লিয়ার এইখানেই আমার কাছে আর সমস্ত শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডির থেকে কিছুটা আলাদা। লিয়ারের শুরু থেকে শেষ, ট্রাজেডির পায়ে পায়ে ট্রাজেডি - যেন অদ্ভুত সাঙ্ঘাতিক এক চেইন রিয়্য্যাকশন চলছে, একের পর এক ঘটনা। অভিঘাত কাটতে না কাটতে আবার-ও আরেকটা কিছু। অনিঃশেষ, রিলেন্টলেস। এই এক-ই দৃশ্যের সংলাপ, "As flies to wanton boys are we to th' gods. They kill us for their sport." ...
মনে হয় না, এও যেন কী অদ্ভুত বিশ্রীরকমের সত্যি? শুধু ঈশ্বরের জায়গায় রাষ্ট্র যেন। নাকি না, জনসমক্ষে সেসব বলা বারণ?
তবে, এই ভোটের আগের দিন, যেটা আসলে বলার কথা, সেটা কিন্তু কিং লিয়ারের একদম শেষ সংলাপ। লিয়ারের মৃত্যুদৃশ্যের অব্যবহিত পরেই। এইটিও এডগারের-ই, অন্তত ফোলিও এডিশনের এডগার। সে বলছে,
"The weight of this sad time we must obey,
Speak what we feel, not what we ought to say.
The oldest hath borne most: we that are young
Shall never see so much, nor live so long."
লিয়ারের অনিঃশেষ ট্র্যাজেডির এই শেষ লাইনক'টি আমার কাছে কিছুটা হয়তো বিসদৃশভাবেই বেশ আশার কথা মনে হয়।
আর মনে হয় যেন চেতাবনি ছিলই, আছেই চোখের সামনে। চোখের সামনে যা ঘটছে, যে সাংঘাতিক অপচয় ও অপমান, তাকে অস্বীকার করতে পারি, ছবি উলটে রাখতে পারি দেওয়ালে, ফল, উন্মাদদশা ও হতাশা। আর যা সত্যিই ভাবছি, যাকে সত্যি বলে অন্তঃকরণে জানি, তা না বলে, যদি শুধু সেইটুকুই বলি যা বলা উচিত সামাজিক সমঝোতা অথবা দায়বদ্ধতায়, তার ফল অন্ধত্ব ও নির্বাসন।
আর মনে হয়, যে, আমরা এই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে বসেও, এই হিংসার উন্মত্ততার মধ্যেও ভাবি যে, আমরা নিশ্চয়ই ঐ ওঁদের মত, সেই গত শতাব্দীর মতন কিছুই দেখবো না, মানে নামছি-নামছি করেও সেই ১৯৩৪-এর জর্মনি অব্দি নামবো না, এইটা কী আশ্চর্য না? অন্তিম মূল্য পেতে চাই আশায় জানি। তবুও। এতো আশা? কোথায় থাকে এতো আশা?
আমরা ভাবতে ভালোবাসি আমরা অতীতের থেকে এগিয়ে, এদিকে ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হয়ে চলে, "ফার্স্ট অ্যাজ় আ ট্র্যাজেডি, সেকেণ্ড অ্যাজ় আ ফার্স"।
যাই হোক, এই আমার আজকের ঘোর "অরাজনৈতিক" বক্তব্য। আমি সাহিত্যের ছাত্র নই। আমার জীবনে কলেজ স্ট্রিটের শ্লোগানের আওয়াজের ব্যাকড্রপে প্রবাদপ্রতিম জ্যোতি ভট্টাচার্য ছিলেন না কোথাও। আমি একান্তই অদীক্ষিত, অশিক্ষিত। শুধু সাহিত্য কেন বলি, নাটক যে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে, আমি তার অন্য পিঠে। এখন আর চেষ্টা করলেও পারবো না।
তবে, ছোটোবেলায় কোনো এক সময় এই এক-একটি নাটকের টেক্সট নিজে নিজে পড়তাম পায়চারি করে, তখন ভাবতাম, এতো ডেস্পেয়ার, এতো বিষাদ, এতো নিকষ অন্ধকার - এ কী করে ফুটিয়ে তোলে মানুষ?
এখন সেই অন্ধকারেই অভ্যস্ত আমরা, শুধু দেখি, আর ভাবি না, এই।