

বাংলার পশ্চিম পারে পুরুলিয়ার বাগমুন্ডিতে ছোট্ট গ্রাম চড়িদা। ছোট হলেও গ্রামটি জগদ্বিখ্যাত, কারণ এটি হল ছৌ শিল্পীদের গ্রাম। এখানে ছৌনাচের মুখোশ তৈরি হয়। আমি প্রথম চড়িদায় আসি খুব সম্ভবত ২০০৩ সালে। তখন পুরো গ্রামটাই ছিল অতি নির্জন - পাহাড়ি পথে কিছু কাঁচা আর আধ পাকা বাড়ি। সেবারে আমি বড় এক কার্টন মুখোশ কিনে বাড়ি ফিরেছিলাম, সকলকে উপহার দেব বলে। মুখোশের দাম এতটাই কম ছিল যে তখন মাইনে কম হলেও, এক কার্টন মুখোশ কেনা গায়ে লাগেনি। আমি আর আমার এক ছাত্র দুজনে মিলে জোড়া রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার কিনেছিলাম, ছাত্র একটা আর আমি একটা ভাগ করে নেব বলে। পেপার পাল্পের সেই বাঘ আজও আমার শো কেসে রয়েছে। সেবার অবশ্য চড়িদা আমরা গিয়েছিলাম এক বেলার জন্য, সার্ভে হয়েছিল পুরুলিয়া শহরের কাছে একটি গ্রামে। এর পরেও ওখানে গেছি, তবে ঐ পথে ছুঁয়ে আসা যাকে বলে। বছর তিনেক আগে পুরোদস্তুর চড়িদায় সার্ভে করার উদ্দেশ্যে ভূগোল অনার্সের ফিফ্থ সেমেস্টারের আটত্রিশ জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে আমরা পাড়ি দিলাম সোজা বাগমুন্ডি, সময়টা শরৎকাল, দুর্গাপুজো শুরু হতে কিছুদিন বাকি। হাওড়া স্টেশন থেকে রাত বারোটা পাঁচে ট্রেন - আদ্রা চক্রধরপুর এক্সপ্রেস। রাত পেরোলে সকাল সাতটা নাগাদ নামতে হবে পুরুলিয়া সদর মহকুমা বরাভূম স্টেশনে। বরাভূম থেকে ছোট ছোট পাঁচটি জিপ ধরণের গাড়িতে আমরা পৌঁছে গেলাম বাগমুন্ডি বাজারের এক হোটেলে। কলেজের ছেলেমেয়েদের অনেকেই এই প্রথম ট্রেনে রাত কাটালো। বাবা মাকে ছেড়ে বাইরে নিজেকে সামলে চলা বেশিরভাগেরই প্রথম।
উঁচু নীচু রাস্তা, মালভূমির চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আমাদের গাড়িগুলো চলেছে সার বেঁধে। মালভূমির এ অংশটা আসলে ছোটনাগপুর মালভূমির এক অংশ - রাঁচি মালভূমির পুব- সীমানা। অযোধ্যা পাহাড়ের নানা শ্রেণী চলেছে আমাদের সঙ্গে। ভারতের পূর্বঘাট পর্বতমালার এক অংশ দলমা পাহাড়। সেই দলমা পাহাড়ের পুবদিকে বেরিয়ে পড়া একটা শাখাই হল অযোধ্যা পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ জঙ্গল আর মাথায় মেঘের প্রাসাদ। আকাশের নীল, রোদের হলুদ, বনের সবুজ আর মেঘের ছাই ছাই সাদা ধো়ঁয়া রং মিলেমিশে এক অদ্ভুত দৃশ্যপট গাড়ির কাচের জানলার দুপাশে। এবছর লেট মনসুন হওয়ার কারণে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। কিন্তু অনেকেই ভরসা দিয়েছিল যে রুখুসুখু পুরুলিয়া বর্ষায় মোহিনী হয়। এখন সত্যিসত্যি দেখছি ভুল তারা বলেনি। গাড়ি চলেছে একে একে গোর্গাবুরু, মাঠা পাহাড়, ময়ূর পাহাড়, পাখি পাহাড়ের পাশ দিয়ে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম - নামগুলোর শেষে জোড়া আছে ডিহি। আর ফাঁকে ফাঁকে সাইনবোর্ড - সেখানে সতর্কতার বার্তা লেখা - কারণ দলমার দামালরা সে পথে যাতায়াত করেন।
যাই হোক হোটেলে পৌঁছে দেখলাম জানলা দিয়ে পাহাড়ের শ্রেণি দূরে দেখা গেলেও পুরুলিয়ার নানা পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্পের কল্যাণে শহুরে মেদ বেড়েছে বাগমুন্ডির। চারপাশে বড় বড় বাড়ি, হোটেল, আধুনিক গাড়ির সারি নিয়ে বাগমুন্ডি খুব না হলেও মাঝারি ঝকমকে বলা যায়। হোটেলের গায়েই বিশাল সরকারি জায়গা, সেখানে প্রতি বুধ ও শনিবারে হাট বসে। হাটও দেখেছি। এমাথা ওমাথা ঘুরতে বেশ সময় লাগে। কাঁচা আনাজ, মশলাপাতি, গাছের বীজ, সার, বাবুই ঘাসের দড়ি, মই, ঝাঁটা, ঝুড়ি, রেডিমেড পোষাক, শাড়ি গামছা, বাসন কোসন, খেলনাপাতি, সাজগোজের হরেক জিনিস, সঙ্গে পাহাড়ি বীজ, মিলেট, ঝিরিঝিরি করে কাটা বাঁশের কোঁড়, মহুয়া ফল - কী নেই? আর আছে পুরুষদের সঙ্গে বিক্রেতা মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। সব মিলিয়ে এই হাটে জীবনের রং যেন রামধনু। যেদিন আমরা হাটে গেলাম, তার তিনদিন পরে ছিল জিহুড় বা নবান্ন উৎসব। সেইজন্য হাটে বাঁশের ঝুড়ি আর বাবুই ঘাসের ঝাঁটা বিক্রি হচ্ছিল। স্থানীয় মানুষের মুখে ঐ ঘাসের নাম কড়াং ঘাস। জিজ্ঞাসা করে জানলাম আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির দিন নতুন ধান ঘরে আনার উপলক্ষে জিহুড় উৎসব পালিত হয়ে থাকে। সবার প্রথমে খামারের ঘাস কোদাল দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করে জলে ভিজিয়ে মই দিয়ে সমতল করা হয়। উৎসবের এই অংশকে খামার বাঁধা বলে। এরপর গরুর শিঙে সর্ষের তেল মালিশ করা হয়। গৃহকর্তা স্নান করে ভেজা কাপড়ে খামারের মধ্যে একটি জল ভর্তি মাটির ভাঁড়, একটি তামার পয়সা, একটি নতুন ঝাঁটা ও এক মুঠো ডাল রেখে দেন। পরে নবান্ন মুখে দিয়ে উৎসব সম্পন্ন হয়। উৎসব, পরব, মেলা ইত্যাদি পুরুলিয়ার সংস্কৃতির অঙ্গ। শুনলাম চড়িদা গ্রামেই দুটো মেলা হয় - একটা বাংলা নাটক ডট কম থেকে ছৌ মুখোশের মেলা, সেটা ডিসেম্বরে হয়। আর একটা হল ছৌ সম্রাট পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়ার স্মৃতি মেলা।
আমাদের হোটেলটি বেশ বড়সড়। কাচের জানলা, অ্যাটাচড ওয়াশরুমে গিজার, শাওয়ার, বেসিন, তোয়ালে। ঘরে কাবার্ড, আয়না, এসি, বেডসাইড টেবিল, দুটো চেয়ার - ব্যবস্থা ভালোই। করিডোরের দুমাথায় দুটি লম্বা বারান্দা। সকাল সওয়া সাতটায় রেলগাড়ি থেকে নেমেছি আমরা। মালপত্র গুছিয়ে জিপগাড়ি ছাড়তে পৌনে আটটা, হোটেলে পৌঁছতে সকাল নটা বাজল। নটাতেই চেক ইন টাইম। বুঝলাম রেলের সময় মিলিয়ে চেক ইন চেক আউট ঠিক করা আছে। গরম গরম লুচি আলুর তরকারি, মিষ্টি দিয়ে জলযোগ সেরে কাজ শুরু করার ছক কষে নিলাম আমরা। তখুনি না বেরিয়ে ঠিক হল দুপুরের খাওয়ার পর প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হবে। কারণ রাতে রেলগাড়িতে কারোরই ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। এখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। ফ্রেশ হয়ে, স্নান সেরে দুপুরে ভুরিভোজ হল - ভাত, ডাল, সব্জি, মাছের কালিয়া, চাটনি, পাঁপড়, খাবারের মান ভালোই। আজকের খাবার হোটেল থেকে নেওয়া হল। রাত থেকে আমাদের টুর অপারেটরের কিচেনেই রান্না হবে।
চড়িদা গ্রামটি হোটেল থেকে বেশি দূরে নয় - আন্দাজ তিন কিলোমিটার দূরে হবে। রাস্তার ধারে ধারে ছৌ মুখোশ বিক্রির দোকান। পথে কয়েকটি বিদ্যালয়ও চোখে পড়ল। কুড়ি বছর আগেও এ গ্রামে এসেছিলাম, তখনকার থেকে এখনকার দৃশ্যপট আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখন এমন রাস্তা ছিলনা। হেঁটে উঠতে হয়েছিল। ইতিউতি বাড়িঘরের মধ্যে দোকানঘর ছিল অল্প। এখন পাকা রাস্তায় হু হু করে গাড়ি করেই এসে পড়লাম। সামনে অগুন্তি দোকানঘর। আজ অবশ্য প্রশ্নমালা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ নয়। বিকেলবেলা এসেছি। সিলেবাস ধরে সার্ভে ইন্সট্রুমেন্টের কাজগুলি সমাধা করতে হবে। একে একে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ছেলেমেয়েরা রোড মর্ফোলজি, ট্রাফিক ফ্লো সার্ভে, স্থানীয় পুকুর থেকে জলের নমুনা সংগ্রহ, চাষের ক্ষেত থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ ইত্যাদি করতে লাগল। কিছু জন ব্যাস্ত হয়ে পড়ল অ্যাবনি লেভেল, ডাম্পি লেভেল, প্রিসম্যাটিক কম্পাস, ক্লাইনোমিটার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি সহযোগে ল্যান্ডস্কেপের নানারকম সার্ভে করতে। গ্রামের পথ ধরে একটু এগিয়ে গেলেই জঙ্গল - শাল, সেগুন, পলাশের বন। আর বন পেরোলেই অনুচ্চ পাহাড়ের শ্রেণী। স্থানীয় ভাষায় ঐ পাহাড়ের নাম উসুল ডুংরি। পাহাড়ের পাদদেশে চড়িদা গ্রামের নিকাশি সমস্যা রয়েছে। বর্ষার কারণে চারিদিকে জল জমে রয়েছে। পুকুরের জল কানায় কানায় ভরা আর কুয়োর জলও মাটির লেভেলেই টলমল করছে। হাওয়া আপিস থেকে বৃষ্টিপাতের হিসেব নিলে বোঝা যায়, পুরুলিয়াতে কলকাতার থেকে বেশি বৃষ্টি হয়। কিন্তু বেসিন আকৃতি গঠনের জন্য স্বাভাবিক ভাবে কলকাতার জল বেরোনোর উপায় নেই আর ঢালু ভূপ্রকৃতির জন্য পুরুলিয়ার জল গড়িয়ে দূরে সমতলের দিকে পালায়। তাই রুখুসুখু হয়ে থাকে। তবে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল যে চড়িদাতে পানীয় জল বা অন্যান্য প্রয়োজনে জলের অভাব নেই। এই সব সার্ভে করতে গেলেই একধরণের চিন্তা আসে। ছেলেমেয়েদের চোখের আড়াল করতে হয়। উপায় থাকেনা। সবার সঙ্গে তো আর বডিলি প্রেজেন্ট থাকা যায়না। বারবার খোঁজ নিতে হয়, এ কোথায়, ও কোথায়, সে কোথায়? ভৌগোলিক ওরিয়ন্টেশন নিয়ে তো আর ওরা ফিল্ডে নামেনা, ওই জিনিসটাই শিখতে আসে।
ছেলেমেয়েদের নিয়ে এইভাবে মাঠে ময়দানে সার্ভে করতে নামলেই আমার নিজের ছাত্রীবেলার কথা মনে পড়ে যায়। কলেজে পড়ার সময়ে লেডী ব্রেবোর্ন থেকে আমরা গিয়েছিলাম সাতপুরা পাহাড়ের পাঁচমারীতে সার্ভে করতে। আমাদেরও জয়িতা সেনদি দু জন চারজন করে গ্রুপে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সেবারই বাড়ি ছেড়ে আমার প্রথম বেরোনো। প্রফেসরেরা আমাদের খুবই খেয়াল রেখেছিলেন। জয়িতাদির সঙ্গে ছিলেন জয়শ্রী রায়চৌধুরী ম্যাম। আসলে ভূগোল তো তখন বেশি কলেজে পড়ানো হতনা, হাতে গোনা গুটি কয়েক কলেজ। সেসময়ে বিশেষ করে প্রেসিডেন্সি ছিল আমাদের রাইভাল। ব্রেবোর্নের পরিবেশ ছিল একেবারে ইস্কুলের মত। আমরা শুনতাম প্রেসিডেন্সিতে নাকি খুব স্বাধীনতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা কথা চালু ছিল, ‘লেডী ব্র্যাবস আর অল স্পুন ফেড বেবিস’। তবে আমরা নিজেরা জানতাম যে ‘লেডী ব্র্যাব’ নয় আমাদের নাম ‘ব্রেবোর্নাইট’। সেই যুগে আমাদের কলেজ সঙ্গীত ছিল। প্রতি অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে গাইতে হত - "এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন"। এই সব পারিপার্শ্বিক কারণে মনের মধ্যে বেশ গর্ব ভাব তৈরি হয়েছিল। গর্বিত ব্রেবোর্নাইট এবং বাপ মা ও শিক্ষিকাদের ননীর পুত্তলি বা ‘স্পুন ফেড ব্র্যাব’ আমরা বম্বে মেলে চড়েছিলাম - জীবনে প্রথম অজানাকে জানব বলে। পাঁচমারীতে সার্ভে চলাকালীন এক দিন আমি আর মৌসুমী নামের এক বন্ধু কাজ করতে করতে পাহাড়ী পথে চলে গেছি বহুদূর। তারপর ফেরার সময় হলে দেখি পথ হারিয়ে ফেলেছি। হোটেলে ফিরব কী করে? জয়িতা মিস বলে দিয়েছেন তোমরা ফেরার সময়ে লোককে বলবে বাস স্ট্যান্ডের কাছে যাব। ওখানেই হোটেল। সেই বয়সে অনেক সংশয় থাকে। অচেনা মানুষের প্রতি একটা স্বাভাবিক ভয়, সন্দেহ কাজ করে। জিজ্ঞেস করব কাকে? অনেক দ্বিধা দন্দ্ব কাটিয়ে একটি লোককে জিজ্ঞাসা করলাম বাস আড্ডা কোথায়? সে বলল এই রাস্তার ওপারে, আমিও যাচ্ছি চল। শুনেই আমরা থমকে গেছি। কলকাতায় যেমন অগুন্তি বাস স্ট্যান্ড, এখানেও একাধিক থাকবে। এই লোকটি কি ভুল পথ দেখাচ্ছে? নিশ্চয়ই তাই। আমাদের ধারণা যে পথে এসেছি সেই দিক দিয়েই অতটা হেঁটে ফিরতে হবে। এদিকে লোকটি দেখাচ্ছে উলটো দিকে। চারিদিকে মিলিটারি বেস, মিলিটারি কোয়ার্টার - যাই ঢুকে মিলিটারিকে জিজ্ঞেস করি। গেট দিয়ে কিছুটা ঢুকে মনে হল সেটা উচিত হবেনা। এমন করে চরকি পাক খেয়ে হয়রান হয়ে আমরা হোটেলে যখন পৌঁছলাম, তখন দুজনেই গলদঘর্ম। তখন না মোবাইল ফোন, আর না গুগল ম্যাপ। তারপর বোঝা গেল প্রথম লোকটি ঠিক বলেছিল। পাঁচমারীতে তখন দুটো নয়, চারটে নয়, সবেধন নীলমণি একটিই বাস আড্ডা আছে। আর আমরা ভেবেছি হাঁটতে হাঁটতে তেপান্তরে গেছি, আসলে পাকদন্ডী ঘুরে হোটেলের কাছেই ফিরে এসেছি। আচ্ছা কলকাতার মেয়ে এসব বুঝবে কীকরে বলো দেখি। সেই প্রথম স্পুন ফেড বেবির মুখ থেকে রূপোর চামচটা পড়ে গেল। সাতপুরার সামনে আমরা বোকা বনে গেলাম। আমাদের ছেলেমেয়েগুলোও তো বোকা বনে। বনতে হয়, তা নইলে ভৌগোলিক হবে কীকরে? সে সাতপুরা হোক বা দলমা পাহাড় - ব্যাপার তো একই।