এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  দর্শন

  • পশ্চিমা দর্শনের গপ্পোগাছা — প্লেটোর মতামতের উৎসসন্ধানে

    প্যালারাম লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | দর্শন | ২৯ মে ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • Scuola di Atene, The School of Athens - Raphael, সূত্র


    তিন দার্শনিক

    প্লেটোর মতামতের উৎসসন্ধানে

    আগের পর্ব: স্পার্টার প্রভাব


    প্রাচীন, মধ্যযুগীয় বা আধুনিক – যে কোনো সময়ের দার্শনিকদের মধ্যে প্লেটো আর আরিস্তোতলই সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী; আর এই দু-জনের মধ্যে পরবর্তী যুগগুলিকে তুলনায় বেশি প্রভাবিত করেছেন প্লেটো। এ কথা বলার দুটো কারণ আছে: প্রথম, আরিস্তোতল নিজেই আসলে প্লেটোর ফলাফল; দ্বিতীয়, অন্ততপক্ষে ত্রয়োদশ শতক অবধি খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন, আরিস্তোতলপন্থী কম, বরং অনেক বেশি প্লেটোনিক ছিল। অতএব, দার্শনিক চিন্তার ইতিহাস লিখতে হলে প্লেটোকে বা আরেকটু কম হলেও আরিস্তোতলকে নিয়ে, তাঁদের পূর্ব উত্তরসূরীদের থেকে অনেক বিস্তারে আলোচনা করা দরকার। প্লেটোর দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি হল:

    এক, তাঁর ইউটোপিয়া (Utopia) – এক লম্বা সিরিজ়ের প্রথম রচনা; দুই, তাঁর ‘ধারণার তত্ত্ব’ (theory of ideas) – আজও সমাধান না হওয়া ‘সার্বিক ধর্ম’ (Universals)-এর সমস্যা সমাধানের এক অগ্রণী প্রচেষ্টা [১]; তিন, অমরত্বের সপক্ষে তাঁর যুক্তিসমূহ; চার, তাঁর সৃষ্টিতত্ত্ব; পাঁচ, জ্ঞানের স্বরূপকে ‘উপলব্ধি’র বদলে ‘স্মৃতিচারণ’ বলে বিচার করা। তবে এসব নিয়ে বসার আগে, তাঁর জীবনের পরিপ্রেক্ষিত আর যা যা তাঁর দার্শনিক ও রাজনৈতিক মতামতকে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে কিছু কথা বলবো।

    ৪২৮-৪২৭ খ্রিস্টপূর্বে, পেলোপন্নেশীয় যুদ্ধের প্রথম বছরগুলিতে প্লেটোর জন্ম। এক সচ্ছল অভিজাত হিসেবে এমন অনেকের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ ছিল – যাঁরা তিরিশ স্বৈরাচারীর রাজত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এথেন্সের পরাজয়ের সময় তিনি ছিলেন নিজের সামাজিক অবস্থান আর পারিবারিক যোগাযোগের কারণে গণতন্ত্রের প্রতি বিরূপ এক যুবাপুরুষ, তাই হয়তো এথেন্সের পরাজয়ের কারণ হিসেবে গণতন্ত্রকেই তিনি দায়ী করতে পেরেছিলেন। তিনি সোক্রাতিসের ছাত্র ছিলেন – সোক্রাতিসের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছিল; আর সোক্রাতিসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল গণতন্ত্র। তাই, নিজের আদর্শ সাধারণতন্ত্রের রেখচিত্র হিসেবে তিনি যে স্পার্টাকে বেছে নিয়েছিলেন – এ খুব আশ্চর্যের নয়। নিজের (সংকীর্ণ না হলেও) অনুদার প্রস্তাবগুলোকে এমন মোড়ক দেওয়ার শৈল্পিক দক্ষতা তাঁর ছিল, যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মদের চোখে ধুলো দেওয়া যায়, যাতে তারা ‘প্রজাতন্ত্র’ (Πολιτεία, পলাইটিয়া, ইংরেজি: The Republic)—বইটির প্রস্তাবে আদতে ঠিক কী আছে না জেনেই—বইটিকে শ্রদ্ধা করতে পারে। প্লেটোকে বুঝি, না বুঝি, তাঁর প্রশংসা করতে হবে – এই-ই মোদ্দা কথা ছিল সর্বদা। মহান মানুষদের এইটেই ভবিতব্য, ঠিকই, কিন্তু আমার লক্ষ্য উলটো। আমি তাঁকে অবশ্যই বুঝতে চাই, কিন্তু আমার সমসাময়িক কোনো ইংরেজ বা মার্কিন সর্বগ্রাসীবাদ/একচ্ছত্রবাদের (totalitarianism) সমর্থকের জন্যে যতটুকু সম্ভ্রম বরাদ্দ রাখবো, প্লেটোর জন্যেও থাকবে মাত্র ততটুকুই।



    প্লেটোর রিপাবলিকের বর্ণনায় যেমন আছে - সোক্রাতিস ও তাঁর বন্ধুরা প্রজাতন্ত্রে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করছেন। লা ফার্জ-এর আঁকা, সূত্র: উইকিমিডিয়া


    স্পার্টা প্লেটোকে প্রভাবিত করতোই; তাঁর ওপর যেসব দার্শনিকের প্রভাব ছিল, তাঁরাই সে রাস্তা প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। একটু মোটাদাগে ভাবলে, এঁরা ছিলেন: পিথাগোরাস, পার্মেনিদিস, হেরাক্লিতোস আর সোক্রাতিস।

    সোক্রাতিসের মাধ্যমে হোক বা না হোক, পিথাগোরাসের দর্শন থেকেই প্লেটো তাঁর দর্শনের অর্ফীয় অংশগুলি নির্মাণ করেছিলেন: ধর্মতত্ত্ব-ঘেঁষা হওয়া, অমরত্বে বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক বাণীর মতো শোনায় এমন কথার সুর – ‘গুহা’র উপমায় ব্যবহৃত সমস্ত কিছুই এই চিহ্ন ধারণ করে; এমনকি তাঁর গণিতের প্রতি সম্মান আর বুদ্ধি এবং অতীন্দ্রিয়বাদকে ক্রমাগত মিলিয়ে ফেলাও।

    পার্থিব জগত যে অনাদি-অনন্ত আর সময়ের আওতার বাইরে, আর যুক্তির বিচারে সমস্ত পরিবর্তনই আসলে মায়া – এ ধারণা তাঁর এসেছিল পার্মেনিদিসের থেকে।

    ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের কিছুই স্থায়ী নয় – এই নেতিবাচক মতবাদ তিনি ধার করেছিলেন হেরাক্লিতোসের থেকে। পার্মেনিদিসের মতামতের সঙ্গে মেলালে, এই দুইয়ের সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়, যে, ইন্দ্রিয়গুলি ব্যবহার করে জ্ঞানলাভ অসম্ভব, জ্ঞানের একমাত্র উৎস হল বুদ্ধি। এ ধারণা আবার পিথাগোরীয় চিন্তার সঙ্গেও খাপ খায়।

    সোক্রাতিসের থেকে সম্ভবত তিনি শিখেছিলেন নৈতিকতার সমস্যাগুলো নিয়ে কীভাবে কাটাছেঁড়া করা যায়; জগতের অধিযান্ত্রিক (mechanistic) ব্যাখ্যার তুলনায় পরমকারণমূলক (teleological) ব্যাখ্যার প্রতি তাঁর ঝোঁকের মূলও সম্ভবত সোক্রাতিস। সোক্রাতিস-পূর্ব দার্শনিকদের তুলনায়, ‘যাহা কিছু শুভ’ – তার চিন্তা প্লেটোর মননের অনেক বেশি জায়গা জুড়ে থাকতো, আর এই ব্যাপারটার জন্যে সোক্রাতিসকে দায়ী না করে থাকা যায় না।

    এ সবের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্রের সম্পর্কটা কোথায়?

    প্রথমত: যেহেতু ‘শুভ’ আর ‘পার্থিব’ – এ দুটি ধারণা সময়ের শাসন মানে না, তাই সেইটিই সেরা রাষ্ট্র, যেখানে খুঁত আর পরিবর্তন, দুইই সবচেয়ে কম – অর্থাৎ, স্বর্গের যতটা সম্ভব নিখুঁত অনুকরণ; সেই রাষ্ট্রের শাসকও তাঁদেরই হওয়ার কথা, যাঁরা চিরাচরিত ‘শুভ’-র ধারণাটা সবচেয়ে ভালো বোঝেন।

    দ্বিতীয়ত: অন্য যে কোনো অতীন্দ্রিয়বাদীর মতোই, প্লেটোর ধারণার মূলে এক অনড়, স্থিরবিশ্বাস আছে – যা একরকমের জীবনযাপনের অনুশীলন ছাড়া বোঝানো বা প্রকাশ করা মুশকিল। পিথাগোরীয়রা চেয়েছিলেন ব্রহ্মচারী/নাড়া-বাঁধা শিক্ষানবিশ (initiate)-দের রাজত্ব স্থাপন করতে, আর প্লেটো-ও, তলিয়ে দেখলে, তাই-ই চান [২]। ভালো শাসক হতে চাইলে ‘শুভ/মঙ্গল’-এর চরিত্র সম্পর্কে জানা দরকার; তা করতে হলে চাই বৌদ্ধিক ও নৈতিক শৃঙ্খলার অভ্যেস। এই শৃঙ্খলায় অনভ্যস্তদের সরকারে ভাগ বসাতে দিলে দুর্নীতি অনিবার্য।

    তৃতীয়ত: প্লেটোর শর্তানুযায়ী ভালো শাসক হতে হলে অনেকটা শিক্ষালাভের প্রয়োজন। স্যুরাকুশাই (সিসিলি-র Syracuse, বর্তমান উচ্চারণ: সিরাকিউজ়)-এর স্বৈরাচারী বালক দিওন্যুসিওস-কে ভালো রাজা বানানোর উদ্দেশ্যে জ্যামিতি শেখানোর উদ্যোগ – আমাদের চোখে বোকার মতো দেখালেও, প্লেটোর চোখে কিন্তু অবশ্য-প্রয়োজনীয় ছিল [৩]। গণিত না জানলে যে ‘সহি’ জ্ঞানলাভ অসম্ভব – এমন ভাবতে হলে যতটা পিথাগোরীয় হতে হয়, প্লেটো তা ছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি কুলীনতন্ত্রকেই নির্দেশ করে।



    দ্বিতীয় দিওন্যুসিওসের সঙ্গে প্লেটো-র পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন দিওন। সূত্র: উইকিমিডিয়া


    চতুর্থত: অধিকাংশ গ্রিক দার্শনিকের মতোই প্লেটোও মনে করতেন জ্ঞানলাভের জন্যে অবসরের কোনো বিকল্প নেই, তাই পেটের জন্যে যাদের কাজ করতে হয়, তাদের নয় – জ্ঞানার্জনের চেষ্টা তাদেরই মানায়, যাদের নিজস্ব সম্পত্তি আছে, বা রাষ্ট্র যাদের ক্ষুন্নিবৃত্তির দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি নেহাতই আভিজাত্যের।

    আধুনিক চিন্তার নিরিখে প্লেটোকে মাপতে গেলে দুটি সাধারণ প্রশ্ন উঠে আসে। প্রথমটি হল, ‘জ্ঞান’ বলে কি সত্যিই কিছু আছে? দ্বিতীয়টি: তেমন কিছু যদি থেকেও থাকে, এমন কোনো সংবিধান কি বানানো সম্ভব, যা সেটিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিতে পারে? যে অর্থে ধরা হয়েছে, তাতে ‘জ্ঞান’ মানে কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা নয় – যেমন থাকে মুচি, চিকিৎসক বা রণকৌশলীর। ‘জ্ঞান’কে এ সবের তুলনায় সাধারণ (general) কিছু হতে হবে, কারণ ধরে নেওয়া হচ্ছে, যে, এই বস্তুটি থাকলেই কোনো একজন বিচক্ষণ শাসক হতে পারেন। আমার মনে হয়, প্লেটো থাকলে বলতেন – ‘শুভ’ কী, তা জানাই ‘জ্ঞান’ আর এই সংজ্ঞার সঙ্গে লেজুড় হিসেবে সোক্রাতিসের বক্তব্য জুড়ে দিতেন: কোনো মানুষই জেনে পাপ করে না, অতএব যে ‘মঙ্গল’-এর স্বরূপ বোঝে, সে ঠিক কাজই করবে। আরও সহজভাবে আমাদের বলা উচিত: (সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়) নানারকমের ভিন্ন স্বার্থ জড়িয়ে থাকলে, একজন প্রশাসক তার মধ্যে থেকে শ্রেয় আপোশের রাস্তাই বেছে নেন। এক বিশেষ শ্রেণী বা দেশের সদস্যদের যৌথ স্বার্থ থাকতেও পারে, কিন্তু তার সঙ্গে সাধারণত অন্য শ্রেণী বা দেশের স্বার্থের বিরোধ থাকে। গোটা মানবসমাজের কিছু যৌথ স্বার্থ নিঃসন্দেহে আছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্যে তা যথেষ্ট নয়। হয়তো ভবিষ্যতে কোনো একদিন তেমন হবে, তবে যদ্দিন অনেকগুলি সার্বভৌম দেশ টিকে থাকবে, তদ্দিন নিশ্চিত নয়। এমনকি তখনও, যুযুধান ক্ষুদ্র স্বার্থগুলির মধ্যে আপোশে পৌঁছনোই মিলিত কোনো উদ্দেশ্যসাধনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তবে, যদি ধরেও নিই – ‘জ্ঞান’ বলে কিছু একটা আছে, এমন সংবিধান কি রচনা করা সম্ভব, যা নিশ্চিত করবে যে শুধু জ্ঞানীরাই সরকার চালাবেন? এটুকু তো পরিষ্কার – সাধারণ পরিষদের মতো সংখ্যাগুরু-নিয়ন্ত্রিত দল ভুল করতে পারে, করেওছে। অভিজাতরা সর্বদা জ্ঞানী নন, রাজারা প্রায় নিয়মিতই নেহাত নির্বোধ; পোপ নাকি ভুল করেন না, অথচ ভয়ানক সব ভ্রান্তির কারণ হয়েছেন। কেউ কি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনো ছাত্রদের বা ধর্মের পণ্ডিতদের হাতে সরকার ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করবেন? বা তাদের হাতে, যারা দরিদ্র হয়ে জন্মেও পরে প্রচুর বিত্ত অর্জন করেছেন? এটুকু পরিষ্কার – গোটা জনসমষ্টির তুলনায়, আইনী সংজ্ঞাবদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট বাছাই করা জনগোষ্ঠীর বেশি ‘জ্ঞানী’ হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই।

    এমন হয়তো বলা যায়, যে, চেষ্টা করলে মানুষকে সঠিক রাজনৈতিক জ্ঞানের শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। তখন আবার প্রশ্ন উঠবে, সঠিক শিক্ষাটিই বা কী? এ প্রশ্নে আবার দলাদলির সুযোগ রয়েছে। একদল ‘জ্ঞানী’ জোগাড় করে তাদের হাতে সরকার ছেড়ে দেওয়ার এই সমস্যাটির অতএব কোনো সমাধান নেই। ‘গণতন্ত্রের’ সপক্ষে এইটিই চূড়ান্ত সওয়াল।


    পরের পর্ব: প্লেটোর মতামতের উৎসসন্ধানে


    বার্ট্রান্ড রাসেল
    A History of Western Philosophy বইটির প্যালারাম-কৃত অনুবাদ



    টীকা-টিপ্পনীর ব্র্যাকেটের মধ্যে অক্ষর থাকলে তা রাসেলের আসল ফুটনোট, সংখ্যা থাকলে তা অনুবাদকের পাকামো। ফুটনোট কণ্টকিত লেখাটির জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী, তবে ছবি-ছাবা দিয়ে সেই দোষ স্খালনের একটা চেষ্টা করা হয়েছে।


     

    [১] ‘Problem of Universals’ বা সার্বিক ধর্মের সমস্যা আসলে অধিবিদ্যার অংশ। সহজ ভাষায়: জ্ঞানার্জন করতে হলে তা নিয়ে ভাবতে হয়, কথা বলতে/লিখতে হয়, আর সে সব করতে গিয়ে আমরা মাঝেমধ্যেই নানা ধারণা নিয়ে কথা বলি, যেমন, একটা রঙ হয়, তার নাম ‘লাল’, একরকমের সংখ্যা আছে, যাদের মৌলিক সংখ্যা বলে বা এক রকমের প্রাণী হয়, তার নাম কুকুর। আপনার পোষা কুকুরটিকে দেখিয়ে তার বিশেষ কিছু ধর্ম (একটা দাঁত নেই) নিয়ে আলোচনা করার পরেও, কিছু সার্বিক ধর্মও আমরা আরোপ করি। দার্শনিকদের সমস্যা হল, বস্তুটি বর্তমান, আবার নশ্বরও বটে; কিন্তু তাকে ছাপিয়ে তার যে সার্বিক ধর্ম নিয়ে আমরা আলোচনা করি, উল্লেখ করি, বস্তুর বাইরে তা কী করে থাকতে পারে? পার্থিব জগতের বাইরে কি তবে কোনো ধারণার জগত আছে? নাকি এ কেবলই ভাষার কারুকার্য? নাকি, সেই জগতও আসলে পার্থিব জগতেরই অংশ? প্লেটো তাঁর eidos-এর প্রস্তাবনার মাধ্যমে বলেছিলেন, তেমন জগত আছে, আর তা পার্থিব জগত থেকে একেবারে আলাদা। আমরা যে ইউনিভার্সালদের নিয়ে ভাবতে বা কথা বলতে পারি, তা নিয়ে দার্শনিকরা একমত হলেও, তাদের ‘অস্তিত্ব’ নিয়ে দার্শনিকদের দলাদলি আছে। সমস্যা আছে প্রশ্নটিকে ঠিকভাবে করা নিয়েও।

