আগের পর্বে আমরা দেখেছিলাম যে ঠকে যাওয়া বোকামি নয়, বিচারের এক ভুল, যে ভুল করানোর জন্য ঠকবাজ কর্তৃত্ব, ভয়, ঘাটতি, লোভ আর "ঠিকঠাক দেখানোর" মতো কতগুলো চেনা জিনিসের উপর ভর করে সুযোগ মত ট্রিগার টেপে। এবার আমরা ঠকবাজির জগতের ভেতরে ঢুকব, একটা-একটা দিক ধরে। কিন্তু সেই জগতে ঢোকার আগে হাতে একটা ভালো মানচিত্র নেওয়া দরকার যেটা এঁকে গিয়েছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক, ফ্র্যাঙ্ক স্তায়ানো আর পল উইলসন।
ধোঁকাবাজির সাতটি সাত সূত্র
উইলসন জড়িত ছিলেন ব্রিটিশ টেলিভিশনের এক অদ্ভুত অনুষ্ঠানের সঙ্গে, যার নাম "দ্য রিয়েল হাসল", যেখানে সত্যিকারের রাস্তার ঠকবাজির কৌশল হাতেকলমে দেখিয়ে দর্শকদের সতর্ক করা হত। সেই অভিজ্ঞতা আর একগাদা আসল টকবাজির বিশ্লেষণ থেকে স্তায়ানো ও উইলসন ২০০৯ সালে দাঁড় করালেন সাতটি সূত্র - মানুষের আচরণের সাতটি চেনা ধরন, যেগুলোকে ঠকবাজ দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করে। বিভ্রান্তি, কর্তৃত্ব-আনুগত্য, পালের টান, বেআইনি সংসর্গ, ছদ্মবেশ, প্রয়োজন-ও-লোভ, আর সময়ের চাপ। তালিকাটা শুকনো শোনায়, কিন্তু মেলার মাঠের একটা পুরোনো খেলা দিয়ে উদাহরণ দিলে জিনিসটা জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে।
তিন তাসের জুয়ার কথা ভাবুন। মাটিতে বসে একজন তিনটে তাস উল্টেপাল্টে সাজায়, লাল টেক্কাটা কোথায় ধরতে পারলেই দ্বিগুণ টাকা। এখানে হাতের কারসাজি, মানে যে "থ্রো"-তে চোখের সামনে দিয়ে তাস বদলে যায় সেটা আসলে “বিভ্রান্তির সূত্র”: আপনি যা দেখতে চাইছেন সেই দিকেই চোখ আটকে থাকে, আর ঠিক তখনই আসল কাজটা হয়ে যায় আড়ালে। ভিড়ের ভেতর থেকে যে লোকটা বারবার জিতে যায়, সে সাজানো খেলুড়ে, মানে “পালের সূত্র”: "অন্যরা তো জিতছে, তবে আমি নই কেন?" আপনার নিজের যে লোভটা আপনাকে টেবিলের দিকে টানে, সেটা “প্রয়োজন-ও-লোভের সূত্র”। আর মজার ব্যাপার, অনেক সময় খেলুড়ে আপনাকে ফিসফিস করে বলে, চলুন দুজনে মিলে আসল লোকটাকে ঠকাই, অর্থাৎ আপনাকেই সামান্য অসৎ হতে প্ররোচিত করা হয়, যাতে ঠকে যাওয়ার পর লজ্জায় পুলিশের কাছে যেতে না পারেন। এটাই “বেআইনি-সংসর্গের সূত্র”, ঠকবাজের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বর্ম।
বাকি তিনটে সূত্রও রোজকার ফাঁদে সমান সক্রিয়। “কর্তৃত্ব-আনুগত্যের সূত্র” - সমাজ আমাদের শিখিয়েছে কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন কোরো না; তাই একটা ফ্লুরোসেন্ট জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে যে কেউ পার্কিং-অ্যাটেন্ড্যান্ট সেজে আপনার গাড়ি হাঁকিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আর ফোনে "পুলিশ অফিসার" পরিচয় দিলে ভালোমানুষ দোকানি বিনা প্রশ্নে গয়না তুলে দেন "তদন্তের প্রমাণ" হিসেবে। কুখ্যাত হ্যাকার কেভিন মিটনিক তো নিজের বইয়েই লিখে গেছেন, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর লোকেরা এই ফাঁদে বরং বেশি বিপন্ন, কারণ তাঁদের রক্তে গাঁথা থাকে পদমর্যাদার প্রতি আনুগত্য, উঁচু পদের কেউ নির্দেশ দিলে নিচের কেউ তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। “ছদ্মবেশের সূত্র” - জিনিস আর মানুষ কেউই যা মনে হচ্ছে তা নয়; নকল এটিএম, নকল ওয়েবসাইট, নকল উর্দি - সবই আসলকে এত নিখুঁত নকল করে যে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। “সময়ের সূত্র” - যখন আপনাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়, তখন মস্তিষ্ক ধীর, যুক্তিনির্ভর পথ ছেড়ে দ্রুত, আবেগনির্ভর পথ ধরে; ঠকবাজ ঠিক সেই তাড়াটাই তৈরি করে - এক্ষুনি টাকা দাও, নইলে সুযোগ শেষ। এই সাতটি সূত্র মাথায় রেখে এবার চলুন, ধোঁকাবাজির দুনিয়ার ভিতরে ঢুকি।
রাজকুমারের চিঠি
এই ধোঁকার প্যাটার্ণটা সবচেয়ে পুরোনো, সবচেয়ে নামজাদা – যাকে বলা হয় অগ্রিম-ফি প্রতারণা, বা "৪১৯" (নামটা এসেছে নাইজেরিয়ার দণ্ডবিধির একটি ধারা থেকে)। গল্পের কাঠামো প্রায় সবাই চেনেন: কোনো দেশের "রাজকুমার", মৃত ধনকুবেরের "উকিল", কিংবা কোনো ব্যাংকের "ম্যানেজার" আপনাকে চিঠি দেন যে তাঁর হাতে আটকে আছে কোটি কোটি ডলার, শুধু দেশের বাইরে পাচার করতে দরকার একজন বিশ্বস্ত লোক। আপনি অ্যাকাউন্টটা ব্যবহার করতে দিলে তার এক-চতুর্থাংশ আপনারই। রাজি হলে আসতে থাকে ভুয়ো ব্যাংক-স্টেটমেন্ট, ভুয়ো নথি। তারপর শুরু হয় আসল খেলা, মানে টাকাটা "ছাড়াতে" গেলে আগে কিছু "খরচা" আপনাকে পাঠাতে হবে। একটা খরচা মিটল তো আরেকটা এসে হাজির, উকিলের ফি, ঘুষ, কর এবং প্রতিবার সেই প্রতিশ্রুতি, "ব্যস, এবারেই টাকাটা চলে আসবে"।
এই বারবার টাকা পাঠানোর পেছনে কাজ করে গত পর্বের সেই ধারাবাহিকতার চাপ। প্রথম খরচাটা পাঠানোর পর প্রতিটা পরের খরচা যেন আগেরটাকে রক্ষা করার লড়াই। এতদূর যখন এসেছি, এখন থামলে তো আগের সবটাই জলে যাবে! এই "ডুবন্ত খরচের" ফাঁদেই শিকার একটু একটু করে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলেন। চিঠির ভাষাটা কেমন হয়, একবার দেখুন। কেউ লেখেন হাসপাতালের বিছানা থেকে - "ডাক্তার বলেছেন আমাকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে, লিভার নষ্ট, আর মাত্র কয়েক মাস বাঁচব; এই টাকাটা যদি সৎ কোনো হাতে তুলে দিয়ে যেতে পারতাম..." কেউ লেখেন সতেরো বছরের এক অনাথ মেয়ের কথা, যাকে আপনি নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে মানুষ করবেন। এই আর্তিগুলো নিছক লোভ নয়, সহানুভূতির সূত্রে বাঁধা, মানুষের সাহায্য করার সহজাত তাগিদটাকেই এখানে অস্ত্র করা হয়। প্রায় সবসময় লেখক নিজেকে দেখান কোনো-না-কোনো ক্ষমতার আসনে, ব্যাংকের ম্যানেজার, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যারিস্টার। কারণ কর্তৃত্বের ছাপ থাকলে বিশ্বাস জন্মায় সহজে।
এই ফাঁদের জন্ম কিন্তু ইন্টারনেটের অনেক আগের। উনিশ শতকে ইউরোপে চালু ছিল "স্প্যানিশ প্রিজনার" নামের এক চিঠি-জোচ্চুরি। জেলে বন্দি এক ধনী অভিজাতকে ছাড়ানোর নাম করে টাকা হাতানো হত, বিনিময়ে মুক্তির পর মোটা পুরস্কার আর তাঁর সুন্দরী কন্যার হাতের লোভ। প্রযুক্তি বদলেছে, ইমেল এসেছে, কিন্তু গল্পের হাড়গোড় প্রায় একই। ব্রিটেনের অফিস অফ ফেয়ার ট্রেডিং-এর ২০০৬ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, শুধু ব্রিটেনেই বছরে প্রায় সত্তর হাজার মানুষ এই ধরনের ফাঁদে পা দেন। গল্পগুলো কখনও কখনও রীতিমতো অবিশ্বাস্য চেহারা নেয়, একবার তো এক ইমেল ঘুরেছিল মহাকাশে "আটকে-পড়া এক নাইজেরিয়ান নভোচারী"-র নামে, পৃথিবীতে ফেরার খরচ চেয়ে! তবু ফাঁদটা কাজ করে যায়, কারণ ভেতরের কাঠামোটা একই থাকে।
এই "না-দাবি-করা সম্পত্তি"-র ফাঁদের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ রেখে গেছেন অস্কার হার্টজেল নামের এক আমেরিকান। ১৯১৫ সালে দুই ঠকবাজ তাঁর মায়ের কাছ থেকে "স্যার ফ্রান্সিস ড্রেকের হারানো সম্পত্তি"-র শেয়ার বেচার নাম করে ছ-হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়। হার্টজেল সেই ঠকবাজদের খুঁজে বার করেন - পুলিশে দেওয়ার জন্য নয়, বরং কারবারে ভাগ বসাতে! গল্পটা ছিল এই: ষোড়শ শতকের নাবিক-জলদস্যু ফ্রান্সিস ড্রেক মারা যান বিপুল সম্পত্তি রেখে, বৈধ উত্তরাধিকারী ছাড়াই। সেই সম্পত্তি নাকি ব্রিটিশ সরকারের হেফাজতে তিনশো বছর ধরে সুদে-আসলে ফুলেফেঁপে উঠেছে, আর হার্টজেল হলেন তার আসল দাবিদারের প্রতিনিধি, শুধু আইনি লড়াই চালাতে টাকা দরকার। ড্রেক পদবির হাজার হাজার মানুষ "শেয়ার" কিনলেন, হাজার-গুণ লাভের আশায়। ব্রিটিশ সরকার সাফ জানিয়ে দিল, এমন কোনো সম্পত্তিই নেই। কিন্তু হার্টজেল তখন ফেঁদে বসলেন এক ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব যে আসল উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করতেই নাকি এসব অস্বীকার করা হচ্ছে। বিস্ময়কর ব্যাপার, তাঁর গ্রেপ্তার আর সাজা হওয়ার পরেও বহু ভক্ত টাকা পাঠিয়ে গেছেন, শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্বাস করে যে তিনিই সত্যি বলছেন! প্রায় কুড়ি বছর ধরে চলা এই কারবারে তিনি হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে তোলেন লক্ষ লক্ষ ডলার। লক্ষ করুন সেই চেনা কাঠামোটা - "টাকাটা প্রায় এসে গেছে, শুধু আর একটু খরচা লাগবে", আর দেরির জন্য ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের অজুহাত। আজকের রাজকুমারের ইমেল আসলে এই ড্রেক-সম্পত্তিরই সরাসরি উত্তরসূরি।
কিন্তু এই প্রদেশের সবচেয়ে অন্ধকার সত্যটা লুকিয়ে সেই বেআইনি-সংসর্গের সূত্রে। কেউ যখন বোঝেন তিনি ঠকেছেন, তখন প্রায়ই পুলিশের কাছে যেতে পারেন না। কারণ যে "সুযোগ"-এর লোভে তিনি এগিয়েছিলেন, সেটা আসলে বেআইনি অর্থপাচারেরই এক রূপ। নিজের সেই সংসর্গ ফাঁস হওয়ার ভয়ে তিনি চুপ করে যান। কেমব্রিজের গবেষকরা লিখেছেন, এই ফাঁদে সর্বস্ব খুইয়ে অনেকে দেউলিয়া হয়েছেন, কেউ কেউ জীবনের আশাই ছেড়ে দিয়েছেন। ঠকবাজের কাছে শিকারের এই লজ্জা আর নীরবতাই সবচেয়ে মূল্যবান পুঁজি। এতটাই যে, একদল ঠকবাজ আরও এক ধাপ এগিয়ে ভুয়ো "প্রতারণা-দমন সংস্থা" সেজে সেই পুরোনো শিকারদেরই আবার চিঠি দেয় এই মর্মে যে "আমরা কিছু ঠকবাজকে ধরেছি, আপনার খোয়া-যাওয়া টাকা ফেরত দিতে চাই, শুধু আপনার ব্যাংক-বিবরণটা পাঠান।" একবার ঠকে-যাওয়া মানুষ দ্বিতীয়বার ঠকেন ঠিক সেই একই আশায়। রাজকুমার বদলায়, চিঠির খামটা একই থেকে যায়।
লোভের কল: লটারি, সুইপস্টেক আর পঞ্জি
পরের ধোঁকাবাজির দিকটা আসে লোভের সরাসরি বাজার থেকে যার সবচেয়ে সরল রূপ লটারি আর সুইপস্টেক প্রতারণা। একটা সরকারি-চেহারার চিঠি এসে জানায়, আপনি বিরাট এক পুরস্কার জিতে গেছেন; শুধু সেটা "ছাড়াতে" গেলে একটা প্রসেসিং ফি লাগবে। এই চিঠিগুলো এত বেশি অফিসিয়াল সাজতে চায় যে সেটাই একরকম হাস্যকর হয়ে ওঠে - কোট অফ আর্মস, সিলমোহর, নানা রঙের সিরিয়াল নম্বর, চেকের মতো দেখতে ভাউচার, ব্যারকোড, ছাপা সই। অফিস অফ ফেয়ার ট্রেডিং-এর বিশ্লেষণে এই চিঠিতে সবচেয়ে চেনা শব্দ ছিল "deadline", আর তার সঙ্গে জুড়ত "guaranteed", "confirmed winner", "you are 100 per cent guaranteed to receive", অর্থাৎ একদিকে নিশ্চয়তার প্রলেপ, অন্যদিকে তাড়ার চাপ। ভাবার সময়টুকু কেড়ে নেওয়াই আসল লক্ষ্য।
লোভের সবচেয়ে সূক্ষ্ম কারিগরি দেখা যায় ধাপে-ধাপে টোপ বাড়ানোর কৌশলে। রিয়েল হাসলের এক লটারি-ধোঁকায় গবেষকরা লক্ষ করেছিলেন, শিকারকে প্রথমে দেওয়া হয় একটা মোটামুটি লোভনীয় প্রস্তাব, মানে ধরুন, পাঁচশো পাউন্ড আগাম দিলে চোদ্দোশো পাউন্ড পাক্কা। শিকার তখনও একটু ইতস্তত করছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ তাঁর ভাগের অঙ্কটা লাফিয়ে পঞ্চাশ হাজারে পৌঁছে যায়! এতক্ষণ যিনি নিম-রাজি ছিলেন, তিনি এবার একদম নিশ্চিত। ঠকবাজ চাইলে গোড়াতেই লাখ টাকার টোপ ফেলতে পারত, কিন্তু দু-ধাপে করলে ব্যাপারটা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয় কারণ শিকারের প্রত্যাশা প্রথমে ছোট অঙ্কে বাঁধা হয়ে যায়, দ্বিতীয় ধাপটা তখন তাঁকে একেবারে মাত্রাছাড়া করে দেয়।
লোভের এই কারবারের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য হল পঞ্জি স্কিম। নামটা এসেছে চার্লস পঞ্জি নামের এক ইতালীয়-মার্কিন লোকের থেকে, যিনি ১৯২০ সালে বস্টনে দাবি করেছিলেন, আন্তর্জাতিক ডাক-কুপনের কারবারে তিনি এমন এক ফাঁক পেয়েছেন যে পঁয়তাল্লিশ দিনে পঞ্চাশ শতাংশ, আর নব্বই দিনে একশো শতাংশ মুনাফা দেওয়া যায়। আসল কথা হল, তিনি কোনো কুপনের কারবারই করছিলেন না, নতুন বিনিয়োগকারীর টাকা দিয়েই পুরোনোদের "মুনাফা" মেটাচ্ছিলেন। যতদিন নতুন লোক আসছে, ততদিন চাকা ঘুরছে। এক সময় তিনি দিনে আড়াই লাখ ডলার তুলছিলেন; সাধারণ শ্রমজীবী অভিবাসী থেকে শুরু করে শহরের ধনী ব্যাংকার পর্যন্ত তাঁর দরজায় লাইন দিয়েছিলেন। ১৯২০-র আগস্টে বস্টন পোস্ট কাগজ যেই খতিয়ে দেখতে শুরু করল, অমনি শুরু হল টাকা তোলার হুড়োহুড়ি, আর গোটা তাসের ঘরটা ভেঙে পড়ল। পঞ্জিকে গ্রেপ্তার করা হয় ডাক-জালিয়াতির ছিয়াশিটি অভিযোগে; জেল খেটে শেষে দেশছাড়া হন।
পঞ্জির নামটা টিকে গেছে, কিন্তু তাঁর স্কিমকে বামন বানিয়ে দিয়েছেন বার্নার্ড ম্যাডফ। এই প্রাক্তন ওয়াল স্ট্রিট ব্যক্তিত্ব বছরের পর বছর তাঁর ক্লায়েন্টদের দেখিয়ে গেছেন নিয়মিত, স্থির, লোভনীয় মুনাফা যার সবটাই বানানো। ধনী ব্যক্তি, দাতব্য সংস্থা, বড় প্রতিষ্ঠান – সব মিলিয়ে প্রায় পঁয়ষট্টি বিলিয়ন ডলারের এক জালিয়াতি। এখানে "সামাজিক প্রমাণ" কাজ করেছিল সবচেয়ে বিষাক্ত রূপে - এত বিখ্যাত, এত সম্মানিত মানুষজন যেখানে টাকা রাখছেন, সেখানে সন্দেহ করে কে? ২০০৮ সালে নিজের ছেলেদের কাছে ম্যাডফ স্বীকার করেন, "পুরোটাই একটা বড় মিথ্যে।" আদালত তাঁকে দেন একশো পঞ্চাশ বছরের কারাদণ্ড; বিচারক তাঁর অপরাধকে বলেছিলেন "অস্বাভাবিক রকমের অশুভ"।
এই গোটা ব্যাপারটার একটাই দুর্বলতা আর একটাই চিরন্তন সতর্কসংকেত যে মুনাফা বাজারের ওঠাপড়া অগ্রাহ্য করে বছরের পর বছর স্থির, নিশ্চিত আর অস্বাভাবিক রকমের বেশি এবং সেটাই সবচেয়ে বড় লাল পতাকা। বৈধ বিনিয়োগে ঝুঁকি থাকে, ওঠানামা থাকে; যে জিনিস শুধুই ওঠে, কখনও নামে না, সেটা হয় জাদু নয় জোচ্চুরি, আর জাদু বাস্তবে হয় না। কিন্তু গত পর্বের সেই "ফ্যান্টম ফিক্সেশন" এখানেই ফাঁদ পাতে: বড় রিটার্নের সংখ্যাটা এত জ্বলজ্বল করে যে "এত ভালো কী করে সম্ভব" এই প্রশ্নটা আর কেউ তোলে না। পঞ্জি থেকে ম্যাডফ, একশো বছরের ব্যবধান, কিন্তু কাঠামোটা অবিকল এক।
আধুনিক যুগে এই লোভের কল আরও নিষ্ঠুর, আরও ধৈর্যশীল রূপ নিয়েছে, যাকে বলা হয় "পিগ বুচারিং"। এখানে প্রথমে গড়ে তোলা হয় বন্ধুত্ব বা প্রণয়, তারপর ধীরে ধীরে শিকারকে টানা হয় কোনো ভুয়ো ক্রিপ্টো বা শেয়ার-লগ্নির অ্যাপে। প্রথম কয়েকবার শিকার সত্যিই "লাভ" দেখেন, এমনকি সামান্য টাকা তুলেও নিতে পারেন - এই ছোট্ট সাফল্যটুকুই তাঁর সন্দেহ ঘুচিয়ে দেয়। তারপর যখন তিনি বড় অঙ্ক ঢালেন, অ্যাপটা একদিন হাওয়া হয়ে যায়। একই পরিবারের আরও এক নতুন প্রজাতি হল "টাস্ক স্ক্যাম" যা ঘরে বসে সহজ কাজ করে রোজগারের টোপ, যেখানে প্রথমে সামান্য টাকা দিয়ে বিশ্বাস জিতে, পরে "আরও বেশি আয় আনলক করতে" শিকারকেই টাকা ঢালতে বলা হয়। মোড়ক ঝকঝকে অ্যাপ, কিন্তু ভেতরের কলটা সেই পঞ্জিরই - বিশ্বাস গড়ো, তারপর গিলে ফেলো।
ছোট্ট জয়ের টোপ
প্রায় সব বড় ফাঁদেই একটা সাধারণ চাল লুকিয়ে থাকে, ঠকবাজদের ভাষায় যাকে বলে "কনভিন্সার" যেটা একটা ছোট্ট, কিন্তু আসল জয়। তিন তাসের জুয়ায় শুরুতে আপনাকে দু-একবার জিততে দেওয়া হয়; পঞ্জি বা ম্যাডফ প্রথম দিকে সত্যিকারের "মুনাফা"-র চেক পাঠান; পিগ বুচারিং-এ শিকার প্রথম কয়েকবার সামান্য টাকা তুলেও নিতে পারেন। এই ছোট্ট সাফল্যটুকুর কাজ একটাই - আপনার ভেতরের সন্দেহটাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া। একবার নিজের চোখে "লাভ" দেখে ফেললে আপনি আর যুক্তি খোঁজেন না, বরং নিজেই নিজেকে বোঝাতে শুরু করেন যে ব্যাপারটা আসল। কেমব্রিজের গবেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানুষ অন্যের চাপিয়ে-দেওয়া ধারণার চেয়ে নিজের বানানো ধারণাকে অনেক সহজে বিশ্বাস করে, সেরা ঠকবাজ ঠিক এই জিনিসটাই কাজে লাগায়। সে আপনাকে সিদ্ধান্তটা বলে দেয় না; শুধু ছোট্ট একটা জয় সাজিয়ে দিয়ে আপনাকে দিয়েই নিজেকে ঠকাতে বসায়।
ভালোবাসার ফাঁদ
এবার দেখা যাক ধোঁকাবাজির সেই দিকটা যেখানে ঠকবাজ টাকার সঙ্গে হৃদয়টাও নিয়ে নেয় - রোম্যান্স স্ক্যাম। ডেটিং অ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় নিরীহ আলাপ। প্রথম সপ্তাহগুলোয় কোনো টাকার কথাই ওঠে না; বরং ওপারের মানুষটি নিখুঁত মনোযোগ দিয়ে শোনে আপনার দিনযাপন, আপনার একাকিত্ব, আপনার পুরোনো ক্ষত। এই ধৈর্যই তার কারিগরি, মনোবিজ্ঞানে যাকে বলে "গ্রুমিং"। মিশায়েলা ডাভ তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন, রোম্যান্স স্ক্যামে এই বিশ্বাস-গড়ার পর্বটা সপ্তাহ কেন, মাসের পর মাসও চলতে পারে; ঠকবাজ কোনো তাড়াহুড়ো করে না, কারণ সে জানে সম্পর্কের ভিতটা যত গভীর হবে, পরে টাকা চাওয়ার মুহূর্তে "না" বলা শিকারের পক্ষে তত কঠিন হবে। সে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ, আর তারপর কখনও কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা, কখনও আটকে-যাওয়া ব্যবসার টাকা, কখনও ভিসার জটিলতা - কোনো একটা "জরুরি বিপদ" এসে হাজির হয়, যেখানে শুধু আপনিই তাকে বাঁচাতে পারেন।
এখানে সিয়ালদিনির "পছন্দ ও সাদৃশ্য" আর স্তায়ানোর "প্রয়োজনের সূত্র" হাত ধরাধরি করে চলে। ইন্টারনেট-প্রতারণা নিয়ে একটি পর্যালোচনা-গবেষণায় দেখা গেছে যে একাকিত্ব আর তাৎক্ষণিক প্রবণতা, এই দুটো মানুষকে অনলাইন ফাঁদে বিশেষভাবে বিপন্ন করে তোলে। যে মানুষ নিঃসঙ্গ, যিনি একটু ভালোবাসার জন্য, একটু শোনার লোকের জন্য কাতর, তাঁর কাছে ওই মনোযোগটুকুই এত মূল্যবান যে টাকার প্রশ্নে যুক্তি খাটানো কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে করুণ ব্যাপার এই যে টাকা ফুরোলেও ফাঁদ শেষ হয় না। অনেক সময় শিকারকে অজান্তেই বানানো হয় "মানি মিউল", অর্থাৎ অন্যের চুরির টাকা নিজের অ্যাকাউন্ট দিয়ে পাচারের বাহক; কিংবা হাতানো হয় তাঁর পরিচয়পত্রের তথ্য। যিনি ঠকেন, তিনি একই সঙ্গে খোয়ান সঞ্চয়, আত্মবিশ্বাস, আর সেই সম্পর্কটুকু যেটা আসলে কোনোদিন ছিলই না। এই দ্বিগুণ ক্ষতই রোম্যান্স স্ক্যামকে সবচেয়ে নির্মম ফাঁদগুলোর একটা করে তুলেছে।
আশার বাজার: নিরাময় ও সহানুভূতির ফাঁদ
লোভ আর ভয়ের মাঝখানে আছে আরেকটা নরম জায়গা, যা হল আশা। কথায় আছে ‘আশায় বাঁচে চাষা’, তবে কেস আজকাল আর শুধু চাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যিনি কোনো দুরারোগ্য রোগে ভুগছেন, কিংবা প্রিয়জনকে বাঁচাতে মরিয়া, তাঁর কাছে "নিশ্চিত নিরাময়ের" টোপ প্রায় অপ্রতিরোধ্য। তাই বাজারে ছাড়া হয় ভুয়ো মিরাকল কিওর - অলৌকিক ওষুধ, গোপন থেরাপি, চটজলদি আরোগ্যের প্রতিশ্রুতি। ডাভ লক্ষ করেছেন, এই ধরনের ফাঁদ বিশেষভাবে কাজ করে দীর্ঘমেয়াদি, লজ্জাজনক বা সহজে-না-সারা রোগের ক্ষেত্রে কারণ ভুক্তভোগী তখন মূলধারার চিকিৎসার বাইরে গোপনে কিছু একটা খুঁজতে থাকেন, আর লজ্জায় কাউকে জিজ্ঞেসও করেন না।
সহানুভূতির ফাঁদের আধুনিকতম রূপ হল ক্রাউডফান্ডিং প্রতারণা। কোনো অসুস্থ শিশু, কোনো বিপন্ন পরিবার, কোনো মর্মস্পর্শী গল্প - সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে ওঠে, আর আমরা হৃদয় উজাড় করে দান করি। ডাভ দেখিয়েছেন, এসব ভুয়ো প্রচারণায় প্রায়ই দেখানো হয় বাড়িয়ে-বলা দানের সংখ্যা (সেই সামাজিক প্রমাণ, "এত মানুষ যখন দিচ্ছে, নিশ্চয়ই আসল"), আর গল্পটা রাখা হয় সরল, আবেগঘন। একবার এক "গৃহহীন মানুষের শেষ সম্বল দিয়ে অচেনা নারীকে সাহায্য"-এর মন-ছুঁয়ে-যাওয়া কাহিনি অনলাইনে বিরাট অর্থ তুলেছিল যেখানে পরে জানা যায়, গোটা গল্পটাই ওই নারী, তাঁর প্রেমিক আর সেই "গৃহহীন" লোকটা মিলে বানিয়েছিলেন। এখানে ঠকবাজ আমাদের লোভ নয়, আমাদের ভালো-মানুষিটাকেই পুঁজি করে যেটা বড়ই অস্বস্তিকর।
ভয়ের বাজার
এই পর্বের শেষে আমরা নাড়াচাড়া করব সেই সবচেয়ে আদিম পণ্যটি, যাকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হয় ধোঁকাবাজির চক্কর - ভয়। ভুয়ো জ্যোতিষী প্রতারণায় চিঠি বা মেসেজ এসে জানায়, আপনার জীবনে ভয়ংকর এক বিপদ ঘনিয়ে আসছে, আপনার বা প্রিয়জনের কোনো অমঙ্গল হতে চলেছে এবং তা ঠেকানোর একমাত্র উপায় একটা তাবিজ, একটা রত্ন, কিংবা একগুচ্ছ "ভাগ্যবান সংখ্যা" কিনে নেওয়া। অফিস অফ ফেয়ার ট্রেডিং-এর প্রোফাইল বলছে, এই চিঠিগুলো হাজারে হাজারে ছাপা হলেও প্রতিটাকে সাজানো হয় যেন একান্ত ব্যক্তিগত, যেন প্রেরক আপনাকেই বিশেষভাবে চেনেন, আপনাকেই বেছেছেন।
এখানে অন্য প্রায় সব ফাঁদের উল্টো খেলা চলে। বেশিরভাগ প্রতারণা যেখানে লোভের বড় হাতছানি দেখায়, জ্যোতিষী-ফাঁদ সেখানে চাগিয়ে দেয় দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক। মাঝে মাঝে চিঠির সুর রীতিমতো আক্রমণাত্মক, টাকা না পাঠালে সর্বনাশ অনিবার্য, এমন হুমকির ভঙ্গি। ভয় পেলে মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি চলে, আর "যদি সত্যি হয়?" এই একটুখানি অনিশ্চয়তাই যথেষ্ট। বিশেষত যিনি ইতিমধ্যেই কোনো সংকটে আছেন, অসুস্থতা, পারিবারিক অশান্তি, আর্থিক টানাটানি - তাঁর কাছে সামান্য একটা তাবিজের দাম নেহাতই তুচ্ছ, যদি তাতে বিপদটা কেটে যাওয়ার এক কণা সম্ভাবনাও থাকে। ভয়ের বাজারে ঠকবাজ আসলে কিছুই বিক্রি করে না, সে শুধু একটা আতঙ্ক তৈরি করে, তারপর সেই আতঙ্ক থেকে মুক্তির মিথ্যে চাবি বেচে দেয়।
এই ভয়ের বাজারের সবচেয়ে বিস্তৃত উদাহরণ "মারিয়া দুভাল" নামের এক জ্যোতিষীর চিঠি যা ইতিহাসের অন্যতম বড় ডাক-জালিয়াতি। এক ফরাসি-ইতালীয় জ্যোতিষীর নাম ভাড়া নিয়ে দশকের পর দশক ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হাতে-লেখা-মনে-হওয়া চিঠি পাঠানো হয়েছে, যেখানে প্রাপকের নাম, বয়স, শহর - সব নিখুঁতভাবে বসানো, যেন জ্যোতিষী নিজেই "দিব্যদৃষ্টিতে" জেনেছেন। আসলে এই তথ্য কেনা হত ডেটা-দালালদের কাছ থেকে, বিপন্ন মানুষের তালিকা ধরে। চিঠি প্রতিশ্রুতি দিত লটারি-জয়, রোগমুক্তি, সৌভাগ্য - বিনিময়ে সামান্য চল্লিশ ডলার, একটা তাবিজ বা "শক্তি-পাথর"। কেউ টাকা না পাঠালে চিঠির সুর বদলে যেত হুমকিতে। শিকার বেছে নেওয়া হত সবচেয়ে দুর্বলদের মধ্য থেকে, মানে ধরুণ একাকী, বৃদ্ধ, অসুস্থ, স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত মানুষ, যাঁদের কাছে "কেউ একজন আমার কথা ভাবছে" এই অনুভূতিটুকুই ছিল অমূল্য। মার্কিন ডাক-তদন্তকারীদের হিসেবে, শুধু আমেরিকা আর কানাডাতেই এই একটিমাত্র ফাঁদ চোদ্দো লাখেরও বেশি মানুষের কাছ থেকে তুলে নিয়েছে প্রায় কুড়ি কোটি ডলার - শিকারের সংখ্যায় যা ম্যাডফের কেলেঙ্কারির প্রায় ষাট গুণ। ২০১৬ সালে আমেরিকায় শেষ পর্যন্ত এটি বন্ধ করা হয়।
লজ্জার খাত: ভয় দেখিয়ে আদায়
ভয়ের বাজারেরই এক নবীনতম, নির্লজ্জ শাখা হল সেক্সটরশন বা ব্ল্যাকমেল-ইমেল। এখানে ঠকবাজ দাবি করে, সে আপনার কম্পিউটার হ্যাক করে আপনার গোপন কার্যকলাপের ভিডিও তুলে রেখেছে এবং টাকা না দিলে সেটা আপনার পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের পাঠিয়ে দেবে। ডাভ তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন, এই ইমেলগুলো প্রায় সবসময় সরাসরি বা আড়ালে হুমকি দেয়, ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার একটা সময়সীমা বেঁধে দেয়, আর টাকা চায় বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে কারণ ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেন সহজে ট্র্যাক করা যায় না। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে অনেক সময় চিঠিতে জুড়ে দেওয়া হয় শিকারের সত্যিকারের কোনো তথ্য - ফাঁস-হওয়া কোনো পুরোনো পাসওয়ার্ড বা ফোন নম্বর, যা আসলে আগে কোনো ডেটা-চুরি থেকে জোগাড় করা। এই এক টুকরো সত্যি তথ্যই গোটা মিথ্যেটাকে ভয়ানক বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
এখানে খেলে সেই বেআইনি-সংসর্গের সূত্রেরই এক জাতভাই, লজ্জার সূত্র। ঠকবাজ জানে, অভিযোগটা যদি যথেষ্ট লজ্জাকর হয়, তাহলে শিকার সেটা নিয়ে কারও কাছে যেতে চাইবে না, চুপচাপ টাকা মিটিয়ে দিতে চাইবে। অথচ বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠকবাজের হাতে কোনো ভিডিও থাকেই না; পুরোটাই ফাঁকা হুমকি, লক্ষ লক্ষ ঠিকানায় একসঙ্গে ছোড়া একই টোপ। কিন্তু লজ্জা আর আতঙ্ক এমন এক জোড়া, যা যুক্তিকে মুহূর্তে হারিয়ে দেয়, আর সেই আতঙ্কেই মানুষ টাকা পাঠিয়ে ফেলে।
উর্দির জোর: নকল কর্তৃপক্ষের ফাঁদ
কর্তৃত্বের সূত্র এত শক্তিশালী যে তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটা আস্ত ধোঁকাবাজির মার্কেট - নকল কর্তৃপক্ষের ছদ্মবেশ। রিয়েল হাসলের গবেষকরা এমন অজস্র কনের কথা লিখেছেন, যেখানে ঠকবাজ শুধু "পুলিশ অফিসার" পরিচয় দিয়েই মানুষকে দিয়ে অবিশ্বাস্য কাজ করিয়ে নিয়েছে। এক ক্ষেত্রে নকল অফিসার এক গাড়ি-ক্রেতাকে ভয় দেখিয়ে চেয়ারে বসিয়ে বলে যান যে "নড়বেন না, নইলে গ্রেপ্তার করব"; তারপর নিজেই সেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান, আর ভদ্রলোক কুড়ি মিনিট ধরে সেই চেয়ারেই বসে থাকেন। আরেক ক্ষেত্রে দোকানি "তদন্তের প্রমাণ" হিসেবে গয়না আর নগদ দুটোই তুলে দেন নকল পুলিশের হাতে, বিশ্বাস করে যে পরে ফেরত পাবেন। মানুষ যখন হঠাৎ কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি হয়, তখন তার একটাই তাগিদ যে কোনোরকমে "ঝামেলাটা মিটিয়ে" নিরাপদে বেরিয়ে আসা; আর সেই মরিয়া তাগিদই তাকে যন্ত্রের মতো বাধ্য করে তোলে।
এই দিকটাই আজ ভারতে সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে "ডিজিটাল অ্যারেস্ট" হয়ে। ভুয়ো "সিবিআই" বা "কাস্টমস অফিসার" ভিডিও কলে মানুষকে দিনের পর দিন কার্যত ঘরবন্দি করে রাখে, মিথ্যে মামলার ভয়ে টাকা আদায় করে, অথচ আইনে "ডিজিটাল অ্যারেস্ট" বলে কিছুই নেই। কেন এটা এত কাজ করে? কারণ কর্তৃপক্ষকে অমান্য করার অভ্যাস আমাদের নেই, আর সমাজ চায়ও না আমরা সত্যিকারের পুলিশকে অমান্য করি। ঠকবাজ ঠিক এই সামাজিক আনুগত্যেরই সুযোগ নেয়। এই জন্যই স্তায়ানো-উইলসন সাবধান করেছেন, নকল অফিসারের কাছে ব্যাজ দেখতে চাওয়া বা ব্যাজে লেখা নম্বরে ফোন করাও যথেষ্ট নয় (ঠকবাজ নকল ব্যাজ, নকল নম্বর দুটোই বানাতে পারে); বরং স্বাধীন কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস - যেমন থানার সরকারি নম্বর থেকে যাচাই করাই একমাত্র উপায়।
ফিশিং: ছদ্মবেশের শিল্প
আজকের দিনে অবশ্য এই সবকটাকে ছাপিয়ে গেছে যা তা হল ফিশিং, বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এখানে ঠকবাজ লোভ বা ভয়ের বিরাট গল্প বানানোরও দরকার বোধ করে না, সে শুধু আপনার চেনা কোনো প্রতিষ্ঠানের মুখোশ পরে নেয়। ব্যাংকের হুবহু লোগো, হুবহু ভাষা, হুবহু রঙের এক ইমেল এসে বলে "আপনার অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন ধরা পড়েছে, অবিলম্বে এই লিংকে গিয়ে যাচাই করুন, নইলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে।" লিংকটা নিয়ে যায় ব্যাংকের নিখুঁত নকল এক পাতায়, যেখানে আপনি নিজের হাতে নিজের পাসওয়ার্ড তুলে দেন। এখানে একসঙ্গে কাজ করে ছদ্মবেশের সূত্র (পাতাটা আসল বলে বিশ্বাস হয়), কর্তৃত্বের সূত্র (ব্যাংক বলছে, অতএব করতেই হবে) আর সময়ের সূত্র (এক্ষুনি না করলে সর্বনাশ)।
মজার ব্যাপার, এই খেলার ওস্তাদরা প্রায়ই কোনো প্রযুক্তি নয়, নিছক মানুষের মন নিয়েই কাজ সারেন। সেই কেভিন মিটনিক দেখিয়েছিলেন, শুধু সঠিক পরিভাষা, সঠিক পদ্ধতি আর সঠিক ফোন নম্বর জানা থাকলে টেলিফোনেই ধাপে ধাপে বিশ্বাস অর্জন করে নেওয়া যায়। এটাই ফিশিং-এর মূল শিক্ষা - মানুষ পরিচিত মুখ চিনতে ওস্তাদ, কিন্তু অচেনা কাউকে "যাচাই" করতে বড় কাঁচা। ফোনের ওপারের গলা, ইমেলের ওপরের নাম, ওয়েবসাইটের ঠিকানা, এগুলো আসল কিনা, তা বোঝার ক্ষমতা আমাদের সহজাত নয়। আর ঠিক এই ফাঁকেই ঠকবাজ ঢুকে পড়ে।
এই পর্বের শেষে
তো এই পর্বে ধোঁকাবাজির দুনিয়ার কয়েকটা দিক ঘুরে একটা জিনিস স্পষ্ট হল যে ফাঁদের মোড়ক আলাদা, কিন্তু ভেতরের কারিগরি সেই সাতটি সূত্রেই ঘোরাফেরা করে। রাজকুমারের চিঠিতে লোভ আর লজ্জা, লটারিতে তাড়া আর নিশ্চয়তার প্রলেপ, আশার বাজারে সহানুভূতি আর ভালো-মানুষি, ভালোবাসার ফাঁদে একাকিত্ব আর সাদৃশ্য, ভয়ের বাজারে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা, সেক্সটরশনে লজ্জা আর গোপনীয়তা, নকল উর্দিতে সামাজিক আনুগত্য, ফিশিং-এ ছদ্মবেশ আর তাড়া। ঠকবাজ প্রতিবার শুধু মানুষটার সবচেয়ে নরম জায়গাটা খুঁজে নেয়, তারপর সেখানেই চাপ দেয়।
পরের আর শেষ পর্বে আমরা তাকাব আরও বড় ক্যানভাসে। শুনব সেই স্কটিশ ভদ্রলোকের গল্প, যিনি একটা আস্ত দেশ বেচে দিয়েছিলেন - এমন এক দেশ, যা কোনোদিন ছিলই না। দেখব যন্ত্রের যুগে সেই পুরোনো খেলা কীভাবে নতুন মুখোশ পরেছে, যেখানে ভিডিও কলের ওপারের গোটা ঘরটাই হয়ে উঠতে পারে নকল। আর সবশেষে ঢোকার চেষ্টা করব সেই মনটার ভেতরে, যা এত নিখুঁতভাবে অন্যের মন পড়তে পারে - ঠকবাজের নিজের মনস্তত্ত্বে।
[ক্রমশঃ]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।