মন্ডলে রয়েছে সীতারাম আশ্রম। শুনলাম ওখানে এক সাধিকা গিরিজা দেবী বিগত ২৩ বছর যাবৎ সন্ন্যাসজীবন যাপন করছেন। পাশে সংস্কৃত বিদ্যালয়। পাকা রাস্তার বাঁদিকে সাধারণ মানের অনসূয়া লজ। ৬০০ টাকা ভাড়া। রাস্তার ডান দিকে সতী অনসূয়া দেবী যাত্রাপথের শুরুতে মাতাজীর নামাঙ্কিত তোরণ। কিছুটা কংক্রিট বাঁধানো রাস্তা পেরিয়ে কাঁকুড়ে পথে চলা শুরু করলাম সোয়া দশটা নাগাদ।
আশপাশে অল্প কিছু বাড়িঘর। একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়। শান্ত পরিবেশ। ডানদিক দিয়ে নামছে উচ্ছল অমৃতগঙ্গা শাখানদী। নীচে মন্ডলেই গিয়ে মিশেছে দুরে বালখিল্য নদীতে। চারপাশে অঢেল সবুজ। ঝকঝকে নীলাকাশ। দুরে পাহাড়ের মাথায় বরফ। উজ্জ্বল সূর্যালোক। এমন পরিবেশে হেঁটে যাওয়া অত্যন্ত আনন্দময় অভিজ্ঞতা। শান্ত ফাঁকা পথে এক বয়স্ক মানুষ আগে চলেছেন লাঠি নিয়ে। সিরোলি গাঁও অবধি ঐ পথে কয়েকজন গ্ৰামবাসীকে আসতে যেতে দেখলাম। তারপর দু এক জনকে নেমে আসতে দেখলাম। যেতে কাউকে দেখলাম না। চারধাম যাত্রার সীজনে ওদিকে লোকজন খুব কম আসে। মন্ডল থেকে একটু গিয়ে বাঁদিক বোর্ডে লেখা দেখলাম NOKIA কোম্পানি ওখানে একটা ওয়াটার-মিল বা জলধারা দ্বারা চালিত যাঁতাকল বা পানিচাক্কি মেরামত করে দিয়েছে।
অতীতে মুঘল জমানায় ১৭৪৪ খ্রীষ্টাব্দে ঔরাঙ্গাবাদে বাবা শা মুসাফির দরগাহতে একটা পনচাক্কি বা ওয়াটার-মিল বানানো হয়েছিল। ৬ কিমি দুর থেকে নালায়, পাইপে করে জল এনে চালানো হোতো সেটা। ১৯৭৯ সালে প্রথমবার ঔরাঙ্গাবাদে গিয়ে ওটা চালু অবস্থায় দেখতে পাইনি। তার অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ৩২ বছর পরে ২০১১ সালে আবার গেছি। দরগাহ, বাগিচা, জলাধর সব আছে। সুন্দর পরিবেশ। হবে নাই বা কেন - পনচাক্কি মহারাষ্ট্র ওয়াকফ বোর্ডের মূখ্যালয়। কিন্তু চাক্কি আর ঘোরে না। তার চাকরি গেছে। প্যাকেটের আটা এসে কজনেই বা এখন আর চাক্কিতে যায়।
কিন্তু মন্ডলে তখনো নিখরচায় চাক্কি চলে জলে। কাছেই একটা ছোট ঘরের নীচে আছে পানিচাক্কিটা। কাছে গিয়ে দেখি পথের বাঁদিকে ছোট্ট পাহাড়ি নালা দিয়ে তীব্রবেগে জল যাচ্ছে। চাকি ঘুরিয়ে পথের তলা দিয়ে পাইপে পেরিয়ে ডানদিকে অমৃতগঙ্গায় গিয়ে মিশছে সেই জলের ধারা। চাক্কিঘরে একটা বড় স্থির (static) গোল পাথরের চাকার ওপর ছোট একটা চাকা জলের শক্তিতে ঘোরে।
কিন্তু চাকাটা ঘোরার কৌশল সামনে থেকে দেখে বোঝা গেল না। ওপরের চাকার কেন্দ্রে একটা ছিদ্র। তাতে ওপরের শঙ্কু থেকে জোয়ার, বাজরা যে যা পিষতে চায় নিয়ন্ত্রিতভাবে পড়ছে। সেগুলি পিষে গিয়ে কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে (centrifugal force) চাকির বাইরে জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যে পিষতে এসেছে সে পেষা শষ্য কুড়িয়ে বস্তায় ভরে চলে যাওয়ার আগে হ্যান্ডল ঘুরিয়ে চাকিটা বন্ধ করে যাচ্ছে। হ্যান্ডলটা একটা বাইপাস ভালভ। ওটা ঘোরালে জলধারা চাকি না ঘুরিয়ে নদীতে গিয়ে পড়বে। শষ্য ছাড়া ঘুরে চললে চাকি ক্ষয়ে যাবে বলে বাইপাস ব্যবস্থা করা আছে। বেশ লাগলো দেখে সরল ব্যবস্থা। অল্প জনসংখ্যার জন্য যথেষ্ট।
আরো খানিক যেতে চোখে পড়লো সিরোলি গ্ৰামের ছোট্ট তোরণ। অমৃতগঙ্গার পুল পেরিয়ে যেতে হয়। ঐ পুলে গাড়ি যায় না। ওটা পদচারীদের জন্য। ছোট গাড়ি আসতে পারে ঐ তোরণ অবধি। এতক্ষণ অমৃতগঙ্গা ছিল পথের ডানদিকে - একটু দুরে। সিরোলির পর তা প্রায় পথের পাশে বাঁদিকে নেচে নেচে নামবে। সিরোলি ছোট গ্ৰাম। লোকজন বেশী দেখা গেল না।
একটি ঘরের দাওয়ায় কিছু পাকা শষ্যের আঁটি ফেলে দুই মহিলা লাঠি দিয়ে ধাঁই ধপাধপ পিটে চলেছেন নির্দিষ্ট ছন্দে। বুঝলাম পিটিয়ে দানা ঝাড়াই হচ্ছে। সহ্যাদ্রীতে প্রত্যন্ত গাঁয়ে একটু বড় স্কেলে চক্রাকারে মহিষ চালিয়ে মাড়াই হতে দেখেছি। আমি দোকান থেকে চাল, আটা কিনে খাওয়া পাবলিক। জমির সাথে যোগাযোগ নেই। পাকা সোনালী শষ্যের আঁটি দুর থেকে আমার চোখে ধান, গম একই লাগবে। তবু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখি ওনাদের পিটিয়ে ঝাড়াইয়ের কায়দা। বেশ পরিশ্রমের কাজ। চেনে বাঁধা লোমশ পাহাড়ি কুকুরটি খুব চেঁচায়। ভাবখানা, তুমি কে হে হরিদাস পাল যে ছবি নিচ্ছো? বেচারা কীভাবেই বা জানবে এসব বেত্তান্ত পরে আমি হরিদাস পালে ছাড়বো। পোষ্যের গার্জেনগিরি দেখে সবুজ কাপড় পরা মহিলাটি আমার দিকে একবার মুখ ফিরিয়ে হেসে তাদের পোষ্যকে স্নেহের ধমক দেন - আরে, বস্ কর, চুপ হো যা। সে থেমে যায়। আমি এগোই।
এ পথে মাঝে মাঝে PWD রাস্তার পাশে তীর্থযাত্রীদের জন্য রেনশেড বানিয়েছে ফলে বসে একটু বিশ্রাম নেওয়া যায়। ঝর্ণা থেকে পাইপ এনে পানীয় জলের কল বানিয়েছে। তাই বেশী জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। ওপরে জনবসতি নেই। পাহাড়ি ঝর্ণার জল হয়তো এমনই পান করা যায়। তবু একাকী ভ্রমণে আমি জলের ব্যাপারে একটু সাবধানতা নিই। ৩৫ দিনের ভ্রমণে এক বোতল জলও কোথাও কিনিনি। যেখানে যা জল পেয়েছি ফিলটার ব্যাগ দিয়ে ছেঁকে বোতলে ভরে ১০ মি.গ্ৰা/লিটার হিসেবে ক্লোরিন ট্যাব দিয়ে খেয়েছি। এভাবেই অনেকগুলো ভ্রমণ করেছি। কোথাও পেটের গোলমালে ভুগিনি।
সিরোলি থেকে কিছুটা এগোতে আবার এলো অমৃতগঙ্গার ওপর একটা সেতু। সেতু পেরোতেই শুরু হোলো চড়াই। জানিনা এই চড়াইয়ের কথা ভেবেই অরুণা বলেছিল কিনা - আঙ্কল আপ থক যায়েঙ্গে। কিন্তু টেন্ট, অতিরিক্ত মাল সমেত বড় স্যাকটা রেখে এসেছি গোপীনাথ মন্দিরে রামপ্রসাদের জিম্মায়। চলেছি একটা ল্যাপটপ স্যাক নিয়ে। হাতে ট্রেকিং পোল।
তখন পৌনে উনষাটে দিব্যি ফিট আছি। তাই নিজস্ব ছন্দে ধীর লয়ে উঠে যেতে অসুবিধা হয় না। বেড়ানো মানে তো শুধুই চলা নয়। কখনো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কেবলই দেবভূমি হিমালয়ে নয়। বিশাল পাহাড়শ্রেণীর এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আছে। পশ্চিমঘাট, পূর্বঘাট, সাতপূরা, নীলগিরি, বিন্ধ্যাচল, আরাবল্লী - নানা জায়গায় উপলব্ধি করেছি তা। তখন সাহচর্যের কলতান ভালো লাগে না। একা যাওয়ার এইটা বিশেষ সুবিধা।
এই পথে কয়েকটি স্বাস্থ্যবান চকচকে স্যালাম্যান্ডর দেখলাম। স্যালাম্যান্ডর, গিরগিটির ছবি বেশ ওঠে। একেকটার একেক বাহার। ২০১৬তে অন্ধ্রে নাগার্জুন সাগরের ঘাটে দেখেছিলুম নীচের এই সুন্দর কালচে ধূসরের চেকের ওপর হলুদ ডোরাকাটা স্যালাম্যান্ডরটি।
কর্ণাটকে ২০২১এ চিত্রদূর্গ কেল্লায় দেখা গিরগিটিটির ক্যামোফ্লেজ তো লেগেছিল অসাধারণ। ওখানকার ছিটছিট গ্র্যানাইট পাথরের সাথে ওর শরীরের ছোপ এমনভাবে অভিযোজিত হয়েছে যে কাছ থেকেও ভালো করে খেয়াল না করলে চোখেই পড়বে না। প্রকৃতির কী বিচিত্র সব সৃষ্টি! তখন ক্যামেরা ছিল না। মোবাইলেই ধরেছিলাম তাকে।
তবে আমার গিরগিটি কলেকশনের খুব পছন্দের ছবিটা উঠেছিল ২০১১তে তামিলনাড়ুর কোডনাডু ভিউপয়েন্টে। দুরে দিগন্ত বিস্তারিত নীলগিরি পর্বত দেখছি। হঠাৎ সামনে পাথরে দেখি কালো ও গেরুয়া কম্বিনেশনের একটি গিরগিটি। তখন সাথে ছিল 5mp Sony ক্যামেরা। দুর থেকে দু একটা তুললাম। মন ভরলো না। রেলিং টপকে কাছে গিয়ে ক্লোজ আপ নিতে যাই। গার্ড বলে রেলিং পেরোবেন না - ভালো ড্রপ আছে আগে - পড়ে যাওয়ার চান্স আছে।
কিন্তু এককালে সামান্য শৈলারোহণের অভিজ্ঞতায় বুঝি খরখরে পাথর, নতুন উডল্যান্ড জুতোর জব্বর সোল - নেহাত ল্যাদোষ না হলে বা ভার্টিগো না থাকলে হড়কানোর কথা নয়। ওকে ইশারায় বোঝাই It’s OK. সাবধানে কাছে যাই। সে পুটপুট করে মাপছে আমায়। বেশী কাছে গেলাম না - যদি পালায়। 12X জুমে ছবিটা তুলতে পিছনে নীলগিরি উধাও হয়ে রেখে গেল সবুজাভ bacground blur. সেই প্রেক্ষাপটে তার সমাহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিটা লেগেছিল খুব মিষ্টি! টেলিলেন্স হলে আরো শার্প আসতো ছবিটা।
অনসূয়া দেবীর পথেও যেখানে বসেছিলাম পাশে পাথর থেকে একটা চকচকে স্যালাম্যান্ডর আমায় কৌতূহলী চোখে দেখছিল। কিন্তু বড় লাজুক। ক্যামেরা নেই। মোবাইল নিয়ে একটু কাছে যেতেই সুরুৎ করে সরে পড়লো।
গম্ভীর পাইনের ডাল হাওয়ায় মৃদুমন্দ দোলে। আকাশে মেঘের জন্য দুর পাহাড়ে সবুজের ওপর আলোছায়ার খেলা। হিমালয়ের নিঃসীম নির্জনতা মনে শান্তির চামর বোলায়। সেতু পেরিয়ে ওপরে উঠতে অমৃতগঙ্গা নীচে জঙ্গলে কোথাও আড়ালে হারিয়ে গেল। মন্ডল থেকে আন্দাজ আড়াই কিমি এসে সেতু পেরিয়ে একটু এগোতে পড়েছিল শিশুপাল বিস্তের চায়ে নাস্তার দোকান।
পরিচিত সঙ্গীর সাথে হপ্তা দুয়েক অবধি ভ্রমণ ঠিক আছে। তার বেশী হলে নানা কারণে ছানা কাটতে শুরু করে। কিন্তু দু মাসের একাকী ভ্রমণেও কখনো সঙ্গীহীনতার চাপ অনুভব করিনি। সেলফ ড্রাইভ করে বেড়াতে গেলে বাস্তবিক কারণে সাথে একজন থাকলে সুবিধা হয়। কারণ পথে গাড়ি খারাপ হতেই পারে। জনবাহনে গেলে সে প্রয়োজন নেই। একাকী ভ্রমণে সঙ্গীর অভাব বোধ না করলেও চলার পথে স্থানীয় মানুষের সাথে গল্পগুজব করতে ভালোই লাগে। যাদের সাথে আর কখনো দেখা হবেনা তাদের সাথে ক্ষণিকের আলাপ স্মৃতিতে রয়ে যায় বহুদিন।
শিশুপাল অমায়িক মানুষ। সিরোলিতেই জন্ম। জানালো আগে ও কেদারনাথের পথে খাবারের স্টল দিয়েছিল। দুটো খচ্চরও কিনেছিল। লোক লাগিয়ে ওদুটো দিয়ে তীর্থযাত্রী বহন করে অতিরিক্ত উপার্জন হোতো। ভালোই চলছিল। কিন্তু দুটো খচ্চর, দিন পনেরোর রোজগারের টাকা, মালপত্র সমেত ওর দোকান ভেসে গেল ২০১৩ সালের জুনে কেদারনাথ প্রলয়ে। কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গাঁয়ে পালিয়ে আসে শিশু। আর যায়নি কেদারখণ্ডে বেশী রোজগারের আশায়। বারোমাস এই দোকান চালায়।
কাছেই সিরোলিতে ওর পরিবার থাকে। অফ সিজনে সন্ধ্যায় ঘরে চলে যায়। সিজনে রাতেও থাকে দোকানে। তখন ওর পোষ্য কুকুরটি থাকে ওর সাথে। সোলার প্যানেল দিয়ে লাইট জ্বলে। যাত্রীরা চাইলে একটু মোবাইল চার্জ করতে পারে। ওখানে BSNL সিগন্যাল আসে।
বলি, শিশুভাই এ পথে লোকজন তো বিশেষ দেখছি না, রোজগারপাতি হয় তেমন? শিশু বলে, কেদারের মতো হয় না। এখন সিজনও নয়। অগ্ৰহায়ণ মাসে গুরু দত্তাত্রেয় জয়ন্তীর সময় একমাস ধরে অনেক তীর্থযাত্রী আসেন। তখন লক্ষ্মী, সরস্বতী, ভগবতী, জ্বালাদেবীর ডোলি গোপেশ্বর, সগ্গর, মণ্ডল থেকে চতুর্দশীতে এসে পৌঁছয় অনসূয়া মন্দিরে। পূর্ণিমার পর ফেরৎ চলে যায় ডোলি। তখন দুদিনের বড় মেলা হয়। বহু লোক আসেন। নবরাত্রির সময়েও অনেকে আসে।
ডিসেম্বরের শেষে ও জানুয়ারিতে হালকা বরফ পড়ে। এখানে কেদারনাথের মতো শীতে মন্দির, যাত্রী চলাচল বন্ধ হয়ে যায় না। তাছাড়া নিঃসন্তান দম্পতিরা সারা বছর আসেন সতী মায়ের থানে সন্তান কামনায় মানত করতে। মানত পূর্ণ হলে সপরিবারে আসেন পূজো দিতে। এভাবে সারা বছরই লোকজন আসেন। তাই চলে যায় মোটামুটি।
শিশুর দোকানে বসে মশালা ম্যাগী আর চা খাই। এক প্যাকেট পার্লেজি কিনে ওর পোষ্যর জন্য শিশুর হাতে দিই। শিশু খাওয়ায় ওকে। সে HMV স্টাইলে বসে কুপকুপ করে খায়। শিশুকে বলি আমার মতো একা যাত্রী চাইলে তোমার দোকানে রাতে থাকতে পারে? শিশু বলে, হ্যাঁ, থাকতেই পারে। তখন আমিও থেকে যাবো তার সাথে। মেলার সময় থেকেওছে অনেকে। একজন কেন চারজন থেকেছে। ডিসেম্বরে ঠান্ডা ভালো পড়ে। মেলা হয় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। এক্সট্রা ফোম ম্যাট আছে। তখন পেতে দিই মাটিতে। থাকার জন্য কিছু চাই না। এটা তো ঠিক থাকার জায়গা নয়। খুশি হয়ে যে যা দেয় তাই সই। সামান্য কিছু দৃশ্যাবলী - মামূলী কিছু কথা। তবু বেশ লাগে। সমাজমাধ্যমে চালাক চালাক শহুরে আদানপ্রদাণে ক্লান্ত মন আরাম পায়।
শিশুর দোকান থেকে বেরিয়ে চলতে শুরু করি। কুকুরটি কিছুদুর চলে আমার সাথে। লেপার্ডের প্রিয় খাদ্য কুকুর। ও যখন নিশ্চিন্তে এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন নিশ্চয়ই আশপাশে গুলবাঘ নেই।
আরো কিছুটা যেতে রাস্তার পাশে দেখলাম একটা শিলালিপি। ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের দেরাদুন সার্কেলের ফলকে ইংরেজিতে এর বিষয়ে যা লেখা আছে তার সংক্ষিপ্তসার এরকম -
ROCK INSCRIPTION, MANDAL. The inscription is in Sanskrit language and northern brahmi script. It says one Kshatriya Naravarman under the Maharajadhiraja Paramesvara Saravarman, constructed a water-reservoir and a temple. The king may be identified as Maukharı king Sarvarman who ruled from 576 to 580 AD. This inscription is historically significant as this is the earliest inscription mentioning a ruling king in Uttarakhand after Mauryan king Ashoka's Kalsi Rock Edict.
দেড়টা নাগাদ চোখে পড়লো মন্দির চত্বর। পিছনের গাছটি শুনলাম বহু প্রাচীন। মন্ডল থেকে পুরো পথ নির্দিষ্ট। হারানোর সম্ভাবনা নেই। পাথর বাঁধানো বা কংক্রিটের পথ। এপথে অশ্বেতর চলে বলে সিঁড়ি নেই। আমি রাতে ওখানে থাকবো ভেবেই গেছি। তাড়া নেই। রাস্তায় টুকটাক জিরিয়ে, এপাশ ওপাশ দেখে, পানিচাক্কি পর্যবেক্ষণ করে, শিশুপালের ধাবায় গল্প করে, কোথাও চুপচাপ কিছুক্ষণ বসেছি। এসবে ঘন্টাখানেক গেছে। সোয়া তিন ঘন্টায় গেছি। মানে ৫ কিমি পথ হাঁটতে লেগেছে সোয়া দু ঘন্টা।
মন্দিরের একটু আগে এলো তিওয়ারি লজ। শয্যা প্রতি ১৫০ টাকা। দ্বিশ্যয্যার ঘর ৫০০ টাকা। ঘুপচি ঘর, অপরিচ্ছন্ন বিছানা। অত্যন্ত কম খরচে একাকী ভ্রমণ করে যে কোনো অবস্থায় মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতার একটু গুমোর হয়েছিল। সেবার উত্তরাখণ্ডেও যাত্রা সীজনে হরিদ্বার টু হরিদ্বার খরচ হয়েছিল দিনপ্রতি ২৯৫ টাকা।
অবশ্য তার একটা কারণ ছিল। দেবপ্রয়াগ, বিষ্ণুপ্রয়াগ, গোবিন্দঘাট, গুপ্তকাশী, শোনপ্রয়াগ, উখিমঠ, যোশিমঠ, আউলি, গোপেশ্বর, অনসূয়া দেবী ইত্যাদি জায়গায় চোদ্দটি রাত্রিবাসে কোনো খরচই লাগেনি। তুঙ্গনাথ, দেওরিয়া তাল, খিরসু, কর্ণপ্রয়াগ, রূদ্রপ্রয়াগ ইত্যাদি জায়গায় রাত্রিবাসে হয়েছে অবিশ্বাস্য কম খরচ। নাহলে এতো কমে হয় না। তিওয়ারি লজ দেখে মনে হোলো নিরুপায় না হলে এখানে রাত্রিবাস করতে ইচ্ছে হবে না। বরং দেবপ্রয়াগ সঙ্গম ঘাটে তিনদিক খোলা ঢাকা চাতালে আরামে কাটিয়েছি দুরাত। (এই সিরিজের ১৮ নং পর্ব শুভারম্ভ)।
লজকে বাঁয়ে রেখে এগোই মন্দিরপানে। চোখে পড়লো একটা বড় শেড। পরে জেনেছি ডিসেম্বরে দত্তাত্রেয় জয়ন্তী মেলার সময় লোকজন এখানে আশ্রয় নেয়। পাশে শৌচালয়ও আছে দেখলাম। মেলার সময় অস্থায়ী তাঁবুও লাগে ঐ মাঠে। ধর্মশালা ইত্যাদি নির্মাণ হবে শুনলাম।
প্রাচীন মন্দিরের পিছনে বিশাল এক চীর গাছ। অনসূয়াদেবীকে ভক্তজন সন্তানদায়িনী মাতা জ্ঞান করেন। তাই নিঃসন্তান দম্পতি এখানে এসে সন্তানকামনায় মানত করে ঐ গাছে সূতো বাঁধেন। মনোস্কামনা সফল হলে মন্দিরে এসে গাছ থেকে সূতো খুলে চারপাশে লাগানো বাঁশে, রেলিংয়ে ঘন্টা বেঁধে যান। নানা সাইজের ঘন্টা। যার যেমন সামর্থ্য।
তবে মানত পূরণ হলে পরে কার সূতো কে খোলে তার ঠিক নেই। আজমীর শরীফে খোয়াজা গরীবে নওয়াজ দরগাহতে সূতো বেঁধে অমিতাভ বচ্চন চার দশক বাদে গিয়ে খুলেছিলেন - সে সূতো অবশ্যই তাঁর বাঁধা নয়।
কার্যকারণ যাই হোক, মন্দিরের চারদিকে বাঁধা অসংখ্য ঘন্টা বহু মানতকারীর মনোবাঞ্ছা পূরণের সাক্ষী। প্রাচীন মন্দিরের সামনে আধুনিক এক্সটেনশন। বড় মন্দির চত্বর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন।
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।