরি দারুণ। যারা শেষ অবধি যাবে না, তাদের কে কোথায় নামবে, মনে থাকে। সে বাসে উঠে এদিক ওদিক দেখে ডানদিকে জানলার পাশে বসা একটি কিশোরকে বলে, বেটা, তু তো সামনে উতর যায়েগা, যা, পিছলে সীটমে বৈঠ যা, ইঁয়াহা বাবুজীকো বৈঠনে দে।
     
    রঙ্গে ভরা বঙ্গে কন্ডাক্টর এমন কথা কাউকে বললে কথাকাটাকাটি লেগে যেতো। কিন্তু একাকী ভ্রমণে মধ্যপ্রদেশে দেখেছি কন্ডাক্টরের বলাতে অনেক যুবক‌ও সীট ছেড়ে দিয়েছে। হয়তো কন্ডাক্টরের দাপটে নয়, আমি পরদেশী বুজুর্গ বলে‌ - সৌজন্যে, শিষ্টতায়। রাজস্থানে‌ও তার ব্যত্যয় হোলো না।
     
    বাস চলতে শুরু করলো। আমার সামনে টানা আড়া সীটে বছর ত্রিশের গ্ৰাম্য মহিলা বসেছে। কোলে একটা বছর তিনেকের ছেলে, পাশে আমার হাঁটুর সামনে বছর পাঁচেকের একটি মেয়ে, তার‌ই দিদি মনে হোলো। হয়তো আমায় স্থানীয়‌দের মতো দেখতে নয় বলে তারা দুজনেই মাঝে মাঝে আমায় আড়চোখে দেখছে। চোখাচোখি হলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। আমার বেশ মজা লাগে।
     
    উইন্ডচিটাররে বুক পকেটে কয়েকটা কিসমি টফি ছিল। আমি একটা বার করে ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে ধীরে সুস্থে মোড়ক খুলে মুখে ফেলি। যা ভেবেছি। দুটি শিশু গভীর আগ্ৰহে আমায় দেখছে‌। এবার একটা টফি বার করে মেয়েটি‌র হাতে দি‌ই। দিদি বলে কথা, ও মোড়ক ছাড়িয়ে টফিটা ভাইকে দেয়। আর একটা বার করতে দেখি তার মুখে লেগে আছে প্রত্যাশা। টফিটা ওকে দিতে এবার ও মোড়ক খুলে নিজে খায়।
     
    নরম কিসমি টফি মুখে দিলে একটু পরে‌ই চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। বাস চলছে, আমি কিছুক্ষণ পরে পরে, ভাই আর বোনকে একটা করে টফি দিচ্ছি। কুড়িটা টফির মধ্যে আমি খেয়েছি দুটো, চায়ের দোকানে আর কেল্লায় শিশুদুটিকে দিয়েছি ছটা। অর্থাৎ আমার পকেটে ছিল বারোটা। ওরা ভেবে পাচ্ছে না, কতো টফি আছে আমার পকেটে। ওদের মাকে দেখে মনে হয় প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষ। চকলেট, টফি ওদের কাছে হয়তো বিলাসিতা।
     
     
    তবু মনে হোলো, ভাইবোনের দৃষ্টিতে আগ্ৰহ থাকলেও লোভ নেই। না পেয়ে পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেলে শিশুদের মধ্যেও একটু নির্লিপ্ততা এসে যেতে পারে। বাস উদয়পুরে ঢুকছে। তখন‌ও পকেটে গোটা ছয়েক টফি। সবকটা বার করে মেয়েটির হাতে দি‌ই। আর্থিক মূল্য তার খুবই সামান্য, কিন্তু তা পেয়ে দুজনের মুখে যে হাসি দেখলাম, তার মূল্যায়ন টাকায় হয়না। এবার তাদের মাও দেখি মুখে আঁচল দিয়ে হাসছে। অর্থাৎ চলন্ত বাসে এতক্ষন ধরে নীরবে যে নাটক হচ্ছিল, সব‌ই টের পেয়েছে সে।
     
    কেল্লা থেকে ফেরার সময় রাণা কুম্ভ‌র মর্মান্তিক অন্ত জেনে মন একটু বিষন্ন হয়ে গেছিল। বাসে দুটি শিশুর সাথে কিসমির দৌলতে নীরব আদানপ্রদানে একটু হালকা লাগলো। সেদিন কুম্ভলগড় ভ্রমণে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছিল আড়াইশো‌ টাকার‌ও কম। অথচ গাড়িতে গেলে, কেবল তাতেই লাগতো আড়াই হাজার। তাই শুরুতে বলেছিলাম, একাকী ভ্রমণে জনবাহনে গেলে খরচ তো অনেক কম হয়‌ই, সাথে বোনাস হিসেবে এমন কিছু তুচ্ছ ঘটনার সুন্দর স্মৃতি মনে রয়ে যায় বহুদিন।
     
    পুনশ্চ - Ext HDD ক্র্যাশ করে কুম্ভলগড়ের সাথে আরো বহু ছবি চিরতরে উড়ে গেছে। ঐ শিশু দুটির ছবি অন্য জায়গায় ছিল বলে বেঁচে গেছে। তাই এ লেখায় সব ছবি নেট থেকে নেওয়া। রাজপুত এলাকার ম্যাপ ও কুম্ভলগড়ের পোলের স্কিমেটিক স্কেচ জীপুদার সাথে কয়েকবার আলোচনা করে নামিয়ে‌ছি। তথ্যসূত্র নেট ও জীপুদা।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    ১-মুখবন্ধ | ২-বিদিশা | ৩-ধূবেলা | ৪-গোপেশ্বর | ৫-ধূবেলা পুনশ্চ | ৬-মারকুটে মাস্টারের সাথে | ৭-চান্দেরী | ৮-ফুহারীজী | ৯-করেরা | ১০-সুরয়ায়া গড়ি | ১১-ভাদিয়াকুন্ড-১ | ১২-ভাদিয়াকুন্ড-২ | ১৩-ভাদিয়াকুন্ড-৩ | ১৪-নরোয়র-১ | ১৬-পানহালা | ১৫-নরোয়র-২ | ১৭-কালিঞ্জর | ১৮-দেবপ্রয়াগ | ১৯-দেবগড় | ২০-শ্রেয়াংসগিরি-১ | ২১-শ্রেয়াংসগিরি-২ | ২২-শ্রেয়াংসগিরি-৩ | ২৩-মুক্ত বন্দীশালা-১ | ২৪-মুক্ত বন্দীশালা-২ | ২৫-মুক্ত বন্দীশালা-৩ | ২৬-অনসূয়া দেবী-১ | ২৭-অনসূয়া দেবী-২ | ২৮-অনসূয়া দেবী-৩ | ২৯-ভদ্রেশ্বরের আশেপাশে-১ | ৩০-ভদ্রেশ্বরের আশেপাশে-২ | ৩১-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-১ | ৩২-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-২ | ৩৩-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-৩ | ৩৪-চিত্রকূট-উদুপী ট্রেনযাত্রা-৪ | ৩৫-পদব্রজে আউলি | ৩৬-চৌকরি | ৩৭-কুম্ভলগড়
  • ভ্রমণ | ০৭ জুন ২০২৬ | ৭৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ০৭ জুন ২০২৬ ১৯:০৫741078
  • অসাধারণ। কত কিছু বিক্ষিপ্ত অসংলগ্ন ভাবে জানতাম মানে আধখানা ধাতরী পান্না,একা কুম্ভ, চিত্তেরা গড - এমন সুন্দর ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে কখনো পড়ি নি। ইতিহাস ভূগোল মিলে মিশে একাকার। ফাইল করে রাখলাম। যদি পারতাম যদি অনুমতি দিতে সঙ্গ নিতাম। জয় হোক
  • kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ০৭ জুন ২০২৬ ২১:৪২741081
  • খুবই ভালো লাগলো পড়তে। ইতিহাস, তথ্য, অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে জমজমাট। আমি রাজস্থান গেছিলাম একবার। উদয়পুর, পিচোলা লেক সবই দেখেছিলাম। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে ঘোরা, বেশি কিছু মনে নেই। তবু আপনার লেখা পড়তে পড়তে সেইসব কাঁচ ও আয়নার টুকরো বসানো রঙীন ঘাঘরা, কারুকাজ করা বা ছবি আঁকা সব দেওয়াল, রাবড়ি ঢালা ঘেভর, টাঙ্গা, এইসব ছবি মনের মধ্যে ভেসে উঠলো।ছবিগুলো নেট থেকে নেওয়া হলেও ভালো লাগলো। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়ে পুরো উদয়পুর শহরের ছবিটা তো অসাধারণ। খুবই ভাগ্যের কথা যে বাচ্চা দুটির ছবি অন্য জায়গায় সেভ করা ছিলো। লস্ট ইন থট্স শিশুটির ঐ জলভরা দুচোখ আর মুখের উদাস ভাব, শুধু ঐ থেকেই হয়তো একটা গল্পের জন্ম হতে পারে, যাঁরা এই ধরণের লেখা লিখতে পারেন তাঁদের হাতে।
  • Debanjan Banerjee | ০৭ জুন ২০২৬ ২৩:০৫741083
  • অসাধারণ হয়েছে ভ্রমণকাহিনী l ঋদ্ধ হলাম l লেখককে অনেক ধন্যবাদ l চিতোর গড় গতবছর অক্টবরে দেখেছি l আচ্ছা একটা অভিজ্ঞতা হলো মেবার চিতোর যোধপুর জয়পুর জয়সলমীর প্রভৃতি সব জায়গাতেই নিজস্ব ভাষা আছে সেগুলো সব স্বতন্ত্র ভাষা কিন্তু স্কুলগুলোতে শুধু হিন্দী শেখানো হয় কোথাওই নিজেদের মাতৃভাষা শেখানো হয়না l অর্থাৎ এটাই ইতিহাসের প্রবল কৌতুক বোধয় যে রানা প্রতাপের মাতৃ ভাষা কি ছিলো এখন তার সাধের মেবার তো জানেইনা উপরন্তু যে মোঘলদের বিরুদ্ধে এতো বছর যুদ্ধ করলো মেবার তার নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে সেই মোঘলদের হাত ঘুরে তৈরী হওয়া হিন্দিই এখন মেবারের সরকারী ভাষা ! এটাই বোধয় রাজস্থানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌতুক ! আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার লেখক যে মারাঠি রানী তারাবাই এর উল্লেখ করছেন সম্ভবতঃ তার আমলেই মারাঠা ও রাজপুতদের মধ্যে প্রবল সংগ্রাম হয় l উদয়পুরও বোধয় মারাঠাদের হাতে আসে l ইতিহাসে এসব বিশেষ পাওয়া যায়না l
  • সমরেশ মুখার্জী | ০৮ জুন ২০২৬ ০০:২৮741087
  • হীরেনদা, দেবাঞ্জন - অনেক ধন্যবাদ
     
    Kk - হুমম- ঐ চোখ ছলছল শিশুটির ছবি আমি বহুবার একমনে দেখেছি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন