এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  ইতিহাস

  • শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ঃ নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সন্ধানে 

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | ইতিহাস | ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এক বিরাট ব্যক্তিত্ব। তার যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা যদি আগে না হয়ে থাকে তবে সেটা এখন করলে আপত্তির কিছু নেই। দেখতে হবে সেই মুল্যায়ন যেন যথাযথ ও বস্তুনিষ্ঠ হয়। স্তুতি আর প্রশংসার আড়ালে বড় মানুষদের সীমাবদ্ধতাগুলো লুকিয়ে ফেলা আমাদের জাতীয় প্রবণতা। যাঁরা ভোটের রাজনীতি করেন তাঁদের এই কাজটা বেশি করে করতে হয়।আবার উল্টোদিকের রাজনীতি যাঁরা করেন তাঁদের অকারণ নিন্দামন্দের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। শ্যামাপ্রসাদ প্রসঙ্গেই একদল তথাকথিত বামপন্থী ফেসবুকার তাঁকে ব্রিটিশ অনুগত সাম্প্রদায়িক এক খলনায়ক সাজাবার চেষ্টা করে থাকেন যেটাও ভুল বলেই আমার মনে হয়েছে। মনে রাখতে হবে কংগ্রেস রাজনীতির বাইরে থেকে যে দুজন মানুষকে জওহরলাল নেহেরু তার মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়েছিলেন তার মধ্যে একজন ছিলেন বি আর আম্বেদকার, আরেকজন শ্যামাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। বাগ্মীতা,ব্যক্তিগত সততা, ব্যক্তিস্বার্থের উপরে উঠে কাজ করার দায়বদ্ধতা,, বিপরীত রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের সঙ্গে সংলাপ চালু রাখার ক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা--- শ্যামাপ্রসাদকে বাছার কারণ ছিল অনেক। আমি আমার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি যা তিনি অনিয়মিতভাবে লিখতেন এবং যা Leaves from a diary নামে প্রকাশিত সেটাকেই কেন্দ্রীয় ফোকাসে রেখেছি। কারণ একজন ব্যক্তির মতাদর্শ, পছন্দ অপছন্দ, স্ববিরোধিতা সবকিছু ডায়েরিতে অন্তরঙ্গভাবে ধরা পড়ে যা মানুষটিকে চিনতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পরিপ্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করার জন্য আমি জয়া চ্যাটার্জীর দুটি বই যা বামপন্থীদের কাছে প্রশংসিত এবং বিপরীত শিবিরের কাছে নিন্দিত – সেদুটির সাহায্য নিয়েছি। আমি যদিও জয়া চ্যাটার্জীর কোনো সিদ্ধান্ত এখানে সচেতনভাবেই গ্রহণ করিনি কিন্তু তথ্যগুলি নিয়েছি কারণ এটা সবাই স্বীকার করবেন যে এর চেয়ে বেশি তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণা দেশভাগের ওপর আর হয় নি।

    পরিপ্রেক্ষিত
    ----------------
    ১৯১৯ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার অনুযায়ী ভারতে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা ( Diarchy) চালু করা হয় যেখানে ভারতীয়দের হাতে প্রাদেশিক আইনসভার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯২৯ সালে লণ্ডনের নীতিনির্ধারকরা ঠিক করেন যে এই ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস দরকার,। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের জাতপাত, ভাষা, ধর্ম এবং অন্যান্য আনুগত্যের অধীন সামাজিক নির্মাণের মধ্য দিয়েই দেখত, আধুনিক নাগরিকের সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে নয়। তারা ঠিক করল যে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব বিভিন্ন গোষ্ঠীস্বার্থ বিবেচনায় ভাগ করে দেওয়া হবে – মুসলিম, দলিত ( তখন Depressed class বলা হত ), শিখ, ইওরোপীয়, সাধারণ হিন্দু, জমিদার, শ্রমজীবী, মহিলা ইত্যাদি। এখানে মুসলিমরা মুসলিমদের নির্বাচিত করবে, হিন্দুরা হিন্দুদের, দলিতরা দলিতদের ইত্যাদি। এইজন্যই ১৯৩২ সালে ঘোষিত এই নীতির নাম সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা বা কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড। এই বাঁটোয়ারা কিন্তু কোন গোষ্ঠীর কত জনসংখ্যা তার দ্বারা কঠোরভাবে নির্ধারিত ছিল না। যেমন বাংলায় আইনসভার ২৫০ আসনের মধ্যে ইওরোপীয়রা পেয়েছিল ২৫ টা অর্থাৎ ১০ শতাংশ আসন যদিও তাদের জনসংখ্যা ছিল ১ শতাংশের কম। ১৯৩১ সালের জনগণনা অনুসারে হিন্দুরা ছিল জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ কিন্তু তাঁরা দলিত আসন সহ পেল মোটে আশিটি আসন অর্থাৎ মোট আসনের ৩২ শতাংশ। মুসলিমরা হিন্দুদের তুলনায় বেশি অনুপাতে পেল কিছুটা যদিও জনসংখ্যা অনুসারে তারাও কিছুটা কমই পেল। তাদের জনসংখ্যা ছিল বাংলার মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ কিন্তু আসন পেল ১১৯ টা অর্থাৎ ৪৭.৮ শতাংশ। এর আগে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় হিন্দুদের আসন ছিল ৪৬ এবং মুসলিমদের আসন ছিল ৩৯। এবার ব্যাপারটা উলটো তো হলই দলিতদের ১০ টি আসন বাদ দিলে সাবর্ণ হিন্দুদের আসন দাঁড়াল ৭০ অর্থাৎ ২৮ শতাংশ মাত্র। ফলে হিন্দু ভদ্রলোকশ্রেণী তখন থেকেই ক্ষমতা খর্ব হওয়ার ফলে বিক্ষুব্ধ হয়।

    কংগ্রেস দল কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড প্রসঙ্গে ‘ সমর্থনও নয়, বিরোধিতাও নয়’ – অবস্থান গ্রহণ করে। কংগ্রেস নিজেকে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে দাবি করত। কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা করলে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মুসলিমদের সমর্থন পুরোপুরি হারানোর ভয় ছিল কংগ্রেসের। কিন্তু বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধ এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিমরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে অবিভক্ত বাংলার মত জায়গায় হিন্দু ভদ্রলোকশ্রেণীর মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে যেটা বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসের সংগঠনের অভ্যন্তরেও প্রতিফলিত হয়। এমনকি বাংলা কংগ্রেসের দুটি বিবদমান গোষ্ঠী ( যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং সুভাষচন্দ্র বসু) একযোগে কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা শুরু করে। শ্যামাপ্রসাদ কলকাতা কর্পোরেশন এবং প্রাদেশিক বিধানসভায় নির্দল সদস্য হিসাবে হিন্দু স্বার্থবিরোধী বলে যে পদক্ষেপগুলি তাঁর মনে হত সেগুলির বিরোধিতা করতেন। কংগ্রেসকে এই বিষয়গুলিতে তিনি যতটা সোচ্চারভাবে পেতে চাইতেন সেভাবে পেতেন না। ফলে ২৭ শে ডিসেম্বর ১৯৩৯ তারিখে যখন বীর সাভারকার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গেরুয়া পতাকা তুলে বাংলায় হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠা করলেন শ্যামাপ্রসাদ বাংলায় সেই দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করলেন। দুই বাংলার বড় বড় জমিদারদের একটা বড় অংশ হিন্দু মহাসভার ছত্রছায়ায় এলেন। প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বের একাংশ যার মধ্যে ছিলেন বৃহৎ বীমা ব্যবসায়ী, তীব্র সুভাষবিরোধী নলিনী রঞ্জন সরকার—তাঁরাও এই দাবিগুলিকে সামনে আনতে শুরু করলেন।সাম্প্রদায়িক বিভাজন উত্তোরত্তোর আরও তীব্র হওয়ার পর সাত বছর বাদে ১৯৪৫-৪৬ সালের কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে কংগ্রেস প্রায় অবিকল হিন্দু মহাসভার ঢংয়ে হিন্দু স্বার্থরক্ষার কথা বলে নির্বাচনী প্রচার করে। ফলে ছটি হিন্দু আসনেই হিন্দু মহাসভাকে টেক্কা দিয়ে কংগ্রেস জিতে যায়। তাই যখন সুরাবর্দীর পক্ষপাতিত্বমূলক শাসন বাংলা দেখে নিয়েছে, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও তার অব্যবহিত পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধ্বস্ত হয়েছে কলকাতা, যখন মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব গৃহীত ও দেশভাগ অনিবার্য --- তখন বাংলা ভাগের দাবিতে শুধু শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা নয়, প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল একযোগে দাঁড়িয়ে গেছে এবং কংগ্রেস সেখানে নেতৃত্বের আসনে। কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার যৌথ উদ্যোগে এই দাবিতে পাঁচটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু একক দলীয় উদ্যোগে কংগ্রেস এই দাবিতে ৫৯ টি সভা করে আর হিন্দু মহাসভা করে ১২ টি। অবশ্যই কংগ্রেসের সাংগঠনিক ক্ষমতা অনেক বেশি ছিল। হিন্দু মহাসভার সংগঠন মূলত ছিল পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার বাইরে একমাত্র মুর্শিদাবাদ জেলায় তাদের সংগঠন ছিল। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদের বিশ্বাস ছিল যে বাংলা ভাগ হলেও পাশে হিন্দুপ্রধান শক্তিশালী ভারত রাষ্ট্র থাকায় পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের ক্ষতি হবে না যদিও সে বিশ্বাস অমূলক প্রতিপন্ন হয়েছে। স্বাধীনতার পর গান্ধীহত্যার কারণে হিন্দু মহাসভার রাজনীতি বিপুল বাধার মুখে পড়ে। পরে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা ছেড়ে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করলেও ১৯৫২ সালের নির্বাচনে তাদের ফলাফল খুব খারাপ হয়েছিল।শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেকটাই অক্ষুণ্ণ ছিল যদিও। বাংলা বিভাজনের ক্ষেত্রে যদি ‘কৃতিত্ব’ দিতে হয় কাউকে তাহলে সেটা অনেকটাই কংগ্রেসের দিকে যাবে কারণ কংগ্রেসের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্রিটিশরা কোনো সিদ্ধান্ত সেই যুদ্ধোত্তর কালে গ্রহণ করতেন না। কিন্তু
    এ বিষয়ে শ্যামাপ্রসাদের প্রভাব শুধু হিন্দু মহাসভার একটি ভোটে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মীতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এই বিষয়ে জনমত গঠনে তিনি যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তার একটি আলাদা তাৎপর্য ছিল। বিশেষত হিন্দু ভদ্রমণ্ডলীর স্বার্থরক্ষায় তিনি যে বহুদিন ধরে অক্লান্ত প্রচারক সেটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ফলে একদিকে যেমন হিন্দু মহাসভার এজেন্ডা কংগ্রেস হাইজ্যাক করে নিয়েছিল সেটা সত্য, অন্যদিকে শ্যমাপ্রসাদের অনুগামীরা বলতেই পারেন যে তাদের এজেন্ডাকেই বাকিদের গ্রহণ করতে হয়েছে--- পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠার পর।
     
     
    শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ঃ একটি অন্তরঙ্গ দৃষ্টিকোণের সন্ধানে
    ------------------------------------------------------------------------------

    শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ডায়েরি যেটা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ১৯৯৩ সালে Leaves from a Diary নামে প্রকাশিত হয় সেখানে মূলত দুটি ভাগে তার ইংরেজিতে লেখা এবং বাংলায় লেখা ডায়েরির লেখাগুলো প্রকাশিত হয়েছে। এটা শ্যামাপ্রসাদের নিজের শুধু নয়, গোটা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মধ্যে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের শাসন চলেছে। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতা। ১২ ই ডিসেম্বর ১৯৪১, শ্যামাপ্রসাদ ফজলুল হকের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন এবং তার অর্থমন্ত্রী হন। ২০শে নভেম্বর ১৯৪২ তারিখে তিনি পদত্যাগ করেন। বিরোধী থাকার সময় এবং মন্ত্রী থাকার কালে তিনি হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার অগ্রণী কন্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হন।

    শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভায় যোগদান করলেন কেন ? ১৯৩৭ থেকে ৪১ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগ এবং ফজলুল হকের মন্ত্রীসভা যে পদক্ষেপগুলি নিচ্ছিল তাতে হিন্দু ভদ্রমন্ডলীর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল। ১৯ ৪১ সালে ঢাকাতে বেশ বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হয়। এছাড়াও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, ইউনিয়ন বোর্ডগুলির নির্বাচনে মুসলিম লীগের গাজোয়ারি ইত্যাদি সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছিল। কংগ্রেস হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা্র কথা বলতে কিছুটা কুন্ঠিত থাকত পাছে তাদের সাম্প্রদায়িক বলা হয়। তাহলে কি শ্যামাপ্রসাদকে সাম্প্রদায়িক বলা যায় ? মনে রাখতে হবে শ্যামাপ্রসাদ স্বাধীনতার আগে যে বাংলায় হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার কথা বলছেন সেখানে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। আবার স্বাধীনতার পর জম্মু ও কাশ্মীরে গিয়ে তিনি যখন হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার কথা বলছেন সেখানেও হিন্দুরা সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরুর আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ আর সংখ্যালঘুর প্রতিরোধমূলক সম্প্রদায়চেতনাকে এক মানদণ্ডে বিচার করা যায় না, বিশেষত সেই সময়ে যখন এই ধরণের বিভাজন তীব্র হয়ে ওঠে। অথচ ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর ফজলুল হক যখন কংগ্রেসকে মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব দেন এবং কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে সেই নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের আক্ষেপটি দেখুন— তিনি লিখছেন ‘’,যদি এটা হত ( কংগ্রেস ও ফজলুল হকের যৌথ সরকার ফজলুল হকের নেতৃত্বে ) তাহলে বাংলা মুসলিম লীগ- ব্রিটিশ যৌথ চক্রান্তের খপ্পরে পড়ত না। রাজ্যটা হিন্দু এবং মুসলিম প্রতিনিধিদের যৌথ প্রচেষ্টায় একটা শক্তিশালী এবং স্বাস্থ্যবান রাজ্য হিসেবে চলত। “

    শ্যামাপ্রসাদের উপরোক্ত বক্তব্য কি কোনো সাম্প্রদায়িক মানুষের কথা ? বস্তুত তার গোটা ডায়েরিতে কোথাও সাধারণভাবে মুসলমানদের সম্পর্কে বা ইসলাম সম্পর্কে কোনো বিদ্বেষমূলক কথা নেই। তাঁর আপত্তি ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে। আবার কংগ্রেসের দলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি এমনকি মুসলিম লীগের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও বলেছেন। প্রথমে আইনসভা বয়কটের ডাক দিয়েও ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের তিনমাস পর কংগ্রেস অনেক হিন্দুপ্রধান প্রদেশেই সরকার গঠন করে। কিন্তু কোথাও তারা কোয়ালিশন রাজনীতিকে কোনো গুরুত্ব দেয় নি। উত্তর প্রদেশে মহম্মদ আলি জিন্নার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা মুসলিম মন্ত্রী লীগ থেকে কাউকে নেয়নি, যা নিয়েছিল সব কংগ্রেস থেকে। শ্যামাপ্রসাদ লিখছেন, ‘১৯৩৭ সালে এই একগুঁয়েমি না দেখালে ১৯৪৪ সালে মুসলিম লীগকে সন্তুষ্ট করার জন্য দেশভাগের প্রস্তাবে গান্ধী আর রাজাগোপালাচারীকে সম্মত হতে হত না।‘’
    এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু আর মুসলিমকে নিয়ে একসাথে চলার পক্ষপাতী ছিলেন। দেশভাগের অব্যবহিত আগের উত্তুঙ্গ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সময় সেই উদার অবস্থান শুধু তিনি কেন, অনেকের পক্ষেই আর রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দুদের সংগঠিত করার কথা বলছেন। পাশাপাশি বলছেন, “ To establish co-operation with those Muslims who feel that Bengal’s hope lies in joint work between the two communities.” এতো তো সমন্বয়ের কথা, বিভাজনের কথা তো নয়।

    দেশভাগ, স্বাধীনতা লাভ এবং গান্ধী হত্যার পর এমন একটা অবস্থা তৈরি হয় যখন হিন্দু মহাসভাকে ঘোষণা করে তার রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ রাখার কথা বলতে হয়। এরকমও মত উঠে আসতে থাকে যে হিন্দু মহাসভা এরপর থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ রেখে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মত সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করবে কিনা। শ্যামাপ্রসাদ একথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন এবং চিরতরে এই পন্থা অনুসরণের পক্ষপাতী ছিলেন।শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভার উদারপন্থী অংশের বক্তব্য ছিল দেশভাগের পর হিন্দু সংখ্যাগুরু অংশকে নিয়ে গঠিত অংশে হিন্দুদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার যেহেতু ভয় নাই, তাহলে শুধু হিন্দুদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন কোন কাজে লাগবে? বরাবরই শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভাকে বাংলায় প্রায় স্বাধীনভাবে চালাতেন। কিন্তু এবার ১৯৪৮ সালের ৮ ই আগস্ট দিল্লীতে হিন্দু মহাসভার সারা ভারত কার্যকরী কমিটি তীব্র বিতর্কের পর রাজনীতিতে ফেরার কথাই বলে। একই সময়ে আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে যে হিন্দু মহাসভায় মুসলিমদের সদস্য করা হবে কিনা। শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য ছিল যে শুধু হিন্দু নয়--- সমস্ত ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে নিতে হবে। এর একটা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগের পরও মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। ৬ এবং ৭ই নভেম্বর ১৯৪৮ তারিখে কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করে যে হিন্দু ছাড়া কাউকে হিন্দু মহাসভার সদস্য করা যাবে না। প্রতিবাদস্বরূপ ২৩ শে নভেম্বর শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করেন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু স্বার্থ রক্ষার কথা বললেও সর্বকালে সব পরিস্থিতিতে সেকথা বলে চলার লোক ছিলেন না। এর প্রমাণ তিনি ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় কাজ করার সময়তেও রেখেছিলেন। তাঁর জোটসঙ্গী কৃষক প্রজা পার্টির বহু মুসলিম বিধায়ক যাঁরা শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু স্বার্থরক্ষাকারী নীতির জন্য তাঁর উপর বিরূপ ছিলেন, তাঁদের অনেকের আস্থা অর্জনে তিনি সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর নিজের কথায়---“ আমার সহজ বিশ্বাস এই যে যদি উভয় সম্প্রদায়ের নেতারা ঠিকঠাক চলেন তাহলে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না রাজ্যে। নেতৃত্বকে শুধু এরকম অবস্থায় থাকতে হবে যাতে তাঁরা নিজের নিজের সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে পারেন যে তাদের স্বার্থ ঠিকঠাক দেখভাল করা হচ্ছে। একবার মানুষের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা পেলে যে দুর্বৃত্ত্রা আগুন নিয়ে দিনরাত খেলতে চায় তারা হীনবল হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। “

    এর প্রমাণ শ্যামাপ্রসাদ পেয়েছিলেন যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য প্রাদেশিক আইনসভায় অন্তত পঞ্চাশ জন মুসলিম বিধায়ককে তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৪ সালে যখন গান্ধী জিন্নার পাকিস্থান প্রস্তাব মেনে নিচ্ছেন তখন ঐ মুসলিম বিধায়করা বোঝেন যে মুসলিমদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে কংগ্রেস লীগকেই মেনে নিচ্ছে।ফলে তাঁরাও আস্তে আস্তে ঐ শিবিরে ভিড়ে যান।
     
    অথচ অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্নতিকল্পে ফজলুক হক সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ বাজেটে এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করেছিলেন। কিন্তু শরিক দলের ব্যর্থতা এবং লোভের জন্য সেই টাকা দিয়ে কোনো প্রকল্প তৈরি করা যায় নি।
    শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন এমন একটা দলে শুরু হয়েছিল যার সাংগঠনিক এবং বর্ণভিত্তি খুব বড় ছিল না। বাংলার নিম্নবর্ণের মানুষ ও তাঁদের নেতারা হিন্দু মহাসভার পক্ষে ছিলেন না। তার ওপর যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি যখন চলছিল তার আগে পরে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। ফলে ব্রিটিশ বিরোধী কোনো বড় গণ আন্দোলন করার মত সময় ও সুযোগ তাঁর ছিল না। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সাভারকরও সব সময় তাঁর মত মেনে নিয়েছেন এমনটা নয়। তাই বলে শ্যমাপ্রসাদ ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ছিলেন এমনটা বলা যায় না। ভারত ছাড় আন্দোলনের উপর দমন পীড়নের তীব্র নিন্দা করেছেন, জেলে আটক কংগ্রেস নেতাদের মুক্তির জন্য দাবি জানিয়েছেন সোচ্চারে। মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগের পর গভর্নরকে ১৯৪২ সালের ১৬ই নভেম্বর যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন সেখানে লিখছেন,” যদি নিজের দেশকে স্বাধীন এবং ব্রিটিশ সমেত যে কোনো বিদেশী শক্তির আধিপত্যমুক্ত দেখতে চাওয়া অপরাধ হয় সেক্ষেত্রে প্রত্যেক আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ভারতবাসীই অপরাধী।“

    এটা কোনো ব্রিটিশ অনুগত মানুষের উক্তি বলে ভুল হচ্ছে না নিশ্চয় ?

    শ্যামাপ্রসাদ নিজের বিশ্বাসের প্রতি প্রচণ্ড দায়বদ্ধ ও আপোষহীন ছিলেন। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে জেহাদী গোষ্ঠীর উদ্যোগে এবং রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় হিন্দুবিরোধী খুন, ধর্ষণ, লুঠতরাজের প্রচুর ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী এবং দলিত হিন্দু নেতা যোগেন মণ্ডল এই ঘটনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এবং হিন্দুদের দেশত্যাগের ঘটনা অনেক বৃদ্ধি পায়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায়। তিনি দাবি জানাতে থাকেন যে উদবাস্তু সমস্যার সমাধানে হয় পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণ করতে হবে নয়তো পাকিস্তানের সঙ্গে জন বিনিময় করতে হবে যেমনটা পাঞ্জাবে দেশভাগের সময় হয়েছিল। এই দাবির মধ্যে অন্তত প্রথমটি বাস্তবোচিত ছিল না সেকথা বলা যেতে পারে।যাই হোক নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি সম্পাদনের পর প্রতিবাদস্বরূপ শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রীসভা থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি বুঝেছিলেন এই চুক্তি দিয়ে পাকিস্তানে সংখ্যালঘু হিন্দুর স্বার্থ রক্ষা হবে না। হয়ও নি।

    কিন্তু হিন্দু স্বার্থের রক্ষার প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ যুক্তির চেয়েও আবেগকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন বলে মনে হয়। তাই কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা না দিয়ে তাকে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা যে সেই সময় যেত না সেকথা তিনি মানতে পারেন নি। ফলে কাশ্মীরে তাঁর সেই সময়ের যাত্রা, গ্রেপ্তার এবং বন্দী থাকাকালীন মৃত্যু এক বিরাট ট্র্যাজেডি। তথাগত রায় বিজেপির সভাপতি থাকাকালীন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের যে জীবনী লিখেছিলেন সেখানে এই প্রসঙ্গে রীতিমত ষড়যন্ত্রের ঈঙ্গিত দিয়েছেন এবং নেহেরুকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে যা আছে সেসবই বিভিন্ন লোকের উক্তি অথবা তাঁদের মুখে অন্য লোকের শোনা কথা। এইরকম অপ্রমাণিত অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হতে পারে কিন্তু কাউকে দোষী ঠাওরাতে গেলে আর সেটা সৎ ইতিহাস চর্চা হয় না। ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলরাজ মাধোক, যিনি কাশ্মীর সফরে শ্যামাপ্রসাদের সহযাত্রী ছিলেন এবং যাঁর কথা তথাগত রায় বারবার উল্লেখ করেছেন তিনি তার আত্মজীবনীতে ১৯৬৮ সালে মোগলসরাই স্টেশনে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে যা অভিযোগ করেছেন সেসব মেনে নিলে তো সংঘপরিবারের ভাবমূর্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে। কিন্তু এগুলোকে আমরা সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে দেখতে চাই না।

