এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা   ইতিহাস

  • বীরাঙ্গনা টেপরী রানী

    দীপ
    আলোচনা | ইতিহাস | ১৫ মে ২০২৬ | ৭ বার পঠিত
  • বীরাঙ্গনা, আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম!
    -------------------------------------------------------------------
     
    "বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী দেহত্যাগ করলেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সমাপ্ত করা হলো।

    ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামের শ্মশানে সমাহিত এই বীর নারীর জীবনের গল্প বড়ই করুণ।

    ১৯৭১ সাল....যুদ্ধ চলছে। টেপরী রাণীর বয়স তখন মাত্র ১৭। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। তখনই পরিবারকে বাঁচানোর নাম করে এগিয়ে এল এক রাজাকার। সে টেপরীর বাবাকে বলল—
    “তোমার মেয়েকে যদি পাকিস্তানি ক্যাম্পে দাও, তাহলে পুরো পরিবার বেঁচে যাবে।” পরিবারকে রক্ষা করতে টেপরীকে ‘বিসর্জন’ দেওয়ার কথা ভাবল তার অসহায় বাবা। কী নির্মম বাস্তবতা, পরিবারের সবার প্রাণকে বাঁচাতে নিজের মেয়ের সম্ভ্রম বিসর্জন দিচ্ছেন তারই বাবা! কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল সে সময় ভাবুন।

    বাবার কথা শুনে কিশোরী টেপরীও আর বাধা দিল না। সে জানত ক্যাম্পে গেলে কি হবে তার সঙ্গে। তবু পরিবারকে বাঁচাতে হবে। নিজের বাবা তার মেয়ের হাত ধরে পৌঁছে দিলো ক্যাম্পে, জমের মুখে। সেদিন সারাটা পথ বাবা-মেয়ে একটিও কথা বলেনি। মেয়েকে তুলে দেওয়া হচ্ছে পাকিস্তানি ক্যাম্পে। পাকসেনারা তাকে ধর্ষণ করবে, ধর্ষণের পর মেরেও ফেলতে পারে। এই যখন ভবিতব্য, কি কথা বলবে বাবা মেয়েকে?

    সেদিন টেপরিকে ক্যাম্পে তুলে দিয়ে মাথা নিচু করে ফিরে আসেন নির্বাক বাবা। এই নিরবতার অর্থ বোঝেন? নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে (নিজেকে বাবা বা মেয়ের স্থানে বসিয়ে) কল্পনা করেন তো!!

    টেপরী আর পাঁচটা মেয়ের মতো মরে যেত পারত। কিন্তু কপাল খারাপ তার, সে মরেনি। দীর্ঘ ছয় মাসের নরকযন্ত্রণা ভোগ করে ফিরে আসে সে। এমন কোনো রাত যায়নি, পাকসেনারা তাকে ধর্ষণ করেনি। আজ শুনতে ‘বাড়াবাড়ি’ মনে হচ্ছে না? ইয়েস, একাত্তর মিথ না, এই ‘বাড়াবাড়ির’ নামই একাত্তর! আর হিন্দু সম্প্রদায়ের এই বলিদানই সেই বাড়াবাড়ির সময়ের ট্র্যাজেডি।

    মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফেরেন টেপরী। শুরু হয় আরেক যন্ত্রণা। অনাগত সন্তানকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত না সমাজ। সন্তানকে ‘নষ্ট’ করে ফেলার জন্য নানা আসে চারদিক থেকে। তখন মেয়ের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান তাঁর বাবা। তিনি বলেছিলেন, “না মা, রাখ। এ-ই হবে তোর সম্বল। তোকে তো আর কেউ গ্রহণ করবে না। শেষ বয়সে এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন হবে।”

    হয়েছেও তাই। ছেলে সুধীর বর্মনের আশ্রয়েই তাঁর বাকি জীবনটা কেটেছে।

    কিন্তু সমাজের কটূক্তি সুধীরেরও পিছু ছাড়েনি। সুধীরকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে অপমান করা হয়েছে নিয়ত। একবার তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সে প্রতিবাদ করে না কেনো?

    সুধীরের উত্তর—“ঝগড়া করতে তো লোক লাগে, কিন্তু আমার কে আছে?”

    না, সুধীরের পাশে কেউ নেই। তখনও ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু এরপরও সুধীর বেঁচে আছে মাথা উঁচু করে। তার একটা মেয়ে আছে, নাম—‘জনতা’।

    জনতা কি ভাবে জানেন? তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তার দাদিকে নিয়ে। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল—
    “দেশে যদি আবার যুদ্ধ হয়, দাদীর মতো আমিও দেশের জন্য নিজের সব কিছু বিসর্জন দিতে দ্বিতীয়বার ভাববো না।”

    এই আমাদের ‘জনতা’, একাত্তরের উত্তরসূরি। এটাই দেশপ্রেমের পরীক্ষায় সর্বদা সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হিন্দু সম্প্রদায় যারা কখনও বেঈমানি করেনি।

    দীর্ঘ অবহেলার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা (হওয়ার উচিত ‘মুক্তিযোদ্ধার’) স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী।

    তাঁকে তখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কি চান তিনি। বৃদ্ধা টেপরী রানী বলেছিলেন: মৃত্যুর পর তাঁর দেহটাকে লাল-সবুজের পতাকায় মুড়িয়ে জাতি বিদায় জানাবে। এর চেয়ে আর বেশি কিছু তার চাওয়া নেই।

    তাঁর সেই চাওয়া পূরণ হয়েছে।

    আসেন আমরা অন্তর থেকে তাঁকে স্যালুট জানাই। তাঁর স্মরণে একা একা এক মিনিট নিরবতা পালন করি। একশো থেকে এক হাজার, এক হাজার থেকে এক লক্ষ, লক্ষ থেকে কোটি মানুষ নীরবতা পালন করুন এই মায়ের জন্য।"
     
    -বাংলাদেশ সংবাদসূত্র
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন