

গোবরই অশুদ্ধ
- একটু গোবর পাওয়া যাবে ?
- গোবর? মানে?
- মানে কাঁচা গোবর!
দোকানটা একটা গুদামঘরের মত। বস্তা ভরা কিছু আছে। পাশে ছোটো চায়ের দোকান। সবাই ঘুরে তাকালো লোকটার দিকে। গোবরগনেশ মার্কা ক্যাবলা টাইপের লোক। শহুরে জায়গাটা নিয়মিত বাজারের মত। লোকটা আবার বলল,
-- দোকানে দোকানে ঘুরছি। পাচ্ছি না। এখনও বোধহয় তেমন চল হয় নি।
-- চল! কীসের চল? কয়েকজন জিজ্ঞাসা করল।
-- ওই পচা ডিম টমেটোর মত আর কি!
এবার সবাই চুপ। কেউ কাগজে মনে দিল। কেউ চায়ে। লোকটা আবার বলল,
-- টিভিতে দেখেন নি, তোলাবাজ নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। আর পাবলিক তাকে পচা ডিম, টমেটো এমনকি কাঁচা গোবরও ছুঁড়েছে। কেনো বলুন তো?
কেউ ঘাড় তুলে তাকালো। কেউ ভুরু কুঁচকে কান খাড়া করল। কেউ কাগজের একটা জায়গায় আটকে রইল।
-- নেতা দুনম্বরি করে দূষিত হয়ে গিয়েছিল তো! শোধন করে দিল। আমারও একজনের একটু শোধন করার দরকার ছিল তো, তাই আর কি!
এক শাস্ত্রীয় আলোচনায় সে এই শুদ্ধিকরণ বিষয়ে শুনেছিল। গুরুদেব বলছিলেন যে, বিশেষ অন্যায় করলে মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ের ২১২ নং শ্লোকে কৃচ্ছ্র সান্তপন নামক এক বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান আছে। গোমূত্র, গোবর, দুধ, দই, ঘি এবং কুশোদক(কুশ ঘাস মিশ্রিত জল)—এই ছয়টি দ্রব্য মিশিয়ে একদিন পান করতে হবে এবং পরের দিন উপবাস করতে হবে। স্মৃতিশাস্ত্রের পরিভাষায় একেই 'সান্তপন কৃচ্ছ্ব' ব্রত বলা হয়। তবে যে সে অন্যায় নয়, মহা অপরাধ করার কারনেই এই কঠিন প্রায়শ্চিত্ত। তা মহা অপরাধ অনেকেই করেছে। সিন্ডিকেট খুলে জমি বাড়ি দখল করেছে, মোটা মোটা তোলাবাজি করেছে,ছোটো দোকানগুলোকেও ছাড়ে নি। আর সে কি বজ্রপাতের মত এক একটা হুমকি। মেয়েদের ছিন্নভিন্ন করেছে। মেরে ফেলেছে। কত মেয়ে বউ নিজেরাই মরেছে বলদর্পীদের অত্যাচারে। হুমকি ! বুকের বল ভস্ম হয়ে যায়। চুরি। লুঠ। হত্যা। কত কি!
কিন্তু গোবর তো গরুর মল। বর্জ্য পদার্থ। তাকি মানুষকে খাওয়ানো যায়! প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য ক্ষতিকারক জীবানুতে ভর্তি। যা থেকে টাইফয়েড, আ্যামিবায়োসিস, ডায়রিয়া এমন কি যক্ষ্মাও হতে পারে। ত্বকে লাগলে চর্মরোগ, আ্যলার্জি বা ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। আবার বলেন গোবরে "অ্যান্টিসেপটিক" আছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় কিছু উপকারী জীবানু দেখা গেছে। যা আসলে গরুর খাদ্যনালীতে থেকে। কিন্তু গোবর দিয়ে সরসরি চিকিৎসার বিধান হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আসলে এর পিছনে একটা উদ্দেশ্য ছিল। বৈদিক যুগের প্রথমদিকে গরুর মাংসের চাহিদা মারাত্মক হয়ে ওঠে। পরে দুধ ও চাষের জন্য গরু পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। তখন একটা গল্প চালু হল। গাভীর শরীরে তেত্রিশ কোটি দেবতার বাস। গরু তাই দেবতারও দেবতা। কিন্তু লক্ষ্মী দেবী নাকি সেখানে জায়গা পান নি। তিনি গোবর হয়ে গরুর শরীরে স্থান নিলেন।আসলে তখন গোবরের ব্যবহার তেমন ছিল না। কাঠ যথেষ্ট ছিল।জ্বালানির প্রয়োজনও তত ছিল না। সেই গোবরেও যদি দেবত্ব আরোপ করা যায় তাহলে কেমন হয়! শুদ্ধিকরণের বস্তু হিসাবে গোবর ঐশ্বরিক পবিত্রতা লাভ করল। গোহত্যা বন্ধ করতেই আসলে এই তত্ত্বের উৎপত্তি।
আসল শুদ্ধি তো মনের ব্যাপার। গোবর খেয়ে মরে গেলে আর শুদ্ধি কিসের! কারন গোবর নিজেই রোগের ডিপো। কিন্তু মাবুষের গায়ে গোবর লাগিয়ে শুদ্ধির কোনো বিধান নেই মনুসংহিতায়।তবে গায়ে গোবর লাগলে তা শুদ্ধতার প্রতীক হিসাবেই মনু ধরতে বলছেন। তবে মল হিসাবে ধরলে যতক্ষণ না তা থেকে গন্ধ ও দাগ যাচ্ছে ততক্ষণ তা জল ও মাটি দিয়ে ( পঞ্চম অধ্যায়, শ্লোক ১২৬) ধুতে হবে। এরপর স্নান তো করতেই হবে। মনুর মতে আচমন করাও বিধেয়। মোটমাট সে যথেষ্ট ঝঞ্জাটের ব্যাপার। কিন্তু বদ লোকদের গায়ে ছুঁড়ে বদলা নিতে কি যে উপযোগী তা আর বলার নয়!
কিন্তু আমাদের বেচারি লোকটি সত্যিই গোবেচারা। তার হঠাৎ একটা কথা মনে হল। আইনের শাসনই তো কাম্য। এভাবে আইনকে হাতে তুলে নেওয়া একটা গর্হিত কাজ হবে না ! এরজন্য তারই মুখে যদি গোবর ছেটানো হয় কোনোদিন !
-- বাপ রে, থাক আর গোবর চাই না।
এরপর আর কি! লোকটা চুপচাপ সরে পড়ল।
---------------
পঞ্চম অধ্যায় : শ্লোক ১২৬
যতক্ষণ পর্যন্ত (মলমূত্রাদি অপবিত্র দ্রব্যের সংস্পর্শে) গন্ধ বা লেপ না যায়, ততক্ষণ সকল দ্রব্যের শুদ্ধিতে মাটি ও জল প্রয়োগ করা উচিত।
------