

ছবি: রমিত
স্থাপত্যের পরের পৃথিবী - বহুমেরু ব্যবস্থা, অর্থনীতি, এবং মানব সহযোগিতার দীর্ঘ পরিক্রমা
প্রথম তিনটে পর্ব পড়ে বন্ধুর প্রশ্ন
শুরুটা হয়েছিল এক বন্ধুর সাথে বিয়ার নিয়ে আড্ডা দিতে দিতে। এই সিরিজের প্রথম তিনটি পর্বের সমস্ত যুক্তি মনোযোগ দিয়ে শুনে সে প্রশ্ন করল, যে প্রশ্নের মুখোমুখি যে কোনো সৎ সিস্টেম-বিশ্লেষককে একদিন না একদিন হতেই হয়, সেটা আপাত সাধারাণ – “সবই তো বুঝলুম, কিন্তু এরপর কী হবে?”
বলাই বাহুল্য এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। জটিল ব্যবস্থার সাথে নির্দেশিকা বা নিশ্চিত সময়সূচি আসে না। কেউ যদি বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটামাত্র আত্মবিশ্বাসী পূর্বাভাস দেয়, সে হয় অতি-সরলীকরণ করছে, না হয় কিছু একটা ধান্ধা আছে! সৎ বিশ্লেষণ যা দিতে পারে তা ভবিষ্যদ্বাণী নয় — বরং সম্ভাবনার মানচিত্র: কোন পথগুলো ব্যবস্থার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ যুক্তিতে কম বা বেশি সম্ভাব্য, আর ইতিহাস থেকে শেখা যে ব্যবস্থাগুলো আজ আধিপত্য দেখাচ্ছে তারা কাল কিভাবে শেষ হয় এবং কী তাদের জায়গা নেয়।
এই চতুর্থ পর্বে আমি ঠিক সেটাই করার চেষ্টা করছি - ভবিষ্যদ্বাণী নয়! কারণ আমি অমৃতলাল নই আর আমার না আছে কোনো পোষা তোতাপাখি! সেই একই কাঠামোর ভেতর দিয়ে "এরপর কী হতে পারে" তা নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ভাবার একটি পদ্ধতি নিয়ে এগুলো - সেই কাঠামো, যা আগের তিনটি পর্বে গড়ে তোলা হয়েছে: গোত্রীয় প্রতিযোগিতায় আমাদের বিবর্তনীয় প্রবণতা, সহযোগিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার গেম থিওরি, থুসিডাইডিসের বাস্তবতা যে নীতির আগেই ক্ষমতা ফলাফল নির্ধারণ করে, এবং পুঁজির ভূমিকা — কখনো সংঘাতের ইন্ধন হিসেবে, আবার কখনো স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে, যখন সংঘাত তার নিজের মুনাফাকেই হুমকিতে ফেলে।
তাহলে সেখান থেকে শুরু করা যাক, যেখান থেকে যেকোনো নিরপেক্ষ ভবিষ্যৎ-বিশ্লেষণ শুরু করতে হয় — অতীত থেকে।
অধ্যায় ১৮: ইতিহাস আসলে আমাদের কী শেখায়
যুদ্ধের পেছনের ব্যাংকাররা
বিশ শতকের দুই মহাযুদ্ধের সবচেয়ে কম আলোচিত একটি দিক হলো — বেসরকারি পুঁজি সেখানে ঠিক কতটা ভূমিকা রেখেছিল। শুধু যুদ্ধের পরে পুনর্নির্মাণে টাকা ঢালার মাধ্যমে নয়, যুদ্ধ চলাকালীন তাদের টাকা ঢালার ব্যাপারটাও। এটা কোনো ষড়যন্ত্রের গল্প নয়। এটা নথিভুক্ত আর্থিক ইতিহাস — এবং এই ইতিহাস আগের তিনটি পর্বে বর্ণিত স্থাপত্যের সাথে অস্বস্তিকরভাবে মিলে যায়।
বিশ শতকের শুরুতে রথসচাইল্ড পরিবার একশো বছর ধরে এমন এক আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল যা অনেকগুলি দেশ জুড়ে ছিল এবং অনেক দেশের সরকারের থেকেও সেই নেটওয়ার্ক বহুগুণে উন্নত ছিল। নাথান রথসচাইল্ডের সেই বিখ্যাত উক্তি, ইংল্যান্ডের সিংহাসনে কে বসল তাতে তার কিছু আসে যায় না, যদি ইংল্যান্ডের অর্থসরবরাহ তার নিয়ন্ত্রণে থাকে — এটা কোনো দম্ভোক্তি ছিল না। এটা ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কোথায় সেটার একটি পদ্ধতিগত বিবরণ। রথসচাইল্ডরা ইউরোপের বিভিন্ন সরকারকে মূলধন যোগান দিত, এমনকি পরস্পর-বিরোধী পক্ষকেও। এটা বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নয়, বরং একই যুক্তি থেকে যা আজও বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকদের চালিত করে: বিচিত্রমুখী বিনিয়োগ ঝুঁকি কমায়, আর যুদ্ধরত সরকারগুলো শান্তিকালীন সরকারের চেয়ে পুঁজির জন্য বেশি মরিয়া — এবং সেই পুঁজির জন্য বেশি মূল্য দিতেও রাজি।
নিয়াল ফার্গুসনের নথিবদ্ধ রথসচাইল্ড বংশের বিশদ ইতিহাসে দেখা যায়, পরিবারটির বন্ড-নেটওয়ার্ক আসলে দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের আদি সংস্করণ হিসেবে কাজ করেছিল। এমন এক ব্যবস্থা যা আর্থিক শৃঙ্খলাকে পুরস্কৃত করে এবং দুঃসাহসিক কাজকে শাস্তি দেয়, যুদ্ধকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে — ফলতঃ যুদ্ধের সম্ভাবনা কিছুটা কমায়, অথচ যখন যুদ্ধ এসেই যায়, তখন সেখান থেকেও মুনাফা করে। ফার্গুসনের যুক্তি হলো, বিশ শতকের গোড়ায় রথসচাইল্ডদের প্রভাব যখন কমে গেল, মূলত ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদের চাপে নেটওয়ার্কটি জাতীয় রেখা বরাবর বিভক্ত হয়ে পড়ায় — তখন যে পরিস্থিতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্ভব করেছিল, সেই পরিস্থিতি তৈরিতে এই ক্ষয় ভূমিকা রেখেছিল। যে আর্থিক কাঠামো ইউরোপীয় সরকারগুলোকে নীরবে লাগাম পরিয়ে রেখেছিল, সেটার সংহতি যখন ভেঙে পড়ল, তখন গোত্রীয় যুক্তি বাধাহীনভাবে ছুটে চলল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জে.পি. মর্গানের ভূমিকা ভিন্ন কিন্তু সমানভাবে শিক্ষণীয় একটি কেস স্টাডি। আমেরিকার যুদ্ধে প্রবেশের আগে মর্গান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের একমাত্র ক্রয়-প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছিল। এমন পরিমাণে ঋণ ও সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিল যা মিত্রশক্তির যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে আর্থিকভাবে টিকিয়ে রেখেছিল। ১৯১৭ সালের মধ্যে মর্গান মিত্রশক্তিকে প্রায় ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল। সে সময়ের হিসাবে বিশাল একটি অঙ্ক, যা মার্কিন আর্থিক স্বার্থ ও মিত্রশক্তির বিজয়ের মধ্যে এমন এক সংযোগ তৈরি করেছিল যা উপেক্ষা করার উপায় ছিল না। রন চেরনোর ‘হাউস অফ মর্গ্যান’ বইতে এই সংযোগ নথিভুক্ত আছে নির্ভুলভাবে। তিনি কোন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত করেননি, কিন্তু অন্তর্নিহিত যুক্তিটি সেই ইঙ্গিতই করে যে পুঁজি যখন একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের সাথে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তখন সেই সেই ফলাফলে পুঁজির স্বার্থ জড়িয়ে থাকে ভালোই।
আমারা যেই উদ্দেশ্যে এই কাঁটাছাড়া করছি, সেখান থেকে এটা বলতে চাইছি না যে ব্যাংকাররা যুদ্ধ বাধায়! বরং আসল শিক্ষাটা আরও সূক্ষ্ম এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি পুঁজি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা সবসময় এমনভাবে জড়িয়ে থেকেছে যা প্রত্থাগত ইতিহাস সাধারণত কমিয়ে বলে। এই জড়িয়ে পড়াটা কোনো সমন্বয় বা ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছি না। এটি কাঠামোগত সংযোজন থেকে উদ্ভূত হয় — একই যুক্তিতে যা পেট্রোডলার পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া তৈরি করে, একই যুক্তিতে যা বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকদের ডলারের স্থিতিশীলতার নীরব রক্ষকে পরিণত করে। যখন আপনার পোর্টফোলিও একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় মূল্য নির্ধারিত, তখন সেই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় আপনার স্বার্থ আছে। যখন সেই ব্যবস্থা হুমকিতে পড়ে, আপনার আচরণ বদলায়। কখনো এমনভাবে যা ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করে, কখনো বা এমনভাবে যা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের মতো, সেই বাধাগুলো সরিয়ে দেয় যা হয়তো বিপর্যয় ঠেকাতে পারত।
থুসিডাইডিস ফাঁদ এবং তার অপ্রতিসম বিবর্তন
থুসিডাইডিস ২,৪০০ বছর আগে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে এথেন্সের উত্থান এবং তা স্পার্টায় যে ভয় তৈরি করেছিল, সেটাই পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল। গ্রাহাম অ্যালিসন তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা "Destined for War"-এ ইতিহাসের ষোলোটি এমন ঘটনা পরীক্ষা করেছেন যেখানে উদীয়মান শক্তি আধিপত্যশালী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছে, এবং দেখেছেন বারোটি ক্ষেত্রেই যুদ্ধ হয়েছে। এই প্যাটার্ন এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে এটির একটি নামও দেওয়া হয়েছে: থুসিডাইডিস ফাঁদ!
কিন্তু থুসিডাইডিস এমন এক পৃথিবীতে লিখেছিলেন যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না, দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত আর্থিক পারস্পরিক নির্ভরতা ছিল না, এবং বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকরা পদ্ধতিগত স্থিতিশীলতায় অভূতপূর্ব স্বার্থ নিয়ে সমান্তরাল শাসন-ব্যবস্থা হিসেবে বসে ছিল না। "শক্তিশালীরা যা পারে তাই করে, দুর্বলরা যা সইতে হয় তাই সয়" — ক্ষমতার এই যুক্তিটি প্রযোজ্য ছিল সেই পৃথিবীতে যেখানে অস্ত্র মোটামুটি সমমানের: সেনাবাহিনী, নৌবহর, ভূখণ্ড। সেই পৃথিবী অদৃশ্য হয়নি, কিন্তু তার ওপর এমন অপ্রতিসমতার আস্তর পড়েছে যা থুসিডাইডিস কল্পনাও করতে পারতেন না।
সাইবার অভিযান ছোট শক্তিগুলোকে বড়দের ওপর উল্লেখযোগ্য মূল্য চাপাতে দেয়, প্রচলিত সামরিক সংঘর্ষের উত্তেজনা-বৃদ্ধির যুক্তি চালু না করেই। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সেগুলো এড়াতে গড়ে ওঠা ছায়া-কাঠামো — সশস্ত্র সংঘাতের দোরগোড়ার নিচে এক ধরনের আর্থিক যুদ্ধ পরিচালনা করে। পারমাণবিক প্রতিরোধের যুক্তি, পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস, মহাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাত ঠেকাতে চমৎকারভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, অথচ ছায়া-সংঘাত, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ক্রমান্বয়ক্ষয় রোধে কিছুই করেনি।
এর ফলাফল হলো এমন এক পৃথিবী যেখানে থুসিডাইডিস ফাঁদ বাস্তব থাকলেও তার প্রকাশ বদলে গেছে। উদীয়মান শক্তিগুলো আধিপত্যশালীদের রণক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করে না, অন্তত সরাসরি নয়। তারা চ্যালেঞ্জ করে পেমেন্ট সিস্টেমে, সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইনে, সমুদ্রের তলার তার-পরিকাঠামোয়, তিন মহাদেশ জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ উত্তোলনে নিজেদের ভূমিকা নীরবে অনিবার্য করে তোলার মাধ্যমে। প্রতিযোগিতা একই। যন্ত্রগুলো বিবর্তিত হয়েছে। এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে, ভুল হিসাবের মূল্য এত বড় হয়ে গেছে যে উভয় পক্ষেরই প্রতিযোগিতা সেই দোরগোড়ার নিচে রাখার গভীর প্রণোদনা আছে, যে একটা সীমা অতিক্রম করলে বিপর্যয়মূলক পরিণতি কেউই সামলাতে পারবে না।
এটাই ক্ষমতার গতিবিদ্যার সেই অপ্রতিসম বিবর্তন যার সাথে আমাদের গোত্রীয় প্রবণতা এখনো তাল মেলাতে পারেনি। আমাদের সহজাত বোধ বলে যে দ্বন্দ্বের নিষ্পত্তি হয় আধিপত্যের মাধ্যমে। বর্তমান ব্যবস্থার কাঠামোগত বাস্তবতা হলো, ঐতিহ্যগত অর্থে একক কোনো শক্তির পক্ষে আর আধিপত্য অর্জন সম্ভব নয়, এবং সেই চেষ্টা করলে সেই ব্যবস্থাটাই ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি থাকে যা সকলকে তাদের বর্তমান মুনাফা দিচ্ছে। খেলাটা বদলে গেছে, কিন্তু প্রবৃত্তি বদলায়নি।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা দরকার। আধুনিক যুগে পারমাণবিক অস্ত্র থুসিডাইডিসের হিসাব মূলগতভাবে বদলে দিয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ যেভাবে ধরে নেয় সেভাবে নয়। বোমাটা প্রথম এবং প্রধানত একটি অস্ত্র নয়। এটি একটি সংকেত, সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও দ্ব্যর্থহীন সংকেত যা একটি রাষ্ট্র একটি গুলি না ছুঁড়েও পাঠাতে পারে। বার্তাটা হল এই রকম: আমাদের দিকে তাকাও, আমরা কী করতে পারি দেখও। প্রতিরোধ-যুক্তি, আমাকে ঘাঁটাতে এসো না, চমৎকারভাবে কাজ করে, কিন্তু কেবল একটি শর্তে: যতক্ষণ লড়াইয়ের খরচ না-লড়াইয়ের খরচকে ছাড়িয়ে যায়। যখন এই শর্ত পূরণ হয়, মহাশক্তিগুলো বাগাড়ম্বর দেখায়, কৌশলে চলে, প্রতিযোগিতা করে — কিন্তু সেই দোরগোড়া পার করে না যেখানে পারস্পরিক বিপর্যয় ঘটে।
কিন্তু প্রতিরোধের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যর্থতার ধরন আছে। যখন কোনো জাতির অস্তিত্বই সংকটে থাকে, হিসাবটা উল্টে যায়। জনগণ এমন দৃঢ়তায় একত্রিত হয় যা কোনো বাইরের শক্তি সহজে পরিমাপ বা মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। সেই মুহূর্তে না-লড়াইয়ের খরচ নিজেই অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলে। সেই মুহূর্তে বিষয়টা আর কার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আছে সেটা নয়, বরং কে যুদ্ধের মূল্য সবচেয়ে বেশিক্ষণ বহন করতে পারবে। সহ্যশক্তি আগ্নেয়শক্তিকে সরিয়ে নির্ণায়ক চল হয়ে ওঠে।
বর্তমানে এটাই ইরানের কৌশলগত যুক্তি। ইরানকে আমেরিকান শক্তিকে হারাতে হবে না। কেবল প্রমাণ করতে হবে যে তাকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা যায় না। আমেরিকার জন্য সীমারেখাটা আলাদা এবং কিছু অর্থে পূরণ করা কঠিন: রেজিম পরিবর্তন, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, যাচাইযোগ্য নিরস্ত্রীকরণের মতো স্পষ্ট ও দৃশ্যমান লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এর কম যেকোনো ফলাফল প্রতিটি পর্যবেক্ষণকারী রাষ্ট্রের কাছে প্রতিশ্রুতির নিচে থাকা ফলাফল হিসেবে দেখা হবে। আর যে রাষ্ট্র এই ব্যবধানের নিরিখে মার্কিন প্রতিরোধের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্মূল্যায়ন করে, সে পরবর্তী সংঘর্ষকে সেইমতো আকার দেয়। প্রতিরোধ কোনো স্থায়ী সম্পদ নয়। এটা একটি সুনাম, প্রতিটি পরীক্ষায় যা গড়ে ওঠে বা ভাঙে।
প্রতিরোধ দ্বিপাক্ষিক নয়। এটা একই সাথে সমগ্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে একটি সংকেত। ইরান এই সংঘর্ষ থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসে, কেবল সামরিকভাবে নয়, ন্যারেটিভের দিক থেকেও — সেটা পড়া হবে পিয়ংইয়ং-এ, কারাকাসে, হারারেতে এবং প্রতিটি রাজধানীতে যেখানে কোনো সরকার আমেরিকান শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার বাস্তব মূল্য আর মার্কিন প্রতিরোধ যে সুরক্ষা দেওয়ার কথা সেটার মধ্যে হিসাব কষছে।
অধ্যায় ১৯: নিয়ন্ত্রকরা স্থিতিশীলতার শক্তি এবং তাদের সীমা
দ্বিতীয় পর্বে বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকদের অদৃশ্য রেফারি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল: এমন প্রতিষ্ঠান যা সরকারগুলোর সামনে প্রণোদনার কাঠামো তৈরি করে, কোনো নির্দেশ না জারি করে, কোনো গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট না খুঁজে। বহুমেরু বিশ্বের দিকে রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে তাদের ভূমিকা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এবং আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ব্ল্যাকরক, ভ্যানগার্ড, স্টেট স্ট্রিট এবং তাদের মতো বেসরকারি সম্পদ নিয়ন্ত্রকদের পদ্ধতিগত স্থিতিশীলতায় সরাসরি স্বার্থ আছে। তাদের হোল্ডিং বৈশ্বিকভাবে বিচিত্রমুখী। যে পৃথিবী পুঁজি নিয়ন্ত্রণ, বাজেয়াপ্তির ঝুঁকি ও বিচ্ছিন্ন আর্থিক সংযোগ সহ বিদ্বেষী ব্লকে ভেঙে পড়ে, সেই পৃথিবীতে এই হোল্ডিংগুলোর মূল্য কমে। বিশৃঙ্খলা মুনাফার জন্য ক্ষতিকর। এটাই তাদের কাঠামোগতভাবে মহাশক্তি প্রতিযোগিতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিশ্লেষণ যে বিপর্যয়মূলক ভাঙন পূর্বাভাস দেয়, তা রুখতে সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত করে।
কিন্তু তাদের স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার কিছু সীমা আছে যা স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার। বেসরকারি পুঁজি সেই ব্যবস্থাগুলোকেই স্থিতিশীল করে যেগুলো মোটামুটি কার্যকর। কার্যকর নয় এমন ব্যবস্থা থেকে তারা সরে যায়। যখন কোনো সরকারের আচরণ নির্দিষ্ট সীমারেখা পেরিয়ে যায়, আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আসার আগেই পুঁজি সেখান থেকে গোটাতে শুরু করে, যেমনটা রাশিয়া ২০২২-এর পর আবিষ্কার করেছে। পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলামূলক প্রভাব বাস্তব, কিন্তু এটি অপ্রতিসমভাবে কাজ করে: স্পষ্ট লঙ্ঘনকারীদের কার্যকরভাবে শাস্তি দেয়, কিন্তু মোটামুটি কার্যকর ব্যবস্থার মধ্যে ধীরে ধীরে জমতে থাকা পদ্ধতিগত উত্তেজনা মোকাবেলায় তেমন কিছু করে না। বেসরকারি নিয়ন্ত্রকরা ২০০৮-এর আর্থিক সংকট ঠেকাতে পারেননি। বহু ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই সেটা তৈরিতে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন।
সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো, যেমনটা দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল, ভিন্ন যুক্তিতে চলে। ভবিষ্যৎ নরওয়েজিয়ান প্রজন্মের পক্ষে নরওয়ের গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল এক ট্রিলিয়নেরও বেশি ডলার পরিচালনা করে। এর সত্যিকারের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে এবং বিনিয়োগে নৈতিক বিধিনিষেধ সম্বলিত ম্যান্ডেট আছে। চীনের সার্বভৌম তহবিলগুলো আর্থিক মুনাফার সাথে সমানভাবে কৌশলগত অবস্থানের হাতিয়ারও বটে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এমন এক সমাজের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বাহন যে জানে তার তেল-সম্পদ সীমিত। এগুলো নিষ্ক্রিয় স্থিতিশীলতার শক্তি নয়। এগুলো সক্রিয় কৌশলগত শক্তি যারা ধৈর্যশীল পুঁজিকে ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এখানে ইতিহাস থেকে শেখার ব্যাপারটা লক্ষণীয়। উনিশ শতকের ইউরোপে রথসচাইল্ড নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতার শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল কারণ এটি সত্যিকার অর্থেই আন্তর্জাতিক ছিল। এমন স্বার্থ নিয়ে যা তার ভেতর থেকে বেড়ে ওঠা জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিপরীতে চলত। যখন উগ্র জাতীয়তাবাদের চাপে সেই আন্তর্জাতিক সংহতি ভেঙে পড়ল, স্থিতিশীলতার কাজও সাথে ভেঙে পড়ল। বর্তমানের বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকরা পৌঁছানোর দিক থেকে আন্তর্জাতিক, কিন্তু শাসন-কাঠামোর দিক থেকে জাতীয়ভাবে নোঙর করা, নির্দিষ্ট বিচারব্যবস্থায় নিবন্ধিত, নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীন, এবং একই সাথে জাতীয়করণের চাপের কাছে সম্ভাব্যভাবে দুর্বল যা এক শতাব্দী আগে রথসচাইল্ড নেটওয়ার্ককে দুর্বল করেছিল।
পৃথিবী যদি স্বতন্ত্র ভূরাজনৈতিক ব্লকে ভেঙে পড়ে, বৈশ্বিক সম্পদের নিয়ন্ত্রকরা এমন এক কাঠামোগত পছন্দের মুখোমুখি হবে যা তারা এতদিন এড়িয়ে আসতে পেরেছে: আপনি কোন পক্ষের? এই প্রশ্নটি যখন সত্যিকার অর্থে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন এটি তাদের স্থিতিশীলতার কাজের প্রকৃতিটাকেই মূলগতভাবে বদলে দেবে।
অধ্যায় ২০: এশিয়া এবং মুখ্য ভারসাম্য পরিবর্তন
আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক পরিবর্তন একক ভাবে আমেরিকান শক্তির পতন নয়। এটা হলো এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক কেন্দ্রাকর্ষণের পুনর্বিন্যাস এবং সেই পুনর্বিন্যাস বৈশ্বিক ব্যবস্থার স্থাপত্যের জন্য কী সংকেত বহন করে।
এশিয়া ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় ৬০ শতাংশ দিচ্ছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা সমতার বিচারে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করবে। আমেরিকার চেয়ে বেশি দেশের সর্বোচ্চ বাণিজ্য অংশীদার চীন। ভারত এই দশকের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার দিকে এগুচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ান (ASEAN) সম্মিলিতভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটি। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তিশক্তি হিসেবে এখনো অপরিসীম। এশিয়ার জনমিতিক ভার, উৎপাদন ক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রাকর্ষণে এমন একটি কাঠামোগত পরিবর্তন যা কোনো ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থাই অনন্তকাল প্রতিরোধ করতে পারবে না।
কিন্তু এশিয়া সেভাবে সংহত কোনো জোট নয় যেভাবে ঐ শব্দসমষ্টি ইঙ্গিত করে। এখানে আছে বিশ্বের দুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, চীন ও ভারত। সম্পর্কটি বিতর্কিত সীমানা, প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক পরিপূরকতার ওপর স্তরে স্তরে জমা গভীর পারস্পরিক সন্দেহ দিয়ে গড়া। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনে মার্কিন মৈত্রী নেটওয়ার্ক অঞ্চলে আমেরিকান কৌশলগত উপস্থিতির নোঙর ধরে রেখেছে। এবং আসিয়ান, যার সদস্যরা দশকের পর দশক ধরে একই সাথে সমস্ত বড় শক্তির সাথে সম্পর্ক রক্ষার শিল্পটা আয়ত্ত করেছে, ভারতও যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চায় তারও এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ।
এশিয়ার আধিপত্যের শতাব্দী, যদি আসে, আমেরিকান আধিপত্যের শতাব্দীর মতো দেখাবে না। এটা একটি একক আধিপত্যশালী শক্তি, একটি রিজার্ভ মুদ্রা এবং একটি নিরাপত্তা স্থাপত্যকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হবে না। এটা হবে আরও অগোছালো, আরও বহুমাত্রিক, আরও আলোচনা-নির্ভর। এই সিরিজ জুড়ে মহাশক্তি প্রতিযোগিতাকে আকৃতি দেওয়া প্রিজনার্স ডিলেমার যুক্তি অদৃশ্য হবে না, কিন্তু টেবিলে খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়বে, যা খেলার ভারসাম্যের বৈশিষ্ট্য এমনভাবে বদলাবে যে পূর্বাভাস দেওয়া সত্যিই কঠিন।
ইতিহাস যেটা দেখায়, ১৮১৫-পরবর্তী ইউরোপীয় কনসার্ট (যেটাকে অনেক সময় কংগ্রেস সিষ্টেমও বলা হয়) থেকে ১৯৪৫-পরবর্তী ব্রেটন উডস পর্যন্ত, সেটা হলো বৈশ্বিক ব্যবস্থার বড় রূপান্তরগুলো সবচেয়ে স্থিতিশীল হয় যখন সেগুলো একতরফা আধিপত্যের মাধ্যমে মীমাংসিত হওয়ার বদলে সম্মত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইউরোপীয় কনসার্ট প্রায় একশো বছর মহাশক্তিদের মধ্যে শান্তি বজায় রেখেছিল কারণ এটি বহুমেরু ভারসাম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল, যেকোনো একক শক্তিকে আধিপত্য দেওয়ার বদলে। ব্রেটন উডস এক প্রজন্ম কাজ করেছিল কারণ এটি আধিপত্যশালী শক্তিকে, আমেরিকাকে, পদ্ধতিগত সুবিধা দিয়েছিল, একই সাথে অন্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট সুবিধাও দিয়েছিল। এশিয়ার শতাব্দীর প্রশ্ন হলো, এই সিরিজে বর্ণিত কাঠামোগত উত্তেজনাগুলো সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার আগেই একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি ও সম্মত হওয়া যাবে কি না। সেই প্রশ্নের কোনো স্বস্তিদায়ক উত্তর নেই।
অধ্যায় ২১: যে পাঁচটি পথে সিষ্টেম এগুতে পারে
এবার যা লিখতে যাচ্ছি তা কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এটা সেই পথগুলোর একটি কাঠামোবদ্ধ মানচিত্র যা ব্যবস্থার নিজস্ব যুক্তি সম্ভাব্য করে তোলে, এবং প্রতিটির পথের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সংগতি এবং নিজস্ব মূল্য রয়েছে।
প্রথম পথ: সুশৃঙ্খল রূপান্তর
সবচেয়ে আশাবাদী পথটিতেই ঐতিহাসিক নজির সবচেয়ে কম। যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করে যে ডলারের আধিপত্য ভেঙে পড়া পর্যন্ত আঁকড়ে ধরার চেয়ে একটি মার্জিত পতন পরিচালনা করা ভালো, এবং সংস্কারের মাধ্যমে বহুমেরু মুদ্রা ব্যবস্থা নির্মাণে সহযোগিতা করাও। ডলার উল্লেখযোগ্য রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা বজায় রাখে, কিন্তু ইউরো, আরও আন্তর্জাতিকায়িত ইউয়ান এবং হয়তো আইএমএফ-এর স্পেশাল ড্রয়িং রাইটসের নতুন কোনো রূপের সাথে ভাগ করে নেয়। বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রকরা, যাদের স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয় একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর ব্যবস্থায়, রূপান্তরকে বাধা দেওয়ার বদলে সমর্থন করতে তাদের প্রভাব ব্যবহার করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশ পাউন্ডের রিজার্ভ মুদ্রা আধিপত্য থেকে সরে আসা সবচেয়ে কাছের ঐতিহাসিক সাদৃশ্য, এবং তাতেও উল্লেখযোগ্য ট্রমা ছিল। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট ছিল সেই মুহূর্ত যখন ব্রিটেনকে এক অপমানজনক সপ্তাহে স্বীকার করতে বাধ্য হতে হয়েছিল যে তার বৈশ্বিক ক্ষমতা এখন মার্কিন অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। একটি সুশৃঙ্খল মার্কিন রূপান্তরের জন্য এমন কৌশলগত প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক সাহস দরকার যা চার বছরের নির্বাচনী চক্র সহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো কাঠামোগতভাবে দীর্ঘ সময় ধরে রাখা কঠিন মনে করে। কিন্তু এটাই সেই ফলাফল যা সবাইকে সার্ভ করবে, আমেরিকাসহ, বিকল্পের চেয়ে ভালোভাবে।
সুবিধা: পদ্ধতিগত স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, রূপান্তরের মূল্য ভাগ হয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য কাজ করতে থাকে, নিয়ন্ত্রকরা তাদের মুনাফার জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীল পরিবেশ ধরে রাখে।
অসুবিধা: ক্ষয়মান আধিপত্যশালী শক্তিকে তার স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক সহজাত প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়, উদীয়মান শক্তিগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক জোর পাওয়ার বিনিময়ে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে হয়, এবং এর প্রায় কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই।
দ্বিতীয় পথ: ভাঙন, পতন ছাড়া
কাছাকাছি সময়ের জন্য আরও সম্ভাব্য পথটি কোনো নাটকীয় রূপান্তর নয়, বরং ধীর ফাটল ধরা। ডলার ভেঙে পড়ে না, কোনো বিকল্পও তাকে জয় করে না, কিন্তু পৃথিবী নীরবে আধা-আলাদা মুদ্রা ও বাণিজ্য জোটে সংগঠিত হয়। পশ্চিম গোলার্ধে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ অংশে, এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার মূল পরিকাঠামোয় ডলারের আধিপত্য টিকে থাকে। বেল্ট অ্যান্ড রোড দেশগুলোতে, পণ্যবাজারে এবং নীরবে নির্মিত সমান্তরাল পেমেন্ট স্থাপত্যে ইউয়ানের প্রভাব বাড়ে। ইউরোপের মধ্যে ইউরো সংহত হয়। ভারত কৌশলগত দ্ব্যর্থতা বজায় রাখে, দুই জোটের সাথেই বাণিজ্য করে, কোনো একটিতে নিজেকে আটকে রাখে না।
এটা হলো বিভাজন-সাম্যাবস্থা, এবং এটা ইতিমধ্যে চলছে বলা যায়। এটা অনুজ্জ্বল এবং কম রিপোর্ট হওয়া কারণ এতে কোনো নির্ণায়ক সংঘর্ষের নাটকীয়তা নেই। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব গভীর। আধা-আলাদা অর্থনৈতিক জোটের পৃথিবী কম দক্ষ: বাণিজ্য ব্যয় বাড়ে, পুঁজি বরাদ্দ কম সর্বোত্তম হয়, এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে সমন্বয় সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি হয়েছিল সেগুলো মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী প্রস্তুতি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের অপ্রসার, কোনো কিছুই জোটের সীমানা মানে না। প্রথম পর্বে বর্ণিত সম্মিলিত কর্মসংক্রান্ত সমস্যাগুলো বিভক্ত পৃথিবীতে সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে, অসম্ভব নয়, তবে কঠিন।
সুবিধা: বিপর্যয়মূলক ভাঙন এড়ায়, ধীরে অভিযোজনের সুযোগ দেয়, জোট জুড়ে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বজায় রাখে।
অসুবিধা: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দক্ষতা কমায়, ভাগাভাগি চ্যালেঞ্জে সমন্বয় কঠিন করে, এবং চাপের মধ্যে বৃদ্ধি পেতে পারে এমন স্থায়ী দ্বন্দ তৈরি করে।
তৃতীয় পথ: প্রযুক্তির পুনর্লিখন
ডলার বা ইউয়ান, কেউই বর্তমান প্রতিযোগিতা জেতে না, কারণ বৈশ্বিক অর্থায়নের অন্তর্নিহিত পরিকাঠামো উভয়ের নিচ থেকেই বদলে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা, যা বর্তমানে একশোরও বেশি দেশ তৈরি করছে, চীনের ডিজিটাল ইউয়ান ইতিমধ্যে উন্নত মোতায়েনের পর্যায়ে আছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পেমেন্ট পথকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে পারে যা বর্তমান কাঠামোর ধারণাগুলো গুরুত্বহীন করে দেয়। ব্লকচেইন-ভিত্তিক সেটেলমেন্ট সিস্টেম কার্যত ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা কমাতে পারে, যেগুলো বর্তমানে ডলার-মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুঁজি বরাদ্দে প্রয়োগ হলে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও প্রকৃতি এমনভাবে বদলাতে পারে যা এখনকার নিয়ন্ত্রক কাঠামো আগে থেকে অনুমান করতে পারবে না।
শক্তির রূপান্তর আরেকটি মাত্রা যোগ করে। পেট্রোডলার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল তেলে চলা পৃথিবীর জন্য। সৌরশক্তি, বায়ু ও ব্যাটারি স্টোরেজ যখন তাদের খারচ কমানোর ধারা অব্যাহত রাখে, বৈশ্বিক শক্তি ব্যবস্থায় তেল ও গ্যাসের খবরদারী প্রভাব কমতে থাকবে, যদিও এখনো কিছুদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে। হাইড্রোকার্বনের বদলে ইলেকট্রনে বেশি চলা পৃথিবীতে একই পেট্রোডলার ব্যবস্থার হয়তো প্রয়োজনই পড়বে না। ডলার আধিপত্যের পরিকাঠামো পরাজিত নাও হতে পারে, এটা কেবল কম প্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে, কারণ যে শক্তি ব্যবস্থাকে ঘিরে এটা তৈরি হয়েছিল, সেটাই রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।
সুবিধা: সম্ভাব্যভাবে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সম্পূর্ণ বাইপাস করে, বর্তমান ব্যবস্থার উত্তরাধিকারের ভার বহন করা ছাড়াই সত্যিকারের নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার জায়গা তৈরি করে।
অসুবিধা: প্রযুক্তিগত রূপান্তর কদাচিৎ মসৃণ হয়, ক্ষমতার নতুন ঘাঁটি ও সামাজিক ব্যবস্থায় নতুন দুর্বলতা তৈরি করে, এবং নতুন স্থাপত্য গঠনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রগুলোই বর্তমানটি নিয়ে প্রতিযোগিতায় আছে।
চতুর্থ পথ: অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়
বাইরের কাঠামো ধরে থাকে, কিন্তু আধিপত্যশালী শক্তির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অর্থনীতি আগেই ভেঙে পড়ে। আমেরিকার ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ কোনো স্থায়ী অবস্থা নয়। এটা একটি ট্রাজেকটরি - আর যে ট্রাজেকটরি চলতে পারে না, সেটা চলে না। কোনো এক সময়ে, ঋণ সংকটের মাধ্যমে, আর্থিক সমন্বয় রুখে দেওয়া রাজনৈতিক অচলাবস্থার মাধ্যমে, অথবা বিনিয়োগকারীদের বর্তমান হারে ডলার সম্পদ ধরে রাখতে ইচ্ছুক রাখার প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষয়ের মাধ্যমে, আমেরিকান আর্থিক মডেলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো সমাধান দাবি করবে।
রোম জয় করা হয়নি। সে তার নিজের সাম্রাজ্যের পরিকাঠামো, রাস্তা, সেনাবাহিনী, প্রশাসনিক ব্যবস্থা যা রোমান শৃঙ্খলাকে তার ভেতরের মানুষদের কাছে মূল্যবান করে তুলেছিল, বজায় রাখতে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। এই ঐতিহাসিক তুলনাটা অসম্পূর্ণ, প্রতিটি ঐতিহাসিক তুলনাই তাই, কিন্তু পদ্ধতিগত যুক্তিটা চেনা যায়। সাম্রাজ্যগুলো প্রায়ই বাইরের পরাজয়ের মাধ্যমে নয়, অভ্যন্তরীণ ক্লান্তির মাধ্যমে শেষ হয়, যখন সেই ব্যবস্থাটা বজায় রাখার খরচ ব্যবস্থার সম্পদ উৎপাদনের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়।
এই পথটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক কারণ এটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে কম মনোযোগ পায়, যা বাইরের চ্যালেঞ্জারদের দিকে মনোযোগ দেয়, অভ্যন্তরীণ সীমার দিকে নয়। এটাই সেই পথ যা বর্তমান মার্কিন রাজনীতিতে সবচেয়ে সরাসরি দৃশ্যমান: যে আর্থিক মেরুকরণ ঋণ হ্রাস রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব করে তোলে, যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয় সরকারের কার্যকারিতা কমায়, এবং যে সামাজিক বিভাজন নির্বাচনী চক্রে টেকসই কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা কঠিন করে তোলে।
সুবিধা: সরাসরি কোনো সুবিধা নেই। একটি বিনম্র মার্কিন পদক্ষেপ সত্যিকারের বহুমেরু প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারে। কিন্তু রূপান্তর সম্ভবত অগোছালো এবং বেদনাদায়ক হবে।
অসুবিধা: অপ্রত্যাশিত, সম্ভাব্য দ্রুত, এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে খারাপ ধরনের পদ্ধতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং নিয়ন্ত্রকদের মুনাফার জন্যও।
পঞ্চম পথ: বৃহত্তর সংঘাত
কাছাকাছি সময়ে সম্ভাব্য নয়, এবং ঠিক এজন্যই এটিকে ঠিক ভাবে বলতে হবে কারণ যে প্রণোদনা-কাঠামো বর্তমানে এটি অসম্ভাব্য করছে, তা স্থায়ী নয়। প্রতিযোগিতার অপ্রতিসম হাতিয়ারগুলো, সাইবার অভিযান, অর্থনৈতিক জবরদস্তি, ছায়া-নৌবহর সংঘর্ষ, ক্রমশ এমন দ্বন্দের মাত্রা স্বাভাবিক করে দিয়েছে যা আগের প্রজন্ম যুদ্ধ বলে চিহ্নিত করত। কোনো এক মুহূর্তে একটি ভুল হিসাব, একটি দুর্ঘটনা, অথবা একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, যখন উত্তেজনা বৃদ্ধি মিট মাটের চেয়ে ভালো বিকল্প মনে হয়, সিস্টেমটাকে সেই দোরগোড়া পেরিয়ে নিয়ে যেতে পারে যা পারস্পরিক প্রতিরোধ-যুক্তি এতদিন বজায় রেখেছে।
ঐতিহাসিক তুলনা এখানে বেশ মসৃণ এবং শিক্ষণীয়। ১৯১৪ সালের ইউরোপ ছিল গভীরভাবে অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল মহাদেশ। বড় শক্তিগুলো পরস্পরের সাথে ব্যাপকভাবে বাণিজ্য করত। তাদের আর্থিক ব্যবস্থাগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত ছিল। রথসচাইল্ড নেটওয়ার্ক ও তার উত্তরসূরিরা একশো বছর ধরে সংঘাতে বাধা দেওয়ার শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছিল। তবুও সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতার কাঠামোগত উত্তেজনা, মৈত্রী ব্যবস্থাগুলো যা একটি আঞ্চলিক হত্যাকাণ্ডকে মহাদেশীয় বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল, এবং সংগঠন-তালিকাভুক্তির সময়সূচি ধীর করার প্রতিটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা — এই সব মিলে সে সময় পর্যন্ত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক সংঘাত ঘটিয়েছিল।
শিক্ষাটা এই নয় যে সংঘাত অনিবার্য। শিক্ষাটা আরও জরুরি: পারস্পরিক নির্ভরতা বিপর্যয়মূলক ফলাফলের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সুরক্ষা নয় যখন ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত উত্তেজনাগুলোকে সমাধান ছাড়াই জমতে দেওয়া হয়। প্রিজনার্স ডিলেমা নিজে নিজে সমাধান হয় না। এটার হয় একটি প্রয়োগ-প্রক্রিয়া দরকার অথবা টেকসই পারস্পরিক স্বীকৃতি দরকার যে বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য সুবিধাকে ছাড়িয়ে যায়। চাপের মধ্যে উভয়ই ভঙ্গুর।
সুবিধা: কোনো সুবিধা নেই।
অসুবিধা: সভ্যতাগত মাত্রার।
অধ্যায় ২২: বহুমেরুতা আসলে কি?
"বহুমেরুতা" শব্দটা এমনভাবে ব্যবহার হয় যেন এটা কোনো গন্তব্যের বর্ণনা। এটাকে বরং একটি রূপান্তরের বর্ণনা হিসেবে বোঝা ভালো, আর রূপান্তর সহজাতভাবে অস্থিতিশীল সময়, যেখানে পুরনো ব্যবস্থার নিয়ম আর পুরোপুরি প্রযোজ্য নয় এবং নতুন ব্যবস্থার নিয়মও এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইউরোপীয় কনসার্ট, একটি কার্যকর বহুমেরু ব্যবস্থার সবচেয়ে কাছের ঐতিহাসিক উদাহরণ, প্রায় একশো বছর কাজ করেছিল কারণ এটি ভাগ করা বৈধতার নীতির ওপর দাঁড়িয়েছিল: রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অগ্রাধিকার, বিদ্যমান ব্যবস্থার বিপ্লবী চ্যালেঞ্জের অবৈধতা, এবং বিরোধ উত্তেজনায় পরিণত হওয়ার আগে সমাধানের জন্য মহাশক্তি পরামর্শের প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত এটা ব্যর্থ হয়েছিল কারণ এটি শিল্পায়নের ফলে উৎপন্ন মৌলিক পরিবর্তনগুলো, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান এবং নতুন শক্তির আবির্ভাব যাদের স্বার্থ কনসার্টের কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তৈরি হয়নি, সামলাতে পারেনি।
একবিংশ শতাব্দীর বহুমেরু ব্যবস্থা অনুরূপ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। যে নীতিগুলো এটিকে ভিত্তি দিতে হবে, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সংযম, বিরোধ সমাধানের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, এবং সাইবারস্পেস, মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহ প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্রের জন্য ভাগ করা নিয়ম — নাম নেওয়া সহজ, কিন্তু সম্মত হওয়া অসম্ভব কঠিন। প্রতিটি শক্তির নিজের অবস্থানের পক্ষে নতুন নিয়মগুলো আকার দেওয়ার প্রণোদনা আছে। প্রিজনার্স ডিলেমার যুক্তি কেবল এই কারণে অদৃশ্য হয় না যে সবাই একমত যে বহুমেরুতা আধিপত্যশীল কর্তৃত্বের চেয়ে পছন্দের।
এশিয়া যে ব্যবস্থাই উদ্ভব হোক না কেন তাতে যে মুখ্য ভূমিকা রাখবে তা আকাঙ্ক্ষামূলক নয়, বরং পদ্ধতিগত। অর্থনৈতিক ভার এতটাই বড় যে এটা প্রান্তিক ব্যাপার হিসেবে সংগঠিত হবে না। কিন্তু এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিভাজন, চীন ও ভারতের মধ্যে, চীন ও জাপানের মধ্যে, ভিন্ন মেলবন্ধন ও ভিন্ন দুর্বলতার আসিয়ান সদস্যদের মধ্যে, মোদ্দা কথা হলো নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণে এশিয়া সম্ভবত এক কণ্ঠে কথা বলবে না। এটা গঠনমূলক নেতৃত্বের উৎস হওয়ার মতোই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হবে।
তাই বহুমেরু পৃথিবীর সবচেয়ে বাস্তব সংস্করণটা সমান শক্তিগুলোর স্বার্থে সহযোগিতার কোনো সুরেলা কনসার্ট নয়। এটা আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, আরও লেনদেনমূলক, আরও আঞ্চলিকভাবে সংগঠিত পৃথিবী, যেখানে বৈশ্বিক সমন্বয় কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়, যেখানে ভুল হিসাবের মূল্য যথেষ্ট উচ্চ যাতে উল্লেখযোগ্য সংযম বজায় থাকে, এবং যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নির্মিত প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে সংস্কার, পরিপূরক বা প্রতিস্থাপিত হয়, ১৯৪৫-এ বিদ্যমান ক্ষমতা বিতরণের বদলে প্রকৃত ক্ষমতা বিতরণ প্রতিফলিত করে নতুন কাঠামো দিয়ে।
সেই পৃথিবীর বর্তমানের চেয়ে বাস্তব সুবিধা আছে: এটা ক্ষমতা আসলে কোথায় আছে সে সম্পর্কে আরও সততার সাথে কথা বলে, এটা একটি দেশের আর্থিক স্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়, এবং এটা ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসন প্রয়োগের আরও পথ তৈরি করে। কিন্তু এর চরম মূল্যও আছে: এটা কম দক্ষ, কম সংহত, এবং সমন্বয় ব্যর্থতার ঝুঁকি সম্পন্ন, যা অনেক সময়েই যৌথ বিপর্যয় ডেকে আনে।
বহুমেরুতার সুবিধা তার মূল্যকে ছাড়িয়ে কি না সে প্রশ্নের উত্তর বিমূর্ত ভাবে মিলবে না। উত্তর আসবে রূপান্তর পরিচালনাকারী শক্তিদের নেওয়া এবং না-নেওয়া সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।
অধ্যায় ২৩: আমাদের প্রবণতা কী বলে, এবং আমরা কী করতে পারি
এই সিরিজ শুরু হয়েছিল বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে। আমাদের গোত্রীয় প্রবণতা, দলকে রক্ষার এবং বাইরের দলকে অবিশ্বাস করার গভীর সহজাত বোধ, মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় অভিযোজনমূলক ছিল। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য এটি ঠিক খাপ খায় না, যেখানে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো হলো জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারীর ঝুঁকি, পারমাণবিক অস্ত্রের অপ্রসার, আর্থিক অস্থিতিশীলতা। এগুলো সম্মিলিত কর্মসংক্রান্ত সমস্যা যা কোনো একা-চলা জোট বা গোষ্ঠী সমাধান করতে পারবে না।
অ্যাক্সেলরড যে "টিট-ফর-ট্যাট" কৌশল চিহ্নিত করেছেন স্বার্থপর শক্তিদের মধ্যে স্থিতিশীল সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে, সেটার তিনটি শর্ত দরকার: বারবার মিথস্ক্রিয়া, পারস্পরিক স্বীকৃতি, এবং ভবিষ্যতের পক্ষে যথেষ্ট মূল্য যাতে শক্তির খেলাওয়ারড়া স্বল্পমেয়াদী লাভের জন্য তা বিসর্জন না দেয়। তিনটি শর্তই বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান। বড় শক্তিগুলো বারবার ও অবিচ্ছিন্নভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তারা একে অপরকে চেনে। এবং বিপর্যয়মূলক সংঘাতের মূল্য, তাদের সকলের জন্যই এতটাই বেশি যে ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ করার মূল্য আছে বোঝাই যায়।
যা নেই সেটা সহযোগিতার পূর্বশর্ত নয়। যা নেই সেটা হলো বিদ্যমান প্রণোদনাগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক ফলাফলের বদলে সহযোগিতামূলক ফলাফলের দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ব্রেটন উডস এক যুগের জন্য সেই কাঠামো দিয়েছিল। পেট্রোডলার ব্যবস্থা আরেক যুগের জন্য তাকে পরিপূরক করেছিল। উভয়ই তৈরি হয়েছিল এমন এক পৃথিবীর জন্য যা আর নেই। যে পৃথিবী উদ্ভব হচ্ছে তার কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।
এটা তৈরি করতে লাগবে এমন কিছু যা আমাদের বিবর্তনীয় প্রবণতার পক্ষে টিকিয়ে রাখা কঠিন: স্বল্পমেয়াদী স্বার্থে সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার সদিচ্ছা দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতিগত স্থিতিশীলতার বিনিময়ে। উদীয়মান শক্তিগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দেওয়ার সদিচ্ছা তাদের ব্যবস্থার মূল নিয়মের প্রতি অঙ্গীকারের বিনিময়ে। পৃথিবীর চ্যালেঞ্জগুলোকে জিরো-সাম প্রতিযোগিতার বদলে সম্মিলিত সমস্যা হিসেবে দেখার সদিচ্ছা যার সমাধান সম্মিলিতভাবে করতে হবে।
কিছুই নিশ্চিত নয়। ইতিহাসে পদ্ধতিগত সংকটের মুখে সফল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনের উদাহরণ আছে, ব্রেটন উডস সবচেয়ে স্পষ্ট, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার উদাহরণও আছে ঠিক সেই মুহূর্তে যখন সাফল্য সবচেয়ে দরকার ছিল, ১৯১৪ ও ১৯৩৯ এখানে সবচেয়ে বেদনার কথা মনে করিয়ে দেয়।
আজকের পার্থক্য এই নয় যে সহযোগিতার প্রণোদনা আগের চেয়ে শক্তিশালী, যদিও কিছু মাত্রায় তাই। আজকের পার্থক্য হলো ব্যর্থতার পরিণতি মানব ইতিহাসের যেকোনো আগের মুহূর্তের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান, বেশি তাৎক্ষণিক, এবং বেশি সর্বজনীনভাবে ভাগ করা। একটি বিশৃঙ্খল ডলার সংকট যে মাত্রার আর্থিক পতন ঘটাতে পারে, এখন বিদ্যমান অস্ত্র ব্যবস্থা জড়িত কোনো সংঘাত, সমন্বয় ব্যর্থতার কারণে চালিত জলবায়ু গতিপথ, এগুলো এমন হুমকি নয় যা প্রধানত দুর্বলদের ওপর পড়ে যখন শক্তিশালীরা সুরক্ষিত থাকে। এগুলো সকলের ওপর পড়ে।
সেই ভাগ করা দুর্বলতা সহযোগিতা উৎপন্ন করতে যথেষ্ট নয়। কিন্তু এটা সম্ভবত আগের প্রজন্মের কাছে যা ছিল তার চেয়ে বেশি শক্ত ভিত্তি। খেলাটা সেই একই খেলা যা আমাদের পূর্বপুরুষরা সাভানায় খেলতেন। বাজিটা কেবল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বৈশ্বিক ক্ষমতার স্থাপত্য সবসময় মানুষ তৈরি করেছে, তাদের সবচেয়ে খারাপ সহজাত বোধ এবং সর্বোত্তম বিচারের মাঝামাঝি পথ চলে। এই সিরিজের পর্ব এক থেকে চারে যে প্রশ্নটা ঘুরে ঘুরে এসেছে, নিশ্চিত উত্তর দেওয়ার দাবি না করে সেটা হলো: আমাদের মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ, যথেষ্ট সংখ্যক সঠিক অবস্থানে, ব্যবস্থাটাকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে দেখতে পারছে কিনা, বর্তমান কাঠামো নিজের দ্বন্দ্বের ভারে ভেঙে পড়ার আগেই পরবর্তী স্থাপত্য তৈরিতে সাহায্য করতে পারব কিনা।
সেটা, যেমন সবসময় হয়ে আসছে, এখনো একটি খোলা প্রশ্ন। উত্তরটা নির্ভর করে আমরা পরবর্তীতে কী করি।