এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  পড়াবই  প্রথম পাঠ

  • পাঠ প্রতিক্রিয়া - আলেয়া ও অমলতাস

    শক্তিপদ পাত্র
    পড়াবই | প্রথম পাঠ | ১৫ মার্চ ২০২৬ | ৩৪৬ বার পঠিত

  • অন্যতম প্রিয় লেখক মোনালিসা চন্দ্র, আর অন্যতম প্রিয় প্রকাশনা সংস্থা — গুরুচন্ডা৯। দুইয়ের প্রথম মিলন হল এবারের কলকাতা বইমেলায়। প্রকাশিত হল এক গল্প সংকলন — আলেয়া ও অমলতাস।

    মোনালিসা দেবী এই সংকলনের প্রাককথনে লিখেছেন — তিনি গল্প খোঁজেন জীবনের খাতায় আর এই অনুসন্ধানের মাঝেই নিজেকে খুঁজে পান। আরও বলেছেন— তিনি যে আনন্দ বই পড়ে পান, সেই একই আনন্দের অংশীদার করতে চান পাঠককুলকে। এভাবেই তিনি তাঁর গল্প খোঁজার সাধনা সার্থক করতে চান।

    প্রতিটি গল্পের সব চরিত্রই জীবন থেকে নেয়া, সংকলনটি যেন পোর্ট্রেট গ্যালারি। গ্যালারির ছবিগুলি জীবনকে সমগ্র চেতনা দিয়ে দেখতে সাহায্য করে। চরিত্রগুলি জীবন জুড়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেদের ও অন্যদের নতুন নতুন ভাবে জানতে ও চিনতে পারে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন-চেতনা বদলায়।

    লেখকের বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টি পাঠকদের মনে সঞ্চারিত হয়, তাঁরা চরিত্রগুলির সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন।

    কয়েকটি গল্প নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবো এখানে। প্রথম গল্প 'অযান্ত্রিক'। ব্যস্ত জীবনের সমাপ্তিতে বয়স্ক মানুষদের নস্টালজিয়া; আরও একবার যৌবনকে ফিরে পাওয়ার অদম্য অভিলাষ। বাউন্ডুলে হওয়ার বাসনা, অশোকবনের রাঙা নেশায় নিজেদের রাঙানোর উদ্দীপনা। হঠাৎ তারা ক্বচিৎ কিরণে দীপ্ত। এরই মাঝে একটি চরিত্রের গভীর গোপনে থাকা বেদনার ছবি। তারপর জীবনের অমোঘ নিয়মে হঠাৎ উৎসাহ নিভে যাওয়া। গল্পের শেষে এসে চরিত্রটির হারিয়ে যাওয়া আশার স্বপ্নিল পূরণ। গল্পটি সরলরেখায় প্রবাহিত নয়।

    ‘বংশধর’ গল্পে লেখক পাড়ি দিয়েছেন গল্পের মুখ্য চরিত্র এক ভদ্রমহিলার অন্তর্মুখী বিবর্তনের প্রবাহধারায়। তবে গল্পটি দাঁড়িয়ে যায় অপূর্ব আয়রনি ব্যবহারের উপর। মুখ্য চরিত্রটি যা ভাবছেন - তার উল্টোটিই সত্য, যে ঘটনা ঘটার কথা তার উল্টোটিই ঘটেছে, যে ভাবনা চরিত্রটির ভাবার কথা, সেভাবে একসময় নিজের অজান্তে তিনি ভাবতে পারছেন না। তাঁর চিন্তার দিগন্তে আসছে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় পরিবর্তন। সবশেষে গল্পে আসছে এক অপ্রত্যাশিত অথচ অবশ্যম্ভাবী মোচড়। যিনি ভুলে ছিলেন ব্যক্তিগত দুঃখে চোখের জল ফেলা, তাঁর হল নতুন বোধে উত্তরণ – ভোলার তলে তলে থাকে অশ্রুজলের খেলা। এ যেন গল্পে পরিব্যাপ্ত আয়রনির ক্লাইম্যাক্স। যেন মুখ্য চরিত্রটির অন্তর্দ্বন্দ্বে লেখক শেষ বিচারটি ছেড়ে দিলেন পাঠকদের হাতে।
    'অক্সিজেন' গল্পের নিউক্লিয়াস – একটি গাছ – 'পিপল কা পেড়'। সে গাছ 'কতল' হল। কাছাকাছি থাকা অনেক গাছ এভাবেই ধ্বংস হল। ধ্বংস করল বনরক্ষাকারীরা। এর মাঝে হাজির করা হয়েছে এক রহস্যময়ীকে – সে মনমতিয়া, তার মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে প্রকৃতির দ্বৈত রূপ — একদিকে বনলক্ষীর ডালা, অন্যদিকে প্রকৃতির প্রতিশোধের ভয়ংকরী রূপ। লেখক তুলে ধরলেন জঙ্গলরক্ষাকারীর 'প্লেজ' রক্ষার পরিহাস। মনমতিয়ার তাচ্ছিল্যভরা ক্রোধদীপ্ত তিরস্কারের মধ্যেই গল্পের 'life throb', 'truth throb'।

    সংকলনটির নামকরণ দুটি গল্প নিয়ে — 'আলেয়া' ও 'অমলতাস'।

    ‘আলেয়া’ গল্পের শুরুতে এক পাগল ও তার সঙ্গী এক চেয়ার। এই পাগলের রাজকীয় ভঙ্গির মধ্যে প্রধান চরিত্রটি পাবে তার মানসিকতার প্রতিফলন। তার জীবনে সে আনবে এক আরাম কেদারা। প্রিয় এই নতুন আরাম কেদারা হবে তার স্ত্রীর সতীন। আবার সেই আয়রনি। চেয়ারের অধিকারীর চেয়ারে বসার সময় হয় না। ব্যস্ত জীবনে সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার! এখন তার মনে চেয়ারের ছবি ছায়ার মতো আসে, আর মিলিয়ে যায়। নামকরণেই এর ইঙ্গিত। মনে পড়ে চেয়ার-পাগলকে। পাগল যেন বলে, পাগল হয়েই যাও। পরোক্ষভাবে গল্পকার মনে করিয়ে দেন গ্যোয়েটের লাইন— 'দাও মাস্ট ডু উইদাউট'। যেন স্মরণ করিয়ে দেন – প্রাচুর্য থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা, থোরোর 'ওয়ালডেন'-এর পথে হাঁটার কথা, নিজের মধ্যে অবসর তৈরি করে নেওয়ার কথা।

    ‘অমলতাস’ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু গুচ্ছ গুচ্ছ হলুদ ফুলে ভরা অমলতাস। সে এক অসুস্থ যুবকের জীবনের অন্ধকারে আলো। জীবন্ত এক চরিত্র হয়ে সে যেন এই যুবকটির জন্যই ফুল ফোটায়। সেই অমলতাসই যুবকটির জীবনের এক জঘন্য অপরাধের সাক্ষী হল — তার অবচেতনেরও। জীবনের শেষ কথাটি যুবক এই অমলতাসের মাধ্যমেই ঈপ্সিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে চায়। গল্পটিতে আছে কিশোর মনের জটিলতা, দ্বন্দ্ব, আক্রমণাত্মক মানসিকতা। শেষে পাওয়া যায় পরিণত, অনুতপ্ত মনের বেদনার ভার। একটি মেসেজে পাঠকের মন তোলপাড় হয় – 'চাওয়াটাই নাকি আসল'।

    আর একটি গল্পের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। 'শিবচরণ' গল্পটি এই সংকলনের শেষে সংযোজিত। গল্পটি শুরু হয় একটি ফোন কল দিয়ে। গল্পের শেষে আসে 'রিংব্যাক'। ইতিমধ্যে ভাবনায় সব ওলটপালট হয়ে যায়। সব বদলে দেয় এক সরল সাদাসিধে মাছওয়ালা। তথাকথিত সফিসটিকেটেড মানুষদের সামনে সে তুলে ধরল মানব মনের এক অভিনব দ্বন্দ্বের দিক। গল্পের শেষে অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনটি ইঙ্গিতে উপস্থাপিত।

    এভাবে, প্রত্যেকটি গল্পে সমাজ জীবনের ছবির পাশাপাশি আছে মনের দ্বন্দ্ব ও মনের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের ছবি — যে পরিবর্তন আসে নীরবে, নিভৃতে, মৃদুচরণে। লেখক চরিত্রগুলির অন্তরের গভীরে নিজেকে স্থাপন করেন আর পাঠক সরাসরিভাবে যুক্ত হন সেই মনের সঙ্গে। গল্পগুলো বিষয় বৈচিত্র্যে ও কথনশৈলীতে নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।

    আলেয়া ও অমলতাস
    মোনালিসা চন্দ্র
    প্রকাশক - গুরুচণ্ডা৯
    প্রচ্ছদ - রমিত চট্টোপাধ্যায়
    প্রথম প্রকাশ - বইমেলা ২০২৬


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • পড়াবই | ১৫ মার্চ ২০২৬ | ৩৪৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন