এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  • আম্বেদকর, জাতপাতের  বিনাশ এবং  আধুনিকতা সম্পর্কিত কিছু বিতর্ক

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ২৩ বার পঠিত
  • বাবাসাহেব আম্বেদকরের ‘ জাতপাতের বিনাশ’ ( Annihilation of Caste) নামে ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত বইটি যে আদতে একটি অপ্রদত্ত বক্তৃতা ছিল সেটা বইয়ের মুখবন্ধে স্পষ্ট করেই বলা আছে। হিন্দুধর্মের সংস্কার সাধনে উদ্যোগী বর্ণহিন্দুদের সংস্থা জাতপাত তোড়ক মণ্ডল ( যা ছিল দয়ানন্দ সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত আর্যসমাজের র‍্যাডিকাল অংশ ) লাহোরে তাদের অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আম্বেদকরকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ডেকেছিল। গোল বাধে আম্বেদকরের প্রস্তাবিত বক্তৃতার বয়ান নিয়ে। আম্বেদকরের বক্তব্যের কিছু কাটছাঁট দাবি করেন মণ্ডলের পরিচালকরা যেটা করতে বাবাসাহেব সঙ্গত কারণেই রাজি হন নি। ফলে সেখানে সভাপতিত্ব করা বা বক্তৃতা দেওয়া কোনোটাই করা হয়ে ওঠে নি বাবাসাহেবের। অচিরেই এই না দেওয়া বক্তৃতাটাই বই হয়ে বেরোয় এবং বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আমরা এখানে এই বইটির বক্তব্যকে কেন্দ্রস্থলে রেখে কিছু আলোচনা করব। হিন্দুধর্ম সম্পর্কে যে বক্তব্য আম্বেদকর এই লেখায় লিখেছেন সেটাই প্রথমে তুলে ধরব ( এখানে আমার নিজের কিছু ভিন্ন ধারণা আছে যেটা এই লেখায় প্রাসঙ্গিক নয় বলে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছি )।

    অনেক সময় বলা হয় জাতের বিচার অন্য ধর্মাবলম্বী যেমন মুসলিম ও শিখদের মধ্যেও আছে। আম্বেদকর বলেন, হ্যাঁ, তা আছে। কিন্তু সেটা একটা প্র্যাকটিস মাত্র, তার পিছনে ধর্মীয় অনুমোদন বা নির্দেশ নেই। কিন্তু হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে এটি একটি পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।আম্বেদকর চমৎকারভাবে বলেন, হিন্দুরা জাত মানে কারণ তারা খুব অমানবিক বা মোটা বুদ্ধির তা নয়। তারা গভীরভাবে ধার্মিক বলে এটা মানে। তাঁর মতে গণ্ডগোলটা আছে ধর্মের মধ্যেই যেটা তাদের মাথায় এই ধারণাটা ঢুকিয়েছে।ফলে যে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে হবে সেটা জাত মানা মানুষগুলো নয়, সেটা হল ধর্মশাস্ত্র এবং তার বিধান। আম্বেদকরের মতে জাতপাতের সমস্যার প্রকৃত প্রতিবিধান ঘটাতে হলে মানুষের মনে শাস্ত্রবাক্যের পবিত্রতায় যে বিশ্বাস তাকে বিনাশ করা দরকার। মহাত্মা গান্ধী সমেত সব সংস্কারকদের সীমাবদ্ধতা এখানেই যে তাঁরা শাস্ত্রের এই কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে না শিখিয়ে মানুষকে যৌক্তিক ও মানবিক হতে বলেন। ফলে তাঁদের প্রচেষ্টায় বিশেষ লাভ হয় না। একবার মানুষকে ধর্মের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে চিন্তার স্বাধীনতা এনে দিলে জাতসম্মেলক ভোজ (Inter caste dining ) বা অসবর্ণ বিবাহ নিয়ে আর আলাদা করে জোরাজুরির প্রয়োজন পড়বে না। এ ব্যাপারে আপ্তবাক্য উচ্চারণ করে লাভ নেই যে, ধর্ম আসলে এটা বলতে চায় নি, এর অন্য মানে আছে ইত্যাদি। লোকে যেভাবে ধর্মটাকে বুঝছে, অনুশীলন করছে সেটাই ধরতে হবে। শেষাবধি বুদ্ধ বা নানকের মত শাস্ত্রের এবং বেদের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করতে হবে।

    দ্বিতীয় যে কারণে জাতব্যবস্থা টিঁকে থাকে সেটা আম্বেদকরের মতে এর স্তরায়ন ( Gradation)। শুধু চতুর্বর্ণ নয় চার হাজারেরও বেশি জাতকে বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করে রাখা আছে। তার মধ্যে অতিশুদ্র, অস্পৃশ্য, জলচল, অজলচল, অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণী – পিরামিডের মত আকার। এই পিরমিডের যত ওপরে যাওয়া যাবে তত বেশি সামাজিক সুবিধা ও সম্মান আর যত নীচে যাওয়া যাবে তত কম তা। কিন্তু একদম নীচের স্তরের যারা আছে তাদের বাদ দিয়ে ঠিক ওপরে যারা থাকছে এই ব্যবস্থায় তাদেরও হারানোর মত কিছু আছে। ফলে তারাও যেমন এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যায় না তেমনি নীচের তলার মানুষরা ঐক্যবদ্ধ হয় না।বাবাসাহেবের অননুকরণীয় ভাষায় – All are slaves of the caste system. But all the slaves are not equal in status. ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদ শুধু ব্রাহ্মণদের মধ্যেই থাকে এমন নয়। জাতব্যবস্থার তুলনামূলক নিচু স্তরে অবস্থিত জাতের মানুষের মনেও থাকে আরও নীচের স্তরে অবস্থিত জাতের মানুষের প্রতি।

    হিন্দু ধর্ম কী ? আম্বেদকরের মতে বেদ এবং স্মৃতিতে যা আছে তা সামাজিক, রাজনৈতিক, শুচিতা ( sanitation ) এবং যজ্ঞাদি সম্পর্কিত নিয়মবিধি মাত্র, কোনো নীতি নয়। আদেশ আর নিষেধের এই সমাহারকেই হিন্দুরা ধর্ম বলে জানে। সর্বদেশে, সর্বকালে প্রযোজ্য আধ্যাত্নিক নীতি এর ভিত্তি নয়। আবার এই নিয়মকানুন নিয়ে কোনো বিরোধ বাধলেও যুক্তির প্রয়োগের কোনো জায়গা এখানে নেই।মনুর বিধান অনুযায়ী বেদ, স্মৃতি আর সদাচারের ভিত্তিতেই ইতিকর্তব্য স্থির করতে হবে।শ্রুতির দুই বিধানের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে যে কোনো একটিকে অনুসরণ করা যাবে। শ্রুতি আর স্মৃতির মধ্যে বিরোধ বাধলে শ্রুতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। স্মৃতির দুই বিধানের মধ্যে পার্থক্য হলে মনুসংহিতা অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু এইসব নিয়ম যে আধুনিক কালে প্রতি মুহূর্তে লংঘিত হচ্ছে সেটাও ঘটনা। রেল ভ্রমণ করলে বা বিদেশ গেলে জাতের শুদ্ধতা বজায় রাখা যায় না। তাহলে এই ব্যবস্থা টিঁকে থাকে কী করে ? এটাও হিন্দুধর্মের বৈশিষ্ট্য যে প্রতি মুহুর্তে নিয়মের উল্লঙ্ঘন আর প্রায়শ্চিত্ত অনুমোদিত। এতে জাতব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রাখার সুবিধা বেড়েছে।

    সদাচার মানেও কিন্তু নৈতিক আচরণ নয়--- কোনটা ধর্ম আর কোনটা অধর্ম সেটা শাস্ত্রানুসারী কিনা দেখে ঠিক করা। তাই আম্বেদকরের মতে শ্রুতি আর স্মৃতির ধর্মকে বিনষ্ট না করে জাতপাতের অভিশাপ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। ধর্মের বিনাশ শুনে কেউ যাতে ভুল না বোঝেন সেই ব্যাপারে আম্বেদকর সতর্ক করে বলছেন, নীতি ( principle ) আর বিধানের মধ্যে পার্থক্য মনে রাখা দরকার। বিধান আমাদের জানায় যুক্তির প্রয়োগ না করেই কী করতে হবে। সেখানে নীতি আমাদের কর্তব্য নির্ধারণে যুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে বলে। নীতির প্রয়োগে, সেটা ঠিক ভুল যাই হোক না কেন, দায়িত্ব আর সচেতনতা থাকে যেটা বিধান পালনে থাকে না। আম্বেদকরের মতে ধর্ম হওয়া উচিত নীতির সমাহার, বিধানের নয়। যে মুহূর্তে নীতি বিধানে পরিণত হয় সেই মুহূর্তে তা আর ধর্ম থাকে না। ফলে মানুষ যদি বোঝে যে ধর্ম বলে সে যেটাকে ভাবছে সেটা কোনো পবিত্র, অলঙ্ঘ্য ধর্ম নয়, বিধান মাত্র তখন সে সেটা অমান্য করে পাল্টাতে সাহস পাবে। কারণ বিধান মানেই সেটা মানুষের তৈরি এবং পরিবর্তনযোগ্য। তবে নীতিভিত্তিক ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করেছেন আম্বেদকর। তবে তিনি মনে করেন নতুন ধর্মের ভিত্তিস্থাপনে স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রীর মত গণতান্ত্রিক বোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার জন্য বিদেশ থেকে ভাবনা না ধার করে যদি উপনিষদ থেকেই সেটা করা যায় তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু জীবন সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে এবং মূল্যবোধ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টে দেবার শক্তি থাকতে হবে সেই ধর্মে। কিন্তু সেই নতুন ধর্মের জন্মের আগে পুরোনোর মৃত্যু দরকার। নতুন প্রাণ যেমন নতুন শরীরেই জন্ম নেয়, জীর্ণ শরীরে নয়।

    দুই

    ২০১৪ সালের অগাস্ট মাসে দিল্লীর নবযান প্রকাশনা থেকে বিস্তৃত টীকা সহ Annihililation of Caste এর একটি সংস্করণ বেড়ায়। ঐ বছরই ব্রিটেনের বামপন্থী বইয়ের বিখ্যাত প্রকাশক ভার্সো থেকেও ছেপে বেরোয় এই সংস্করণ। এই বইয়ের ভূমিকা লেখেন অরূন্ধতী রায়। পঞ্চাশ পৃষ্ঠার বক্তৃতার ১৫০ পৃষ্ঠার ভূমিকা। এই নিয়ে ভারতের দলিত বুদ্ধিজীবীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল (১) এত বড় ভূমিকা লিখে বাবাসাহেবের বইটিকে প্রান্তিক করে তোলা হয়েছে। (২) অরুন্ধতীর ভূমিকা প্রকাশক ব্যবহার করেছেন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। এতে বাবাসাহেবের বইটি উপলক্ষ মাত্র (৩) উচ্চবর্ণের অরুন্ধতীর কি অধিকার আছে এই ভূমিকা লেখার ? (৪) এখানে মহাত্মা গান্ধীকে এত গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হল কেন ? এই সমস্ত সমালোচনাগুলি একত্র করে একটি বই প্রকাশ করেন তাঁরা যেখানে অরুন্ধতীর একটি পত্রোত্তরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পরে ২০১৭ সালে অরুন্ধতীর ভূমিকাটি ‘ The Doctor and the Saint’ নামে আলাদা করে প্রকাশিত হয়।

    অরুন্ধতীর লেখার সাথে যাঁরা পরিচিত তাঁরা জানেন যে তিনি দেবতাদের সঙ্গেও নির্ভয় কথোপকথনে অভ্যস্ত।এই ভূমিকায় তিনি গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকা বাসপর্বের রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখান যে সেখানে গান্ধীর বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলন আদতে ছিল কৃষ্ণাঙ্গ বা ভারতীয় দাসশ্রমিকদের থেকে ভাগ্যান্বেষী বাকি ভারতীয়রা যে আলাদা সেই দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ফলে বর্ণব্যবস্থা সম্পর্কে গান্ধীর যে মত—বর্ণবিভাগ থাকুক কিন্তু অস্পৃশ্যতা দূর হোক – সেটাও ওই একইরকম স্থিতাবস্থা বজায় রেখে সংস্কারের চেষ্টা। গান্ধী এবং আর্যসমাজীদের বক্তব্য ছিল বর্ণব্যবস্থা হোক গুণবাচক অর্থাৎ সামর্থ্য অনুযায়ী বর্ণবিভাগ। আম্বেদকর সঠিকভাবেই বলেছেন যে এই প্রস্তাব অবাস্তব। কারণ গুণের ভিত্তিতে বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন বর্ণে বিন্যস্ত করাই তখন সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। বিভিন্ন বর্ণে যাতায়াত চলতেই থাকবে—এমনকি একই পরিবারের মধ্যে বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন বর্ণে স্থান পেতে হতে পারে। মেয়েদের তাহলে কী হবে ? নারী পুরোহিত (ব্রাহ্মণ) এবং নারী যোদ্ধা (ক্ষত্রিয় ) হওয়া যাবে কী ? গান্ধীর দলিতদের সম্পর্কে ‘পিতৃসুলভ এবং অছিসুলভ ভুমিকা ‘, আদর্শ ভাঙ্গির (মেথর) সংজ্ঞাদান ইত্যাদি পরবর্তীকালে পুনা চুক্তির আগে তার অনৈতিক আমরণ উপবাসের ( যেটা দলিতদের পৃথক ভোটাধিকারের অধিকারের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির কাজে লেগেছিল ) পটভূমিকাকে চিনিয়ে দেয় আমাদের।মজার কথা, গান্ধীর বিখ্যাত হরিজন সেবক সংঘের একজন সদস্যও হরিজন ছিল না।

    অরুন্ধতী আম্বেদকরের ভারতের আদিবাসী সম্পর্কিত বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। জাতপাতের বিনাশ গ্রন্থে বাবাসাহেবের এই সংক্রান্ত বক্তব্য বেশ আপত্তিজনক। আদিবাসীদের কীভাবে’ আধুনিক, সভ্য’ করে তোলা যায় সেই নিয়েই যেন তিনি চিন্তিত ছিলেন। অরুন্ধতী সরাসরি এই বক্তব্যকে গান্ধীর বর্ণব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে তুলনীয় বলেছেন। আসলে আম্বেদকরের চিন্তায় পাশ্চাত্য আধুনিকতার বিরাট গুরুত্ব ছিল। আধুনিকতা, শিল্পায়ন, নগরায়ন, বৈজ্ঞানিক শিক্ষা--- এগুলোকে তিনি মুক্তির পথ হিসেবেই দেখতেন --- বিশেষত গ্রামভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার জাতপাতের নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি পেতে। বস্তুত আম্বেদকরের সঙ্গে গান্ধীর জাতিগঠন সম্পর্কিত ধারণার অবস্থান বিপ্রতীপ। গান্ধী আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি,শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা--- সবকিছুরই বিরোধিতা করতেন। আম্বেদকর মনে করতেন, এটা আসলে আধুনিকতার মধ্যেই লালিত এক রোমান্টিক, কল্পিত আদর্শ গ্রামব্যবস্থার স্বপ্ন ( যেটা রুশো, টলস্টয় দেখে এসেছিলেন ) ছাড়া কিছু নয়। অরুন্ধতী এটাও দেখিয়েছিলেন যে গান্ধী যখন তাঁর আদর্শ ‘ হিন্দ স্বরাজ’ লিখছেন (১৯০৫) দক্ষিণ আফ্রিকায় বসে তখনও তিনি ভারতের গ্রামজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাই লাভ করেন নি। লণ্ডন আর ডারবান যাওয়ার আগে তিনি পোরবন্দর, রাজকোট আর আমেদাবাদের মত যে জায়গাগুলিতে ছিলেন তার কোনোটিই গ্রাম নয়।

    প্রাবন্ধিক নমিত অরোরা জানাচ্ছেন আধুনিক সভ্যতার অনেক অবদানকে গান্ধী নিজেই ব্যবহার করতেন ‘ নেসেসারি ইভিল’ বলে। তাই রেলব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলেও সারা ভারত তিনি ট্রেনেই ঘুরেছেন। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার নিন্দে করলেও ১৯২৪ সালেই নিজের অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করিয়েছেন। মজার ব্যাপার, এ ব্যাপারে অরুন্ধতী আবার আম্বেদকরের সমালোচক এবং গান্ধীকে দ্রষ্টার সম্মান দিয়েছেন। তাঁর মতে গান্ধীর এই বিশ্বাস সঠিক ছিল যে রাষ্ট্র সংহত এবং সংগঠিত উপায়ে হিংসার প্রতিভূ। অপরদিকে আম্বেদকর ‘’পাশ্চাত্য আধুনিকতার বিপর্যয়কারী বিপদকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। “ তাঁর মতে আম্বেদকর ন্যায় চাইতে গিয়ে আধুনিকতা, শিল্পায়ন ও নগরায়নের যে মেলবন্ধন চেয়েছেন তারই উপজাত উন্নয়নের মডেলে বড় নগর, বড় বাঁধ, বড় সেচপ্রকল্প গড়ে ওঠে যা শত সহস্র মানুষকে অবিচারের লক্ষ্যবস্তু করে, পরিবেশের ধ্বংসসাধন করে, খনি,বাঁধ এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পর দ্বারা লক্ষ মানুষের উচ্ছেদ ঘটায় গ্রাম ও স্বীয় বাসস্থান থেকে। অপরদিকে আম্বেদকর মনে করতেন যে মানুষের অস্তিত্বকে ‘’ পশুসুলভ যাপন থেকে মুক্তি দিতে যন্ত্র এবং আধুনিক সভ্যতা অপরিহার্য ‘’।তিনি বলছেন, ‘’ যন্ত্র এবং আধুনিক সভ্যতাকে অনাসৃষ্টির জন্য দায়ী করা যায় না। দায়ী ভুল সামাজিক ব্যবস্থা যা ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং লাভকেই সর্বোচ্চ বৈধতা দেয়। ‘’এখানে আম্বেদকরের বক্তব্য অনেকটা সমাজতন্ত্রীদের মত যদিও ‘ জাতপাতের বিনাশ’ লেখায় একমাত্র অর্থনৈতিক মাপকাঠি দিয়ে সামাজিক বৈষম্যকে বুঝতে চেষ্টা করা এবং ফলস্বরূপ অনিবার্য ব্যররথতার জন্য সমাজতন্ত্রীদের তিনি সমালোচনা করেছেন ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে।

    নমিত অরোরা অরুন্ধতী রায়ের সমালোচনা করতে গিয়ে বলছেন, তিনি যে যে বিষয়ে তাঁর সোস্যাল অ্যাকটিভিজম জারী রাখেন এবং সেই সংক্রান্ত নন-ফিকশন লেখেন তা যথাযথ। কিন্তু তার ভিত্তিতে যখন তিনি সরাসরি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং উন্নয়নের ধারণার সর্বাত্মক বিরোধিতা করেন তখন বলতেই হয় যে বিকল্পটা কি ? সদ্য স্বাধীন এবং দারিদ্রপীড়িত একটি দেশের কাছে ভারী শিল্প, প্রযুক্তি, আধুনিক বিজ্ঞান, নগরায়ন,জনস্বাস্থ্য, পরিকাঠামোর প্রসার – এসবের কোনো বিকল্প থাকে কি ? থাকলেও সেই বিকল্প যে আরও খারাপ ফল দিত না তারই বা গ্যারান্টি কী ? লাভ ক্ষতি সবসময় মিশে থাকলেও লাভের পাল্লা ভারী কিনা সেটাই বিচার করতে হয়। নমিত যে ব্যাপারটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তা হল, আধুনিকতার প্রতি একধরণের অদম্য গণ ক্ষুধা রয়েছে মানুষের। আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্য, আরেকটু মর্যাদা, আরেকটু স্বাধীনতা প্রায় সবাই চায় (বাংলা সাহিত্যে পুতুলনাচের ইতিকথার শশী আর বিভূতিভূষণের অপুর কথা মনে করুন)। যেমন ঐতিহ্যবাহী পিতৃতান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজে সমকামীর স্বাধীনতা, নারীর নিজের শরীর ও জন্মদানের স্বাধীনতা কি অনেক বেশি বাধাপ্রাপ্ত নয় ? সেই সমাজে মানুষের স্বাধীনতার মর্যাদা, জীবনযাপনের অনন্যতার অধিকার কতটা গুরুত্ব পায় ?

    অরুন্ধতী যে ‘পাশ্চাত্য আধুনিকতা’র মুণ্ডপাত করেছেন তার অনেকটাই ন্যায্য যা কর্পোরেট পুঁজিবাদ, আয়ের বৈষম্য এবং পরিবেশের প্রশ্নগুলোর সঙ্গে জড়িত। একইসঙ্গে নমিত মনে করিয়ে দেন যে ঐ আধুনিকতার অংশ হিসেবেই আমরা পাই গণতন্ত্র, কম্যুনিজম, সমাজবাদ, পরিবেশবাদ, জিরো গ্রোথ ইকনমি ইত্যাদি। নমিত অরুন্ধতীর আধুনিকতা সম্পর্কিত ধারণার বিরোধিতা করেছেন মানে কিন্তু এই নয় যে তিনি আম্বেদকরের এই সংক্রান্ত ধারণার পূর্ণ সমর্থক। তিনি উদ্ধৃত করেছেন, অন্ধ্রের অকালপ্রয়াত দলিত বুদ্ধিজীবী ডি আর নাগারাজকে। নাগারাজ মনে করিয়ে দিয়েছেন আধুনিক নগরায়ন দলিতের মধ্যে এক সাংস্কৃতিক শূণ্যতা তৈরি করে। দলিতের নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে যাওয়াই যেন আম্বেদকরপন্থীদের লক্ষ্য যেখানে নাগারাজ এই বিস্মরণের বিরোধী।নাগারা্জ মনে করেন না দলিতের জীবন শুধু দুঃখ, নির্যাতন আর নিষ্পেষনের আখ্যান। তার আনন্দ, উল্লাস, গীতিবাদ্য, লোকশিল্প –সবটা মিলেই তার সংস্কৃতি। সনাতন হিন্দুধর্ম থেকে দূরত্বরচনায় রত আর আধুনিক পুঁজিবাদের সাংস্কৃতিক শূণ্যতায় পীড়িত হয়ে অতীতের সঙ্গে সংযোগস্থাপনের চেষ্টা থেকেই সম্ভবত আম্বেদকরের ‘ নবযান বৌদ্ধধর্ম’ গ্রহণ। আরেকটি ব্যাপার নাগারাজ সঠিকভাবেই তুলে ধরেছেন – ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজি এবং উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়নের মডেলে উচ্চবর্ণের আধিপত্য ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। ঐতিহ্যবাহী সমাজের নিষ্পেষণ এড়াতে গিয়ে আম্বেদকর খেয়াল করেন নি যে নতুন প্রযুক্তির সামাজিক মালিকানা কার হাতে।

    আম্বেদকরের মধ্যে সামাজিক ন্যায়ের আদর্শ প্রগাঢ় ছিল বলেই তিনি শুধুমাত্র সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যেই ন্যায় খোঁজেন নি। বহু ব্যপারেই অতৃপ্ত ছিলেন তিনি। গৌতম বুদ্ধ এবং কার্ল মার্কস—দুজনেই প্রতিই শ্রদ্ধাশীল আম্বেদকর মার্কসের চিন্তাধারার ওপর একটি বই লেখা শুরু করেছিলেন যার অসমাপ্ত পান্ডুলিপি আনন্দ তেলতুম্বদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। আম্বেদকর বুঝেছিলেন শহরের দলিতদের এক সামান্য অংশের উন্নয়ন হলেও গ্রামের দলিতদের অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হয় নি। এ ব্যাপারে তাঁর ক্ষোভ তিনি অনুগামীদের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন আম্বেদকর কল্যাণকর পুঁজিবাদের ( Welfare Capitalism) পক্ষপাতী ছিলেন। জানিনা, এরকম ধারণার ভিত্তি কি। একথা ঠিক, তিনি রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের আগে সামাজিক সংস্কারের পক্ষপাতী ছিলেন যেটা বুঝতে তৎকালীন কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ ভুল করেছিলেন। আমাদের দেশের বামপন্থী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দও একই ভুল করেছিলেন। আমাদের প্রশ্ন, দুই ধরনের সংগ্রাম একসঙ্গে চলার কী অসুবিধা ছিল বা এখনই বা কী আছে ? দ্বিতীয়ত,আম্বেদকর আজ বেঁচে থাকলে দেখতে পেতেন আধুনিকতা আর নাগরিকতার মধ্যে দলিতদের যে মুক্তিসন্ধান তিনি করেছিলেন তার চালিকাশক্তি থেকে দলিতরা আজও শত যোজন দূরে। তার কারণ আধুনিকতার গোটা ব্যবস্থাটা কিন্তু শেষপর্যন্ত বড় পুঁজির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পুঁজি তার কল্যাণকর মুখোস দিন দিন হারাচ্ছে। যুদ্ধ, নৈরাজ্য, কর্মহীনতা আধুনিক পুঁজিবাদের অপর নাম হয়ে উঠছে। এই কর্পোরেট পুঁজি ধর্মের খারাপ দিকগুলো নতুন করে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে জাতপাতের বিনাশ শুধু যুক্তিবাদের প্রসারের মাধ্যমে ধর্মের বৈধতা নস্যাৎ করে দিলেই ঘটছে না। আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য সমাজমাধ্যমে ভর করে নতুন করে এসবের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। মানে আধুনিকতাই নতুন করে মানুষকে পশ্চাৎপদ হতেও সাহায্য করছে। এখানেও সেই একই প্রশ্ন--- এই সমাজমাধ্যমের মালিকানা কার হাতে ? উত্তর হল বৃহৎ পুঁজি। ফলে দলিতের মুক্তির ইস্যুতে আধুনিক পুঁজিবাদের ভূমিকা আর নেহাত মুক্তিদাতার ভূমিকায় নেই (হয়তো কোনোদিনই সম্পূর্ণভাবে ছিল না ), তা এক সাংঘর্ষিক ভূমিকায় পৌঁছেছে। এই দ্বান্দিকতার ভেতর আম্বেদকরের ওই যুগান্তকারী বইটির পুনর্পঠন দরকার। আধুনিকতা আর নগরায়নে পৌঁছে গেলেও মুক্তি নেই, যদি না পুঁজির শাসনকে নিরন্তর প্রশ্ন করা না যায় ধর্মের অচলায়তনকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি।

    সূত্রনির্দেশঃ
    (১) Annihilation of Caste : The Annotated Critical Edition, B.R.Ambedker,2014, Navayana.
    (২) The Lottery of Birth: on Inherited Social Equalities, Namit Aroara, 2017, Three Essyas Collective
    (৩) The Flaming Feet and Other Essyas, D.R Nagaraj, 2010 Permanent Black,
    (৪) Hatred in the Belly, 2015, Shared Mirror.
    (৫) India and Communism, B.R. Ambedker,Introduction by Anand Teltumbde.

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ২৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন