

অলংকরণ: রমিত
কিছু কিছু মজার ঘটনা থাকে যাদের গপ্প করতে গিয়ে হাসতে হাসতে, মজা পেতে পেতেও গলার ভেতরে একটু নীল নীল ব্যথা হয়, চোখটা একটু যেন জ্বালা করে। আসলে সেই গপ্পের আসরে আমরা প্রত্যেকেই একজন মানুষের উপস্থিতি টের পাই। শীতের শুরুতে কিম্বা দোলের সকালে পুরোনো টিনের ট্রাঙ্ক খুললে অনেকদিন আগের বিয়েবাড়ি যাওয়া পুরোনো জামা কাপড়ে রয়ে যাওয়া পুরোনো এসেন্সের গন্ধ, বড় সড় কোনো শালের পরতে পরতে ঘুমিয়ে থাকা তামাকের গন্ধ, কিম্বা ন্যাপথলিন এর গন্ধ যেমন, তেমন যেন খানিকটা। গন্ধটা পাই, কিন্তু তাকে ছুঁতে, ধরতে পারি না। তাই কষ্ট হয়।
মহারাজের রোমাঞ্চকর গল্পগুলোর কতকগুলি নির্ভার আমোদ দেয় -- বাড়ীর সবার ছোট্ট ছেনুর দুষ্টুমি আর জব্দ হওয়ার রংবেরঙের ঘটনায়। তেতলার বারান্দা থেকে লুকিয়ে রাস্তায় বন্ধুদের মাথার উপর রং ছুঁড়ে দিয়ে সে নিজেই জব্দ হয় তাদের হাতে। রাস্তায় পড়ে যাওয়া গোলপোস্ট তৈরির চটিটা যে তাদের চেনা! আর তারাও যে ঠিক বাড়ির দরজার বাইরেই ওৎ পেতে আছে তাতো আর বারান্দার রেলিং দিয়ে টের পাওয়া যায়নি! আমরা হাহা করে হাসি। আবার কতগুলিতে মজা পেতে গিয়েও কেমন জানি বুক টনটন করে ওঠে! মজা পাওয়াটাই নিষ্ঠুরতা হয়ে ওঠে। কেমন যেন বিভূতিবাবুর তালনবমী টাইপ, কিন্তু ঘটনাটা একেবারেই উল্টো। পয়লা বৈশাখে জৌলুস হারানো একদা সম্পন্ন বাড়ির শিশুটা পাত পেড়ে বসে ভোজ খেতে চায়। আলুপটল দিয়ে ভাত আর ভাল্লাগেনা তার। বিকল্প হিসেবে সে পায় মার্কণ্ডেয়র চিঠি। সেটা কী আর এখানে বললাম না। পুরোনো কর্মচারীর সাথে শিয়ালদা কলেজ স্ট্রিটএর দোকানে দোকানে চক্কর মেরে মিষ্টি, নোনতা, আইসক্রিম ইত্যাদিতেই খুশি থাকে। মাংস ভাত নাই বা মিলল! কিন্তু বাড়ী ফিরে এসে সে যে অবাক সংবাদটি পায় সেটাতে আমাদের আর মজা ঠিক আসেনাতো! মনে হয় আগে কেন ওরা বলল না? পরে মনে পড়ল?
হ্যাঁ। আমাদের মহারাজ ছনেন্দ্রনাথের রোমাঞ্চকর অভিযানগুলি তাই নিছক বালখিল্য খিলখিলানি থেকে আলাদা। আবার গোমড়া জ্যাঠামোর সাথেও তার আদায় কাঁচকলার সম্পর্ক। আমরা নিজেদের সাথে তাই তাকে মেলাতে যাই।
গল্পের পটভূমি প্রায় পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে এক একান্নবর্তী সামাজিক আবহে যখন পাশের বাড়ী, বা উপরের তলায় ছেলেপিলেকে পাঠিয়ে বড়রা নিশ্চিন্ত থাকতে পারত। আর সেই বাড়িগুলিতেও ছোট ছোট দাবির ছোট ছোট আরামের কোনা তৈরি থাকত। আল্লাদ, প্রশ্রয় আর শাসন থাকত। এবাড়ির বাচ্চা ও বাড়ির আত্মীয়বাড়ী গিয়ে দিব্যি রয়ে যেত, নতুন নতুন দাদা দিদি বন্ধুও জুটে যেত। ঘটনা দুর্ঘটনা নিয়ে ছেলেবেলাগুলি ভরে যেত রোমাঞ্চকর সব অভিজ্ঞতায়! ছিল জমজমাট কলকাতার জমজমাট বাঙালিয়ানার দাপট, যেখানে হোটেল মালিক বাবা আটকে পড়া ট্রেন যাত্রীদের বাড়িতে ডেকে এনে খেতে শুতে দিতে এক মুহূর্তও ভাবতেন না। ছিল মফস্বলের ফুটবল মাঠ, সাইকেলের ক্যারিয়ার আর রড --- অন্য বাড়ির কাউকে বসিয়ে নিয়ে ছুটবার জন্য। ছিল পুজোর ভিড়ে, খেলার মাঠে বাচ্চাদের হারিয়ে যাওয়া আর তাকে নিয়ে তার বাড়ির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকা জনৈক। ছিল পশ্চিমে মামার বিয়েতে যাওয়া, বরযাত্রী, নিতবর, দিদির বিয়ে, নতুন জামাইবাবু। ছিল প্রশ্রয়ের বড়দা, কড়া মেজদা, আদুরে বদ্দি আর ছোদ্দি --- মা, দিদিমা, তিন তলার পিসিমা। পাশের বাড়িতে ‘ওরা’ ছিল, আর তাদের সাথে ভাগ করে নেওয়া খেলনাগুলি। ছিল চমচম আংটি নিয়ে রেষারেষি। হ্যাঁ, ডিম, চৌকো, গোলপানা আংটির পাশাপাশি পেটমোটা, দুদিকে ছুঁচোমুখো সেই বিশেষ ছাঁদের আংটি আমরা দেখেছিতো ছোট বেলায়। কিন্তু তাকে যে 'চমচম আংটি' বলে তাতো ছেনুর কাছ থেকেই জানলাম এই এখন!
সে আবহের পেছনে আরেকটা গুনগুন স্মৃতিকথা থাকে ছাড়া ছাড়া। পাস্ট পারফেক্ট টেনস বুঝি। ছেনুর জ্ঞান না ফোটা, অস্ফুট বা শৈশবের আধো ফোটায়। গমগম করা এক হোটেলে নাকি দশ-দশটা পাখা ঘুরে চলতো একসাথে; দামী পোর্সেলিনের বাসনে লোকে ধরাছোঁয়ার সীমার মধ্যেই ব্রেকফাস্ট করতো, দুপুরের ভাত খেতো আর বিকেল- সন্ধ্যেতে চপ কাটলেট পোলাও পরোটা সাঁটাতো। খেলোয়াড়রা পেয়ে যেত মাটন চিকেন স্টু। কুটুম কিম্বা ফুটবল খেলায় জিতে আসা দল পেতো আমুদে সম্মান আর বিনি পয়সার ভোজ। ভারতীয় রেলের সেই রমরমার যুগে ইস্টার্ন রেল এর ফুটবল দল সেখানে শিল্ড এনে রেখেছিল আর তাকে ঘিরে উৎসব হয়েছিল সেথায়। বাড়িতে গয়না পোশাক আসতো নিত্যনতুন, ওদিকে গরিব দুঃখী পেতো হোটেলে অতিরিক্ত হওয়া গরমাগরম টাটকা খাবার - রোজ রাতে।
তবে পূর্ণিমার পরেই তো চাঁদের ক্ষয় শুরু হয়! বনেদী সারল্যের তেজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধনে প্রাণে শেষ হয়। সবচেয়ে বড় গাছটিই তো শুয়ে পড়ে সব্বার আগে। গল্প আর সেই দিনটির কথা তোলেনা। আমরাও সাহস করিনা জিজ্ঞাসা করার। মাঝারি আর ছোট গাছগুলি জড়ামড়ি করে জীবনের অন্য রকম গল্প বুনতে বুনতে বেঁচে থাকতে লাগে সেই সূর্য আলোকিত বনেদিয়ানার আশ্রয়ে।
সবচেয়ে ছোটটি- আমাদের ছেনু পূর্ণিমা দেখেনি, তাই অন্যদের মত তার অভাবও সে টের পায়না। তার সম্বন্ধে গল্পগুলোও তাই ছবি ছবি বর্ণনা, তারই নিজস্ব জগতের চাওয়া পাওয়া আফশোষগুলি নিয়ে। সেগুলি বুঝি কাঁচের লম্বা বয়ামের রঙিন লজেঞ্চুস। ভেঙে যাওয়া হোটেলের খণ্ডহরেই তার আপন সাম্রাজ্য গড়ে তোলে সে। সে বিরাট রাজার মাঠে আপন মনে ঘোড়া ছোটায়, তবে- নানান জাতের কলার বাজার বসার সময়টা ছেড়ে। কিন্তু সে সাম্রাজ্যও তাকে একদিন ছেড়ে দিতে হয়। আইনি লড়াইতে হেরে যাওয়া পার্টির এলেবেলে সেই শিশু সেদিন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, নাকি বারান্দার কোনে বসে চুপচাপ চোখ মুছেছিল- আমরা তা জানিনা। তবে আমরা কিন্তু চোখ মুছি। সেই ভূমি আর ভূমির উপর আকাশ - দূরের ট্রাম লাইন - সব- সব হারায় শিশু। যাকগে। ওসব থাক। চ ছেনু, খেলি গিয়ে এখন আমরা।
এই ছেনু! তোকে ওরা ‘ছেনু’ ডাকে কেনরে? কী সব ছানা-টানার গপ্প শুনতে পাই যেন? কোন চার্চে তোকে কেউ নিয়ে চলে যাবে বলেছিলনা ? সেই ভয়েই জব্দ করা গেলো তোকে? ছানা গিলতে বাধ্য হলি? নাহ এটা আর ভাঙব না এখন। ওটার চেয়ে খেলনা বাড়ির পকাইদের সাথে খেলার গপ্পটাই কর, ঘোড়ার কান ভাঙার কথাটা চেপে যাবি কিনা দেখ। তারপর ছোটমামার ধানবাদের বিয়ের জমজমাট গপ্পটা? বদ্দির বিয়ের পর ছায়াছবি দেখার গপ্পটাই বা কম কি? তারপর সেই যে তিনতলার পিসিমার ছেলে কান্টুদা? বিদেশ যাবার বেগে লন্ডনে জায়গা না পেয়ে কানাডায় চলে যাওয়া আর মেম বউ বিয়ে করার পেছনের যে গপ্পোটা দিয়েছিল? সেই যে, রাস্তায় বৃষ্টিতে ঠান্ডায় ভিজছিল, বাড়ির জানালা খুলে গেল আর মেম মেয়ে বাড়িতে আশ্রয় দিল -- বিবেকানন্দের শিকাগোর ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করেনি তো, বিয়েটা শুধু যোগ করে? বাংলা বেমালুম ভুলে যাওয়ার দাবিটাও মুচকি হাসি আনে। ওদিকে সাহেব বাচ্চাগুলো দিব্যি শিঙাড়া মিষ্টি মেরে দিচ্ছে। যাকগে। ওর আনা চকলেট পাসনি তো কী। অন্য একটা দারুণ জিনিস তো পেয়ে গেলি! বলব এখানে? সেবার বদ্দির বিয়ের আগে ডাকাতটা দেখে কেমন ছুট দিলি? কে ছিল বলতো সেটা? পুজোর ভলেন্টিয়ার হয়ে বিসর্জনে যাওয়ার গৌরব তোর সাথে আমাদেরও ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আর স্বপন কুমার! আমাদের রোমাঞ্চের সেই জাদুঘরকে তুই কিনা মা দুগ্গার কাছে দুলতে দুলতে মন্ত্র পড়তে দেখলি, সেই লোকটাই আবার বছর কয়েক পর ভক্তের লকেটে দোলা শ্রীভৃগু গুরুদেব হয়ে গেল! এ রোমাঞ্চ রাখি কোথায়? পুরীতে গিয়ে ভোগ খেলি, মালপোয়া খাজা খেলি, আমায় দিলিনে! বেশ হয়েছে ছড়িটা ফেলে এসেছিস!
নানা, বেশ হয়নি! কি ভালো ওগুলি! নিয়ে এলে আমরা আবার রাজা রাজা খেলতাম বেশ! তোকেই মহারাজা রাখতাম। তোর বুকের নীল মখমলে যে জুঁই ফুল দুঃখ টুপ টুপ করে ফুটে ওঠে! দিনের বেলা দেখা যায়না। তুই তখন মজা দিস আমাদের। রাজারদেরই এমন হয় শুধু। রাজারাই পারে এমনটা করতে!
বইতে যেমন করে সাজানো সেভাবেই পর পর বলতে হবে তার কি মানে? মন যখন যেটা খুঁজে বেড়ায় সেই মত টুক করে বালিশের পাশে রাখা বইটা থেকে তুলে নিতে হয়। এতো আর ক্লাসের পড়া নয়! মহারাজের কোন গল্প আগে যাবে আর কোনটা পরে, সেটা বেঁধে দেওয়া যায় নাকি?
আর এই সব ঘটনার, এই সব ভাবনার চারপাশ জুড়ে ছেয়ে থাকে মন কেমন করা সেই সুগন্ধের ছায়া। সেই তিনি! যাঁর থাকা না থাকাতেই তৈরি হয় গল্পের আবহ, বিশেষ বিশেষ মোড়গুলি।
বই এর সবচে উপরের যে মোটা পাতাটা থাকে- ‘প্রচ্ছদ’ বলে যেটাকে- তার উপর দেখি তুই নীল আকাশে পক্ষীরাজ ঘোড়া ছোটাচ্ছিস, হাতে তরোয়াল। দুপাশে লাল লাল বাড়িগুলো অবাক হয়ে দেখছে তোকে আর নিচে মানুষজন কেউ উপরের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে, তো কেউ আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ভিতরের পাতায় সাদা কালোর লাইনে আঁকা ছবিগুলো তোর ঘটনাগুলো যেন চোখের সামনে আরও জ্যান্ত করে তুলছে। হ্যাঁরে, তোর এই গপ্প গুলো যে লিখলে, আর সাথে সাথে ছবিও এঁকে দিলে এমন জম্পেশ করে, সে এত সব জানলে কী করে? ও নিশ্চই তোর বেশি বেশি বন্ধু? তা হোক। ওর জন্যই তো তোর সাথে আলাপ হল। তোকে বন্ধু পেলাম!
হ্যাঁ। মহারাজা ছনেন্দ্রনাথের রোমাঞ্চকর গল্পসমূহ এমনই একটা বই যার কোনো নৈর্ব্যক্তিক গ্রন্থ সমালোচনা বেশিদূর টেনে নিয়ে যাওয়া যায়না। আমরা এ ভাবেই ছেনুর সাথে কখন যেন কথা বলতে শুরু করে দিই!
মহারাজ ছনেন্দ্রনাথের রোমাঞ্চকর গল্পসমূহ - রমিত চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশক: গুরুচণ্ডা৯
প্রকাশ: ২০২৫
সংগ্রহ মূল্য: ২৭৭ টাকা (ভারত)
হীরেন সিংহরায় | ১০ মে ২০২৬ ১১:৫৬740597
স্বাতী রায় | 117.*.*.* | ১০ মে ২০২৬ ১৬:১৪740606
kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ১০ মে ২০২৬ ২০:৩০740609
dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ১০ মে ২০২৬ ২১:১৪740610