

অলংকরণ: রমিত
১
- কাজীদা!
- আরে, বিজয় যে! দে গরুর গা ধুইয়ে!
কাঁধের ঝোলা নামিয়ে রেখে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলেন নজরুল। 'দোলন, এই সেই বিজয়। বহরমপুর জেলে আমাদের কী আড্ডাই না হতো! বিজয়ের যেমন সুন্দর গান, তেমনি সুন্দর কথা।'
উৎফুল্ল বিজয়লাল গিরিবালা দেবীকে প্রণাম করলেন।
- হেমন্তদা যখন বললেন আপনারা কৃষ্ণনগরে আসছেন, এখানেই থাকবেন, তখন থেকে আমার ঘুম হচ্ছে না। কতদিন পর আবার কাজিদাকে দেখব। কাজীদা, তুমি কিন্তু অনেক রোগা হয়ে গিয়েছ।
গিরিবালা দেবী বললেন - ‘আর বোলো না বাবা, যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে এটাই ভাগ্যি।'
পিছন থেকে হেমন্ত সরকারের গলা ভেসে এলো –‘গল্প করার অনেক সময় পাবে বিজয়। তুমি এখন ওদের নিয়ে চলো, আর দ্যাখো কাসেম গাড়ি নিয়ে এসেছে কিনা’।
'এইতো, আমি এখানেই আছি!' বলতে না বলতেই হুড়মুড় করে সামনে এগিয়ে এলো এক বলিষ্ঠ বৃদ্ধ। হাতে চাবুক, মাথায় পাগড়ীর মতো করে গামছা বাঁধা। দাড়ি-গোঁফ চোখের ভুরু পর্যন্ত সাদা, কিন্তু গলার জোর কম নয়। ‘দাদাবাবু, তুমি ইস্টিশনে এসেছো আর আমি গাড়ি নিয়ে আসিনি, এরকম কখনো হয়েছে? লাটফারাম থেকে বার হয়ে যেদিন দেখবে আমি নাই, জানবে সেদিন কাসেম মাটির তলায় চলে গিয়েছে।
সরকার বাড়ির সব কাজে কাসেমের গাড়ি একদম বাঁধা বলেই নয়, ওবাড়ির ছোট থেকে বড় হওয়া সবার উপরে কাসেমের কর্তৃত্ব ফলানো একটা অভ্যাস। এ নিয়ে তার নিজেরও একটু অহংকার আছে। আর এই জন্য জজকোর্ট পাড়া বটতলায় কোচোয়ানদের ভিতরে একটা হিংসেও আছে। কলকাতা থেকে অতিথিরা এলে তাদের সামনে কাসেমের অভিভাবকত্ব যেন আরো বেড়ে যায়। হেমন্ত সরকার ধমক লাগালেন - ‘কথা না বাড়িয়ে জিনিসপত্র গাড়িতে তোলো।'
কাসেম আলী সব আগে হারমোনিয়ামটা কাঁধে তুলে নিয়ে রেখে আসতে গেলেন। গিরিবালা দেবীর হাত থেকে মস্ত ব্যাগটা নিয়ে বিজয়লাল সবাইকে সঙ্গে করে উঠলেন কাসেমের গাড়িতে।
স্টেশন থেকে গোয়াড়ি অনেকটাই পথ। ক্রোশ খানেক তো হবেই। তার উপর বেলা পড়তে না পড়তেই কৃষ্ণনগরে শীত যেন জাঁকিয়ে নেমেছে। পথের দুপাশে গাছ-গাছালির ছায়া, ফাঁকে ফাঁকে দুচারটে ঘরবাড়ি। অনেকটা জায়গা জুড়ে গাছপালা নিয়ে একেকটা বাড়ি। নজরুলের ভালো লাগছে বেশ। অনেকদিন পর বাতাসে কেমন একটা ভালো লাগার স্বাদ। ঝলমলে মিষ্টি রোদের সাথে ঠান্ডা বাতাসের মিশেল কেমন একটা মাদকতা ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে শরীরে। মাত্র একটা বেলা, তাতেই মনে হচ্ছে অন্য একটা জগৎ। গত কয়েক মাস ধরে হুগলির ঘরখানায় যে দুঃসহ যন্ত্রণার ঝড় বয়ে গেল --- যেন একটা বিভীষিকা, একটা দুঃস্বপ্নের ঘোর। বসিরহাট থেকে ফিরেছিলেন ম্যালেরিয়া আর আমাশয় সঙ্গী করে। একদিন ভালো, তো একদিন জ্বরের তান্ডব। দুঃসহ তাপে গা পুড়ে যায়। যন্ত্রণায় মাথার শিরা ছিড়ে যাবার অবস্থা। বলতে গেলে একরকম মৃত্যুর হাত ফিরে আসা। মাসিমা একা হাতে কী করে যে এতোসব সামাল দিয়েছেন কে জানে। কলকাতার বন্ধুরা কেউ কেউ মাঝে মাঝে বরফ এনে দিত। দোলন সেই বরফজলে কাপড় ভিজিয়ে সারা শরীর মুছিয়ে দিত। তারও তো শরীরের অবস্থা ভালো না। সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে সেও জেরবার। জন্মাষ্টমীর দিনে ঘর আলো করে এসেছিল তাদের ভালোবাসার সন্তান আদর করে নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মহম্মদ।
বিয়ের পর কলকাতায় মুসলমান পাড়ায় ঘর মেলেনি। সাহিত্যের বন্ধুরাও ছিল একরকম মুখ ফিরিয়ে। অভিমান হয়েছিল খুব। সেই অভিমান থেকেই বোধহয় স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি - পুত্রের মধ্যে কৃষ্ণ আর মহম্মদ একসাথে বিকশিত হোক। কিন্তু অভাগা যেদিকে চায় - চার মাস না পেরেতেই সে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। নিজেকে অপরাধী মনে হতো খুব। দোলনকে এরকম অবস্থায় রেখে বসিরহাটে না গেলেই বোধহয় ভালো ছিল। কিন্তু তাই বা কী করে হয়? কুতুবউদ্দিন ভোটে দাঁড়িয়েছে। হারা-জেতা পরের ব্যাপার, কিন্তু এই সুযোগেই তো দরিদ্র কৃষক- শ্রমিকদের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে? অনিয়ম হয়েছে খুব সেটা ঠিক। দুই সপ্তাহ ধরে গ্রামে গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন - কিন্তু ম্যালেরিয়ার জীবাণু তাঁকে ছাড়েনি, জাঁকিয়ে সংসার পেতেছে শরীরে। একদিকে শরীরের এই জরাজীর্ণ অবস্থা, অপরদিকে পুত্রশোকে পাথর হয়ে যাওয়া দোলনের মুখ, ধার করে ছাপাতে গিয়ে তিন-তিনটে বই বাজেয়াপ্ত, তার উপর প্রবাসীর আড়ালে একদল সাহিত্য-বন্ধুর ক্রমাগত কদর্য আক্রমণ। এরই মধ্যে হেমন্তদার আগ্রহে অতি উৎসাহ নিয়ে তৈরি হয়ে গেল 'লেবার স্বরাজ পার্টি'। কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা, কত উদ্দীপনা এই সংগঠনকে ঘিরে। কিন্তু শরীর? সংসার? ঈশ্বর বুকের মধ্যে এতো স্বপ্ন দিলেন, কিন্তু শরীরে শক্তি দিলেন কই?
আড়ালে বসে ঈশ্বর বোধ হয় শুনছিলেন। হেমন্তদার কথাগুলো যেন আশীর্বাদের মতোই নেমে এলো -
'চলো কাজি, কৃষ্ণনগরে। এই শরীর নিয়ে হুগলিতে পড়ে থেকে নিজেকে শেষ করে দেবে নাকি? সামনে তোমার কত কাজ!'
২
গোয়াড়ি বাজার লাগোয়া গলির ভিতরে একটা লাল রঙের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো কাসেমের গাড়ি। রাস্তাটা অপ্রশস্ত, কিন্তু বাড়িটা দেখে ভালো লাগলো। একটা আলাদা বাড়ি, নাকি এজমালি টানা তিন-চারটে বাড়ির একটা অংশ বোঝা মুশকিল। গায়ে গা লাগানো লালরঙের বাড়িগুলির মধ্যে পুরনো আভিজাত্যের একটা ছাপ লেগে আছে। রাস্তা থেকে কয়েক ধাপ সিঁড়ির উপর দরজা, বাঁদিকে কাঠের রেলিং দেওয়া একটা বারান্দা। কাসেম আর বিজয়লাল মিলে হৈচৈ করে জিনিসপত্র নামানোর মধ্যেই দরজা খুলে যিনি বেরিয়ে এলেন, তাঁকে দেখে হেমন্ত সরকার বললেন, 'দাদা, কাজীকে এনে দিলাম তোমার জিম্মায়। কাজি, আমার দাদা জ্ঞানচন্দ্র সরকার। গুছিয়ে টুছিয়ে একটু বিশ্রাম নাও, সন্ধ্যাবেলা দেখা হবে।'
'সে তো দেখেই বুঝতে পেরেছি' বলতে বলতে নজরুল প্রণাম করার জন্য এগিয়ে গেলেন।
'আরে না, না! করেন কী?' বলে জ্ঞানচন্দ্র নজরুলকে জড়িয়ে তুলে ধরলেন।
- আপনি দাদার দাদা, আপনি আজ্ঞে করবেন না।
- বেশ, বেশ! তোমার নামী মানুষ, গুণী মানুষ আমার বাড়িতে থাকবে, সেটাই আনন্দের কথা ভাই! মাসিমা আসুন।
ভিতরে চওড়া বারান্দা, প্রশস্ত একটা উঠোন, কলতলা, বারান্দা লাগোয়া রান্নাঘর। বাঁদিকের বারান্দার শেষে উপরে ওঠার একটা সিঁড়ি আছে। দিনের বেলাতেও একটা আবছা অন্ধকার ভাব। 'কিছু অসুবিধে হলে বলবেন, আমরা উপরেই থাকি' বলে জ্ঞানচন্দ্র সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন। কি জানি কেন, ঘরদুয়ার, মানুষজনের ব্যবহার, সব মিলিয়ে গিরিবালা দেবী অনেকটা স্বস্তি বোধ করলেন। হুগলির দিনগুলির কথা মনে করলে বুকটা কেমন শিউরে ওঠে। কী সব দিনই যে গেছে! কূল-কিনারাহীন অনিশ্চিত ভাগ্যের হাতে নিজেদের সঁপে দিয়ে এক খামখেয়ালী কবির জীবনের সঙ্গে মা-মেয়েতে নিজেদের জীবনকে ভাসিয়ে দিয়েছেন। সবকিছু জেনেও পিতৃহারা মেয়েটির মনকে ভেঙে দিতে চাননি। কিন্তু নিকট আত্মীয়-স্বজনরা যে এতোটা পর করে দেবে সেটা ভাবতে পারেননি। নুরুর এতো বন্ধু, কলকাতায় এতোসব গুণগ্রাহী, তারাও কেমন আশ্চর্য রকম মুখ ফিরিয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস পড়ার আগেই বিজয়লালের কথায় ফাঁকা বাড়িটা যেন গমগম করে উঠল।
"মাসিমা, ফ্রেস ট্রেস হয়ে একটু বিশ্রাম নিন। আজ রাতে কিন্তু আমাদের বাড়ি সবার নিমন্ত্রণ। আমি সন্ধ্যা বেলায় এসে নিয়ে যাব। বৌদি, রেডি হয়ে থাকবেন।"
- আজকেই তো এসে পৌঁছালাম বাবা। দু'দিন যাক, নিশ্চয় যাব কোনও এক সময়।
- না মাসিমা। মা বারবার বলে দিয়েছেন। অতদুর থেকে জার্নি করে এসে ঘরদোর গুছিয়ে রান্না-বান্না করার অনেক ঝক্কি। তাই মায়ের নির্দেশ - আপনাদের ধরে নিয়ে আসতে হবে। আমি সন্ধ্যা বেলায় আসছি।
এই বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন বিজয়লাল।
- কই? আমার 'আল্লা-ছেলে'টা কই?
সদরের গেট খুলে বিজয়লাল 'মা' বলে ডাকতেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছেন কিরণময়ী। পিছন পিছন বেরিয়ে এসেছেন মেজ ছেলে মিহিরলাল। দুজনে যেন এই ডাকের অপেক্ষাতেই ছিলেন।
কাসেমের গাড়ি বটতলা পেরিয়ে মোড়ের মাথায় পৌঁছাতেই শহরের চেহারাটা যেন বদলে গেল। হঠাৎ কেমন নিঝুম। গোয়াড়ির মতো কোলাহল নেই। তার উপর কনকনে ঠান্ডায় শহরের এই দিকটা যেন সন্ধ্যে হতে না হতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। দেউড়ি পেরিয়ে বেশ অনেকটা ফাঁকা জায়গা। বাড়ির সন্মুখেই একটা কাঁঠাল গাছ - আলো-আঁধারিতেও ঠিক বোঝা যায়। নিচে সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চি।
- কই দেখি আমার 'আল্লা- ছেলে' টাকে! বিজয়ের কাছে কত গল্প শুনেছি তোমার। কী সুন্দর আমার বৌ-মণিটা গো! আহা, সারাদিনের ধকলে মুখ-চোখ শুকনো হয়ে গিয়েছে। আসুন দিদি, ভেতরে আসুন। হেলেন, বৌদিমণিকে নিয়ে এসো।
ইতিমধ্যে বিনুনি দুলিয়ে প্রায় লাফাতে লাফাতে হাজির হয়ে গিয়েছে চঞ্চলা কিশোরী হেলেন। দোলনের হাত ধরে কলকল করতে করতে সবার আগেই ঢুকে গেল বাড়ির ভিতর।
- কাজিদা, এই আমার ভাই মিহির।
- 'দে গরুর গা ধুইয়ে!' মিহিরলালের কাঁধে চাপড় মেরে নজরুল চেঁচিয়ে উঠলেন। 'আরে ভাই, তুমিই তো আসল ছাত্রনেতা। পুরো নদীয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছ তুমি!'
বেশ বড়সড় পুরনো আমলের বাড়ি। বৈঠকখানা বললে যা বোঝায় সেই বাহির- বাড়িতেই ছোটো বড়ো তিনখানা ঘর। কথায় কথায় জানা গেল - বিজয়লালের পিতামহ পিয়ারীলাল চট্টোপাধ্যায় সত্তর বছর আগে এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন। বিক্রমপুরের জমিদারপুত্র পিয়ারীলালকে কৃষ্ণনগরে নিয়ে এসেছিলেন বিক্রমপুরের আরেক কৃতী সন্তান মনমোহন ঘোষ। কথায় আছে - কৃষ্ণনগরে যারা আসে তারাই কৃষ্ণনাগরিক হয়ে যায়। তো জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে চাকুরি করতে এসে পিয়ারীলালও হয়ে গেলেন শহরের বিশিষ্ট নাগরিক। বাড়ির সামনের রাস্তাটাই হয়ে গেল পি এল চ্যাটার্জি লেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে কিশোরীলালও পেয়েছেন শৌখিন ঠাটবাট আর জমিদারি মেজাজ। দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণ বলশালী চেহারা। যোগাসন, পাখি শিকার, গান-বাজনার আড্ডা, নাটকের মহড়া - কোনো কিছুতেই তাঁর উৎসাহের অভাব নাই। বাইরে কাঁঠাল গাছের নীচে ম্যারাপ বেঁধে 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, কিশোরীলাল নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন। ওদিকে অন্তঃপুরে প্রসব বেদনায় কাতর কিরণময়ী তার চোদ্দতম সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। নাটকের শেষে আঁতুড়ঘরে গিয়ে ফুটফুটে কন্যাকে দেখে উচ্ছ্বসিত কিশোরীলাল বলে উঠলেন - "এই তো, হেলেন চলে এসেছে আমার ঘরে!"
সত্যি সত্যি মেমসাহেবের মতোই চেহারা আর চালচলন হয়েছে হেলেনের। সব সময় কথার খই ফুটছে।
- বহরমপুর জেল থেকে বাড়ি এসে থেকে বড়দার মুখে শুধু কাজিদার গল্প। বাড়ির চেয়ে যেন জেলখানাতেই বেশি সুখে ছিল!
নজরুল হো হো করে হেসে উঠলেন। "তা কথাটা খুব একটা ভুল বলোনি হেলেন। হুগলি জেল আর বহরমপুরে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তার উপর বিজয়লাল, পূর্ণ দাস আর নরেন চক্রবর্তীর মতো দিলখোলা ছেলেরা এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। জেল কি আর জেলখানা থাকে!"
বিজয়লাল বলেন - "তা যাই বলো কাজীদা, বসন্ত ভৌমিকের মতো মানুষ জেলের সুপার না থাকলে কিন্তু আমাদের এতো সুখের কিছুই হতো না। তোমাকে তিনি অন্য চোখে দেখতেন, জেলের ভিতরে তিনি নিজে তোমাকে হারমোনিয়াম এনে দিলেন। তোমার গান, আর আমাদের হৈচৈ। আহা, কয়েকটা মাস যেন কয়েক দিনেই ফুরিয়ে গেল!"
অন্তরঙ্গ আতিথেয়তা, আড্ডা আর আলাপচারিতায় অল্পক্ষণের মধ্যেই দুটি পরিবার বেশ কাছাকাছি চলে এলো। গিরিবালা দেবী অনেক স্বস্তি পেলেন। নজরুলের যা উড়নচণ্ডী স্বভাব, সংসারের কোনো কিছুই তো তার খেয়াল থাকেনা। আশেপাশে ভরসা পাবার মতো মানুষজন আছে জানলে বুকে বল পাওয়া যায়।
হৈচৈ গল্প-কথার ভিতরেই মিহিরলাল উঠে পড়লেন, "দাদা, এবারে তো আমাদের যেতে হবে।"
বিজয়লালও উঠে পড়লেন, "মা, আমরা আসছি। কাজীদা, তোমরা থাকো। কাল দেখা হবে।"
নজরুল অবাক হলেন, "আসছি মানে? কোথায় যাবে? আর আমরা ফিরব কার সাথে?"
- সেসব কথা তোমাকে বলা হয়নি কাজীদা। আমরা তো আমাদের স্বরাজ আশ্রমে থাকি। হাই স্ট্রীটে। কাল দেখাবো। আর রাতে তো তোমরা এখানেই থাকছ!"
মাঝখান থেকে হেলেন ফুট কাটার মতো বলে উঠলো, "বাবার কোর্টের আড্ডা থেকে ফিরতে দেরি আছে দাদা!"
বিজয়লাল বিরক্তি দেখিয়ে বললেন, "তাতে কী হলো? বাবা এলে আসবে! তাতে কী? আমাদের কাজ আছে!"
- ইস্! বাবার ভয়েই তো রোজ আগে আগে চলে যাস! জানেন কাজীদা, ছোটোবেলায় দেরি করে ঘরে ফিরে গেট বন্ধ দেখে বড়দা বাবার ভয়ে কাউকে ডাকেনি। পিছনে নাড়ুকাকুদের ছাদে উঠে আমাদের উঠোনে নামতে গিয়েই ধপাস্!
"মাসিমা, এই মেয়েটা সারাক্ষণ উল্টোপাল্টা বকবক করে যাবে, আপনারা মোটেও কান দেবেন না" বলে বোনকে শাঁসানি দিয়ে বিজয়লাল মিহিরকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
একটুখানি স্তব্ধতা। সবাই কিছুটা চুপচাপ। হেলেনও দরজার দিকে তাকিয়েই আছে।
হীরেন সিংহরায় | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:২৪742498