এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইদবোশেখি  ইদবোশেখি

  • বরাতের রাত

    ডাঃ বর্ণালী রায়
    ইদবোশেখি | ২৫ মার্চ ২০২৬ | ৩৯ বার পঠিত
  • ছবি: জেমিনি



    সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আসমা। শবেবরাত এর দিন বলে কথা। বাচ্চারা বাড়িতে। দোস্ত মেহমানরা আসবেন। নাস্তাপানি বিছানাপত্তর সবই তো তাকে একা হাতে সামলাতে হয়। সাহায্য করার জন্য তো কেবল ওই বোকার হদ্দ সাদিয়াটা।

    কিচেনে ঢুকেই গ্যাসে প্যান বসিয়ে দিলেন আসমা। প্যানটার দিকে তাকালেন একবার। একটা সবুজ উপত্যকা দিয়ে ছোট্ট নদীর মত বয়ে গেল মনটা তার। কি অপূর্ব রঙ বাসনটার। পেস্তা বাদামের খোসার মত হালকা সবুজ গায়ের রঙ। হাতলটা উজ্জ্বল হলুদ। হাতলের উল্টোদিকে প্যানের উপরে ছোট্ট সরু একটা তেকোনা মোটা পাত বসানো। গরম হয় না। হাত দিয়ে ধরে নামানোর সুবিধার জন্য একটু লম্বাটে ধরনের। আগাটা সরু। পাখির ঠোঁটের মত। আবার রঙটাও চমৎকার গাঢ় লাল। হাত দিয়ে হাতলটা সামনের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন তিনি। লাল ঠোঁটটা কোনাকুনি মত হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে যেন পিছন ফিরে একটা পাখি বসে আছে। আসমার ঠোঁটেও জিতে যাওয়ার হাসি। কি খোঁজটাই না করেছিলেন প্যানটার জন্য আসমা। অনলাইনে অনলাইনে সে কি ঘুরে মরা ! যখন তখন রাঁধতে রাঁধতে খেতে খেতে চলতে ফিরতে। ঘুম তো ঘুম শোওয়াই ভুলে গিয়েছিলেন। সে যে কতরকম! ধরন, গড়ন, কায়দা, কানুন, রঙ, ঢঙ! কত যে। মনে মনে এটাই যেন খুঁজছিলেন। তারপর আবার একটা এসে পড়ে। অমনি মনে হয় এটাই সেরা। তারপর আবার। আবার। ওঃ। ফোন দিচ্ছে কেউ। আম্মি কি আপা হবে। আর সময় পেল না, না কি! এমনকি মনোয়ারার মত দোস্তকেও সে পাত্তা দেওয়ার সময় পেল না । কতবার যে তাঁর মানুষটা নিচু স্বরে কিছু বলে গেলেন। কানেই নিলেন না আসমা। কতদিন যে চলেছিল এসব !

    "বিবিজি, এগুলান কোন হানে রাহুম?"

    চমকে উঠলেন আসমা। সাদিয়া তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে দুটো প্যাকেট। সে খুবই শান্ত চুপচাপ এক মহিলা। মালকিনের দিকে চোখ তুলে তাকানোর মত জোরটুকু তার কোথায়! কিন্তু সেও আসমার মতই বিভোর হয়ে হাতের প্যাকেটদুটোর দিকে তাকিয়ে ছিল। এতে কী আছে সে জানে। খুব মজাদার নাস্তার জিনিস। এ দিয়ে যা আসমা বানান তা সেও খেতে পেয়েছে কখনো সখনো। সেগুলো দেখতে দেখতে তাই তার মন ভেঙে ঝুরঝুর হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেগুলো সদ্য ফ্রিজ থেকে বের করা। বরফের মত হিমশীতল। হাত ঠান্ডায় জমে জ্বালা করছিল সাদিয়ার। বুক পেট আর মনও একসাথে ভারি হয়ে উঠছিল। তাই মালকিনকে জিজ্ঞেস না করে পারল না।
    "অ্যাঁ, ও, বাদাম মিল্কশেক? দাঁড়া দাঁড়া। " বলে একটা বড় পাতিল বেসিনে বসিয়ে দিলেন। খুলে দিলেন জলের কলের মুখ। বললেন, "এতক্ষণ বলিস নি কেনো ? তোকে নিয়ে তো আর পারা যায় না রে। কত্ত দেরি করে দিলি। রাখ রাখ ওর মধ্যে।"

    সাদিয়া হাত খালি করতে করতে শুনতে পেল আসমা বলছেন, "সাদিয়া চালটা বেটেছিস তো? দে বাটিটা দে। "
    সাদিয়া চুপচাপ বাটিটা বাড়িয়ে দিল।

    "একি, এত পানি পানি করেছিস কেনো? কোনোদিন ফিরনি পাক করিস নি নাকি? নিজের বাচ্চাদের জন্যও করিস নি ? আবার মিথ্যা বলিস না যেন। নিজের কাজটাতে মন নেই। খালি বাজে কথা। আর মাহিনা বাড়াও, মাহিনা বাড়াও।...." রোজকার মতন বকবক করতে থাকেন আসমা।

    কিন্তু সাদিয়ার দুর্বল শরীরটা কাঁপতে শুরু করেছে। রোজা চলছে। বাচ্চাগুলো মসজিদে গিয়ে দুইএক টুকরো ফল পায়। বা একটা ঠান্ডা চপ। তার জব্বারের বাবার হাত ভেঙেছে। তা দেখিয়ে সেও কিছু নাস্তা পানি পাচ্ছে। কিন্তু সাদিয়া কোথায় কী পাবে ?

    ওদিকে বাদাম মিল্কশেকের প্যাকেট কেটে দুধটা প্যানে ঢালা হয়ে গেছে। হালকা ফুটছে ঘন পানীয়টা। দামী খাদ্যের সুবাসে সাদিয়ার খালি পেটটা গুলিয়ে উঠছে। পাশের বাড়ির বুড়ি আম্মিজান যাকাতের নামে কিছুটা চাল, কয়েকটা আলু আর কয়েকটা আণ্ডা দিয়েছিল। কেউ আজকাল এসব মানে না। কিন্তু আম্মিজান প্রতিবারই টুকটাক দেয়। সেই চাল মুঠো দুয়েক ছিল। ভোর রাতে তার মধ্যে অনেকটা পানি ঢেলে পাক করেছিল সাদিয়া । গিলা গিলা পানি পানি সবটা। একটু নুন ছড়িয়ে বাচ্চাদের খাইয়েছে। নিজের জন্য সামান্যই ছিল। তার উপর দু গেলাশ পানি ঢেলে পেটের মুখ বন্ধ করেছে সে। এবার জব্বার, মানে তার ছোটো ছেলেটা আবার ফিরনি খাবে বলে সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করছে। তার কী দোষ ! চারিদিকে তো শুধু খাওয়ারই কথা।

    "দ্যাখ, চাল এভাবে ঘন করে বাটতে হয়।" বলে আসমা সাদিয়ার দিকে তাকালেন। অবাক হয়ে বললেন, "ওমা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁ করে কী ভাবছিস ? বাদাম শেকটা খুন্তি দিয়ে একটু নাড়াতেও তো পারিস ! সব কি বলে দিতে হয়? "

    সাদিয়া বলল, "তুমি তো কও নাই---!"

    "তুই কি ঘরে পাকশাকও করিস না ? চালাকি করো, না?"

    সাদিয়া চুপ। মেঝের দিকে তাকিয়ে। সত্যিই তো এটা তার মাথায় যে আসে নি কেনো! আসমা একবাটি কাজু বাদাম দিয়ে বললেন, " নে, এগুলো ছোটো করে ভেঙে দে। দেখিস যেন গুঁড়ো গুঁড়ো না হয়ে যায়। আমার হয়েছে যত জ্বালা। এগুলোও বলে দিতে হবে । কিচ্ছু জানিস না, না ?" চালবাটা তপ্ত পানীয়ে ঢেলে খুন্তি দিয়ে নাড়তে লাগলেন আসমা। আর বলতে লাগলেন, "এখন আবার কত ঢঙ হয়েছে। ক্যারামেল ডিস্ক দিয়ে নাকি সাজাতে হবে। আমার নানি তো হাতেই চাল বাটত। বাদাম টাদাম কারও মাথাতেও ছিল না। প্যাকেটের দুধই বা কোথায় ! বরং ছিলো খাঁটি গাইয়ের খাঁটি দুধ। আর খেঁজুরের গুড়। সেটাও অবিশ্বাস্য রকমের খাঁটি। আর এলাচের গুঁড়ো কিন্তু থাকবেই। সে যে কি দারুন রে সাদিয়া কি বলব! কোথায় লাগে এসব নকশা খাবার! এই তো এই আঙুলের মাথায় এতটুকুন জাফরান। দামটা ভাব ? কে কিনতে পারে তুই বল ! আচ্ছা এবার চিনির বয়ামটা দে।" মনে মনে আসমা বলে চলেন, " অবশ্য সে ফিরনিই বা আর কত হত! ঈদে হত হয়ত। শবেবরাত নানির হাতের রুটি হালুয়াতেই সারতে হত। খাওয়া আর ফূর্তির থেকে আল্লাহ তাল্লাহর কাছে গুনাহ কবুল করার ব্যাপারটাই ছিল বেশি । আল্লাহ তাল্লাহর সাথে তাঁর বান্দাদের সম্পর্ক স্থাপনের রাতই তো এটা। বরাত ফেরানোর রাত। সে অনেক বড়সড় ব্যাপার। আমিই কি ছাই সে সব বুঝি ! কিন্তু তার জন্য এত এলাহি আয়োজনের কিছু কি দরকার আছে? আল্লা রসুল তো তা বলেন নি। কিন্তু ওই যে মানুষের হুজুগ। অথচ কী করার না কথা ! রাতে দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতে হয়। আল্লাহ তাল্লাহ তখন অনেক উঁচু আকাশ থেকে পৃথিবীর কাছাকাছি নেমে আসেন। ঋজু বলিষ্ঠ শরীর তাঁর। দীর্ঘ পদক্ষেপ ফেলে ফেলে আশমানের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে হেঁটে চলেন। চলতে চলতে মাটির পৃথিবীর দিকে একটু ঝুঁকে ডাক দেন, "ওহে রহমতের প্রিয় বান্দারা, অপরাধ কবুল করার হিম্মত আছে নাকি আপনেদের? তোমরা সব দরওয়াজা খুলে দাও দেখি। মাফি মাঙো। আর বরাত ফিরে ঘরে নিয়ে যাও। আমেন।"

    সবাই জানেন এসব। আর যারা ক্ষমা পেতে চান তাঁরা বহু সময় ধরে সেজদায় থেকে অপরাধের হিসাব বলে যান। আর প্রত্যেকটি অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। আল্লা রসুল ক্ষমাশীল। তিনি তো জগতের মালিক। তাঁর বিচারালয়ের নিয়মকানুন তো আলাদা হবেই। ভেড়ার গায়ে কত লোম আছে ? ভাবা যায়! আল্লা রসুল নাকি তার থেকেও বেশি অপরাধীকে শবেবরাতের রাতে ক্ষমা করেন। কিন্তু না। তাঁর অন্য বিচারও আছে। এক ফোঁটাও ক্ষমা করেন না এমন কোনো কোনো বান্দাকে যাদের মনে ভরা বিষ। এবার বোঝো এই রাত কার জন্য সৌভাগ্য নিয়ে আসবে। আর কাদেরই বা দোজখের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। " মনে মনে কথা বলতে বলতে গ্লাসে গ্লাসে ফিরনি ঢেলে ফেলেছেন আসমা। উপরে সাজিয়ে দিয়েছেন ক্যারামেল ডিস্ক আর ভাঙা বাদাম । প্রত্যেক গ্লাসের উপর দু-তিনটে করে জাফরানের সুতোর মত পাঁপড়িও ছড়িয়ে দিলেন। যাকে বলে গার্নিশ করা। তাই শেষ করে সাদিয়াকে বললেন,
    " নে, এগুলো একটা একটা করে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখ তো। পড়লে কিন্তু কেলেংকারী। আমিই রাখতাম। কিন্তু খাটতে খাটতে কোমর ভাঁজ করতে পারছি না। " তারপর একটু থমকে গেলেন। সাদিয়া এগোচ্ছিল। তিনি হাত তুলে বললেন, " না থাক, আমিই রাখছি। তোর উপর ভরসা করতে গিয়ে শেষে ---। তুই, তুই বরং এবার ঘরগুলো সাফসুতরো কর। ধুলো ময়লা যেন এক ফোঁটাও না থাকে। সাবধান। আল্লা রসুলের মনে গুস্যা যেন না আসে। মোমবাতি জ্বালাতে হবে সন্ধেবেলা। ধুলোর মধ্যে জ্বালাবো নাকি ! আসল পাক তো শুরুই হল না। গোস্তটোস্ত সব রেডি করতে হবে না ! মেহমানরা এসে পড়বেন। তাড়াতাড়ি সেরে আয় ওদিকটা।" সাদিয়া ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে কিচেন ছেড়ে। আসমা ফ্রিজে তুলছেন গ্লাসগুলো। তখনই বাইরে থেকে একটা চেঁচামেচি তাঁর কানে এল। ওসমানেরও গলা শোনা যাচ্ছে।

    "বিবিজি, তাড়াতাড়ি আহেন। দেহেন কী কোরছে আফনার সাদিয়া বিটি।"

    আসমা প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন। মনে হল যেন গোটা টাওয়ার ভেঙে পড়ল। একটা কাজ ঠিক করে করার উপায় নেই। সব সময় ঝামেলা। ফিরনির গ্লাস ছেড়ে আসমা দৌড়ে বাইরে এলেন। এসেই হতবাক। ওকি কে পড়ে উঠোনে? সাদিয়া? সামনে একটা ছোটো জলের বোতল। গড়াগড়ি যাচ্ছে। মুখ খোলা। চারিদিকে সাদা সাদা জলীয় বস্তুও ছিটিয়ে পড়ে আছে। কী ওগুলো ? দুধ ? কয়েক মুহূর্ত আসমা থমকে গেলেন। তারপর চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এসব কী হচ্ছে ওসমান? ও পড়ে গেলো কী করে? সাবধানে চলতে বলি। কথা তো শুনবে না।"

    "না না বিবিজি, মনে কয় মাথা ঘুইরা পড়ছে। রোজা রাখতাছে তো! তায় খাওন দাওন কই ? "

    "আর, ওই দুধ ? না কি মিল্কশেক ? হায় আল্লা ! এ কী কাণ্ড! "

    ওসমানের গলা থেকে সব দরদ এবার মিলিয়ে গেলো। বিকৃত স্বরে চিৎকার করে বলল, "বোঝেন নাই এহোনও ? চুরি করছে। আগেও করছে কিনা ক্যাডায় জানে। হারামজাদী পুষতেছেন আফনে। "

    অমনি হাঁউমাঁউ করে উঠে বসল সাদিয়া। " না, না, বিবিজি, আজই শুধু নিছিলাম। ওই যে আমার ইবলিশের ছাওয়াল কয়ডা আছে না ! ফিরনি খাইতে চায়। আজই ওগো জিব্যা টাইন্যা ছিঁড়া ফেলামু। আছাড় মাইরা সব কয়ডারে --- " উপস্থিত কয়েকজন হাঁ করে সাদিয়াকে দেখছে। এ কোন সাদিয়া? সেই চুপচাপ ভিতুর আণ্ডা মাইয়াডার গলায় কি ত্যাজ রে বাবা! এত কতাও জানে সে! দেহে তো মনে হয় গুঙ্গা এড্ডা। ওদিকে এসব বলতে বলতে সাদিয়া গড়িয়ে আসমার পায়ের সামনে এসে পড়েছে। আসমার মুখ কঠিন। দুঠোঁট চেপে বন্ধ করা। দৃষ্টি স্থির। অপলক। সেদিকে তাকিয়ে সাদিয়ার গলা শুকনো কাঠ হয়ে গেলো। কোনোরকমে কাঁদতে কাঁদতে বলে, "আল্লার কিরা, আর হইবে না বিবিজি। আর কোনোদিন হইবে না। আল্লায় জানে আমি চোর না। শুধু বাচ্চাডার লাইগা ---।" কাঁপতে কাঁপতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কি সব বলে যাচ্ছে সাদিয়া।

    তওবা তওবা তওবা। আসমার কানে আর কিছু ঢুকছে না। তাঁরও শরীর জুড়ে কাঁপুনি শুরু হয়েছে। তাঁর চোখের সামনে জমিনের উপরে দোজখের আগুন জ্বলছে। তার ভিতর থেকে টকটকে লাল আর ক্যাটক্যাটে হলুদ চীনা ড্রাগনদের শত শত মাথা তেড়ে আসছে তার দিকে। আর তাদের চেরা চেরা হাজার হাজার জিভ উপরে নিচে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। অনবরত। বিরামহীন। তাদের শ্বাসবায়ুতে ততক্ষণে ঝড় উঠে গেছে। পর পর হুঙ্কারে মাটি আকাশ তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর যেন শেষ দিন ঘনিয়ে উঠছে।

    পিছন ফিরলেন আসমা। তারপর এক ছুটে চলে গেলেন ঘরের ভেতর। বাইরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল সাদিয়া। ওসমান বলে উঠল, "ঠিক হইছে। এইবার দ্যাখ ক্যামনে ঘাড়ে গুত্তা মাইরা ফ্যালায় দ্যাবার হুকুম আসে। "

    আসমা আবার বেরিয়ে এসেছেন। তবে ধীর অনুত্তেজিত পায়ে। হাতে একটা বড় গামলা মত পাত্র। ঢাকা দেওয়া। কারও দিকে তাকালেন না। সাদিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, " সাদিয়া, ওঠ।" তার স্বরও অকম্পিত। সাদিয়া ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ালো। আসমা এক পা এগিয়ে এসে বললেন, "ফিরনিটা বাড়িতে নিয়ে যা। জব্বারকে দিস। অন্য ছেলেদেরও দিস। বলে দিলাম।"

    একটু একটু করে সন্ধে হচ্ছে। বাড়িটা শান্ত। সেই দুপুর থেকেই। বাড়িতে এখনও তেমন কেউ আসেন নি। মানে মেহমানেরা। বাচ্চারাও বড় হয়ে গেছে। পরিস্থিতিটা তারাও বোঝে। ওদের আব্বুর তো একটা কিতাব হলেই হয়ে গেল। এত যে কার জন্য আসমা করেন ! আসলে এসব নিত্যনতুন কায়দাগুলো আসমারই পছন্দ। কেউ তাঁকে কিছু করতে বানাতে বা পাকাতে বলে না। সে নিজেই ইউটিউব নয়ত টিভি থেকে দেখে নানারকম কিছু করতে ভালোবাসেন। সবাইকে চমকে দিয়ে খুশী করে আনন্দ পান। কিন্তু আজ সব কিছু অন্যরকম হয়ে গেছে । আনন্দের অর্থটা কেমন যেন গোলমেলে লাগছে তার। বিভ্রান্ত বোধ করছেন। বিস্বাদ আর বিষাদ একসাথে চেপে ধরেছে আসমাকে। একটা আলো জ্বালাতেও হাত উঠছে না তাঁর। সকালেও ফুলগুলো দিয়ে কত কী করবে ভেবে রেখেছিলেন ! এখন সেদিকে তাকালে অসহ্য লাগছে। মুখ ঘুরিয়ে বাইরে আকাশের দিকে চোখ ফেললেন। একটা একটা করে জ্বলে ওঠা তারা দেখতে লাগলেন। ক্রমশ তারাগুলো তাঁকে আকৃষ্ট করতে লাগল। চমৎকৃত হতে হতে তারায় তারায় ভরে উঠতে দেখছেন আকাশকে। অনেকদিন পর বিস্ময় ফিরে এল জীবনে। মুগ্ধতাও। কেনো এতদিন আকাশ দেখতে ভুলে গেছেন আসমা? আচ্ছা এর মধ্যে কোন তারাটা তাঁর নানি ? আর কোনগুলোই বা নানির কালের হারিয়ে যাওয়া সেইসব মানুষজন ? যারা রুটি আর হালুয়া খাওয়ার জন্য নানির মাটির দাওয়ায় ভিড় জমাতো! তারা কি আসমাকে দেখতে পাচ্ছে ! তাঁকে চিনতে পেরে মাটির কাছাকাছি নেমে আসছে ! আসমার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বোধহয় বলছে, "তোগো ওই ফিরনি এড্ডু খাওয়াইবি নাহি, আসমা বেটি?"

    আসমা মুখ তুলে ধরা গলায় বলছেন, "তোমরা আমাকে মাফ করছো তো!"

    "দূর হ। ওসব মাফ টাফের বুজিডা কী আমরা? তোর ঘরগুলান এমন আন্ধার ক্যান? চল, আমরা বরং আলোগুলান জ্বালাইয়া দি। আর ফুলগুলান দিয়া তরে এড্ডু সাজাইয়াও দি। জামাই অমন কিতাব মুহে পড়ে থাহে ক্যান? চল দেহি এহোন। অমা, আসমা, আবার কান্দোস ক্যান ?”


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইদবোশেখি | ২৫ মার্চ ২০২৬ | ৩৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন