ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।আগ্রহী হলে মূল গ্রন্থগুলি পড়ে নেবেন।
--------------------------------------------------------------------
জন্ম ১৮৮০ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর। আইনজীবি বিশ্বনাথ দত্ত আর ভুবনেশ্বরী দেবীর কনিষ্ঠ সন্তান। বিশ্ববরেণ্য দাদার চেয়ে সতেরো বছরের ছোট। যদিও দাদার পরিচয়ে কোনদিনও আলোকিত হতে চাননি। আফশোস, তাঁর পরিচয় দিতে গেলে অবধারিত ভাবে ওই বিবেকানন্দের ভাই’ কথাটিই আগে মাথায় আসে।
১৯০৩ সালে যুক্ত হন গুপ্ত সমিতি যুগান্তরে। সভাপতি তখন ব্যারিস্টার পি. মিত্র। আর সংগঠক ও মুখ্য নেতা বলতে গেলে অরবিন্দ ঘোষ। গুপ্ত সমিতিতে থাকাকালীনই ১৯শে জুলাই, ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা। বারীন ঘোষ আর অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের সঙ্গে উনি সম্পাদনা করতে লাগলেন যুগান্তর। দাম মাত্র এক পয়সা। কয়েকদিনেই পাঠক সংখ্যা হলো কুড়ি হাজার। সরকার বিরোধী প্রবন্ধ লেখার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে জারি হলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। আত্মপক্ষ সমর্থন করতে রাজি হননি। তাঁর এই পদক্ষেপ ছিলো পরাধীন ভারতে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম অসহযোগ প্রদর্শন! তারিখটা ২২শে জুলাই, ১৯০৭। জামিনের ব্যবস্থা করতে এগিয়ে এলেন অনেকেই! সঞ্জীবনী-সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র, দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী, এমনকি নিবেদিতাও। শাস্তি হলো একবছর সশ্রম কারাদণ্ড। হ্যারিসন রোডে ডা. নীলরতন সরকারের বাড়িতে মহিলাদের তরফ থেকে ভুবনেশ্বরী দেবীকে দেওয়া হল সংবর্ধনা। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি মাকে মজা করে বলেছিলেন, “বিবেকানন্দের মা হয়ে তো তুমি কোনো স্বীকৃতি পেলে না, কিন্তু আমার মা হয়ে তুমি জনসম্বর্ধনা লাভ করেছো!"
১৯০৮ সালে জুন মাসে জেল থেকে ছাড়া পেলেন। শুরু হলো তাঁর সংগ্রামী জীবনের দ্বিতীয় পর্ব। এই পর্বের শুরুতে অনেকটাই জুড়ে ছিলেন তাঁর মাতৃসমা ভগিনী নিবেদিতা। জেলে থাকাকালীনই নিবেদিতা তাঁকে উপহার দিয়ে এলেন পিটার ক্রপ্টোকিনের ‘মেময়ার্স অফ আ রেভোলিউশনিস্ট’ আর ‘ইন রাশিয়ান অ্যান্ড ফ্রেঞ্চ প্রিজনস’, সাথে মাৎসিনির রচনাগুচ্ছ। তাঁর স্বদেশপ্রেম দেখে এই নিবেদিতাই একদিন তাঁকে বলেছিলেন - ‘'আই কনসিডার ইউ কনসিক্রেটেড। ডোন্ট ম্যারি''।
জেল থেকে বেরিয়ে বেলুড় মঠে আত্মগোপন করলেন বসন্তকুমার ব্রহ্মচারী নামে, কারণ সেই বছরেই সুবোধ মল্লিক, কৃষ্ণকুমার মিত্র, অশ্বিনীকুমার দত্তসহ যে দশজনের নামে আন্দামানে দ্বীপান্তরে পাঠানোর হুলিয়া বেরোল, সেই তালিকায় ওনারও নামও ছিল। এরপর ১৯০৮ সালে ইংরেজ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে পাড়ি জমালেন মার্কিন মুলুকে, সোজা নিউইয়র্ক। সবদিক দিয়েই সাহায্য পেলেন নিবেদিতার। বিবেকানন্দ-অনুরাগিণী জোসেফিন ম্যাকলাউডকে নিবেদিতা চিঠিতে জানিয়ে দিলেন, বইপত্র, জামাকাপড়, গাড়ি-ভাড়া এ সমস্তের ব্যবস্থা যেন তিনি অনুগ্রহ করে করে দেন। এমনকি তিনি কী বিষয়ে পড়াশোনা করবেন, সে বিষয়েও মিস ম্যাকলাউডের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। ১৯১২ সালে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিবেদিতার কথামতোই ইতিহাসে স্নাতক হলেন। পরের বছর রোড আইল্যান্ডের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার ডিগ্রী করেন।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পাড়ি দিলেন জার্মানি। আমেরিকাতে থাকাকালীনই তিনি সানফ্রান্সিসকোর গদর পার্টির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন, সেসময় থেকেই কমিউনিজমে আকৃষ্ট হন। জার্মানিতে এসে শুরু করে দিলেন তাঁর স্বাধীনতাসংগ্রামের দ্বিতীয় পর্ব। জার্মানিতে ভারতীয় ছাত্ররা যে কমিটি গঠন করেছিল, সেই ‘বার্লিন কমিটি’র সেক্রেটারি হলেন ১৯১৫ সালে। বার্লিন কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, অবিনাশ ভট্টাচার্য, সি. পদ্মনাভন পিল্লাই, তাঁর ভাই চম্পকরমণ পিল্লাই, ড. ধীরেন সরকার, এন. এস. মারাঠে, ড. জে এন দাশগুপ্ত প্রমুখ। পরে এই কমিটির নাম রাখা হয়েছিল ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স কমিটি। ইন্দো-জার্মান কন্সপিরেশির মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই কমিটির সদস্যরাই। বাঘা যতীন ও তাঁর দলকে অস্ত্রসাহায্য করার কথা থাকলেও তা ব্যর্থ হয়। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে, এইসময় ভারতে সার্বিক বৈপ্লবিক আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত। একমাত্র বাংলা ও পঞ্জাবের মানুষ ছাড়া আর কেউই বিপ্লবে আগ্রহী ছিলেন না। ১৯১৭ তে বার্লিন কমিটি বুঝতে পারল যে আর বিপ্লবের কোনও আশা নেই। আসলে তাঁরা বিপ্লবের কথা বলে গেলেও দেশের জনগণের একটা বড় অংশের কাছে পৌঁছতে পারেননি।
রুশ বিপ্লবের আগে থেকেই তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সম্পর্কে পড়াশোনা করছেন। কিন্তু তার সাথে জাতীয়তাবাদকেও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর বিপ্লববাদে এসে মিলেছে মহারাজা নন্দকুমার, মঙ্গল পাণ্ডে, আজিমুল্লা খাঁ, তাঁতিয়া টোপি, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, হজরৎ মহল, বাহাদুর শাহ থেকে বিরসা মুন্ডা, রাজা রামমোহন রায় ইয়ং বেঙ্গল থেকে পি. মিত্র, অরবিন্দ ঘোষ। যে কারণে পরবর্তীকালে আরেক বিশিষ্ট প্রবাসী বাঙালি কমিউনিস্ট মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সাথে তাঁর বিরোধ হয়ে উঠলো অবশ্যম্ভাবী।
১৯শে জুলাই, ১৯২০, তাশখন্দে সূচনা হলো ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির, আর নভেম্বরে বীরেন্দ্রনাথ তৃতীয় কমিন্টার্নের নেতাদের সাথে আলোচনা করতে মস্কো গেলেন। তার কয়েক মাস বাদেই ১৯২১-এর এপ্রিল বা মে মাসে বার্লিনের ভারতীয় বিপ্লবীদের সাথে উনিও মস্কো রওনা হলেন। অনেকে বলে থাকেন সেসময় লেনিনের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ এবং আলোচনাও হয়েছিল। লেনিন তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর প্রস্তাব দেন।
মস্কো থেকে ফিরে তিনি আবার গবেষণায় মনোনিবেশ করলেন। ১৯২২ সালে হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃতত্ত্বে পিএইচডি লাভ করলেন। ১৯২৫-এর এপ্রিলে, দেশছাড়ার সতেরো বছর পরে তিনি ভারতে ফিরে এসে শুরু করলেন তাঁর কাজ। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন ইন্ডিয়ান নিউজ অ্যান্ড ইনফরমেশন ব্যুরো। ফিরে এসে কলকাতাতেই উঠলেন। ভেবেছিলেন অধ্যাপনার চাকরি নেবেন, কিন্তু বিপ্লবী ছাপমারা এমন একজনকে অধ্যাপক হিসাবে নিতে ভরসা করলেন না বিশ্বভারতী বা শ্যামাপ্রসাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে স্থাপন করলেন বেশ কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন। ব্রিটিশ সরকার এরপর থেকেই তাঁর কাজকর্মের ওপর নজরদারি রাখা শুরু করে।
দেশে ফেরার পর থেকে তিনি সব পার্টির মুখোশ এমনভাবে খুলেছেন চাঁচাছোলা ভাষায়, যে সকলের কাছেই হয়ে গিয়েছিলেন চক্ষুশূল। গান্ধীবাদের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, "এটা এককথায় ইউরোপের utopian socialism, গান্ধীবাদ নামে চলছে এদেশে।" আবার ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে বরাবরই বলে এসেছেন, 'এই দুই পার্টিই ভারতের স্বাধীনতাআন্দোলনে প্রকৃত অর্থে সাহায্য কিছুই করেনি।' ভারতে এসে তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রাম আর শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন একসূত্রে বাঁধা থাকুক, কারণ স্বাধীনতা বা বিপ্লব মানে শুধু ইংরেজ মেরে তাড়ানো নয়, স্বাধীনতা মানে একটা সার্বিক পরিবর্তন।
তাঁকে ভুল বুঝেছিলেন আসলে দু’দিকের স্বদেশীরাই। তিনি কিন্তু আজীবন ন্যাশনালিস্ট এবং কমিউনিস্টদের মধ্যেকার সেতুবন্ধন করে যাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। হয়ে উঠেছিলেন শ্রমিক কৃষকদের বন্ধু। তাঁর সম্বন্ধে মুজফফর আহমেদ বলছেন – “এক দিক থেকে তিনি নীতিহীন ব্যক্তি। তিনি চির অসন্তুষ্ট, আর অসন্তুষ্ট ব্যক্তিরা অসুখী হবেনই”।
স্বাধীনতার পরে ভারত সরকারের তরফ থেকে কোনোরকম ভাতা নিতে অস্বীকার করেন। একলা মানুষ থাকতেন ১৩এ, গৌরমোহন স্ট্রিটের গলিতে। দু’বেলা যে পাইস হোটেলে খেতেন তার নাম ছিল ‘অমিয় হোটেল’। বাঁধা আসন ছিল ১০ নম্বর। মৃত্যুর পর ওই আসনটিতে আজও কাউকে বসতে দেওয়া হয়না। দেশের মানুষের থেকে যে সম্মান পাননি, শেষমেশ পেলেন তা এক অর্ধশিক্ষিত হোটেলওয়ালার কাছ থেকে।
ইনিই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিশ্বনাথ দত্ত ও ভুবনেশ্বরী দেবীর ছোটো ছেলে।