    শ্যামাপ্রসাদের সীমাবদ্ধতার একটা বড় জায়গা ছিল যে তিনি ছিলেন উচ্চবর্ণের শিক্ষিত ভদ্রলোকদের প্রতিনিধি। ফলে হিন্দু সমাজের ঐক্যের জন্য ডাক দিলেও, অনেকটা আর্য সমাজের ছাঁচে নিম্ন বর্ণের এবং আদিবাসীদের হিন্দু সমাজের ’ মূল স্রোতে’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শুদ্ধি, সংগঠন ইত্যাদির আয়োজন করলেও তাদের কাছে টানতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার দলিত সদস্যরা যোগেন মণ্ডলের নেতৃত্বে বরং মুসলিম লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন। নারী অধিকার আন্দোলনের প্রবক্তারা বলতে পারেন যে তিনি আম্বেদকর প্রস্তাবিত হিন্দু কোড বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন যে বিলের মাধ্যমে আম্বেদকার হিন্দু মহিলাদের সম্পত্তিতে সমানাধিকার, বহুবিবাহ রদ, বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার প্রভৃতি আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে বহু বিশিষ্ট মানুষ এর বিরোধিতা করেছিলেন যেমন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ স্বয়ং। শ্যামাপ্রসাদ তখনই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আগে চালু করার দাবি করেছিলেন এবং হিন্দুদের এই বিল মানাকে অপশনাল করতে চেয়েছিলেন। আম্বেদকার শ্যামাপ্রসাদের এই দাবিকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেন। শ্যামাপ্রসাদ, এন সি চ্যাটার্জী প্রমুখের বক্তব্য ছিল যে এতে হিন্দুদের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। আসলে শ্যামাপ্রসাদ সারাজীবন একটা সুন্দর যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন এবং তার সুবিধা পেয়েছিলেন। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে স্ত্রীকে হারালেও তার সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার বৌদি। শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু কোড বিলের বিরোধী হলেও নারীবিদ্বেষী ছিলেন না। বরং যেভাবে তার ডায়েরিতে নিজের অকালপ্রয়াতা স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা উচ্ছসিতভাবে প্রকাশ করেছেন, তাঁর স্মৃতিকে উজ্জ্বল রাখার জন্য দ্বিতীয়বার বিয়ে করা থেকে বিরত থেকেছেন সেটা সেই যুগের পক্ষে ব্যতিক্রমী বইকি।

    শ্যামাপ্রসাদ যে সংগঠন করতেন তা সে হিন্দু মহাসভাই হোক বা জনসংঘ – তাদের মতাদর্শ নিয়ে আমি এখানে কোনো মন্তব্য করিনি। আমার ফোকাস এখানে ছিল পুরোটাই ব্যক্তি শ্যামাপ্রসাদের ওপর। অনেকে বলবেন এভাবে কি ব্যক্তিকে তাঁর সংগঠনের মতাদর্শ থেকে আলাদা করে বিচার করা যায় ? অন্তত শ্যামাপ্রসাদের ক্ষেত্রে যে অনেকটাই যায় সেটা উপরের আলোচনা থেকেই বোঝা যাবে। আমার মনে হয়েছে শ্যামাপ্রসাদের কাছে সংগঠন ছিল উপায় মাত্র, উদ্দেশ্য নয়। ফলে বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি নিজের আদর্শের সহায়ক হিসেবে যেটা ভালো মনে করেছেন সেই সংগঠনকেই বেছে নিয়েছেন। এটা একধরনের প্র্যাগম্যাটিজম, কোনোসুবিধাবাদ নয়। লক্ষ্য একটাই, আক্রান্ত হিন্দুর স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। এই প্র্যাগমাটিজমের দৃষ্টিকোণ থেকেই ফজলুল হক বা নেহেরুর মন্ত্রীসভায় তিনি একসময় যোগ দিয়েছিলেন। আবার যখন মনে করেছেন তার উদ্দেশ্য(ব্যক্তিগত নয়) সাধিত হচ্ছে না তখনই পদত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছেন। এই বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে তাঁর যাত্রাপথে তিনি নিঃসঙ্গতায় ভুগেছেন। এমনকি স্বার্থহীন, উচ্চ আদর্শযুক্ত মানুষ নিজের সংগঠনের মধ্যেও খুব বেশি পান নি একথা লিখে গেছেন। ভগ্ন স্বাস্থ্যের কথা, ক্লান্তির কথা, হার্টের অসুখের কথা এমনকি মৃত্যুচেতনার কথা তাঁর দিনলিপিতে উঠে এসেছে বারবার—কিন্তু হতাশা বা পরাজয়ের কথা আসে নি। এই বরেণ্য, আদর্শবাদী মানুষটিকে কোনো ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রবণ শক্তি গ্রাস করতে যাতে না পারে সেটা দেখাই আমাদের সকলের দায়িত্ব।

    তথ্যসূত্রঃ
    1. Leaves from a diary, Shyamaprasad Mukherjee, Oxford University Press,1993
    2. Bengal Divided Hindu Communalism and Partition 1932-1947, Joya Chatterji, Cambridge University Press 1994
    3. The Spoils of Partition, Joya Chatterjee, Cambridge University Press 2007
    4. Syamaprasad Mukherjee, Life and Times, Tathagata Roy, Penguin Books,2017




    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন