এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ত্রিবিধ ছেদন (নূতন বেতাল কাহিনী)

    Arka Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫৬ বার পঠিত
  • কৃষ্ণা চতুর্দশীর রজনী। কাশীর বহির্ভাগস্থ মহাশ্মশানে চিতাগ্নি নির্বাপিতপ্রায় হইয়া আসিয়াছে। বায়ুমণ্ডলে ঘৃত, অর্দ্ধদগ্ধ অস্থি ও পরিত্যক্ত বাসি চম্পকপুষ্পের গন্ধ একত্র জমাট বাঁধিয়া রহিয়াছে। দূরে নদীতটে শৃগালগণ রব করিতেছে।

    শিংশপাবৃক্ষের শাখা হইতে যে শবটি লম্বমান রহিয়াছে, তাহার মুখ কৃষ্ণসূত্র দ্বারা সীবিত, নয়নদ্বয় উন্মীলিত।

    রাজা বিক্রমাদিত্য পুনর্বার সেই বৃক্ষের অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। ক্ষান্তিশীল নামক এক ক্ষপণকের নিকট তিনি ঋণবদ্ধ হইয়া আছেন। লোকটি দ্বাদশ বৎসর ধরিয়া প্রত্যহ প্রভাতে তাঁহাকে একটি করিয়া শ্রীফল প্রদান করিত, প্রত্যেক শ্রীফলের অভ্যন্তরে একটি করিয়া হীরক লুক্কায়িত থাকিত। সেই ঋণে এক্ষণে এই শব বহন করিতে হইতেছে। আর নিয়ম একটিই, মুখ উন্মোচন করা যাইবে না।

    স্কন্ধে তুলিবামাত্র শবমধ্যস্থ বেতাল শুষ্ক পত্রের ন্যায় খসখস করিয়া হাসিয়া উঠিল।

    “পুনরায় আসিলে, ধর্মধ্বজ রাজন্? উত্তম। তোমার যখন কথা কহা নিষিদ্ধ, তখন আমিই কহি। এক ঋণের কথা শুন, অর্থের ঋণ নহে, শয্যার ঋণ। অন্তে বলিবে, ঋণটি প্রকৃতপক্ষে কাহার?”

    রাজা স্কন্ধ দৃঢ় করিলেন। বেতাল আরম্ভ করিল।

    উজ্জয়িনীতে রোহক নামে এক সদাগরপুত্র বাস করিত। পত্নী বাসবদত্তা।

    রোহক দুর্জন ছিল না। বুদ্ধিমান, মুখে এক বক্র হাস্য লগ্ন হইয়া থাকিত, বাম ওষ্ঠটি কিঞ্চিৎ অধিক উন্নত হইয়া থাকিত। সেই হাস্যের নিমিত্তই বাসবদত্তা তাহাকে পছন্দ করিয়াছিল, পাঠশালায় প্রথম দর্শনে।

    প্রথম এক বৎসর তাহাদের সকলই ত্বরা-প্রধান ছিল। ক্ষুদ্র গৃহ, সুলভ ধূপের গন্ধযুক্ত শয্যা, প্রদীপ নির্বাপিত হইবার পূর্বেই হাস্যে লুটোপুটি। তখন সত্বরতাই প্রেম বলিয়া প্রতীত হইত।

    অনন্তর একদিন, কেহ টেরও পাইল না, সেই ত্বরা নিয়মে পরিণত হইল।

    যাহা শীঘ্র স্খলিত হইয়া পড়িত, তাহা কেবল শুক্র নহে। সময়ও স্খলিত হইয়া পড়িত।

    রোহকের স্খলন হইয়া যাইত, অতি জোর পলার্দ্ধও লাগিত না। বাসবদত্তা বুঝিল, সময় লইয়া তাহার আপত্তি নাই। আপত্তি তাহার পরবর্তী মুহূর্তটি লইয়া।

    রোহক মুখ ফিরাইয়া লইত। কখনও কহিত, “তুমি বড় অধিক...”— কথাটি প্রথম প্রথম প্রশংসা বলিয়া বোধ হইত, পরে বাসবদত্তা বুঝিল, ইহা দোষটি তাহার স্কন্ধে অর্পণ করিবার কৌশল। কখনও কড়িকাঠের দিকে চাহিয়া শুইয়া থাকিত। তাহার স্কন্ধ তখন এমন কঠিন হইয়া থাকিত, যেন যুদ্ধযাত্রা করিবে।

    বাসবদত্তাও একটি কৌশল শিক্ষা করিয়া লইল। রোহক যখন তাহাকে স্পর্শ করিত, তাহার শরীর আদরে নহে, আশঙ্কায় কঠিন হইয়া যাইত। তাহার মন তখন দ্বিধা বিভক্ত হইয়া যাইত। এক অংশ স্পৃষ্ট হইয়া থাকিতে চাহিত, অন্য অংশ উপর হইতে দর্শন করিত— বাতায়ন রুদ্ধ আছে কি না, তৈল নিঃশেষিত হইয়াছে কি না, প্রাঙ্গণের মার্জারশাবকগণ দুগ্ধ পাইয়াছে কি না। উপরিস্থ মনটি অধিক দয়ালু ছিল। তাহাকে একাকী পরিত্যক্ত হইবার ক্লেশ ভোগ করিতে হইত না।

    একদিন পিতৃগৃহে অন্নগ্রহণকালে মাতা যখন জিজ্ঞাসা করিলেন, সন্তানাদি কবে হইবে, বাসবদত্তা আর সহ্য করিতে পারিল না। কহিল, “আমরা একত্র থাকিয়াও যেন পৃথক।”

    রোহক কহিল, “তুমিই ত পৃথক হইয়া থাক।”

    সে কহিল, “আমরা কি কিঞ্চিৎ মন্থরভাবে চেষ্টা করিতে পারি না?”

    রোহক কহিল, “তুমি কি কিঞ্চিৎ অধিকক্ষণ থাকিবার চেষ্টা করিতে পার না?”

    বৈদ্য একটি তালপত্র দিয়াছিল, স্তম্ভনের ঔষধ লিখিত। পত্রটি তাহাদের সিন্দুকের উপর পড়িয়া থাকিয়া ধূলিধূসরিত হইয়া গেল। রোহক কহিল, তাহাতে তাহাকে গো-ছাগের ন্যায় বোধ হয়। বাসবদত্তা কহিল, তাহাতে তাহার লজ্জার হিসাব রাখা হইতেছে বলিয়া বোধ হয়।

    অনন্তর বাসবদত্তা সুখের ভান করিতে আরম্ভ করিল। কন্যাগণ এই বিদ্যা নাট্যশাস্ত্রেরও পূর্ব হইতে জানে। সে শিক্ষা করিয়া লইল কিরূপে একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিলে পুরুষ মনে করে নাটকের অবসান হইয়াছে। তৎপরে শরীর কেমন শূন্য বোধ হইত, যেন সচ্ছিদ্র কলসে জল ভরিয়া রাখিয়া আসিয়াছে।

    একসময় ভানটিও পরিত্যাগ করিল। তাহা আরও মন্দ হইল।

    যে রজনীতে সকল ভাঙিয়া পড়িল, তাহা কোন বৃহৎ রজনী ছিল না। মঙ্গলবার। ব্যঞ্জনে লবণ অধিক হইয়াছিল। তাহারা শয়ন করিতে গেল। রোহকের স্খলন হইয়া গেল। বাসবদত্তা শুইয়া রহিল।

    “তুমি ঠিক আছ ত?” রোহক কহিল।

    বাসবদত্তা কিছুই কহিল না।

    “এইরূপ করিও না।”

    “কিরূপ করিব না?”

    “ইহাকে এত বৃহৎ করিও না।”

    “ইহা ত স্বভাবতই বৃহৎ।”

    “তুমি সকলই ভারী করিয়া তুল।”

    বাসবদত্তা স্নানাগারে গিয়া শীতল প্রস্তরের উপর উপবেশন করিয়া নিঃশব্দে রোদন করিল, যাহাতে রোহক শুনিতে না পায়, যাহাতে পুনর্বার তাহাকে ‘ভারী’ না বলে।

    চারি মাস পরে তাহারা গৌতমীর নিকটে গেল।

    গৌতমী কেবল বৈদ্যা নহেন, একদা গৃহ করিয়াছিলেন, এক্ষণে পরিত্যাগ করিয়াছেন। অর্থের পরিবর্তে বিবাদ মীমাংসা করিয়া দেন। তাঁহার গৃহ গন্ধদ্রব্যের বিপণির উপরে। নিম্নে মুষলধ্বনি, উপরে জটামাংসীর গন্ধ। মেঝেতে গোময়লিপ্ত, এক অনুচ্চ তক্তপোশ, তাহার উপরে তাম্রঘট ও এক পিণ্ড অপ্রক্ষালিত কার্পাস। পার্শ্বে এক ক্ষুদ্র গণেশ, তাঁহার শুণ্ডটি ভগ্ন।

    গৌতমী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমাদের কী হইয়াছে?”

    বাসবদত্তা বহুবিধ শব্দ মুখস্থ করিয়া গিয়াছিল— শাস্ত্রীয় শব্দ, বৈদ্যকীয় শব্দ। মুখে আসিল না। অবশেষে বলিয়াই ফেলিল, “আমার স্বামী শীঘ্রস্খলন রোগে ভুগিতেছেন।”

    কথাটি তক্তপোশের উপর সশব্দে পতিত হইল।

    গৌতমী রোহকের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন, “সত্য?”

    রোহক সেই বক্র হাস্যটি হাসিল। বাসবদত্তার দিকে চাহিয়া কহিল, “ঠিক তাহা নহে। যে ভোগ করে, সে আমি নহি, ও-ই।”

    নিম্নে মুষল থামিয়া গিয়াছে। গৃহে কোন শব্দ নাই।

    গৌতমীর নাসিকা হইতে সহসা এক ক্ষুদ্র হাস্য নির্গত হইল, তিনি কাসি দ্বারা তাহা আচ্ছাদন করিলেন।

    বাসবদত্তার গণ্ডে যেন চপেটাঘাত পড়িল। তাহার বোধ হইল, ঠিকই ত, ইহা ত হাস্যেরই বিষয়। অন্যে ত ইহাকে হাস্যের সামগ্রী করিয়াই তুলিতে পারে।

    আর রোহক ভাবিল, তাহার হাস্য কার্য করিয়াছে। সে আরও কিঞ্চিৎ হাসিল।

    গৌতমী কহিলেন, “রোহক, কী বলিতে চাহিতেছ তুমি?”

    “আমার কোন রোগ নাই।” রোহক গম্ভীর হইবার চেষ্টা করিল, “হইয়া যায়, ত্বরায় হয়। উহার যদি সহ্য না হয়, তাহা উহার বিষয়। অন্য কামিনীগণ ত এত অনুযোগ করে না।”

    অন্য কামিনীগণ। পূর্বে কখনও বলে নাই।

    গৌতমী একটি তালপত্র টানিয়া লইলেন, “বাসবদত্তা, যখন ও এই কথা বলে, তখন তোমার কিরূপ বোধ হয়?”

    বাসবদত্তার দন্ত এমন দৃঢ়রূপে বদ্ধ ছিল যে মাড়ি টনটন করিতেছিল। হস্তদ্বয় ক্রোড়ের মধ্যে পরস্পরকে নখ দ্বারা বিদ্ধ করিয়া ধরিয়াছিল। বক্ষের মধ্যে এক উষ্ণ বাষ্প উত্থিত হইতেছিল, নির্গমনের পথ পাইতেছিল না।

    “লজ্জা বোধ হয়,” সে কহিল, “বলিয়াছি বলিয়া লজ্জা, আর ও হাসিতেছে বলিয়া আরও লজ্জা।”

    রোহক অমনি কহিল, “ইহা হাস্যের কথা নহে। ইহা আমার দোষ নহে।”

    গৌতমী কহিলেন, “যখন তুমি বল, ‘ও ভোগ করে, আমি নহি’— তোমার মতে বিবাহে ভোগটি কাহার করা উচিত?”

    রোহক হতবুদ্ধি হইয়া গেল। সে ভাবিয়াছিল মূল-পত্রাদি প্রদান করিবেন।

    “ওটা ত কথার কথা,” সে কহিল।

    “কথার কথাতেই মানুষের প্রকৃত কথা বাহির হয়,” গৌতমী কোমলভাবে কহিলেন।

    বাসবদত্তা কার্পাসের দিকে চাহিয়া ছিল। সে ভাবিল, দুঃখ ত বৃহৎ হইবার কথা, যুদ্ধের ন্যায়, অনাবৃষ্টির ন্যায়। এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৈরাশ্য নহে, যাহা প্রত্যহ সঞ্চিত হইতে পর্বত হয়। আর এমন একজনের পার্শ্বে শয়ন করিয়া থাকা নহে, যে তুমি জাগ্রত থাকিতে থাকিতেই নিদ্রা যায়।

    সে সহসা উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া ফেলিল, “আমি চাহি না উহার ক্লেশ হউক। আমি কখনও চাহি নাই। আমি কেবল চাহিয়াছিলাম, ইহার মধ্যে আমরা দুইজনে একত্র থাকি। সত্বর হইলেও। আমি চাহিয়াছিলাম, স্খলন হইয়া যাইবার পরেও ও থাকিয়া যাউক। আমাকে একাকিনী ফেলিয়া চলিয়া না যাউক।”

    “চলিয়া যাইব কোথায়? আমি ত এখানেই আছি,” রোহক কহিল।

    “তুমি থাক না,” বাসবদত্তা কহিল, “তুমি স্খলিত হইলেই অন্যত্র চলিয়া যাও। তোমার যুক্তিতে, তোমার হাস্যে, অন্য বধূগণের নিকটে।”

    রোহকের হস্ত জানুর উপর শ্বেতবর্ণ হইয়া গিয়াছিল। বাল্যকাল হইতে তাহাকে বলা হইয়াছে, বুদ্ধি থাকিলে সকল রক্ষা পায়।

    সে মস্তক অবনত করিয়া কহিল, “আমার পিতা কহিতেন, যে পুরুষ আপনাকে সংযত করিতে না পারে, সে পুরুষই নহে। সুরা, ক্রোধ, আহার— সকল। তাই আমি সকল সংযত করিতে শিখিয়াছি। অধিক ভোজন করি না, চীৎকার করি না। কেবল ইহা পারি না। তাই ভান করি, পারি। ভান করি, আমি স্বয়ংই দ্রুত করিতে চাহিয়াছি। আমার কিছু যায় আসে না। যদি স্বীকার করি যে আমার ক্লেশ হয়, তবে সত্য হইয়া যাইবে যে আমি ন্যূন। তাই উহার দোষ বানাইয়াছি। ওটা সহজ ছিল।”

    এই স্থলে গল্পটি বক্রতা প্রাপ্ত হইল।

    বাসবদত্তার স্মরণ হইল, প্রায় বৎসরাধিক পূর্বে এক রজনীতে নিদ্রাভঙ্গে সে দেখিয়াছিল, রোহক পাকশালার মেঝেতে উপবিষ্ট হইয়া হস্ত দ্বারা শুষ্ক ছাতু ভোজন করিতেছে, ক্ষুদ্র বালকের ন্যায়, গাত্রের উত্তরীয়টি বড় অধিক বৃহৎ লাগিতেছে। তখন তাহার এত করুণা হইয়াছিল যে বমনোদ্রেক প্রায় হইয়াছিল। সে কিছু না বলিয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল।

    আর গৌতমীর বক্ষও ধক করিয়া উঠিল। এই কথাটি তিনি পূর্বেও শ্রবণ করিয়াছেন।

    বিংশতি বৎসর পূর্বে, গৌতমী যখন গৌতমী হন নাই, গার্গী ছিলেন, পৈঠানে এক সদাগরের পত্নী। তাঁহার স্বামীও ঠিক এই কথাটিই কহিত— সে ভোগ করে, আমি নহি— যখন সে তাহার ত্বরা লইয়া অনুযোগ করিত। তখন তিনিও হাসিয়াছিলেন। কাঁদিয়াছিলেন। অনন্তর গৃহ ত্যাগ করিয়াছিলেন। তিনি সাধ্বী হন নাই, এই কথাটি সহ্য করিতে না পারিয়া সরিয়া আসিয়াছিলেন। তাই রোহক যখন কথাটি কহিল, তিনি যেন তাঁহার মৃত স্বামীর কণ্ঠ অন্য এক মুখে শ্রবণ করিলেন। আর তাঁহার হাস্যটি বাসবদত্তাকে লইয়া ছিল না, ছিল সংসারের প্রতি, যে একই কথা প্রত্যেক জন্মে ফিরাইয়া আনে। তাই তিনি কাসি দ্বারা হাস্যটি আচ্ছাদন করিয়াছিলেন।

    গৌতমী কিছু কহিবার পূর্বেই বাসবদত্তা পুনর্বার কহিল, আরও একটি কথা আছে।

    রোহকের পিতা ধনদত্ত বিভাগপত্রে লিখিয়া গিয়াছিলেন, যে পুত্রের পুত্র হইবে না, সে সম্পত্তির অংশ পাইবে না। রোহক জানিত। বাসবদত্তা জানিত। যদি পল্লীতে প্রচারিত হয় যে রোহকের এই দোষ আছে আর বাসবদত্তা সেই কারণেই অদ্যাপি ফলবতী হইতে পারে নাই, তবে গ্রামপ্রধানগণ অংশটি তাহার ভ্রাতাকে দিয়া দিবে। তাই বাসবদত্তা সুখের ভান করিত, কেবল রোহকের মান রক্ষার্থ নহে, নিজের অন্ন-বস্ত্রের নিমিত্তও। তাহার মিথ্যা সীৎকারধ্বনির মধ্যে গণনার পুস্তকও নিহিত ছিল।

    আর একটি কথা, যাহা গৌতমীও জানিতেন না।

    বিবাহের দ্বিবৎসর পূর্বে, পৌরুষ লইয়া ভয়ে রোহক উজ্জয়িনীর বহির্ভাগে কদম্বতলে যক্ষিণীর স্থানে গিয়াছিল। তথায় সৌদামিনী নাম্নী এক যক্ষিণী বাস করে, সে সাধ্বীও নহে, অসাধ্বীও নহে, কেবল চুক্তির ক্ষুধায় কাতর। রোহক কহিয়াছিল, “আমাকে কামিনীগণকে তুষ্ট করিবার ক্ষমতা দাও, আমি আমার প্রথম পুত্রকে তোমায় দান করিব।” যক্ষিণী হাসিয়া কহিয়াছিল, “তথাস্তু। তুমি বহু কামিনীকে তুষ্ট করিতে পারিবে। কিন্তু যাহার গর্ভে তোমার পুত্র আসিবে, তোমার নিজ পত্নী, তাহার নিকটে তুমি ভীত শশকের ন্যায় হইয়া যাইবে। কারণ যাহা জন্মের পূর্বেই বিক্রয় করিয়াছ, তাহা যে গর্ভে আসিবে, সেই গর্ভই তোমার হস্তে নষ্ট হইবে।”

    তাই রোহক বহিঃস্থ কামিনীগণের নিকটে পারিত। একবার কৌতূহলবশত গিয়াছিল, কামিনীটি কিছু বলে নাই, প্রশংসা করিয়াছিল। পত্নীর নিকটেই পারিত না, কারণ সেই গর্ভটিই তাহার নিজের প্রদত্ত বাক্যে বদ্ধ।

    এই কথাটি সে কাহাকেও বলে নাই। যক্ষিণীর নিকটে বাক্য একবার প্রদান করিলে, মুখে উচ্চারণ করিলেই তাহা আরও দৃঢ়তররূপে বদ্ধ হয়।

    গৃহে তখন নিস্তব্ধতা। নিম্নের বিপণি রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। বাহিরে ঘণ্টা বাজিতেছে।

    রোহক হস্ত প্রসারিত করিল। তাহার হস্ত স্বেদে সিক্ত। বাসবদত্তার হস্তদ্বয় যেখানে পরস্পরকে নখবিদ্ধ করিয়া ধরিয়াছিল, তাহার উপরে স্থাপন করিল।

    “আমিও ভোগ করি,” মৃদুস্বরে কহিল, “কেবল বলিতে পারি না কিরূপে।”

    বাসবদত্তা হস্তটি উল্টাইয়া দিল। তাহার সুখ হইল না, শান্তিও হইল না। বহুদিন পরে তাহার কিছু অনুভূত হইল। তাহার হনুদ্বয় শিথিল হইল।

    গল্প সমাপ্ত হইল এই স্থলেই, রাজন্।

    বেতালের কণ্ঠ এবার কোমল, কিন্তু ভয়জনক।

    “এক্ষণে শ্রবণ কর বিক্রমাদিত্য। এই গল্পে তিনটি ছেদ।

    রোহক ছেদন করে একতাকে, যখন বলে ‘ও ভোগ করে, আমি নহি’।

    বাসবদত্তা ছেদন করে সত্যকে, যখন সুখের মিথ্যা অভিনয় করে।

    গৌতমী ছেদন করেন দয়াকে, যখন হাসিয়া ফেলেন।

    আর ঊর্ধ্বে লম্বমান রহিয়াছে যক্ষিণীর নিকট প্রদত্ত বাক্য— অজাত পুত্রকে বিক্রয় করা।

    এক্ষণে বল—

    যদি বল রোহকের দোষ গুরুতর, তবে তুমি বলিতেছ বিবাহ একতা ও পুত্রোৎপাদনের নিমিত্ত। তাহা হইলে তোমাকে স্বীকার করিতে হইবে, বিবাহের পূর্বের সেই মূর্খ প্রতিজ্ঞাটিই প্রকৃত পাপ।

    যদি বল বাসবদত্তার দোষ গুরুতর, তবে তুমি বলিতেছ সত্যই সর্বশ্রেষ্ঠ। তাহা হইলে তোমাকে বলিতে হইবে, যে কামিনী উদরান্নের দায়ে মিথ্যা সুখ প্রদর্শন করে, সে লোভিনী, দয়াবতী নহে।

    যদি বল গৌতমীর দোষ গুরুতর, তবে তুমি বলিতেছ দয়াই সর্বশ্রেষ্ঠ। তাহা হইলে তোমাকে মানিতে হইবে, যে নিজে একই আঘাতে মরিয়াছে, তাহার বিচার করিবার অধিকার নাই। আর তাহা হইলে ত কোন আহত ব্যক্তিই বিচারক হইতে পারিবে না।

    বল রাজন্, তোমার নিকট বিবাহ কিসের নিমিত্ত— পুত্রের নিমিত্ত, সত্যের নিমিত্ত, না দয়ার নিমিত্ত? তোমার উত্তর বলিয়া দিবে, তুমি নিজ প্রাসাদে কোনটিকে অগ্রে বলি দিবে।

    বল, আমি জানি তুমি জান।”

    শৃগালগণ নীরব। শবটি ভারী।

    বিক্রমাদিত্য অধিক চিন্তা না করিয়া রাজার ন্যায়ই উত্তর প্রদান করিলেন।

    “বেতাল, গুরুতর দোষ রোহকের।

    ‘ও ভোগ করে, আমি নহি’— এই বাক্যটি মূলে ছেদন করে। শাস্ত্রে বলে বিবাহ অর্থ এক শরীর। এক হস্ত যদি বলে অন্য হস্তের বেদনা তাহার নহে, তবে শরীরটি ত পূর্বেই ছিন্ন। বাসবদত্তার মিথ্যা সুখটি সেই ছেদটি আচ্ছাদন করিবার নিমিত্ত হইয়াছে। ওটি দোষ, কিন্তু ওটি আত্মরক্ষার্থ কৃত দোষ। গৌতমীর হাস্যটি এক মুহূর্তের ভ্রম, পুরাতন ক্ষত হইতে নির্গত।

    কিন্তু রোহক দ্বিবার ছেদন করে। একবার একতাকে, আরবার যক্ষিণীর নিকট পুত্র বিক্রয় করিয়া বংশকেও। তাই উহারই গুরুতর।”

    রাজা ভাবিলেন, বেশ রাজোচিত উত্তর দিয়াছেন, বংশ ও একতা রক্ষা করিয়া।

    বেতাল হাসিয়া উঠিল, কিন্তু এবার নিষ্ঠুরভাবে নহে, ক্লান্তভাবে।

    “আহা রাজন্, তুমি রাজার ন্যায়ই কহিলে। তোমার নিকট বিবাহ অর্থ পুত্র ও গৃহ অটুট রাখা। তাই যাহার নিমিত্ত পুত্র হইতেছে না, তাহার দোষ অধিক।

    তুমি ভাব নাই, বাসবদত্তা যখন প্রতিরজনীতে শিক্ষা দেয় যে তাহার ত্বরা-স্খলনেই সুখ, তখন সে রোহককে শিক্ষা দিতেছে যে অস্বীকার করিলে কার্য চলিয়া যায়। সে তখন উহার শিক্ষয়িত্রী হইয়া যাইতেছে। ইহা কি দয়া, না ভয়? উজ্জয়িনীতে পুত্রহীনা বিধবা ভিক্ষা করিয়া বেড়ায়, ইহা সে জানে।

    আর গৌতমী— তুমি বলিতেছ ওটি সামান্য ভ্রম। কিন্তু ওই হাস্যটিই ত ওই গৃহে একমাত্র সত্য ছিল। জগৎটাই হাসে। মাতা-মাসীগণ হাসে, গ্রামপ্রধানগণ হাসে, রাজগণ হাসে। ওই হাস্যটি লুকাইয়া গৌতমী বাসবদত্তাকে বুঝাইতে পারিলেন না যে তুমি একাকিনী নহ, আমিও এই কথাটি শ্রবণ করিয়াছি। কাসি দ্বারা আচ্ছাদন করিয়া তিনি নিজ অতীতকেই অস্বীকার করিলেন।

    তুমি রাজা, তাই তুমি কহিলে বংশ গুরুতর। কোন সন্ন্যাসিনীকে জিজ্ঞাসা করিলে সে কহিত দয়া গুরুতর, কারণ দয়া ব্যতীত কোন ক্ষত আরোগ্য হয় না। কোন বারাঙ্গনাকে জিজ্ঞাসা করিলে সে কহিত সত্য গুরুতর, কারণ সে জানে অর্থের নিমিত্ত সুখের ভান করিলে নিজ শরীরই অর্থ হইয়া যায়।

    তুমি বলিয়া দিলে রাজন্, তোমার নিকট বিবাহ পুত্রার্থে। ইহা ভ্রান্ত নহে। কিন্তু ইহাই একমাত্র সত্য নহে। আর তুমি যতদিন ইহা মনে করিবে, ততদিন তোমার বোধ হইবে যে স্বামী পুত্র দান করিতে পারে না, সে পত্নীর অপেক্ষা অধিক দোষী, যে সত্য কহিতে পারে না তাহার অপেক্ষা, বা যে স্মরণ রাখিতে পারে না তাহার অপেক্ষা।

    এই নিমিত্তই তুমি আমাকে বহন করিতেছ রাজন্। তুমি ভাবিতেছ শব বহন করিতেছ, শক্তি প্রাপ্ত হইবে বলিয়া। বস্তুত তুমি এমন এক প্রশ্ন বহন করিতেছ, যাহার একটিই উত্তর হয় না, আর তোমাকে কল্য প্রাতেও রাজত্ব করিতে হইবে।”

    এই বলিয়া বেতাল শব হইতে পিছলাইয়া নামিয়া, হাসিতে হাসিতে অন্ধকারে উড্ডীয়মান হইয়া পুনর্বার সেই শিংশপাবৃক্ষে লম্বমান হইল। নয়ন উন্মীলিত, মুখ সীবিত।

    রাজা বিক্রমাদিত্য একাকী দণ্ডায়মান রহিলেন নির্বাপিত চিতার মধ্যে, চরণপ্রান্তে শ্মশানধূলি লিপ্ত, আর বেতালের কথাটি মস্তকে বাজিতেছে, যে কোন শব অপেক্ষাও ভারী।

    তিনি পুনর্বার বৃক্ষটির অভিমুখে চলিতে আরম্ভ করিলেন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • :|: | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০৬742533
  • কঠিন কাহিনী।
    ছাতুকে পুরানো কালে বলতো সত্তু।
    আর, বানানটা শীৎকার।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন