অত: কুক্কুট ডিম্ব সংবাদ।
দিন কয়েক হলো বাজারে ডিমের দাম ভয়ানক বেড়ে গেছে। অবশ্য কেবল ডিমের ওপরে উষ্মা প্রকাশ করা কেন? বাজারে সবকিছুই এখন অগ্নিমূল্য। ডিমের দাম এমন উর্দ্ধমুখী কেন? - একথা পাড়ার দোকানী শঙ্করকে জিজ্ঞেস করতেই, সে আমার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে একগাল হেসে জবাব দিলো – কেন, মাস্টারমশাই আপনি জানেন না? এখন তো বাতিল ন্যাতাদের,পাবলিক ডিম ছুঁড়েই বরণ করছে। আমিও কিছু বাড়তি মাল এজন্য তুলে রেখেছি। বলা যায়না,কখন তেমন কাস্টমার এসে হাজির হয়!” মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বলি – ভগবান, এই সংস্কৃতি যত দ্রুত বাতিল হয় তত মঙ্গল।
ডিম নিয়ে এমন বিস্মৃতির আড়ালে লুকিয়ে পড়া এক সুখস্মৃতির কথা বরং বলি। সেই কবেকার কথা! যে সময়ের কথা বলবো বলে বসেছি সেই সময় পেরিয়ে গেছে কত কত বছরের পার। আমরা তখন নাবালক। বাড়িতে ডিম এলেও একালের মতো ডজন ডজন মুরগির ডিম আসার চল ছিলোনা। তাই বাজার থেকে হাঁসের ডিম আনা হতো প্রয়োজন মতো। এখানেই কিন্তু গপ্পো শেষ নয়। এরপরেই তা শুরু হবে। মা ডিম সেদ্ধ করে হয়তো বলেছেন – “এগুলোর খোসা ছাড়িয়ে রাখ।” যেমন বলা তেমনই কাজ শুরু। মেঝেতে ডিমগুলোকে একটু ঠুকে নিয়ে কচি কচি আঙ্গুল দিয়ে তার খোসা ছাড়িয়ে নেবার কাজে লেগে পড়ি ঝটপট। আমাকে ওভাবে এনগেজড হতে দেখে আমার সব্ববিদ্যা পটিয়সী ভগিনীও গুটিগুটি পায়ে অকুস্থলে এসে হাজির। ডিমের পাত্রে একবার নজর বুলিয়েই তাঁর প্রশ্ন – “হ্যাঁরে দাদা! আমরা খাইয়ে হলাম পাঁচ জন, অথচ মা ডিম সেদ্ধ করেছে মাত্র তিনটে! কেনরে ? বাড়িতে আর ডিম নেই?” এতক্ষণে তাঁর গোবদ্ধন দাদার হুঁশ হয়েছে। “ সত্যিই তো খাইয়ে হলাম আমরা পাঁচ জন, অথচ মাত্র তিনটি ডিম সেদ্ধ করেছে মা! কেন?” অংকে আমি বরাবরই কাঁচা রয়ে গেলাম।
ডিমের খোসা ছাড়ানো হয়ে গেছে। এবার মা কে খবর দেওয়া। হাতের টুকটাক কাজ সেরে মা এলেন রান্নাঘরে। পিঁড়িতে বেশ জুৎ করে বসে হাত বাড়ালেন মিটশেফের দিকে।
সেখানে পেরেকের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখা একটা ফিনফিনে সুতো। সেই সুতোর একটা দিক পায়ের আঙুলে পেঁচিয়ে নিয়ে, অন্য মাথাটা বাঁ হাতের আঙ্গুলের সঙ্গে জড়িয়ে বেশ টানটান করে নিলেন - যেন এক ইমপ্রোভাইজড করাত।এবারে ডানহাতে একটা করে ডিম তুলে নিয়ে সেই সুতো করাতের ওপর আলতো করে চেপে ধরতেই ডিমগুলো ডিডিং ফাঁক - দু টুকরো। এই দৃশ্য দেখে আমরা যুগপৎ বিস্মিত ও মর্মাহত।
একালের -সানডে ইয়া মানডে / রোজ খাও আনডে বিজ্ঞাপন মুখরিত সময়ে, সেইসব অন্তরঙ্গ যাপনের মুহুর্তগুলোকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, খোঁজ করেও লাভ নেই। আধখানা ডিমের কাহিনি আমরা নাবালক কায়া ছেড়ে সাবালক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের ধূসর মলাটের নিচে সেই কবে চাপা পড়ে গেছে! সেই সময়টা ছিল ভাগ করে নেবার সময়।এখন সময় কেড়ে নেবার। ভাগ করে খাবার মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক সহ যাপন,সম যাপনের শিক্ষা। সেই শিক্ষার মর্মবাণী আজও হৃদয়ে বয়ে নিয়ে চলেছি সঙ্গোপনে। কার পাতের ডিম ছোট আর কারবা পাতে বড়ো ডিম পড়েছে তাই নিয়ে আর মন কষাকষি হয়না। মা যেদিন খাবার থালায় একটা গোটা ডিম তুলে দিলেন সেদিন বুঝেছিলাম আমরা সাবালক হয়ে উঠলাম। আধখানা ডিমকে নিয়ে মনে যে টানাপোড়েন চলতো তার অবসান ঘটলো।
তবে তা বলে বিবাদ বিসম্বাদ নেই,সব উবে গিয়েছে তেমনও যে নয়। এই তো ডিম কিনতে গিয়ে দোকানে যেতেই দেখা হয়ে যায় নির্মল দার সঙ্গে। নির্মল দা আমার প্রতিবেশী, একটু গোলগাল চেহারা, নির্বিরোধী মানুষ। দোকানে যেতেই দেখি তাঁর সঙ্গে দোকানী শঙ্করের বেশ চড়া সুরে বাগবিতণ্ডা চলছে। নির্মল দা সুর চড়িয়ে শঙ্করকে প্রায় শাসাচ্ছেন যেন – “এতো চড়া দামে ডিম বিক্রি করছো, অথচ তাদের সাইজ দেখেছো? আমি তোমাকে মুরগির ডিম দিতে বলেছিলাম, আর তুমি আমাকে টিকটিকির ডিম ধরিয়ে দিয়েছো! কি তাদের সাইজ! আজ যেন বড়ো বড়ো ডিম হয়। নাহলে….! “--আমাকে দেখে নির্মল দা ওই তুঙ্গ অবস্থা থেকে যেন একটু ব্রেক কষে থমকে গেলেন – “আরে মাস্টারমশাই! আপনিই এর বিচার করে দিন তো! এই ছোট্ট ছোট্ট টিকটিকির ডিমের মতো ডিম! সে কথা বলতেই বলে – এই গরমে ডিম সাইজে ছোটই হবে। এটা কোনো যুক্তির কথা হলো। আপনি এর একটা বিহিত করে দিন।” ক্রেতা হিসেবে দোকানে এসে, শেষে বিচারক হতে হবে বলে তো কখনও মনে হয় নি। যাইহোক ভার যখন পেয়েছি, তখন আর পিছিয়ে যাওয়া চলেনা। আমি দুপক্ষের মধ্যে একটা মান্য যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করি।
“গরমকালে ডিম সাইজে একটু ছোট হয়ে যায় – একথা আমরা সবাই সেই কবে থেকে শুনে আসছি। তবে এ জন্য যদি হাঁস মুরগির ডিম ছোট হয়ে টিকটিকির ডিম হয়ে যায়, তাহলে সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। আমরা সবাই জানি যে এই মুহূর্তে পৃথিবী উষ্ণায়নের কবলে ত্রস্ত হয়ে আছে। এই পরিবর্তনের ফলে হাঁস - মুরগির ডিম আকারেই যে শুধু ছোট হয়ে গেছে তা নয়, ডিমের খোলগুলোও বেশ নরম, দুর্বল হয়ে পড়েছে।” আমার এই কথা মনপসন্দ না হওয়ায় নির্মল দা আমার দিকে কটমট করে তাকাতেই আমি আমার কথা আবার চালু করে দিই।
“ পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষদের মতে ডিম পাড়া মুরগিরা ১৯ -২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবথেকে বড়োসড়ো মাপের ডিম পাড়ে। তাপমাত্রা এর থেকে যত বাড়তে থাকে তত ডিমের সাইজ কমতে থাকে। আসলে গরম বেড়ে যাওয়ায় পাখিরা এক ধরনের স্ট্রেস বা মনোদৈহিক চাপ অনুভব করে। ঠিক আমাদের মতো। এরফলে তাদের স্বাভাবিক ফিজিওলজিক্যাল কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং ডিম পাড়ার সামর্থ্য কমে আসে।” – এই ব্যাখ্যা নির্মল দা আর শঙ্কর দুজনেরই বেশ পছন্দ হয়। বেশ বুঝদারের মতো দুজনেই পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়। আমার সালিশি ঠিক পথেই চলছে দেখে আমি বাকি কথা বলে ফেলার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠি।
“আসলে মুরগিরা আমাদের মতো ঘাম ঝরাতে পারেনা। পারলে সহজেই নিজেদের শরীরকে ঠাণ্ডা করে নিতে পারতো, তাহলেই স্ট্রেস দিব্যি কমে যেত। সেক্ষেত্রে ওরা কী করে? খানিকটা সময় ধরে দৌড়াদৌড়ি করলে আমরা যেমন হাঁপিয়ে গিয়ে ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে থাকি এই খামারে থাকা লেয়ার মুরগিরা ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করে। তবে যখন টানা গরমের দাপট চলে, যেমন এখন চলছে,এই কায়দাটা তেমন কাজে আসে না। এই কারণে মুরগিদের স্বাস্থ্য খারাপ হয় এবং খুব ভালো মানের ডিম উৎপাদনে ভাটা পড়ে।”
অনেক গুরুগম্ভীর কথা বলে বেশ হাঁপিয়ে উঠি। দুই বুড়ো আর এক আধ বুড়োর আলাপচারিতা শুনতে আমাদের ঘিরে একটা ছোটোখাটো ভিড় জমে উঠেছে। সকলের মনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – “কি এমন হলো যে সাতসকালেই এমন তিন্নাথের আসর বসাতে হলো?” শঙ্করের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তার গিন্নি অন্নপূর্ণা এসে দোকানের হাল সামলাতে শুরু করেছে। সে তো জানে কেবল কথায় চিড়ে ভিজবে না। কারবারটাও যে ঠিকঠাক সামলাতে হবে।
আজ আর সামান্য কয়েকটা কথা বলে এই তত্ত্বকথায় ইতি টানবো। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে অতিরিক্ত গরমের সময় মুরগিদের মানসিক সহন মাত্রায় পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে ডিমের আকার, ডিমের ওজন, ভিমের খোসার কাঠিন্য সবার ওপরে ডিমের উৎপাদন বেশ কমে যায়। এর একটা বড় কারণ হলো গরম বাড়ার সঙ্গে তালমিলিয়ে মুরগির শরীরে ক্যালসিয়াম মেটাবোলিজম কমে যাওয়া।
ডিমের খোসা তৈরি হয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়ে যা ডিম তৈরির সময় প্রায় ২০ ঘন্টা ধরে জমা হয়।গরম খুব বেশি হলে মুরগিরা বাধ্য হয় খুব দ্রুত শ্বাস নিতে।এর ফলে শরীরে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। মুরগির শরীরের এই বিশেষ অবস্থাকে বলা হয় respiratory alkalosis বা শ্বাসযন্ত্রের এ্যালকালোসিস যা শরীরের রক্তের রাসায়নিক গঠনের পরিবর্তন আনে। রক্তের pH ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে।এই কারণেই ক্যালসিয়ামের জোগানে টান পড়ায় ডিমের খোসা খুব শক্তপোক্ত হতে পারে না। খোসা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা পাতলা হয় এবং সামান্য নাড়াচাড়াতেই ভেঙে যায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে অতিরিক্ত গরমের দিনে ডিম পাড়ার সময় পিছিয়ে যায়। তাছাড়া ডিমের আকারেও কিছুটা পরিবর্তন ঘটতে পারে।”
আমার কথকতা শেষ হতে না হতেই নির্মল দার পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা হঠাৎ জেগে ওঠে। সুইচটা অন করে কানের কাছে নিতেই ওপার থেকে সুতীব্র বামা কন্ঠ ভেসে আসে – “বলি ভিম আনতে গিয়ে কি ভিরমি খেলে না ডিমে…. দিতে বসেছো? অন্যের দাম্পত্য জীবনের একান্ত কথোপকথনে কান দিতে নেই, তাতে ফিরতি মারের ঝুঁকি আছে। আমি সেসবে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে ডিম আর পাউরুটি নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াই। গিন্নি আজ ব্রেকফাস্টে ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানাবেন।
**
গুরুচন্ডালির শ্রদ্ধেয় লেখক শ্রী রঞ্জন রায়কে এই লেখাটি উৎসর্গ করা হলো। ভালো থাকবেন দাদা।
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
জুন ১৩.২০২৬.
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।