    [২] বর্তমান ইতালির ক্রোতন শহরের বিখ্যাত পিথাগোরীয় ইশকুলে নতুন শিক্ষানবিশদের বলা হত অকুজ়মাতিকোয় (akousmatikoi), বা ‘শ্রোতা’। এদের কথা বলা/প্রশ্ন করা বারণ ছিল, শুধু পর্দার আড়াল থেকে পিথাগোরাসের কথা শোনা-র অধিকার ছিল। এমন অবস্থায় থাকতে হত পাঁচ বছর। লক্ষ্য, যাতে প্রগলভতা, অপ্রয়োজনীয় উচ্ছ্বলতা আর অহং কমে, কিছু বোঝার আগেই তা নিয়ে কোঁদল করার বদলে ভাবার অভ্যেস তৈরি হয়। তবে আরও ভিতরের কারণ ছিল – ওটি বেশ শক্তপোক্ত একটি কাল্ট। ওখানে আলোচিত গভীর গোপন কথা যাতে অদীক্ষিত জনতার গোচরে না যায়, এ তারই প্রথম বাঁধ।

    [৩] সিরাকিউজ়-এ প্লেটো-কে নেমন্তন্ন করে নিয়ে যায় তাঁর ছাত্র ও বন্ধুস্থানীয় দিওন, যিনি আবার সদ্য সিংহাসনে বসা, বছর তিরিশের যুবক দিওন্যুসিওস (দ্বিতীয়)-র মামা। উদ্দেশ্য, ছোকরাকে যদি প্লেটো-র ‘দার্শনিক রাজা’-য় পরিণত করা যায়। এর আগেও প্লেটো সিরাকিউজ়ে গেছেন, তখন তার স্বৈরাচারী রাজা ছিলেন প্রথম দিওন্যুসিওস (প্রাচীন পৃথিবীর রাজাদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে সন্দেহপ্রবণ, নিষ্ঠুর আর প্রতিহিংসাপরায়ণ)। বিলাসব্যসনে মত্ত আর সন্দেহে ডুবে থাকা সেই সভা থেকে প্লেটো অবশেষে নির্বাসিত হন। এই দ্বিতীয়বারে প্লেটো-র প্ল্যান – ছাত্রকে জ্যামিতি শেখানো। শৃঙ্কলাবদ্ধ চিন্তা করতে শিখলে নাকি ভালো রাজা হওয়া যাবে। রাজা তো তাতে বিশেষ পাত্তা দেননি বটেই, সন্দেহের বশে দিওন ওদিকে নির্বাসিত হন। প্লেটো এথেন্সে ফেরেন। প্লেটো-র প্রিয়পাত্র হওয়ার অভিলাষে তরুণ দিওন্যুসিওস আবার তাঁকে অনেক প্রতিশ্রুতি-টুতি দিয়ে ফেরত নিয়ে যান, কিন্তু এবারে প্রথম থেকেই প্লেটোর আশাভঙ্গ হয়। তাঁকে প্রাসাদে প্রায় নজরবন্দি করে রাখা হয়। শেষমেশ আরেক পিথাগোরীয়ের সাহায্যে তিনি প্রাণ নিয়ে পালান। প্রসঙ্গত, এর পরে দিওন লোকলস্কর বাগিয়ে সিরাকিউজ় জয় করে বছর তিনেক রাজত্ব করেছিলেন, তারপর আততায়ীর হাতে প্রাণটি খোয়ান।
     

    পরের পর্ব: প্লেটোর ইউটোপিয়া
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ২৯ মে ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন