এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  বাকিসব  মোচ্ছব

  • আমার দুবাহু প্রসারিত করে সূর্যের কোন অঞ্চলে

    Shuchismita
    বাকিসব | মোচ্ছব | ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • আমি যখন অ্যালাবামায় থাকতাম, আর মিঠুন ইলিনয়ে, সেই সময়ে পাকিস্তানী কোক স্টুডিওর খুব ভক্ত ছিলাম। 'ইশক কিনারা' গানটা তখনই শোনা। কি আশ্চর্য! এতো আমাদের 'শুকনো পাতার নুপুর পায়ে'র সুরে অন্য কথা বসিয়ে গেয়ে দিয়েছে! মিঠুন খুঁজে বার করল এই সুর এশিয়া মাইনর ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে অনেকদিন ধরেই ঘোরাফেরা করছে। কাজী নজরুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আর্মিতে ছিলেন। সেই সময়েই হয়ত তিনি এই সুর শুনেছিলেন এবং এই সুরে কথা বসিয়ে তৈরী হয়েছিল আমাদের ছোটবেলার গান - 'জলতরঙ্গে ঝিলমিল ঝিলমিল ঢেউ খেলে যে যায়'। মিঠুনের উৎসাহেই দেখা হল এই সুরের সন্ধানে তৈরী হওয়া বুলগেরিয়ান পরিচালক আদিলা পিভার ২০০৩ সালের ডকুমেন্টারি Whose is this song? বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া, গ্রীস ছুঁয়ে তুরস্ক - এই গান নিয়ে পরিচালক ঘুরে বেড়ালেন দেশ-্দেশান্তরে - সব দেশের মানুষই দাবী করল এই সুর তাদের নিজের - এবং যে সুর দৃশ্যতই তাদের বেঁধে রেখেছে সেই সুরের কারণেই শুরু হল মনোমালিন্য।

    এই সুরে বসানো বিভিন্ন দেশের গানগুলো শুনে দেখছিলাম এবং আবারও মিঠুন খুঁজে পেল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় রূপান্তরটি - তুরস্কের ভাষায় তৈরী গানটি "উস্কুদারা" নামে পরিচিত। বাংলা ভাষান্তরে কথাগুলি দাঁড়াবে এরকম - "উস্কুদারের পথে বৃষ্টি নামল, তার পায়জামায় কাদা লেগে আছে, ঘুম থেকে উঠেছে সদ্য, ঝিমধরা চোখ, সে আমার ও আমি তার - কি আসে যায় অন্যের কথায়, মাড় দেওয়া টানটান জামায় কি চমৎকার দেখায় তাকে"। প্রেমের গানে আমরা সচরাচর একজন পুরুষের চোখে নারীকে দেখতে অভ্যস্ত। এই গানের বয়ানে একটা মেয়ের চোখে তার পছন্দের পুরুষটার প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ পাচ্ছে (আমার বিচ্ছিরি অনুবাদে মুগ্ধতা বোঝা গেলনা মানছি, আপনারা ইংরিজি ট্রানস্লেশন পড়ে নিন বরং)। গানটি এই কারণেও আমার বিশেষ প্রিয়।
     
     
    কোপেনহেগেনের একটি চার্চে এই গানের অনেকগুলো রূপ পরিবেশন করেছিলেন Hesperion XXI নামে একটি দল - যার পরিচালকের নাম জর্ডি সাভাল - একজন স্প্যানিশ ভিওলা বাদক। এই গানটার মত তাঁর দলের বাজিয়েরাও ইউরোপ ও এশিয়ার নানা অঞ্চল থেকে জড়ো হয়েছেন। গানটা শুনেছিলাম জর্ডি সাভালের স্ত্রী বিখ্যাত সোপ্রানো মন্তেসেরা ফিগুরার কন্ঠে। এই অনুষ্ঠানটির সময় তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন। তাঁর রেকর্ড করা গানটি চালানো হয়েছিল। ইউটিউবে এই অনুষ্ঠানের রেকর্ডটা দেখে আমরা দুজনেই এত আপ্লুত হয়েছিলাম যে সেদিন থেকেই মনে হত যদি কোনোদিন জর্ডি সাভালের অনুষ্ঠান সামনে বসে শোনার সৌভাগ্য হয়, তা আমাদের সারা জীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। সুযোগ এসেছিল বছর কয়েক পর। জর্ডি সাভাল কানসাসে এসেছিলেন। আমার যাওয়ার উপায় ছিল না, মিঠুনকে জোর করে পাঠিয়েছিলাম। ও খুব চাইছিল আবার একটা সুযোগ আসুক যাতে আমরা দুজনে যেতে পারি। গত বছর খুঁজে বার করল বস্টনে আসবেন জর্ডি সাভাল এবছরের এপ্রিলে। টিকিট তো কাটা হল। কিন্তু ভদ্রলোকের চুরাশি বছর বয়েস। ভয় হচ্ছিল - অসুস্থ হয়ে পড়বেন না তো! শুনতে পাবো তো!

    অবশেষে অপেক্ষা শেষ হল। Hesperion XXI-এর এই পরিবেশনার নাম Songs, Battles, and Dances from the Old & the New World (1100-1780)। প্রোগ্রামের একটা কপি এই লেখার সাথে জুড়ে দেব। শুরু হয়েছিল মারকাব্রু নামে এক একাদশ শতকের কবির ক্রুসেড নিয়ে বাঁধা একটা গান দিয়ে। অভ্যন্তরীন অরাজকতা থেকে নজর ঘোরানোর জন্য একটা মহান আদর্শের নাম করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার কৌশল তো চিরন্তন। এরই অতি উত্তম প্রয়োগ হয়েছিল ক্রুসেডের সময়। গুয়াদালুপের এক শিল্পী অসাধারণ পরিবেশনা করলেন গানটি। এর পরে এল একটি আরামিক প্রার্থনা সঙ্গীত। বেশ কয়েক বছর আগে গ্রীসের থেসালোনিকি শহরে গেছিলাম একটা কনফারেন্স উপলক্ষে। সেখানে অনেক পুরোনো একটা অর্থোডক্স চার্চে পৌঁছেছিলাম সূর্যাস্তের সময়। আমাদের পাড়ার বিশালাক্ষী মন্দিরে যেমন হয়, ঠিক তেমন ধূপধুনোর গন্ধযুক্ত সন্ধ্যারতির আয়োজন চলছিল তখন। একজন পুরোহিত অপূর্ব সুরে আমার অজানা ভাষায় কিছু পাঠ করছিলেন। রেকর্ড করার লোভ সামলাতে পারিনি। মিঠুনকে শুনিয়েছিলাম সেই রেকর্ড, কিন্তু ভাবতে পারিনি ও সেটা মনে রাখবে। আরামিক প্রার্থনা সঙ্গীতটা শোনার সময় আমার মন চলে গেল থেসালোনিকির সেই চার্চে। বিরতির সময় মিঠুন বলল ওরও তখন আমার রেকর্ড করে আনা সন্ধ্যারতিটির কথা মনে পড়ছিল। আমি যে কতখানি আনন্দ পেলাম তা বলার নয় - সৌন্দর্য তো একা উপভোগ করার জিনিস নয়। ভাগ করে নিলে তার মাধুর্য বাড়ে।

    সব গানের কথা তো লিখতে পারবো না। আমি সঙ্গীতে অদীক্ষিত মানুষ। সুরকে আমি দৃশ্যের সাথে, কবিতার সাথে, জীবন বোধের সাথে মিলিয়ে তবে রসগ্রহণ করতে পারি। এটুকু লিখে রাখি - কোনো গান আমায় মনে করাল মিশরে লুক্সরের মন্দিরে নীল তারা আঁকা ছাদের কথা, কেউ আমায় নিয়ে গেল কুয়ার্নাভাকায় ক্রিসমাসের সপ্তাহে এক অপ্রত্যাশিত চার্চ সঙ্গীতের কাছে, কখনো আবার মনে পড়ল আলেকজান্দ্রিয়ায় এক দুর্গে ভূমধ্যসাগরের উন্মত্ত হাওয়ায় লুটোপুটি খাওয়া একটা দুপুরের কথা। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে পেরুর একটি লুপ্ত ভাষার গান ছিল। সেই সুরও নির্ভুল ভাবে মিলে গেল মেঘে ঢাকা আন্দিজের মায়াবী স্মৃতির সাথে। আবারও বলি, আমরা সঙ্গীতে অদীক্ষিত মানুষ। মিঠুন স্বচেষ্টায় কিছুটা শিক্ষিত। আমি তো সেটুকুও নই। গান শুনতে মিডওয়েস্ট থেকে পূর্ব উপকূলে ছুটে যাওয়া কি আমাদের মানায়! তবু যা পেলাম তা নির্দ্বিধায় বলতে পারি সারা জীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। মনে থাকবে এই সন্ধ্যাটা। জর্ডি সাভালকে সামনে থেকে দেখার ও শোনার সুযোগ। মনে থাকবে অনুষ্ঠান ভেঙে হল অর্ধেক খালি হয়ে যাওয়ার পরেও কিছু মানুষের অনুরোধে আরেকটি গানের কথা - আর ক্রমশ এক বিশাল নীল আকাশকে ছুঁয়ে ফেলার মূহুর্তটা। এই যাত্রাটার জন্য মিঠুনের কাছে ঋণী।
     
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Shuchismita | 134.228.***.*** | ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৪৫747347
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন