
নাচনডুবি বাগান; একটি ঢেউ খেলানো সবুজ বাগান। পাহাড়তলার এই জায়গাটি বুঝি বড়ো ভয়ঙ্কর জায়গা—লোকে বলে অভিশপ্ত জায়গা; তাই নামটাও নাচনডুবি। বেলা পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড় থেকে অপ্সরা কন্যারা নেমে এসে এই ঢেউ খেলানো ভূমিতে নেচে বেড়াত। সূর্য ডুবে গেলে পাহাড়তলার লোকজন এদিকে কক্ষনোই আসত না। যেই কিনা এই বেলা পড়বার সময়ে এখানে এসে কমলা রঙের আলোয় এই অপ্সরাদের নাচতে দেখেছে—সেই রক্তবমি করে মরত!গ্রামের বসতি আর নাচনডুবিকে আলগা করেছে মাঝের ননৈ নদী। ... ...

শুকদেব যে কতো বড় জহরিলা জীব, সে কথা ভাল বুঝেছিল গঙ্গুঠা চামার। অন্যদের সঙ্গে প্রায়ই যেমন করত, তেমন করে তার জমি কাড়েনি শুকদেব বা ঘরের মেয়েদের দিকেও নজর দেয়নি। কিন্তু একটা হলুদ ভেলভেটের টুকরোর মতো ঝলমলে আলো ঠিকরানো সকালে গঙ্গুঠা মকাই ক্ষেতের পাশে উঁচু গাছের নীচে বসে টিয়েপাখির ঝাঁক দেখছিল। ... ...

আমি অনেক চেষ্টা করলাম চন্দ্রাকে বোঝাতে, কিন্তু সে কিছুতেই তার মত পরিবর্তন করতে চাইলো না। চন্দ্রা বলল, ‘আমি কি কষ্ট করে দই ভাত খাই, সেটা তো তুমি বোঝো। তোমরা প্রতিজ্ঞাও করলে যে আমি যা চাইবো, সেটা তোমরা দেবে। এখন কেন কথার খেলাপ করছো? তুমিই তো আমাকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের চরিত্র এবং তার আদর্শ সম্বন্ধে গল্প শুনিয়েছিলে। ... ...

চারিদিকের আলোটা ধীরে ধীরে কমে আসতে তাতান চোখ পিটপিট করে দেখল, চারপাশ পুরো বদলে গেছে। ও হঠাৎ একটা অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি প্লাস কন্ট্রোল সেন্টার ধরণের জায়গায় এসে হাজির হয়েছে। আশেপাশে বেশ কিছু লোক ব্যস্তসমস্ত হয়ে কত কী খুট খাট করছে বিশাল বিশাল স্ক্রিনের সামনে বসে, সাথে ট্যাবে নোট করছে হাজার রকম হিসেব নিকেশ। সামনে তাকিয়ে দেখল, ওই লম্বা মতো লোকটা চিন্তিত মুখে ঠিক ওর দিকে তাকিয়ে আছে, 'আপনি ঠিক আছেন তো তাতান?' ... ...

পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে পয়সা তোলা দেখে যেন বনমালী চৌধুরির স্নায়ুগুলো শান্ত হয়ে এল। আজ মালতীর ঘরে যাবেন বলে ভাবছিলেন তিনি; ধনদা এসে বলে গেছে—ওর বুঝি শরীর ভালো না, মাথা ঘোরাচ্ছে। এর মানে আরও একটা খরচা বাড়ল— বাইরে বের করা, অন্নপ্রাশন; না করলেও তো নয়, মৌজাদারের রক্ত বলে কথা!শান্তিপ্রিয়ার দিকের যমজ ছেলে দুটি মঙ্গলদৈর হাইস্কুলে পড়াশোনা করছে; কলেজে পড়াতে হবে, কলকাতা পাঠাতে হবে। ... ...

রবিবার ২৫শে অক্টোবর সার্বিয়ার নির্বাচনে আলেকজান্দার ভুচিচের হেরে যাওয়ার খবরটা অন্য অনেক দেশের কাছে হয়তো ছিল আরেকটি রাজনৈতিক পালা বদল মাত্র, দক্ষিণ থেকে বাঁয়ে। কিন্তু নানান নিউজ মিডিয়া, সার্বিয়া ও বলকান সংবাদ থেকে জানলাম সার্বিয়ার স্টুডেন্ট লিস্টের নামে সবচেয়ে বেশি অভিনন্দনের বন্যা এসেছে যে দেশ থেকে তার নাম হাঙ্গেরি; ঠিক সাত মাস আগে মার্চ ২০১৬ তারা ষোলো বছরের অরবান অপশাসনের অবসান ঘটিয়েছেন। কোনো এক জায়গায় ভুচিচ ও অরবানের কর্মকাণ্ডে একটা মিল দেখেছেন তাঁরা। তফাৎ শুধু এই যে হাঙ্গেরির পট পরিবর্তনে ছাত্ররা নেতৃত্ব দেননি, সেটি দিয়েছিলেন অরবানের এককালের সহযোগী পেটার মাজর। ... ...

সারাদিনে যার সঙ্গেই দেখা হোক না হোক, কথা হোক না হোক বাড়ি ফেরার আগে সমর একবার ছাতিমের কাছে যান। নতুন খবর থাকলে দেন, না হলে পুরোনো খবরই চালাচালি করেন। বা খবর না থাকার খবরটাই। কোনও দিন তারও দরকার পড়ে না। দুজনে দুজনের গায়ে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। ফাঁকহীন। ফাঁক ভরানোর দাবিহীন। শুধু তিনি যে আছেন, ছাতিমও যে আছে, দুজনে দুজনকে মনে করিয়ে দেন। প্রথমদিনের কথামতো। ... ...

আসলে এই ঝুলনযাত্রা হল বাঙালির জীবনে বৈষ্ণব প্রভাবের একটা রূপ - ঠিক যেমন তুলসীমঞ্চে প্রদীপ জ্বালানো হল হাজার হাজার বছর আগে বৌদ্ধস্তূপে গিয়ে সাধারণ মানুষের প্রদীপ জ্বালানোর সামাজিক স্মৃতি। এই ভাবেই আমাদের ইতিহাস সংস্কৃতির রূপ ধরে জীবনধারায় বহমান থাকে। ঝুলন যাত্রা বা ঝুলন পূর্ণিমা উপলক্ষে মূলত শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত নানাবিধ পুতুলের প্রদর্শনী চলে, প্রদর্শনীর কেন্দ্র থাকেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারাণী – তাঁরা দোলনায় অবস্থান করেন, একপাশে পাহাড়ের মাথায় থাকেন হরপার্বতী। ... ...

গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে আঁকা-বাঁকা পথ ধরে মহিষের গাড়ি, হাতি, ঘোড়ার শোভাযাত্রা এগিয়ে যেতে থাকল। সেদিন ছিল অমানিশার রাত; হাতি, মহিষের গাড়ি—সব কিছুই অদৃশ্য ছিল। কেবল ঝলমলে করছিল মাংরা সরদার আর বার্নার্ড সাহেবের হাতের মশাল দুটি। মাঝে মধ্যে ভিক্টর সাহেবও হাতের টর্চটা জ্বালছিলেন; আলোতে দেখা যাচ্ছিল কেবলই আদি-অন্তহীন অরণ্য আর অরণ্য! সেই অরণ্যে মহিষের গাড়ির ঘণ্টার ঝুনঝুনি গর্জনের মতো শোনাচ্ছিল। ... ...

সম্প্রতি বাগীরাম বাবা কলকাতায় এসেছিলেন। সল্টলেকে বড়ো আসর বসেছিল কথা-র। হিন্দিভাষাভাষী স্থানীয় লোকের ভীড় উপচে পড়েছিল। সেখানে বাগীরাম বক্তব্য রেখেছেন যে অত্যধিক আমিষ ভোজনের ফলেই বাঙালি হিন্দুদের স্বধর্মনিষ্ঠা কমে যাচ্ছে। বাবা বলেছেন সারাভারতের হিন্দু একতার স্বার্থে বাঙালির উচিত একটি সাধারণ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। তাই, তাঁকে নিয়ে এখন মিডিয়া তোলপাড় হচ্ছে। বাগীরাম এককালে বাগী বা ডাকাত ছিলেন, পরে রামভক্ত হয়েছেন। দেশের একাংশ মানুষ তাঁকে বাল্মীকির অবতার মনে করে। ... ...

আমরা জানি সার্থক শিল্পী দেশ কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে যান। আর এও জানি সব মহৎ সাহিত্য কীর্তির পটভূমিকা কোন এক সত্যি দেশ, কোন এক কালের এক টুকরো অংশ। তার চরিত্রগুলো কোনো এক দেশের কোনো কালের গণ্ডিতে বাঁধা। তবে কি করে এমন সাহিত্য সৃষ্টি হল যাকে আমরা বলি চিরন্তনী। অথচ, আমরা যে কাব্য উপন্যাসকে মহৎ বলি, যে গুলোকে চিরন্তনী ও সর্বকালের বলি, তাদের স্রষ্টা যে সব কবি ও লেখক তাঁরা কিন্তু তাঁদের সৃষ্টির, কাব্য উপন্যাসের, পটভূমিকা তৈরী করেছিলেন তাঁদেরই কালের। ... ...

আলেকজান্দার ভুচিচ প্রধানমন্ত্রী হলেন ২০১৪ সালে। বছরের পর বছর স্বাধীন প্রফেশনাল মিডিয়ার স্থান সঙ্কুচিত এবং সরকারের প্রচার প্রোপাগান্ডা বিস্তারিত হতে থাকে। জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়েচে ভেলের মিডিয়া অ্যানালিস্ট নেদিম সাইদেনোভিচ বলেছিলেন ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্র, টেলিভিশন রেডিও - দেশের সমস্ত মিডিয়াকে কঠিন হাতে কন্ট্রোলে আনাটা সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টির মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়। ... ...

ওদের বাড়ির নিচে এক তলা জুড়ে ছিল সাইকেল জমা রাখার দোকান। কাছের রেলস্টেশনের নিত্যযাত্রী, কলেজ, ইস্কুলের ছাত্র, মাস্টার কত লোকের কত রকমের সাইকেল। মোটর সাইকেল। একজন মেকানিকও ছিল। সারাইয়ের কাজও হত। বানোয়ারী ঐ দোকানেই বহাল হয়ে গেল। মাস গেলে মাইনে সঙ্গে খাওয়া থাকা ফ্রি। ... ...

বড়োফান্দি বলছিলেন ভয় দেখাতে চায় যে পালছুট হাতি, তার লক্ষণগুলোর কথা। এমন হাতি সামনের মানুষটিকে ভয় দেখাবার জন্যে শুঁড় তুলে চিৎকার জুড়ে দেবে; পাগুলো এগিয়ে-পিছিয়ে গর্জন করে এমন ভাব করবে, যেন এইমাত্র এসেই আক্রমণ করে বসবে। আসলে কিন্তু সে ভয় দেখাবার নাটক করছে; এই অবস্থাতে যাকে তাড়া করছে, তাকে বুক টান করে হাতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। হাতির কান যেমন সচরাচর থাকে, সেরকম আছে কি নেই দেখে নিতে হয়; নিশ্চিত হওয়া যাবে হাতি আক্রমণ করবে না, সামনের জীবটিকে ভয় দেখিয়ে শুধু তাড়াতেই চাইছে। ... ...

২০১৮ সাল থেকে সার্বিয়াতে প্রতিবাদ প্রখর হলো – তার চেয়ে বহুগুণ কঠোর হল সরকারের শাসন, পুলিসি বর্বরতা, অকারণে জেলে ভরা, কিছু অনুগত মিডিয়া বাদে বাকিদের পিছনে সরকারি তদন্ত কমিটি বা নকলি চার্জে আদালতে হাজির করা শুরু হল, বিনা বিচারে আটক, সামাজিক মিডিয়াতে যে কোন প্রতিবাদী কণ্ঠের বিরুদ্ধে কালিমা লেপন (স্মিয়ার ক্যাম্পেন) চলতে থাকল, লৌহ হস্তে দমন, দেশজোড়া দুর্নীতি। ... ...

শহরের স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে কোনো সমস্যাই দেখা দিল না। বোতলজাত পরিশোধিত পানীয় জলের বিক্রি একলাফে চারগুণ বেড়ে গেল, বহুতল ভবনের কল খুললেই পরিষ্কার জল এল, ধনকুবেরদের গল্ফ ক্লাবের সবুজ ঘাস স্বয়ংক্রিয় স্প্রিঙ্কলারে ভিজল, শহরের মোড়ে মোড়ে সাজানো ফোয়ারাগুলো রঙিন আলোয় আগের মতোই চলল। এমনকি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদনও এক মিনিটের জন্য বন্ধ হলো না। ... ...

ক্রমে ক্রমে চারদিকে রটে গেল—মুজাদার মশাই সুগরীজানকে এনে বড়োবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। পুরো মৌজার মানুষজন এসে এই নতুন জলের ধারায় হাত-মুখ ধুয়ে তবেই বড়োবাড়িতে প্রবেশ করে দেখতে শুরু করল। হাতি-তোরণের পাশ দিয়ে নয়া সুগরীজান বাড়ির পেছন দিকে গিয়ে বইতে শুরু করেছে; কদিন পরেই হাতি-মহলের লোকজনও চলে আসবে। নয়া সুগরীজানে হাত-মুখ ধুয়েই এরা বড়োবাড়িতে প্রবেশ করবে। ... ...

বৃদ্ধ দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলেন। তাঁর নিজেরও একসময় নদীর ধারের বাড়ি ছিল। বহু বছর আগে নদী ভেঙে নিয়েছিল। তারপর থেকে তিনি এই রাজপথের ধারে বসে মানুষ দেখেন। তিনি জানেন, উচ্ছেদ শুধু ঘর ভাঙে না, মানুষের ভাষা, উৎসব, গন্ধ, এমনকি স্বপ্নও বদলে দেয়। ... ...

সুস্পষ্ট আঙ্গিকে তৈরি হয় আস্ত এক একটি রোজনামচার মনলিপি, প্রতিনিয়ত। ... ...

এমং বুড়োর হাতে সাজানো পালকি দুবার দুই যুবতীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিল। আর শান্তিপ্রিয়া? সেই যুবতী বয়সেই ওর চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল; সে প্রায়ই বসে থাকত তাঁতে। বড়োবাড়ির ধনদাকে সঙ্গে নিয়ে রেশম পোকা পোষা শুরু করেছিল সে। রেশম সুতো কেটে চাদর বোনে সে; চাদরে মাঘ মাসের শীতও পালিয়ে বেড়াত।শান্তিপ্রিয়ার ছেলে দুটি উঁচু মেধার পরিচয় রেখে মঙ্গলদৈর স্কুল একটিতে লেখাপড়া করছিল। শান্তিপ্রিয়া কাঠি আর লাল সুতো দিয়ে গামছাতে ছেলেদের নাম লিখে ফেলে; গামছাতে লাল সুতোয় লেখা নাম দুটি জ্বলজ্বল করে—প্রিয়নাথ আর চন্দ্রনাথ। ... ...