

ছবি: রমিত
বড় রোড। গাড়িটার স্পিড্ বারবার কমে যাচ্ছে। ব্রেক চিপে দাঁড়িয়ে পড়ছে। রাস্তায় জ্যাম আজ বেশি। বৃষ্টি হচ্ছে রাত থেকে। চারিদিকে জল কাদা। কাদামাখা বৃষ্টির জল সাদা সুমো গাড়িটা কালছে করে ফেলছে। গাড়িটা এবার বড় রাস্তা থেকে ছোট একটা রাস্তায় ঢোকার চেষ্টা করে চলেছে। রোডের মুখের অনেকগুলো গাড়ি পরপর আটকে আছে। ভিড় ওখানটায় খুব। হর্ণ বেজে চলেছে নানারকম। সাদা গাড়িটা ছোট রাস্তাটায় ঢুকে পড়েছে। আরো দু চারটে গলি পেরিয়ে জ্যামে আটকে পড়েছে আবার। হর্ণ দিচ্ছে। মাঝের সিটে জানালার ধারে একজন ভদ্রমহিলা বসে আছে। বারবার উঁকি মারছে বাইরের দিকে। ওখানে জানালার কাচটা খোলা। বৃষ্টির জলে মহিলাটির মুখে গায়ে গিয়ে পড়ছে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। খুব মনোযোগ দিয়ে আশপাশের উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলোর দিকে দেখছে তাকিয়ে তাকিয়ে। খোঁজার চেষ্টা করে চলেছে কোনও কিছু। তারপাশে বসা আরো দুজন পুরুষ। সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে আরো একজন। পিছনের সিটে আরো জনা তিনেক পুরুষ। খানা খন্দে দুএকবার গাড়ির চাকা আটকে গিয়ে আবার চলতে শুরু করেছে গাড়ি গলির ভেতর।
গাড়িটা এসে থেমে গেল সবুজ রঙের একটা বিল্ডিংএর সামনে। এখানটায় মানুষের ভিড় বেশি। পান বিড়ি সিগেরেট গুটখার দোকান। দলটা গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। উঠছে এবার বিল্ডিংএর সিঁড়ি বেয়ে। ওই যে সিঁড়িতে একেবারে সামনে চলেছেন উনি সেই গাড়ির জানালার পাশে বসে থাকা ভদ্রমহিলা। সালোয়ার কামিজ পরা। কাঁধে ঝুলছে লেডিস ব্যাগ। হাতে কালো রঙের একটা ফাইল। কোলকাতা থেকে এসেছেন বাহাত্তর ঘণ্টার জার্নি করে। আগের দিন রাতে এসে পৌঁছেছেন। তপতী ভৌমিক। পিছনে যে বেশ লম্বা চওড়া পুরুষ মানুষেরা তারা পুলিশ। দুজন মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চএর। আর বাকি দুজন কোলকাতা পুলিশের। দলটা উঠছে। রাস্তার চিৎকার চ্যাঁচামেচির শব্দ কমছে ক্রমশ। দু-তলা পেরিয়ে তিনতলা। দলটা থেমে গেল। দরজাটা পুরোনো। বড় সাইজের একটা দরজা। দরজার পাশ দিয়ে দেওয়ালগুলো ড্যাম্প পড়া। দেওয়ালের নীল রংটা ড্যাম্প পড়ে আরো ডার্ক হয়ে ছোপ ছোপ হয়ে গেছে। দরজার সামনে একটুখানি দাঁড়ানোর জায়গা। কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আছে তপতী ভৌমিক। পেছনে সিঁড়ির ধাপে অন্যরা। কড়া নাড়ছেন। কোনও সাড়া নেই ভেতর থেকে। শব্দ হচ্ছে কেবল বাইরে বৃষ্টির। আর কড়া নাড়ার শব্দ। দরজাটা কাঠের। কাঠের উপর লোহার কড়া নাড়ানোর শব্দটা বাড়ছে। জোরসে। কলিং বেলের পাশ দিয়ে আঙুলের ছাপে ছাপে কালো কালো ছাপ। সুইচের নিচটাতে কেবল সুইচের আসল ঘিয়ে রঙটা বেরিয়ে আছে। ওখানে বার তিন চারেক চাপ দেওয়ায় কোনও শব্দ হয়নি। কলিং বেলটা খারাপ। বা বন্ধ করা আছে ভেতর থেকে। এবার দরজার বাইরে কথার শব্দ হচ্ছে। তপতী ভৌমিক আর চারজন পুরুষের ভেতর কথা হচ্ছে। কথার শব্দটা বাড়ছে। কড়া নাড়ানো হচ্ছে এবার আরো জোরসে। কড়া নাড়ানোর শব্দটা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কানে এসে লাগছে। ভেতর থেকে এখনও কোনও শব্দ নেই। এবার টুক করে একটা শব্দ। ছিটকিনি খুলছে কেউ ভেতর থেকে। দরজা খুলে গেল। ফর্সা এক মহিলা। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে ভেতরে। দরজা খোলার সাথে সাথে একটা গানের শব্দ বেরিয়ে এলো বাইরে। ইয়ে দিল দিওয়ানা… দিওয়ানা ইয়ে দিল। দরজায় দাঁড়ানো মহিলার হাতে একখানা হাতপাখা। হাওয়া খাচ্ছে সেটা দিয়ে। আরেক হাতের নীচে চেপে ধরে আছে একটা বালিশ। চোখ দুটো চেড়া চেড়া, ভ্রুটা মোটা। চুলটা মাথার উপর দিকে খোপা করে বাঁধা। মোঙ্গোলিয়ান ফেস। ভারী চাহারা। ঢিলে চামড়া ঝুলে পড়েছে এধারে ওধারে। ছাপার স্লিভলেস ব্লাউজ। চুমকি বসানো সিন্থেটিক শাড়ি। সামনে আঁচল দিয়ে পরে কোমোরে একপাশ গোঁজা। মহিলাটির পেছন দিয়ে ঘরটা এবার দেখা যাচ্ছে। চড়া নীল রঙ করা একটা ছোট মতোন ঘর। টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে ভেতরে। ঘুপচি ঘরখানা। দরজাটা খুলে নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেয়ে চলেছে মহিলাটি। কিছু একটা বলায় আস্তে আস্তে কি একটা বলল প্রথমে। ঠিক শোনা গেল না। তারপর চুপ। শুধু বোঝা গেল নেপালি ভাষায় কথাটা বলেছে। বোঝ যাচ্ছে মহিলা নেপালের । এক মিনিট থেমে তপতী ভৌমিক ভেতরের মহিলাটিকে জিজ্ঞাসা করছে কিছু।
এবার ঘরের মহিলা উত্তর দিচ্ছে ভাঙা সুরে হিন্দিতে। কিস্সে চাহিয়ে। হাতের পাখাটা নাড়িয়ে চলেছে এখনও। হিন্দি গানের সঙ্গে ঘরের ভেতর থেকে বাচ্চাদের কথার শব্দ আসছে। দরজার বাইরের দলটার চোখেমুখে উত্তেজনা। তাদেরই একজন একটা কাগজ দেখাচ্ছে বার করে। জোর গলায় বলছে কথা। ভেতর থেকে মহিলা একবার তাকালো কাগজটার দিকে। খুব একটা কিছু বলল না দেখে। আর দেরী করতে চাইছে না দলটা। ঢুকে যেতে চাইছে ভেতরে। বেশ জোরে হেঁটে ঢুকে পড়ল । ভেতরের মহিলাটি একটু সরে দাঁড়ালো। চেড়া চোখ দিয়ে নিরুদ্বিগ্নু দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে রইল সেভাবেই। এবার গানের শব্দটা আরো একটু জোরে শোনা যাচ্ছে। হাত পাখাটা চলতে লাগল আবার। ইয়ে দিল দিওয়ানা… দিওয়ানা ইয়ে দিল…। গানটা বেজে চলল। বাইরে একটু ঠান্ডা লাগছিল। ভেতরে ঢুকে পড়ে ঠান্ডা ভাবটা কমে গেল। বদ্ধ। গুমোট। কিরকম একটা ভ্যাপসা গন্ধ ভিতরে। গন্ধটা কিসের। কোনও ধূপের ! না শুধু ধূপের গন্ধ না। সঙ্গে মিশে আছে কিরকম মাংসের মতো কিছু খাবারের গন্ধ। একটু আগেই খেয়েছে কেউ এই ঘরে বসে। গন্ধটা এখনো আটকে আছে ঘরের ভেতর। আর ঘামের গন্ধ। বোটকা গন্ধ। তেলের গন্ধ। আরো কোনও গন্ধ আছে। চারপাশের দেওয়ালে নানারকম ছবি। সালমান খান, শিব ঠাকুর, শাহরুখ খান, শেরওয়ালী, লাড্ডু হাতে গণপতি, মাধুরী দিক্ষিত, আমীর খান, রাণী মুখার্জি, জুঁই চাওলা…। কোনওটার রঙ চটে গিয়েছে। কোনোওটার উপরের প্লাস্টিকের পরতটা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে উঠে আছে। হিরো হিরোইন ঠাকুর দেবতার পোস্টারগুলির উপর আঁকিবুকি চলেছে অনেকবার। ঠোঁটের উপর দিয়ে লাল কালির পেন দিয়ে আরো লাল করে দিয়েছে কেউ। এঁকে এঁকে বুকের উপর মালা পরিয়ে দিয়েছে। নাকে নাকছাবি। ভেতরের অন্তর্বাসের ছবি এঁকেছে কারুর ড্রেসের উপর দিয়ে। ঘরে যে এতোগুলো লোকজন ঢুকে পড়েছে তাতে ঘরের ভিতরের তিনটি বাচ্চার কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনটে মেয়ে বাচ্চা। চার পাঁচ বছর বয়সের। পরপর চৌকি পাতা গোটা চারেক। চৌকি আরো সব জিনিসপত্রের পাশ দিয়ে হাঁটার জায়গা নেই প্রায়। গ্যাঞ্জাম। একটা চৌকির উপর বাচ্চা তিনটে গোল হয়ে বসা। সামনে ছয় সাতটা তাস। ফেলে দেওয়া তাসের পাতা ওগুলো। ঘরের কোথাও সেলফ, উঠিয়ে রাখা চৌকি, টুল কোথাও ডাঁই করা ভাঙা শিশি বোতল। কোনও বাইরের আলো হাওয়া ঢুকছে না ভেতরে। একখানা জানালা। সেটা বন্ধ। উপরের ঘুলঘুলি শুধু ফাঁকা। ঘরের ভেতর ঝুল পড়া টিমটিমে একটা লাইট জ্বলছে কেবল। ঘ্যারঘ্যার একটা শব্দ করে একখানা ফ্যান ঘুরছে। হাওয়া কমে গেছে ফ্যানটার। ঘরের ভেতর বাচ্চাগুলোর শরীরগুলো ঘামে ভেজা।

দলটা এধার ওধার উঁকি মারছে। চোকিগুলোর উপর পাতা ছাপা ছাপা চাদরগুলো টেনে তুলে চৌকির নিচে উঁকি মারছে দলের লোকজন। বাথরুমে গিয়ে উঁকি মারছে। প্লাস্টিকের মগ রঙ চটা বালতি, নর্দমা। না কোনও মানুষ নেই ভেতরে। হঠাৎ তপতী ভৌমিক এগিয়ে যাচ্ছে একটা সেল্ফের দিকে। এতোক্ষণ শ্যেণ দৃষ্টিতে দেখছিল চারপাশ। হঠাৎ দু-এক সেকেন্ড থেমে এগিয়ে যেতে থাকল ঘরের কোনে রাখা ওই সেল্ফটার দিকে। কাঠের সেল্ফ। এক মানুষ সমান হাইট। সেল্ফে সেন্টের শিশি, স্নো এর কৌটো জলের বোতল, ভাঙা চোরা বাক্স আয়না চিরুনী। তপতী ভৌমিক ঠেলা দিল হঠাৎ সেলফটাতে। টুং টাং ঠক ঠাক করে শব্দ হল জোরসে। জিনিসগুলো ছিটকে পড়ল। তপতী ভৌমিকের সাথে হাত লাগালো এবার আরো দুজন। ঠেলা দিচ্ছে সেলফটাকে বেশ জোরে। সেল্ফটা বেঁকে দাঁড়ালো জায়গা ছেড়ে। পেছন কি ওটা? অমিতাভ বচ্চনের বড় একটা ছবি। ফ্রেমে বাঁধানো। তপতী ভৌমিক টেনে খুলে ফেলে দিল ছবিটা। এক মিনিট। হঠাৎ সবাই চুপ! ছবির পেছনে একটা চৌকো জানালার মতো করা হোল। তার ভেতরে ওগুলো কী? চৌকো ফাঁকটার ওপাশে অন্ধকার। অন্ধকারে কী দেখা যাচ্ছে? ক্রমে অন্ধকার থেকে ঘরের আলোয় আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। কারা এরা? বোঝা যাচ্ছে ভেতরে কী? প্রশ্ন করে চলেছে উনি। মাথা হাত বুক কুনুই মাথার চুল চকচকে জামা উঁকি মারছে অন্ধকারে। কতগুলো মানুষ। নড়েছে না। পরপর একজনের উপর আরেকজন। গুটিসুটি মেরে আছে শরীরগুলো। তপতী ভৌমিক ঝুঁকে পড়ল চৌকো খোপটা দিয়ে। শরীরের উপরের অংশটা তার ঝুঁকে গিয়ে টানতে চেষ্টা করল ভেতর থেকে একটা শরীর। উপরের হাত ধরে জাপটে ধরে টানার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভেতর থেকে শরীরটা বেরিয়ে এলো বাইরে। মেয়ে। তেরো চোদ্দ হবে। অন্ধকারের ভেতর এবার আস্তে আস্তে আরো খানিকটা দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ ঠিক। পরপর সব মেয়ে। একজনের নীচে আরেকজন শোয়া। তার নীচে আরো একজন। আরও… আরও…। কেউ বেঁকে। কেউ চিৎ। কেউ ঘাড় বেঁকিয়ে আধা শোয়া। কেউ ঘুচকে শোয়া। আর দুজন পুরুষ হাত লাগিয়ে ফেলেছে ওঁর পাশ দিয়ে। চৌকো খোপটাতে জায়গা নেই বেশি। উনি হাত ধরছে পরপর মেয়েগুলির। টেনে কিছুটা বাইরে বার করছে। বাকি দুজন পাঁজা কোলে নিয়ে বার করে আনছে। বেরিয়েই চলেছে। এক দুই তিন চার…। চ্যাঁচামেচি বেড়ে গেছে ঘরের ভেতর। গানটা এখনও ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিকের মতো বেজে চলেছে। ইয়ে দিল। দিয়ানা…। দিওয়ানা …। যে বাচ্চারা ঘরে বসে ছিল হুড়োহুড়িতে তাদের তাসের পাতাগুলো বিছানার নীচে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। যারা টেনে বার করছে তারা চ্যাচাচ্ছে। যাদের বার করছে তারা চ্যাঁচামেচি করছে না কোনও। একদম চুপ। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে যেভাবে ওদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে সেভাবেই। এখনও থামেনি। মেয়েদের বার করে যাচ্ছে। যত ফাঁকা হচ্ছে খুপড়িটা তত বোঝা যাচ্ছে ভেতরটা ঠিক কিরকম। পাঁচ ছয় স্কোয়ার ফুটের মতো ড্যাম্প ধরা স্যাঁতস্যাতে খুপড়ি একটা জায়গা। দেওয়াল তুলে উপর দিকে কেবল চৌকো ফাঁক করে রেখেছে একখানা। ও জায়গায় মাঝে একটা পাথরের তাক। তার উপর দিয়ে নীচ দিয়ে গুঁজে দিয়েছে মেয়েদের। খুব তাড়াতাড়ি করে গোজাগুজি করে ঠেসে ঠেসে শুইয়ে দিয়েছে শরীরগুলোকে।
যাদের দাঁড় করানো হচ্ছে তারা কাঁপছে। ঘামে চিপচিপে ভেজা দাঁড়ানো শরীরগুলো কেঁপে চলেছে। পাগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে জোর পাচ্ছেনা দাঁড়ানোর। শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চলেছে। বসে পড়তে পারছেনা ভয়ে। মুখ গুলো নীচু। পায়ের দিকে তাকানো। মুখে কোনও শব্দ নেই। চোখে মুখে ঠোঁটে জল। মুখের মেকাপগুলো লেপ্টে গেছে। ভ্রু চোখের কাজল ঠোঁটের লিপ্সটিক ঘাম লালা থুথু মিলে মিশে গিয়ে কেমন রঙচঙে হয়ে আছে মুখগুলো। চৌকো অন্ধকার খোপটা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আরো মেয়ে। দাঁড় করানো হচ্ছে লাইন দিয়ে। বাইরে বৃষ্টি বেড়ে গেছে। সকাল সাড়ে দশটা কি এগারোটা। বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেল দলটা ঢুকেছে ঘরটার ভেতর। রাত থেকেই বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। লোকাল ট্রেনগুলো গাদাগাদি করা মানুষ এনে পৌঁছে দিচ্ছে শহরের দিকে। অটো বাস রিকশ’র ভিড় চলেছে রাস্তায়। ভেজা প্লাস্টিকের নীচে নীচে রোডের ধারে পাওভাজির দোকানে ভিড় বাড়ছে। ‘চায়ে চায়ে…’ বলছে চ্যাট চ্যাটে আঠালো কেটলি নিয়ে হাঁটছে কেউ থ্যাপ থ্যাপ করে জমা জলে পা ফেলে। বার হয়ে চলেছে আরো মেয়ে। এগারো… বারো… তেরো… চোদ্দ… আরো সংখ্যা বাড়ছে। বৃষ্টিটাও হচ্ছে তেড়ে। বড় বড় জলের ফোঁটাগুলো হাওয়ার সাথে সাথে পড়ে ছিটকে যাচ্ছে এদিক ওদিক। পেট্রোল ডিজেলের ধোঁয়া মিশছে বৃষ্টির জলে। ট্রেনের লাইনে জল উঠছে। রাস্তায় জল উঠছে ক্রমশ। শহরের ভেতর ঠেলাঠেলি ভিড় বাড়ছে। ধাক্কা লেগে যাচ্ছে ছাতায় ছাতায়।
আরো আছে কেউ ভেতরে! তপতী ভৌমিক একটা টুলে উঠে লাফ মেরে ঢুকে পড়েছে চৌকো খুপড়ির ভেতর। খুপড়ির ভেতর গরমটা আরো অনেক বেশি। শরীরে শরীরে আরো গরম হয়ে গেছে পাঁচ ছয় স্কোয়ার ফিটের মতো জায়গাটা। ধূলো ড্যাম্প মানুষের ঘামে আরো কিরকম গা গুলিয়ে ওঠা অবস্থা ভিতরটার। আরো একটা দশ এগারো বছরের মেয়েকে কোমোর ধরে তুলে দিচ্ছে বাইরে। নীচের মেয়েটাকে ডাকছে এবার। একেবারে নীচে। মেঝেতে উলটে আছে। না এর তলায় আর নেই। এই লাস্ট। ঠেলছে এবার। আস্তে আস্তে। না সাড়া দিচ্ছে না। আবার ডাকছে। হিন্দিতে। নাম জানে না। উঠো… উঠো…। না। সাড়া নেই। তপতী ভৌমিক ডাকছে এবার খোপের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশদের। ঢুকে পড়েছে তারা। বার করছে পাঁজা কোলে করে।
দাঁড়িয়ে থাকা শরীরগুলোর পাশে এবার একটা শোয়া শরীর। নড়ছে চড়ছে না। কাঁপছে না। শক্ত। মৃত।
ড্যাম্প পড়া বিল্ডিংটাকে আপাদমস্তক ভিজিয়ে দিয়ে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। আরো ডুবে যাচ্ছে এধার ওধার গজিয়ে ওঠা কচি কচি আগাছা। ডাস্টবিনের মাছিগুলো উড়ে যাচ্ছে। প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগগুলো জল খেয়ে খেয়ে ফুলে উঠছে। দাঁড়িয়ে থাকা আঠারোটা মেয়ের চোদ্দটা পশ্চিমবঙ্গের। বাকিরা বিহার ঝাড়খন্ডের। আর ওই শুয়ে থাকা শক্ত দেহের মেয়েটা কানপুরের। বয়স নয় হবে। আর ওই যে ভেজা বাড়িটা ওটা এ দেশের। অফিস আদালত ব্যাঙ্ক থানা শপিং মল সংবাদপত্রের অফিসের মতোই এ দেশের একটা বিল্ডিং ওটা। এ দেশের আলো ঝলমলে মুম্বাই শহরের কামতিপুরার…
. | ২৯ মার্চ ২০২৬ ১৯:১০739537