এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • গুবাচি

    যদুবাবু লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত
  •  


    আক্কা

    তুমি হয়তো দেয়ালে শুধু একটা ছবি
    বা শত শত মানুষের হাতে তুলে ধরা একটা
    প্ল্যাকার্ড
    কিংবা পিছনে টাঙান ফ্লেক্স তুমি কোনও এক
    অনুষ্ঠানে
    অথবা তুমিই একটা মঞ্চ সবাই সরব যেখানে
    ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলে
    তুমি সর্বত্র, আছো সব ভিড়ে
    তুমি দাভোলকার, কলবুর্গি বা পানসারে
    হয়তো সঠিক ভাবে তুমি আরেক আসিফা,
    তুমি আমি এবং তুমি তুমি
    তুমি গৌরী, আমি গৌরী,
    আমরা সবাই গৌরী
    আমরা সবাই দানাম্মা, আসিফা
    ছিন্ন, ধর্ষিতা,
    কখনো বাইরে
    কখনো অন্তরের গভীরে
    কি যায় তাতে …
    আমরা লড়াই করি, বেদনার সাথে
    আমরা শ্বাস নিই। ছিন্ন ভিন্ন
    যে ভাবে হোক, যেখানে হোক তবুও সব শূন্য
    তুমি ছিলে অনেকের বোন,
    কয়েকজনের মা,
    আম্মার প্রিয় কন্যা
    হাজারো মানুষের কন্ঠস্বর,
    আজ শুধু তোমারই অভাব বুঝি আক্কা আমার।
     
    -----

    আজ শিক্ষক দিবস। আজ গৌরী লঙ্কেশের চলে যাওয়ার দিন। উপরের ছবিগুলি কবিতার, কবিতা লঙ্কেশের লেখা, নিজের বোনকে নিয়ে, আট পাতার বুকলেটের নাম-ও "আক্কা - পোয়েমস ফর গৌরী"। আর বাংলা অনুবাদটি নেওয়া গৌরীর লেখা একটি প্রবন্ধ সঙ্কলন থেকে। সঙ্কলনের নাম "আলোর পথযাত্রী", ভাষান্তর সোমনাথ গুহ।
     
    গৌরীর সম্বন্ধে আগেও অজস্র লেখা পড়েছি, সেমিনার শুনেছি, বন্ধুদের সাথে আলোচনা করেছি, তবুও সেই বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল যে আসলে আমরা যেসব আলোকসামান্য মানুষজনের অসম্ভব সাহস দেখে আশ্চর্য হয়ে যাই, তারাও আসলেই সাধারণ মানুষ। অতিসাধারণের মধ্যেই কোথাও একফোঁটা অদম্য জেদ। যে জেদের, ব্যাখ্যা আমাদের সুবিধেবাদী ব্যকরণে নেই।

    যেমন ধরুন, কবিতা, এই বইয়ের ভূমিকায় এক জায়গায় লিখেছেন,

    "গৌরীকে দেখতে হয়তো `গুবাচি’র (একটা ছোট, দুর্বল চড়াই পাখি) মতো, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি যখন রুখে দাঁড়ান তখন তিনি হিংস্র বাঘের মতো হয়ে যান।"

    গুবাচি ... আশ্চর্য ব্যাপার যে ঐটুকু পড়ার পর যতবার নিজের টাইমলাইনে বা অন্যত্র গৌরীর ছবি দেখেছি, আমার মনে পড়েছে এই মানুষটিই তার বোনের আক্কা, তার বোনের গুবাচি, ছোট্ট চড়ুই পাখি, এবং ইনিই লড়েছিলেন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রায় একা। বাঘের মতই।

    সেই এক-ই অনুচ্ছেদে, কবিতা লিখেছেন,

    "তাঁর ধর্ম ছিল সংবিধান এবং তিনি দাঁতে দাঁত চেপে মেরুকরণ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, ডঃ আম্বেদকর, গৌতম বুদ্ধ, বাসবান্নার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং সাম্যবাদী সমাজে বিশ্বাস করতেন।"

    গান্ধী, আম্বেদকর, বুদ্ধ - এদের আদর্শের পাশেই যাঁর নাম - বাসবান্না, তাকেও খুঁজে পেয়ে প্রচণ্ড উত্তেজিত বোধ করেছিলাম মনে পড়ছে।

    কারণ ঠিক এই পাণ্ডুলিপি পড়ার কিছুদিন আগে আমার হাতে এসেছিল দুটি আলাদা বই - একটির নাম স্পিকিং অফ শিভা, এ-কে-রামানুজনের অনুবাদ, বাসবান্নার কবিতা, বচন। অন্যটির নাম "শতেক বচন"। বাসবান্না, আক্কা মহাদেবী, আল্লামাপ্রভু-সহ বহু বীরশৈব কবিদের ১০০টি কবিতার মূল কন্নড় থেকে* বাংলায় অনুবাদ করেন নবনীতা, বইতে। ১৯৮৩ সালে। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, স্পিকিং অফ শিভা পড়ে এত উত্তেজিত হয়েছিলাম যে ঘুম আসেনি সেদিন, মানে সেই রাতে। আমি লিখেছিলাম,

    "... আজকাল এই প্রায় আটশো-নশো বছর পরে, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে আরেকবার আমাদের এই লুপ্ত ধারাটির খোঁজ করি। খুঁজছি, তাই, পড়ছি খুব, কারণ আর কিছু করার নেই, এবং হাতে সময় কম, আর ভাবছি, কোথায় ভুল হয়ে গেলো আমাদের? অসত হইতে সতের দিকে, তমসা হইতে আলোর দিকে, এবং মৃত্যু হইতে অমৃতের দিকে যাওয়ার পথ আমরা যে শুধু হারিয়েছি তাই নয়, বোধ হয় পথটি মুছে গেছে আমাদের সমবেত চেতনা থেকে।"

    আর বাসবান্নাকে নিয়ে সেই প্রবন্ধে গৌরী লিখেছিলেন,

    "আমরা কন্নড়রা বিশ্বাস করতে ভালোবাসি যে আমাদের পড়শিদের চেয়ে আমরা বিভিন্ন মতামতের প্রতি অনেক বেশি সহিষ্ণু। দুর্ভাগ্যক্রমে গত নয় শতাব্দীতে এখানে কোনকিছুরই খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। কলবুর্গির হত্যার প্রতিবাদে রবিবার যে প্রতিবাদ সভা হয় সেখানে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা হয়েছে: গতকাল বাসবান্না, আজ কলবুর্গি।"

    আর শেষ করেছিলেন এই বলে,

    "কেউ জানে না কলবুর্গির মৃত্যুতে কার কি লাভ হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে বাসবান্না এবং কলবুর্গির মতো সংস্কারকদের যখন নিষ্ঠুর ও মর্মান্তিক ভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন মতাদর্শগত ভাবে দক্ষিণপন্থীরাই লাভবান হয়। তবুও, আদর্শের কখনোই মৃত্যু হয় না।"
     


    আদর্শের কী সত্যিই মৃত্যু হয় না? এর উত্তর আমার জানা নেই। আমি সিনিক্যাল এবং স্বভাবগতভাবে ভীরু প্রকৃতির মানুষ। আমি মনে করি আদর্শ আসলেই একটি অলীক প্রকল্প। যেমন অলীক প্রকল্প চিন্তার স্বাধীনতা। শিল্পের স্বাধীনতা। যেমন অলীক শিক্ষার অধিকার। তবুও, এইসব অলীক জিনিষে বিশ্বাস না করলে সকালে বিছানা ছেড়ে উঠে কাজে যাওয়ার শক্তি হবে না আমাদের।

    তাই, বিশ্বাস করি। তাই কাজে যাই। তাই-ই, এ দুনিয়ার চাকা ঘোরে। আমরা দিবস উদযাপন করি, এবং আমরা দীর্ঘ রাত্রি বিস্মৃত হই।

    আজ ৫-ই সেপ্টেম্বর। আজ শিক্ষক দিবস। আজ গৌরী লঙ্কেশের চলে যাওয়ার দিন। ২০১৭ সালের ঠিক এই দিনেই সন্ধ্যে আটটার একটু পরেই, খুন হন গৌরী লঙ্কেশ। সেই মুহূর্তের বর্ণনা বহুলপঠিত। তবুও বইটি পড়তে পড়তে শিউরে উঠি পড়ে, কল্পনাপ্রবণ বলেই হয়তো স্পষ্ট দেখতে পাই,
     
    "সিঁড়ির প্রথম ধাপে তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। তাঁর হালকা নীল কুর্তায় রক্ত ছড়িয়ে পড়ল। তাঁর নড়বড়ে চটিটা তখনো তাঁর পায়ে সেঁটে ছিল।"

    (সঙ্গের আঁকা গৌরীর ছবিটি রমিতর। বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য এঁকেছিল। আজকে চেয়ে নিলাম। ওর হাতের তুলিকলম অক্ষয় হোক।)
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন