ভোরের বাসে মুন্সিয়ারী থেকে রওনা হয়েছিল সৌমেন - একা। ইদানিং ওর কখনো, কিছুদিনের জন্য একা ঘুরতে ভাল লাগে। তখন ঘড়ি, ক্যালেন্ডার উপেক্ষা করে যেখানে ইচ্ছে মর্জি মতো ঘোরা যায়। যতদিন খুশী থাকা যায়। কারুর সাথে আপোষের দায় নেই। এমন মুক্তকচ্ছ ভ্রমণের আনন্দ অন্যরকম। ষাট পেরিয়েও সৌমেন শরীরে সুস্থ। মনে তাজা। হাঁটাহাঁটিতে ক্লান্তিহীন।
তবে যতদিন ও বাইরে থাকে মৌমিতা একটু টেনশনে থাকে। অনুযোগ করে, বুড়ো বয়সে এসব কী খেয়াল চাপলো তোমার? যদি কোথাও শরীর টরীর খারাপ হয়? অন্তত আর একজনের সাথে তো গেলে হয়?
সৌমেন হেসে বলে, বাঙালি মেয়েরা এতো আতুপুতু করে কেন বলতো? আমার কোনো অসুখ নেই, আমি কোনো এ্যাডভেঞ্চার করতেও যাই না। সাবধানেই থাকি। এতো ভাবো কেন?
বেড়াতে গিয়ে সৌমেন অনলাইনে বাইরের খবর টবর বিশেষ দেখে না। ফোনে কারুর সাথে অপ্রয়োজনে কথাবার্তা বলতে ইচ্ছে করে না। মৌমিতাকেও বিশেষ কিছু না জানানোর থাকলে ফোন করে না। ও তখন নিজের মনে থাকতে ভালবাসে। মৌমিতাও এটা বোঝে এবং মেনে নিয়েছে। তাই সেও রোজ ফোন করে কেমন আছো, শরীর ঠিক আছে তো গোছের আলুনী কথার ঝাঁপি খোলে না।
তবে সৌমেন খুব গোছানো ও দায়িত্বশীল। নিয়মিত ও মৌমিতাকে ও কোথায়, কখন বাসে বা ট্রেনে উঠছে, কোথায় যাচ্ছে তা হোয়াতে মেসেজ করে জানায়। তার সাথে থাকে বাসের নাম, নাম্বার প্লেট এবং কন্ট্যাক্ট নম্বর (যদি বাসে লেখা থাকে)। ট্রেনে গেলে তার নম্বর ও কোচ নম্বরের ডিটেলস। গন্তব্যে পৌঁছে কোথায় উঠেছে তার ডিটেলস, সেখানকার কারুর নম্বরও হোয়াতে পাঠিয়ে দেয়। চলার পথে ও গুগল লাইভ লোকেশন অন করে মৌমিতা ও ওদের পুত্রের সাথে শেয়ার করে রাখে। ফলে ওর রিয়েল টাইম পজিশন ওরা চাইলেই জানতে পারে।
উত্তরাখণ্ডে তিনবার ও এমন জায়গায় ছিল যেখানে ওর এয়ারটেল ও জিও, দুটো ফোনেই সিগন্যাল ছিল না। সেখানে একমাত্র ছিল BSNL নেটওয়ার্ক। ও তখন স্থানীয় একজনের ফোন থেকে মৌমিতাকে জানিয়ে বলেছে এখন ওর নেটওয়ার্ক নেই এবং আবার কবে, কখন পাওয়া যেতে পারে।
সেক্ষেত্রেও সৌমেন পথচলতি কোনো বেগানা কারুর ফোন থেকে নয়, স্টেশনারি কেউ, যেমন, যেখানে আছে সেখানকার ম্যানেজার বা চৌকিদার বা আশপাশে চায়ের দোকানে কারুর সাথে আলাপ করে তার ফোন থেকে জানিয়েছে। মৌমিতাকে বলেছে সেই নম্বর নোট করে রাখতে, কোনো এমার্জেন্সিতে ফোন করে আমায় জানানোর অনুরোধ করতে।
তাদেরকেও বলেছে কোনো এমার্জেন্সিতে বাড়ি থেকে ওদের কাছে আমার জন্য কোনো মেসেজ এলে দয়া করে ওকে তা জানিয়ে দিতে। শহরেও এমন অনুরোধ রাখবে না এমন মানুষ বিরল। সরল পাহাড়ি মানুষের তো কথাই আলাদা। তারা বিশেষভাবে আশ্বস্ত করেছে ওকে। এসব সৌমেন করে যাতে ও কখন, কোথায় আছে তা নিয়ে মৌমিতার কোনো অযথা দুশ্চিন্তা না হয়।
আর একটা কারণেও সৌমেন এসব করে। পুলিশ পিতার দৌলতে সৌমেন জানে যে সাধারণ মানুষ যেমন ভাবে, পুলিশের কাছে তেমন কোনো যাদুছড়ি থাকে না যে নাচালেই সব জানা যাবে। তাই ও মৌমিতাকে বলে রেখেছে, ও যেহেতু আগাম খবর না নীরব হয়ে যায় না, তাই ওর দুটো ফোনের একটাও যদি না লাগে, গুগল লাইভ লোকেশন যদি অফ হয়ে যায় তখন বারো ঘন্টার বেশি অপেক্ষা না করে লোকাল পুলিশকে জানিয়ে ওর বিগত কয়েকদিনের লোকেশন ডিটেলস ও চ্যাট শেয়ার করতে হবে।
পুলিশও বুঝবে যে লোক এতো মেথডিক্যালি নিয়মিত বাড়ির সাথে যোগাযোগ রেখে চলে তার সাথে আচমকা এভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা। তাহলে পুলিশের পক্ষেও - সদিচ্ছা থাকলে - দ্রুত ওর last known location থেকে অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব হতে পারে। সৌমেন এসব করে যদি কোথাও দুর্ঘটনায় বা আততায়ীর হাতে জীবনহানি হয়, সেই সম্ভাবনার কথা ভেবে। যা হবার সে তো হবে কিন্তু যে রয়ে গেল তার যেন কোনো হদিশ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পাগল হওয়ার দশা না হয়।
দশটা নাগাদ চৌকোরিতে এসে বাস থামে। যাত্রীরা চা নাস্তার জন্য নামে। সৌমেন বাগেশ্বরের টিকিট কেটেছিল। কিন্তু ভাবে এখানে একটু চক্কর মেরে পরের বাসে গেলেও হয়। এখান থেকে কুমায়ুন হিমালয়ের প্যানারোমিক ভিউ খুব সুন্দর দেখায়। যেমন ভাবা তেমন কাজ। একাকী ভ্রমণের এই সুবিধা। চা নাস্তা করে, চায়ের দোকানে বড় স্যাকটা রেখে ও ন্যাপস্যাকটা নিয়ে হাঁটা দেয় পুবদিকে। যাওয়ার আগে জেনে নেয় সেদিন আর কটা বাস আন্দাজ কখন আসবে। সেই মতো ফিরতে হবে এখানে।
কিছু হোটেল, রিসর্টের পাশ দিয়ে এগোতে ডানদিকে অনেকটা জায়গা নিয়ে কুমায়ুন পর্যটন বিভাগের পর্যটক আবাস। দলে এলে এখানে থেকে, লনে বসে জমিয়ে গুলতানি করার জন্য আদর্শ জায়গা। একাকী ভ্রমণে এসব জায়গা এড়িয়ে চলে সৌমেন। তখন ও বেড়ায় Hoboদের মতো, কমখরচে, ভবঘুরে স্টাইলে। কিছুটা এগোতে নির্জন জায়গায় পরিত্যক্ত চায়ের কারখানাটা দেখা গেল। এটার কথা একটা লেখায় পড়েছিল। আরো কিছুটা যেতে অনেক নীচে চোখে পড়ে ছবির মতো উপত্যকা। তবে হিমালয়ের তুষারাবৃত শৃঙ্গরাজি হালকা মেঘে ঢেকে আছে। একটা ছোট্ট পাখি নরুনের মতো লম্বা ঠোঁট ঢুকিয়ে নেচে নেচে গোলাপি গুরাস বা রডোডেনড্রনের মধু খাচ্ছিল। টেরিয়ে দেখলো সৌমেনকে। খুব মিষ্টি রকমসকম। সৌমেন দেখছিল একমনে।
বাবুজী, আপনি কি বেড়াতে এসেছেন? ঘুরে তাকায় সৌমেন। পেটানো স্বাস্থ্য। বছর চল্লিশের ওপরে বয়স হবে। বেশভূষায় মনে হয় স্থানীয় মানুষ। গ্ৰাম্য মুখে সরল হাসিতে নিরীহ কৌতূহল। সৌমেন সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলে, তুমি বুঝি এখানেই থাকো? কী নাম তোমার? লোকটি বলে, আমি সুখরাম। এখানেই থাকি। ঐ যে বাড়িটা তৈরি হচ্ছে, আমি ওটার চৌকিদার। দীপাবলীর ছুটিতে এখন কদিন কাজকর্ম বন্ধ আছে। তাই একটু ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছি। আসার পথে নির্মিয়মান বাড়িটা চোখে পড়েছিল সৌমেনের। অনেকটা জায়গা নিয়ে হচ্ছে। দোতলার ছাদ ঢালাই হয়ে গেছে। হঠাৎ মাথায় একটা আইডিয়া আসে ওর। বলে, বাড়িটা কেমন হচ্ছে আমায় দেখাবে সুখরাম?
আসুন না। খুশি হয়েই বলে সুখরাম। জানা গেল বাড়ির মালিক পিথোরাগড়ের ব্যবসায়ী। বড় পরিবার। এটা তৈরি হচ্ছে ছুটির বাড়ি হিসেবে। কালেভদ্রে তারা সপরিবারে ছুটি কাটাতে আসবে। তখন কদিন আনন্দ কলরবে মুখর হয়ে উঠবে এ বাড়ি। অন্য সময় নিশ্চুপে পড়ে থাকবে। তৈরি হয়ে গেলে সুখরামই হবে এ বাড়ির পার্মানেন্ট চৌকিদার কাম মালি। দোতলায় একটা বড় ঘরে গাঁথুনি হয়ে গেছে। প্লাস্টার হয়নি, দরজা, জানলা বসেনি। মেঝেতে টাইলও লাগেনি। কংক্রিটের মেঝেতে খড় বিছিয়ে তার ওপর চাদর পেতে শোয় সুখরাম। অক্টোবরের শেষ। সাড়ে ছ হাজার ফুট উচ্চতায় রাতে ভালোই ঠান্ডা পড়ে। হাওয়া চললে তো কথাই নেই। তাই জানলার গ্যাপ সিমেন্টের বস্তা, বাঁখারি, দড়ি দিয়ে বন্ধ করেছে। দরজাতেও বস্তা দিয়ে তৈরী পর্দা। দিনে একপাশে সরানো থাকে। রাতে টেনে বন্ধ করে দড়ি দিয়ে বাঁধার ব্যবস্থা। বাইরে বারান্দার কোনে ইঁটের উনুনে কাঠকুটো জ্বেলে রান্নার ব্যবস্থা। সামান্য আয়োজন। কিন্তু ওর ছোট্ট জগতটা দেখানোর তৃপ্ত ভঙ্গিমায় সৌমেনের মনে হয় সুখরাম বেশ সুখেই আছে এখানে।
সুখরাম, তোমার কাছে আজ রাতটা আমায় থাকতে দেবে? আচমকা মত বদলায় সৌমেন। মনে হয় দিগন্ত বিস্তারিত হিমালয়ের অঙ্গনে এমন নির্জনতায় রাতে থাকলে ভোরটা উপভোগ করা যেতো। এখানে থাকবেন! অবাক হয়ে তাকায় সুখরাম। চিন্তান্বিত মুখে বলে, চারপাই নেই, অতিরিক্ত কম্বলও নেই। এখানে আপনি থাকবেন কীভাবে?
সৌমেন বলে, ওসব নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি একা একা ঘুরি। কখনো মন্দিরে বা আশ্রমের হলে রাতে থেকে গেছি। আমার বড় স্যাকে ফোমম্যাট, স্লিপিং ব্যাগ, মশারি সব আছে। ওটা চায়ের দোকানে রেখে জায়গাটা দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু এ জায়গাটা বেশ লাগলো, তাই একটা রাত এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে। তুমি যদি তোমার ঘরে থাকতে দাও, ভালো লাগবে।
সুখরাম একটু বিব্রত ভঙ্গিতে বলে, এটাকে কি এখন ঘর বলা যায় বাবুজী? তবে আপনার যদি অসুবিধা না হয়, থাকতেই পারেন। কাজকর্ম বন্ধ। কদিন ধরে তো একাই আছি। আপনি থাকলে বরং গপসপ করে ভালোই লাগবে।
কথায় বলে, খেতে পেলে শুতে চায়। সৌমেন সুখরামের রান্নার জোগাড় দেখিয়ে বলে, তুমি তো মনে হচ্ছে নিজের জন্য রান্না করোই, অসুবিধা না হলে যদি রাতে আমার জন্যেও কিছু করো তাহলে আর দোকানে খেতে যেতে হয় না।
সুখরাম অভিভূত হয়ে বলে, অসুবিধা কীসের বাবুজী? অতিথি তো নারায়ণ, আপনি আমার কাছে খাবেন, এতো আমার সৌভাগ্য। তবে আমি তো করবো শুধু রুটি আর একটা সবজি। ডালও হবে না। আপনি পারবেন খেতে? তাছাড়া আমি ক্ষত্রিয় নই, কুমায়ুনি জৌনসারী, আমার হাতের রান্না খেতে আপনার আপত্তি নেই তো?
আমার অনেক কিছুতেই কোনো অসুবিধে নেই সুখরাম। থাকলে এভাবে একা একা ঘুরতে পারতাম না। জাতপাতের সংস্কার আমার নেই। থাকা খাওয়ার জায়গা একটু পরিস্কার হলেই হোলো। আর তোমার তো বেশ গোছানো ব্যবস্থা দেখছি, তোমার কাছে খেতে আপত্তির কী আছে? ডাল ফাল নিয়ে ভেবো না। ঘুরতে বেরিয়ে কখনো আমি রাতে কলা খেজুর বিস্কুট খেয়েও কাটিয়ে দিয়েছি। সে তুলনায় গরমাগরম রুটি সবজি তো অমৃত। সৌমেন হেসে আশ্বস্ত করে ওকে।
তাহলে চলুন, দোকান থেকে আপনার ব্যাগ নিয়ে আসা যাক। আমাকেও একটু আলু, ডাল আর চাপাত্তি কিনতে হবে। দুজনে এগোয় বাসরাস্তার দিকে। চাল, ডাল, আলু, সরষের তেল, চা পাতা, চিনি, গুঁড়ো দুধ, একটু ঘি, আচার আর বিস্কুট কিনে সুখরামের হাতে দেয় সৌমেন। যা কিনেছে তাতে সুখরামের হয়তো এক সপ্তাহ চলে যাবে।
এতো সামান কী হবে? হাঁ হাঁ করে ওঠে ও। ওর পিঠ চাপড়ে আশ্বস্ত করে সৌমেন। এখানে হোটেলে থাকলে হাজারের কমে হোতো না। সুখরামের সাথে রাত্রিবাসে কোনো খরচই নেই। প্রতিদানে এটুকু তো করাই উচিত। হিসেবি শহুরে মন এবার সন্তুষ্ট হয়। স্যাক তুলে রওনা হয় সৌমেন।
পাশে মৃদু গজগজ করতে করতে চলে সুখরাম। ঘরে তো চাল রয়েছে, কী দরকার ছিল কেনার। সৌমেন কান দেয়না ওর কথায়। ঘরে এসে সুখরামের বিছানায় আরাম করে বসে সৌমেন। জিনিসপত্র রেখে সুখরাম বলে, বাবুজী আপনি অনেক সামান কিনেছেন। তাহলে দুপুরেও আমার সাথেই খাবেন। এখন একটু চা খাবেন? চায়ে কখনোই না নেই সৌমেনের। এখন সবে সাড়ে এগারোটা। আসন্ন শীতের মিঠে আমেজ। মাথা নেড়ে সায় দেয় ও।
সন্তুরের মিঠে সুরের মতো সুখরামের আন্তরিকতার আবেশ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে সৌমেনের মনে। চা খেতে খেতে টুকটাক কথায় জানা যায় সুখরাম বিয়ে থা করে নি। বয়স যা ভেবেছিল সৌমেন তাই, বেয়াল্লিশ পেরিয়ে গেছে। আর ওসবে ইচ্ছেও নেই। মা বাবা গত হয়েছেন কিছুদিন। ভাই বোন নেই। আপন বলতে আছে এক বিধবা মাসি ও তার বছর বিশেকের ছেলে। সামান্য কিছু জমি আছে ওদের। তাতে কিছু সবজি চাষ হয়। মাসতুতো ভাই গ্ৰামে একটা ছোট মুদীর দোকান চালায়। ওতেই মা বেটার গুজরান হয়ে যায়। সুখরাম একা মানুষ। ওর খরচ বেশী নয়। মাইনে পায় মাসে পাঁচহাজার। ওতেই দিব্যি চলে যায় ওর। একা মানুষের কিই বা আর খরচ। বরং কিছু বাঁচে। তার থেকে মাঝেমধ্যে মাসিকে কিছু সাহায্য করে। মালিক মানুষটি ভালো। যখন আসেন এখানে তখন চাল, আটার বস্তা ও কিছু বকশিশ দিয়ে যান। বাড়ির সংলগ্ন জমির কোনে ওরও একটা ঘর হবে। বাড়ি তৈরী হয়ে গেলে সুখরামই হবে পার্মানেন্ট চৌকিদার। তখন মাইনেও বাড়বে হাজার টাকা। সুখরামের প্রধান যোগ্যতা ও ছুটি নেয় না। তিনকুলে কেউ নেই, ছুটি নিয়ে যাবেই বা কোথায়। মাসিও থাকে কাছেই।
সুখরামের সাথে গল্প করতে করতে একটা কথা আচমকা মনে উদয় হয় সৌমেনের। অজানা, অচেনা কারুর সাথে এমন নির্জন জায়গায় রাতে হঠাৎ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠকারিতা হোলো না তো? বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে তো মৌমিতাকে বলেছিল, ভেবোনা, সাবধানে থাকবো। কিছুদিন আগে খবরে পড়েছিল মুসৌরির কাছে চক্রাতায় দিল্লি থেকে বেড়াতে আসা এক তরুণ দম্পতিকে দেরাদুন থেকে ভাড়া নেওয়া গাড়ির চালকই খুন করে খাদে ফেলে দেয়। দিন সাতেক বাদে মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ কল রেকর্ড ট্রেস করে চালককে ধরে। সৌমেনের পরিচিত এক অভিজ্ঞ পাহাড়ি দাদাও বলেছেন, সময়ের সাথে সমতলের কুপ্রভাবে হিমালয়ে পাহাড়ি মানুষ আর আগের মতো সরল সাধাসিধে নেই। কেন যে এমন অলক্ষুণে ভাবনা মাথায় আসে কে জানে।
মৌমিতা জানে ও আজ বাগেশ্বর যাবে। আচমকা চৌকোরিতে থেকে যাওয়ার প্ল্যান তো ছিল না। সৌমেন এখানে বসেই ফোনে মৌমিতাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা ভাবে। তাহলে কোনো বদ মতলব থাকলে সুখরাম দুবার ভাববে। মোবাইলে দেখে সিগন্যাল নেই। সুখরামকে বলে, আমার ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। বাসরাস্তায় হয়তো সিগন্যাল পাবো। তাহলে ওদিকে গিয়ে বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিই যে আজ রাতে চৌকোরিতে তোমার কাছেই থাকবো।
সুখরাম বলে, বাবুজী, আমার ফোন থেকেই জানিয়ে দিন না। বাসরাস্তায় যাওয়ার কী দরকার। সুখরাম ওর সস্তা ডাব্বা ফোনটা বাড়িয়ে দেয়। সৌমেন বাস্তবিকই অবাক হয়ে বলে, আরে বাঃ! তোমার ফোনও আছে? সুখরাম জানায় পিথোরাগড় থেকে কখনো যোগাযোগ করার জন্য মালিকই ফোনটা দিয়েছেন। ওর কাউকে ফোন করার নেই। সৌমেন মৌমিতাকে ফোন করে, সুখরামকে শুনিয়ে হিন্দিতে বলে, আজ রাতে চৌকোরিতে থাকবো সুখরামের সাথে। এটা ওর নাম্বার। আমার ফোনে সিগন্যাল নেই। কাল সকালে এখান থেকে যাবো বাগেশ্বর। সিগন্যাল এলে লোকেশন পাবে, তখন আমার ফোন থেকেই জানিয়ে দেবো কখন পৌঁছবো ওখানে
মাথায় এমন অবিশ্বাসের ভাবনা আসায় ফোনটা রেখে মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু কী করা যাবে। সবাইকে তো আর বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এই সামান্য সাবধানতাটুকু নিয়ে এবার খানিক নিশ্চিন্ত লাগে। দুপুরে ওর কাছেই খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে একা একা আশপাশে ঘুরে বেড়ায়। নির্জন প্রকৃতির মাঝে বেশ লাগে। সন্ধ্যার পর অমাবস্যার রাতে নীচের উপত্যকায় মিটমিটে আলো রহস্যময় লাগে।
সৌমেন যথেষ্ট বাজার করেছে বলে সুখরাম ডালও বানিয়েছে। সুখরামের রান্নার হাতও ভালো। দুপুরের খাওয়া ভালোই হয়েছে। রাতেও জমিয়ে খাওয়ার পর সৌমেন সুখরামের রান্নার প্রশংসা করে। সুখরাম গদগদ হয়ে বলে, বাবুজী, এ বাংলো শেষ হতে এখনো বছর খানেক লাগবে। একবার আসুন মার্চের শেষে। এখানেই থাকবেন। আমার ফোন নম্বর তো রইলো। আসার আগে জানিয়ে দেবেন। মাসির ছেলেকে এখানে রেখে আপনাকে ঐ দূরের পাহাড়ে নিয়ে যাবো। অনেক রকমের ফুল ও পাখি দেখতে পাবেন ওখানে। বাইরের লোক জানে না ও জায়গার কথা। যেতে আসতে সারাটা দিন লাগবে। অনেকটা হাঁটতে হবে। বেশ চড়াই। আপনারা তো সমতলের মানুষ তাই একটু অসুবিধে হতে পারে। তবে আপনার সাথে কথা বলে মনে হোলো, আপনার বিরান জায়গা পছন্দ তাই ওখানে গেলে ভালো লাগবে।
সৌমেন অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ে। মনে তীব্র অপরাধবোধের কাঁটা খচখচ করে। হে ঈশ্বর, এতো আগ্ৰহ নিয়ে যে সম্পূর্ণ অচেনা কাউকে এভাবে আহ্বান জানায় তার সম্পর্কে এমন কুভাবনা কেন এলো মনে?
পরদিন সকালে রোমান এ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো দিগন্তবিস্তারিত পশ্চিম হিমালয়ের নানান শৃঙ্গরাজি ঝলমলিয়ে ওঠে। কালকের মেঘের আস্তরণ এখন উধাও। পাহাড়ের এই মজা। সুখরাম বড় গেলাসে করে চা আর ওর কিনে দেওয়া বিস্কুট এনেছে। চায়ে সুখচুমক দিতে দিতে পাহাড়ে রঙবদলের পালা দ্যাখে সৌমেন। ভাবে একটা রাত এখানে থেকে যাওয়ার আচমকা সিদ্ধান্তটা খাসা হয়েছিল।
আটটা নাগাদ বেরোয় সৌমেন। সুখরাম হাতজোড় করে বলে, আবার আসবেন বাবুজী। হঠাৎ সুখরামকে বুকে জড়িয়ে ধরে সৌমেন। গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে আসে। মৃদু স্বরে বলে, তোমার কথা অনেকদিন মনে থাকবে। সুখরাম বলে, আপনাকেও খুব মনে পড়বে বাবুজী। এভাবে শহরের কেউ কখনো থাকেনি আমার কাছে। স্যাক তুলে রওনা হয় সৌমেন। খানিক এগিয়ে মোড়ের মুখে ঘুরে তাকায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে সুখরাম। মুখে সরল হাসি।
হঠাৎ সৌমেন আবার ফিরে আসে বাড়ির দিকে। সুখরাম প্রশ্নমাখা চোখে তাকায়, কিছু ফেলে গেছেন বাবুজী? সৌমেন বলে, তোমার ফোনটা একবার দাও তো। সুখরাম ফোনটা বাড়িয়ে দেয়। সৌমেন মৌমিতাকে হিন্দিতেই বলে, কালকের দিনটা সুখরামের সাথে বেশ আনন্দে কাটলো বুঝলে। এখন চৌকোরি থেকে যাবো বাগেশ্বর। বিকেলে কথা হবে।
ফোনটা ফিরিয়ে দেয় সৌমেন। সুখরামের মুখে আনন্দের আভা। কীই বা এমন যত্ন করতে পেরেছে ও, তবু দ্যাখো তো, বাবুজী কেমন ভাবীজীকে বললেন, সুখরামের সাথে বেশ কাটলো। কৃতার্থ বোধ করে ও।
চলে যেতে যেতে সৌমেন ভাবে সুখরাম কোনোদিন জানতেও পারবে না সৌমেন কেন আবার ফিরে এসেছিল। সৌমেন তো রাস্তায় গিয়েও একথা ফোনে মৌমিতাকে জানিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু জীবনে পরমূহুর্তে কী হবে কেউ জানে না। যদি এখান থেকে যাওয়ার পরে কিছু অঘটন হয়, তাহলে মৌমিতার কাছে পাওয়া শেষ কল রেকর্ডের সূত্র ধরে বেচারা সুখরাম হয়তো অযথা হয়রানির শিকার হতে পারে।
গতকাল কিছুটা রক্ষাকবচের কথা ভেবেই সৌমেন সুখরামের ফোন থেকে মৌমিতাকে ওর অবস্থান জানিয়েছিল। আজ ওর অজান্তে ওকে দায়মুক্ত করে গেলো। এবার মনটা একটু হালকা লাগে। সমতলের এসব হিসেবের নাগাল সুখরামের না পাওয়াই ভালো। বেঁচে থাক ওর পাহাড়ি সরলতা।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।