জীববিজ্ঞান: মুরগিও সুন্দর মুখ পছন্দ করে
সৌন্দর্য নিয়ে আমি প্রচুর লিখেছি। প্রচলিত কথায় আছে 'সৌন্দর্য দর্শকের চোখে', অর্থাৎ কে সুন্দর, তা নাকি নিতান্তই আমাদের সংস্কৃতি, শিক্ষা আর অভ্যাসের ব্যাপার। বিজ্ঞাপন যাকে সুন্দর বলে শেখায়, আমরা তাকেই সুন্দর ভাবি। ২০০৩ সালের জীববিজ্ঞানের ইগ নোবেল এই ধারণাটায় একটা ছোট্ট অথচ অস্বস্তিকর ধাক্কা দেয়, আর ধাক্কাটা দেয় একদল মুরগি!
গবেষণাটার নাম 'চিকেনস প্রেফার বিউটিফুল হিউম্যানস', অর্থাৎ 'মুরগিরা সুন্দর মানুষ পছন্দ করে'। ছাপা হয়েছিল হিউম্যান নেচার পত্রিকায়, ২০০২ সালে। গবেষক ছিলেন তিনজন, স্তেফানো গিরলান্দা, লিসেলত ইয়ানসন আর ম্যাগনাস এনকুইস্ট। এনকুইস্ট ছিলেন প্রাণী-আচরণবিদ্যার অধ্যাপক, যিনি প্রাণীদের সামাজিক আচরণ ও সংকেত-বিনিময়ের বিবর্তন নিয়ে কাজ করতেন; গিরলান্দা তখন সদ্য পিএইচডি শেষ করেছেন উদ্দীপক-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে; আর ইয়ানসন গবেষণা করছিলেন জীবন্ত প্রাণী দিয়ে যোগাযোগের বিবর্তন-সংক্রান্ত তত্ত্ব যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে। তাহলে বুঝতেই পারছেন এঁরা মুরগি নিয়ে মশকরা করতে বসেননি। এঁদের প্রশ্নটা ছিল গুরুতর, সৌন্দর্যের বোধ কি প্রজাতি-নির্দিষ্ট, নাকি সেটা যে কোনও স্নায়ুতন্ত্রেরই একটা সাধারণ ধর্ম?
প্রশ্নটার তাৎপর্য বুঝতে দুটো প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্বের কথা জানা দরকার। এক পক্ষ বলে, আমরা যাকে আকর্ষণীয় বলি, সে আসলে সঙ্গী হিসেবে ভালো, মানে সুস্থ, সবল, বংশরক্ষায় সক্ষম। অর্থাৎ আমাদের সৌন্দর্যবোধ প্রকৃতির বাছাই করে দেওয়া একটা বিশেষ যন্ত্র, মানুষের মুখ চেনার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি। এই মত সত্যি হলে পছন্দটা প্রজাতি-নির্দিষ্ট হওয়ার কথা, মুরগির পছন্দের সঙ্গে মানুষের পছন্দ মিলবে না। অন্য পক্ষ বলে, আমাদের পছন্দগুলো আসলে স্নায়ুতন্ত্রের সাধারণ কিছু ধর্মের উপজাত ফল। যে কোনও স্নায়ুতন্ত্র যদি একই ধরনের সংকেতের সঙ্গে পরিচিত হয়, তার মধ্যেও একই রকম পক্ষপাত তৈরি হতে পারে। এই মত সত্যি হলে মুরগিরও মানুষের মতোই পছন্দ হওয়া উচিত।
পরীক্ষাটা তাই ছিল এই দুই মতের মধ্যে কোনটা ঠিক সেটা গভীরে গিয়ে দেখার চেষ্টা। পদ্ধতিটা ছিল এইরকম - প্রথমে সত্তরটি মানুষের মুখের ছবি নেওয়া হল। কম্পিউটারে সমস্ত পুরুষ-মুখ মিলিয়ে বানানো হল একটা গড়পড়তা পুরুষ-মুখ, আর সমস্ত নারী-মুখ মিলিয়ে একটা গড়পড়তা নারী-মুখ। তারপর ছটি মুরগিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হল এই ভাবে - মুরগিদের শেখানো হল বিপরীত লিঙ্গের মুখে ঠোকর দিতে, আর নিজের লিঙ্গের মুখে না দিতে। অর্থাৎ মুরগিরা ঠোকর দেবে পুরুষ-মুখে, আর মোরগেরা নারী-মুখে।
প্রশিক্ষণটা চলত পর্দায়। পর্দা কালো, তার মাঝে ভেসে উঠত একটা মুখ। ঠিক মুখে ঠোকর দিলে পর্দা সাদা হয়ে যেত আর পাঁচ সেকেন্ডের জন্য খাবার মিলত। দশ সেকেন্ডেও ঠোকর না পড়লে নতুন একটা মুখ ভেসে উঠত। সপ্তাহান্ত বাদে রোজ প্রশিক্ষণ চলত, একেকটা সেশন চলত মিনিট চল্লিশেক পর্যন্ত। ছটি মুরগিই দিব্যি শিখে ফেলল পার্থক্যটা।
এবার শুরু আসল পরীক্ষা। গবেষকরা কম্পিউটারে ছবিগুলোকে টেনে-বাড়িয়ে একটা ধারাবাহিকতা তৈরি করলেন - একদিকে অতি-পৌরুষদীপ্ত মুখ, অন্যদিকে অতি-নারীসুলভ মুখ, মাঝখানে নানা ধাপ। এই মুখগুলো এবার মুরগিদের সামনে ধরা হল। পাশাপাশি, একই মুখগুলোর আকর্ষণীয়তা বিচার করতে বলা হল একদল বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়াকে।
ফলাফল? মানুষ যেসব মুখকে বেশি আকর্ষণীয় বলে রায় দিল, মুরগিরাও ঠিক সেই মুখগুলোর দিকেই বেশি সাড়া দিল। দুই প্রজাতির রায় মিলে গেল।
এর মানেটা ভাবলে সত্যিই বেশ ঝকমারি ব্যাপার বলে মনে হবে। মুরগির তো ফ্যাশন-ম্যাগাজিন পড়ার সুযোগ নেই, বিজ্ঞাপন দেখার বালাই নেই, সিনেমার নায়ক-নায়িকা চেনার প্রশ্নই ওঠে না। 'কে সুন্দর' এই নিয়ে সমাজের কোনও পাঠ তাদের কেউ দেয়নি। তবু তারা যদি আমাদের সঙ্গে একমত হয়, তাহলে সৌন্দর্যের একটা বড় অংশ হয়তো কেবল সাংস্কৃতিক অভ্যাস নয় - মেরুদণ্ডী প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে গড়া, আর প্রতিসাম্য ও গড়-চেহারার প্রতি তার কেমন সহজাত টান, তারই একটা উপজাত ফল।
তবে সৎ বিশ্লেষণও দরকার, কারণ এই গবেষণার একটা বিকল্প ব্যাখ্যাও আছে আর সেটাও কম মজার নয়। প্রাণী-প্রশিক্ষণে একটা সুপরিচিত ঘটনা আছে, যার নাম 'পিক শিফট'। কোনও প্রাণীকে যদি 'ক' চিনতে শেখানো হয় এবং 'খ' এড়াতে শেখানো হয়, তাহলে সে সবচেয়ে জোরালো সাড়া দেয় 'ক'-এর চেয়েও বাড়াবাড়ি রকমের 'ক'-এর প্রতি। মুরগিদের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হয়েছে - তারা হয়তো 'সুন্দর' মুখ নয়, বরং 'অতিরঞ্জিত' মুখ পছন্দ করেছে। মজার ব্যাপার, গবেষকরা এই সম্ভাবনাটাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁদের যুক্তি ছিল, মানুষের সৌন্দর্যবোধও হয়তো ঠিক এই একই স্নায়বিক পক্ষপাতেরই ফল। মানে আপনি যাকে 'অপরূপ' বলছেন, স্নায়ুতন্ত্র হয়তো তাকে বলছে 'অতিরঞ্জিতভাবে চেনা'।
যাঁরা 'সুন্দর মানেই ভালো, সুন্দর মানেই যোগ্য' গোছের ধারণা নিয়ে ঘর করেন এবং সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, আমরা প্রায় সবাই কমবেশি তাই করি, তাঁদের জন্য এই মুরগিরা একটা অস্বস্তিকর আয়না ধরে। চাকরির ইন্টারভিউ থেকে আদালতের রায়, নির্বাচনের ফল থেকে ক্লাসরুমের নম্বর, সর্বত্র চেহারার প্রভাব নিয়ে অজস্র গবেষণা হয়েছে, আর প্রায় সবগুলোই অস্বস্তিকর ফল দিয়েছে। সেই চেহারার প্রভাব নিয়ে আমি আগেও অন্য প্রবন্ধে লিখেছি। এই মুরগিরা সেই আলোচনায় একটা বাড়তি কাঁটা যোগ করে এই মর্মে যে আমাদের নান্দনিক পছন্দের অনেকটাই হয়তো মুরগির স্তরেই ঠিক হয়ে বসে আছে। চাইলেও আমরা তার পুরো কৃতিত্ব বা পুরো দোষ কোনটাই 'সংস্কৃতি'কে দিতে পারি না!
রসায়ন: ঘুম ভাঙানো ওয়াসাবির অ্যালার্ম
সুশির সঙ্গে যে সবুজ ঝাঁঝালো পেস্টটা দেওয়া হয় সেটার নাম ওয়াসাবি আর সে জিনিস এমনই যে তার এক খোঁচায় নাক-চোখ জ্বালা করে ওঠে! এ অভিজ্ঞতা যাঁর হয়েছে তিনি জানেন। ব্যথাটা ঠিক জিভে লাগে না, লাগে নাকের ভেতর, মাথার একেবারে মাঝখানে, বরফ-খাওয়া মাথাধরার মতো, শুধু ঠান্ডার বদলে ঝাল। ২০১১ সালে রসায়নে ইগ নোবেল পেল সেই ওয়াসাবিরই এক অভাবনীয় প্রয়োগ।
এখানে শুরুটা কিন্তু রসিকতা দিয়ে হয়নি, হয়েছিল একটা নিতান্ত কঠিন প্রশ্ন দিয়ে। ২০০০ সালে শিগা ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক মাকোতো ইমাই একটা সমস্যা নিয়ে ভাবতে বসেন যে মানুষ কানে শোনেন না, আগুন লাগলে তাঁকে জাগানো যাবে কী উপায়ে?
সমস্যাটা যত সহজ শোনায়, তত সহজ নয়। প্রচলিত অগ্নি-সংকেত শব্দ করে সাবধান করে, যা কানে-না-শোনা মানুষের কোনও কাজেই আসে না। বিকল্প হিসেবে চালু আছে দুটো ব্যবস্থা, আর দুটোরই সমস্যা আছে। এক, ঝলকানি আলো - কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের চোখ তো বন্ধ, তায় অনেকে মাথা পর্যন্ত চাদর টেনে ঘুমোন। দুই, কম্পন-যন্ত্র - কিন্তু সেটা কাজ করতে হলে যন্ত্রটা সবসময় গায়ে বা বিছানায় লাগিয়ে রাখতে হয়। ইমাইয়ের দলের ভাবনা ছিল সম্পূর্ণ অন্য, চোখ বন্ধ থাকে, কান কাজ করে না, কিন্তু নাক? নাক তো সারা রাত খোলা।
এখানেই আসে গবেষণাটার আসল বৈজ্ঞানিক ব্যাপারটা, যেটা না বুঝলে পুরো ব্যাপারটা নেহাতই ঠাট্টা মনে হবে। ঘ্রাণেন্দ্রিয় ঘুমের সময় কার্যত ঝিমিয়ে পড়ে, অর্থাৎ নিছক 'গন্ধ' দিয়ে মানুষকে জাগানো কঠিন। আপনার রান্নাঘরে ভাত পুড়ে গেলে গন্ধে আপনার ঘুম ভাঙবে, এমন ভরসা না করাই ভালো! কিন্তু ওয়াসাবির ঝাঁঝালো উপাদান, অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট, স্রেফ গন্ধ নয় - এটা নাকের ভেতরের স্নায়ুতে সরাসরি একটা জ্বালা ধরায়। এই জ্বালার অনুভূতি, অর্থাৎ দেহস্পর্শজনিত সংবেদন, ঘুমের ভেতরেও সজাগ থাকে। ইমাইয়ের ভাষায়, ঠিক সেই কারণেই বাতাসে মেশানো ওয়াসাবি ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে। তাই সেভাবে যদি ভাবেন তাহলে গোটা ব্যাপারটার নিচে আছে নিরেট স্নায়ুবিজ্ঞান।
এবার শুরু হল গন্ধ বাছাইয়ের পালা। দলটি প্রায় একশোটা আলাদা গন্ধ পরখ করে দেখেছিল। তালিকায় ছিল পচা ডিমের গন্ধও! তো সেই শুনে আমি ভাবছিলাম, ভাই, যে চোদ্দোজন স্বেচ্ছাসেবক এই পরীক্ষায় ঘুমোতে রাজি হয়েছিলেন, তাঁদের ধৈর্যের জন্য আলাদা একটা পুরস্কার দিয়ে দিস বাপু! শেষমেশ সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে জিতে গেল ওয়াসাবি।
পরীক্ষাটা হয়েছিল এইভাবে: স্বেচ্ছাসেবকদের গভীর ঘুমে পড়তে দেওয়া হত, তারপর ঘরে ছাড়া হত ওয়াসাবির নির্যাস মেশানো বাতাস। চোদ্দোজনের মধ্যে তেরোজনই দু-মিনিটের মধ্যে ধড়ফড় করে জেগে উঠেছিলেন। যিনি ওঠেননি, তাঁর ব্যর্থতার কারণটাও নিতান্ত ঘরোয়া — সর্দিতে নাক বন্ধ ছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: এই চোদ্দোজনের মধ্যে চারজন ছিলেন কানে-না-শোনা মানুষ, এবং তাঁরা প্রত্যেকেই আধ মিনিটের মধ্যে জেগে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ যাঁদের জন্য যন্ত্রটা বানানো, তাঁদের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে।
গবেষকদের হিসেব করে বার করতে হয়েছিল একটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য যে বাতাসে ওয়াসাবির ঘনত্ব ঠিক কতটা হবে। কম হলে ঘুম ভাঙবে না আর বেশি হলে মানুষ জেগে উঠে হাঁচি-কাশি-চোখের জলে এমন কাবু হয়ে পড়বেন যে আগুন থেকে পালানোর বদলে সেখানেই হাবুডুবু খাবেন। তাঁরা এমন একটা মাত্রা বার করলেন যা জাগানোর পক্ষে যথেষ্ট, অথচ ক্ষতিকর মাত্রার অনেক নিচে।
যন্ত্রটার পেটেন্ট আবেদন জমা পড়ে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, টোকিওর 'সীমস ইনকর্পোরেটেড' আর কোবের 'এয়ার ওয়াটার সেফটি সার্ভিস' যৌথভাবে। পেটেন্টের গালভরা নামটা শুনুন শুনে রাখুন, 'গন্ধ উৎপাদক সতর্কযন্ত্র এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি জানানোর পদ্ধতি'। বাজারেও এসেছিল, ২০০৯ সাল থেকেই। কিন্তু একটা যন্ত্রের দাম ছিল প্রায় ছশো ডলার, ফলে ঘরে ঘরে সেটা বসানো গেল না। দলটি সস্তা সংস্করণ আনার কথা ভেবেছিল, কিন্তু তার পরে কেস কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আমি জানি না।
পুরস্কার নিতে গিয়ে হার্ভার্ডের প্রায় বারোশো দর্শকের সামনে ইমাই নাকি বলেছিলেন যে তাঁরা এই যন্ত্রটি বানিয়েছেন কানে-না-শোনা মানুষদের বিপদের সময় জাগানোর জন্য, এবং এটি একটি 'প্রাণরক্ষাকারী' যন্ত্র। তারপর তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন সেই স্বেচ্ছাসেবকদের, যাঁরা ঘুমের মধ্যে ওই ঝাঁঝে দমবন্ধ হয়ে কষ্ট পেয়েছেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে কৃতজ্ঞতা-জ্ঞাপনের এমন সরস দৃষ্টান্ত বিরল।
এই গল্পটা আমার কাছে ইগ নোবেলের কনসেপ্টের এক আদর্শ নমুনা। বাইরের খোলসটা নিছক মজার, 'ওয়াসাবি দিয়ে ঘুম ভাঙানোর যন্ত্র' শুনলেই হাসি পায়, মাথায় ভেসে ওঠে ভোর পাঁচটায় নাকে এক ঝাপটা সুশির ঝাঁঝ পেয়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠার ছবি। কিন্তু ভেতরে আছে একটা গভীর মানবিক প্রশ্ন - যে মানুষটি শব্দ শুনতে পান না, আগুন লাগলে তাঁর প্রাণ বাঁচবে কী উপায়ে? হাসির মোড়কে মোড়া এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই জন্ম নিয়েছে একটা সত্যিকারের সমাধান।
সাহিত্য: গড়িমসির তত্ত্ব, অথবা কাজ ফেলে কাজ করা
এই বিভাগের গল্পটা পড়লে অনেকেরই চেনা চেনা মনে হবে, কারণ আমরা অনেকেই কম বেশী এর শিকার। ২০১১ সালে সাহিত্যে ইগ নোবেল পেলেন স্ট্যানফোর্ডের দর্শনের অধ্যাপক জন পেরি তাঁর 'স্ট্রাকচার্ড প্রোক্রাস্টিনেশন' বা 'সুসংগঠিত গড়িমসি' তত্ত্বের জন্য।
পেরি কোনও স্বঘোষিত আত্মোন্নয়ন-গুরু নন বরং তিনি ভাষার দর্শন, মনের দর্শন আর ব্যক্তি-পরিচয়ের দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করা একজন প্রথম সারির চিন্তাবিদ। অন্তত আটটি গবেষণা-গ্রন্থ আর অজস্র প্রবন্ধের লেখক, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের সদস্য, একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারের প্রাপক। ২০০৪ সাল থেকে সহকর্মী কেন টেলরের সঙ্গে চালাতেন 'ফিলজফি টক' নামের একটা রেডিও অনুষ্ঠান, যার বিজ্ঞাপনী লাইনটাও চমৎকার, 'এখানে সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়... শুধু আপনার বুদ্ধিমত্তা ছাড়া।'
তত্ত্বটার জন্মমুহূর্তটা ১৯৯৫ সালের একটা দিন, সেই মুহূর্তের বর্ণনা পেরির নিজের মুখেই সবচেয়ে ভালো শোনায়। তিনি সেদিন নিজের গড়িমসির স্বভাব নিয়ে গভীর অবসাদে ভুগছিলেন। এবং ঠিক তখনই তাঁর মাথায় একটা অদ্ভুত স্ববিরোধ ধরা পড়ল - মজার ব্যাপার হল, স্ট্যানফোর্ডে সবাই তো তাঁকে এমন একজন মানুষ বলেই জানে, যিনি প্রচুর কাজ করে ফেলেন। তাহলে এটা কী করে সম্ভব?
উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে তিনি বুঝলেন, গড়িমসি করার সময় তিনি বসে থাকেন না। যে জরুরি কাজটা করার কথা, সেটা এড়াতে গিয়ে তিনি অন্য অজস্র কাজ করে ফেলেন এবং তার ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই বেশ উৎপাদনশীল হয়ে ওঠেন। এই আবিষ্কারের পর তিনি যা করলেন, সেটাই এই গল্পের চমকপ্রদ অংশ, যে কাজটা তখন করার কথা ছিল, সেটা ফেলে রেখে তিনি বসে গেলেন এই স্ববিরোধ নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখতে। অর্থাৎ তত্ত্বটার জন্মই হয়েছিল তত্ত্বটাকে প্রয়োগ করতে গিয়ে!
প্রবন্ধটা ছাপা হয় ১৯৯৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ক্রনিকল অফ হায়ার এডুকেশন কাগজে, নাম 'কীভাবে গড়িমসি করেও কাজ এগিয়ে নেবেন'। পরে এটি 'স্ট্রাকচার্ড প্রোক্রাস্টিনেশন' নামেই বেশি পরিচিত হয়। তত্ত্বটার মূল কথাটা এক বাক্যে এইরকম, উঁচুদরের সাফল্য পেতে হলে সবসময় এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে লেগে থাকুন, যেটা করাটা আসলে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা কাজ এড়ানোর উপায়। পেরির ভাষায়, গড়িমসিওয়ালা মানুষকে দিয়ে কঠিন, সময়সাপেক্ষ ও জরুরি কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, যতক্ষণ সেই কাজগুলো আরও বেশি জরুরি কিছু না-করার একটা রাস্তা হয়ে থাকে।
এবার লক্ষ করুন, তাঁর পরামর্শটা প্রচলিত জ্ঞানের ঠিক উল্টো। ধারণত গড়িমসির দাওয়াই হিসেবে বলা হয়, দায়িত্ব কমাও, তালিকা ছোট করো, একটার পর একটা কাজে মন দাও। পেরি বলছেন উল্টোটা, তালিকাটা বরং কৌশলে ভরিয়ে তোলো। তালিকার একেবারে মাথায় এমন একটা কাজ বসিয়ে রাখো যা দেখতে অত্যন্ত জরুরি (এবং যা এড়ানোর আকাঙ্ক্ষা প্রবল), আর তার নিচে সাজিয়ে রাখো এমন সব কাজ, যেগুলো আসলে করা দরকার। তারপর দেখো, শীর্ষের দানবটাকে এড়াতে গিয়ে তুমি বাকি তালিকাটা দিব্যি শেষ করে ফেলেছ।
পেরির সবচেয়ে সহানুভূতিশীল কথাটা হল, গড়িমসি মানে অকর্মণ্যতা নয়, এবং এটা মানুষের সবচেয়ে বড় দোষও নয়। তাঁর মতে, গড়িমসিওয়ালা মানুষরা অলস নন, মানসিক রোগীও নন। তাঁদের কাজের ধরনটা কেবল আদর্শ নয়, এই যা! আর তাঁরা সম্ভবত যথেষ্ট ভদ্র মানুষ, যাঁরা অনেক কাজই করে ফেলছেন। এই বাক্যটি কি আপনার অপরাধবোধ কমাতে সাহায্য করতে পারে :)
প্রবন্ধটা ইন্টারনেটে প্রকাশের পর যা ঘটল, তা পেরিকে হতভম্ব করে দিয়েছিল। মেল আসতে শুরু করল দলে দলে। তিনি পরে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে দর্শনে তিনি যে সব গভীর, তাৎপর্যপূর্ণ কাজ করেছেন (অন্তত তাঁর নিজের বিবেচনায়), তার কোনওটাই এই সামান্য প্রবন্ধটার মতো প্রভাব ফেলতে পারেনি। আজও প্রতি সপ্তাহে দু-একটা করে অপরাধবোধে ভরা ইমেল তাঁর কাছে আসে, স্বজাতীয় গড়িমসিওয়ালাদের কাছ থেকে।
এরপর তিনি আরও কয়েকটা সহযোগী প্রবন্ধ লিখলেন, 'অ্যাকাডেমিক ট্রাফ' বা বিদ্যায়তনিক জাবনা-পাত্র, আর 'গড়িমসি ও নিখুঁততাবাদ' জাতীয় শিরোনামে। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে বেরোল বই 'দ্য আর্ট অফ প্রোক্রাস্টিনেশন, গড়িমসি, ঢিলেমি ও পিছিয়ে দেওয়ার কার্যকর নির্দেশিকা'। বিরানব্বই পাতার ছোট মাপের বই এবং সেটি বেরিয়েছিল মূল প্রবন্ধের পনেরো বছরেরও পরে। তত্ত্বের সঙ্গে জীবনের এমন নিখুঁত সমাপতন আর হয় না!
কিন্তু গল্পের সেরা রসিকতাটা তোলা ছিল পুরস্কারের দিনের জন্য। প্রথমত, পুরস্কারটাই এসেছিল প্রবন্ধ প্রকাশের পনেরো বছর পরে। পেরি ক্রনিকলকে বলেছিলেন, এই দেরিটা তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বেশ মানানসই হয়েছে। দ্বিতীয়ত পুরস্কার নিতে তিনি নিজে যেতে পারেননি, কারণ সেই সময় তিনি জার্মানিতে ছিলেন। নিজের বদলে তিনি পাঠিয়েছিলেন তাঁর সম্পাদক ডেবোরা উইলকসকে। গড়িমসির তত্ত্বের জন্য পুরস্কার, যা এল পনেরো বছর দেরিতে, আর তা নিতে তত্ত্বকর্তা নিজে হাজির হতে পারলেন না। এর চেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ ঘটনা কল্পনা করাও কঠিন!
সম্ভাব্যতা: টস করলে কি সত্যিই ফিফটি-ফিফটি?
ক্রিকেট মাঠ হোক বা দুই বন্ধুর তর্কের নিষ্পত্তি কোথায় ফাইন্যালি বেড়াতে যাওয়া হবে সেই নিয়ে, 'চল, টস করে নিই' বলে আমরা কয়েনটা শূন্যে ছুঁড়ি একটা গভীর বিশ্বাস নিয়ে - হেড আর টেল পড়ার সম্ভাবনা ঠিক সমান, পঞ্চাশ-পঞ্চাশ। পাঠ্যবইয়ে সম্ভাব্যতা পড়াতে গিয়ে সবার আগে এই উদাহরণটাই দেওয়া হয়। কয়েন টস আমাদের কাছে নিরপেক্ষতার প্রতীক বলতে গেলে। ২০২৪ সালের সম্ভাব্যতার ইগ নোবেল এই নিরপেক্ষতার বিশ্বাসেই একটুখানি চিড় ধরিয়ে দিয়েছে।
গল্পটা শুরু করতে হবে একজন মানুষকে দিয়ে, যাঁর জীবনী পড়লে মনে হয় কেউ বানিয়ে লিখেছে। পার্সি ডায়াকোনিস- এর জন্ম ১৯৪৫ সালে, নিউ ইয়র্কে, গ্রিক বংশোদ্ভূত পরিবারে। পাঁচ বছর বয়সে নিজে নিজে তাসের ম্যাজিক শিখতে শুরু করেন, আর কৈশোরটা কাটে টাইমস স্কোয়ারের ম্যাজিকের দোকানগুলোয় ঘুরঘুর করে, যেখানে হাতসাফাইয়ের ওস্তাদরা নিয়মিত জড়ো হয়ে একে অন্যকে কেরামতি দেখাতেন।
চোদ্দো বছর বয়সে তাঁর জীবন বদলে যায়। ডাই ভার্নন নামে গত শতকের অন্যতম প্রভাবশালী তাস-জাদুকর এই ছেলেটির হাতসাফাই দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের সঙ্গে সফরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। ডায়াকোনিস স্কুল ছেড়ে, বাবা-মাকে কিছু না জানিয়ে, বেরিয়ে পড়েন। বহু বছর পরে স্ট্যানফোর্ডের ঘরে বসে সেই মুহূর্তটার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন অবিস্মরণীয় সরলতায় - তিনি একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছিলেন, তাতে ছিল কয়েক প্যাকেট তাস আর কিছু মোজা।
এরপর কয়েক বছর তিনি ভার্ননের সহকারী ও ছাত্র হিসেবে ঘুরে বেড়ান, আর নিউ ইয়র্ক থেকে দক্ষিণ আমেরিকাগামী জাহাজে তাস খেলে নিজের খরচ চালান। মার্টিন গার্ডনারের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন রীতিমতো পেশাদার তাস-কারিগর, আর কেউ তাঁকে সন্দেহও করত না কারণ তিনি তখন নিতান্তই কিশোর।
তারপর এল একটা মোড়। ডায়াকোনিস একটা বই হাতে পান, উইলিয়াম ফেলারের দু-খণ্ডের সম্ভাব্যতা-তত্ত্বের সেই বিখ্যাত গ্রন্থ। তিনি বইটা বুঝতে চান, কিন্তু পারেন না। শুধু এই কারণেই, চব্বিশ বছর বয়সে, তিনি আবার স্কুল-কলেজে ফিরে যান। ১৯৭১ সালে সিটি কলেজ অফ নিউ ইয়র্ক থেকে স্নাতক, ১৯৭৪ সালে হার্ভার্ড থেকে গাণিতিক পরিসংখ্যানে পিএইচডি। আজ তিনি স্ট্যানফোর্ডের পরিসংখ্যান ও গণিতের অধ্যাপক, র্যান্ডাম ওয়াক থেকে তাস-শাফলিং পর্যন্ত এলোমেলোপনার গণিতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান নাম। তাসের প্যাকেট সাতবার রিফল শাফল করলে তবেই সেটা যথেষ্ট এলোমেলো হয় - এই বিখ্যাত ফলাফলটিও তাঁরই দেওয়া। তিনি ঠাট্টা করে বলেন, গণিতজ্ঞ হিসেবে তিনি যতটা ভালো, জাদুকর হিসেবে তার চেয়ে ঢের বেশি ভালো!
যে মানুষ ছোটবেলায় তাস দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছেন, তিনিই বড় হয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দিলেন এই প্রশ্নের পিছনে যে 'সত্যিকারের এলোমেলোপনা জিনিসটা আসলে কী?' তাঁর একটা কথা এই প্রসঙ্গে বারবার উদ্ধৃত হয় - একটা কয়েনকে যদি ঠিক একই জায়গায় ঠিক একই বল দিয়ে আঘাত করেন, সে সবসময় একই কাজ করবে। অর্থাৎ কয়েন টস মোটেই দৈব নয়, ওটা নিছক পদার্থবিদ্যা। তিনি দেখিয়েছিলেন, স্প্রিং লাগানো একটা যন্ত্র দিয়ে কয়েন ছুঁড়লে হেড-উপর করে ছোঁড়া কয়েনকে একশো শতাংশ ক্ষেত্রেই হেড ফেলা সম্ভব। আমরা যেটাকে দৈব বলি, সেটা আসলে আমাদের অজ্ঞতা।
২০০৭ সালে ডায়াকোনিস সুজান হোমস আর রিচার্ড মন্টগোমেরির সঙ্গে মিলে একটা গবেষণাপত্র লেখেন, 'ডায়নামিক্যাল বায়াস ইন দ্য কয়েন টস', ছাপা হয় সিয়াম রিভিউ পত্রিকায়। (প্রসঙ্গত, সহলেখক সুজান হোমস স্ট্যানফোর্ডেরই পরিসংখ্যানের অধ্যাপক এবং ডায়াকোনিসের স্ত্রী, কয়েন নিয়ে গবেষণায় স্বামী-স্ত্রীর যুগলবন্দি, ভাবা যায়!)
তাঁদের যুক্তিটা তীক্ষ্ণ - এতদিন যত পরীক্ষা হয়েছে, সব যাচাই করেছে একটাই জিনিস যে কয়েন হেড পড়ার সম্ভাবনা টেল পড়ার সমান কিনা। কিন্তু কেউ যাচাই করেনি অন্য একটা প্রশ্ন যে কয়েনটা যে পিঠ উপরে করে ছোঁড়া হয়েছিল, সেই পিঠেই পড়ার সম্ভাবনা কত? তাঁদের হিসেব বলল, মানুষ যখন হাতে কয়েন ছোঁড়ে, তখন নিখুঁতভাবে ছুঁড়তে পারে না, ঘূর্ণনের অক্ষটা সামান্য টলমল করে, একটা মৃদু 'পাক' বা প্রিসেশন তৈরি হয়। আর এই টলমলে ভাবের ফলে কয়েনটা শূন্যে একটু বেশি সময় কাটায় শুরুর পিঠটা উপরে রেখে। ফলে সেই পিঠেই পড়ার সম্ভাবনা সামান্য বেশি, তাঁদের হিসেবে প্রায় একান্ন শতাংশ।
তত্ত্ব তো হল। কিন্তু এত সূক্ষ্ম একটা পক্ষপাত প্রমাণ করতে গেলে কী পরিমাণ তথ্য লাগে? এইখানেই আসে ২০২৪ সালের ইগ নোবেল। আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতিবিদ্যার গবেষক ফ্রান্তিশেক বার্তোশ এবং তাঁর সহযোগীরা মিলে সে পরীক্ষা করলেন। আটচল্লিশজন মানুষ হাতে হাতে কয়েন ছুঁড়লেন। একবার নয়, হাজারবার নয়, মোট তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার সাতশো সাতান্ন বার। প্রতিবার তাঁরা প্রথমে লিখে রাখতেন কোন পিঠ উপরে আছে, তারপর ছুঁড়তেন, হাতে লুফে নিতেন, আর ফলাফল লিখে রাখতেন। যাতে কোনও বিশেষ কয়েনের নকশা বা ওজনের প্রভাব না পড়ে, তার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ছেচল্লিশটি ভিন্ন দেশের মুদ্রা।
গোটা গবেষণাটা ছিল আগাম বলে দেওয়া, মানে কী খুঁজবেন আর কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন তা তাঁরা তথ্য সংগ্রহের আগেই ঘোষণা করে রেখেছিলেন। বিজ্ঞানে সততার এই রীতিটা আজকাল যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। আর সমস্ত তথ্য, বিশ্লেষণের কোড, এমনকি ভিডিয়ো রেকর্ডিং পর্যন্ত তাঁরা খোলাখুলি প্রকাশ করে দিয়েছেন, যাতে যে কেউ যাচাই করতে পারেন।
ফলাফল ডায়াকোনিসদের ভবিষ্যদ্বাণীকেই সমর্থন করল। কয়েন যে পিঠ উপরে করে শুরু করেছিল, সেই পিঠেই পড়ার সম্ভাবনা দাঁড়াল ০.৫০৮ অর্থাৎ ৫০.৮ শতাংশ। অথচ, এবং এটাই মজার, হেড বনাম টেলের হিসেবে কোনও পক্ষপাত পাওয়া গেল না; সেটা নিখুঁতভাবে ০.৫০০। মানে দাঁড়ালো গিয়ে কয়েন হেড-টেলের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, কিন্তু 'যে পিঠে শুরু, সেই পিঠে শেষ' এই ব্যাপারে সে সামান্য পক্ষপাতদুষ্ট। যদি আপনি না দেখেন কোন পিঠ উপরে ছিল, টস পুরোপুরি ন্যায্য; কিন্তু যদি দেখেন, আপনি সামান্য এগিয়ে থাকলেন :)
আরও দুটো ইন্টারেষ্টিং পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করা যাক। এক, মানুষে মানুষে পক্ষপাতের তারতম্য যথেষ্ট, কারও হাতে টলমলে ভাব বেশি, কারও কম। দুই, যাঁরা যত বেশি কয়েন ছুঁড়েছেন, তাঁদের পক্ষপাত তত কমে এসেছে। মানে অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাত স্থির হয়, ছোঁড়াটা কম টলমলে হয়ে যায়। কয়েন ছোঁড়াও একটা দক্ষতা, যা রেওয়াজে উন্নত হয়!
তবে এই গবেষণাপত্রের হালকা মিষ্টি রসিকতাটা লুকিয়ে আছে লেখকদের নামের ক্রমে। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে কার নাম আগে বসবে, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ রাজনীতি আর মনোমালিন্য হয়, তা যাঁরা এই জগতে আছেন তাঁরা জানেন। এই দলটি সেই সমস্যার একটি নিখুঁত, অকাট্য সমাধান বার করেছিল, কে কতগুলো কয়েন ছুঁড়েছেন, সেই অনুযায়ী নাম বসেছে। যিনি সবচেয়ে বেশি খেটেছেন, তাঁর নাম সবার আগে। গবেষণা যে শেষ পর্যন্ত কতটা নিরেট, একঘেয়ে পরিশ্রমের ব্যাপার, তার এর চেয়ে সরস স্বীকারোক্তি আর হয় না!
তাহলে পুরো ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো যা আমরা নিজেরা একটু হলেও ব্যবহার করতে পারি? পরের বার টসের সময় যদি দেখে ফেলেন প্রতিপক্ষ কোন পিঠ উপরে করে কয়েনটা ধরেছে, তাহলে সেই পিঠটাই বেছে নিন, তাহলে অতি সামান্য, কিন্তু একটা সুবিধা আপনি পাবেন। আর যদি হেরে যান, অন্তত এই সান্ত্বনাটুকু রইল যে খেলাটা শুরু থেকেই পুরোপুরি সৎ ছিল না।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।