

কালো মেয়ের কাহিনি
"কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। আর কালো মেয়ের নাম ? কালো মেয়ে কালো ছেলের জন্ম দেবে। ভোট দেবেন কালো মেয়েকে?---" মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে গেছে এই কুৎসিত বক্তব্য। সমালোচনার ঝড় উঠেছে স্যোসাল মিডিয়ায়। রাস্তায় বাজারে পাড়ায় ঠেকে ঘরেও কম কথা হয়নি।
কালো মেয়েটির নাম আলোকিতা। এই মুহুর্তে টিভির পর্দায় তাকে দেখা যাচ্ছে। আজকের আগেও দেখা গেছে। তবে তা ছিলো বিশুদ্ধ রাজনৈতিক। আজ আলোকিতা এসেছে, সুতপার আমন্ত্রণে।তার “তারার আলোয়” অনুষ্ঠানে।
প্রথমে সাধারণ কিছু কথা। রাজনীতিও ছিলো। কিন্তু কিছু মানুষ অপেক্ষা করেছিলেন সেই বৈচিত্রের আশায়। অবশেষে সুতপা বিষয়টা তুললেন। জিজ্ঞাসা করলেন,
"কী বলবে?"
টিভির সামনে অনেকেই একটু টানটান হলেন।
আলোকিতা কয়েকবছর পড়াশুনো শেষ করেছেন। চাকরি শুরু করার মত বয়স। কিন্তু রাজনীতিতেই তার প্রথম টান। গায়ের রঙ যথেষ্ট কালচেই। কিন্তু ছিমছাম চেহারাখানি উজ্জ্বল। সাবলীল। আজ পরেছেন লালপাড় কালো শাড়ি। চুল ছাড়া। কপালে লাল টিপ। তার নিচে টিকলো নাক। তার নিচে ঝকঝকে হাসি। জোনাকির আলো দেখে লোকে। জোনাকিকে কি আর দেখা যায়? আলোকিতা বললেন,
"ইংরেজরা আমাদের সবাইকে ব্ল্যাক ইন্ডিয়ান বলত। সেই ব্ল্যাকরাই কিন্তু শেতাঙ্গ দূঃশাসনদের তাড়িয়েছে।"
সুতপা -- অর্থাৎ ব্ল্যাক ম্যাটারস।
আলো -- অবশ্যই। পৃথিবী জুড়ে কালো শব্দটাই বিলীন হবার মুখে।
সুতপা – তোমার ওই নোংরা আক্রমণে সরব হতে ইচ্ছা করে নি ?
আলো -- করেছিল তো। করেও। যখন যখন কালো বলে মেয়ের বিয়ে হয় না। রীতিমতো প্রেম করতে করতে হঠাৎ কালো বলে সম্পর্ক কেটে দেয় একদা রোমান্টিক প্রেমিক। নারী প্রগতির কথা বলা বাবুরা বিয়ের সময় ফরসা চামড়ার মেয়ে খুঁজে বেড়ায়।
সুতপা -- ফরসা রঙের প্রতি দুর্বলতা কেনো মানুষের ?
আলো -- হাজার হাজার বছর ধরে এটা প্রচার করা হয়েছে।
সুতপা -- কোথায়? কীভাবে?
আলো -- বেদে। মনুসংহিতায়।
সুতপা -- সত্যিই ?
আলো -- বেদে তো ছত্রে ছত্রে দেবতার কাছে সুদর্শন বলিষ্ঠ পুত্র সন্তান প্রার্থনা করা হয়েছে। তার জন্য সেরকম সুজাত বংশের সুন্দরী নারী চাই।
সুতপা -- তাহলে মনুসংহিতার কথা কিছু বল।
আলো -- এখানে পরিষ্কার বলা আছে কোন মেয়ের সাথে বিবাহ হবে না। শুধু গায়ের রঙ নয়, আরও অনেক কিছু আছে। কপিল বর্ণ ও পিঙ্গলবর্ণার সাথে বিয়ে হবে না।
কপিল বা পিঙ্গল মানে কালচে তামাটে রঙ। মানে শুধু কালো না, কালোর ধারকাছ দিয়ে গেলেও চলবে না।
সুতপা -- তাহলে কাকে বিয়ে করবে? তা বলা আছে?
আলো -- অবশ্যই। "যে অঙ্গহীন নয়, যার নাম সুখে উচ্চার্য, যে হংসগতি বা গজগামিনী, যার লোম ও কেশ কোমল,দন্ত ক্ষুদ্র, অঙ্গ মৃদু,সেই স্ত্রীলোককে বিবাহ করবে।" মানে ফরসা ও সর্বাঙ্গসুন্দর নারীর কথা বলা হয়েছে। এখন বল এর বাইরে যারা তাদের কি বিয়ে হবে না ?
সুতপা -- কতটা অমানবিকও ভাবো। অসুখ করলে বিয়ে করা যাবে না ! শরীরের কোনো একটা অঙ্গ বাদ গেলে বিয়ে বাদ!
আলো -- আর কালো মেয়ের পেটে যদি কালো সন্তানই হয়,কালো মানুষে যদি দেশ ভরেই যায় তাতেই বা কী? দেশ কি পিছিয়ে যাবে ?
সুতপা – একদল বলছে, “যাবে”। কালোরা অনার্য। তারা আর্যদের থেকে উন্নত হতে পারে না। এটা নাকি একটা বৈজ্ঞানিক সত্য।
আলো – ঠিক উল্টো। এখন এটা প্রমাণিত যে মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৃথক নয়। কালো মেয়ের মগজের ঘিলুতে ধুসর কোষ কম থাকে এরকম কোনো তথ্য তোমার কাছে আছে?আরে, আসলে তো বুদ্ধি যস্য বলম তস্য।
সুতপা -- সে আর কত পার্সেন্ট ?
আলো -- সমান অধিকার দাও। সময় দাও। উৎসাহ দাও। তা না করে তো কুসংস্কার ছড়ানো হচ্ছে।
সুতপা -- কিন্তু কালো মেয়ের পেটে কালো বাচ্চাই তো হবে।
আলো-- কে বলেছে ? সাদা বাচ্চা আখছার হচ্ছে।আর বাবা যদি কালো হয় বাচ্চা কালো হতেই পারে। সে মা যত ফরসাই হোক না কেনো। এমনকি বাবা মা দুজনেই ফরসা হলেও বাচ্চা কালো হতে পারে। কীভাবে জানো? কমপক্ষে তিনটি পূর্বপুরুষের কেউ কালো থাকলে তার জিন থেকে এটা হতে পারে। জিনের ভিতর গঠনগত বৈশিষ্ট্য ধরা থাকে। কিন্তু সবসময় সব বৈশিষ্ট্য প্রকট হয় না। কখনো উজ্জ্বলতা প্রকট হল তো কালো প্রছন্ন রয়ে গেল। কিন্তু যার সন্তানের বেলায় কালো প্রকট হয় সে সন্তান কালো হয়। এই আর কি!
সুতপা -- ওই জেনোটাইপ আর ফেনোটাইপ ?
আলো -- জেনোটাইপ হল ভিতরের জিনের মধ্যে যা আছে। আর ফেনোটাইপ হল বাইরে যা তুমি দেখতে পাচ্ছো। পূর্বপুরুষের এইসব বৈশিষ্ট্যর বাইরেও কিন্তু নতুন কিছু পরিবর্তন আসতে পারে প্রত্যেকের মধ্যেই তার জীনের কিছু মিউটেশন বা কিছু বৈশিষ্ট্য নিজেই বদলাতে থাকে। সব ভাইবোন একরকম হয় দেখতে? সবসময় বাবা-মার মতও হয় না। না রূপে না গুণে। সবটাই বিজ্ঞান। কিন্তু একটা সময় চেষ্টা হয়েছিল, না তাই বা বলি কেনো ! এখনও হচ্ছে।বরং বেশিই হচ্ছে। যারা কালো তাদের ছোটো করতে। আর তা প্রমাণ করতে তারা কালো মানুষের মৃতদেহ থেকে মাথা কেটে মস্তিষ্ক ওজন করেছে। খুলির গঠন দেখেছে। বৃটিশ আমলে এই চেষ্টা ভয়ানক রূপ নেয়।
সুতপা-- বাপরে, কী কাণ্ড! কিন্তু রঙ ফরসা না হলে কি প্রেম আসে ?
আলো-- এটাও তো কুসংস্কার। শুধু রঙেই কি প্রেমের যাদু কাজ করে ? রূপ মানে কি শুধু উজ্জ্বল ত্বক ? চোখ মুখ শরীরের গঠন ? এতো বাহ্যিক। অন্তরের রূপ?
সুতপা-- কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিছু হয়েছে ?
আলো-- কুছ কুছ হোতা হ্যায়।
সুতপা--যেমন ?
আলো--বন্ধুদের প্রকৃত চোখগুলো স্পষ্ট হয়েছে নিজে কালো হওয়ায়। বাতিল হবার আগেই বাতিল করতে পেরেছি।
সুতপা-- বাহ। দারুন ব্যাপার তো। আচ্ছা, যে ভদ্রলোক তোমাকে কালো বলে বদনাম ছড়ালো তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করবে না?
আলো-- মনুষত্বের স্বভাব ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া। দাবি করার আমি কে ?
সুতপা -- বাহ ! মেয়েদের এতবড় অপমান ! তুমি চুপ করে থাকবে ?
আলো -- প্রথমত আমি চুপ করে নেই। তুমি তোমার মত করে আশা করছ তাই সমস্যা হচ্ছে। আর মেয়েদের অপমান। মেয়েদের বুঝতে দাও। ভাড়া করে তো বিপ্লব হবে না।
সুতপা -- তোমার সাথে কথা বলে পারা দায়।আবার দেখা হবে। শুভরাত্রি। ভালো থেকো।
----
তৃতীয় অধ্যায়
শ্লোক : ৯
"কপিল বর্ণ, অধিকাঙ্গবিশিষ্টা, রোগগ্রস্তা,লোমহীনা, অধিকলোমবিশিষ্টা,বাচাল,পিঙ্গলবর্ণা,নক্ষত্র, বৃক্ষ, নদী,পর্বত,পক্ষী,সর্প,দাস-- এইসব নামধারিনী এবং
ভীতিজনক নামযুক্তা কন্যাকে বিবাহ করবে না।"
শ্লোক : ১০
"যে অঙ্গহীন নয়, যার নাম সুখে উচ্চার্য, যে হংসগতি বা গজগামিনী, যার লোম ও কেশ কোমল,দন্ত ক্ষুদ্র, অঙ্গ মৃদু,সেই স্ত্রীলোককে বিবাহ করবে।"
সূত্র : মনুসংহিতা -- সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
-------------------
হীরেন সিংহরায় | ০১ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৫742054