কলকাতার উপকণ্ঠে রাত নামলে একটা অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। সেটা কুকুরের ডাক নয়, ট্রেনের হুইসেলও নয়। সেটা আসলে ক্ষমতার সাইলেন্সার-লাগানো হাঁপানি। বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এমন এক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পোস্টারগুলো গণতন্ত্রের কথা বলে, আর গলিগুলো ফিসফিসিয়ে বলে, “মুখটা বন্ধ রাখ, না হলে বন্ধ করে দেব।”
এই রাজ্যে বিরোধী রাজনীতি করা এখন অনেকটা পুরনো ফ্রিজে আইসক্রিম রাখার মতো। বাইরে থেকে ঠান্ডা দেখায়, ভিতরে সব গলে যাচ্ছে।
শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে মধ্যমগ্রামে গুলি করে খুন করা হয়েছে। বাইকে আসা দুষ্কৃতীরা গাড়ি আটকে পরপর গুলি চালায়। ঘটনাস্থলে রক্ত, ভাঙা কাচ, কার্তুজ, আর যথারীতি “তদন্ত চলছে” নামক ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোরি।
কিন্তু এ ঘটনা শুধুই একটি খুন নয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় এটা একধরনের বারোমাস্যা। এখানে ভোট আসে, ভোট যায়, কিন্তু ভয় থেকে যায়। যেন প্রতিটি নির্বাচনের পরে রাজ্যটা কিছুদিনের জন্য মেক্সিকোর কোনো বি-গ্রেড নার্কো-থ্রিলারের বাংলা ডাবিং হয়ে ওঠে।
মজার বিষয় হল, বাংলার তথাকথিত “প্রগতিশীল” বুদ্ধিজীবীরা এইসব ঘটনায় এমনভাবে চুপ থাকেন, যেন তাঁদের বিবেকটা কোনো সরকারি প্রকল্পের টেন্ডারে আটকে গেছে। কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে বিপ্লব এখনও পরিবেশন হয়, তবে এখন সেটা কাপে নয়, ফেসবুক স্টোরিতে।
চন্দ্রনাথ রথের খুনের ঘটনায় পুলিশ বলছে তদন্ত চলছে। সিসিটিভি দেখা হচ্ছে। নম্বরপ্লেট নকল ছিল। গাড়ির চেসিস নম্বর ঘষে তুলে দেওয়া হয়েছে। সব শুনে মনে হচ্ছে খুনিরা যেন ইউটিউবে “Perfect Crime in 5 Easy Steps” দেখে মাঠে নেমেছিল।
এখানে প্রশ্নটা শুধু “কারা মারল” নয়। প্রশ্নটা হল, কেন বাংলায় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের মৃত্যু এত স্বাভাবিক শোনায়? কেন সংবাদপাঠকের গলায় বিস্ময় কমে গেছে? কেন মানুষ বলছে, “আবার?” যেন এটা বর্ষাকালে জল জমার মতোই এক অনিবার্য নাগরিক অভিজ্ঞতা।
বিজেপি এই ঘটনাকে রাজনৈতিক সন্ত্রাস বলছে। তৃণমূল নিন্দা করছে এবং সিবিআই তদন্ত চাইছে। বাংলার রাজনীতিতে এ এক অপূর্ব দৃশ্য। সবাই তদন্ত চায়, কিন্তু কেউ পরিবেশটার মালিকানা নিতে চায় না। যেন গোটা রাজ্যটাই একটা ভাঙা অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে প্রত্যেকে বলছে, “দেয়ালটা আমি ভাঙিনি, আমি শুধু হাতুড়িটা ধরেছিলাম।”
তবে বাস্তব বড় নির্মম। পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশকে বিজেপির উত্থান কোনো আদর্শগত সাহিত্যচক্রের ফল নয়। এটা এসেছে রক্ত, হামলা, বাড়িছাড়া, এবং রাজনৈতিক একঘরে হয়ে যাওয়া মানুষের জমাট ক্ষোভ থেকে। দিলীপ ঘোষ থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারী পর্যন্ত, বিজেপির রাজনীতি এখানে অনেকাংশে “survival politics”। কারণ বাংলায় বিরোধী হওয়া মানে অনেক সময় শুধু মতাদর্শ নয়, ব্যক্তিগত ঝুঁকিও।
এখানে একটা অদ্ভুত সাংস্কৃতিক ভণ্ডামি কাজ করে। যদি দিল্লিতে বিরোধী নেতার গাড়িতে গুলি চলত, বাংলা টুইটার বলত “গণতন্ত্র বিপন্ন।” কিন্তু বাংলায় হলে বলা হয়, “পুরো ঘটনা না জেনে মন্তব্য করা ঠিক নয়।”
এই “পুরো ঘটনা” নামক প্রাণীটা বাংলায় কখনও সম্পূর্ণ হয় না। ঠিক যেমন কলকাতার মেট্রো নির্মাণ। শুধু ব্যারিকেডটা থেকে যায়।
চন্দ্রনাথ রথ হয়তো জাতীয় রাজনীতির বড় মুখ ছিলেন না। কিন্তু বাংলার বাস্তব রাজনীতিতে আপ্তসহায়ক মানে শুধু PA নয়। সে অনেক সময় ছায়াসঙ্গী, মাঠের সংগঠক, যোগাযোগের সেতু, এবং নেতার রাজনৈতিক স্নায়ুতন্ত্রের অংশ। সেই মানুষটিকে বাড়ির কাছাকাছি গুলি করে মারা মানে শুধু একজনকে হত্যা নয়, একটা বার্তা পাঠানো।
আর বার্তাটা ভীষণ পুরনো: “বেশি বুঝলে লাশ পড়বে।”
কিন্তু বিজেপির পক্ষে এই ঘটনাকে শুধু আবেগে ভাসিয়ে দিলে ভুল হবে। রাজনৈতিকভাবে তাদের সামনে এখন দুটো রাস্তা। এক, শহিদ রাজনীতি করে ক্ষোভকে ভোটে রূপান্তরিত করা। দুই, আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নটাকে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় আলোচনায় তুলে ধরা। দ্বিতীয় পথটাই কঠিন, কিন্তু কার্যকর। কারণ সাধারণ বাঙালি এখন আর শুধু আদর্শ চায় না, নিরাপত্তাও চায়। সে চায় রাতে বাড়ি ফিরতে। চায় ছেলেকে অন্য দলের মিছিলে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরতে না দেখতে।
বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহুদিন ধরেই “ক্যাডার বনাম নাগরিক” দ্বন্দ্বে আটকে গেছে। এখানে দল অনেক সময় রাষ্ট্রের থেকেও বড় হয়ে ওঠে। থানার ওসি বদলায়, কিন্তু পাড়ার ভয় বদলায় না।
সবচেয়ে করুণ ব্যাপার হল, আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। খুনের খবর এখন আর মানুষকে স্তব্ধ করে না। কারণ প্রতিদিনের রাজনৈতিক সহিংসতা আমাদের অনুভূতির উপর একধরনের নিকোটিন প্যাচ লাগিয়ে দিয়েছে।
রক্ত দেখে আর হাত কাঁপে না। শুধু স্ক্রল করি।
চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু তাই শুধু একটি অপরাধের খবর নয়। এটা পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যপরীক্ষার রিপোর্ট। আর রিপোর্টটা খুব ভালো নয়। রোগীর পালস আছে, কিন্তু বিবেকের অক্সিজেন কমে গেছে।
শেষ পর্যন্ত, বাংলার রাজনীতি এখন অনেকটা পুরনো উত্তর কলকাতার ভাড়া বাড়ির মতো। বাইরে এখনও নীল-সাদা রং আছে, ভিতরে দেওয়ালে ফাটল। আর সেই ফাটলের ভিতর দিয়ে মাঝেমাঝে গুলির শব্দ বেরিয়ে আসে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।