এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো  ইদবোশেখি

  • একটি প্রাচীন কাহিনি

    যশোধরা রায়চৌধুরী
    গপ্পো | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩৮ বার পঠিত
  • ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি

    অলংকরণ: রমিত



    তালিকা বানাবে বলে ওরা হাতে নিয়েছিল কাগজ পেন্সিল। কিন্তু পেন্সিলের লেখা তো ঝাপসা হয়ে যায়। নতুনতর প্রযুক্তির ওষুধ প্রয়োগের মহা উদ্যোগ। দৈবী প্রায় ওষুধটি, দেশজ প্রক্রিয়ায় বিদেশে বানানো। সাগরপারের। কিন্তু দেশজ ছাপটি আছে। ফলত অব্যর্থ। এজন্য যে মহাযজ্ঞ তাতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন। তাই শেষ অব্দি একটা টাইপরাইটার এল। তবে বিস্ময়সূচক চিহ্নের বোতামটা সেখানে কাজ করেনা।

    একে একে সবাইকে ধরে ধরে ওরা নাম ধাম তুলে নিচ্ছিল। সবার জিভ বের করিয়ে, পেটের জামা তুলে পরখ করে দেখছিল। কারুর কারুর সামনেটা দেখা শেষ হলে, পেছনে ঘুরে যেতে বলছিল। পশ্চাৎ দেশের ছবি তুলে রাখা হয়নি অবশ্য, প্রযুক্তিটা আসেনি এখনো।

    অ্যাই অ্যাই, চিৎকার না, চেঁচামেচি না, অ্যাই অ্যাই সবাই শান্তভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়াও। এ কী, খামোখা চেঁচায় দ্যাখো, আমাদের কাজের অসুবিধা হবে না এতে? শোন, সবাই ওষুধ পাবে, সব্বাই। কেউ বাদ পড়বে না। কিন্তু তার আগে তো দেখতে হবে কার কী অসুখ আছে, কোন রঙের গুলি খেলে সারবে।

    অ্যাই অ্যাই, তুমি দুবার এলে যে? দুবার ওষুধ নিলে কী হয় জানো? এ দৈবী ওষুধ এর অপব্যবহারে ফাঁড়া আছে।

    এই যে, মেয়ে, যাও বাড়ি গিয়ে মা, মাসি, দিদি সবাইকে পাঠাও এদিকে। মেয়েদের ওষুধ খাওয়ানোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন কর্তৃপক্ষ।

    একটা মস্ত বড় বোয়েমের মধ্যে স্বচ্ছ কাচের আড়ালে অনেক ট্যাবলেট দেখা যাচ্ছিল। সবুজ রঙ ট্যাবলেট। খসখসে গা ট্যাবলেট। অন্য এক বোয়েম ভর্তি হলদে কিছুটে তেলতেলে ক্যাপসুল। চকচকে গা।

    যারা খোসপাঁচড়ায় ভুগছে তাদের জন্য সবুজ। বেশ তেতো। ক্রনিক আমাশার জন্য হলদে। বেশ মিষ্টি। বাকি রোগের ট্যাবলেট সাদা কাগজের ভেতরে বন্দি, গায়ে নাম ছাপাই করা। প্রয়োজন অনুসারে প্রযোজ্য।

    সাদা, করকরে মাড় দেওয়া পোশাক পরা মেট্রনদিদিমণি ডাকছিল একে একে। হালকা গোঁফের রেখা দেখা যায় মেট্রনের নাকের নিচে, পুরু ঠোঁটের ওপরে। ওকে আরো বেশি বেশি করে ভয়ানক মনে হয়। পৃথুলা মেট্রনের সঙ্গে রোগা রোগা দুই নার্স, তাদের প্রত্যেকের মুখেচোখে বিরক্তি আর হতচ্ছেদ্ধা। যেন এই কাজটা তাদের ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তেতোমুখ করে তারা দাঁড়িয়ে আছে।

    সহজ কাজ না। একজন টেম্পারেচার নেবে।ঘটাং ঘট। একটা তরল শোধকে ভরা গেলাসের মতন কাচের পাত্রে, ডোবানো রয়েছে থার্মোমিটার। সে কেবল তুলছে আর মাপছে আর আবার শোধকে ডোবাচ্ছে।

    একজন লোকের নথিপত্র পরীক্ষা করবে। কারুর নামের বানান ঠিক নেই। টাইপরাইটারে যে এস আর এল অক্ষরের বোতামও ঠিক করে টেপা যায়না, সেটা আবিষ্কার করে মেজো মেট্রনের মেজাজ আরো তিরিক্ষে।

    এদিকে তো, রুগিদের, থুড়ি সম্ভাব্য রুগি, ঔষধপ্রার্থীদের সারি ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে বারান্দা অব্দি। বারান্দা ছাড়িয়ে চলে গেছে উঠোনে, মাঠে, তারপর সিধে পাকা সড়কের দিক অব্দি। প্রথমে ওরা এসেছিল হাঁকডাক শুনে, বিনি পয়সার ওষুধের লোভে। তারপর তো ওদের অবস্থা হয়েছে আঠাকাগজে আটকে যাওয়া মাছির মতন। না পারে পালাতে, না পারে নড়তে চড়তে। ঠা ঠা রোদ্দুরের মধ্যে হা হা করা শূন্য বুকে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে তো দাঁড়িয়েই থাকে।

    প্রথমে শোনা গেছিল কেবল সরকারি হাসপাতালের, প্রাচীন নামলেখানো, মৃত্যুপথযাত্রী রুগিদের জন্যই নতুনতর ওষুধ আবিষ্কার করে সে ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। ওষুধ এসেছে সেই কোন দূর দেশ থেকে, কিন্তু পাঁচশো মাইল দূরের কারখানায় সেগুলোকে নতুন করে বয়ামে ভরে, দেশজ ছাপ মেরে পাঠাতে আরো কিছুদিন গেল।

    এদিকে, যারা পুরনো রুগি, তাদের তো অসুখটাও প্যাঁচালো। আর এই রুগিগুলোও দাগি, মার্কামারা। হাত পা অষ্টাবক্র হয়ে গিয়েছে, মাথায় ঢুকে গেছে কতরকমের বীজাণু, গায়ের চামড়া গিসগিস করছে ফোঁড়ায়। এরা সব যাচ্ছেতাই, জঘন্য এবং সমাজপরিত্যক্ত। তা, নতুন ওষুধ প্রয়োগ করে এদের কী উপকারটা হয়, মজা দেখতে কিছু কিছু লোক এসেছিল বটে। তাদের কারো আত্মীয়কে এই রোগে ধরেছে বলে এখানে পুরে দিয়েছে, তাই তাদের ভারি ফুর্তি। আত্মীয়ের ধানিজমিটা, মাছে ভরা পুকুরটা, কী সোনার গাছকৌটোটা, গাপ করার সুযোগে হাসপাতালে এদের দিয়ে দিয়েছে, জানে কোনদিন সারবে না। কিন্তু নতুন ওষুধে আবার সেরে উঠতেও পারে, ফিরে গিয়ে বেবাক দাবি করে বসতেও পারে নিজেদের হারানো জিনিসপত্র, এইসব ভেবে ভেবে তারা একটু ঘাবড়ে যাচ্ছিল বটে। কিন্তু কৌতূহলটাও নিরসন হচ্ছিলনা।

    তারপর কেউ কেউ বলল, আরে, ওসব ওষুধ ফসুধ কিসসু না, স্রেফ ধাপ্পাবাজি। তাছাড়া পরীক্ষামূলক ওষুধ প্রয়োগে কেউ কেউ মুখে গ্যাঁজলা উঠে মরেও তো যেতে পারে বা। তা, পরীক্ষানিরীক্ষা ওদের ওপর দিয়েই হোক না, আমাদের পরে তাতে সুবিধেই হবে। পরবর্তী যাদের অসুখ করবে তারা তো হাসপাতালের চৌহুদ্দির মধ্যে না ঢুকেই এ ওষুধের সুবিধে পাব।
    কাজেই মজা দেখার লোভটা চোদ্দগুণ হয়ে গেল। হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তল্লাটের আনাচকানাচ ভরে উঠল নানা ধরনের উটকো মজালোভী জনতায়।

    এত বছর ধরে হাসপাতালের ভেতরে যাদের আটকে রাখা হয়েছিল বছরের পর বছর, এতাবৎ কালের সবরকমের রুগিরাই, নিজেদের স্বাস্থ্য কিসসু বোঝেনা, উল্টে রোগ পুষে রাখতেই তারা ভীষণ দড়ো। তাই তো হাসপাতালের মেট্রন থেকে নার্স দিব্যি ছিল, খাচ্ছিল দাচ্ছিল। ঘুমোচ্ছিল। অসুস্থদের উহ আহ কানে গেলেও তাদের বিন্দুমাত্র কিছু আসছিল যাচ্ছিল না, অসুস্থগুলো আরো অসুস্থ হচ্ছিল। একটা দুটো পটকেও যাচ্ছিল, তখন তাদের ঠ্যাংগুলোতে দড়ি বেঁধে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। কী রোগ কী রোগ বাবা। মেরে ছাড়ে! এইসব বলে টলে হাত ডেটল দিয়ে ধুয়ে ফেলছিল নার্স।

    দেশজ আর দৈবী ছাপ্পামারা এত এত ওষুধ এল যখন, বয়াম বয়াম, পাতা পাতা, গুচ্ছের ওষুধ এসে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটা দেওয়াল স্তূপীকৃত হয়ে গেল, দেওয়ালে লেখা স্বাস্থ্যের বাণী, দেবতার আশীর্বাদ, ইত্যাদি লেখা টেখা ঢেকে দিল, তখন সবার টনক নড়ল।

    এর পর নতুন নতুন নির্দেশিকা এল, ওষুধ প্রয়োগ করে ফলাফল ফেরত যাবে ল্যাবরেটরিতে। ল্যাব থেকে জানতে চেয়েছে এই প্রয়োগে কটা লোকের অসুখ ভাল হয় আর কটা পটকে যায়।
    এইবার কাজের চাপ বাড়ল। ডাকাহাঁকা করে সবাইকে আনা করাতে হল। অসুস্থরা কেউ মেঝেতে পাছা ঘষটে, কেউ দেওয়ালে ভর দিয়ে, কেউ লাঠি ঠুকে, কেউ একে অপরের কাঁধে ভর দিয়ে এল। বাধ্য হল আসতে। নতুন ওষুধ, প্রয়োগ করে দেখতেই হবে।

    সারা গায়ে উকুন সমেত, নোংরা, তোবড়ানো মুখের লোকগুলো প্রথমবার তাই ওষুধ নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিল। এরা এমন রুগি যে এতটুকু পরিবর্তন সহ্য করতে পারেনা। রুলের গুঁতো দিয়ে স্নানে পাঠাতে হয়। মাঝে মাঝেই এদের পরিচ্ছন্নতা দেখতে আসে নির্দেশক মণ্ডলী। তার ঠিক আগে আগে, মেট্রন গিয়ে সরু একটা লাঠি নিয়ে এদের গায়ের কম্বলগুলো সাবধানে তুলে পুড়িয়ে দেয়। হাসপাতালে বছরে একবার নতুন কম্বল আসে। কিন্তু নির্দেশকদের লোক না এলে নতুন কম্বল দেওয়া হয়না রুগিদের। তাই, সেই পুরনো বিশ্রি কম্বল জড়িয়ে তারা সারাবছর কাটায়। এইসব পুরনো ছেঁড়া গন্ধবেরনো গায়ের কম্বল আগুনে ফেলে দেওয়ামাত্র তারা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে দেয়, যেন তাদের আত্মীয় বিয়োগ হয়েছে। এতদিনের প্রিয় গায়ে দেবার কুটকুটে কম্বলে এমনভাবে উকুন আর ছারপোকা জমেছে, বংশবিস্তার করেছে যে, তাদের সঙ্গেও ওরা বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিয়েছে ততদিনে। ওরা বিশ্বাস করতে পারেনি একদিন সবকিছুকেই ছেড়ে দিতে হবে আর এ তো নেহাৎ কম্বল।

    নতুন ওষুধটা আশ্চর্য ভাবে কারুকে মেরে তো ফেললই না, বরঙ অনেক অসুস্থ লোকের ভেতরে একটা পরিবর্তন দেখা যেতে লাগল। প্রাথমিকভাবে তাদের যার যা সমস্যা ছিল সেগুলো কেমন যেন কমে যেতে লাগল। যে চোখ পিটপিট করত তার পিটপিটানি কমল। যার মুখ ফ্যাকাশে ছিল তার ঠোঁটে সামান্য রং দেখা দিল। যে সবকিছু হারিয়ে ফেলত সে সবকিছু খুঁজে পেতে শুরু করল।

    চীৎকার করে কাঁদা বা শাপশাপান্ত করা, এসব ও কমে যেতে লাগল ক্রমশ। এই মুহূর্তে নির্দেশকমণ্ডলী পরিদর্শক পাঠাল এবং এই চমৎকার উন্নতি দেখে কিঞ্চিৎ খুশি হলেন তাঁরা। ফিরে গেলেন ল্যাবে। এবং প্রতিটি নতুন ওষুধের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হল কয়েকশো গুণ। চারিদিকে এবার ঢ্যাঁড়া পেটানো হতে শুরু করল। সর্বরোগহর ওষুধের বাড়তি জোগান এসেছে। এটাই সুযোগ। মানুষকে এ সুযোগ গ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।

    উৎসাহিত নয়, মানুষকে ডাকতে হবে। মানুষকে নাম ধরে ধরে কান ধরে ধরে আনতে হবে। মানুষকে ওষুধ নিতে বাধ্য করতে হবে। ফলে প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপরে দায়িত্ব এল, এবার প্রতিটি পরিবারের সদস্য তালিকা বানানো হবে এবং তাদের ডেকে এনে যে দুতিন প্রকারের অসুখ, যা খুব দুর্বারভাবে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, বা পড়ার সম্ভাবনা আছে, তার প্রতিষেধক হিসেবে এইসব ওষুধ সেবন করাতে হবে।

    যারা মজা দেখতে এসেছিল, প্রথম তাদেরই পাকড়াও করে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। তারপর বাকিদের ডেকে আনা আর কতক্ষণের ব্যাপার। কারণ প্রথম দল, মানে পূর্বতন অসুস্থের দল সামান্য ভাল বোধ করছিল বলে মজাদেখার লোকেদের মনে একটা শান্তি ও স্বস্তি এসেছিল, ভয় ছিল না, বরং নিখরচায় ছোটখাট রোগগুলো সেরে যাবার আশা ছিল।

    ইতিমধ্যে একটা আদ্দিকালের টাইপরাইটার নিয়ে কাজ চলছিল না। নতুন নতুন কটা টাইপরাইটার এনে মেট্রন দিদিমণি আর দু চারজন কর্মীকে বসিয়ে দিয়েছেন নাম টাইপ করতে। কাগজে পেনসিলে লিখলে এত দীর্ঘ সারির মানুষের সবার নাম তোলা অসম্ভবপ্রায়। পেন্সিল ছুঁচলো করতে যে সময়টুকু লাগে সেটাও পাওয়া যায়না বস্তুত। নতুন টাইপরাইটারে সব অক্ষর ভাল টেপাটিপি হয়। তবে, নতুন বলে আঙুলে চাপ বেশি লাগছিল। সামান্য আঙুলের এদিক ওদিকে নামের তালিকা গুলিয়ে যাবার ভয় করছিল।

    এত চাপ নিতে না পেরে নার্সদের অনেকেই অসুস্থ বোধ করছিল। কিন্তু মেট্রন তাদের ভাল করে বক্তৃতা দিয়ে উৎসাহিত করছিলেন।

    মেট্রনের মনে একইসঙ্গে পুলক ও ঘৃণা কাজ করছিল। এতবড় একটা দায়িত্বপালনের পুলকের পাশাপাশি এই মূর্খ, অসহ্য ভিড় সামলানোর ঘৃণা। মেট্রন দিদিমণি পাশাপাশি রাখা ছটি টাইপরাইটার থেকে বেরনো দীর্ঘ কাগজের স্তূপ থেকে ঘাড় তুলতে পারছিলেন না, তাঁর ঘাড় দপদপ করছিল।

    প্রত্যেকের নাম লিখেই এদিকে নার্সরা জিজ্ঞাসা করছিলেন, খোসপাঁচড়া না আমাশা? আমাশা না খোসপাঁচড়া। না কান কটকট, নাকি ঘুমঘোরে ঘর্মাক্ত দুঃস্বপ্ন? চারপাঁচ রকমের রোগ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে বলতে নার্স লোকেদের মুখ দেখছিলেন, তাপমাত্রা মাপছিলেন, চোখের মণি দেখছিলেন, হাতের তালুর ঘাম দেখছিলেন, শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট চেটে নিয়ে তো তো করে উত্তর দেওয়া দেখছিলেন।

    লোকেদের তাপমাত্রা বেশি আসতে শুরু করত দুপুরের দিকে। তারা রোদ্দুরে তিনঘন্টা দাঁড়িয়ে এই হাসপাতালে ঢুকতে পেরেছে। হাঁক দিয়ে বকা হচ্ছে তাদের। যাও ছায়ায় দাঁড়িয়ে এসো দশমিনিট। নার্সের নিকটে পৌঁছেও তাদের কার্যসিদ্ধি হচ্ছেনা, তাদের মুখ ঝুলে যাচ্ছে। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। কপাল ঘর্মাক্ত। নিজের কাপড়ের খুঁটে কপাল মুছে তারা দশ মিনিট পরে আবার আসছে। আবার তাপমাত্রা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আবার ফিরে যাচ্ছে ছায়ায়। কতটা ছায়া হলে ঠিকঠিক ছায়া হয় সেটা বুঝতে পারছেনা। কতটা তাপমাত্রা হলে ঠিক ঠিক তাপমাত্রা হয় বুঝতে পারছেনা।

    লোকেরা যত মূর্খ হচ্ছিল, নার্স ও মেট্রনদের নিজেকে ক্ষমতাবান মনে হচ্ছিল। মানুষকে মাছির মত বিরক্তিকর, ইঁদুরের মত করুণ ও ফেউয়ের মত লোভী মনে হচ্ছিল।

    বিনিপয়সার ওষুধ পাবে বলে অনেকে মিথ্যে মিথ্যে নিজেদের রোগ বাড়িয়ে বানিয়ে বলছিল। যাতে চার পাঁচ রকমের ওষুধ পাওয়া যায়। পাশে একজন নার্স দাঁড়িয়ে তারপর এক গেলাস জল এগিয়ে দিয়ে সবকটা ওষুধ তাদের গিলিয়ে দিচ্ছিল, আর তারও পরে, মানুষগুলো মিথ্যে করে বলা অসুখের জন্য মিথ্যে ওষুধ যখন গিলে নিতে বাধ্য হচ্ছে, ঢক করে গেলার সময়ে তাদের মুখের মধ্যে তেতো, মিষ্টি, কষায়, বদগন্ধযুক্ত নানারূপ ওষুধ যখন মিলেমিশে গিয়ে একটা বীভৎস স্বাদের সৃষ্টি করছে, তখন তাদের বিস্ফারিত চোখ মুখ দেখতে ঔষধদাতারা খুব আমোদ পাচ্ছিল...ওদের ভয়ে বিবশ, কিছুটা বিভ্রান্ত অবস্থাটা ভারি মজার লাগছিল তাদের।

    মুখে একটা চিলতে হাসি নিয়ে নার্সরা একের পর এক ওষুধ দিতে লাগল, আর প্রত্যেকে ফেরার সময়ে তাদের মনে করিয়ে দিতে লাগল, বাড়ির বাকি সবাই যেন এখুনি চলে আসে ওষুধ নিতে। আর বেশিদিন ওষুধের স্টক থাকবে না।

    লোকগুলো পা ঘষটে ফিরে যাচ্ছিল। ওষুধের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ভালই, তাদের চনমনে লাগছিল, আর এতক্ষণের অপেক্ষা তো সফল অন্তত! সাময়িক বিরামের আনন্দে রীতিমতন পুলকিত হয়ে তারা ঘরে ফিরে অন্যদের পাঠাচ্ছিল। এভাবে লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতেই থাকছিল।

    সাত থেকে দশদিন পরে, দেশজ দৈব ল্যাব থেকে যে ওষুধগুলো এসেছিল সেগুলো ফুরিয়ে গেল। ওদিকে ভূমধ্যসাগরের চড়ায় বিদেশি জাহাজ আটকে গিয়ে নতুন ওষুধ আসা বন্ধ, তাই এই কর্মকান্ডে আপাতত ইতি।

    কিন্তু ইতিমধ্যে আশেপাশে যত গরিব, ভুখা, বোকা মানুষ ছিল প্রত্যেকে ওষুধ পেয়েছে। দৈব ওষুধের কী লীলা, সবার খোসপাঁচড়া সেরে গেছে, আমাশাও। বাকি আরো কত ছোট ছোট অসুখ পুষে তারা এদ্দিন ছিল কী করে কে জানে? সব সেরে গেছে। বা যাচ্ছে। এই ভেবে তারা মহা খুশি।

    ল্যাব থেকে জানানো হল, আপাতত ওষুধ প্রস্তুতির বিরতিমাস। আপাতত সবাই নিজের নিজের কাজে থাকো। মানুষ কোন আপিল আপত্তি জানালে সে আলাদা কথা। নাহলে দশমাইল শান্তি কল্যাণ বিরাজ করতে লাগল।

    এইসবের মধ্যেই পুরনো রুগিদের একজনের শরীরে নানারকম বিদঘুটে চিহ্ন দেখা দিল। তার চামড়া ফেটে ফেটে রক্ত বের হয়ে আসছিল। চোখের মণিদুটো টকটকে লাল। মনে হচ্ছিল ভেতরে কোন শিরা ফেটে গেছে। তারপর শেষে তার রক্তবমি শুরু হল।

    নার্সেরা কিছু বুঝতে না পেরে, তাকে জলপটি আর সামান্য কিছু পুরনো, তারিখ পেরনো ওল্ড স্টকের ওষুধ দিয়ে প্রশমিত করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু লাভ হয়নি কিছু। চারপাঁচদিনে সব শেষ। কী আর করা, পায়ে দড়ি বেঁধে হিড়হিড় ও অগ্নিতে সমর্পণ ছাড়া কিছু করার নেই। লোকটা কাগজপত্রও তালিকা থেকে খুঁটে ফেলে সেগুলোকেও বিসর্জন দেওয়া হল। লোকটা ছিলনা হয়ে গেল।

    এইবার একে একে প্রতিটি রুগির ভেতর এইসব লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করল। যারা হাসপাতালে ছিল তাদের সবচেয়ে আগে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, এবং ফলত তারাই সবচেয়ে আগে মরল।
    ল্যাবে, ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে, সর্বত্র জানানো হল। কিন্তু ওদিক থেকে ঠা ঠা নীরবতার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেসব চিঠি ফিরে এল। তালিকা প্রস্তুতির পর, সে তালিকার বান্ডিল বান্ডিল কাগজ ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়ে গিয়েছিল। ফলে, সে কাজটার দিকে ফিরে দেখার আর সুযোগ ছিল না।

    এমতাবস্থায় একদিন ভোর রাতে বিপদ বুঝে মেট্রন পালালেন। নাহলে নার্সদের খেটে খেটে কাহিল অবস্থা, মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবা করে আর হাগামোতা পরিষ্কার করে রীতিমতো বিস্রস্ত অবস্থা। নেইমানুষ করার জন্য তথ্যাবলি-ও বেহাত হয়ে গেছে।

    দিন সাতেক পর, হাসপাতালের বাইরের, গাঁ গেরামের প্রথম লোকটি, যিনি ওষুধ পেয়ে কাল্পনিক অসুখের কাল্পনিক সুস্থতাপ্রাপ্তির পর বাড়ি গেছিলেন, তিনি রক্তবমি করলেন। পরিবার হাসপাতালে ছুটল।

    হাসপাতালে তখন কেউ ছিল না। দরজায় তালা। পুরনো পুরনো, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকা, শেষতম রুগিকেও তদ্দিনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মেট্রন নার্স, সবাই গোপনে স্থানত্যাগ করেছিল।

    ফাঁকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজা জানালা ভেঙে যারা ঢুকল, তাদের অনেকেই প্রথমবার আত্মীয়ের সোনার গাছকৌটো গাপ করার পর, মজা দেখতে ওই জানালার বাইরে থেকে ভিড় জমিয়েছিল। তারপরের বার মিথ্যে বলে বাড়তি ওষুধ নিয়ে গপ করে গিলে খেয়ে ফেলেছিল। যে যত বেশি ওষুধ খেয়েছিল, সে তত তীব্রভাবে টের পেয়ে যাচ্ছিল সমস্ত শরীর জুড়ে দাপাদাপি করছে রক্তস্রোত। ভয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছিল তারা, মাথার মধ্যে যেন মৃত্যুর ভয়টাই সবচেয়ে বেশি নাচছিল। স্নায়ু ফেটে ফেটে বের হয়ে আসছিল একটা ভয়ানক বুঝতে পারা। কিচ্ছু করার নেই আর। যা হবার হয়ে গিয়েছে।

    ভেতরে ঢুকে হা হা করা আলমারিগুলো দেখতে পাওয়া গেল। কোথাও আর কোন ওষুধ ছিল না।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি
  • গপ্পো | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ঘ - শর্মিষ্ঠা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্রতিভা | 2409:40e0:1152:59be:842e:d90c:2f50:***:*** | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ২১:১৫739948
  • গল্পটা কশাঘাতের মতো! প্রাসঙ্গিক এবং ভীতিপ্রদ। যে প্রাঞ্জলতার সঙ্গে এই জটিলতাকে স্তরে স্তরে উদঘাটন করা হয়েছে তা খুবই মুনশিয়ানার পরিচয় দেয়।
  • Rohini Dharmapal | 84.4.***.*** | ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০২:১৬739951
  • ভয়ঙ্কর একটি লেখা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন