
এই সম্পর্ক ভৌগোলিক ভাবেও পুঞ্জীভূত। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-মধ্য বাংলার একটি বেল্ট— মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর— যেখানে বিবেচনাধীন ভোটারের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। বিবেচনাধীন ভোটারের হার সবচেয়ে বেশি যে ২৫টি কেন্দ্রে, তার মধ্যে ১১টি মালদায়, ৮টি মুর্শিদাবাদে, ৫টি উত্তর দিনাজপুরে এবং ১টি বীরভূমে। অর্থাৎ, পরিসংখ্যান বলছে যে, ‘বিবেচনাধীন ভোটার’ বিষয়টি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।

এখানে দু’টি কথা বলে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, রাশিবিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠই বলে যে, কোরিলেশন বা আন্তঃসম্পর্ক মানেই কজ়েশন বা কার্যকারণ সম্পর্ক নয়। ফলে, বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা কয়েকটি নির্দিষ্ট জেলায় অনেক বেশি, এই তথ্য থেকে সরাসরি কোনও অভিসন্ধি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সম্ভাবনা রয়েছে যে, এই প্রবণতা আসলে সামাজিক বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন। যে গোষ্ঠীগুলি অধিকতর প্রান্তিক— দরিদ্র, নিরক্ষর, প্রবীণ, পরিযায়ী— তাদের পক্ষে পরিচয়পত্র বা নথিপত্র সঠিক ভাবে সংরক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময়ে পেশ করা কঠিন। আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, জেলার জনসংখ্যায় মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ঘনত্বের সঙ্গে ‘বিবেচনাধীন’-এর সংখ্যার যেমন দৃঢ় আন্তঃসম্পর্ক আছে, তেমনই আছে নিরক্ষরতার হারের সঙ্গেও। অন্য দিকে, সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উত্তরদাতারা মনে করেছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রবীণ, নিরক্ষর, দরিদ্র, গ্রামীণ মানুষ এবং পরিযায়ীরা। অর্থাৎ, ঝুঁকির বোঝা সমাজের প্রান্তিক অংশের উপরেই বেশি পড়ছে— এবং এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ফল। এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যেই তৃণমূলের সমর্থন তুলনামূলক ভাবে বেশি থাকলে, পরিসংখ্যানে এই ধরনের সম্পর্ক দেখা যেতেই পারে।
তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ নয়। নিরক্ষরতা ও আর্থসামাজিক বৈষম্যের প্রভাব পরিসংখ্যানগত ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পরেও দেখা যাচ্ছে, ভোটের ব্যবধান ও বিবেচনাধীন হারের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
দ্বিতীয় কথা হল, গোটা রাজ্যকে একত্রে বিশ্লেষণ করলে জেলাভিত্তিক বৈচিত্র আড়াল হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক দক্ষতা, জনসংখ্যার গঠন, বা রাজনৈতিক সমর্থনের ধরন আলাদা। এই সবই ভোটের ব্যবধান ও বিবেচনাধীন হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। এই আপত্তিও যুক্তিসঙ্গত। তাই আমাদের বর্তমান বিশ্লেষণে জেলাভিত্তিক প্রভাব আলাদা রেখে দেখা হয়েছে। ফল একই। একই জেলার মধ্যেই, তৃণমূল-জেতা আসনে ভোটের ব্যবধান প্রতি ১ শতাংশ বাড়লে বিবেচনাধীন ভোটারের হার গড়ে প্রায় ০.৪১ শতাংশ বাড়ছে। বিপরীতে, বিজেপি-জেতা আসনে এই সম্পর্ক কার্যত শূন্য— অর্থাৎ ব্যবধান বাড়লেও বিবেচনাধীন হারে তেমন পরিবর্তন নেই। উত্তরবঙ্গের তিনটি জেলা— মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর— আলাদা করে দেখলেও এই প্রবণতা একই রকম। যেখানে তৃণমূলের জয় ব্যবধান বেশি, সেখানে বিবেচনাধীন হারও বেশি। উত্তর দিনাজপুরের যে সব বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল বড় ব্যবধানে জিতেছিল, যেমন গোয়ালপোখরে, সেখানে ‘বিবেচনাধীন’ নামের হার সর্বোচ্চ; আর রায়গঞ্জ ও কালিয়াগঞ্জে, যেখানে বিজেপি জয়ী হয়েছিল, সেখানে বিবেচনাধীন হার সর্বনিম্ন।
এটা ঠিকই যে, পরিসংখ্যান রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্য নির্ণয় করতে পারে না; তা কেবল দেখাতে পারে যে, গোটা ব্যবস্থার মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট নকশা ফুটে উঠছে কি না। এখানে যে নকশাটি উঠে আসছে, তা হল— বিবেচনাধীন ভোটারের হার রাজ্যজুড়ে সমান নয়; এটি ভৌগোলিক ভাবে পুঞ্জীভূত; এবং এটি শুধু আর্থসামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে নয়, পূর্ববর্তী নির্বাচনের ভোট ব্যবধানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একই জেলার ভিতরেও এই সম্পর্ক তৃণমূল-জেতা আসনে দৃশ্যমান, কিন্তু বিজেপি-জেতা আসনে নয়। এই পর্যবেক্ষণগুলি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে— এমন প্রশ্ন, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা কেবল একটি প্রশাসনিক নথি নয়; এটি নাগরিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি। ভোটাধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার যদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তা হলে কত জন বাদ পড়লেন, প্রশ্ন শুধু সেটা নয়— প্রশ্ন হল কোথায়, কার উপরে, কতটা বেশি ভাবে এই অনিশ্চয়তা নেমে এল। এবং সেই অনিশ্চয়তার দায় কার— প্রান্তিক মানুষের, প্রশাসনিক ব্যর্থতার, না কি এমন কোনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার, যা সরাসরি দৃশ্যমান নয়?
------