

ছবি: রমিত
প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালন হবে। সে কি আর যেমন তেমন ব্যাপার। সারা দেশে ৭০ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানো হবে এমনটাই ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু করা হবে সরকারিভাবে কিছু দলগতভাবে। এমনটাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি থেকে শুরু করে ২১ টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা সেই রাজ্যের সমস্ত মানুষকে এই নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্দান্ত পরিকল্পনা, দুরন্ত আবহ ভাবতেই কেমন একটা শিহরণ হচ্ছে গায়ে। ছোট্ট চার পাঁচ টাকা দামের প্রদীপ কিন্তু তার আলোর বিচ্ছুরণে ঝলমল করবে গোটা দেশ। উপগ্রহ চিত্রে দেখা যাবে সেই আলোর ছটা। ড্রোন ক্যামেরায় ছবি উঠবে, সেই ছবি সমস্ত গণমাধ্যমে দেখা যাবে এবং তা নিয়ে চর্চা চলবে অন্ততপক্ষে আরো ৪-৫ দিন। সবাই ধন্য ধন্য করবে, এই না হলে রাজা এই না হলে রাজার জন্মদিন পালন?
অনেকে বলছেন এই প্রদীপের আলোয় কি ঢেকে যাবে সমস্ত অন্ধকার? যারা এই কথা বলছেন তারা নিশ্চিত দিমাগী নকশাল। গত ২৫ বছর ধরে যিনি রাজ্য এবং কেন্দ্রের প্রশাসনিক প্রধান হয়ে সামাল দিয়ে আসছেন সমস্ত কিছু তার জন্মদিনে একটু উৎসব হবে না? তিনি তো প্রণম্য ব্যক্তি, তিনি তো মহামানব। ঐসব দিমাগী নকশাল কিংবা সেকু মাকুরা যারা সরকারি উদ্যোগের এই রাষ্ট্র গুরুর দীর্ঘায়ু প্রার্থনার বিরোধিতা করছেন, কিংবা প্রশ্ন তুলছেন যে এই প্রধানমন্ত্রী তো কিছুদিন আগে বলেছিলেন যে ভোজ্য তেলের অভাব আছে দেশে সেই দেশের ৭০ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানো হবে ওই তেল দিয়ে সেটা কি অপচয় নয়, তারা সবাই আসলে দেশদ্রোহী। দেশ কথাটা বললেই তো দেশের প্রধানমন্ত্রী মুখ সামনে ভেসে আসে সুতরাং দেশকে ভালোবাসা আর প্রধানমন্ত্রীকে ভালবাসা তো একই জিনিস! এতে তো কারো আপত্তি থাকার কথা নয়।
এর আগেও এই ধরনের উৎসব হয়েছিল অনেকের খেয়াল নেই। ২০২১ সালে ১৪ কোটি রেশনের ব্যাগে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপা হয়েছিল। পাঁচ কোটি পোস্ট কার্ডে লেখানো হয়েছিল 'ধন্যবাদ' এই শব্দটি। যাদেরকে দিয়ে লেখানো হয়েছিল তারা নাকি বিনামূল্যে সরকারের থেকে রেশন পেয়ে থাকেন, অর্থাৎ এই রাজার অনুগত প্রজা। দল এবং সরকারের পক্ষ থেকে সেই পোস্টকার্ড সময়মতো যাতে রাজার কাছে পৌঁছয় তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদি একাত্তর বছরে পড়েছিলেন তাই একাত্তর টি গঙ্গা সংলগ্ন ঘাট পরিষ্কারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় তিন সপ্তাহ ধরে তার মহিমা প্রচার করা হয়েছিল তিনি কোভিডের ভ্যাকসিন দিয়ে কত মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন, যেন তিনিই ভ্যাকসিনের আবিষ্কর্তা। খুঁজে দেখলেই দেখা যাবে ওই সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে বেশ কিছু উত্তর সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল। তার গুণগান প্রচার করে। সেই সমস্ত লেখায় ছিল যে প্রধানমন্ত্রীর জন্যই অসংখ্য মানুষ নাকি খাবার পেয়েছিলেন, তার জন্যই নাকি অসংখ্য মানুষের প্রাণ বেঁচে ছিল। সুতরাং দেশের মানুষের উচিত তাকে 'ধন্যবাদ' জানানো। এবারও একই রকম ভাবে বলা হচ্ছে তার জন্যই অসংখ্য মানুষ আয়ুষ্মান ভারতের অধিকাংশ সুবিধা পেয়েছেন। তার জন্যই নাকি এক কোটি ৫০ লক্ষ মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পেয়েছেন বাংলায়। সেজন্যই বাংলায় বলা হয়েছে, যারা যারা সরকারের সুবিধাভোগী, তারা যেন প্রদীপ জ্বালিয়ে 'ধন্যবাদ' জানান। কিন্তু যে অসংখ্য মহিলারা বাসে ট্রামে ট্রেনে বলছেন যে তারা অন্নপূর্ণা যোজনা টাকা পাননি, তারা কি করবেন? তাদের কি অন্য কিছু করণীয় আছে? এই যেমন কোভিডের সময়ে বলা হয়েছিল কোভিড তাড়াতে গেলে নাকি থালা বাজাতে হবে। এখন অবশ্য বহু মহিলার বহু মানুষের থালা এমনিতেই খালি, এবার কি বাজালে তাহলে আওয়াজ বেশি হবে? এবার কি প্রধানমন্ত্রীর উন্নতি হবে নাকি দেশের মানুষের উন্নতিও হবে, সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।
অনেকেই সেই সময়ে বলেছিলেন এটা কুসংস্কার, এই থালা বাজালে কিছু লাভ হয় না। এবার কিন্তু আবার সুযোগ এসেছে থালা বাজানোর, আশা করি এবার সেই সুযোগটা অনেকে হারাবেন না। কোভিডের সময়ে থালা বাজিয়ে, শঙ্খ বাজিয়ে আলো জ্বালিয়ে কোভিড গিয়েছিল কিনা জানা নেই, কিন্তু কিছু মানুষকে তো ভুল বোঝানো গিয়েছিল। সেদিন যারা এই সুযোগ হেলায় হারিয়েছিলেন, তাদের কাছে আবার সুযোগ এসেছে প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করার। প্রার্থনা করার তার মতো একজন সফল প্রধানমন্ত্রী যেন বছর বছর আমরা পাই। কালো টাকা যেন ৫০ দিনের মধ্যে ফেরত আনতে পারেন, প্রতি বছর যেন বেকারদের চাকরি হয় এই সমস্ত কামনার সঙ্গে মিশে থাকবে আমাদের এই প্রধানমন্ত্রী বন্দনা। আজকে না হোক অন্তত ২০৪৭ সালে যাতে ভারত জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন নিতে পারে করতেই পারি তো সেই প্রার্থনা। সেই জন্যেই তো "আশীর্বাদ কা দিয়া" জ্বালানোর জন্য এত অনুরোধ, এত পরোক্ষ হুমকি।
কিন্তু আলোর নিচেই তো অন্ধকার রয়েই যাচ্ছে। যে প্রদীপ জ্বালানো হবে সেই প্রদীপের নিচে কেটে যাচ্ছে উমর খালিদের কারাগারের দিনগুলো। কোন বিচার না পেয়ে কোন তদন্ত না হয়ে উমর খালিদ দিন কাটাচ্ছেন। অন্তত ৩০ লক্ষ মানুষ ট্রাইব্যুনালের দরজায় দরজায় ঘুরছেন, নির্বাচনের পর নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে। উপ নির্বাচন আসছে চলে যাচ্ছে কিন্তু সেই মানুষগুলোর আশঙ্কা কমছে না। বেনাগরিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমছে না। এই কলকাতার মধ্যেই বেলগাছিয়ার কাছে জ্যোতিনগর কলোনিতে দীর্ঘদিন ধরে জল পাচ্ছে না আমাদেরই সহনাগরিকেরা কারণ তারা সংখ্যালঘু। সেখানে দূরদূরান্ত থেকে জল বয়ে নিয়ে আসতে হচ্ছে তাদেরকে। আমরা দেখেও দেখছি না, কারণ অঞ্চলের বিধায়ক থেকে শুরু করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বলছেন যে মুসলমানরা তো আমাদের ভোট দেয় না তাই তাদের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। উন্নয়ন করতে হবে না। কিন্তু সাধারণ পানীয় জলটুকুও পাবে না তারপরে যদি বা পায় তাদেরকে বলা হবে সেই কারণে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে? সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত। এতদিন জেনে এসেছি সংখ্যাগুরুর কাজ সংখ্যালঘুকে আড়াল করা। ব্রিকসের সম্মেলনে আলাদা করে সংখ্যালঘুর জন্য উপাসনা কক্ষ থাকে। আর আমাদের দেশে আমাদের রাজ্যে সংখ্যালঘু হয়ে জন্মালে তার জন্য জোটে উপহাস অবজ্ঞা এবং অপমান। সংখ্যালঘুর নিজের ভাষা আক্রান্ত আর আমরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর ২৫ বছরের সেবাকালের উৎসব পালন করব প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে? অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে সন্ধ্যে ছটা থেকে সাতটা অব্দি আলো-জ্বালানো হলে বা প্রতিটি স্কুলের ছাত্ররা যদি আলো জ্বালায় প্রদীপ জ্বালায় তাহলে হয়তো প্রধান সেবকের বন্দনা হয়, কিন্তু অন্ধকার কাটে কি? সমাজের যে অন্ধকার দেশের যে অন্ধকার মনের যে অন্ধকার সেটা কি দূর হয়?